পার্থ প্রতিম পাঁজা
চরিত্র: পিসি, শম্ভু, নিতাই, গুরুমশাই, কথক,
এ ছাড়া বেড়াল, পেঁচা (হুতুম, লক্ষ্মী), গাছ, বনবেড়াল, মনসাঝোপ, বাদুর।
কথক : বারো বছর বয়স হল, তবু শম্ভুর মন থেকে ভয় যায় না। বনের ধারে শম্ভুর দাদুর ঘর, তার চারদিকটি ভয় দিয়ে ঘেরা। দিনের বেলাতে বনের ভেতর ছায়া ছায়া সড়াৎ সড়াৎ, নিঝুম চুপচাপ। সারারাত বনের মধ্যে কীসের চলাচলের-শব্দ-খসখস, ফসফস, মটমট, ফোঁসফোঁস। পাতার ফাঁক দিয়ে বাতাস বয় শোঁ-শোঁ। চোখে কিছু দেখা যায় না, সব অন্ধকারের আলকাতরা মেখে অদৃশ্য হয়ে থাকে; তারই মধ্যে মাঝে মাঝে এক-এক জোড়া চোখ জ্বলে ওঠে দপ করে, লাল, সবুজ, নীল, তার রং। আর শম্ভু ভয়ে কাঠ হয়ে যায়। গাছের ডালে কীসের যেন ডানা ঝাপটায় ঝাপুড়-ঝুপুড়! শম্ভু দু-কানে আঙুল দিয়ে মাথার ওপরে চাদর টেনে চুপ করে শুয়ে থাকে। দাদুর কথায় ভয় ভাঙে না! পিসির আদরে মন মানে না। দিনের বেলায় গুরুমশায়ের পাঠশালার সবচেয়ে যে দুরন্ত ছেলে, রাতে সেহয়ে যায় ভয়ে কাদা। একদিন ঝোড়ো-সন্ধেবেলায় পিসি ভেবে ভেবে সারা।
পিসি : ও শম্ভু, অন্ধকার হয়ে গেল, এই ঝড় উঠল বলে, কিন্তু তোর দাদু তো এখনও ফিরল না। যা বাবা লণ্ঠনটা নিয়ে একটু এগিয়ে গিয়ে দেখ।
শম্ভু : ও বাবা। সুয্যি ডুবে গেছে কতক্ষণ! সেআমি পারব না। দাদু এক্ষুনি এসে পড়বে দেখো।
পিসি : কী জানি বাবা, এতরাত তো সেকখনো করে না। একবারটি যা, বাপ।
শম্ভু : আমার—আমার বড়ো ভয় করে।
পিসি : কীসের ভয়, শম্ভু?
শম্ভু : বনের ভয়, অন্ধকারের ভয়।
পিসি : ও কী কথা, শম্ভু ? যে-বন আমাদের খাওয়ায় বা পরায়, যেখান থেকে আমার বুড়ো বাবা গাছগাছড়া, ওষুধ, আঠা, মধু খুঁজে আনে, সেযে আমাদের মা-বাপ, তাকে ভয় করলে চলবে কেন?
শম্ভু : তোমার ভয় করে না, পিসি, তুমিই যাও-না কেন, লণ্ঠন নিয়ে; আমি পারব না। অন্ধকারে আমার ভয় করে।
পিসি : (রেগে) আমার পায়ে বাত না থাকলে আমিই যেতাম। দেখি, একটু দোরটা খুলে দেখি।
[ক্যাঁচ করে দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের শব্দ ঘরে আসে। দুমদাম করে বাসনকোসন গড়িয়ে পড়ে।]
শম্ভু : (চিৎকার করে) ও কী করছ, পিসি, ঘরের চাল যে উড়িয়ে নেবে। বন্ধ করো, বন্ধ করো শিগগির।
[দুম করে দরজা বন্ধ করল]
পিসি : (কাঁদো কাঁদো সুরে) এই জল-ঝড়ে বুড়ো দাদু রইল বাইরে, আর তুই উনুনের পাশে আরামে বসে থাকতে পারছিস শম্ভু? (দরজায় ধাক্কা দেওয়ার শব্দ)
শম্ভু : খুলো না, খুলো না বলছি—পিসি, ও দাদুর ধাক্কা নয়, দাদু আস্তে আস্তে টোকা দেয়।
পিসি : না, আমি নিশ্চয় জানি তার কোনো বিপদ হয়েছে।
[দরজা খোলার সঙ্গে সঙ্গে ঝড়ের গর্জন ও দু-তিনজন লোকের পায়ের শব্দ]
নিতাই : আমাকে চিনতে পারছেন না, পিসিমা? আমি পাঠশালার নিতাই। দাদুকে গাছতলায় পড়ে থাকতে দেখে, আমিই গিয়ে গুরুমশাইকে ডেকে আনলাম।
পিসি : ও কী! কে তোমরা? বাবাকে অমন ধরাধরি করে আনছ কেন? বাবার চোখ বন্ধ কেন? ও গুরুমশায়, ভয়ে যে, আমার প্রাণ উড়ে যাচ্ছে।
নিতাই : ওঠ শম্ভু, দেখছিস-না আমি কেমন, জল-ঝড়ে বেরিয়ে পড়েছি? তোর অত ভয় কীসের?
গুরু : ভয় পাবেন না মা। দাদু গাছ থেকে পড়ে অচেতন হয়েছেন, বোধ হয় পায়ের হাড় ভেঙেছে। কোনো ভয় নেই, মা, আমি ওষুধ বলে দিচ্ছি। শম্ভু টোকা মাথায় দিয়ে এক দৌড়ে এনে দিক! দাদু ভালো হয়ে যাবেন। শম্ভু পিসির পিছনে লুকুচ্ছিস যে বড়ো? এদিকে আয়, ওষুধ আনতে হবে।
পিসি : ও ছেলেমানুষ—
গুরু : কীসের ছেলেমানুষ? বারো বছরের বুড়ো ছেলে! আমাদের যা করবার আমরা করেছি। এখন শম্ভু যাক, আপনাদের বাড়ির পিছনেই শুশনি পাহাড়। শুশনি পাহাড়ের মাথায় হাড়ভাঙা পাতার গাছ, আর পাথরের গুহাতে লাল মধু উপচে পড়ে পাথরের গা বেয়ে গড়াচ্ছে। ওই পাতা বেটে, মধুর সঙ্গে মিশিয়ে লাগিয়ে দিলেই ব্যথা সেরে যাবে। তবে সাবধান, দেরি করলে পা ফুলে ঢোল হয়ে যাবে। তখন ওষুধের গুণ ধরবে না। দু-ঘণ্টার মধ্যে ওষুধ লাগাতে হবে। আচ্ছা আমরা চললাম। শম্ভু বেরিয়ে পড়। জল-ঝড় কমে এসেছে। এই বেলা পথ ধর।
[দরজা খুলে প্রস্থানের শব্দ। দরজা বন্ধ।]
পিসি : ও কী রে শম্ভু মুখ ঢেকে শুয়ে পড়লি যে বড়ো? শুনলি-না দু-ঘণ্টার মধ্যে ওষুধ না লাগালে ওষুধের গুণ ধরবে না?
শম্ভু : না ধরে না ধরুক। কাল ভোরে উঠে এনে দেব, এখন আমি বেরোতে পারব না।
কথক : বুড়ো দাদু অসাড় অচেতন হয়ে পড়ে থাকে, পিসিও তার পাশে মুখ গুঁজে বসে থাকে, কেউ কথা কয় না। উনুনের ওপরে ভাতের হাঁড়ি টগবগ করে ফুটতে থাকে, কিন্তু দাদুর মুখে কথা নেই, ছাই-এর মতো সাদা মুখ। উশখুশ করতে থাকে শম্ভু, আহা দাদু যদি না বাঁচে! তবু ঘরখানি যেন দু-হাত বাড়িয়ে জড়িয়ে ধরে রাখতে চায়। উনুনের পাশের গরম জায়গাটি থেকে মেনি বেড়াল মিটমিট করে চায়।
বেড়ালের গান
মিঁয়াও! কোথা যাও?
যেয়ো না কো!
এই ঘরেতে আরাম বড়ো,
সুখে থাকো!
কে বলে গো বাইরে যেতে?
আরামেতে গরমেতে
নিরাপদে বিছানা পেতে,
শুয়ে থাকো!
যেয়ো না কো!
ঝড়ে পড়ে জলে ভিজে
কেন মিছে মরবে নিজে
যেয়ো না কো!
পিসি : শম্ভুরে, যখন এতটুকুটি ছিলি, বাপ-মা তোর বিদেশে গেল, দাদুই তোকে বুকে করে মানুষ করল, সেসব কথা কি ভুলে গেছিস? যে, আমাদের প্রাণ দিয়ে বাঁচিয়ে রেখেছিল, মাথার ওপরকার এই ঘরের ছাদ নিজের হাতে বেঁধেছিল, হাঁড়ির ভেতরকার ওই চাল নিজে গিয়ে হাট থেকে কিনে এনেছিল, কত কষ্টের টাকা দিয়ে, তাকে আমরা বাঁচাতে পারলাম না।
কথক : আর বসে থাকতে পারে না শম্ভু, দেওয়াল থেকে টোকা পাড়ে, তাক থেকে লণ্ঠন জ্বালে, মধুর শিশি নেয়। পেছন ফিরে চায় না, পিসিকে কিছু না বলে দরজা ঠেলে জল-ঝড়ে বেরিয়ে পড়ে।
[দরজা দুম করে বন্ধ হওয়ার শব্দ,—সঙ্গে সঙ্গে প্রচন্ড ঝড়ের অট্টরোল। কে যেন গর্জন করে ডাকে—শম্ভু—শম্ভু—শম্ভু উ—উ—]
শম্ভু : (ভয়ে মুখ ঢেকে)—কে—কে—তোমরা? অন্ধকারে ডানা মেলে আমাকে ধরতে আসছ? আমি—আমি কোথায় পালাব? ও কে? ও কে?
পেঁচাদের গান
হুতুমরা : হুতুম থুম হুতুম থুম
কে যায় রেতে?
চোখে নেই ঘুম?
বাঁকা ঠোঁট, ভাঁটা চোখ,
জোরালো পাখা, ধারালো নখ।
লক্ষ্মীপেঁচারা : আমরা পেঁচা, পেঁচা, পেঁচা,
এবার প্রাণের ভয়ে চ্যাঁচা!
পাসনি ভয়—
তাই কী হয়?
হুতুমরা : হুতুম থুম হুতুম থুম।
শম্ভু : না, না, কোথায় তোমরা? কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছি না কেন? কোথায় তোমরা? (লণ্ঠনটা তুলে) দেখি তোমাদের মুখ। শম্ভু যেই না তুলে ধরেছে লণ্ঠন, অমনি পেঁচাদের চোখে আলো পড়েছে, আর চোখ গেছে ধাঁধিয়ে। পেঁচারা তখন ডানা দিয়ে মুখ ঝেঁপে পালাবার পথ পায় না।
শম্ভু : আঃ, বাঁচা গেল, সব পালিয়েছে। কিন্তু—কিন্তু গাছগুলি অমন কাছাকাছি ঘেঁষাঘেঁষি করে দাঁড়িয়েছে কেন, দিনের বেলায় তো ওরকম থাকে না। আর ওই যে তালগোল পাকিয়ে ডালের ওপরে, ওটা কী? ও বাবা! —কেন যে এলাম মরতে এই রাতে।
গাছেদের গান
যা ফিরে যা! হাত ধরাধরি
পথ বন্ধ করি।
ঝুরি নামিয়ে।
দিই থামিয়ে।
দেখ প্রকান্ড, আমাদের কান্ড
পথ জুড়ে রয়,
নেই তোর ভয়?
শম্ভু : না, না, না, অমন করে আমাকে ঘিরে ফেলো না। কী করি এখন? কোন দিকে পালাই? দেখি, দেখি, পালাবার পথ কই?
কথক : চারিদিকে আলো ফেলে। শম্ভু দেখে গাছের ডালে কুন্ডুলী পাকিয়ে ও তো মোটেই অজগর নয়, ঝুরিগুলি ওইরকম তালগোল হয়ে আছে। আর গাছের তলা দিয়ে ওই যে এঁকেবঁেকে চলে গেছে শুশনি পাহাড়ে যাওয়ার পথটি।
শম্ভু : উফ! বাঁচা গেল। গাছপালা পাতলা হয়ে এসেছে। বাবা! বনজঙ্গলে আমার বড়ো ভয় করে। কিন্তু ওগুলো কী, ছায়ার মতো এ-ঝোপের পেছন থেকে ও-ঝোপের পেছনে চলে যাচ্ছে? ও বাবা! কী ওগুলো? বাঘ নাকি?
বনবেড়ালদের গান
১ম : বনভোজন হবে, আহা,
সকলে : বাহবা বাহবা বাহা! বনভোজন হবে!
২য় : কবে?
১ম : শিকার ধরলে তবে।
২য় : শিকার ধরগে তবে।
সকলে : আহা!
বাহবা বাহবা বাহা!
কথক : তখন উঠে পড়ে শম্ভু, ভয়ে তার বুদ্ধিসুদ্ধি লোপ পায়, চোখ বুজে এদিক-ওদিক ছোটে। হাত থেকে টোকা পড়ে যায়, লণ্ঠন পড়ে যায়, মধুর শিশি মাটিতে গড়াগড়ি খায়। মনসাগাছে ঝোপেঝোপে ঠোকর খায়। ঝোপরা তাকে টিটকিরি দেয়।
মনসাঝোপের গান
কাঁটা ভরা গায়ে
ব্যথা দেব পায়ে!
দেখ-না ঝোপের মাঝে
বাঁছারা লুকিয়ে আছে,
তাদের নাম করতে নেই,
যারা রক্ত শোষে সেই!
ঝোপের ঝাড়ে গাছে
তাদের চক্ষু জেগে আছে।
এ-পথে কেউ যায়?
কথক : হোঁচট খেয়ে আবার পড়ে যায় শম্ভু, হাতের তলায় মধুর শিশি খুঁজে পায়। ভয়ের শেষপ্রান্তে পৌঁছে আবার টোকা তুলে নেয়, লণ্ঠনটাকে উঁচু করে ধরে। অমনি চারদিকে সরসর, পালাপালা, বনবেড়ালের দল চোখ ছোটো করে, মনসাঝোপের আড়াল দিয়ে আস্তানায় ফিরে যায়।
শম্ভু : আরে এই তো পৌঁছে গেছি, এই যে, গোছা গোছা হাড়ভাঙা পাতার গাছ। আর ওই তো মধুর গুহা। এবার শিশিটা ভরে নিলেই হল। কিন্তু—কিন্তু গুহার ভেতরটা অমন অন্ধকার কেন? কীসের সাঁদা গন্ধ নাকে আসছে? এতদূর এসেও শেষটা কি খালি হাতেই ফিরতে হবে? ইশ! কী অন্ধকার!
বাদুড়দের গান
ডানা মেলা কালো ভয়,
তার-ই হোক জয়!
আঁধারে জ্বলিছে দাঁতের সারি,
করাল কঠিন ধারালো ভারী,
তার-ই হোক জয়।
আলো না সয়,
গুহাতে রয়,
তার-ই হোক জয়।
সাঁেদা গন্ধ, বন্ধ গুহা
সেখানে ভয়!
তার-ই হোক জয়!
শম্ভু : (স্বর বদলে)—না! আলো যে-সইতে পারে না তাকে আমি ভয় করব না। এই আলো তুলে ধরলাম। কে আছ ভেতরে, বেরিয়ে এসো। আমি মধু নেব, আমি তোমাদের ভয় পাই না! আমার দাদুকে আমি ভালো করে তুলব, কেউ আমাকে বাধা দিতে পারবে না।
কথক : অমনি ‘সরসর ফড়ফড় ঝটফট’ করে, আলোয় অন্ধ রাশি রাশি বাদুড় ডানা মেলে গুহা ছেড়ে বাইরে বেরিয়ে এল। লণ্ঠনের আলোতে শম্ভু দেখল ফাঁকা গুহা, তার দেওয়ালের গায়ে টুপ টুপ করছে মৌচাক, পাথর বেয়ে মধু গড়াচ্ছে। শিশি ভরে বাইরে বেরিয়ে দু-মুঠো হাড়ভাঙা পাতা তুলে এসে দেখে শম্ভু , কখন মেঘ কেটে গেছে, দূরে দূরে খানকতক মনসাঝোপ! আর পায়ের কাছেই গাছের তলা দিয়ে ঘরে ফেরার পথ। মুখ তুলে বুক ফুলিয়ে দৌড়ে শম্ভু সেই পথ ধরল। চারদিক যেন গান গেয়ে উঠল, ভয়-দূর-করা আলোর গান, সাহসের গান।
[‘আঁধারমণি’ গল্পের লেখিকাকৃত নাট্যরূপ অনুসরণে।]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন