সৌরভবৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়

পার্থ প্রতিম পাঁজা

চরিত্র : বেল, করবী, জুঁই, গাঁদা, জবা, চন্দ্রমল্লিকা, অপরাজিতা, গোলাপ, রজনীগন্ধা ফুল।

(গান)

‘হৃদয় আমার ওই বুঝি তোর’

[গানের সঙ্গে সবাই নাচতে থাকে।]

বেল : চুপ করো সকলে। রানি আসছেন।

করবী : রানি আসছেন! এত তাড়াতাড়ি!

জুঁই : রানির তো এখন আসার কথা নয়। কথা ছিল—মাঝরাতে রজনীগন্ধাকে নিয়ে আসবেন। তাই বলেছিলেন তখন, না কি বল—গ্যাঁদাপিসি!

গ্যাঁদা : তোদের রানির ঢং দেখে বাঁচি না। এই এক রকম কথা বলে। এই আরেক রকম। কথাবার্তার কোনো ঠিকঠিকানা আছে কি? রূপের গরবেই গেলেন।

বেল : বাব্বা:! রানির ওপর পিসির ভারি রাগ।

জুঁই : না হবারই বা কারণ কী? রানির গায়ের গন্ধটাই না হয় ভালো। দেখতে পিসি রানির চেয়ে কম কীসে! যেমন থকথকে বাঁধুনি। তেমনি রংয়ের বাহার। তবু লোকে গোলাপ গোলাপ করেই পাগল।

গ্যাঁদা : বল তো জুঁই মানুষের কি আর জ্ঞানগম্যি আছে? সত্যিকারের রূপের আদর করতে ওরা এখনো শিখল না।

বেল : ফুলেদের তো শুধু একটা থাকলেই চলে না পিসি। রূপ আর গন্ধ দুটোই থাকা চাই, নইলে—

গ্যাঁদা : থাম থাম আমাকে আর বোঝাতে হবে না। রূপ যদি কিছু নয় তবে ডালিয়ার অত কদর কীসের। কীসের জন্যে লোকে ওকে বাগান ভর্তি করে ফুটিয়ে রাখে?

চন্দ্রমল্লিকা : আর আমাকেও খোঁপায় তোলার জন্য সুন্দরী মেয়েরা পাগল হয় কেন!

করবী : তবু সেইটাই তো সব নয় চন্দ্রমল্লিকাদি। তোমায় দেখে পাগল হতে পারে লোকে। কিন্তু, হাসনুহানাকে যে না দেখেই পাগল হয় লোকে। বাগানের পাশ দিয়ে যাবার সময় বুক ভরে নি:শ্বাস নেয়, বলে আঃ কী সুন্দর।

গ্যাঁদা : তোকে আবার টক টক করে কথা বলতে কে ডেকেছে? বড়োদের কথায় থাকা তোর ভারি বদরোগ।

জুঁই : বারে, ছোটো বলে ফুল নই নাকি আমরা! না হয় দেখতেই ছোটো, গন্ধে আমি রানির থেকেও কম যাই না জানো?

গ্যাঁদা : অ্যাঁ—রানির সঙ্গে নিজের তুলনা করিস, তোর আস্পর্ধা তো কম নয়।

বেল : রানির সঙ্গে নিজের তুলনা করবার আগে চেহারার দিকে তাকিয়ে দেখেছিস কোনোদিন—আর দেখবিই বা কী করে—ড্রেসিং টেবিলের সামনে মানুষেরা তোকে রাখে না, আয়না দেখতেই পেলি না কোনোদিন।

জুঁই : আর তোমাকেই বড়ো রাখে—মাঝে মাঝে মালা হয়ে খোঁপায় উঠতে পাও এই পর্যন্ত তো তোমার দৌড়, তুমিই বা ফুলদানিতে কবে গেলে বেলাদি?

চন্দ্রমল্লিকা : চুপ করো চুপ করো! বড্ড চেঁচামেচি হচ্ছে, ফুল হয়ে মানুষের মতো ব্যবহার কেন তোমাদের! নিজেদের মধ্যে রূপ-গুণ নিয়ে হিংসে করা মানুষের কাজ, তোমাদের নয়।

করবী : আমরা আবার কী করলাম—পিসিই তো যতসব গোলমাল আরম্ভ করেছে।

জুঁই : গোলমাল করা স্বভাব পিসির কিছুতেই ঘুচবে না।

বেল : পুরোহিতের টিকিতে বাঁধা থাকে কিনা, তাই পূজারি বামুনের মতো পিসির মেজাজটাও খটখটে হয়ে গেছে।

গ্যাঁদা : কী? যত বড়ো মুখ নয় তত বড়ো কথা! পূজারি বামুনের মেজাজের সঙ্গে আমার তুলনা। আজ আসুক রানি। এর একটা বিহিত করতেই হবে। এক ফোঁটা ফুল সব গুণের গরবেই গেলেন। রানির মান রেখে কথা কইতে জানে না।

চন্দ্রমল্লিকা : আঃ! পিসি বড্ড বাড়াবাড়ি হচ্ছে। আজ বাসন্তী পূর্ণিমা। ফুলেদের বার্ষিক উৎসব। এ দিনেও তুমি চুপ থাকতে পারো না?

গ্যাঁদা : ও। তুমিও শুধু আমারই দোষ ধরবে চন্দ্রমল্লিকা। বেশ, এই চললুম আর কক্ষনো তোমাদের মধ্যে আসব না।

বেল : আহা, রাগ করো কেন পিসি!

গ্যাঁদা : না না। আমার ঘাট হয়েছে। আমি তোমাদের মধ্যে এসেছিলুম। আমার লক্ষ্মীপুজোর ঘরই ভালো। ওখানে সাজির মধ্যে আমি ভালোই থাকি। রূপগুণওয়ালা ফুলেদের কাছে আসার আমার দরকার নেই।

জুঁই : আহা পিসি! তবুও তো তুমি সুন্দর। সাজিতে যখন যাবার তখন যাবে। আজ আমাদের মধ্যেই এসো—আজকের উৎসবে তুমি না থাকলে হয়?

গ্যাঁদা : কেন তোর দয়া নাকি। বলি তুই দয়া করে ডাকলে তবেই কি আমি থাকতে পারব? আসুক রানি, তোকে থাকতে দেয় কিনা তাই দ্যাখ আগে—তারপর আমার কথা চিন্তা করিস।

[অপরাজিতা ঢোকে। বেশ বাহুল্য নেই, ম্লান মুখ। ]

অপরাজিতা : আসতে পারি?

চন্দ্রমল্লিকা : কে?

বেল : (মুচকি হেসে) অপরাজিতা।

চন্দ্রমল্লিকা : কী চাও?

অপরাজিতা : আমি আসব তোমাদের সঙ্গে?

জুঁই : কেন ঠাকরুন! তোমার আবার এ রোগে ধরল কেন?

করবী : তুমি আজকে আমাদের সঙ্গে এসে কী করবে? শুকনো খটখটে লোক তুমি—রসকস একেবারে নেই—

বেল : সংস্কৃত মন্তরের মধ্যে বাস করো—সন্ন্যাসিনী মানুষ। দ্যাখো কাছাকাছি কোথাও পুজোটুজো হচ্ছে কিনা। তুমি নাচ-গানের আসরে কী করবে?

চন্দ্রমল্লিকা : অপরাজিতা, আজ ফুলেদের উৎসবের দিন। শুধু আনন্দ, শুধু উৎসব। যে ফুলেদের বর্ণ গন্ধ কিছুই নেই, আজকের উৎসবে তারা আসতে পারে না।

অপরাজিতা : তবুও আমি ফুল। নাচতে-গাইতে না পারি, শুধু এক পাশে চুপটি করে বসে দেখতেও পারি তো?

চন্দ্রমল্লিকা : না, রানি পছন্দ করবেন না।

অপরাজিতা : শুধু পুজো করি বলে কোনো আনন্দ উৎসবে আমি থাকতে পাব না!

বেল : কী করে পাবে! আমাদের রূপে-বর্ণে-গন্ধে বাতাস যখন হেসে উঠবে, আকাশের চাঁদ উঠবে আরো উজ্জ্বল হয়ে, কোকিল গাইবে গান, জোনাকিরা মিটমিট করে জ্বলে উঠবে, ভ্রমরেরা গুঞ্জন করবে...আর মানুষের মনে আসবে অফুরন্ত হাসি আর আনন্দ...তখন তোমার দিকে কে চেয়ে দেখবে অপরাজিতা।

গ্যাঁদা : আর নামটাও তো বেশ জব্বর নিয়েছ। অপরাজিতা—বাব্বা: যেন কারো কাছে হেরে যাও না।

চন্দ্রমল্লিকা : অথচ সবার কাছে সব দিক দিয়েই তোমার হার। যেমন তুমি দেখতে, তেমনি তোমার গুণ।

অপরাজিতা : (মৃদু হেসে) নাম তো আমি নিজে নিইনি ভাই। নাম আমাকে মানুষই দিয়েছে। কেন দিয়েছে, কী বুঝে দিয়েছে—তারাই জানে।

করবী : ওই, ওই তো তোমার গরব। মানে তোমার বলবার ইচ্ছে, তোমার দাম মানুষেরা জানে। বুঝেসুঝেই তারা ওই নাম দিয়েছে।

চন্দ্রমল্লিকা : কথা বাড়িও না অপরাজিতা। যাও চলে যাও।

অপরাজিতা : আমাকে একটু থাকতে দাও চন্দ্রমল্লিকাদি। হাজার হলেও আমি ফুল, ফুলের আনন্দের দিনে আমি থাকতে পারব না।

জুঁই : বেশ, বেশ। এত করে যখন বলছ বাপু—থাকো না হয় একপাশে। কিন্তু নাচ-গানের সময় অনর্থক আমাদের সঙ্গে এসে মিশে যাবার চেষ্টা করো না, তাতে আমাদের তাল কেটে যায়।

বেল : তুমি বরং ওই পিসির কাছে গিয়ে বোসো।

গ্যাঁদা : না না। আমার কাছে বসবার দরকার নেই। দুর্গাপুজোয় তোমার ঠ্যালায় আমি অস্থির। পুজো বাড়িতেও যে লোকের আদর-আপ্যায়ন একা একা ভোগ করব সে-পথও তুমি বন্ধ করেছ।

[ছুটে জবা ঢোকে। জবা ফুল রাজ্যের প্রহরী। ভালো না বাসলেও সবাই তাকে ভয় করে চলে।]

জবা : হুঁশিয়ার, হুঁশিয়ার সকলে। রানি আসছেন! রানি আসছেন।

বেল : (অপরাজিতাকে) যাও না, ওদিকে লুকিয়ে পড়ো।

অপরাজিতা : আমাকে দেখলে রানি বুঝি খুব রেগে যাবেন?

করবী : তাও কি বুঝতে পারছ না? তোমাকে দেখলে আমাদেরই কেমন মন খারাপ হয়ে যায়, তোমাকে দেখলেই আমার পাঁঠাকাটার হাড়িকাঠটা মনে পড়ে যায়।

জুঁই : অমনি চোখ ফেটে জল আসে আমাদের। মনের সব আনন্দ নষ্ট হয়ে যায়।

চন্দ্রমল্লিকা : ঢাকে কাঠি পড়ে চড়বড় করলে তুমি এসো অপরাজিতা। আজ তুমি যাও।

অপরাজিতা : বেশ।

[অপরাজিতা চলে যেতে যায় কিন্তু জবা তাকে ডাকে।]

জবা : শোনো অপরাজিতা, মন খারাপ করে ফিরে যাচ্ছ না তো। আমার দিকে ফেরো, ফেরো, দেখি জল আছে কিনা তোমার চোখে।

গ্যাঁদা : ঢং দেখে আর বাঁচি না! জল থাকলেই বা হয়েছে কী!

জবা : না। ফুলের রাজত্বে মন খারাপের কোনো জায়গা নেই। ফুলের রাজত্বে আছে হাসি আর আনন্দ, ফুলের চোখে জল পড়লে সূর্যদেব রাগ করেন।

অপরাজিতা : (হেসে) তোমার ভয় নেই জবা। চোখে আমার জল থাকে না কোনোদিন। রাগ দুঃখ আমার কাছে ঘেঁসে না, অপমান আমাকে বেঁধে না। আমি যে শক্তিকে পুজো করি জবা, তাই নিজে আমি শক্ত হতে জানি।

জুঁই : (চন্দ্রমল্লিকাকে) না হয় থাকলই বাপু একদিকে।

চন্দ্রমল্লিকা : না।

অপরাজিতা : না না। আমি যাচ্ছি। তবে একটা কথা বলে যাই। আর কোনো ছোট্ট ফুলের মনে তোমরা দুঃখ দিও না। আজকের উৎসবে ছোটো-বড়ো সব ফুলকেই কাছে টেনে নিও। নইলে কারো চোখে যদি জল পড়ে, জেনো, সূর্যদেব আর উঠবেন না, তোমাদেরও আর অমন সুন্দর হয়ে ফুটে ওঠা হবে না।

[অপরাজিতা চলে যায়।]

গ্যাঁদা : ও মা, কোথায় যাব। অভিশাপ দিয়ে গেল নাকি?

বেল : গেল তো গেল। যেন রাগী বামনী। আচ্ছা, সূর্যদেব আমাদের এতগুলো সুন্দর মুখের দিকে চেয়ে না উঠে পারবেন নাকি?

করবী : সব রাগ-দুঃখকে জয় করেছে। ভারি মহীয়সী একেবারে।

জবা : চুপ, চুপ, রানি আসছেন! রানি আসছেন!

বেল : আকাশের উদারতা, বাতাসের সরলতা, স্বর্গের পারিজাতের গন্ধ, বিশ্বের সৌন্দর্য নিয়ে আবির্ভূতা হচ্ছে গোলাপ মহারানি—ই—ই—ই।

[গোলাপ আর রজনীগন্ধা ঢোকে। রজনীগন্ধা সবসময় গোলাপের পাশে পাশে থাকে। দুজনে সিংহাসনে বসে। তাদের পাশে গিয়ে দাঁড়ায় চন্দ্রমল্লিকা। অন্য ফুলেরা সারি হয়ে রানির দু-পাশে দাঁড়ায়।]

গোলাপ : জবা!

জবা : এই তো মহারানি।

গোলাপ : বিবরণী শোনাও গত বছরের। উৎসবের আগে আমি জেনে নিতে চাই, যে বছরটি চলে গেছে সে-বছরে ফুলেরা নিজেদের কর্তব্য কে কতটুকু করেছে। মানুষের জীবনে আনন্দ হাসি-গান আনতে ফুলের জগৎ কতটুকু সাহায্য করতে পেরেছে।

জবা : ভয়ে বলব না নির্ভয়ে বলব মহারানি?

রজনীগন্ধা : তোমায় তো চিরকাল নির্ভয় বলেই জানি জবা। তোমারও ভয়ের কোনো কারণ আছে কি?

জবা : না, তা নেই। মানুষের জীবনে আনন্দ-হাসি-গান আনতে আমার দান কিছুই নেই। আমার জীবন অত ক্ষণস্থায়ী নয়, অত চটুলও নয়। আমি গম্ভীর প্রকৃতির, ঠাট্টা ইয়ার্কি আমার পছন্দসই জিনিস নয়। তবু অন্য ফুলেদের সব খবর আমার রাখতে হয়—তাই রাখা। কারণ, আমি ফুলের জগতের প্রহরী। তাই নিজের কথা ভেবে নয়, অন্য ফুলেদের এমনকী মহারানির কথা ভেবেও আমি ভয় পাচ্ছি।

গোলাপ : কী তোমার ভয়ের কারণ? গত বছরে ফুলের জগতে এমন কিছু কি ঘটেছে যা বলতে তোমার ভয়।

চন্দ্রমল্লিকা : আমার তো মনে হয় না ভয় পাবার মতো কিছু আছে। সারাবছর মানুষ মনের আনন্দে আমায় ফুটিয়ে তুলেছে। কত চেষ্টা করেছে আমাকে আরো বড়ো আরো সুন্দর করে তোলবার, কত পরিচর্যা করেছে।

বেল : আমিও তো কখনো কারো খোঁপা থেকে নেমে গেছি বলে মনে হয় না. মেয়েরা যত্ন করে আমায় ফুটিয়ে তুলেছে। গোছা গোছা তুলে এনে সারাদুপুর ধরে বসে মালা গেঁথেছে...তারপর কখনো তাদের খোঁপাটিকে ঘিরে ঘুমিয়ে পড়েছি, কখনো কোনো বিয়ের বাসরে কারো গলায় দুলেছি।

গ্যাঁদা : আমাকে নিয়ে ছেলেদের লোফালুফি খেলাও তো সমানে চলেছে। অবশ্য পুজোআচ্চার দিকটা বাদ দিয়ে বলছি। সেখানে তো ষোলো আনাই আমার রাজত্ব।

করবী : আমার আদরও কিছু কম দেখিনি। বাচ্চা মেয়েরা তো আমায় নিয়ে ছিনিমিনি খেলেছে।

জুঁই : আমি তো মুঠোভর্তি হয়ে ছেলেদের পাঞ্চাবির পকেটে কত যে ঘুরলাম তার আর ইয়ত্তা নেই।

গোলাপ : জবা।

জবা : আজ্ঞে!

রজনীগন্ধা : সব ফুলের কথা শুনলে তো। আমার কথা যদি শুনতে চাও—আমি বলতে পারি—আমিও সারাবছর জন্মদিন, বিবাহবাসর, বিবাহবার্ষিকীর উৎসবে, মেলায় ঘুরেছি। প্রতিটি বাড়ির ড্রেসিং টেবিলে আমি কতবার নিজেকে ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে দেখেছি। আমার রূপ আগের তুলনায় এতটুকু ম্লান বলে মনে হয়নি।

গোলাপ : এখনও তুমি গম্ভীর কেন জবা। তুমি কি বলতে চাও পৃথিবীতে ফুলের জগতে কিছু অনাদর হয়েছে।

জবা : হয়েছে মহারানি।

গোলাপ : কেন বলছ একথা? সব ফুলই তো দেখছি—আনন্দিত। আমার নিজের কথা যদি জিজ্ঞাসা করো, বলব—আমিও কম খুশি নই মানুষের ব্যবহারে। আমাকে নানা আকারে নানা রূপে ফুটিয়ে রাখা হয়েছে প্রায় সব বাড়িতেই—মানুষ যত নিবিড়ভাবে আমাকে ভালোবাসে, যেন নিজের ছেলে-মেয়েদেরও অতটা ভালোবাসে না—

জবা : খুব সত্যি কথা মহারানি, তবু ভয়ে আমার বুক কেঁপে উঠছে—মনে হচ্ছে এই বুঝি শেষ, এই বুঝি শেষ, তারপর আসছে ফুলের জগতে দুর্দিন।

রজনীগন্ধা : কেন জবা?

চন্দ্রমল্লিকা : যত সব পাগল! ফুলের জগতে দুর্দিন বলে কোনো জিনিস নেই।

জবা : আছে চন্দ্রমল্লিকা—দুর্দিন নেই আমার জীবনে। কোনো যত্ন কোনো আদরের পরোয়া করি না আমি। নিজে ফুটে উঠি নিজের শক্তিতে। কিন্তু তোমাদের যাদের মানুষের শখ-আহ্লাদের উপর নির্ভর করতে হয়? মানুষের রুচি যদি কোনোদিন পালটে যায় চন্দ্রমল্লিকা?

চন্দ্রমল্লিকা : পালটে যাবে?

জবা : যেতেও পারে তো! এমন দিন যদি আসে যে তারা ফুল ফোটাতে ভুলে যাবে।

গোলাপ : কী বকছ পাগলের মতো?

জবা : পাগলের মতো নয় মহারানি। যদিও পাগলরাই আমাকে সত্যিকারের ভালোবাসে, তবু আমি অন্তত পাগল নই...মানুষের মনের জগতে, দুর্দিন আসছে মহারানি।

গোলাপ : সেকেমন দুর্দিন?

জবা : বিনা কারণে আনন্দ পেতে মানুষ ভুলে যাচ্ছে—

রজনীগন্ধা : সেআবার কী কথা? ভালো করে বুঝিয়ে বলো।

বেল : হেঁয়ালি ছেড়ে সোজা কথায় জবাব দাও জবা।

জবা : জীবনের প্রয়োজনকে মানুষ বড্ড বেশি করে দেখছে। খুব মোটা মোটা লাভ-লোকসানের অঙ্ক কষছে। এখনও তোমাদের ফোটাচ্ছে বটে কিন্তু সেলোকদেখানো। তোমাদের দেখে...শুধু দেখে...আনন্দ পেতে মানুষ ভুলে যাচ্ছে বেল।

বেল : তবু আমায় খোঁপায় তুলে রাখে কেন?

রজনীগন্ধা : ফুলদানিতে আমায় সাজিয়ে রাখে কেন?

চন্দ্রমল্লিকা : কেন ঘরে ঘরে আমায় ফুটিয়ে রাখতে ভালোবাসে?

জবা : কিন্তু তোমার খোঁপায় তোলার পরও তোমার গন্ধ, তার মনকে স্নিগ্ধ করে না। তোমায় খোঁপায় রেখে সেহয়তো অপরের সর্বনাশ চিন্তা করে। ফুলদানিতে রজনীগন্ধা সাজিয়ে তার হয়তো আর সারাদিন দেখার সময় হয় না। ঘরে ঘরে ফোটানো চন্দ্রমল্লিকা হয়তো মালি ফোটায়...কিন্তু তা হয়তো বাগানেই শুকিয়ে যায় কারণ বাগানের মালিক আরো ব্যস্ত।

গোলাপ : ব্যস্ত হলে কী হবে জবা। ব্যস্ত হলে কি সৌন্দর্য দেখতে মানুষ ভুলে যায়?

জবা : যায় মহারানি, যায়। মানুষের হয়তো অনেক উন্নতি হয়—বাইরের উন্নতি। কিন্তু তার যে মনটা সৌন্দর্য দেখে, সেটা মরে যায়। কিছুদিন পর তোমাদের ফোটানোর কোনো অর্থই তারা হয়তো খুঁজে পাবে না।

গ্যাঁদা : কী সমস্ত আবোলতাবোল কথা! তোমাকে বেশি কথা বলতে দিলেই বিপদ। কেমন একটা গম্ভীর গম্ভীর ভাব এনে ফেল। এখন উৎসবের কথা হোক মহারানি।

করবী : হ্যাঁ, উৎসবের কথা হোক।

জুঁই : পাগলের কথায় তোমরা কেউ কিছু মনে করো না।—এসো, কী করে আরও ভালো করে নিজেদের ফুটিয়ে তুলতে পারি সেচেষ্টাই করা যাক।

রজনীগন্ধা : মহারানি।

গোলাপ : বলো রজনীগন্ধা।

রজনীগন্ধা : রাত প্রায় শেষ হয়ে এল। আলোচনা বন্ধ করা যাক।

চন্দ্রমল্লিকা : হ্যাঁ জবা, তুমি তাহলে এসো।

জবা : নিশ্চয়ই, এ আনন্দে আমি কোনোদিন থাকি না। আমার আনন্দ পুজোবাড়িতে। আর মানুষের মন থেকে দেবতার ভয় এখনও যায়নি। কাজেই সেখানে আমার আসন একেবারে পাকা।

গ্যাঁদা : সেই পাকা আসনেই বিদেয় হও বাপু। মেজাজটা একেবারে খড়খড়ে করে দিলে।

জবা : মহারানির জয় হোক। [জবা চলে যায়]

জুঁই : হাঁফ ছেড়ে বাঁচলুম! যেমনি লাল টকটকে চেহারা, তেমনি গরম গরম কথাবার্তা। যেন দাউ দাউ করে জ্বলছে। ওকে আবার ফুল বলে!

রজনীগন্ধা : এখন উৎসবের কাজ আরম্ভ করা যাক। কী কী হবে তুমি কিছু ঠিক করেছ চন্দ্রমল্লিকা?

চন্দ্রমল্লিকা : (একটা গাছের পাতা নিয়ে) হ্যাঁ, প্রথমে জুঁই আর করবীর নাচ।

বেল : আমারটা আগে হয়ে গেলে হত না চন্দ্রমল্লিকাদি? সেই বিকেল থেকে খোঁপায় ঘুরতে হচ্ছে। বড্ড শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে।

চন্দ্রমল্লিকা : না না, সেবললে হবে না। ফুলের রাজ্যে আইনকানুন বড্ড কড়া। যেমন লেখা আছে ঠিক তেমনটি হবে।

বেল : এই চাঁদের আলোয় প্রথমে আমার নাচটা দেখাত ভালো।

জুঁই : দেখাত ভালো! কেন আমরা খারাপ কীসে যে চাঁদের আলোয় আমাদের ভালো দেখাবে না?

বেল : রংটা হয়তো একই। তাই বলে এমন জমাট বাঁধুনি তুমি কোথায় পাবে জুঁই?

জুঁই : উঃ! তাও যদি চন্দ্রমল্লিকাদি পাশে না থাকত।

চন্দ্রমল্লিকা : ঝগড়া নয় ঝগড়া নয়। কী আশ্চর্য—তোমরা কি ভুলে গেলে তোমরা ফুল। নাও আরম্ভ করো, বেলা, একটু বোসো। ওদের হয়ে গেলে পরের বারই তোমার।

গোলাপ : আরম্ভ হোক, জুঁই, করবী।

[জুঁই ও করবী নাচে গায়—নীল দিগন্তে। শেষ হলে গ্যাঁদা চন্দ্রমল্লিকার কাছে যায়।]

গ্যাঁদা : আমারটা কখন চন্দ্রমল্লিকা?

চন্দ্রমল্লিকা : তোমার?—তুমি আবার কী করবে?

গ্যাঁদা : বা:, আমায় একটু নাচতে-গাইতে দেবে না।

বেল : কি?

চন্দ্রমল্লিকা : পিসি নাচতে-গাইতে চায়।

রজনীগন্ধা : সর্বনাশ! পিসির কি মাথা খারাপ হয়ে গেল। নাচ-গান করবার মতো পিসির আছে কী? না-গুণ, না-রূপ।

গ্যাঁদা : কী? ভালো তিরিঙ্গে লম্বা হলেই কি রূপ উছলে পড়ল, না? আমার রূপ নেই—রূপ আছে তোর মতন লাঠির ডগায়।

রজনীগন্ধা : খবরদার, লাঠির ডগা বলবে না বলে দিচ্ছি! বেঁটে খুটখুটে। পাশাপাশি বেড়ে খুব খানিকটা গোল থকথকে হলেই বুঝি রূপ উছলে পড়ল?

গোলাপ : কী আরম্ভ করলে তোমরা? রজনীগন্ধা তুমিও! ছি, তুমি না আমার মন্ত্রী।

রজনীগন্ধা : অপরাধ হয়ে গ্যাছে মহারানি। আর কখনো হবে না। কিন্তু এ হলদে বুড়িকে সাবধান করে দিন।

গ্যাঁদা : আমি বেঁটে থকথকে। আমি হলদে বুড়ি। হে ভগবান—আর কখনো এখানে থাকব না। আমি চলে যাব। পুজোবাড়িতেই চলে যাব। আমার এখানে আসাই অন্যায় হয়েছে। রূপের গরবে গরবিনিদের সভায় কেন আসতে গেলুম রে—

[গ্যাঁদা কাঁদতে লাগল।]

বেল : ছি পিসি—আজকের দিনে কাঁদো?

করবী : চুপ করো পিসি—

জুঁই : ও পিসি তোমার কান্না দেখে আমারও যে কান্না পাচ্ছে গো।

বেল : চুপ পিসি, শিগগির চুপ করো। যাও বা সেজেগুজে একটু ভালো দেখাচ্ছে, চোখের জলে পাপড়িগুলো ভেজালে একটা জলে ভেজা বেড়ালের মতো দেখাবে।

গোলাপ : চুপ, চুপ করো সবাই। গ্যাঁদা, এদিকে এসো। বেলার পরই তোমার নাচ-গান, ফুলের রাজত্বে সবাই সমান। কেউ কারো চেয়ে হীন নয়, ছোটো নয়, অধিকার সবারই সমান। ফুল, সেযে ফুলই হোক, আনন্দ দেয় জগৎকে, কাজেই তার নিজের আনন্দে বাধা দিতে কেউ পারে না।

[এমন সময় অপরাজিতা ঢোকে।]

অপরাজিতা : সত্যি কথা?

গোলাপ : কে তুমি?

অপরাজিতা : আমায় চিনতে পারছেন না মহারানি।

গোলাপ : না তো, কোথায় তোমায় দেখেছি বলো তো?

অপরাজিতা : আমায় আপনি নাও দেখতে পারেন মহারানি। আমায় আসা-যাওয়া যেখানে, সেখানে তো আপনি যেতে পারেন না।

রজনীগন্ধা : কে তুমি? তোমার আস্পর্ধা তো কম নয়। রানির সঙ্গে কেমনভাবে কথা কইতে হয়—জানো না?

গ্যাঁদা : ও অপরাজিতা।

গোলাপ : অপরাজিতা! কী চাও এখানে?

অপরাজিতা : জিজ্ঞেস করছিলাম, এখুনি যা বলছিলেন তা কি সত্যি কথা?

গোলাপ : কোন কথা?

অপরাজিতা : ফুলের রাজত্বে সবাই সমান। কেউ কারো চেয়ে হীন নয়, ছোটো নয়।

গোলাপ : নিশ্চয়ই। অতি সত্যি কথা। ফুলেদের মধ্যে জাতিভেদ নেই। বাদ বিসংবাদ নেই—

রজনীগন্ধা : তবে তোমায় উৎসবে নেওয়া যেতে পারে না অপরাজিতা। কারণ তোমার কাজ আলাদা, তাই জাতিও আলাদা, হাসি-গানে তোমার কোনো জায়গা নেই।

অপরাজিতা : সেআমি জানি। নিজের কথা বলতে আমি আসিওনি, কোন ফুলের হাসি-গানে, আনন্দে অধিকার আছে আমি শুধু জানতে চাই।

গোলাপ : যে ফুল শুধু ফুল...শুধু চোখকে তৃপ্তি দেওয়া যার কাজ নয়, যে ফুল মানুষের মনে এনে দেয় এমন এক আনন্দ যা তাকে জীবনের দুঃখ-ব্যথা ভুলিয়ে দেয়—

অপরাজিতা : তবে আমার সঙ্গিনীটিকে আজকের উৎসবে আপনাদের সঙ্গে নিন।

রজনীগন্ধা : কে তোমার সঙ্গিনী। কোথায় সে?

অপরাজিতা : আমার সঙ্গেই এসেছে। (পিছন ফিরে) শোনো, এসো তুমি।

[ভীরু কুন্ঠিত পদে একটি নাম না জানা ফুল ঢোকে। ইতস্তত চায়। নানা বর্ণের ফুলের সমারোহে সেবিভ্রান্ত, নিজের সামান্য বেশবাসের জন্য লজ্জিত।]

অপরাজিতা : এই আমার সঙ্গিনী। প্রাচীরের এক কোণে নিজের মনে ফুটে উঠেছে, আবার হয়তো দু-একদিনেই শুকিয়ে ঝরে যাবে। ফুলের জগতে একে প্রবেশাধিকার দিন।

চন্দ্রমল্লিকা : কোথায় ফুটেছে বললে?

অপরাজিতা : প্রাচীরে এককোণে—

[অন্য ফুলেরা সকলে হেসে ওঠে।]

গ্যাঁদা : এ আবার এখানে কেন? এই, নাম কী তোর?

ফুল : আমি তো জানি না।

বেল : ও মা, নাম নেই এর।

জুঁই : কে ফুটিয়েছে তোমায় ভাই?

ফুল : কেউ ফোটায়নি তো। আমি তো নিজেই ফুটে উঠেছি।

বেল : বুঝেছ, কত বড়ো ফুল নিজেই ফুটেছে—

করবী : আমাদের দিন গেল—এবার এই রকম সমস্ত ভালো ভালো ফুলেরা নিজেরা ফুটতে আরম্ভ করলেই হয়েছে আর কী! মানুষেরা কি ভুলেও আমাদের দিকে তাকাবে?

[অন্য ফুলেরা সকলে হেসে ওঠে।]

রজনীগন্ধা : চুপ, চুপ করো সবাই! অপরাজিতা তোমার তো আস্পর্ধা কম নয়। কোথাকার নাম না জানা প্রাচীরের গায়ে ফুটে ওঠা এক ফুলকে উৎসবে নিয়ে এসেছ!

অপরাজিতা : কিন্তু তবু এ ফুল তো। শুধু ফুটে ওঠাতেই তো এর আনন্দ—

চন্দ্রমল্লিকা : হোক ফুল। মানুষকে আনন্দ দেবার কী ক্ষমতা আছে ওর! নিজের মনেই ফুটে উঠেছে আবার নিজের মনেই ঝরে পড়ে যাবে। ওর দিকে তাকাবার অবসর কোনো মানুষের হবে কি?

অপরাজিতা : কিন্তু তা কি ওর দোষ চন্দ্রমল্লিকাদি। ও ফুটে উঠেছে ওর সাধ্য মতো। মানুষকে আনন্দ দিতেই চেয়েছে ও। মানুষের যদি ওকে দেখবার সময় না থাকে ওর ফুলজন্ম কি বৃথা যাবে?

ফুল : হয়তো মাত্র দু-দিন আমি থাকব—হয়তো আর কখনো জন্মাবও না।

বেল : কখনো না জন্মালেও কোনোদিন ক্ষতি ছিল না।

জুঁই : কে বা কষ্ট করে তোমায় জন্মাতে বলেছে বাবা?

গ্যাঁদা : জন্মে তুমি ফুলের জগতে কী এমন বিরাট উপকার করলে?

ফুল : দয়া করুন। শুধু আজকের উৎসবের রাতটি আমায় সঙ্গে নিন। নিজেকে ফুল বলে চিনতে দিন আমায়।

রজনীগন্ধা : না না! পাগলামির জায়গা পেলে না। যাও অপরাজিতা, ওকে নিয়ে যাও। আর তোমাকে বলে দিচ্ছি এমন করে যাকে-তাকে উৎসবের মাঝে এনে সব পন্ড করার চেষ্টা করলে কঠিন শাস্তি দেওয়া হবে তোমাকে।

অপরাজিতা : আমায় শাস্তি দেওয়ার ক্ষমতা তোমাদের কারোরই নেই। মহারানি আপনারও কি তাই ইচ্ছে, ফিরে যাবে এই ছোট্ট নাম-না-জানা ফুলটি।

গোলাপ : হ্যাঁ অপরাজিতা—ফিরে যাবে।

অপরাজিতা : কিন্তু একটু আগে যে বললেন ফুলের কোনো ভেদাভেদ নেই।

গোলাপ : সেকথা ফুলেদের সম্বন্ধেই খাটে অপরাজিতা। বুনো লতাপাতার গায়ে তো অনেক কিছুই গজায়, সবই কি ফুল?

অপরাজিতা : কেন নয় মহারানি? অতি যত্নে বাগানের মাঝখানে যে ফুলটি তোলা হয় সেও যেমন ফুল...অযত্নে সকলের অবহেলায় প্রাচীরের গায়ে যে ফুলটি আপনি ফুটে ওঠে, সেও তেমনি ফুল। সূর্যের করুণা থেকে তো কেউ বঞ্চিত নয় মহারানি।

গোলাপ : তা হয় না অপরাজিতা। ওর কোনো বংশ পরিচয় নেই। ওর জীবনও একটুখানির জন্য। এত ভালো ভালো ফুলের মধ্যে আসবার যোগ্যতা ওর কোথায়?

অপরাজিতা : ও যে ফুল হয়ে ফুটে উঠেছে সেইটেই কি ওর একমাত্র যোগ্যতা নয়?

গ্যাঁদা : না, না! এতবার করে বলা হচ্ছে, বুঝতে পারছ না। ঠাকুর-দেবতার সঙ্গে থেকে থেকে তুমি বড্ড একগুঁয়ে হয়ে গেছো অপরাজিতা। শিগগির নিয়ে যাও ওকে।

করবী : ওঃ আজকের রাতটাই মাটি! ভোর হয়ে এল। সূর্যদেব উঠলেই খাবারের জন্য দৌড়াদৌড়ি করতে হবে। আর কোনো কাজই হবেনা।

চন্দ্রমল্লিকা : যাও অপরাজিতা, তোমার ওই ফুল না ফুলের কুঁড়ি ওকে নিয়ে বিদেয় হও। আর আমাদের সময় নষ্ট কোরো না।

অপরাজিতা : ভাই।

ফুল : কিন্তু অপরাজিতা। ফুলের উৎসবে না আসতে পারলে আমার যে আর ফুল হয়ে ওঠা হবে না। এমনি করে ফিরে গেলে আমার ফুটে ওঠা যে ব্যর্থ হয়ে যাবে।

অপরাজিতা : মহারানি দয়া করুন। ওকে ফুলের জীবনের আনন্দ থেকে বঞ্চিত করবেন না।

রজনীগন্ধা : আঃ জ্বালিয়ে মারলে! জবা—

[জবা ঢোকে।]

এরা ভেতরে এল কী করে?

জবা : ফুল বলে আমি পথ ছেড়ে দিয়েছি।

রজনীগন্ধা : ফুল! এরা ফুল? তুইও কি চোখের মাথা খেয়েছিস? বার করে দে এদের।

জবা : চলো বোন।

অপরাজিতা : জবা, তুমিও।

জবা : আমার কোনো উপায় নেই অপরাজিতা। আমি জানি, সব জানি, সব। তবু আমি ফুলের রাজত্বের প্রহরী। আমার কর্তব্য আমাকে করতে দাও।

ফুল : মহারানি—

[ফুল গোলাপের পায়ের কাছে পড়ে।]

রজনীগন্ধা : (জবাকে) হাঁ করে দেখছ কী? নিয়ে যাও।

[জবা ধীরে ধীরে ফুলকে তোলে। আস্তে আস্তে বাইরে নিয়ে যায়।]

অপরাজিতা : মহারানি। ফুল হয়ে ফুলকে স্বীকার করে নিলেন না। এর ফল কি ভালো হবে?

রজনীগন্ধা : তোমায় উপদেশ দিতে হবে না।

অপরাজিতা : না, আমি যাচ্ছি। তবে এত বড়ো অপরাধ, ফুলের রাজত্বে এত বড়ো অবিচার সূর্যদেব মামা কি সহ্য করবেন!

[অপরাজিতা চলে যায়]

চন্দ্রমল্লিকা : ওঃ আজ রাতে কার মুখ দেখে উঠেছিলাম! আবদার দেখো। কচু ঘেঁচু সব ফুল এনে ফুলের উৎসবে ঢোকাচ্ছে...ফুলের উৎসবের মান থাকে এতে!

রজনীগন্ধা : যেতে দাও। এরপর কী আছে দেখো।

বেল : কথা তো হয়েই আছে—এরপর আমার নাচ।

গোলাপ : হ্যাঁ, বেলার নাচ। বেলার নাচের পরই আজকের উৎসব শেষ হবে।

গ্যাঁদা : আমার!

জুঁই : তোমারটা এবারের মতো তোলা থাক পিসি।

করবী : হত...তোমারটাও হত। তোমার নাচ না দেখে কিছুতেই ছাড়তাম না। তবে ওই অপরাজিতা দু-বার কী রকমভাবে সময় নষ্ট করে দিলে দেখলে তো।

গোলাপ : চুপ করো সকলে। বেলা নাচ আরম্ভ করো। আর সূর্য ওঠার সময় যখন হয়ে গেছে তখন সূর্যবন্দনা নাচটাই নাচো। সূর্যের আনন্দ কিরণ ছড়িয়ে পড়ুক প্রতিটি ফুলের অন্তরে।

[বেলা নাচ-গান আরম্ভ করে—আগুনের পরশমণি....নাচ একসময় শেষ হয়। সূর্য ওঠার কোনো লক্ষণই দেখা যায় না। ফুলেদের মধ্যে চাঞ্চল্য জাগে।]

রজনীগন্ধা : এ কী! এখনও কি সূর্য ওঠার সময় হয়নি?

চন্দ্রমল্লিকা : না, বোধ হয় সূর্যদেব এখন একটু দেরিতেই ওঠেন।

করবী : কিন্তু কাল তো এর চেয়েও আগে উঠেছেন।

জুঁই : বেলাদির নাচ কি সূর্যদেবের মনের মতন হয়নি।

বেল : হ্যাঁ! তুমি বললেই হয়নি। এই নাচ নেচে নেচে হদ্দ হলুম আর আজ তুমি আমাকে শেখাবে।

গোলাপ : কিন্তু সত্যিই তো সূর্য কেন উঠলেন না এখনও!

জুঁই : আমার মনে হয় বেলাদির নাচ ঠিক হয়নি। যদি অনুমতি করেন মহারানি, আমি একবার চেষ্টা করে দেখতে পারি।

বেল : তুমি—তুমি নাচের জানো কী?

রজনীগন্ধা : বেশ তো...বলছে যখন একবার চেষ্টা করে দেখতে দোষ কী?

চন্দ্রমল্লিকা : দ্যাখোই না জুঁই...একবার চেষ্টা করে।

[জুঁই নাচে—তালের নাচ। শেষ হয় তবু সূর্য ওঠার লক্ষণ দেখা যায় না।]

বেল : আমি জানতাম—নাচে আমার কোনো দোষ নেই। আর কেউ চেষ্টা করে দেখবে নাকি?

গোলাপ : না, আর কারোর চেষ্টা করার দরকার নেই। আমার মনে হয় মহা সর্বনাশ হয়েছে! সূর্য আর উঠবেন না।

রজনীগন্ধা : সেকী! সেযে দারুণ বিপদের কথা! সূর্য না উঠলে আমরা বেঁচে থাকব কী করে?

গ্যাঁদা : হে ভগবান, কী সর্বনাশ হল রে?

বেল : চুপ পিসি! কাঁদা-কাটা করলেই কি আর বিপদ থেকে উদ্ধার পাওয়া যায়!

করবী : কিন্তু কী করা যায়?

জুঁই : জবাকে ডেকে জিজ্ঞেস করলে হয় না। সেতো অনেক কিছুই জানে।

রজনীগন্ধা : জবা আবার বলবে কী?

চন্দ্রমল্লিকা : আমার পাপড়িগুলো কেমন যেন কুঁকড়ে আসছে।

রজনীগন্ধা : আমারও।

করবী : খিদেয় আমার সমস্ত নাড়িভুঁড়ি জ্বলে যাচ্ছে।

জুঁই : আমার সমস্ত শরীর আগুনে জ্বলে যাচ্ছে।

বেল : মহারানি, আর বুঝি টিকে থাকা যায় না।

গোলাপ : আমাদের সৌরভ?

সকলে : নেই, নেই—

গোলাপ : জবা, জবা—

[ছুটে জবা ঢোকে।]

গোলাপ : কোথায় কী হয়েছে জানাও, ফুলের রাজত্বে কোথাও কোনো অমঙ্গল দেখা দিয়েছে?

রজনীগন্ধা : সূর্যদেব কেন উঠছেন না জবা?

গ্যাঁদা : বাঁচাও, আমাদের বাঁচাও। ফুলের রাজত্ব শুকিয়ে যাচ্ছে জবা।

জবা : মহারানি ফুলের চোখে জল পড়ছে।

গোলাপ : ফুলের চোখে জল!

রজনীগন্ধা : জল!

চন্দ্রমল্লিকা : কোথায়?

জবা : সেই প্রাচীরের গায়ে। নাম-না-জানা ফুলটির চোখ দিয়ে জল পড়ছে।

গোলাপ : কিন্তু সেতো ফুল নয়। তার চোখ দিয়ে জল পড়লে অমঙ্গল কেন?

জবা : ফুল বই কী মহারানি। ফুলের জীবন নিয়েই যে তার জন্ম। যতটুকু জীবনই হোক। ফুল ছাড়া আর কী হতে পারে সে। তার দুঃখ-বেদনা সূর্যদেবকে স্পর্শ করবেই। তাঁর কাছে তো ছোটো-বড়ো কোনো ভেদাভেদ নেই।

গোলাপ : কিন্তু কী করতে পারি এখন? কোথায় তাকে পাওয়া যাবে এখন?

চন্দ্রমল্লিকা : যেমন করে পারো জবা তাকে এখানে এনে দাও।

রজনীগন্ধা : আমরা অন্যায় করেছি। আমরা তাকে অপমান করে নিজেদেরই অপমান করেছি।

বেল : নিজেদের রূপের মোহে সেও যে ফুল আমরা তা ভুলে গিয়েছি।

করবী : আমাদের আর শাস্তি দিও না জবা। তাকে এনে দাও।

গোলাপ : জবা, শিগগির তাকে খুঁজে দেখো।

[অপরাজিতা ও ফুল ঢোকে।]

অপরাজিতা : খুঁজতে হবে না। সেএসেছে মহারানি।

[অন্য ফুলেরা তাকে টেনে নেয় নিজেদের মধ্যে।]

রজনীগন্ধা : এসো এসো ছোট্ট সোনা ফুল।

বেল : কিছু মনে কোরো না ভাই।

করবী : মানুষের সঙ্গে থেকে থেকে আমরাও মানুষদের মতো হয়ে গিয়েছিলুম।

জুঁই : আমাদের ক্ষমা করো ভাই।

গোলাপ : এসো, আমাদের ভোরের উৎসবে যোগ দাও।

জবা : ওই দেখুন মহারানি। সোনার রঙে দশদিক আলো করে সূর্যদেব দেখা দিচ্ছেন।

[সব ফুলেরা প্রণাম করে।]

অপরাজিতা : আমি তবে আসি মহারানি?

গোলাপ : না, না, অপরাজিতা। তুমি চলে যেও না। তুমি না থাকলে আমাদের ভোরের উৎসব জমবে না, অপরাজিতা।

অপরাজিতা : তা তো হয় না মহারানি। হাসি-গানে আমার জায়গা নেই। আমি যে অনেক দূরে থাকি মহারানি।

গোলাপ : অপরাজিতা!

অপরাজিতা : দুঃখ করবেন না মহারানি। আমাকে এখান থেকে চলে যেতেই হবে। ফুলের আনন্দের হাটে আমার জায়গা নেই। আমার পুজোয় আনন্দ আছে। কিন্তু যেসব তুচ্ছ ফুলের রূপ বর্ণ গন্ধ কোনো আনন্দই নেই, দেবতার নৈবেদ্যেও যারা জায়গা পায় না...তাদের মতো হতভাগ্য আর কে আছে। এই যে ছোট্ট ফুল যারা দু-দিনের জন্য ফোটে আবার নিজের মনেই শুকিয়ে যায়, তাদের অবহেলা করবেন না। তাদের কাছে টেনে নিয়ে ফুল বলে স্বীকার করবেন। মনে রাখবেন, সূর্যদেবের অনুগ্রহ থেকে ফুলের রাজত্বে কেউ বঞ্চিত নয়।

[অপরাজিতা চলে যায়।]

জবা : যে কয়েক মুহূর্ত সময় আছে, আপনারা নিশ্চিত উৎসব করুন মহারানি। আমি বাইরে পাহারা দিচ্ছি।

গোলাপ : আমাদের সৌরভ?

ফুলেরা : আছে, আছে।

[নাচে-গানে মেতে ওঠে ফুলের দল—ঝরো ঝরো ঝরো ঝরো, ঝরো রঙের ঝরনা। আলো কমে আসে।]

সকল অধ্যায়
১.
ছাত্রের পরীক্ষারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২.
পেটে ও পিঠেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩.
বেচারাম কেনারামউপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
বৃক ও মেষ পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫.
কাক ও পনীর পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬.
লক্ষ্মণের শক্তিশেল সুকুমার রায়
৭.
অবাক জলপান সুকুমার রায়
৮.
কাজির বিচারকাজী নজরুল ইসলাম
৯.
রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা কাজী নজরুল ইসলাম
১০.
ঝড়ের দিনেসুনির্মল বসু
১১.
আলোলীলা মজুমদার
১২.
দরদিদিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩.
যেদিন জাগবে মুকুল বিমল ঘোষ
১৪.
ভীম বধনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১৫.
বহুরূপীদেবনারায়ণ গুপ্ত
১৬.
গুপীগাইন বাঘাবাইন সত্যজিৎ রায়
১৭.
দত্যি দানোর ছানাশৈলেন ঘোষ
১৮.
সৌরভবৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়
১৯.
শ্রেয়সী অমল রায়
২০.
বোকা বাঘের ছানাড. পার্থপ্রতিম পাঁজা
২১.
রাক্ষসের সঙ্গে টক্কর ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%