পার্থ প্রতিম পাঁজা
চরিত্র : মা, মোম, প্রেয়া ও শ্রেয়া।
১ম দৃশ্য
[সূচনাজ্ঞাপক আবহসংগীত। বাড়ির দৃশ্য। বিকেল।]
মা : হ্যাঁরে মোম, তুই কি একটুও লেখাপড়ায় মন দিবি না? সামনে পরীক্ষা আর তুই স্কুল থেকে ফিরেই টিভি-র সামনে বসে পড়েছিস, স্কুল ড্রেসটাও খুললি না!
মোম : আঃ, চুপ করো না? ফাটাফাটি একটা সিনেমা হচ্ছে—করিনা কাপুর আর প্রিয়াঙ্কা চোপড়া—দু-দুটো হিরোইন। করিনা যা ড্রেস পরেছে না! দারুণ!
মা : বোঝো কান্ড। একটা ক্লাস সিক্সের মেয়ের কথা শোনো! তোমার বাবা যদি এসব শুনত—
মোম : বাবা আমায় কিচ্ছু বলবে না! যত ঝামেলা তুমিই পাকাও।
মা : বাপের আদরেই তুমি একেবারে মাথায় চড়েছ। আমার কোনো কথা কানেই তোলো না। দিনরাত হিন্দি ফিলমের হিরোইনের মতো হাবভাব করে ঘুরে বেড়াচ্ছ, দু-দুজন দিদিমণি তোমাকে প্রাইভেটে পড়াতে আসেন, অথচ তোমার পড়ায় মন নেই।
মোম : ইস্কুলের বই পড়ে ছাই হবে। আমি সিনেমা করব প্রীতি জিন্টার মতো।
মা : (রাগে) করাচ্ছি তোমায় সিনেমা। ওঠ, ওঠ, বলছি টিভি-র সামনে থেকে। স্কুলের জামাকাপড় ছেড়ে হাত-মুখ ধুয়ে কিছু খেয়ে পড়তে বোস। মনে রাখিস—সন্ধেবেলায় ঊর্মি আসবে তোকে গান শেখাতে। সারাসপ্তাহ তো হারমোনিয়ামই ছুঁসনি!
মোম : ওসব আমার ভালো লাগে না। গান মানে তো সেই রবীন্দ্রসংগীত—যত সব প্যানপ্যানে কাঁদুনি। গানই যদি শেখাতে চাও তো হিন্দি সিনেমার গান শেখাচ্ছ না কেন? এবারের কালী পুজোর ফাংশানে মিস জুলি কী সুন্দর হিন্দি গান গাইল।
মা : কী সব রুচি। আমাদের মেয়ে হয়ে শেষকালে তুই পাড়ার ফাংশানে কোমর বেঁকিয়ে হিন্দি ছবির গান গাইবি মোম? এই জন্যেই তোর লেখাপড়ার জন্যে—গানের জন্যে আমরা শয়ে শয়ে টাকা খরচ করছি?
মোম : উঃ বাবা। আর পারি না, খালি পড়া আর পড়া। চলো, চলো, পড়তে বসতেই যাচ্ছি।
২য় দৃশ্য
[দৃশ্যান্তরসূচকআবহ। বাড়ির দৃশ্য, রাত্রি।]
মা : বাব্বা! আজ যে তোর কী হল মোম? রাতের খাওয়ার পরেও পড়তে বসেছিস! ওঠ, ওঠ, শুয়ে পড়বি, চল। কাল ভোরবেলা উঠে আবার পড়তে বসবি।
মোম : মা, কতকাল তোমার মুখে গল্প শুনিনি। একটা গল্প বলো না মা। শুনতে শুনতে ঘুমিয়ে পড়ব।
মা : তুই তো হিন্দি ফিলমের পোকা। আমি তো ওসব গল্প জানি না।
মোম : না মা, ওসব শুনব না, আমি রূপকথার গল্প শুনব।
মা : এই যে যখন তুই রূপকথার গল্প শুনতে চাস, বা টিভি-তে অ্যানিম্যাল প্ল্যানেট বা কার্টুন চ্যানেল দেখিস, তখন মনে হয়, আমাদের মোম নষ্ট হয়ে যায়নি, সেএখনো আগের মতোই আছে।
মোম : দেরি করো না মা, গল্প বলো—রাজা-রানির গল্প—
মা : ঠিক আছে, আজ তোকে বিজয়-বসন্তের গল্প বলব।
মোম : দুর! বিজয়-বসন্তের গল্প আমি জানি। ঠাকুরমার ঝুলিতে পড়েছি।
মা : না রে, দক্ষিণারঞ্জন মিত্র মজুমদারের লেখা গল্প নয়, আমি তোকে শোনাব কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের ‘বিজয়-বসন্ত’।
মোম : দুটো গল্প এক নয়?
মা : মূল গল্পটা এক তবে ‘কাঙাল’ হরিনাথের গল্পটা অনেক বড়ো। তার অনেক ডালপালা, এক গল্পের মধ্যে অনেক গল্প!
মোম : ‘কাঙাল’ হরিনাথ কে মা?
মা : তিনি ঊনবিংশ শতাব্দীর একজন শক্তিশালী সাংবাদিক ও সাহিত্যিক ছিলেন। তিনি ‘গ্রামবার্তা প্রকাশিকা’ বলে একটা পত্রিকা বের করতেন। তাতে গ্রামের গরিব চাষিদের দুঃখদুর্দশার খবর ছাপা হত। বড়ো হলে তুমি তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছু জানবে।
মোম : ঠিক আছে, ঠিক আছে—তুমি এখন গল্পটা বলো।
মা : তোকে তো আগেই বললাম—‘কাঙাল’ হরিনাথের লেখা ‘বিজয়-বসন্ত’ গল্পটা অনেক বড়ো। তা ছাড়া একই গল্পের মধ্যে সেখানে অনেক গল্পের ছড়াছড়ি। তোকে তার মধ্যে থেকে ছোট্টো একটা গল্প বলি। এই তো হাতের কাছেই হরিনাথের নির্বাচিত রচনা রয়েছে। দাঁড়া—‘বিজয়-বসন্তটা’ বার করি। এই তো পেয়েছি—এবার তার মধ্যে থেকে...অ্যা-অ্যা-হ্যাঁ-এই গল্পটা শোনাই—সারদ্বাজ মুনি বসন্তকে এই গল্পটা বলেছিলেন—‘বাছা বসন্ত! মনুজনামা এক ব্রাহ্মণ কুমারের কৈশোরাবস্থা গত হইলে তিনি যৌবনের প্রারম্ভে সন্দেহ-পন্থায় ইতস্তত গমন করিতে করিতে, সম্মুখে এক চিন্তা-শৈল দেখিতে পাইলেন; সেই পর্বতের শিখরদেশ ক্রমে বৃদ্ধি প্রাপ্ত’—
মোম : একী, অদ্ভুত ভাষা মা! কিচ্ছু বুঝতে পারছি না।
মা : সেই যুগের বাংলা গদ্য এই রকমই ছিল। তোমরা এ যুগের ছেলে-মেয়েরা বঙ্কিমচন্দ্রের উপন্যাসের ভাষাও বুঝতে পারবে না। আর হরিনাথের ‘বিজয়-বসন্ত’ তো তারও আগে লেখা। ঠিক আছে, আমি তোকে সহজ করেই বলছি। মনুজ নামে একটি ছেলে একদিন বেড়াতে বেড়াতে একটা পাহাড়ের কাছে পৌঁছে গেল। সেখানে গিয়ে দেখে—পথটা দু-ভাগে ভাগ হয়ে গেছে। কোন পথে সেযাবে—তা মনুজ যখন কিছুতেই ঠিক করতে পারছে না—তখন আকাশ থেকে দুজন ‘দিব্যাঙ্গনা’—ও! দিব্যাঙ্গনা মানে তো তুই বুঝবি না। মনে কর, ওরা স্বর্গের দেবী, একজনের নাম প্রেয়া, আরেকজনের নাম শ্রেয়া...
[কালক্ষেপক আবহসংগীত।]
মা : গল্পটা শুনতে শুনতে মোম ঘুমিয়ে পড়েছে। — আচ্ছা, আজ ও কি ওই প্রেয়া আর শ্রেয়া আসতে পারে না? মোমের মতো বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের ঠিক পথটা দেখাতে ওরা কি আর কোনোদিন আসবে না?
মা : গল্পটা শুনতে শুনতে মোম ঘুমিয়ে পড়েছে।—আচ্ছা, আজও কি ওই প্রেয়া আর শ্রেয়া আসতে পারে না? মোমের মতো বাচ্চা ছেলে-মেয়েদের ঠিক পথটা দেখাতে ওরা কী আর কোনোদিন আসবে না?
[দৃশ্যান্তর সূচক আবহসংগীত]
৩য় দৃশ্য
প্রেয়া : এই মেয়েটার নামই তো মোম, তাই না শ্রেয়া?
শ্রেয়া : হ্যাঁ প্রেয়া। আজ এর ওপরেই হবে আমাদের পরীক্ষা—শ্রেয়া বড়ো না প্রেয়া বড়ো।
প্রেয়া : এসব পরীক্ষার কি সত্যিই আর কোনো প্রয়োজন আছে? কতবারই তো প্রমাণ হয়েছে—মানুষ প্রেয়াকে চায়, শ্রেয়াকে নয়। আর তা ছাড়া এখন তো আমারই জয়-জয়কার। চারপাশে ভোগের মোহিনী হাতছানি, মানুষ আগের চেয়েও এখন আরো বেশি অর্থ চায়, চটজলদি নাম চায়, জীবনটাকে উপভোগ করতে চায়। এখন আর কেউ তোর পথে, নিষ্ফল সাধনার পথে, আত্মনিগ্রহের পথে, ত্যাগের পথে চলতে চায় না।
শ্রেয়া : জানি, সময়টা আমার পক্ষে খুবই প্রতিকূল! চারপাশে শুধু লোভ-লালসার কুৎসিত বিকার। শ্রেয়ার সাধনা অনেকেই করতে চায় না—একথা আমি জানি প্রেয়া। তবু এসেছি আরেকবার পরীক্ষা করে দেখতে। এই বিকৃত বাসনার যুগে শ্রেয়ার সাধনা করতে সত্যিই কি কেউ চায় না?
প্রেয়া : বারবার আমার কাছে হেরে গিয়েও যখন তোর কোনো শিক্ষাই হয়নি, তখন না হয় আরেকবার দেখা যাক এই বালিকার ওপর পরীক্ষা করে—তুই বড়ো, না আমি বড়ো!
শ্রেয়া : মোম এখন ঘুমোচ্ছে। আয়, আমরা ওর স্বপ্নের জগতে ঢুকে পড়ি।
[স্বপ্নালু মধুর আবহসংগীত]
মোম : (ঘুমের ঘোরে) ওমা, এ আমি কোথায় এসে পড়লাম। কী করে এলাম এখানে? আমাদের বাড়িটাকে তো কোথাও দেখা যাচ্ছে না। মা-বাবাই বা কোথায় গেল?
প্রেয়া : ভয় পেয়ো না মোম! আমরা তোমার সঙ্গে আছি।
মোম : এ-কী! তোমরা কারা? তোমাদের গা থেকে আলো বেরুচ্ছে। তোমরা কি স্বর্গের দেবী?
শ্রেয়া : আমাদের দুজনকে না হয় দেবীই ভাবো। আমরা তোমাকে পথ দেখাতে এসেছি।
মোম : পথ? কীসের পথ?
প্রেয়া : উন্নতির পথ, সমৃদ্ধির পথ, সুখ ও বিলাসের পথ। তুমি যা চাও, সব পাবে আমার পথে গেলে।
মোম : তোমরা কী বলতে চাইছ, আমি কিছুই বুঝছি না।
শ্রেয়া : মোম সোনা, তুমি এখন দাঁড়িয়ে আছ যেখানে, সেখান থেকে পথটা দুটো ভাগে ভাগ হয়ে গেছে, একটা পথ আমার পথ, আরেকটা পথ ওর—প্রেয়ার।
প্রেয়া : শ্রেয়ার পথে যেও না মোম। ওপথে কিচ্ছু নেই। দেখছ না—সারাটা পথ জঙ্গলে ঢাকা, ওখানে কাঁটার ঝোপ, তোমার কচি কচি পা দু-খানা রক্তাক্ত—ক্ষতবিক্ষত হয়ে যাবে, ওর পথে কত খানা-খন্দ যে-কোনো সময় আছাড় খাবে আর হাত-পায়ের হাড় ভাঙবে। আর আমার পথটার দিকে তাকিয়ে দেখো—একদম মসৃণ, কংক্রিটে বাঁধানো রাজপথ, দু-পাশে দ্যাখো—রং-বেরঙের কত ফুলের বাগান, উড়ালপুলও আছে কত, আর সারিসারি কত দোকানপাট-শপিংমল, প্লাজা, মাল্টি প্লেক্স—কী নেই এখানে! সব পাবে। তুমি যা হতে চাও, আমি তোমাকে তাই করে দেব। তুমি হিন্দি ছবির নায়িকা হতে চাও, আমি বানিয়ে দেব। তুমি তো গান জানো, আমি টিভি চ্যানেলের যেকোনো হিন্দি গানের কম্পিটিশনে তোমাকে ফার্স্ট করে দেব। টাকার গদিতে শুয়ে থাকবে মোম, বাড়ি-গাড়ি-সব পাবে—যা চাও সব। খুব তাড়াতাড়ি পাবে আর তার জন্যে তেমন কিছু পরিশ্রমও করতে হবে না, শুধু আমার পথে চলতে হবে, প্রেয়ার পথে চলতে হবে।
মোম : হ্যাঁ, চলব, আমি তোমার পথেই চলব প্রেয়া মাসি। এটাই সহজ পথ।
শ্রেয়া : সহজ পথ মানেই সঠিক পথ নয় মোম। আমার পথ শ্রেয়ার পথ, মঙ্গলের পথ। হ্যাঁ, মোমসোনা, আমার পথের শুরুটা প্রেয়ার পথের মতো সহজ নয়। আমার পথে চললে সত্যিই তোমাকে প্রথম দিকে অনেক কষ্ট—অনেক দুঃখ পেতে হবে।
প্রেয়া : শুনলে তো মোম—শ্রেয়া নিজেই স্বীকার করছে তার পথে দুঃখের কাঁটা বিছোনো।
শ্রেয়া : কিন্তু মোম, তুমি প্রেয়ার পথের শুরুটাই দেখেছ, শেষটা দেখোনি। চলো, আমি তোমাকে ওই মায়াবী ছলনার ঝকঝকে সুন্দর পথের শেষটা দেখিয়ে আনি।
[আবহ সংগীত]
মোম : এ কী! এ আমাকে কোথায় নিয়ে এলে শ্রেয়া মাসি। এত সহজ, এত সুন্দর পথের শেষে কী ভয়ংকর খাদ, আর তার মধ্যে জমাট বেঁধে আছে শত যুগের অন্ধকার! এ কী, একের পর এক এই পথের যাত্রীরা এই খাদের মধ্যে পড়ে যাচ্ছে, তাদের সারাগায়ে কাদা, কী ভয়ংকর লাগছে তাদের দেখতে, মাথার ওপরে শকুনেরা ঘুরছে—
শ্রেয়া : আরো ভালো করে দ্যাখো মোম, শকুনে-শিয়ালে তাদের ছিঁড়ে খাচ্ছে! লোভ-লালসা আর বিকৃত বাসনার এই শেষ পরিণতি, ভোগবাদের নির্মম ভবিষ্যৎ।
মোম : আমি আর এসব দেখতে পারছি না শ্রেয়া মাসি। আমি তোমার পথেই চলব, যতই সে-পথ কঠিন হোক না কেন, তবু সেই পথই আমার পথ।
শ্রেয়া : আমার পথ কঠিন, কিন্তু সে-পথ আনন্দময়। হ্যাঁ মোম, তোমাকে কাঁটা বিছানো পথে রক্তমাখা পায়ে চলতে হবে, কিন্তু যতটুকু পথ তুমি চলতে পারবে, ততটুকুই তোমার জীবনের সেরা সঞ্চয় হয়ে থাকবে, যার কোনো ক্ষয় নেই। না, শ্রেয়ো পথে চটজলদি সাফল্য নেই, যেটুকু সফলতা পাবে, তা তোমাকে ঘাম ঝরিয়ে পরিশ্রম করেই অর্জন করতে হবে। তবে সেই অর্জনের পেছনে যে আনন্দ আছে, তার কোনো তুলনা নেই। তুমি যদি সমস্ত প্রলোভন ত্যাগ করে এই মঙ্গলময় পথে চলতে পারো, তাহলে হয়তো দেখবে পথের কোনো বাঁকে তোমারই জন্যে অপেক্ষা করে আছেন মহামানবেরা, হয়তো বা রবীন্দ্রনাথও।
মোম : রবীন্দ্রনাথ? আমার জন্যে অপেক্ষায় থাকবেন রবীন্দ্রনাথ? শ্রেয়া মাসি আমি তোমার পথে চলব।
প্রেয়া : ঠিক আছে শ্রেয়া, এখানে না হয় আমি হেরে গেলাম, কিন্তু জেনে রাখিস শ্রেয়া—আমার পথেই আজ হাজার হাজার ছেলে-মেয়ে চলছে।
শ্রেয়া : তবু তো এখনো মোমের মতো কেউ কেউ তৈরি হচ্ছে আমার পথে চলার জন্যে। আর এই দুঃসময়ে এখানেই আমার জয় প্রেয়া।
[দৃশ্যান্তর আবহসংগীত।]
৪র্থ দৃশ্য
সকাল
[নেপথ্য আবহে হারমোনিয়ামে ‘এ দিন আজি কোন ঘরে গো...’ বাজে।]
মা : এ কী রে মোম! আজ কোন দিকে সূর্য উঠেছে। সকালে উঠেই রেওয়াজে বসেছিস, তাও রবীন্দ্রসংগীত।
মোম : এসো না, আমরা দুজনে আজ এই গান গেয়ে উঠি। (দুজনে গান গাইতে থাকে।)
[‘কাঙাল’ হরিনাথ বিরচিত ‘বিজয়-বসন্তে’-র একটি ক্ষুদ্র অংশের অনুপ্রেরণায় নাটকটি লেখা হয়েছিল।]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন