হেমেন্দ্রকুমার রায়

ভারতে 'ছত্রপতি' বললেই বোঝায় মহারাষ্ট্রের মহাবীর শিবাজিকে। কিন্তু যখনকার কাহিনি বলছি, তখনও তিনি 'ছত্রপতি' উপাধি ধারণ করেননি।
বাদশাহ ঔরঙ্গজেবের সবচেয়ে বড়ো শত্রু ছিলেন ছত্রপতি শিবাজি। শিবাজিকে বধ করতে পারলে দিল্লীশ্বর নিশ্চিন্ত ও নিষ্কণ্টক হতেন, কিন্তু তাঁর সব অপচেষ্টাই হয়েছিল নিষ্ফল, শেষ পর্যন্ত। তার প্রধান কারণ শিবাজির বাহুবল নয়, বুদ্ধিবল।
ঔরঙ্গজেবের ফাঁদে পা দিয়ে শিবাজি তো বন্দি হলেন আগ্রা শহরে। তারপর তিনি কী অপূর্ব কৌশলে মারাত্মক ফাঁদ ছিঁড়ে বেরিয়ে আসেন, সে গল্প সকলেই জানেন, কারণ অনেক লেখক অনেকবার তা বর্ণনা করেছেন। সত্য যে উপন্যাসের চেয়ে অদ্ভুত, ওই বিখ্যাত ঐতিহাসিক কাহিনিটি সেই কথাই প্রমাণিত করে। ছেলেবেলায় রুদ্ধশ্বাসে গল্পটি পাঠ করতুম।
তারপরেই পড়ে যেত ছেদ! জেল ভেঙে অনেক কয়েদিই তো পালায়, কিন্তু তাদের অধিকাংশই পরে নাগালের বাইরে যাওয়ার আগেই ধরা পড়ে সুড়সুড় করে ফের জেলে ঢুকতে বাধ্য হয়, এই ব্যাপারটাই দেখা গেছে বারংবার।
দিল্লি থেকে মহারাষ্ট্র—বহু দূরে। তার মধ্যে দিকে দিকে কড়া পাহারা দিচ্ছে হাজার হাজার সতর্ক প্রহরী। শিবাজি কেমন করে তাদের চোখে দিলেন ধুলো, ছেলেবেলায় তা জানবার জন্যে মনে জাগত ব্যাকুল প্রশ্ন। কিন্তু ইস্কুলের ইতিহাসে প্রশ্নের উত্তর পাওয়া যেত না।
আজকের ছেলে-মেয়েরাও নিশ্চয়ই মনে মনে এই প্রশ্ন করে। তাদের কৌতূহল নিবারণের জন্যে আমরা যথাসাধ্য চেষ্টা করব।
এ হচ্ছে রীতিমতো চিত্তোত্তেজক অ্যাডভেঞ্চার।
আগ্রা থেকে কয়েক মাইল দূরে এক বিজন অরণ্য।
সেইখানে বসল পলাতকদের পরামর্শসভা। অবশেষে স্থির হল পাছে ভারী দল দেখে লোকের সন্দেহ জাগে, তাই দলের অন্যান্য সকলে যাবেন একদিকে এবং শিবাজি তাঁর বালক-পুত্র শম্ভুজি ও তিনজন পদস্থ কর্মচারীকে নিয়ে যাত্রা করবেন অন্যদিকে।
শিবাজি ও তাঁর সঙ্গীরা সর্বাঙ্গে ছাই মেখে সাজলেন ভবঘুরে সন্ন্যাসী, তারপর অগ্রসর হলেন মথুরার পথে।
ওদিকে আগ্রায় বন্দির ঘর শূন্য দেখে প্রহরীদের সর্দার ফুলাদ খাঁ হন্তদন্ত হয়ে সম্রাটের কাছে গিয়ে কুর্নিশ ঠুকে খবর দিলে, 'জাঁহাপনা, শিবাজি রাজা যে নিজের ঘরেই আটক ছিলেন, এ আমরা বার বার উঁকি মেরে স্বচক্ষে দেখেছি। তারপর আচমকা আমাদের চোখের সামনেই তিনি মিলিয়ে গেলেন কোথায় কে জানে! তিনি পাখির মতো ফুড়ুত করে আকাশে উড়ে পালালেন, না মাটি ফুঁড়ে পাতালে ঢুকে গেলেন, না অন্য কোনওরকম ভানুমতীর খেল খেললেন, সেসব কিছুই বোঝা গেল না।'
কিন্তু এহেন গাঁজাখুরি গল্পে বিশ্বাস করবেন, ঔরঙ্গজেব মোটেই সে পাত্র ছিলেন না। হইহই রব উঠল তখনই। শিবাজির পলায়নবার্তা নিয়ে দলে দলে দূত ব্যস্তভাবে ছুটে গেল দিকে দিকে। দাক্ষিণাত্যে যাওয়ার প্রত্যেক পথ আগলে সজাগ হয়ে রইল হাজার হাজার সেপাই-সান্ত্রি।
কিন্তু চাতুর্যে শিবাজিকে ঠকাবে কে? তিনি মহারাষ্ট্রের বাসিন্দা, তাঁর গন্তব্যপথ ভারতের দক্ষিণদিকেই বটে। তবে সেদিকের পথের ওপরে থাকবে যে প্রহরীদের শ্যেনদৃষ্টি, সে বিষয়ে তাঁর সন্দেহ ছিল না কিছুমাত্র।
অতএব তিনি মাথা খাটিয়ে ধরলেন উত্তর ভারতের পথ। আগ্রা ছেড়ে ঘণ্টা ছয় পরে পদব্রজে পৌঁছোলেন গিয়ে মথুরায়, কেউ কিছু সন্দেহ করতে পারলে না।
কিন্তু ছেলেমানুষ শম্ভুজি, মথুরা পর্যন্ত গিয়ে পথশ্রমে একেবারে ভেঙে পড়ল।
এ-ও এক গুরুতর সমস্যা। অক্ষম ছেলের মুখ চেয়ে সেখানে অপেক্ষা করলে বাদশাহের গোয়েন্দাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হবে এবং অক্ষম পুত্রকে সঙ্গে নিয়ে যাওয়ারও উপায় নেই। এখন মুশকিল আসান হয় কেমন করে?
কিন্তু সৌভাগ্যক্রমে সেখানে ছিল শিবাজির তিনজন জানিত লোক, তাঁদের হাতেই পুত্রকে সমর্পণ করে আবার তিনি বেরিয়ে পড়লেন।
ইতিমধ্যে শিবাজি গোঁফ-দাড়ি কামিয়ে ফেলেছিলেন। পথে প্রচুর অর্থের প্রয়োজন, কিন্তু তাও অতি গোপনে না নিয়ে গেলে চলবে না। অতএব তিনি হাতে নিলেন এমন এক মোটা লাঠি—ভিতরটা যার ফাঁপা। কিন্তু সেই শূন্যগর্ভ যষ্টির ভিতরটা পূর্ণ রইল বহু অমূল্য রত্ন ও স্বর্ণমুদ্রায়। আরও কিছু ঐশ্বর্য লুকিয়ে রাখা হল পাদুকার মধ্যে। হিরা-চুনির উপরে মোমের প্রলেপ মাখিয়ে শিবাজির ভৃত্যরাও মুখের ও পোশাকের ভেতরে লুকিয়ে রাখলে।
তারপর দিনের বেলায় বিশ্রাম ও রাতের অন্ধকারে পথ চলা। শিবাজির অনুচররা তিন দলে বিভক্ত হয়ে বৈরাগী, গোঁসাই ও উদাসী এই তিন শ্রেণির সন্ন্যাসীর ভেক ধারণ করে পিছনে-পিছনে চলল। সংখ্যায় ছিল তারা পঞ্চাশ-ষাটজন।
মাঝে মাঝে ছদ্মবেশ পরিবর্তনের প্রয়োজন হত। পলাতকরা কখনো সাজতেন ভিক্ষাজীবী সাধু, কখনো বা নিম্নশ্রেণির সওদাগর। এক তীর্থক্ষেত্রে তাঁদের চিনতে পারত না।
মথুরা ছেড়েও শিবাজি দেশমুখো হলেন না—চললেন পূর্বদিকে। একে একে গেলেন এলাহাবাদ, বেনারস ও গয়া ধামে তাঁকে সাধারণ তীর্থযাত্রী ছাড়া আর কিছু বলে ভ্রম করবার উপায় রইল না।
এসব অঞ্চলেও যথাসময়ে বাদশাহের ফরমান এসেছে বটে, কিন্তু মহারাষ্ট্রের যাত্রীর আসবার কথা নয় পূর্ব ভারতের দিকে, তাই দক্ষিণাপথের মতো এদিককার কর্তৃপক্ষও যে খুব বেশি হুঁশিয়ার ছিলেন না, সেটুকু সহজেই অনুমান করা যেতে পারে। এবং শিবাজিও চেয়েছিলেন তা-ই!
তবু মাথার উপরে মাঝে মাঝে নেমে এসেছিল বিপদের ফাঁড়া। এইবারে সেই কাহিনিই বলব। সেসব যেন চমকদার ডিটেকটিভ উপন্যাসের ঘটনা।
শহরের ফৌজদারের নাম আলি কুলি। সন্ন্যাসীর বেশে শিবাজি সদলবলে প্রবেশ করলেন সেই শহরে।
বাদশাহের ফরমান জাগ্রত করে তুলেছে ফৌজদারকে। শিবাজি ও তাঁর দলবলের হাবভাব সন্দেহজনক মনে হওয়াতে তাঁদের গ্রেপ্তার করা হল এবং বন্দিদের নিয়ে জোর জেরা চলতে লাগল।
বোধ করি বন্দিদের পক্ষে জেরার ফল হল না বিশেষ সন্তাোষজনক। গতিক সুবিধার নয় বুঝে শিবাজি ফৌজদারের সঙ্গে গোপনে দেখা করলেন।
তখন দুপুররাত। বন্দি বললেন, 'আমি শিবাজি।'
সচকিত ফৌজদার বুঝলেন, তাঁর জালে পড়েছে সবচেয়ে সেরা ঘাগি মাছ। আশা করা যায় বন্দির পরিচয় পেয়ে তাঁর বুক হয়ে উঠেছিল দশ হাত।
শিবাজি বললেন, 'যদি আমাকে মুক্তি দেন, আমার কাছ থেকে আপনি লাখ টাকা দামের একখানা হিরা ও একখানা পদ্মরাগমণি উপহার পাবেন।'
পরম লোভনীয় উৎকোচ—একেবারে কল্পনাতীত। বুদ্ধিমান ফৌজদার এমন দুর্লভ সুযোগ ত্যাগ করতে পারলেন না।
আলি কুলি কর্তব্য ভুললেন এবং শিবাজি সদলবলে নিরাপদে আবার পদচালনা করলেন নিজের গন্তব্যপথে।
এলাহাবাদ। গঙ্গা-যমুনা সংগম। স্মরণাতীতকাল থেকে তীর্থযাত্রীরা এখানে এসে অবগাহন স্নান এবং শাস্ত্রকথিত অন্যান্য ধর্মানুষ্ঠানের নিয়ম পালন করে থাকেন। শিবাজিও সেখানে স্নানাদি সেরে যাত্রা করলেন কাশীধামের দিকে।
পুণ্যতীর্থ বারাণসী—ভারতের বর্তমান নগরগুলির মধ্যে সবচেয়ে পুরাতন। ইয়োরোপে যখন কেউ রোমের নামও শোনেনি, তখনও বারাণসীর খ্যাতি দিকে দিকে দেশ-বিদেশে বিস্তৃত।
চারিদিকে তরুণ উষার আলো-আঁধারির খেলা। নিষ্ঠাবান হিন্দুর মতো শিবাজিও তীর্থকৃত্য পালন করতে উদ্যত হয়েছেন, এমন সময়ে সম্রাটের বার্তাবহ নগরে ঢুকে উচ্চকণ্ঠে ঘোষণা করলে, রাজা শিবাজি পলাতক! অবিলম্বে তাকে গ্রেপ্তার করতে হবে!
ঠিক তার একটু আগেই শিবাজি জনৈক পূজারির হাতের মধ্যে কিছু ধনরত্ন গুঁজে দিয়ে বলেছেন, 'এখন মুঠো খুলো না, শীঘ্র আগে আমাকে শাস্ত্রীয় বিধি পালন করাও!'
ইতিমধ্যে শিবাজি ক্ষৌরকার্য ও স্নান সেরে নিয়েছেন, কিন্তু তখনও তাঁর অন্যান্য কর্তব্য শেষ হয়নি। ঠিক সেই সময়ে রাজদূতের ঘোষণা তাঁর কর্ণগোচর হল...
পুরোহিত ফিরে দেখেন, তাঁর যজমান অদৃশ্য!
হাতের মুঠো খুলে তিনি সবস্মিয়ে দেখলেন, নয়খানি রত্ন এবং কতকগুলি স্বর্ণমুদ্রা।
শিবাজির কাছ থেকে প্রাপ্ত এই দৌলতের প্রসাদে পুরোহিত পরে হয়েছিলেন প্রাসাদোপম ভবনের অধিকারী।
পূর্বে—আরও পূর্বে—দক্ষিণের যাত্রী চলেছেন আরও পূর্বদিকে, ধূলিনিক্ষেপ করতে হবে বাদশাহের গুপ্তচরদের ক্ষুধিত চক্ষে!
কাশীধাম থেকে তাড়া খেয়ে শিবাজি ক্রোশের পর ক্রোশ পার হয়ে গেলেন দ্রুতপদে। অবশেষে গয়া ধামে। সেখানে অর্ঘ্য নিবেদন করলেন বিষ্ণুর পাদপদ্মে।
তারপরেই আছে বঙ্গদেশ। কিন্তু বঙ্গদেশ তীর্থের জন্যে ভারতবিখ্যাত নয়। এবং সম্রাটের গোয়েন্দারাও দক্ষিণাপথে মিথ্যা ছুটোছুটি করে শ্রান্ত হয়ে এতদিনে শিবাজির আশা নিশ্চয়ই পরিত্যাগ করেছে! আলেয়ার পিছনে ছোটারও মানে হয়, কারণ তাকে দেখা যায়; কিন্তু যে থাকে একেবারে চোখের আড়ালে, তার পাত্তা পাওয়া যাবে কেমন করে?
অতএব এইবারে এসেছে স্বদেশ প্রত্যাগমনের প্রশস্ত সুযোগ।
শিবাজি এবারে অগ্রসর হলেন বিহার থেকে দক্ষিণ-পশ্চিমদিকে। সুদূর পথ—ভারতের প্রায় এক প্রত্যন্ত দেশ থেকে আর-এক প্রান্তে। মাঝে পড়ে বিস্তর নদনদী, দুস্তর প্রান্তর, দুশ্চর অরণ্য, দুর্লঙ্ঘ্য পর্বত, বিপজ্জনক জনপদ। পায়ে হেঁটে ক্রোশের পর ক্রোশ পার হতে হতে পা ওঠে টনটনিয়ে, গায়ে হয় ব্যথা। শিবাজি ছিলেন অশ্বপৃষ্ঠের ভ্রমণে অভ্যস্ত, পদব্রজে পথ অতিক্রম করতে আর তাঁর ভালো লাগল না।
অতএব পথিমধ্যে এক জায়গায় দরদস্তুর করে তিনি একটি টাট্টু ঘোড়া কিনে ফেললেন।
সঙ্গে রৌপ্যমুদ্রার অভাব, তাই তিনি জেব থেকে থলি বার করে অশ্ব-ব্যবসায়ীর হাতে সমর্পণ করলেন কয়েকটি মোহর।
অশ্ব-ব্যবসায়ীর বিস্ময়ের সীমা রইল না। বলা বাহুল্য, তখন শিবাজির অদ্ভুত পলায়ন-বার্তা ছড়িয়ে পড়েছিল সারা ভারতে। সে সচমকে বলে উঠল, 'একটা ছোটো টাট্টু ঘোড়ার জন্যে আপনি এত বেশি দাম দিচ্ছেন, নিশ্চয়ই আপনি শিবাজি রাজা!'
ব্যবসায়ীর মুখ চটপট বন্ধ করবার জন্যে মোহর ভরতি থলিটাই তার হাতে ফেলে দিয়ে শিবাজি তৎক্ষণাৎ ঘোড়া ছুটিয়ে সেখান থেকে সরে পড়লেন।
গোদাবরী নদীতীরের এক গ্রাম। ছদ্মবেশী সন্ন্যাসীর দল সেখানকার কোনও চাষির বাড়িতে গিয়ে অতিথি হল।
চাষির বুড়িমা দুঃখ করে বললে, 'কী বলব বাবা, সর্বস্ব গিয়েছে, আর কি আমাদের অতিথিসৎকার করবার সামর্থ্য আছে?'
কৌতূহলী শিবাজি শুধোলেন, 'কেমন করে সর্বস্ব গেল মা?'
বুড়ি বললে, 'শিবাজি ডাকাতের চেলাচামুণ্ডারা গোটা গাঁ লুট করে গেছে, আমাদেরও কিছু রেখে যায়নি।' তারপর সে লুটেরাদের দলপতি শিবাজির উদ্দেশে চোখা চোখা বাক্যবাণ বর্ষণ করতে লাগল।
শিবাজি চেপে গেলেন তখনকার মতো। কিন্তু সেই কৃষাণ পরিবারের নাম ও ঠিকানা মনে রাখতে ভুললেন না।
পরে যথাসময়ে দেশে ফিরে তিনি সেই কৃষককে সপরিবারে নিজের কাছে তলব করে আনিয়েছিলেন। নিশ্চয়ই তারা এসেছিল খুব ভয়ে-ভয়ে, কিন্তু বাড়ি ফিরেছিল ভারী হাসিমুখে, শিবাজির মঙ্গলকামনা করতে করতে।
কেন, তাও কি আবার খুলে বলতে হবে?
উত্তর, পূর্ব, পশ্চিম ঘুরে অবশেষে দক্ষিণে! রীতিমতো ভারত-পরিক্রমা! দিগবিজয়ী রূপে নয়, মহাবীর হয়েও ভাগ্যহত, শত্রুভীত অভাগাজনের মতো শিবাজি আজ বৃহৎ ভারতের যে অংশের মাটি মাড়িয়ে স্বদেশে ফিরে এলেন, অদূর-ভবিষ্যতে তাঁরই সৃষ্ট সৈন্যসামন্তগণ যে সেই বিপুল ভূখণ্ডেরই দিকে দিকে গৈরিক পতাকা উড়িয়ে বিজয়োৎসবে প্রমত্ত হয়ে উঠবে, এ কথা কেউ সেদিন কল্পনায়ও আনতে পারেনি। একান্ত অকালে পূর্ণগৌরবের মাঝখানে অন্তিম নিশ্বাস ত্যাগ করবার আগেই মাত্র তেত্রিশ বৎসরের মধ্যেই নিজের হাতে তিনি এমন এক দুর্ধর্ষ জাতি তৈরি করে গিয়েছিলেন, যার কাছে সকল গর্ব হারিয়ে সকাতরে করুণা ভিক্ষা করতে হয়েছিল একদা-অপরাজেয়, শক্তিগর্বিত মোগল রাজবংশকেও। স্বর্ণ ও রত্নখচিত ময়ূর সিংহাসনে আসীন হয়ে সেদিন যে আলমগির ঘৃণার্হ শিবাজি, মারাঠি ও সেইসঙ্গে সমগ্র হিন্দু জাতির উচ্ছেদসাধনের জন্যে প্রাণপণ চেষ্টা করে গিয়েছিলেন, পরে সেই আলমগির নামেই পরিচিত দ্বিতীয় দিল্লীশ্বর মারাঠিদেরই আশ্রয় গ্রহণ করতে লজ্জিত হননি এবং তখন তাঁর মসনদ বলতে বোঝাত কাঠে তৈরি এক নকল ময়ূর সিংহাসন। আবার তারও বৎসর দুই পরে ওই মারাঠিরাই গায়ের জোরে দখল করেছিল রাজধানী দিল্লি পর্যন্ত।
কিন্তু সেসব হচ্ছে আরও কিছুকাল পরের কথা। আপাতত ঔরঙ্গজেবের লক্ষ্যচ্যুত শিবাজি কোনওক্রমে নিজের কোটে পদার্পণ করে আশ্বস্তির নিশ্বাস ফেলে বাঁচলেন। কালচক্র ঘুরে যাবে কোনদিকে, তিনি বা ঔরঙ্গজেব কেউই তা এখন পর্যন্ত জানতে পারেননি...
বীরধাত্রী, রত্নপ্রসবিত্রী, পুত্রগত প্রাণা জিজাবাই! নিজের হাতে মানুষের মতো মানুষ করা ছেলে আজ হিন্দুবিদ্বেষী, কূটচক্রী, নৃশংস ঔরঙ্গজেবের খপ্পরে গিয়ে পড়েছে, তাই শিবাজি-জননীর জীবন হয়ে উঠেছে দুঃসহ দুঃস্বপ্নের মতো।
একাকিনী বসে বসে তিনি নিজের দুর্ভাগ্যের কথা চিন্তা করছেন, এমন সময়ে দ্বারী এসে খবর দিলে, একদল বৈরাগী তাঁর সাক্ষাৎ প্রার্থনা করে। তিনি সম্মতি দিলেন।
সন্ন্যাসীরা সামনে এসে দাঁড়াল। একজন হাত তুলে তাঁকে আশীর্বাদ করলে। কিন্তু আর-একজন এগিয়ে এসে লুটিয়ে পড়ল একেবারে তাঁর পায়ের তলায়!
জিজাবাই বিস্মিত ও তটস্থ! কোনও সন্ন্যাসী যে তাঁর পায়ে মাথা ছুঁইয়ে প্রণাম করবে, এ যে স্বপ্নাতীত! এ যে অমঙ্গলকর!
তারপর সন্ন্যাসী মাথা রাখলে একেবারে তাঁর কোলের ভিতরে এবং একটানে খুলে ফেললে নিজের শিরস্ত্রাণ!
মাথার একটা পরিচিত চিহ্ন দেখেই জিজাবাইয়ের বুঝতে দেরি হল না যে, তাঁর কোলের ছেলেই আবার ফিরে এসেছে মায়ের কোলে! দুই হাতে তাকে জড়িয়ে ধরে তিনি আবেগকম্পিত কণ্ঠে ডাকলেন, 'শিবা, শিবা, আমার শিবা!'
আদরে গলে শিবাজি সাড়া দিলেন, 'মা গো, আমার মা!'
অরবিন্দ, শরৎ সাহিত্য ভবন, ১৯৫৪

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন