ঝড়ের দিনেসুনির্মল বসু

পার্থ প্রতিম পাঁজা

চরিত্র: ছোট্ট ইঁদুরছানা, কালো বিড়াল, সোনাব্যাং, বক, বোয়াল, চিল, ইঁদুরের মা।

প্রথম অঙ্ক

প্রথম দৃশ্য

[ছোটো একটি ভাঙা কুঁড়েঘর। দরজা বন্ধ। দরজা খুলে বেরিয়ে এল একটি ছোট্ট ইঁদুর। কোমরে জড়ানো একটি নোংরা ছেঁড়া কাপড়। কাঁধে ডান্ডিঅলা একটি মাছ ধরবার জাল। ইঁদুর পা টিপে টিপে বাইরে এল। তারপর দরজাটা আবার ধীরে ধীরে বন্ধ করে দিল। কুঁড়েঘরের সামনে মাঠে, মধ্যে মধ্যে ছোটো ছোটো ঘাসের ঝোপ। তার পাশ দিয়ে আঁকাবাঁকা রাস্তা। ইঁদুর সেই রাস্তা ধরে এগিয়ে চলল। আর চলতে চলতে গান ধরল—]

ইঁদুরছানা : ঘুমিয়ে আছে মা—

চুপে চুপে বেরিয়ে এলাম

টের পেল না তা।

সারাদিন আজ হয়নি খাওয়া

খাবার কিছু যায়নি পাওয়া

পেট জ্বলে যায়, আঃ।

মাছ ধরব নদীর ধারে

ভেজে দেবে মা আমারে

কুচকুচিয়ে মা-ব্যাটাতে

কেমন খাব, বা:।

.....ঘুমিয়ে আছে মা।

[গান গাইতে গাইতে, নাচের তালে পা ফেলতে ফেলতে ইঁদুর এগিয়ে চলল। পাশের একটা ঝোপ নড়ে উঠল। দেখা গেল একটা হোঁতকা কেঁদো কালো বিড়ালের দুটো জ্বলজ্বলে চোখ। ইঁদুরটাকে দেখতে পেয়ে কেঁদো-বিড়ালটা খুশি হয়ে উঠল। তার মুখে আনন্দের ভাব ফুটে উঠল। মুখ দিয়ে লালা ঝরতে লাগল—তাই সেপ্রকান্ড জিব দিয়ে চাটতে লাগল। ইঁদুর অনেকটা এগিয়ে গেছে—দূরে তার ক্ষীণ গানের শব্দ শোনা যাচ্ছে।]

.....মাছ ধরব নদীর ধারে,

ভেজে দেবে মা আমারে।....

[বিড়াল তার দিকে গোল গোল চোখ দিয়ে লক্ষ্য করতে করতে বলতে লাগল]

বিড়াল : পেট করে চোঁ চোঁ খিদের চোটে—

সারাদিন খেয়ে পেট ভরেনি মোটে,

এবার জুটেছে ওই সরেস খাবার,

ছুটে গিয়ে টুঁটি টিপে করব সাবাড়।

[ঝোপের আড়ালে আড়ালে সেইঁদুরছানাকে অনুসরণ করতে লাগল।]

দ্বিতীয় দৃশ্য

[ইঁদুর চলেছে নদীর দিকে। পথের ধারে সারি সারি ব্যাঙের ছাতা—ছোটোবড়ো নানারকম। ইঁদুরছানা আকাশের দিকে তাকাল। দেখা গেল আকাশে মেঘ জমেছে, বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। ইঁদুরছানা গান ধরল]

ইঁদুরছানা : মেঘ করে গুরগুর

বুক করে দুরদুর।

[কালো বিড়ালটা কিন্তু ঝোপের আড়াল থেকে ঠিক লক্ষ্য রেখে যাচ্ছে ইঁদুরছানার ওপর। এমন সময় নামল ঝমঝম বৃষ্টি। ঝোপের সামনে ছিল, একটা বড়ো মানকচুর গাছ। বিড়াল অতিসন্তর্পণে তার-ই একটা পাতার নীচে আড়াল নিয়ে বসল। তার মুখের ভাবটা একটু নৈরাশ্যজনক। এদিকে ইঁদুর করেছে কী—বৃষ্টি একটু জোরে নামতেই একছুটে গিয়ে রাস্তার পাশ থেকে বড়ো দেখে একটা ব্যাঙের ছাতা হ্যাঁচকা টান মেরে ছিঁড়তে গেল। তার তলায় একটা সোনাব্যাং। সেভয় পেয়ে মারল তড়াক করে এক পেল্লাই লাফ।

মানকচুর পাতার তলায় বিড়ালটা গুটিশুটি মেরে বসেছিল। ব্যাংটা একলাফে তার ঘাড়ে গিয়ে পড়ল। ভীষণরকম ঘাবড়ে গিয়ে মারল কালো বিড়ালটাও ল্যাজ তুলে একলাফ দিল। পড়ল গিয়ে পাশের এক ডোবার জলে। ইঁদুর ততক্ষণে ব্যাঙের ছাতাটা বেশ করে কাঁধের ওপরে বাগিয়ে ধরেছে। ডোবার জলে বিড়ালটা পড়তেই—সেতাই দেখে হি হি করে হেসে উঠে গান ধরল—]

ইঁদুরছানা : হিহি হি হিহি হি

জোরসে লাগাও তুড়ি,

কালো বিড়াল পড়ল জলে

ভাঙল জারি-জুরি।

কালো বিড়াল খুব চিনি এ—

সবার খাবার খায় ছিনিয়ে,

আমরা থাকি পেট চিমিয়ে—

আর বাড়ছে যে-ওর ভুঁড়ি।

তৃতীয় দৃশ্য

[ভেজা বিড়ালটা সাঁতার কেটে ওপরে ওঠার চেষ্টা করছে। তার মুখে কখনো ভয়ের ভাব কখনো, নৈরাশ্যের ভাব; কখনো আবার বিরক্তির ভাব ফুটে উঠছে। সেঅনবরত ‘ম্যাও ম্যাও’ করে ডাকছে। অনেক করে কালো বিড়াল পাড়ে উঠল। তার শরীর থেকে টপটপ করে জল ঝরছে। সেফ্যাঁচফ্যাঁচ করে হাঁচতে লাগল। বৃষ্টিটা একটু থেমেছে কিন্তু আকাশে এখন মেঘ জমে আছে, গুরগুর করে ডাকছে। বিড়াল দু-তিনবার গা-ঝাড়া দিল, তারপর বলল]

বিড়াল : জলে যখন মরছি ডুবে

ইঁদুর করে ঠাট্টা;

বুঝবে তখন চ্যাংড়া ইঁদুর

ভাঙব যখন ঘাড়টা।

[বিড়ালটা বড়ো বড়ো কয়েকটা হাই তুলল, একটু আড়মোড়া ভাঙল তারপর আবার বলতে শুরু করল]

বিড়াল : মিউ মিউ ম্যাও—

বড্ড আমি শ্রান্ত হলাম পড়ে ডোবার জলে,

একটুখানি ঘুমিয়ে নেব বটগাছটার তলে।

[এগিয়ে এল একটা বটগাছের কাছে। শুয়ে পড়তে পড়তে বলল]

ফিরবে যখন ইঁদুরছানা এই পথটি ধরে,

কচমচিয়ে মুন্ডু তখন খাব আরাম করে।

[এই বলে, কালো বিড়াল গাছের তলায় নাক ডেকে ঘুমিয়ে পড়ল।]

চতুর্থ দৃশ্য

[আকাশে ঝড়ের আভাস। জোরে জোরে বাতাস বইতে লাগল। ইঁদুর সেই বাতাসের মধ্যে পথ চলছে। এক কাঁধে ব্যাঙের ছাতা আর এক কাঁধে মাছ ধরার জালটা। হঠাৎ একটা দমকা বাতাসের ঝটকায় তার কাঁধের ছাতাটা উড়ে গেল। দূরে সেই সোনাব্যাংটা মানকচুর পাতার তলায় বসেছিল। সেতখন মোটা গলায় করুণ সুরে বলতে লাগল]

সোনাব্যাং : ঘ্যাং ঘ্যাং ঘ্যাং—

ছাতি আবার ফিরে পেল

ছাতির মালিক ব্যাং।

নেংটি ইঁদুর থাকুক বেঁচে,

বিড়ালটা তায় তাগ করেছে—

ফিরতি পথে একটি লাফে

ধরবে চেপে ঠ্যাং।

বাঁচিয়ে দেব ইঁদুরটাকে,

জানিয়ে দেব খবর তাকে,

সটকে যদি পড়ে ইঁদুর

নাচব ড্যাং-ড্যাং-ড্যাং।

দ্বিতীয় অঙ্ক

প্রথম দৃশ্য

[গায়ে নামাবলি জড়িয়ে একটা বক ধীরে ধীরে পাহাড়ের দিকের গাছ থেকে উড়তে উড়তে নদীর দিকে আসছে। মুখে বলছে,—]

বক : হরে কৃষ্ণ হরে কৃষ্ণ, কৃষ্ণ কৃষ্ণ হরে হরে—

হরে রাম হরে রাম, রাম রাম হরে হরে।

[ছোট্ট নদী কিন্তু জলের খুব স্রোত। একধারে ছোটো একটি বাঁশের সাঁকো। দূরে একটা পাহাড় দেখা যাচ্ছে। পাহাড়ের চুড়ো থেকে একটু একটু ধোঁয়া উঠছে। বকটা এসে নদীর জলে নামতে নামতে বলল]

বক : সঙে ভরা এ-সংসার, সার হরিনাম—

তাই তো ধার্মিক আমি জপি সেই নাম।

আহারে বিহারে আর রুচি কিছু নাই—

অহিংসা পরম ধর্ম জেনেছি সদাই।

[বক স্থির হয়ে দাঁড়াল। তারপর মাথা নীচু করে জলে ঠোঁট দিয়ে একটি একটি করে ছোটো ছোটো মাছ ধরে পেছন দিকে ছুড়ে দিতে লাগল। একটা মাছকে বক ঠোঁটে তুলে বলল]

বক : ক্ষুদ্র মাছ, তুচ্ছ মাছ, তুই তো জলের পোক।

মহান গুরুর স্পর্শে মুক্তি হয়, যদি তোর হোক।

জমুক জলের জীব, ডাঙার মাঝার

একসাথে সকলেরে করিব উদ্ধার।

...হরে কৃষ্ণ, হরে রাম।

[তারপর তাকেও পেছন দিকে ছুড়ে ফেলে দিল। ইঁদুর দূর থেকে এই দৃশ্য দেখতে পেল। তাই দেখে তার মনে খুব আনন্দ হল। সেগান ধরল]

ইঁদুরছানা : বা: বা: বা:, বা: বা: বা:,

নদীর কিনারায়,

তপস্বী, এক মাছ ধরেছে

ওই যে, নিরালায়।

ছুড়ে ছুড়ে ফেলছে দূরে

চুনো-পুঁটির রাশ;

ভালোই হল ওই মাছেতেই

পুরবে আমার আশ।

[পা টিপে টিপে ইঁদুর এগিয়ে এল, তার ডান্ডিঅলা জালখানা বাগিয়ে। তারপর কায়দা করে এমন জায়গায় দাঁড়াল, যেখান থেকে বকের ছুড়ে দেওয়া মাছগুলি সব তার জালের মধ্যে এসে পড়ে।

বক মাছ ছুড়ছে, আর ইঁদুর টপ করে তার জালে লুফে নিচ্ছে। দেখতে দেখতে তার জাল মাছে ভরতি হয়ে গেল। ইঁদুরের মুখ হাসি হাসি। হঠাৎ সে‘হ্যাঁচ্চো’ করে হাঁচি দিয়ে বসল। সেই শব্দে বক ঘাড় বেঁকিয়ে পেছনে তাকাতেই ইঁদুরকে দেখতে পেল। অমনি চোখ রাঙিয়ে তাকে তাড়া করল আর শাসাতে লাগল এই বলে]

বক : দাঁড়া চোর ছিঁচকে

মিচকে পটাস,

গালে তোর দেব চড়

চটাস চটাস।

পুরব পেটের মাঝে

কপাৎ কপাৎ,

উদ্ধার হয়ে তুই

যাবি নির্ঘাত।

[বককে তেড়ে আসতে দেখে ইঁদুর তার মাছভরতি জালটা কাঁধে ফেলে ছুটতে ছুটতে এসে, সেই বাঁশের সাঁকোর ওপরে উঠল।

এমন সময় প্রবল ঝড়। আকাশে আবার ঘন ঘন মেঘের গর্জন—বিদ্যুৎ-এর চমক। দূরের গাছপালা ভয়ংকরভাবে দুলছে। নদীর স্রোত ভীষণভাবে বাড়তে লাগল আর ঢেউও উঠতে লাগল খুব উঁচু হয়ে। বাঁশের সাঁকোটা বেজায়রকম দুলতে শুরু করল। ইঁদুর টাল সামলাতে না পেরে, নদীতে পড়ে গেল।

প্রবল স্রোতে ইঁদুর ভেসে চলল। একবার একবার ঢেউয়ের সঙ্গে ওপরে ভেসে উঠছে আবার তলিয়ে যাচ্ছে জলের তলায়। জোর ঝড় হচ্ছে। জলের মধ্যে এক জায়গায় ঘূর্ণিপাক হচ্ছে। ইঁদুর সেখানে বনবন করে ঘুরপাক খেতে লাগল। কাঁধে কিন্তু তার উঁচু হয়ে রয়েছে মাছভরতি জালটা।

এ-সময় হঠাৎ শোনা গেল একটা বিকট হাসি]

হা-হা-হা-হা

ঘূর্ণিজলে পাক খায় ওই

নেংটি ইঁদুর ছা।

[ইঁদুরের কাছেই ভেসে উঠল একটা বিটকেল বোয়াল মাছের মুখ। চোখ তার লাল, বড়ো বড়ো দাঁত—প্রকান্ড ‘হাঁ’ করে এগিয়ে আসতে আসতে সেবলল]

বোয়াল : বা:-বা:-বা:-বা:—

জ্যান্ত ইঁদুর ছা

টপ করে আজ ফেলব গিলে

হা-হা-হা-হা—

[ইঁদুরছানা তখন ভয় পেয়ে বলছে]

ইঁদুরছানা : বাস রে বুঝি গেলুম মারা

বোয়াল আসে তেড়ে।

রক্ষা বুঝি নাইরে এবার

ফেললে দফা সেরে।

[বোয়াল মাছটা বিকট শব্দ করে তার রাক্ষুসে ‘হাঁ’-করা মুখটা নিয়ে, ইঁদুরছানাটার দিকে তেড়ে আসতে লাগল। ছানাটাও স্রোতের টানে করুণ শব্দ করতে করতে একেবারে সেই বোয়ালের মুখের সামনে এসে পড়ল। বোয়াল মাছটা যেই, তাকে গিলতে যাবে এমন সময় আকাশ থেকে নেমে এল একটা চিল। আর ইঁদুরছানাটাকে নখে করে ধরে শোঁ করে আকাশের গায়ে উঠে পড়ল। রাক্ষুসে বোয়ালটা বোকার মতো সেদিকে তাকিয়ে বলল]

বোয়াল : ছ্যাঁচড়া পাজি চিল।

আমার খাবার ছিনিয়ে নিলি,—

হায় এ কী মুশকিল!

[উড়তে উড়তে চিল জবাব দিল]

চিল : ইঁদুর ছুঁচো ব্যাং-ব্যাঙাচি

আমার প্রিয় বড়ো,

বোয়ালদাদা জলের ভিতর

খলশে পুঁটি ধরো।

[শূন্যে চিলের নখে ইঁদুর ঝুলে চলেছে। কাঁধে কিন্তু তখন তার রয়েছে সেই মাছভরতি জালটা। চোখ দিয়ে তার টপটপ করে জল পড়ছে। হঠাৎ একটা বাতাসের ঝাপটা লেগে তার কোমরে জড়ানো ছেঁড়া কাপড়খানা খুলে আকাশে উড়ে যেতে লাগল। উড়তে উড়তে চিল ইঁদুরছানাটাকে নিয়ে দূরের পাহাড়ের চুড়োয় বসল। পাহাড়ের চুড়ো থেকে তখন ধোঁয়া বেরোচ্ছে]

তৃতীয় অঙ্ক

প্রথম দৃশ্য

[ইঁদুরের সেই ভাঙা কুঁড়েঘর। ইঁদুরের বিধবা মা। পরনে ছেঁড়া সাদা থান। বাইরের দাওয়ায় গালে হাত দিয়ে বসে করুণ সুরে গান গাইছে]

ইঁদুর-মা : কোথায় গেল বাছা আমার

আমায় ফেলে একা,

প্রাণ যে, আমার কেমন করে

পাচ্ছি না তার দেখা।

বলছে ছুটে, ঝড়ের হাওয়া,

সারাদিনে হয়নি খাওয়া—

হায়রে যেন, কী আছে আজ

মোর কপালে লেখা।

[করুণ সুরে গান করতে করতে ইঁদুরের মা-র চোখে জল এল। তখন সে, চোখে আঁচল দিয়ে কাঁদতে লাগল।]

দ্বিতীয় দৃশ্য

[পাহাড়ের চুড়োয় চিল ইঁদুরছানাটাকে সামনে রেখে পাথরে ঠোঁট শানাচ্ছে। ইঁদুরটা জড়সড় হয়ে এদিক-ওদিক তাকিয়ে পালাবার পথ খুঁজছে। এমন সময় চুড়ো দিয়ে আগুন উঠতে লাগল দারুণ শব্দ করে ঝলকে ঝলকে। চিল ইঁদুরছানাটাকে ঠুকরে খেতে যাবে, এমন সময় আগুনের একটা হলকা এসে লাগল তার গায়। সেতখন একটা করুণ আর্তনাদ করে উড়ে পালাল নীল আকাশে।

ক্রমেই পাহাড়ের চুড়ো দিয়ে ভয়ংকর আগুন বেরোতে লাগল। আর শব্দও হচ্ছে বিরাট। পাথর ছটকে ছটকে পড়ছে। ভয়ংকর শব্দের সঙ্গে পাহাড়টা কেঁপে কেঁপে উঠছে। একটু পরেই শুরু হল ভীষণ ভূমিকম্প। ইঁদুরছানা ভয় পেয়ে একটা পাথর আঁকড়ে ধরল।]

তৃতীয় দৃশ্য

ইঁদুর-মা : (ভাঙা কুঁড়েঘরের দাওয়ায় ইঁদুর-মা কাঁদছে)

কোথায় গেল বাছা আমার

আমায় ফেলে একা—

[এমন সময় দেখা গেল একটা ছেঁড়া কাপড় উড়ে উড়ে তার দিকে আসছে। সেকৌতূহলী দৃষ্টিতে ওই কাপড়ের দিকে তাকাতে লাগল। কাপড়টা উড়ে এসে তার সামনে ঝুপ করে পড়ল। ইঁদুর-মা দেখেই চিনতে পারল এটা তার ছেলের কাপড়। সেকাপড়টা হাতে তুলে নিয়ে বলল]

ইঁদুর-মা : এই তো আমার বাছার কাপড়—

হায় হায় হায় হায়।

ওরে আমার বুকের মানিক

আয় ফিরে আয় আয়।

[কাপড়টাকে বুকে চেপে সেফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে লাগল।]

চতুর্থ দৃশ্য

[পাহাড়ের চুড়ো ভয়ানকভাবে কাঁপছে। পাথর ছিটকে পড়ছে চারধারে। একটা পাথরের ওপর বসে কাঁপছে ইঁদুরছানাটা। তার কাঁধে জালটা তখনও ঠিকই আছে।

জালটা কাঁধে নিয়ে সেযে-পাথরটার ওপরে বসেছিল, হঠাৎ সেটা তাকে নিয়ে ‘চোঁ’ করে ছটকে আকাশে উঠল। পাথরের ওপর চড়ে ইঁদুরছানাটা শূন্য দিয়ে সবেগে ছটকে আসছে। সেনীচের দিকে তাকিয়ে দেখল—একটা বড়োপাথর চাপা নামাবলি পরা বকটা ঠ্যাং উলটে মরে পড়ে আছে। নদীর ওপর দিয়ে আসতে আসতে ইঁদুরছানা দেখল বোয়াল মাছটা ডাঙায় হাঁ করে মরে পড়ে আছে। তার পিঠের ওপরেও একখানা ভারী পাথর।]

ইঁদুর-মা : (ইঁদুর শূন্য থেকেই বলল)

পাথর চাপা পড়ে,—

বোয়াল এবং তপস্বী বক

উলটে আছে মরে।

[ইঁদুর সবেগে পাথরসুদ্ধু এসে সেই ঘুমন্ত বিড়ালটার গায়ের ওপর পড়ল। বিড়ালের দেহটা চেপটে গেল। বিড়ালটা একবার ‘ম্যাও—আও—আও’ করে ছটফট করতে করতে মরে গেল। ইঁদুরছানা মাটিতে পড়েই চোঁ—চোঁ ছুটল বাড়ির দিকে। কাঁধে কিন্তু এখন রয়েছে তার মাছভরতি জালটা।

একটা ঝোপের পাশ থেকে ব্যাং বেরিয়ে এল। তারপর বিড়ালের দুর্দশা দেখে আনন্দে গান ধরল]

ব্যাং : আচ্ছা মজা হল—

অত্যাচারী হোঁতকা হাঁদা

বিড়ালদাদা,

ভাবের পটল তোলো।

ঘ্যাং—ঘ্যাং—ঘ্যাং—ঘ্যাং।

কেমন হল সাজা?

ধরবে ইঁদুর তাজা!

শিলার ঘায়ে চেপটে গিয়ে

ভাঙল যে, তোর মাজা।

সবাই মিলে এবার জুটে

বাজা ডঙ্কা বাজা।

ঘ্যাং—ঘ্যাং—ঘ্যাং—ঘ্যাং।

[কুঁড়েঘরের দাওয়ায় ইঁদুর-মা বসে সেই ছেঁড়া কাপড়টিকে বারে বারে আবেগের সঙ্গে দু-হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরছে আর তার চোখ দিয়ে বড়ো বড়ো ফোঁটায় জল পড়ছে। সেফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে বলছে]

ইঁদুর-মা : বাছা আমার নেইকো বেঁচে

আঃ—আঃ—আঃ—আঃ।

[ঠিক সেই সময় কাঁধে মাছভরতি জালটা নিয়ে লাফাতে লাফাতে এসে ইঁদুরছানা হাজির হয়ে বলল]

ইঁদুরছানা : বেঁচে আছি, এই এসেছি,

মা—মা—মা—মা।

[মা আনন্দে লাফিয়ে উঠল। ইঁদুরছানা আকুল হয়ে মা-কে জড়িয়ে ধরল। ইঁদুরের মা-র মুখে এবার হাসি, চোখে আনন্দাশ্রু।]

সকল অধ্যায়
১.
ছাত্রের পরীক্ষারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২.
পেটে ও পিঠেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩.
বেচারাম কেনারামউপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
বৃক ও মেষ পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫.
কাক ও পনীর পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬.
লক্ষ্মণের শক্তিশেল সুকুমার রায়
৭.
অবাক জলপান সুকুমার রায়
৮.
কাজির বিচারকাজী নজরুল ইসলাম
৯.
রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা কাজী নজরুল ইসলাম
১০.
ঝড়ের দিনেসুনির্মল বসু
১১.
আলোলীলা মজুমদার
১২.
দরদিদিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩.
যেদিন জাগবে মুকুল বিমল ঘোষ
১৪.
ভীম বধনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১৫.
বহুরূপীদেবনারায়ণ গুপ্ত
১৬.
গুপীগাইন বাঘাবাইন সত্যজিৎ রায়
১৭.
দত্যি দানোর ছানাশৈলেন ঘোষ
১৮.
সৌরভবৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়
১৯.
শ্রেয়সী অমল রায়
২০.
বোকা বাঘের ছানাড. পার্থপ্রতিম পাঁজা
২১.
রাক্ষসের সঙ্গে টক্কর ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%