বহুরূপীদেবনারায়ণ গুপ্ত

পার্থ প্রতিম পাঁজা

চরিত্র : সতীশ, যতীন, শ্রীকান্ত, ছোটদা, রামকমল, পিসেমশাই,

কিশোরী সিং, ইন্দ্রনাথ, শ্রীনাথ, পিসিমা।

[শ্রীকান্তের পিসেমশাইয়ের বৈঠকখানা। সামনে উঠোন। এক কোণে একটি ডালিমগাছ। ঘরের অভ্যন্তরে মেজদা অর্থাৎ সতীশ, ছোটদা, যতীন এবং শ্রীকান্তকে একটি টানা ফরাশের ওপর পড়াশোনা করতে দেখা যায়। সতীশের সামনে গঁদের শিশি, কাগজ, কলম, পেনসিল, ছুরি, কাঁচি প্রভৃতি। চাকতির ন্যায় কতকগুলি পিচবোর্ড গোল করিয়া কাটা। সকলেই চিৎকার করিয়া পড়িতেছে। তবে সকলের গলা ছাড়াইয়া সতীশ পড়িতেছে। ঘরের বারান্দায় পিসেমশাই ক্যাম্প খাটিয়ায় তন্দ্রাচ্ছন্ন। তাহারই অদূরে রামকমল ভট্টাচার্য আফিম খাইয়া ঝিমুইতেছেন। সকলে চিৎকার করিয়া পড়িতেছে। ]

সতীশ : লেট ‘এ বি সি বি এ’ ট্রাঙ্গল...

যতীন : পশ্যতি পশ্যতঃ পশ্যন্তি...

শ্রীকান্ত : বিপদে মোরে রক্ষা করো

এ নহে মোর প্রার্থনা।

বিপদে যেন না করি আমি ভয়।

ছোটদা : যে বিস্তীর্ণ জলরাশি...

সতীশ : লেট ‘এ বি সি বি এ’ ট্রাঙ্গল....

[ইহার মাঝে নেপথ্য হইতে বাঁশির আওয়াজ ভাসিয়া আসে। ছেলেরা উৎকীর্ণ হইয়া শোনে। এরমধ্যে পিসিমা প্রবেশ করিয়া সতীশকে জিজ্ঞাসা করে।]

পিসিমা : হ্যাঁরে সতীশ। অমন করে কে বাঁশি বাজাচ্ছে রে?

সতীশ : কে আবার, রায়েদের ইন্দ্র।

পিসিমা : বলিস কীরে? ওর কি পড়াশুনো নেই?

সতীশ : পড়াশুনো ও অনেককাল শেষ করে দিয়েছে। ও হেড পন্ডিতের টিকি কাঁচি দিয়ে ক্লাসের মধ্যে কেটে দিয়েছিল, হেডমাস্টার তাই ওকে গাধার টুপি পরিয়ে দেবেন বলেছিলেন। সেই রাগে ও হেড মাস্টারের পিঠে এক ঘুসি মেরে স্কুল ছেড়ে দিয়ে চলে এসেছে—আর যায় না।

পিসিমা : বলিস কীরে? ধন্যি ছেলে যা-হোক!

সতীশ : এখন ওর কাজ হয়েছে বাঁশি বাজানো আর নদীতে নৌকা বাওয়া।

পিসিমা : মনে হচ্ছে যেন গোঁসাইবাগানের ভেতর দিয়ে বাঁশি বাজিয়ে এদিকে আসছে। তা ওর মা কি বারণ করে না? গোঁসাইবাগানের মধ্যে যে কত লোক সাপের কামড়ে মোলো তার আর ঠিক নেই।

সতীশ : তাতে ওর কী মা? যার প্রাণের মায়া নেই—ভয় নেই—সেকেন শুধু শুধু বড়োরাস্তা দিয়ে ঘুরে আসতে যাবে? ওর শিগগির আসা নিয়ে দরকার। তা সে-পথে নদীনালাই থাক, আর সাপখোপ বাঘ-ভালুকই থাক।

পিসিমা : যা বলেছিস।

শ্রীকান্ত : যাই বলো মেজদা, ইন্দ্রর কিন্তু খুব সাহস, সেদিন না থাকলে স্কুলের মাঠে বিপক্ষ দল আমায় ছাতাপেটা করে মেরে ফেলেছিল আর কী।

সতীশ : নে নে, ‘বীরত্ব’-এর বড়াই করে আর কাজ নেই—যা করছিস তাই কর।

[পিসিমা চলিয়া গেলেন। আবার সকলে পড়া শুরু করিল। এরমধ্যে যতীনদা একটা টিকিট লইয়া দাঁড়াইল।]

যতীন : মেজদা!

সতীশ : (পড়া থামাইয়া) কী?

যতীন : একটা টিকিট।

সতীশ : কীসের?

যতীন : নাক ঝাড়া।

সতীশ : (ঘড়ি দেখিয়া) হুঁ। আটটা তিরিশ থেকে আটটা সাড়ে চৌত্রিশ মিনিট পর্যন্ত। মনে থাকে যেন!

যতীন : আচ্ছা।

[যতীনের প্রস্থান। সেবাহিরে গেলে আবার সবাই পড়া আরম্ভ করে। এরমাঝে ছোড়দা একটা টিকিট লইয়া উঠিয়া দাঁড়ায়।]

ছোটদা : মেজদা একটা টিকিট।

সতীশ : (গম্ভীরভাবে) কীসের?

ছোটদা : থুতু ফেলা।

সতীশ : (ধমক দিয়া) না!

[সতীশের পুনরায় পড়া শুরু হয়। যতীন ফিরিয়া আসে। শ্রীকান্ত তেষ্টা পাওয়ার টিকিট দেখায়।]

ও, অমনি তোর তেষ্টা পেল?

শ্রীকান্ত : সত্যি বলছি মেজদা, বড্ড তেষ্টা পেয়েছে।

সতীশ : দাঁড়া, দেখি কালকের খাতাটা, একদিনে তুই কীরকম জল খাচ্ছিস দেখে, তবে ছুটি দেব।

[সতীশ খাতা দেখিল, যতীন, ছোটদা পড়িতেছে। এই সময় অবিকল বাঘের আকারের জীব ‘হুম’ শব্দে শ্রীকান্তের পেছনে লাফাইয়া পড়িল, সেই দেখিয়া সকলে চিৎকার করিতে লাগিল।]

যতীন, ছোটদা, সতীশ, মেজদা : ওরে বাপরে! খেয়ে ফেল্লেরে! মলাম রে—গেলাম রে—

[সতীশ ‘গোঁ গোঁ’ করিতেছে। আলো উলটাইয়া গেছে। যে-জীবটি প্রবেশ করিয়াছিল, এদের অবস্থা দেখিয়া ভয়ে ডালিম গাছের পিছনে গিয়া লুকাইল। পিসেমশায় দুই ছেলেকে বগলে করিয়া চিৎকার করিতে থাকিল।]

পিসেমশাই : এই দারোয়ান! এই কিশোরী সিং! মার ডালো! শালাকো আউর মারো—

[সতীশের গোঁঙানি বন্ধ হয় নাই। রামকমল ভট্টাচার্যের নেশা ছুটিয়া গিয়াছে। তিনি ভয়ে সদর পার হইতেছিলেন—কিশোরী সিং চোর ভ্রমে রামকমলকে ঠ্যাঙাইতে আরম্ভ করিয়াছে।]

রামকমল : ওরে বাবা! আমি চোর নই! আমাকে ছেড়ে দে বাবা—

[রামকমল মিনতি করিতেছেন।]

পিসেমশাই : আউর মারো শালাকো—মারো—মার ডালো—

[কিশোরী সিং মারিতে মারিতে রামকমলকে আলোর সামনে আনিল। তাহাকে চিনিতে পারিয়া।]

আরে তোরা করছিস কী? ছাড় ছাড় এ যে ভট্টাচার্য মশাই।

[তখন রামকমলকে কেহ জল দিতেছে, কেহ বাতাস করিতেছে।]

কিশোরী সিং : মাফ কিজিয়ে হুজুর, বহুত কসুর হো গিয়া!

রামকমল : (হাঁফাইতেছিল) আর কসুর। কিলায়কে কিলায়কে একেবারে কাঁটাল পাকায় দিয়া—গা-গতর একেবারে চূর্ণবিচূর্ণ হো গিয়া বাবা।

পিসেমশাই : যত ব্যাটা উজবুক! চোর কোথা দিয়ে পালাল তার ঠিক নেই, আর নিরীহ ভট্টাচার্যমশাইকে ধরে শুধু শুধু ঠ্যাঙাল।

রামকমল : না-না চোর নয়, চোর নয়, আমি নিজে চোখে দেখেছি—মস্তবড়ো একটা ভাল্লুক।

পিসেমশাই : অ্যাঁ! ভাল্লুক! বলেন কী?

যতীন : না বাবা, ভাল্লুক নয়—একটা বাঘ ‘হুম’ করে লাফিয়ে পড়ল!

[এতক্ষণে সতীশের চৈতন্য ফিরিয়া আসিয়াছে। পিসিমার হন্তদন্তভাবে মঞ্চে আগমন]

সতীশ : দি রয়েল বেঙ্গল টাইগার!

পিসিমা : তা বাঘই হোক, আর ভাল্লুকই হোক সেটা গেল কোথায়? এই হোঁতকা হোঁতকা দারোয়ান চাকরগুলো আছে কীসের জন্য? ওদের খুঁজে বার করতে বলো। ছেলেপিলেগুলো ভয়ে সারা হয়ে গেল। নিরীহ বেচারিকে ধরে ঠ্যাঙাল। আর আসল কাজের বেলায় ওরা কেউ নয়। দু-বেলা বসে বসে ডাল-রুটি খাচ্ছে আর শরীরে তাগত করছে।

[পিসিমার কথা শুনে কিশোরী সিং এদিক-ওদিক তাকায়।]

কিশোরী সিং : মিলা মাইজি—মিলা, উহা বয়ঠা একঠো বড়িয়া শের।

পিসেমশাই : অ্যাঁ! শের? বাঘ!

[বাঘের নাম শুনিয়া সকলে কাঁপিতেছে। কম্পিত কন্ঠে পিসেমশাই বলে—]

সড়কি লাও, বন্দুক লাও—

[এই সময়ে ইন্দ্রনাথ প্রবেশ করিল]

ইন্দ্রনাথ : কী কী ব্যাপার কী? কী হল?

পিসেমশাই : ওরে বাঘ—বাঘ! ইন্দ্র পালিয়ে আয়!

[ইন্দ্রনাথ ছুটিয়া ভিতরে প্রবেশ করে]

ইন্দ্রনাথ : বাঘ! এখানে বাঘ এল কী করে?

পিসেমশাই : কী জানি বাবা?

সতীশ : (জড়িত কন্ঠে) দি রয়েল বেঙ্গল টাইগার!

কিশোরী সিং : (ডালিম গাছের দিকে দেখাইয়া) জি উহা বয়ঠা।

[ইন্দ্র হ্যারিকেন নিয়া আগাইয়া যায়]

ইন্দ্রনাথ : দেখি কীরকম বাঘ?

পিসেমশাই : ওরে যাসনে ইন্দ্র! যাসনে! কী ডাকাত ছেলেরে বাবা! বাঘকে ভয় করে না।

ইন্দ্রনাথ : আমরা এতগুলো লোক রয়েছি—বলি, বাঘেরও তো প্রাণের ভয় আছে, দেখি-না ব্যাপারটা কী?

[ইন্দ্র হ্যারিকেন নিয়া আগাইয়া গিয়া বলে—]

কিন্তু এ তো বাঘ বলে বোধ হচ্ছে না।

[ইন্দ্রনাথের কথায় বাঘরূপী শ্রীনাথ বহুরূপী দুই থাবা জোড় করিয়া।]

শ্রীনাথ : না, বাবুমশাই—আমি বাঘও নই, ভাল্লুকও নই—আমি ছিনাথ বহুরূপী।

[শ্রীনাথের কথায় ইন্দ্রনাথ হাসিয়া ওঠে।]

ইন্দ্রনাথ : বহুত আচ্ছা! আচ্ছা সাজ সেজেছ বটে!

[এরমধ্যে সকলে আগাইয়া আসে।]

রামকমল : হারামজাদা! তুমি ভয় দেখাবার আর জায়গা পাওনি?

পিসেমশাই : শালাকো কান পাকাড়কে লাও!

[কিশোরী সিং শ্রীনাথের কান ধরিতে যায়। ইন্দ্রনাথ বাধা দেয়।]

ইন্দ্রনাথ : আঃ! কেন আর বেচারিকে—

রামকমল : বলো কী হে ছোকরা—এই বজ্জাত হারামজাদা ব্যাটাকে ওয়াস্তে হামারা গা-গতর চূর্ণবিচূর্ণ হো গিয়া। (কিশোরী সিংহকে দেখাইয়া) আর এই শালার ব্যাটারা আমাকে কিলায়কে কিলায়কে একদম কাঁটাল পাকায় দিয়া।

শ্রীনাথ : (রামকমলের পা ধরিয়া) মাফ করুন ঠাকুরমশাই! আমি বুঝতে পারিনি যে, ছেলেরা আর আপনারা এমন করে ভয় পাবেন। কালও তো এ-বাড়িতে নারদ সেজে গান গেয়ে গেছি। তাই ভাবলাম আমার এই সাজ দেখে চিনে নেবেন।

পিসেমশাই : কী করে চিনে নেবে? চেনবার কী আর উপায় রেখেছিস?

পিসিমা : সেউপায় ও যদি নাই রেখে থাকে, তাহলে ওর ওপর রাগঝাল না দেখিয়ে এখন বকশিশ দিয়ে ওকে বিদেয় কর।

ইন্দ্রনাথ : ঠিক বলেছেন। (হঠাৎ শ্রীকান্তকে দেখিয়া) কীরে! শ্রীকান্ত তুই বুঝি এই বাড়িতে থাকিস?

শ্রীকান্ত : (ঘাড় নাড়িয়া)—হ্যাঁ।

পিসেমশাই : না—ওকে তবে কিছুতেই ছাড়া হবে না। ওর জন্যে ভট্টাচায্যি মশাইয়ের লাঞ্ছনার আজ আর শেষ নেই।

[পিসেমশাই পিসিমার কথাবার্তার মাঝে দেখা যায়, শ্রীকান্ত ও ইন্দ্রনাথ সরিয়া পড়িয়াছে।]

পিসিমা : লাঞ্ছনার জন্য দায়ী ও নয়, দায়ী তোমার দেউড়ির দারোয়ান। ও-বেচারিকে ছেড়ে দাও। আর দূর করে দাও—তোমার ওই পালোয়ান নামধারী দারোয়ানগুলোকে। একটা ছোটোছেলের যা-সাহস এতগুলো লোকের তা নেই।

পিসেমশাই : ছেড়ে দেব? ও আজ যা করেছে, ওর ল্যাজটা কেটে নিয়ে তবে ওকে ছেড়ে দেব।

পিসিমা : হ্যাঁ তাই নাও—তোমার ওটা অনেক কাজে লাগবে।

[পিসিমার প্রস্থান]

পিসেমশাই : কিশোরী সিং উসকো ল্যাজ কাট লেও।

শ্রীনাথ : দোহাই বাবুমশাই! অনেক পয়সা খরচ করে এই সাজটা করেছি। ল্যাজটা কেটে নিলে অনেক ক্ষতি হবে।

পিসেমশাই : তবে আর এরকম যা-তা সেজে, কোনো দিন আমার বাড়িতে ঢুকবি না—

শ্রীনাথ : না!

পিসেমশাই : যা দূর হ!

[আলো নেভে।]

[শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের গল্প অবলম্বনে]

সকল অধ্যায়
১.
ছাত্রের পরীক্ষারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২.
পেটে ও পিঠেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩.
বেচারাম কেনারামউপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
বৃক ও মেষ পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫.
কাক ও পনীর পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬.
লক্ষ্মণের শক্তিশেল সুকুমার রায়
৭.
অবাক জলপান সুকুমার রায়
৮.
কাজির বিচারকাজী নজরুল ইসলাম
৯.
রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা কাজী নজরুল ইসলাম
১০.
ঝড়ের দিনেসুনির্মল বসু
১১.
আলোলীলা মজুমদার
১২.
দরদিদিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩.
যেদিন জাগবে মুকুল বিমল ঘোষ
১৪.
ভীম বধনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১৫.
বহুরূপীদেবনারায়ণ গুপ্ত
১৬.
গুপীগাইন বাঘাবাইন সত্যজিৎ রায়
১৭.
দত্যি দানোর ছানাশৈলেন ঘোষ
১৮.
সৌরভবৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়
১৯.
শ্রেয়সী অমল রায়
২০.
বোকা বাঘের ছানাড. পার্থপ্রতিম পাঁজা
২১.
রাক্ষসের সঙ্গে টক্কর ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%