পার্থ প্রতিম পাঁজা
চরিত্র : বাঘা, গুপি, ভূতের রাজা এবং বাঘ ও ভূতের দলেরা।
[ বাঁশবন। গুপী বাঁশবনে প্রবেশ করে। এদিক-ওদিক তাকায়। দূর থেকে ‘ঢপ ঢপ’ আওয়াজ ভেসে আসে। গুপী শব্দটাকে লক্ষ করে বাঁশবনের ভেতর দিয়ে এগোতে থাকে। গাছের গুঁড়ির পাশে একটা ঢোল পড়ে আছে। গাছের ওপর থেকে জল পড়ায় ঢোলের শব্দ হচ্ছে। দূর থেকে গুপীকে ঢোলের দিকে এগিয়ে আসতে দেখা যায়। গুপীর চোখ পড়ে ঢোলের পাশে ঘুমন্ত বাঘার ওপর। বাঘার অবস্থা দেখে গুপী ফিক করে হেসে ওঠে। ঘুম ভেঙে যায় বাঘার।]
বাঘা : কেডা?
গুপী : আরে বাপ!
বাঘা : চোপ!
গুপী : চোপ!
বাঘা : খবরদার!
গুপী : খবরদার!
[বাঘা হঠাৎই কথা থামিয়ে আপন মনে হাঁটু বাজাতে থাকে]
বাঘা : ধিনতা ধিনতা
তাক ধিন ধিনতা।
[গুপী বাঘার দেখাদেখি]
গুপী : ধিনতা ধিনতা
তাক ধিন ধিনতা।
[বাঘা আঙুল মটকায়। গুপীও বাঘার দেখাদেখি আঙুল মটকায়। বাঘা হাই তোলে। গুপীও হাই তোলে। বাঘা লাফিয়ে ওঠে। বাঘার হাত লেগে ঢোল গড়িয়ে পড়ে মাটিতে।]
বাঘা : তবে রে!
গুপী : তোমার ঢোল যে জল পইড়ে ফুলে ঢোল হয়ে গেছে গো।
[হঠাৎই দূরে বাঘের ডাক শোনা যায়। বাঘা সরে আসে গুপীর কাছে।]
বাঘা : কী নাম তোমার?
গুপী : আমার নাম?
বাঘা : তোমার না তো কার?
গুপী : আমার নাম শ্রী গোপীনাথ গাইন।
বাঘা : নিবাস?
গুপী : আমলকী। তোমার?
বাঘা : হরতকী।
গুপী : তা তুমি এখানে যে?
বাঘা : তাড়ায়ে দেল। গাধার পিঠে তুইলে দূর করে দেছে।
গুপী : রাজামশাই?
বাঘা : জানলে কী কইরা?
গুপী : আমারও যে।
বাঘা : এসে গেছে।
[বাঁশবন। দূরে বাঘ আসতে দেখা যায়। বাঘ এগিয়ে আসে। গুপী-বাঘা একদৃষ্টে বাঘের দিকে চেয়ে থাকে।]
বাঘা : এদিকে দেখছে।
গুপী : আমাদের দেখছে।
[বাঘটা ঘুরে দাঁড়ায়। ভয়ে গুপী-বাঘার দাঁতে দাঁত লেগে যায়।]
বাঘা : চইলা গেছে বোধ হয়।
গুপী : যাইনি! যাইনি!
[গুপী-বাঘা দাঁতে দাঁত চেপে একদৃষ্টে বাঘের দিকে তাকিয়ে থাকে। বাঘটা একবার ওদের দিকে তাকিয়ে চলে যায়। ওদের ভয় কাটে। বাঘা দৌড়ে ঢোল আনতে যায়।]
বাঘা : পলাইছে, পলাইছে। ভয় পেয়েছে।
[বাঘা ঢোল নিয়ে ফিরে আসে গুপীর কাছে। শুরু করে ঢোল বাজাতে।]
গুপী : কেন ভয় পেয়েছে বলোতো?
বাঘা : পাবে না—আমার নাম
বয়ে কাটি, ঘয়ে কাটি
ঢোলে চাঁটি বাঘা—
বাঘা বাইন
গুপী : (হেসে) বাঘা বাইন।
বাঘা : গান গাও, গান গাও, তুমি তো গাইন, তাহলে আর বাঘ আসবে না।
[গুপী লাফিয়ে লাফিয়ে বাঘার ঢোলের আওয়াজের সঙ্গে তাল মেলায়।]
গুপী : সা সা সাগারে
বাঘারে ভাগারে
সা সা সাগারে
বাঘারে ভাগারে
মোরা দু-জনারে
অকূল পাথারে।
[গুপী-বাঘার পিছনে বাঁশবনের দৃশ্য বদলাতে থাকে।]
গুপী : মোরা দু-জনারে
অকূল পাথারে
ঝোপে ঝাড়ে ঝাড়ে
[গুপী-বাঘা বাঁশবনের দৃশ্য দেখে ভয়ে কেঁপে ওঠে।]
গুপী : কেবা দেখে কারে
কেবা দেখে কারে—
[বাঁশবনের ফাঁকে ফাঁকে ভূতেদের আসতে দেখা যায়। আস্তে আস্তে অসংখ্য ভূত বাজনার তালে নাচতে নাচতে এসে জড়ো হয়। গুপী-বাঘা সেদিকে তাকিয়ে থাকে। গুপীর মুখে গান বন্ধ হয়ে যায়।]
গুপী : বাঘাদা এ কী হল গো? ও বাবা ! এ কী হইচে গো?
বাঘা : থেমো না, গেয়ে যাও।
[বাঁশবনের পুরো দৃশ্যটা বদলে অন্ধকার হয়ে যায়। গুপী-বাঘা কী যেন দেখে হাত জোড় করে বসে পড়ে। অন্ধকারের মধ্য থেকে নাচের বাজনা ভেসে আসে। সঙ্গে একটা ভূতের পা সামনে এগিয়ে এসে নাচের ছন্দে তাল দেয়। সব ভূতেরা এগিয়ে এসে নাচতে শুরু করে। প্রথমে রাজা ভূতের দল, পরে চাষা বা প্রজার দল, এরপর সাহেব ভূত এবং শেষে বানিয়া, বামুন আর পাদ্রি মিলে মোটা ভূতের দল।
নাচতে নাচতেই এদের নিজেদের মধ্যে দ্বন্দ্ব লাগে এবং নিজেদের মধ্যেই লড়াই শুরু করে। সেই লড়াইতে প্রত্যেক দলের ভূতই মারা পড়ে। শেষে চারটি ভূতের দলকেই চার সারিতে একসঙ্গে নাচতে দেখা যায়। নাচের দৃশ্য অদৃশ্য হওয়া মাত্র ভূতের রাজার আবির্ভাব হয়। তিনি দুই হাত নেড়ে গুপী-বাঘাকে কাছে ডাকেন। ]
ভূতের রাজা : গুপী-বাঘা গুপী-বাঘা
ভয় নেই, ভয় নেই,
কাছে আয় কাছে আয়
তোরা বড়ো ভালো ছেলে
কাছে আয়।
[গুপী-বাঘা অবাক হয়ে যায় ওদের নাম শুনে।]
গুপী : আপনি আমাদের চেনেন?
বাঘা : আপনি আমাদের নাম জানেন?
ভূতের রাজা : নাম জানি ধাম জানি।
সব জানি
রাজা দিল দূর করে
ঠাঁই নেই, ঠাঁই নেই
কোথা যাবি, কিবা খাবি
জানা নেই, জানা নেই
জানা নেই—
গুপী : সত্যি রাজামশাই। আমাদের বড়ো মুশকিল।
বাঘা : কী যে করব কিছুই বুঝতে পারছি না।
ভূতের রাজা : আমি আছি, আমি আছি।
ভূতো রাজা খুশি হলে
বর দিই খুশি হলে বর দিই।
তিন বর—
গুপী-বাঘা : তিন বর!
ভূতের রাজা : শুধু তিন শুধু তিন।
ভেবে টেবে বল তোরা
কোন বর, কোন বর চাস
বল—
গুপী : রাজামশাই আমাদের যেন খাওয়া-পরার কোনো ভাবনা না থাকে।
ভূতের রাজা : খাওয়া পরা বেশ বেশ!
খেতে চেয়ে হাততালি,
জামা চেয়ে হাততালি।
এর হাতে ওর হাতে
মিলে তালি—
আর কোন বর চাস
বল—
বাঘা : আমাদের খুব দেশ বেড়াবার বড়ো শখ রাজামশাই।
গুপী : যদি একটু ঘুরে-টুরে বেড়াতে পারতাম!
ভূতের রাজা : দেশ দেখা, দেশ দেখা বেশ বেশ বেশ বেশ
জুতো জোড়া পায়ে পরে
কোথা যাবি নাম করে
এর হাতে ওর হাতে
তালি দিবি তালি দিবি।
[শূন্য থেকে গুপী-বাঘার সামনে এসে পড়ে দু-জোড়া নকশা করা নাগরা জুতো।]
গুপী : রাজামশাই, যদি আমরা গান-বাজনা করে লোককে একটু খুশি করতে পারতাম!
ভূতের রাজা : হবে হবে হবে হবে
গান হবে ঢোল হবে
সুর হবে তাল হবে লয় হবে
লোকে শুনে ভ্যাবাচ্যাকা
স্থির হয়ে থেমে যাবে
থেমে যাবে থেমে যাবে
থেমে যাবে—
[বর দিয়ে ধীরে ধীরে ভূতের রাজা অদৃশ্য হয়ে যায়। সেই সঙ্গে আস্তে আস্তে আলোটাও মিলিয়ে যায়।]
[সত্যজিৎ রায়ের ‘গুপী গাইন বাঘা বাইন’ চিত্রনাট্যের অনুসরণে]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন