রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা কাজী নজরুল ইসলাম

পার্থ প্রতিম পাঁজা

চরিত্র: রাজপুত্র, রাজা, মন্ত্রী, অনুচর, প্রৌঢ়া, প্রবীণ ব্যক্তি, শহর কোটাল, দাসী, রাজকন্যা।

১ম দৃশ্য

[কমলাপুর রাজার দরবার। রাজা, মন্ত্রী ও পাত্র-মিত্র বসে আছে। রাজপুরীতে আছে লক্ষ্মীর ভান্ডার। লক্ষ্মীদেবীর বরে, রাজা এই ভান্ডার পেয়েছে। রাজার একমাত্র পুত্র বন্ধুবান্ধব নিয়ে সেখুব খরচ করে।]

[রাজপুত্রের প্রবেশ]

রাজপুত্র : পিতা, পিতা আমার কিছু প্রয়োজন আছে আপনার কাছে।

রাজা : কী প্রয়োজন, রাজকুমার?

রাজপুত্র : আমার কিছু টাকার প্রয়োজন পিতা।

রাজা : টাকা! গত কালই তো তোমাকে অনেক টাকা দিলাম। কী করলে সেটাকা?

রাজপুত্র : সব টাকা খরচ হয়ে গেছে।

রাজা : তোমাকে আর টাকা দিতে পারব না। সাতদিন পর এসো।

[বিষণ্ণ মনে রাজপুত্রের প্রস্থান]

মন্ত্রী : রাজকুমার বিষণ্ণ হয়ে চলে গেল। ওকে আর কিছু টাকা দিলে ভালো হত।

রাজা : রাজকুমার যেভাবে টাকা খরচ করছে তাতে লক্ষ্মীর ভান্ডার টুটে যাবে। তাই এখন আর টাকা নয়। [প্রস্থান]

২য় দৃশ্য

[রাজকুমারের বাগানবাড়ি।]

[রাজকুমার ও তার এক অনুচরের প্রবেশ]

রাজপুত্র : পিতা টাকা দিলে না। অথচ টাকার আমার খুব দরকার। এখন কী করা যায়।

অনুচর : টাকা হচ্ছে রাজার। যাকে খুশি দেবে, যাকে খুশি দেবে না। কী করবেন, করার কিছু নাই। বরং আর একবার পিতার কাছে গিয়ে চেয়ে দেখুন, তিনি টাকা দেন কি না।

রাজপুত্র : না, আর পিতার কাছে টাকা চাইব না। এখন আমার মাথায় একটা ফন্দি এসেছে।

অনুচর : কী ফন্দি?

রাজপুত্র : আমাদের লক্ষ্মীর ভান্ডার হতে বেশ মোটারকমের কিছু টাকা নেওয়া। তাতে আমার অনেকদিন চলে যাবে।

অনুচর : রাজকুমার, এ কাজ মোটেই করবেন না। মহারাজ এই ভান্ডারকে মান্য করেন।

রাজপুত্র : আরে, লক্ষ্মীর ভান্ডার তো আমাদেরই ভান্ডার। নিতে দোষ কী? তা ছাড়া কায়দা করে নেব। পিতা জানতে পারবে না।

অনুচর : বেশ চলুন, তবে না গেলেই মঙ্গল হত। [প্রস্থান]

৩য় দৃশ্য

[লক্ষ্মীর ভান্ডার-ঘর]

[রাজকুমার ও অনুচরের প্রবেশ]

রাজপুত্র : এই তো লক্ষ্মীর ভান্ডার। এই চাবিটা তৈরি করে এনেছি। এবার খোলা যাক। (দ্বার খুলে) লক্ষ্মীর ভান্ডারই বটে। হীরে, মতি, জহরত আর টাকায় পরিপূর্ণ। এখান হতে ইচ্ছামতো টাকা তুলে নিই। কেউ বারণ করার নেই। (থলেয় টাকা ভরে)

অনুচর : রাজকুমার, একটু বেশি বেশি করে নেবেন। যেন অনেকদিন চলে। আর আপনার যা খরচের বহর।

[অদূরে রাজার প্রবেশ]

রাজা : এ কী! লক্ষ্মীর ভান্ডারের দুয়ার খোলা! (রাজা দ্রুত লক্ষ্মীর ভান্ডারের দ্বারে যায়)।

[রাজপুত্র ও তার অনুচর নির্বাক।]

রাজা : তুই একটা কুলাঙ্গার। তুই আমার লক্ষ্মীর ভান্ডার লুট করলি।

তোরে চাই না আমি আর।

রাজপুত্র, রাজপুত্র, এমনি রে তুই কুলাঙ্গার।

তোরে চাই না আমি আর, তোরে চাই না আমি আর।।

তুই দুষ্টু বুদ্ধি ধরিস ভারি,

লক্ষ্মীর ভান্ডার করলি চুরি,

এমনি রে তুই রাজকুমার।।

তোরে চাই না আমি আর।।

বেরিয়ে যা তুই রাজ্য হতে,

ঢুকবি না আর কোনো মতে,

মোর কমলাপুরের ভিতরে, ঠাঁই নাই তোর আর।।

তোরে চাই না আমি আর।।

নজরুল এসলামে ভনে,

পুত্রে চোর ভেবো না মনে,

এ পুত্র আনবে জিনে, কত নীতিকথা মণিহার।।

তোরে চাই না আমি আর

(রাজপুত্র ও তার অনুচরকে) যাও, তোমরা দুই জন আমার রাজ্য হতে চলে যাও।

[সকলের প্রস্থান]

৪র্থ দৃশ্য

[অন্য এক রাজ্য। রাজপথ। অদূরে এক বাজার। পথশ্রমে, ক্ষুধায়, তৃষ্ণায় রাজপুত্র ক্লান্ত ও কাতর।]

[রাজপুত্র ও অনুচরের প্রবেশ]

রাজপুত্র : পিতৃরাজ্য হতে নির্বাসিত হয়ে আজ পথে পথে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আমি শ্রান্ত, ক্লান্ত। পথশ্রমে, ক্ষুধায়, তৃষ্ণায়, কাতর। তুমি আমার বিশ্বাসী অনুচর। আমার জন্য বাজার হতে কিছু খাবার নিয়ে এসো।

[অনুচরের প্রস্থান]

৫ম দৃশ্য

[বাজার। বাজারে সারি সারি দোকান। প্রতি দোকানে বিছানা বিছানো আছে। আর আছে বালিশ। কোনো দোকানে বৃদ্ধ, প্রৌঢ়। আবার কোনো দোকানে প্রৌঢ়া, তরুণী। কিন্তু কোনো দোকানে কোনো খাবার নেই।]

[অনুচরের প্রবেশ]

অনুচর : (ঘুরে ঘুরে দেখে) এ কী! কোনো দোকানে খাবার নেই। এ এক আজব বাজার।

অনুচর : (সামনে একটি দোকান। সেখানে এক প্রৌঢ়া বসে আছে।) এসব আপনাদের কীসের দোকান?

প্রৌঢ়া : এ হল কথার বাজার। গল্প-কেচ্ছার বাজার।

অনুচর : আপনার কাছে কী বিক্রি হয়।

প্রৌঢ়া : নীতিকথা।

অনুচর : নীতিকথা! আচ্ছা আমি আমার প্রভু রাজকুমারকে খবর দিই।

[প্রস্থান]

৬ষ্ঠ দৃশ্য

[রাজপুত্র পথের পাশে এক পুকুরে হাত-মুখ ধুয়ে এক বটবৃক্ষের ছায়ায় বসে আছে। দূর হয়েছে খানিকটা ক্লান্তি]

[অনুচরের প্রবেশ]

অনুচর : এ এক আজব দেশ। আর আজব দেশে, আজব বাজার।

রাজপুত্র : তুমি বাজার গেলে, খাবার কই? আর কীসব বলছ, আজব দেশ, আজব বাজার।

অনুচর : কী বলব রাজকুমার।

আজব দেশে, আজব বাজার, দেখলাম চমৎকার।

সারি সারি দোকান আছে, নেই সেথা কোনো খাবার।।

দোকানে বসিয়া আছে বিছনা পাতা,

যত সব প্রৌঢ়া প্রোঢ়ী বসে সেথায়

তারা বিক্রি করে নীতিকথা, গল্পগাথা কেচ্ছা সার।

[প্রস্থান]

রাজপুত্র : বল কি হে, চল দেখি।

৭ম দৃশ্য

[নীতিকথা, গল্প-কেচ্ছার বাজার।]

[রাজপুত্র ও অনুচরের প্রবেশ।]

রাজপুত্র : (অনুচরসহ কিছুক্ষণ বাজারে ভ্রমণ) তাই তো! সারি সারি দোকান। বিছানা পাতা, বালিশ পাতা। তা চল, একটা দোকানে। পছন্দ হলে কথা কিনব।

অনুচর : চলুন, ওই প্রৌঢ়ার দোকানে।

রাজপুত্র : (প্রৌঢ়ার দোকানে এসে) হ্যাঁ গো তোমরা কথা বিক্রি করো?

প্রৌঢ়া : হ্যাঁ বাবা। আমি নীতিকথা বিক্রি করি। আমার স্বামীর দোকান আছে সেকেচ্ছা বিক্রি করে। আমার বউমায়ের দোকান আছে তারা নাচগান বিক্রি করে। তা তুমি আমার নীতিকথা কিনবে?

রাজপুত্র : হ্যাঁ, কিনব। কত করে দাম?

প্রৌঢ়া : আমার একটা নীতিকথার দাম একশো টাকা। কিনতে গেলে একসঙ্গে চারটে কিনতে হবে। একটা বা দুটো বা তিনটে কথা বিক্রি নাই।

রাজপুত্র : আমাকে চারটে কথা বিক্রি করো। এই নাও চারশো টাকা।

প্রৌঢ়া : (টাকা চারশো নিয়ে)

আমার প্রথম কথা

যখন যেমন, তখন তেমন।

দ্বিতীয় কথা

জাগলে নিশি তরি।

তৃতীয় কথা

বস্ত্রহীনকে বস্ত্র দান করো।

চতুর্থ কথা

কড়ির বশ নারী।

পরিস্থিতি বুঝে কথা অনুসারে কাজ করলে ভালো ফল পাবে।

রাজপুত্র : কথা তো কেনা হল। চলো আমরা এখন অন্যদেশে যাই।

অনুচর : চলুন, এই কথা চারটে খেতে খেতে যাব। পেট ভরে কি না দেখি।

রাজপুত্র : কথা কি আর খাওয়া হয়, বোকা কোথাকার।

[প্রস্থান]

৮ম দৃশ্য

[পথ চলতে চলতে রাজপুত্র ও তার অনুচর এল এক গ্রামে। গ্রামে ঢোকার মুখে এক বৈঠকখানা। সেখানে এক প্রবীণ ব্যক্তি বসে আছে। সূর্য ডুবে গেছে। রাত আসছে। এই গ্রামের লোকেরা নিশান। অর্থাৎ গম্ভীর প্রকৃতির।]

[রাজপুত্র ও তার অনুচরের প্রবেশ]

রাজপুত্র : (প্রবীণ ব্যক্তিকে) প্রণাম হই মহাশয়। আমরা বিদেশি, আমি আর আমার এই অনুচর, আপনার এই বৈঠকখানায়, আজকের রাতটা কাটাতে চাই।

প্রবীণ ব্যক্তি : তা থাকতে পারো। কিন্তু এখানে একটু ফের আছে।

রাজপুত্র : কী ফের বাবা?

অনুচর : আরে আমাকে দেন না, ঢেলা চাপিয়ে ফের ভেঙে দিচ্ছি।

প্রবীণ ব্যক্তি : আরে বাবা, দাঁড়িপাল্লার ফের নয় যে, ঢেলা চাপিয়ে ফের ভাঙবে। এ ফের মহাফের। এক বেটা বোষ্টুম এখানে এসে শুয়েছিল। সন্ধ্যায় এসে দেখি বেটা মরে পড়ে আছে। একে শ্মশানে ফেলে দিয়ে আসতে হবে। নচেৎ মড়া নিয়ে তো এখানে রাত কাটাতে পারবে না।

রাজপুত্র : (অনুচরের দিকে চেয়ে) ঢেলা দিয়ে ফের ভাঙবে? এখন দেখো কী ফের ?

অনুচর : আমরা কথা কিনেছি। প্রথম কথা যখন যেমন, তখন তেমন। চলুন আমরা দুজনে মড়াটা শ্মশানে ফেলে দিয়ে আসি। তারপর বৈঠকখানায় রাত কাটাব। (মড়াটাকে বেঁধে একটা বাঁশে ঝুলিয়ে শ্মশানে নিয়ে যায়) বলো হরি, হরি বল।

প্রবীণ ব্যক্তি : যাক বাঁচা গেল। তোমরা এসো আমি এখানে বসে থাকছি।

[মড়াটা শ্মশানে ফেলে, বৈঠকখানায় এসে দেখে মড়াটা আবার চলে এসেছে। প্রবীণ ব্যক্তি একথা বলে।এইভাবে পর পর দুই বার এই ঘটনা ঘটে। তৃতীয়বার মড়াটা তারা দুজন আবার নিয়ে যায়।]

অনুচর : (মড়াটা নামিয়ে) বেটাকে এই চিতায় চাপান। চাপিয়ে সাতটা পাক দেন। আমি শুনেছি, শ্মশানযাত্রীরা, মড়াকে চিতায় চাপিয়ে পোড়াবার আগে সাতটা পাক দেয়।

[উভয়ে সাতটা পাক দিল।]

এর পর মড়াটার মুখে গোড়ালে দেন।

[রাজপুত্র মড়াটার মুখে পায়ের গোড়ালি দিয়ে লাথি মারল। আর মড়ার মুখ থেকে বেরিয়ে এলো সাতরাজার ধন এক বড়ো মানিক।]

রাজপুত্র : কেনা কথার দাম আছে। মড়ার মুখ হতে সাত রাজার ধন এক মানিক পেয়েছি।

অনুচর : না, না, ওটা একটা ইটের টুকরো।

রাজপুত্র : আমি রাজার ছেলে, মানিক চিনি। সত্যই এটা একটা মানিক। আর গ্রামে গিয়ে কাজ নাই। রাতে রাতে অন্যদিকে চলে যাব।

অনুচর : বেটা বোষ্টুম বাহাদুর আছে তো। একটা মানিক মুখে ভরে রেখেছিল গো। তা যখন মানিক পেয়েছি, ওর দেহটা কাঠকুটো দিয়ে একটু আগুন দিয়ে যাই।

[কাঠকুটো কুড়িয়ে চিতায় আগুন দিয়ে ওরা অন্য দিকে চলে যায়।]

[প্রস্থান]

৯ম দৃশ্য

[রাজকুমার ও তার অনুচর হাঁটতে হাঁটতে চলে এল অন্য এক রাজার রাজ্যে। সামনে রাজধানী। শহরের প্রধান রাস্তা দিয়ে ঢুকতেই বিশাল এক শিবমন্দির। সামনে বিরাট এক চাতাল।]

[রাজপুত্র ও তার অনুচরের প্রবেশ]

রাজপুত্র : সন্ধ্যা নামল। চলো আমরা কিছু খেয়ে এই মন্দিরের চাতালে রাতটা কাটাব। আর এই চাতাল চারিদিকে ঘেরা।

অনুচর : হ্যাঁ রাজকুমার তাই হবে। আমাদের সঙ্গে খাবার কেনা আছে, ওই তো ওই দিকে ভালো পুকুর। চলুন ঘাটে বসে আমরা খাওয়াদাওয়া সারি। (খাওয়াদাওয়া)

চারটে কথাই ফলবে। দ্বিতীয় কথাটা হল জাগলে নিশি তরি।

অনুচর : আজ রাতটা আমাদের জেগে কাটাতে হবে।

রাজপুত্র : আমারও তাই মত। জাগলে নিশি তরি।

[রাজপুত্র ও অনুচর জেগে থাকে। রাত বাড়ে। অনেক রাতে। চাতালের অন্য দিকে এক রূপসীর প্রবেশ]

রাজপুত্র : (চুপিচপি) চাতালের ওই দিকে এক রূপসী গেল।

অনুচর : (চুপিচুপি) কথা বলবেন না। দেখুন কী হয়।

[মন্দিরের উলটোদিক থেকে এক যুবকের প্রবেশ]

(মেয়েটি নিজের পরনের কাপড়টা এক কোণে রাখল) একী! মেয়েটি আমাদের সস্তা কাপড় পরে নিল!

অনুচর : (চুপিচুপি) মেয়েটি শুয়ে পড়েছে। যুবকটা ওর কাছে যাচ্ছে। ব্যাটা চোর মনে হচ্ছে।

রাজপুত্র : (চুপিচুপি) পবিত্র শিবমন্দির। এখানে চুরি!

(জোরে) হা: হা: হা:

[যুবকের পলায়ন, মেয়েটিও ভয় পেয়ে পালিয়ে যায়।]

অনুচর : এ কী! মেয়েটা তো নিজের কাপড় ফেলে রেখে আমাদেরটাই পরে চলে গেল!

রাজপুত্র : আমার কেনা তৃতীয় কথা হল বস্ত্রহীনকে বস্ত্রদান করো। আমাদের কাছে বাড়তি একটা কাপড় ছিল সেটা মেয়েটির কাজে লেগে গেল। তাই না ? আসলে আমার ডাকাতে হাসিতে ভয়ে কাপড়ের কথা ভুলে গেছে।

অনুচর : রাত বোধহয় শেষ হয়ে আসছে। একটু ঘুমোনো যাক।

[সকলের প্রস্থান]

১০ম দৃশ্য

[রাজপথ]

রাজপুত্র : মন্দিরের চাতালে রাতে কী কান্ড না হল।

অনুচর : ওই সুন্দরীর শাড়িটা খুব দামি। নাটমন্দিরে লুকিয়ে রেখেছি।

[শহর-কোটালের প্রবেশ]

শহর-কোটাল : তোমরা কে হে? কোথায় তোমাদের বাড়ি?

রাজপুত্র : (জনান্তিকে) রাতের চোর। দিনের শহর কোটাল।

আমরা বিদেশি। এদেশে বেড়াতে এসেছি।

শহর-কোটাল : এই শহরে রাতে চুরি হচ্ছে। চোর ধরতে পারছি না।

অনুচর : (জনান্তিকে) চোর কী করে ধরবে? রাতে নিজেই তো চোর হও।

শহর-কোটাল : আমার সন্দেহ হচ্ছে তোমাদের। তোমরা দুজনেই চোর।

রাজপুত্র : আমরা বিদেশি, এদেশে গত সন্ধ্যায় এসেছি মাত্র। পথঘাট কিছুই চিনি না, আর আমরা চোর নই।

শহর-কোটাল : আমি তোমাদের কোনো কথা শুনতে চাই না। আমার সঙ্গে রাজদরবারে চলো, যা বলার রাজাকে বলবে।

রাজপুত্র : তাই চলো, তোমার সঙ্গে আমরা যাচ্ছি।

[প্রস্থান]

১১শ দৃশ্য

[রাজদরবার। রাজা রাজসিংহাসনে। পাশে মন্ত্রী। উভয় দিকে পাত্র-মিত্র]

[শহর-কোটালের প্রবেশ, সঙ্গে রাজপুত্র ও তার অনুচর]

শহর-কোটাল : মহারাজের জয় হোক। মহারাজ, এই শহরে, প্রতিরাতে চুরি হচ্ছিল, চোর ধরতে পারছিলাম না। আজ ধরেছি, এই দুজন চোরকে।

মন্ত্রী : কিছু মাল ওদের কাছে মিলেছে?

শহর-কোটাল : না।

রাজা : রাতে, চুরি করার সময়, ওদের ধরেছ?

শহর-কোটাল : না, ওদের দিনে ধরেছি হুজুর।

[কাপড় হাতে দাসীর প্রবেশ]

দাসী : মহারাজের জয় হোক।

রাজা : (দাসীকে) তুমি রাজদরবারে ? কীজন্যে এসেছ?

দাসী : মহারাজ, ভয়ে বলব, না নির্ভয়ে বলব?

রাজা : নির্ভয়ে বলো।

দাসী : মহারাজ, আমি আপনার কন্যার রক্ষক। তার দামি দামি কাপড় থাকে আমার জিম্মায়। গত সন্ধ্যায় একটা সোনার জরি দেওয়া শাড়ি আপনার কন্যাকে পরিয়ে দিয়েছিলাম। সকালে দেখি আপনার কন্যার পরনে সেশাড়ি নাই। (হাতের শাড়িটি দেখিয়ে) এই অল্প দামের শাড়িটা রাজকন্যার পরনে ছিল। ওই শাড়িটা খুঁজে পেলাম না। তাই আপনাকে জানাতে এসেছি। তা না হলে শাড়ি চুরির দায় আমার ওপর পড়বে।

[রাজকুমার ও তার অনুচর ওই কাপড় নিজেদের কাপড় বলে চিনতে পারে]

রাজা : (দাসীকে) রাজকন্যাকে এখানে ডেকে আনো।

[দাসীর প্রস্থান]

[কিছুক্ষণ পর রাজকন্যা ও দাসীর প্রবেশ]

রাজকন্যা : মহারাজ আমাকে ডেকেছেন?

রাজা : (কাপড়টা দেখিয়ে) হ্যাঁ। তোমাকে ডেকেছি। এ কাপড়টা কার?

রাজকন্যা : মহারাজ, আমি গতসন্ধ্যায় সোনার জরি দেওয়া শাড়ি পরে মন্দিরে পুজো দিতে গিয়েছিলাম। পুজো শেষে মন্দিরে একটু শুয়েছিলাম। ফুরফুরে বাতাস, ঘুম এসেছিল। কী হয়েছে জানি না। ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার শাড়িটা নেই।

রাজপুত্র : মহারাজ, আমি কিছু বলতে চাই।

রাজা : বলো।

রাজপুত্র : মহারাজ, আমরা বিদেশি। গতসন্ধ্যায় আমরা ওই মন্দিরের চাতালে আশ্রয় নিয়েছিলাম। আমরা আড়ালে ছিলাম। দেখলাম রাজকন্যা এল, মন্দিরের ভেতরে আমাদের কাপড় পরে পুজো দিল, তারপর শুয়ে পড়ল। কিছুক্ষণ পর (শহর-কোটালকে দেখিয়ে) এই লোকটি এল। ঘুমন্ত রাজকন্যার কাপড়টা নিয়ে বেরুতে যাবে, আমি হা: হা: চিৎকার করলাম। ও কাপড়টা মন্দিরের কোণে রেখে পালিয়ে গেল। আমার হাসিতে ভয় পেয়ে রাজকন্যাও কাপড়টা না নিয়েই আমাদের কাপড় পরেই চলে গেল। কাপড়টা মন্দিরেই আছে।

রাজা : তুমি ভালো কাজ করেছ। (দাসীকে) যাও তো মন্দির হতে কাপড়টা নিয়ে এসো।

[দাসীর প্রস্থান]

[কিছুক্ষণ পর কাপড় হাতে দাসীর প্রবেশ]

দাসী : এই দেখুন মহারাজ, সেই সোনার জরি দেওয়া শাড়ি।

মন্ত্রী : নগরে যে চোর ধরবে সে-ই চোর!

রাজা : প্রতিহারী।

প্রতিহারী : হুজুর, আদেশ করুন।

রাজা : (রাগে শহর-কোটালকে দেখিয়ে) এই নিমকহারামকে শ্মশানে নিয়ে গিয়ে শূলে দাও।

মন্ত্রী : বেটা নিমকহারাম, শয়তান।

[প্রতিহারী শহর-কোটালকে নিয়ে বেঁধে শ্মশানে নিয়ে যায়। প্রস্থান]

রাজা : (রাজপুত্রকে) তুমি কে? সঠিক পরিচয় দাও।

রাজপুত্র : আমি কমলাপুরের রাজপুত্র।

রাজা : কমলাপুরের রাজা আমার মিত্র। রাজপুত্রের উপযুক্ত কাজ তুমি করেছ। আমার কন্যার সম্মান তুমি রক্ষা করেছ। এই কন্যা তোমার হাতেই তুলে দিলাম। আর দিলাম আমার গলার হিরের এই হার।

[দাসী ফুলের মালা নিয়ে আসে। রাজকন্যা সেই মালা নিয়ে রাজপুত্রের গলায় পরিয়ে দেন।]

রাজপুত্র : মহারাজ আপনার কাছে আমার একটা প্রার্থনা আছে।

রাজা : বলো কী প্রার্থনা,

রাজপুত্র : আমি এখানে কিছু দিন বিশ্রামের পর অন্যদেশে ভ্রমণে যাব।

রাজা : বেশ, তাই হবে, আমার কোনো আপত্তি নেই।

[সকলের প্রস্থান]

সকল অধ্যায়
১.
ছাত্রের পরীক্ষারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২.
পেটে ও পিঠেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩.
বেচারাম কেনারামউপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
বৃক ও মেষ পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫.
কাক ও পনীর পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬.
লক্ষ্মণের শক্তিশেল সুকুমার রায়
৭.
অবাক জলপান সুকুমার রায়
৮.
কাজির বিচারকাজী নজরুল ইসলাম
৯.
রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা কাজী নজরুল ইসলাম
১০.
ঝড়ের দিনেসুনির্মল বসু
১১.
আলোলীলা মজুমদার
১২.
দরদিদিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩.
যেদিন জাগবে মুকুল বিমল ঘোষ
১৪.
ভীম বধনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১৫.
বহুরূপীদেবনারায়ণ গুপ্ত
১৬.
গুপীগাইন বাঘাবাইন সত্যজিৎ রায়
১৭.
দত্যি দানোর ছানাশৈলেন ঘোষ
১৮.
সৌরভবৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়
১৯.
শ্রেয়সী অমল রায়
২০.
বোকা বাঘের ছানাড. পার্থপ্রতিম পাঁজা
২১.
রাক্ষসের সঙ্গে টক্কর ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%