বুদ্ধদেব

হেমেন্দ্রকুমার রায়

মানুষ যে নিজেকে ভগবানের মতো মহীয়ান করে তুলতে পারে, পৃথিবীতে সর্বপ্রথমে সেই প্রমাণ রেখে গিয়েছেন শাক্যবংশীয় মহাপুরুষ বুদ্ধদেব। একটি গল্প শোনা যায়। মান্ধাতার আমলের কাহিনি।

ইতিহাসপূর্ব যুগে উত্তর ভারতে এক রাজা ছিলেন, তিনি বিবাহ করতে চান এক পরমাসুন্দরী রাজকন্যাকে। কিন্তু রাজকন্যার এক অদ্ভুত খেয়াল, যে রাজা তাঁকে বিবাহ করবেন, জ্যেষ্ঠপুত্র তাঁর সিংহাসনের উত্তরাধিকারী হবে না, হবে কনিষ্ঠপুত্র। রাজা বললেন, 'তা-ই সই।' তাঁদের বিবাহ হয়ে গেল এবং পরে পরে জন্মগ্রহণ করলে পঞ্চপুত্র। ছোটোছেলেকে সিংহাসনের জন্যে রেখে রাজা নির্বাসিত করলেন অন্য চার ছেলেকে।

চার রাজপুত্র দেশে দেশে ঘুরতে ঘুরতে এক জায়গায় এসে হাজির হলেন। সেখানে ছিল কপিল মুনির আশ্রম। মুনিকে ভক্তিভরে প্রণাম করে রাজপুত্ররা শুধোলেন, 'মহর্ষিবর, আমরা বড়োই পথপ্রান্ত হয়ে পড়েছি। বাস করবার জন্যে মনের মতো ঠাঁই খুঁজে পাচ্ছি না।'

কপিল বললেন, 'বৎসগণ, মনোরম জায়গায় আমার এই আশ্রম। তোমরা এইখানেই বাস করো।'

তা-ই হল। রাজপুত্ররা সেইখানেই বসালেন এক নূতন নগর এবং কপিল মুনির নামানুসারে নগরের নাম রাখলেন কপিলবস্তু। তাঁদের বংশ পরিচিত হল শাক্য বংশ নামে। এই বংশের অধস্তন পুরুষ রাজা শুদ্ধোদনই হচ্ছেন বুদ্ধদেবের জনক।

বুদ্ধদেবের সঠিক জন্ম-তারিখ জানা যায়নি। এইটুকুই নিশ্চিতভাবে বলা চলে পৃথিবীতে তাঁর আবির্ভাব হয় ষষ্ঠ শতাব্দীতে।

রাজা শুদ্ধোদনের মহিষী মায়া দেবীর সন্তান-সম্ভাবনা হল। গনতকাররা বিচার করে বললে, 'মায়া দেবীর সন্তান-সম্ভাবনা হল। সংসারে থাকলে তিনি হবেন দিগবিজয়ী। সংসার ত্যাগ করলে তিনি হবেন মহর্ষি।'

বুদ্ধদেবকে প্রসব করবার নয় দিন পরে মায়া দেবী স্বর্গারোহণ করেন এবং শিশুর লালনপালনের ভার গ্রহণ করেন মায়া দেবীর ভগিনী। রাজপুত্রের নাম রাখা হল গৌতম।

গৌতমের মধ্যে ছিল রাজ্যোচিত সমস্ত গুণ। ক্ষাত্রধর্মে, অকস্ত্রবিদ্যায় কেউ ছিল না তাঁর সমকক্ষ। কিন্তু গনতকারদের কথা রাজা শুদ্ধোদন ভুলতে পারেননি। গৌতমের নাকি সংসারত্যাগের সম্ভাবনা আছে! অতএব পুত্রকে তিনি পালন করতে লাগলেন পরম সাবধানে। উনিশ বৎসর বয়সেই পুত্রের বিবাহ দিলেন যশোধরা দেবীর সঙ্গে। পাছে গৌতমের মনে বৈরাগের উদয় হয়, সেই ভয়ে তাঁকে তিনি ডুবিয়ে রাখলেন বিলাসব্যসনের মধ্যে।

কিন্তু পৃথিবীতে দুঃখ-শোক, জরা, রোগ ও মৃত্যু প্রভৃতি দেখে যৌবনেই গৌতমের মন হয়ে উঠল অশান্ত। অনিত্য জগৎ, নশ্বর দেহ, জীবনের পরম লক্ষ্য কী? রাজকীয় ভোগবিলাসের মধ্যেও এই প্রশ্নই জাগতে লাগল সর্বদা।

সংসারত্যাগী, বন্ধনত্যাগী সন্ন্যাসীদের দেখে গৌতম ভাবতে লাগলেন, ওঁরা এমন কৃচ্ছ্রসাধন করছেন কোন পরম আদর্শের সন্ধানে? মন তাঁর কৌতূহলী হয়ে উঠল। ভালো লাগল এই বন্ধনহারা জীবন।

এমন সময়ে তিনি শুনলেন, তাঁর সহধর্মিণী একটি পুত্র প্রসব করেছেন। গৌতম বললেন, 'বন্ধনের উপরে এ আবার এক নূতন বন্ধন! এরপরেও বাঁধা পড়তে হবে আরও কত নূতন বন্ধনে!'

সব বাঁধন ছিঁড়ে ফেলে গৌতম করলেন সংসারত্যাগ। বয়স তখন তাঁর উনত্রিশ বৎসর।

পথচারী এক দীন পথিককে নিজের রাজবেশ খুলে দিয়ে চেয়ে নিলেন তার মলিন বস্ত্র এবং তা-ই পরে গৌতম চললেন চিরন্তন প্রশ্নের উত্তর খোঁজবার জন্যে।

দিনের পর দিন পথ চলে গৌতম অবশেষে উপস্থিত হলেন বিন্ধ্য পাহাড়ের এক সন্ন্যাসীদের আস্তানায়। সন্ন্যাসীদের উপদেশ অনুসারে তিনিও কিছুকাল ধরে কৃচ্ছ্রসাধনে নিযুক্ত হয়ে রইলেন। অবশেষে উপবাসে ও অনিদ্রায় প্রাণ তাঁর যায়-যায় হয়ে উঠল, তবু পাওয়া গেল না সত্যের সন্ধান। যখন তিনি বুঝলেন উপবাস করেও দেহকে যাতনা দিয়ে পরমার্থ লাভ হয় না, তখন আবার সাধারণ মানুষের মতোই পানাহার করতে লাগলেন।

তারপর আবার দেশে দেশে অশান্ত মনে ঘুরতে ঘুরতে গৌতম যেখানে এসে হাজির হলেন, আজ তা বুদ্ধগয়া নামে বিখ্যাত। নির্জন বনভূমির মধ্যে তৃণশয্যায় বিস্তৃত ছায়া ফেলে দাঁড়িয়েছিল প্রকাণ্ড একটি বট গাছ। তারই তলায় উপবেশন করে গৌতম দীর্ঘ ছয় বৎসরকাল একান্ত মনে তপস্যায় নিযুক্ত হয়ে রইলেন। এবং লাভ করলেন বুদ্ধত্ব।

এতদিন তপশ্চর্যার পর বুদ্ধদেব যে পরম সত্যকে লাভ করলেন, সর্বমানবকে তার সন্ধান দেবার জন্যে সর্বপ্রথমে যাত্রা করলেন কাশীধামের দিকে। সেখানে মৃগদার কাননে (এখন সারনাথ নামে প্রসিদ্ধ) নিজের আশ্রম নির্মাণ করলেন। প্রথম পাঁচজন শিষ্যকে তিনি এই উপদেশ দিলেন: সৎদৃষ্টি, সৎস্মৃতি ও সম্পূর্ণ সমাধি—ধর্মের পথে অগ্রসর হবার জন্যে এই আটটি উপায় আছে।

বুদ্ধদেবের মত হচ্ছে, ব্যক্তিগত স্বার্থলাভের জন্যে সকল ইচ্ছা দান করা উচিত। আত্মজ্ঞানের দ্বারা আত্মলোপ করতে পারলেই মানুষ চরম নির্বাণ লাভ করতে পারে। সকলরকম হিংসাই ত্যাগ করা কর্তব্য।

বুদ্ধদেব রাজগৃহে গিয়ে শিষ্যরূপে গ্রহণ করেন রাজা বিম্বিসারকে। পরে কপিলবাস্তুতে প্রত্যাগমন করে নিজের পুত্র ও সহধর্মিণী প্রভৃতিকেও সন্ন্যাস-মন্ত্র দান করেন।

পঁয়তাল্লিশ বৎসরকাল ধর্মপ্রচার করবার পর অন্তিম শয্যায় শয়ন করে বুদ্ধদেব শিষ্যদের এই শেষ উপদেশ দেন: 'সকলে ধর্ম ও নিয়মের অধীন থেকো। দেহকে ভঙ্গুর জেনে মুক্তিলাভের চেষ্টা করো।'

মাসিক বসুমতী জুলাই ১৯৫২

সকল অধ্যায়
১.
ভারতের দ্বিতীয় প্রভাতে
২.
ভগবানের চাবুক
৩.
মহাভারতের শেষ মহাবীর
৪.
হন্তারক নরদানব
৫.
রক্ত বাদল ঝরে
৬.
আলেকজান্ডার দি গ্রেট
৭.
দিগবিজয়ী নেপোলিয়ন
৮.
পঞ্চনদের তীরে
৯.
উপন্যাসের চেয়ে আশ্চর্য
১০.
সত্যিকার অ্যাডভেঞ্চার
১১.
সাত হাজারের আত্মদান
১২.
মরা মানিক আর জ্যান্ত মানিক
১৩.
ভারতের একমাত্র সুলতানা
১৪.
সূর্য দেবী, পর্মল দেবী
১৫.
মারাঠার লিওনিডাস
১৬.
মুসলমানের জহরব্রত
১৭.
মৃগনয়না মহিষমর্দিনী
১৮.
ব্যাঘ্রভূমির বঙ্গবীর
১৯.
অনামা বীরাঙ্গনা
২০.
ভারতের থার্মোপলি
২১.
সিরাজের বিজয় অভিযান
২২.
ছত্রপতির অ্যাডভেঞ্চার
২৩.
ইতিহাসের রক্তাক্ত দৃশ্য
২৪.
মহাভারতের মহারথ
২৫.
'বীরাঙ্গনা, পরাক্রমে ভীমা-সমা'
২৬.
রক্ত পাথারের সাঁতারু
২৭.
ছত্রপতির ছত্রভঙ্গ
২৮.
তিন সম্রাটের ত্র্যহস্পর্শ-যোগ
২৯.
আলেকজান্ডারের পলায়ন
৩০.
ওষ্ঠাধরে রাজদণ্ড
৩১.
ইতিহাস আশ্রিত রচনা
৩২.
এ যুগের সবচেয়ে বড়ো ডাকাত
৩৩.
আধুনিক রবিনহুড
৩৪.
ইয়াঙ্কি খোকা-গুণ্ডা
৩৫.
গুপ্ত কবির কদলী-কবিতা
৩৬.
ভাঙা অমিত্রাক্ষরের স্রষ্টা কে?
৩৭.
নূতন বাংলার প্রথম কবি
৩৮.
বুদ্ধদেব
৩৯.
বাংলাদেশে বোম্বেটেরাজ
৪০.
ঋষি টলষ্টয়
৪১.
দুই ঠাকুরের কাহিনি
৪২.
আশ্চর্য মূর্খ পণ্ডিত
৪৩.
অতুল্য শ্রুতিধর
৪৪.
বর্গি এল দেশে
৪৫.
প্রথম বাঙালি সম্রাট
৪৬.
জগন্নাথদেবের গুপ্তকথা
৪৭.
মরণ বিজয়ীর দল
৪৮.
সত্যিকার দানব-দানবী
৪৯.
প্যারিসের কুব্জ-রাজা
৫০.
ফরাসি বিপ্লবে বাঙালির ছেলে
৫১.
বিখ্যাত চোরের অ্যাডভেঞ্চার
৫২.
টেলিফোনে গোয়েন্দাগিরি
৫৩.
প্যারির বালক-বিভীষিকা
৫৪.
পৃথিবীর প্রথম গোয়েন্দা কাহিনি
৫৫.
শিবদাস ভাদুড়ি
৫৬.
সেকালের সপ্ত আশ্চর্য

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%