পার্থ প্রতিম পাঁজা
চরিত্র : বুড়ো চাষি, বড়োছেলে, মেজোছেলে,ছোটোছেলে অ্যাশ, রাক্ষস।
১ম দৃশ্য
[বুড়ো চাষির খামার। বুড়োর তিনছেলে। সকাল- বেলা। বুড়োছেলেদের ডেকে কিছু বলছে।]
বুড়ো : দ্যাখো ছেলেরা, আমি এখন বুড়ো হয়েছি। আগের মতো পরিশ্রম করতে পারি না। এখন তোমরা যদি নিজের থেকে কাজে হাত না লাগাও তবে তো আর সংসারে হাঁড়ি চড়বে না।
বড়োছেলে : একথা কেন বলছ বাবা? আমরা কি সংসারের কোনো কাজ করি না।
বুড়ো : তা, যদি করতে বাবা, তাহলে আমাকে আর এই কথাগুলো বলতে হত না। সংসারের কোন কাজটা তোমরা করো শুনি? হ্যাঁ, একটা কাজ অবশ্য তোমরা মন দিয়ে করো।
মেজোছেলে : সেটা কী বাবা?
বুড়ো : সেটা কী বাবা? হুঁ, খাওয়া আর শোয়া। আর তো কোনো কাজ নেই।
অ্যাশ : এভাবে বলছ কেন বাবা? আমরা তোমার সমর্থ-ছেলে। আমরা থাকতে তোমার ভাবনা কীসের? বলো, তোমার জন্যে আমাদের কী করতে হবে? তুমি যা বলবে আমরা তাই করব। কী বলো দাদারা?
বড়ো ও মেজো: হ্যাঁ হ্যাঁ তাই করব, কথা দিলাম।
বুড়ো : কাজটা আমার নয় বাবারা সংসারের। এমন কিছু কঠিনও নয়।
অ্যাশ : বলো কী কাজ? আমরা নিশ্চয়ই তা করে দেব।
বুড়ো : দ্যাখো, এই খামারে ওই দিকটাতে বেশ ভালো জঙ্গল পড়ে আছে। আমি চাই তোমরা ওই জঙ্গলের কাঠ কেটে, সেই কাঠ বিক্রি করে আমার ঋণের বোঝা হালকা করো।
বড়োছেলে : বেশ, আমরা রাজি। আমাদের জঙ্গলের কাঠ কাটলে যদি তোমার ঋণ শোধ হয়, তবে আমরা নিশ্চয়ই কাঠ কাটতে যাব।
বুড়ো : কে প্রথমে যাবে?
বড়োছেলে : তুমিই বলো, প্রথমে কার যাওয়া উচিত?
অ্যাশ : আমিই প্রথমে যেতে চাই।
বুড়ো : না না, তুমি বয়েসে সবচেয়ে ছোটো। আমার মতে, তোমার বড়দাকেই আগে যেতে দেওয়া উচিত।
বড়োছেলে : ঠিক আছে। আজকে আমিই চললাম। দাও তোমার কুঠার আর দড়ি। আজ থেকেই আমাদের কাঠ কাটার অভিযান শুরু।
[কুঠার ও দড়ি নিয়ে বড়োছেলে বেরিয়ে যায়।]
[মঞ্চে আলো নেভে।]
২য় দৃশ্য
[বনের দৃশ্য। বড়ো বড়ো গাছ। বড়োছেলে সেখানে প্রবেশ করে]
বড়োছেলে : বাবা: কত পুরোনো বন। চারিদিকে শ্যাওলা, ঝোপ আর বড়ো বড়ো গাছ। এখানে পৌঁছোতেই তো দম বেরিয়ে গেল। হোঁচোট খেয়ে আর খোঁচা খেয়ে পা দুটোর দফারফা হয়ে গেছে। না:, এই গাছটার ওপর বসে একটু বিশ্রাম নেওয়া যাক। বেশ খিদে পেয়েছে, সেইসঙ্গে তেষ্টাও। ভালোই শরীরে ফুঁ দিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছিলাম। কেন যে ছোটোর কথায় সায় দিয়ে কাঠ কাটতে রাজি হয়ে গেলাম? এখন ঠেলা সামলাও। না:, কাজে লেগে যাই। অন্তত একটা গাছ কেটে কাঠ নিয়ে বাড়ি ফিরতে হবে। না হলে কারো কাছে মুখ দেখাতে পারব না। ওই তো ওই শুকনো বুড়ো ফার গাছটা কাটতে শুরু করি .... হ্যাঁয় ... হ্যাঁয়—
[বড়োছেলে ঘাম ঝরিয়ে কাঠ কাটতে থাকে। এমন সময়, সেখানে রাক্ষসের আবির্ভাব হল।]
রাক্ষস : কে রে হতভাগা? আমার অনুমতি ছাড়াই আমার জঙ্গলে কাঠ কাটছিস? এতবড়ো সাহস!
বড়োছেলে : ওরে বাবারে! এ কে রে? এ তো দেখি রাক্ষস!
রাক্ষস : হ্যাঁ, ঠিক ধরেছিস, আমি রাক্ষস, আমার জঙ্গলে কাঠ কাটছিস। এতবড়ো আস্পর্ধা। আমি তোর ঘাড় মটকে রক্ত চুষে খাব, ব্যাটা পাজি, হতচ্ছাড়া!
বড়োছেলে : ওরে বাবারে! মরে গেলুম রে! বাঁচাও, বাঁচাও! কে কোথায় আছ বাঁচাও। রাক্ষস! রাক্ষস আমাকে মেরে ফেললে!
[কুঠার, দড়ি ফেলে রেখে দৌড়ে পালাল সে, রাক্ষস ‘হা: হা:’ করে হাসতে লাগল।]
রাক্ষস : দাঁড়া, তোকে আমি চিবিয়ে খাব। আমার জঙ্গলে কাঠ চুরি! তোকে জ্যান্ত খাব ব্যাটা, ‘হা:, হা:, হা:’।
[মঞ্চে আলো নেভে।]
৩য় দৃশ্য
[বুড়ো চাষির খামার বাড়ি। দুই ছেলেকে নিয়ে বুড়ো বাগানের ঘাস বাছছে।]
বুড়ো : অনেক দিনের পর আজ আমার মনটা অনেক খুশি, অনেক হালকা লাগছে। আমার ছেলেরা এবার সংসারের দায়িত্ব নিতে শুরু করেছে, কাজ করতে শুরু করেছে।
অ্যাশ : তুমি কিছু চিন্তা কোরো না বাবা, আমরা তোমার সব ঋণ, সব কষ্ট মিটিয়ে দেব। বড়দা আজ অনেক কাঠ আনবে, দেখো—
মেজোছেলে : আরে, দূর থেকে একটা কেমন চিৎকার শোনা যাচ্ছে-না? মনে হচ্ছে কেউ খুব ভয় পেয়ে আর্তচিৎকার করতে করতে এদিকেই ছুটে আসছে।
অ্যাশ : হ্যাঁ তাই তো! এখন আবার কার কী হল?
[ঝড়ের বেগে বড়োছেলে মঞ্চে প্রবেশ করে। সেআতঙ্কগ্রস্ত। মঞ্চে আছড়ে পড়ে সে।]
মেজোছেলে : কী হয়েছে দাদা? তুমি এমন করছ কেন? কী দেখে তুমি এত ভয় পেলে?
বড়ছেলে : বলছি, বলছি। আগে আমাকে একটু জল দাও। গলাটা শুকিয়ে একেবারে কাঠ হয়ে গেছে।
বুড়ো : এই নাও জল খাও। (জলের জগ দেয়। বড়োছেলে ‘ঢক ঢক’ করে পুরো জগ শেষ করে দিয়ে হাঁপাতে থাকে।)
এইবার বলো তো ব্যাপারটা কী? কেন এই নাটক?
বড়োছেলে : নাটক! হা:, বাবা আর একটু হলে তুমি তোমার বড়োছেলেকে চিরকালের জন্যে হারাতে।
বুড়ো : মানে?
বড়োছেলে : আমি তো মনোযোগ দিয়ে একটা ফারগাছ কাটছিলাম। এমন সময় একটা রাক্ষস!
মেজোছেলে : রাক্ষস! কী বলছ বড়দা?
বড়োছেলে : হ্যাঁ রে ভাই। তার পাহাড়ের মতো শরীর, বড়ো বড়ো ভাঁটার মতোচোখ। মুলোর মতো দাঁত।
মেজোছেলে : বাপরে! শুনেই তো আমার পিলে চমকে যাচ্ছে।
বড়োছেলে : আর পিলে, আর একটু হলে রাক্ষসটা আমার পিলে, হৃৎপিন্ড, হাত-পা, মায় মুন্ডুটা অবদি চিবিয়ে খাচ্ছিল আর কী। আমি কোনোমতে কুঠার, দড়িটড়ি ফেলে দৌড়ে পালিয়ে এসেছি।
বুড়ো : বুঝেছি। এইসবই তোমার কাজ না করার জন্যে নাটক। আমার এক টুকরো কাঠতো ঘরে এলই না, বরং অতপুরোনো কুঠার আর নতুন কেনা দাড়িটা গচ্চা গেল। তোমার দ্বারা না, কিস্যু হবে না।
বড়োছেলে : সত্যি বলছি বাবা, বিশ্বাস করো।
বুড়ো : শোনো, তুমি শুধু কামচোর-ই নও, একটা ভীতুর ডিম। আমার ছোটোবেলা থেকে এখন পর্যন্ত কখনোই এখানে রাক্ষসের উৎপাত হয়নি। এখন কাজের ভয়ে রাক্ষসের আষাঢ়ে গল্প ফাঁদছ। তোমার লজ্জা হওয়া উচিত। শোনো মেজোখোকা, কাল তুমি জঙ্গলে যাবে কাঠ কাটতে। আমি কোনো অজুহাত শুনব না। কাল তোমাকে যেতেই হবে।
মেজোছেলে : কিন্তু বাবা, রাক্ষস যদি, সত্যি সত্যি আমার ঘাড় মটকে খায়?
বুড়ো : আবার সেই আষাঢ়ে গল্প। আমি বলছি কাল সকালে তুমি যাবে। না হলে কাল থেকে বাড়িতে তোমার খাওয়া বন্ধ। বুঝলে?
মেজোছেলে : ওরে বাবা। এ তো দেখছি শাঁখের করাত। আসতে কাটে, যেতেও কাটে। না খেলে তো এমনিতেই মারা যাব, তারচেয়ে খেয়ে গিয়ে রাক্ষসের খাবার হওয়াই সই। কপাল, কপাল!
[মঞ্চের আলো নেভে।]
৪র্থ দৃশ্য
[আবার বনের দৃশ্য। খুব সন্তর্পণে মেজোছেলে মঞ্চের বনে প্রবেশ করে।]
মেজোছেলে : ওরে বাবা, ভয়ে হাত-পা পেটে সেঁধিয়ে যাচ্ছে। এই বুঝি রাক্ষসটা এসে ঘাড় মটকে দিল। ওরে বাবারে, আমার কী হবে রে?
[রাক্ষসটাও সন্তর্পণে প্রবেশ করে।]
রাক্ষস : এই কে রে ওখানে?
মেজোছেলে : কেউ না, আ-আ-মি কেউ না। (ভয়ে চোখ বুজিয়ে ফেলে।)
রাক্ষস : কেউ না বললেই হবে? আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি তোর হাতে কুঠার, কাঁধে দড়ি। এখানে কাঠ কাটতে এসেছিস?
মেজোছেলে : হ্যাঁ ভাই। তুমি কে ভাই?
রাক্ষস : আমি রাক্ষস ভাই। (মেজোছেলে চোখ খুলে রাক্ষসকে দেখে চিৎকার করে ওঠে।)
মেজোছেলে : ওরে বাবা রে! এ যে, সত্যি সত্যি রাক্ষস! আর রক্ষে নেই। দোহাই রাক্ষস বাবা, আমার ঘাড়ে তো একটাই মাথা আছে। এটা মটকালে আমি আর খেতে পারব না। মন্ডা, মিঠাই, জিলিপি, এসব আর কিচ্ছু খেতে পারব না। এই আমি নাক খঁত দিচ্ছি, আমি আর তোমার জঙ্গলের ত্রিসীমানায় আসব না। আমায় ছেড়ে দাও।
রাক্ষস : তা বললে কী চলে? রাক্ষসের কাজ তো রাক্ষসকে করতেই হবে। তা ছাড়া তুই অন্যায় তো করেই ফেলেছিস। শাস্তি তো তোকে পেতেই হবে। অনেক দিন মানুষের মুন্ডু কুড়মড় করে চিবিয়ে খাইনি। আজকে তোকে দিয়েই শুরু করি, আয় বেটা এদিকে, হা: হা: হা: হা:—
মেজোছেলে : যাই গো বাবা গো.... মেরে ফেললে গো.... বাঁচাও বাঁচাও! রাক্ষসের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও....,
[মঞ্চে আলো নিভে যায়]
৫ম দৃশ্য
[বুড়োর খামার বাড়ি। মেজোছেলে আচ্ছন্নের মতো শুয়ে শুয়ে ভুল বকছে। কাছে বুড়োর দুইছেলে।]
মেজোছেলে : বাঁচাও, বাঁচাও! রাক্ষস আমাকে মেরে ফেলল। রাক্ষসের হাত থেকে আমাকে বাঁচাও! ....বাঁচাও .....বাঁচাও!
বড়োছেলে : এবার কী হবে?
বুড়ো : থামো থামো, তোমার নাটুকে কাহিনি শুনেই ওর ফোবিয়া মতন হয়ে গেছে। জঙ্গলে গিয়ে কী না কী দেখেছে, তাতেই ভিরমি খেয়ে গেছে। আসলে তো তোমার মতোই ভীতুর ডিম। ওই জঙ্গলে কি ছোটোবেলা থেকেই আমি কাঠ কাটিনি? যত্তসব! অপদার্থ। তোমাদের ওপরে আমার ভরসা করাই অন্যায় হয়েছে। এ-জীবনে আমার আর ঋণ শোধ করা হল না।
অ্যাশ : চিন্তা কোরো না বাবা। এবার আমি যাব। আমি তোমাকে নিরাশ করব না, দেখো।
বড়োছেলে : তুই! তুই যাবি? হ্যাঁ তুই-ই পারবি বটে, কেন-না বাড়ির সামনের দরজা আর খামারের বাইরেই যে, কখনো যায়নি, তার-ই তো অসাধ্য সাধন করার কথা!
অ্যাশ : যাই বলো দাদা, আমি কিন্তু কাল যাবই।
মেজোছেলে : যাস না, রাক্ষসটা তোর ঘাড় মটকে খাবে। বড়ো ভয়ংকর সেই রাক্ষসটা। ভাবলেই আমার বুক ধড়পড় করছে।
অ্যাশ : আমি যাবই দাদারা। তাতে রাক্ষসটা যদি সত্যিই আমাকে খেতে আসে, তাতেও আমি ভয় পাই না। তা ছাড়া বাবার ঋণ শোধ করতে হলে আমাকে ওই জঙ্গলে কাঠ কাটতে যেতেই হবে।
বুড়ো : কিন্তু অ্যাশ, তুমি এত্তটুকু ছেলে। সত্যিই যদি রাক্ষস আসে, বরং থাক। যা আমার কপালে আছে তাই হবে।
অ্যাশ : না বাবা, আমরা তোমায় কথা দিয়েছি। সে-কথা আমাকে রাখতেই হবে। তুমি বরং মাকে বড়োকড়াইটা উনুনে বসিয়ে একটা ইয়া বড়ো সাইজের চিজ বানাতে বলো। ওটা আমার কাজে লাগবে। সঙ্গে আরও অনেকটা করে খাবার।
বুড়ো : বেশ, তাই হবে।
[মঞ্চে আলো নেভে।]
৬ষ্ঠ দৃশ্য
[জঙ্গলের দৃশ্য। পিঠে খাবারের থলি, কুঠার ও দড়ি নিয়ে শান্তভাবে উইং দিয়ে জঙ্গলে প্রবেশ করল অ্যাশ।]
অ্যাশ : বা:, সুন্দর জঙ্গল। অনেক শুকনো ফারগাছ আছে এখানে। দারুণ সুন্দর কাঠ হবে। না:, এইখানে জিনিসপত্র রেখে আমি কাঠ কাটার কাজে লেগে পড়ি।
[কাঠ কাটতে থাকে। শব্দ হয়। হঠাৎ সেখানে রাক্ষসের আবির্ভাব হয়।]
রাক্ষস : আবার একটা ব্যাটা। আমার জঙ্গলে কাঠ কাটছিস তুই? এতবড়ো বুকের পাটা তোর? তোর মুন্ডু আমি চটকে দেব কিন্তু!
অ্যাশ : তাই নাকি? (থলির ভেতর থেকে চিজটা বের করে তাকে চাপ দিয়ে প্রায় জল বের করে ফেলল সে।) এই দেখছিস, তুই যদি কথা বন্ধ না করিস, এই সাদা পাথরের থেকে যেমন করে জল বের করছি, তেমনি তোকেও দলাই-মলাই করব বলে দিলাম। তখন টের পাবি আমি কী জিনিস! চিপটে মারব তোকে!
রাক্ষস : ওরে বাপ রে! এতো যে-সেছেলে নয়। একেবারে ধানি লঙ্কা। না হে বৎস, রক্ষা করো আমাকে, আমাকে বাপু ছেড়ে দাও। তোমাকে আমি কাঠ কাটতে, গাছ কাটতে সাহায্য করব। কথা দিলুম।
অ্যাশ : তাই বলো, কথার যেন, নড়চড় না হয়, কেমন। না-হলে কিন্তু-আচ্ছা দাওয়াই হাতে আছে। দেব একেবারে—
রাক্ষস : না না বাপু। আমি এই মুখ বন্ধ করলুম। এখন বলো শুধু কোন গাছটা কাটতে হবে?
[ওরা অনেকক্ষণ ধরে কাঠ কাটে। অ্যাশ নির্দেশ দেয়, রাক্ষস বাধ্য ছেলের মতো নিখুঁতভাবে কাজ করে যায় বিনা বাক্য ব্যয়ে।]
অ্যাশ : বা:, ভালো কাজ করছিস। অনেক কাঠ জমেছে। এ দিয়ে বাবার ঋণ অনেকটাই শোধ করা যাবে।
রাক্ষস : বলছি কী, সারাদিন ধরে তো অনেক কাঠ কাটা হল। সামনেই আমার বাড়ি। তুমি আমার বাড়িতে আসতে পারো। মানে তোমার বাড়ির চেয়ে আমার বাড়িটা তো অনেক কাছে।
অ্যাশ : বেশ, তাই চলো। আমারও খুব খিদে পেয়েছে। একটু ক্লান্তও লাগছে।
[ওরা কাঠকুটো নিয়ে এক দিকের উইং দিয়ে বেরিয়ে গিয়ে উলটো দিকের উইং দিয়ে প্রবেশ করে। জিনিসপত্র রাখে। সামনে বড়ো দুটো লোহার বালতি, খাবার টেবিল, চেয়ার। অবশ্য সব কাঠের গুঁড়ির আদলে তৈরি। একটা উনুন।]
রাক্ষস : আমি এক্ষুনি উনুনটা জ্বালিয়ে পরিজের পাত্রে রান্না চড়িয়ে দিচ্ছি।
অ্যাশ : (জনান্তিকে) এই রে, তবে তো পরিজের পাত্র ভরানোর জন্যে আমাকে জল আনতে যেতে হয়। ওই তো ওখানে বালতি দুটো রয়েছে। বাপরে! যা বড়ো সাইজ। দেখি তো, ওরে ব্বাস, কী ভারী! একে তো এমনিতেই তুলতে পারছি না। কিন্তু নিজের অক্ষমতার কথা প্রকাশ হলেই তো আমার দফারফা। একটা কিছু ফন্দি আঁটতে হবে। —হ্যাঁ, দি আইডিয়া! (রাক্ষসকে শুনিয়ে) এই যে রাক্ষস, বেশি জল আনতে হলে এইরকম ছোটো জলের পাত্র চলে না, বুঝলে। পুরো কুয়োটাই আনতে চললাম আমি।
রাক্ষস : না না, প্রিয় বন্ধু, আমি কুয়ো হারাতে চাই না। তুমি বরং আগুন ধরাও, আমি জল নিয়ে আসি।
[রাক্ষস জল আনতে বাইরে যায়, পরে ফিরে আসে।]
অ্যাশ : বা:, অনেক পরিজ সেদ্ধ হয়েছে। ঠিক আছে তো পরিমাণ?
রাক্ষস : হ্যাঁ হ্যাঁ ঠিক আছে।
অ্যাশ : তাহলে খাবারের একটা প্রতিযোগিতা হয়ে যাক, কী বলো?
রাক্ষস : তোমার সঙ্গে প্রতিযোগিতা? আচ্ছা ঠিক আছে। কিন্তু—
[অ্যাশ চুপিচুপি জামার নীচে থলিটা নিয়ে ওর সামনেই শক্ত করে বাঁধল। তারপর যত খেল, তার চেয়ে বেশি থলিটায় ভরল। থলিটা ভরে গেলে ছুঁরি দিয়ে রাক্ষসকে দেখিয়ে দেখিয়ে একটা বড়ো ফুটো করে দিল।]
অ্যাশ : খাও খাও হে রাক্ষস। পেটপুরে খাও।
রাক্ষস : না:, আমি আর পারছি না।
অ্যাশ : না না, তোমাকে খেতেই হবে। আমার এখনও অর্ধেকও খাওয়া হয়নি। তুমি বরং আমার মতো করো। পেটে একটা গর্ত বা বড়ো ফুটো করে নাও। যত খুশি খেতে পারবে, কোনো সমস্যা হবে না।
রাক্ষস : মারাত্মক যন্ত্রণাদায়ক হবে-না ব্যাপারটা?
অ্যাশ : কিচ্ছুটি না। এই দ্যাখো-না আমি করেছি। আমার কিছু হচ্ছে? এই নাও ছুরি। দাও ফুটো করে।
রাক্ষস : বেশ, এই আমি ছুরি দিয়ে আমার পেট ফুটো করলাম.... ওরে বাবারে... আমি মরে গেলাম। শয়তান ছেলে! আঃ—আঃ! ধরতে পারলে আমি তোর...
অ্যাশ : আর আমাকে ধরতে হবে না, বদমাশ রাক্ষস। আমার দাদাদের তুই মেরে ফেলতে চেয়েছিলি, আমাকেও। তাই এখানেই আমি তোকে মেরে গেলাম। মানুষের সঙ্গে কখনো লড়তে আসিস না, বুঝলি? এখন আমি তোর লুটের সমস্ত সোনাদানা, ধনরত্ন নিয়ে চললাম। এতে আমার বাবার ঋণ ঠিক শোধ হয়ে যাবে।
‘রাক্ষস রাজা
দেখ তোর সাজা!’
হা: হা: হা: হা:
[পিঠে ধনরত্নের বোঝা নিয়ে অ্যাশ চলে। মঞ্চের আলো নেভে। নাটক শেষ হয়।]
[নির্মল ব্রহ্মচারীর ‘নরওয়ের লোককথা’-র গল্প অবলম্বনে।]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন