কাক ও পনীর পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পার্থ প্রতিম পাঁজা

চরিত্র: কথক, চলচিত্রকার, কাক (কাকলি), গোবিন্দ, বৃন্দাবন, শৃগাল, কোকিল।

কথক : ‘এক কাক কোনও স্থান হইতে একখন্ড পনীর আনিয়া বৃক্ষের শাখায় বসিল। সেওই পনীর খাইবার উপক্রম করিতেছে, এমন সময়ে, এক শৃগাল, সেই স্থানে উপস্থিত হইয়া কাকের মুখে পনীরখন্ড দেখিয়া মনে মনে স্থির করিল কোনও উপায়ে কাকের মুখ হইতে ওই পনীর লইয়া আহার করিতে হইবে। অনন্তর, সেকাককে সম্বোধন করিয়া বলিল, ভাই কাক, আমি তোমার মতো সর্বাঙ্গসুন্দর পক্ষী কখনও দেখি নাই। কেমন পক্ষ! কেমন চক্ষু! কেমন গ্রীবা! কেমন বক্ষঃস্থল! কেমন নখর! দেখো ভাই তোমার সকলই সুন্দর। দুঃখের বিষয় এই তুমি বোবা।

কাক শৃগালের মুখে এইরূপ প্রশংসা শুনিয়া অতিশয় আহ্লাদিত হইল এবং মনে করিল শৃগাল ভাবিতেছে আমি বোবা। এই সময়ে যদি আমি শব্দ করি তাহা হইলে শৃগাল একেবারে মোহিত হইবে। এই বলিয়া মুখ বিকৃত করিয়া কাক যেমন শব্দ করিতে গেল, অমনি তাহার মুখস্থিত পনীরখন্ড ভূমিতে পতিত হইল। শৃগাল যারপরনাই আহ্লাদিত হইয়া ওই পনীরখন্ড উঠাইয়া লইল এবং মনের সুখে খাইতে খাইতে তথা হইতে চলিয়া গেল। কাক হতবুদ্ধি হইয়া বসিয়া রহিল।’

[চলচিত্রকারের চিত্র দর্শানো]

চলচিত্রকার : প্রহ্লাদের কুলে জল্লাদ যেমন

কোকিলের বাসায় দাঁড়কাক তেমন।

গলা সাধে সক্কালে

কলা চাখে বৈকালে,

ফেরে আনাচেকানাচে অলিগলি,

তারি কথা এল চলি,

সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি।।

(কাকের গীত)

কাকলি : নোনতা নোনতা পনীর পনীর

বাসি ছানা গয়লা-পটির

ভোরে উঠে লুটে পুটে

হাওয়া খেয়ে হই বাহির

ফজির ফজির

পর্কটির বনটায়।

[প্রস্থান]

[বাড়ি হাতে গোবিন্দ ঘোষ, বৃন্দাবন]

গোবিন্দ : কই গেল কই গেল?

এই এসে ওই গেল—

চোরায়ে ননী টাটকা পনীর।

দধি পসারির দৈ খেল

ওই যে সেওই গেল—

মাখন-চোরায় বুদ্ধি পেল,

মাথায় ঘোল ঢেলে পালাল ওই।

কই কই পরচুলা কই?

বৃন্দাবন : বৃন্দাবনে ঘর বসতি মোর

ভাঁড় ভেঙে ননী খেয়ে ওই পালাল চোর!

গোবিন্দ : কান্ড দেখো, ছোঁ মেরেছে

পরচুলোটায় মোর।

ওরে চালও নেই চুলও নেই

টাক ঢাকা দিই পরচুলোতেই

কাকটা এসে উড়িয়ে নিতেই

টাকটা বেবাক ফাঁক হয়ে গেল

মাথা ধরে উঠল এই!

বৃন্দাবন : বসে কী হবে ভাই?

চলো কাকের পিছনে দৌড়াই।

গোবিন্দ : পরচুলের উপর চুড়ো ছিল

ময়ূরপাখার,

তেমনটি আর মেলা ভার।

বৃন্দাবন : পাখি হয়ে মানুষকে ঠাট্টা—

কোথা হতে এল তীর্থের কাগটা।

গোবিন্দ : ওঃ কেমন করে সামলাই ব্যাগটা!

বৃন্দাবন : পাই কোথা এমন মাটির ভাঁড়টা!

গোবিন্দ : চলো চোরোশি ক্রোশ ঘুরে

দেখি পাই কি না পাই পাখির পাত্তা।

[প্রস্থান]

[শৃগালের প্রবেশ]

শৃগাল : হোগলা বনে ঘর বসতি

চৌকিদারি কাজ,

চার প্রহর চৌতালেতে

খেয়াল করি গান।

চৌকিদারি কী ঝকমারি

না খেয়ে প্রাণ গেল,

আমার হাঁসধরা কাজ ছিল ভালো

না ছিল দেগদারি

পরেন্তি জারি ল্যাঠা ভারি!

[কাকলির প্রবেশ]

কাকলি : বৃন্দাবনের স্বর্গের তাল গাছ,

ছায়া নাই তার আছে কেবল ঝাঁজ।

তারি থেকে নেমে এলেম

বনভোজনে সকালে আজ।

শৃগাল : আইস, আইস, বৈস বৈস।

বংশবদের নিবেদনমিদং

কিং কার্যং দ্রুত গমনে

নাহি প্রয়োজন বনভোজনে

কার্যঞ্চাগে অনিবার্যং করি দরশন।

কী উজ্জ্বল রূপরাশি নিরুপম এ ভুবনে

কোন ভাগ্যে হেন রূপ নেহারিনু

এ নয়নে।

সর্বাঙ্গসুন্দর পক্ষী এমন তো দেখি নাই

কেমন পক্ষ, কেমন চক্ষু, কেমন গ্রীবা

সুচিকণ চিক্কণ বর্ণ।

কোকিলকন্ঠ আছে কি নাই,

ভাবছি তাই।

পড়েছিলেম একটা কথা

শিশুবোধকের তেষটি পাতে—

তাবচ্চ শোভতে মূর্খং যাবৎ কিঞ্চিন্নভাষতে।

[কোকিলের প্রবেশ]

কোকিল : বলি কই কথা কও, কই কথা কও

বৈসে কেন রইলে ওই!

বউ-কথা কও ডাকল ডালে

কইছে কোকিল ওই তমালে রই রই।

শৃগাল : আমি এসেছি এই প্রভাতে

সারাটি রজনী জাগিয়া

শুধু দেখিবারে, কথা শুনিবারে

আশাতে এ বুক বাঁধিয়া

পথে আসিতে পথের মাঝে

মাত্র একবার দ্রাক্ষাখেতে

গিয়েছি কাজে

তাই কি তোমার কন্ঠবীণার

মধুঝংকার স্তব্ধ রইল সকাল হতে

ত্যাজ হে।

কোকিল : মিছে সাধাসাধি! গাইবেন কি?

গলার সুর আসলে নাস্তি

সেধো না জাস্তি। মিছে সাধা!

কোনোদিনই কাক-পক্ষী গায়নি।

শৃগাল : মধুমাস আসে, দখিনা বায়।

পাপিয়া গায় কোকিলে গায়

বকুলে রসালে মন মাতায়

কাক শুধু ককায়

বেসুরো কাঁদা, কালো কুচকুচে।

কাকলি : (স্বাগত)। ভাবছ জাতিতে কাক

জানিনে ডাক।

দুঃখ পেলে চুপ করে থাকি,

সুখ পেলে চোখ মেলে থাকি নির্বাক।

আচ্ছা এবার লাগাচ্ছি তাক

পনীর খাওয়া থাক।

(কাকলির গীত)

বৃন্দাবনের গাছগুলি অতি বড়ো উঁচু

শিখী ফেরে নৃত্য করি উঁচু করে পুছু।

কলাপাতার বাঁশি বাজে চুচু চুচু চুচু

চুচু চুচু কিচু মিচু নাচু নাচু।

শৃগাল : বাহোয়া বাহোয়া, করো খুব চর্চা

বহুৎ আচ্ছা—কালোয়াৎ সাচ্চা।

হাত হয়েছে পনীর

কার তোয়াক্কা রাখি আর

কোকিলের রবে কর্ণ বধির

কাকের ডাকাতে পক্ষীর ধার

এবে হই পগার পার

বসন্ত বাহার বাহোয়া বোয়া

কেউসা হুঁয়া চমৎকার।

[প্রস্থান]

কাকলি : অহং তিষ্ঠ তিষ্ঠ শ্যালটা জানতেম শিষ্ট—

এখন দেখি যে বিষম নষ্ট, তিষ্ঠ তিষ্ঠ।

অকালে সকালে ঘটালে অনিষ্ট

পনীরটা হল হস্ত ভ্রষ্ট, কী দুরদৃষ্ট।

কোকিল : আরে যেতে দাও পনীর খাওন

উচিত কি হয় খাওন এখন?

বসন্তকালে করো গলার সাধন

মিছে লাগালে খকর কাশন।

কাকলি : বসি গালে সক—

যাক তার পর খক

একদম ফুলিসস্টপ।

নাচ শিখব গানেতে ড্রপ।

কোকিল : আগে গাইতে শেখো, নেচো না পায় পায়

লেখা আছে কথামালায়

বৃক্ষের আগায় কাগটে গান গায়,

তলাতে শেয়াল বাহবা বাৎলায়

করে হায় হায়!

সকল অধ্যায়
১.
ছাত্রের পরীক্ষারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২.
পেটে ও পিঠেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩.
বেচারাম কেনারামউপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
বৃক ও মেষ পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫.
কাক ও পনীর পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬.
লক্ষ্মণের শক্তিশেল সুকুমার রায়
৭.
অবাক জলপান সুকুমার রায়
৮.
কাজির বিচারকাজী নজরুল ইসলাম
৯.
রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা কাজী নজরুল ইসলাম
১০.
ঝড়ের দিনেসুনির্মল বসু
১১.
আলোলীলা মজুমদার
১২.
দরদিদিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩.
যেদিন জাগবে মুকুল বিমল ঘোষ
১৪.
ভীম বধনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১৫.
বহুরূপীদেবনারায়ণ গুপ্ত
১৬.
গুপীগাইন বাঘাবাইন সত্যজিৎ রায়
১৭.
দত্যি দানোর ছানাশৈলেন ঘোষ
১৮.
সৌরভবৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়
১৯.
শ্রেয়সী অমল রায়
২০.
বোকা বাঘের ছানাড. পার্থপ্রতিম পাঁজা
২১.
রাক্ষসের সঙ্গে টক্কর ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%