ভীম বধনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়

পার্থ প্রতিম পাঁজা

চরিত্র: কালুদা, হারাধন, নিমাই, নিখিল, প্রম্পটার, পান্নালাল।

প্রথম দৃশ্য

[একটা থিয়েটারের মঞ্চ। পেছনে একটা জঙ্গলের সিন খাটানো। ডিরেক্টর মানে নাটকের পরিচালক কালুদা খুব ব্যতিব্যস্ত হয়ে এসে ঢুকল। তাকিয়ে দেখলে চারদিক, আর কাউকে না দেখে রেগে চিৎকার করে উঠল]

কালুদা : হবে না—থিয়েটার হবে না। এই সমস্ত গোবর-গণেশকে দিয়ে কখনো প্লে হয়? আজ হবে না থিয়েটার—হতে পারেই না।

[হারাধনের প্রবেশ]

হারাধন : কী হয়েছে কালুদা? অত চেঁচাচ্ছ কেন?

কালুদা : চেঁচাব না? বলি হারাধন, ওটা কী সিন টাঙিয়েছ—শুনি?

হারাধন : কেন—চমৎকার অরণ্যের দৃশ্য বানিয়ে রেখেছি।

কালুদা : অরণ্য? তোমার মুন্ডু! তুমি একটি গবেট। বুঝেছ? নির্জলা গবেট।

হারাধন : কেন? সিনটা দেখতে বেশ। কত মনোরম তরুলতা—কত কুসুম ফুটে রয়েছে—শাখায় শাখায় কত কোকিল সুমধুর স্বরে—

কালুদা : (চেঁচিয়ে) শাট আপ! (ভেংচে) ‘তরুলতা—কুসুম—কোকিল সুমধুর’ স্বরে! বলি, কুরুক্ষেত্রের রণভূমিতে অরণ্য কোত্থেকে এল—অ্যাঁ? আর তা ছাড়া দ্বৈপায়ন হ্রদ-ই বা গেল কোথায়? দুর্যোধন লুকিয়ে কোথায় বসে থাকবে—শুনি?

হারাধন : এই নাও—কথা শোনো একবার। আমি হ্রদ কোথায় পাব? স্টেজ কেটে আমি হ্রদ তৈরি করব নাকি? বলো তো একটা পুরোনো গঙ্গাজলের ট্যাঙ্ক নিয়ে আসি। তারমধ্যে দুর্যোধন ঘাপটি মেরে বসে থাকবে।

কালুদা : ইয়ার্কি পেয়েছিস—না? (রেগে) গেট আউট—দূর হ সামনে থেকে!

[হারাধন চলে গেল]

যা-হোক, ওই অরণ্য দিয়েই চালিয়ে নিতে হবে এখন। লোকে ধরে নেবে দুর্যোধন জঙ্গলের মধ্যে পালিয়ে বসেছিল! কিন্তু আর সব হতচ্ছাড়া গেল কোথায়? এই সিনটাতেই দেখছি সব মাটি করে দেবে—একদম ভালো রিহার্সাল হয়নি। (চেঁচিয়ে) এই নিমাই—এই পটলা—

[একমুখ দাড়ি লাগিয়ে গায়ে যাত্রার দলের মতো পোশাক পরে নিমাইয়ের প্রবেশ। কালুদা ভীষণ চমকে গেল।]

কালুদা : আরে এটা কে রে?

নিমাই : আমি নিমাই।

কালুদা : নিমাই! তা বেশ, কিন্তু কীসের পার্ট করছ তুমি? ধৃতরাষ্ট্রের?

নিমাই : ধৃতরাষ্ট্র কেন হবে? আমি ভীম।

কালুদা : ভীম? তাহলে জগঝম্প দাড়ি লাগিয়েছিস কেন? কে তোকে বলেছে, ভীমের অমন বাবর শা-র মতো দাড়ি ছিল?

নিমাই : বা রে! দাড়ি গজাবে না? কদ্দিন ধরে কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধ চলেছে। দিন নেই, রাত নেই—খালি যুদ্ধ। এরমধ্যে ভীম কখন দাড়ি কামাবে শুনি? পরামানিক পাবে কোথায়?

কালুদা : এঃ—এঃ! খুব যে পন্ডিত হয়ে গেছিস! ভীম দাড়ি কামাবে কেমন করে? কেন, অর্জুন বাণ দিয়ে মেজদার দাড়ি কামিয়ে দেবে!

নিমাই : বাণ দিয়ে?

কালুদা : হ্যাঁ—হ্যাঁ—বাণ দিয়ে। অমন ভীষ্মকে শরশয্যায় শুইয়ে দিতে পারল, আর দাদার দাড়ি কামাতে পারবে না? খোল, খুলে আয় এক্ষুনি।

[শ্রীকৃষ্ণের বেশে নিখিলের প্রবেশ]

নিখিল : কালুদা, দ্যাখো তো সাজ কেমন হল?

কালুদা : আহা—খাসা! এখন গিয়ে কদম্ববৃক্ষে উঠে বসলেই হয়! এই নিখলে, হাতে যেন আবার বাঁশি নিয়েছিস বড়ো?

নিখিল : বা:—শ্রীকৃষ্ণের হাতে বাঁশি থাকে না?

কালুদা : এ কী বৃন্দাবনের বন পেলি যে, বেণু বাজিয়ে ধেনু চরাবি? এসব অপোগন্ডকে দিয়ে তো আচ্ছা প্যাঁচে পড়া গেল। কুরুক্ষেত্রে শ্রীকৃষ্ণের হাতে কী ছিল মনে নেই? ‘শঙ্খচক্র’।

নিখিল : শাঁখ দিয়ে কী হবে? আমি বাজাতে পারি না।

কালুদা : চোপরাও! খালি পাকামো শিখেছিস। শাঁখ না হল, একটা চক্র তো দরকার।

নিখিল : চক্র আমি নিয়ে এসেছি। দাদার সাইকেলের একটা টায়ার।

কালুদা : কী? সাইকেল টায়ার! ইচ্ছে হচ্ছে তোকে আমি ফায়ার করি।

[নিমাইয়ের দিকে তাকিয়ে কালুদা বলে—]

তুই যে তখন থেকে ‘হাঁ’ করে দাঁড়িয়ে আছিস? তোকে বললুম না ওই মোগলাই দাড়ি খুলে আসতে?

নিমাই : তুমি তখন থেকে কেবল আমার দাড়িই দেখছ। আর নিখলে কেষ্ট সেজেছে, তার জুতো বুঝি তোমার চোখে পড়েনি?

কালুদা : আরে হ্যাঁ—তাই তো! এ যে ডার্বি জুতো, নিখলে?

নিখিল : আমার পা মচকে গেছে। অন্য জুতো পরলে লাগে।

কালুদা : তাই বলে ওই জুতো? তুই পাগল, না আমি পাগল?

নিমাই : দু-জনেই।

কালুদা : শাট আপ! যা, খোল জুতো!

নিমাই : খালি পায়ে নেংচে হাঁটতে হবে আমাকে?

কালুদা : তাই হাঁটবি। নেংচে নেংচেই হাঁটবি।

নিখিল : শ্রীকৃষ্ণ খোঁড়া হয়ে হাঁটবে? লোকে যে—

কালুদা : লোকে যা বলে আমি বুঝব। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে আহত হয়েছে, তাই খুঁড়িয়ে চলছে। হল তো? যা এখন। নিমাই, তুমিও যাও দাড়ি খোলো তো—

নিমাই : খুলছি। কিন্তু একটা কথা বলব কালুদা?

কালুদা : বল চটপট!

নিমাই : আমি বলছিলাম কী—এই থিয়েটারের পর পাঁচ বছর আমাদের কাউকে আর জুতো কিনতে হবে না।

কালুদা : মানে?

নিমাই : মানে এই থিয়েটার দেখে লোকে এত জুতো ছুড়বে যে তাতেই—

কালুদা : অ্যাঁ—মশকরা? ঠাট্টা হচ্ছে আমার সঙ্গে? গেট আউট!

[নিমাই আর নিখিলের পলায়ন]

শেম! এদের নিয়ে থিয়েটার করতে হবে? এর চাইতে যদি দলবল নিয়ে খোল করতাল বাজিয়ে হরি সংকীর্তন গাইতুম, তাহলেও অনেক বেশি যশ হত। ছ্যা:!

[পেঁচার মতো মুখ করে দুর্যোধনবেশী গাঁট্টাগোট্টা পান্নালালের প্রবেশ।]

তোমার আর হাঁড়ির মতো মুখ কেন হে পান্নালাল? পেট কামড়াচ্ছে? আমি দেখছি শেষপর্যন্ত তুইই ডোবাবি। তখন তোকে এত করে বললুম, এত তেলেভাজা খাসনি—খাসনি। তা—

পান্নালাল : (খ্যাঁচ—খ্যাঁচ করে) পেট কামড়াচ্ছে কে বললে তোমায়?

কালুদা : তাহলে? অমন তালের আঁটির মতো চেহারা করবার মানে কী?

পান্নালাল : কালুদা, আমি থিয়েটার করব না।

কালুদা : থিয়েটার করবি না—মানে?

পান্নালাল : মানে করব না।

কালুদা : বা:—বা:! রসিকতার সময়টি তো পেয়েছ ভালো। একটু পরে থিয়েটার আরম্ভ হবে। তুমি দুর্যোধন, তোমার ঊরুভঙ্গ নিয়ে নাটক, এখন বলছ কিনা পার্ট করব না।

পান্নালাল : দুর্যোধন বলেই করব না।

কালুদা : জ্বালাসনি বলছি পেনো! এমনিই আমার মেজাজ এখন বেজায় খারাপ। ‘খ্যাঁক-খ্যাঁক’ করে এখন আমি যাকে-তাকে কামড়ে দিতে পারি। কী হয়েছে তোর?

পান্নালাল : ওই নিমাই তাহলে ভীমের পার্ট করবে?

কালুদা : নির্ঘাত।

পান্নালাল : আর আমি দুর্যোধন?

কালুদা : নি:সন্দেহে।

পান্নালাল : অসম্ভব!

কালুদা : মানে?

পান্নালাল : মানে আবার কী? নিমাইকে তো আমি এক ল্যাং মেরে পটকে দিতে পারি। আর ওই শুঁটকো ফড়িংটাই কিনা আমার ঊরুভঙ্গ করবে! মহাভারত-টহাভারত আমি বুঝি না। মোদ্দাকথা, ওই রোগাপটকা নিমেকে আমার ঊরুভঙ্গ করতে দেব না, কিছুতেই না।

কালুদা : কী মুশকিল! বলি, মামাবাড়ির আবদার পেলি? রিহার্সালের সময় বললি না কেন?

পান্নালাল : বলেছিলাম তো। তুমি তখন আমাকে ভুজুংভাজুং দিয়ে বোঝালে আমার নাকি হিরোর পার্ট। এখন দেখছি, সব বোগাস। আমি হিরো না ছাই। ঊরুভঙ্গ হয়ে আমি মাটিতে পড়ে হাহাকার করব, আর নিমে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তড়পাবে। জাঁক দেখাবে। উঁহু! ইম্পসিবল!

কালুদা : ইম্পসিবল! (দাঁত খিঁচিয়ে) দেখ পেনো, অনেকক্ষণ ধরে তোর বাঁদরামো সহ্য করেছি আমি! একটু পরে প্লে আরম্ভ হবে, আর এখন উনি এলেন ধ্যাষ্টামো করতে। যা রেডি হ শিগগির—নইলে এক চড়ে কান ছিঁড়ে দেব। বেরো—যা শিগগির গিরিন রুমে—

পান্নালাল : (খানিকক্ষণ গোঁজ হয়ে থেকে) আচ্ছা বেশ, দেখা যাবে।

[পান্নালাল বেরিয়ে গেল।]

কালুদা : এদের নিয়ে আমায় থিয়েটার করতে হবে। ছ্যা-ছ্যা! এর চাইতে যদি ঢোল বাজিয়ে ‘রামা হো রামা হো’ গাইতুম, তাহলেও নাম হত। যতসব বেকুবের কারবার!

[সামনের দিকে তাকিয়ে জিভ কেটে]

অ্যাঁ—মেলা অডিয়েন্স এসে গেছে রে। এই, ড্রপ ফেল, ড্রপ ফেল। প্লে আরম্ভ করতে হবে।

[আলো নিভল।]

দ্বিতীয় দৃশ্য

[আলো জ্বললে দেখা যায়, সেই অরণ্যই রয়েছে পেছনে। গদা হাতে দুর্যোধন অর্থাৎ পান্নালাল পায়চারি করছে।]

পান্নালাল : আজি লুকাইয়া হ্রদে,

কুরুক্ষেত্র রণ হতে পলাতক আমি।

না না—এ তো হ্রদ নয়, এ যে বনভূমি!

কালুদা বলিয়াছে মোরে।

[প্রম্পটার মঞ্চের পাশ থেকে গলা বের করল।]

প্রম্পটার : এই—কী বলছিস এ সমস্ত? ঠিকমতো পার্ট কর।

পান্নালাল : চোপরাও। আমি দুর্যোধন,

ভাঙিবে আমার ঊরু—

ওই নিমো?

হা:—হা:—হা:—পায় অট্টহাসি—

আসুক অর্জুন এইখানে একবার।

পাবে টের মজা কারে বলে!

[উত্তেজিত প্রম্পটার মঞ্চে প্রায় ঢুকে গেল।]

প্রম্পটার : এই পেনো, কী হচ্ছে? ভালো করে পার্ট বল শিগগির—

পান্নালাল : নিকালো হিঁয়াসে, মোরে দিবে উপদেশ। অর্বাচীন যত।

[শ্রীকৃষ্ণ সাজে খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিখিলের প্রবেশ।]

নিখিল : মহামানী দুর্যোধন—

এতদিনে বুঝেছ কি তুমি,

অধর্মের জয় নাহি হয়? বুঝেছ কি—

পান্নালাল : কে রে ওটা? খোঁড়া কেষ্টা? (হেসে)

খোঁড়া ল্যাং ল্যাং ল্যাং,

কার বাড়িতে গিয়েছিলি,

কে ভেঙেছে ঠ্যাং ? হা:—হা:—হা:।

প্রম্পটার : এই সেরেছে! দিলে সব ডুবিয়ে। এ পেনো, থাম—ওসব নয়—

পান্নালাল : কী—বার বার হাঁসের মতো করিস ‘প্যাঁক প্যাঁক’?

বহুক্ষণ সহিয়াছি তোর এ-ধৃষ্টতা রে বর্বর।

এইবারে পাবি সমুচিত প্রতিফল—

[প্রম্পটারের গলা ধরে টেনে পান্নালালের সজোরে পদাঘাত]

প্রম্পটার : ওরে বাপরে, গেলুম রে—মেরে ফেললে রে—

[বই আর বাঁশি ফেলে সবেগে প্রম্পটারের পলায়ন]

পান্নালাল : তারপর খোঁড়া-কেষ্ট? কী মতলবে হেথা আগমন?

নিখিল : (ফিসফিসিয়ে) মাইরি ভাই পান্নালাল—কী আরম্ভ করলি তুই? থিয়েটার যে মাটি হয়ে গেল! ওই দেখ—সামনে অডিয়েন্স হাসছে।

পান্নালাল : হাসুক—হাসুক যত খুশি।

আমি নাহি করি ভয়।

রাজা দুর্যোধন আমি—হাতে মোর গদা।

ওরে ল্যাং ল্যাং-খোঁড়া-কেষ্ট। কী বুঝাস মোরে?

নিখিল : (ফিসফিসিয়ে) আঃ—কী করছিস? ঠিকমতো বলে যা। নে আমি আরম্ভ করছি। (জোরে)

শোনো রাজা দুর্যোধন,

যত পাপ করিয়াছ—এবে তার হইবে বিচার।

ওই হের ধু-ধু জ্বলে রাশি রাশি লেলিহান শিখা—

ওই শোনো আর্তনাদ।

খেলিয়া কপট-পাশা পান্ডবেরে দিলে নির্বাসন,

মহাপাপ সঞ্চিলে কত না—

আজ তাই তোমারে অন্তিম দন্ড দিতে—

পান্নালাল : এঃ, খুব লেকচার দিচ্ছিস! তবু যদি খোঁড়া না হতিস। হেঁ হেঁ হেঁ হেঁ!

[টেনে টেনে হাসে পান্নালাল।]

নিখিল : (ফিসফিসিয়ে) মাইরি পেনো, খামোকা সব মাটি করে দিস নে! আমায় বলতে দে—(জোরে)

তোমারে অন্তিম দন্ড দিতে

ওই আসে ভীম সেন।

হও হে প্রস্তুত—

নামিছে তোমার পরে কালের বিচার।

[গদা হাতে ভীমের প্রবেশ।]

নিমাই : রে রে রে রে পামর!

এইবার কোথায় পালাবি? পাইয়াছি তোরে!

সমুচিত দন্ড দিব এবে।

আয় রণে—গদাযুদ্ধ করি তোর সনে।

পান্নালাল : হ্যাঁ হ্যাঁ, ওরে নিমে, এবার আমিও পেয়েছি তোকে।

হা রে রে রে রে—

গদাযুদ্ধ আমার সঙ্গে?

বোঝ ঠ্যালা!

[গদাম করে গদা দিয়ে পান্নালাল এক বিরাট ঘা বসাল নিমাইয়ের পিঠে।]

নিমাই : অ্যাঁ—এ কী! আমাকে মারলে যে বড়ো? এরকম তো কথা ছিল না?

পান্নালাল : চোপরাও—রোগাপটকা নিমে ভাঙিবে আমার ঊরু! (বিচ্ছিরি মুখ করে) অ্যাঁ—তোর মতো অনেক ভীমকে আমি গিলে খেতে পারি, বুঝেছিস?

যা—যা—

[পান্নালালের নিমাইকে গদা দিয়ে আর এক ঘা। নিমে ঠেকাতে গিয়েও পারল না—‘উঃ’ বলে চেঁচিয়ে উঠল।]

নিখিল : এ কী কান্ড! দুর্যোধন—এ কী ব্যবহার?

কথা আছে ভীম ভাঙিবে তব ঊরু।

তুমি কেন ভাঙিতেছ পিঠ তার,

কহ, কোন অধিকার বলে হেন কার্য করিতেছ?

পান্নালাল : ওঃ—তুমি আবার ওর হয়ে ওকালতি করতে এসেছ?

ওরে ওরে খোঁড়া কেষ্ট, ওরে ধড়িবাজ—

দাঁড়া তবে। দিব দেখাইয়া

কত ধানে কত চাল হয়।

[দড়াম করে পান্নালালের নিখিলের পিঠে গদাঘাত। গদার আঘাতে নিখিলের সবেগে পতন। এবং তার চাইতেও বেগে উত্থান।]

নিখিল : ওরে বাবা রে! কালুদা—

[খোঁড়াতে খোঁড়াতে নিখিলের দ্রুত প্রস্থান]

পান্নালাল : যা, নিয়ে আয় ডেকে—

তোর কালু-আলু-কলা-মুলো যা-যেখানে আছে—

সবারে করিব আমি ঠাণ্ডা,

খাইব চিবায়ে কচকচ।

এই ভীম সেন, পালাস কোথায়?

নিমাই : ছেড়ে দাও আমাকে। আমি আর গদাযুদ্ধ করব না তোমার সঙ্গে।

পান্নালাল : গদাযুদ্ধ করবি না—বললেই হবে? ভীম হয়েছিস না?

দাঁড়া এবে—

তোর যত লম্ফঝম্ফ—সমস্ত ওস্তাদি

এবার করিব শেষ—

[বলেই পান্নালাল গদা তুলে দমাদ্দম পিটতে শুরু করল নিমাইকে। দু-একবার ঠেকাতে চেষ্টা করে ভীম শেষে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর জুড়ে দিল পরিত্রাহি চিৎকার।]

নিমাই : কালুদা—বাঁচাও বাঁচাও! এই হতচ্ছাড়া পেনোটা ঠেঙিয়ে ঠেঙিয়ে আমাকে মেরে ফেললে—

পান্নালাল : রেখে দে তোর কেলো, ভুলো, কলা-মুলো—পিটিয়ে পিটিয়ে তোকে করে দেব তুলো—

[আবার পান্নালালের ধপাধপ গদাঘাত, নিমাইয়ের আর্তনাদ।]

নিমাই : কালুদা—কালুদা—

পান্নালাল : কালুকে করিব আমি আলুসেদ্ধ!

[কালুদা, প্রম্পটার, আরও দু-তিনজনের প্রবেশ]

কালুদা : ভয় নাই—ভয় নাই—ভীমবধ হতে নাহি দিব।

সৈন্যগণ—চেপে ধরো এই পাষন্ড দুর্যোধনের ঠ্যাং—

ফেলে দাও চিত করে

অবিলম্বে ভূমিতলে।

[সকলে মিলে পান্নালালকে ধরে ফেলল, তারপর ফেলে দিল মাটিতে। এরমধ্যে পান্নালাল বেশ কয়েক ঘা বসিয়েছে সকলকে, কালুদা তার গদাটা কেড়ে নিল।]

পান্নালাল : ছাড়ো—ছাড়ো—ধর্মযুদ্ধ করো—

এসো একে—একে,

সবে মিছে কেন ধরো ঠেসে?

[নিমাই তখন জুত পেয়ে দু-ঘা লাগাল পান্নালালকে।]

নিমাই : হা রে রে রে রে দুর্যোধন,

এবার কেমন লাগে?

পান্নালাল : স্তব্ধ হও কাপুরুষ! (চিৎকার করে) দেখলেন মশাইরা, দেখলেন? ব্যাটা ভীমকে দিয়েছিলুম ঠাণ্ডা করে—সবাই মিলে কীভাবে আমায় বিধ্বস্ত করলে—দেখলেন? এটা কীরকম ব্যভার হল, অ্যাঁ? ও মশাইরা, অডিয়েন্সের ভদ্রলোকেরা, দেখলেন তো একবার?

কালুদা : থাক—থাক, খুব হয়েছে! প্লে করতে এলুম ‘দুর্যোধনের ঊরুভঙ্গ’— বানিয়ে দিলে ‘ভীম-বধ’। এদের নিয়ে থিয়েটার মশাই? এর চাইতে খোল-করতাল নিয়ে যদি ‘কালী-কেত্তন’ গাইতুম, অনেক ফল হত এর চেয়ে। থিয়েটার এইপর্যন্তই থাক। এই ড্রুপ ফেল।

[আলো নেভে।]

সকল অধ্যায়
১.
ছাত্রের পরীক্ষারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২.
পেটে ও পিঠেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩.
বেচারাম কেনারামউপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
বৃক ও মেষ পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫.
কাক ও পনীর পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬.
লক্ষ্মণের শক্তিশেল সুকুমার রায়
৭.
অবাক জলপান সুকুমার রায়
৮.
কাজির বিচারকাজী নজরুল ইসলাম
৯.
রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা কাজী নজরুল ইসলাম
১০.
ঝড়ের দিনেসুনির্মল বসু
১১.
আলোলীলা মজুমদার
১২.
দরদিদিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩.
যেদিন জাগবে মুকুল বিমল ঘোষ
১৪.
ভীম বধনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১৫.
বহুরূপীদেবনারায়ণ গুপ্ত
১৬.
গুপীগাইন বাঘাবাইন সত্যজিৎ রায়
১৭.
দত্যি দানোর ছানাশৈলেন ঘোষ
১৮.
সৌরভবৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়
১৯.
শ্রেয়সী অমল রায়
২০.
বোকা বাঘের ছানাড. পার্থপ্রতিম পাঁজা
২১.
রাক্ষসের সঙ্গে টক্কর ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%