বৃক ও মেষ পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর

পার্থ প্রতিম পাঁজা

[কথামালা যাত্রা। মূল গ্রিক ক্রীতদাস ঈশপ কথিত]

চরিত্র: বিদ্যাধর, চিত্রকর, বাঘ, ছাগ, হুড়ুদুম্বা, পাঠক, অধিকারী।

বিদ্যাধর : সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি

একটা নিয়ম আসছে চলি

চিত্রোদঘাটন করেন এলে

দুষ্ট বুকে শিষ্ট মেষে

চিত্রকথামালার দেশে।

কুরু যাত্রাং কুরু বলি

সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি।

[চিত্রকরের চিত্র দর্শানো]

চিত্রকর : পাগলা ঝোরার নেকড়ে বাঘ

চোখ রাঙিয়ে ফুলিয়ে নাক

ছাগলার পরে বিষম রাগ

করছে তো করছেই।

বাচ্ছা ছাগ কাঁচ্চা ঘাস এক এক গ্রাস।

খাচ্ছে তো খাচ্ছেই কুড় কুড় করি।

গুড়ু গুড়ু চলি বাঘ ও সে

বিনা দোষে শাসাচ্ছে তো শাসাচ্ছে

কড়া কথা বলি

সত্য ত্রেতা দ্বাপর কলি

[ছাগ ও বাঘের প্রবেশ]

[ছাগের ঘাস-চর্বণ-নৃত্য-গীত]

ছাগ : কুড়ু বা কুড়ু বা কুড়ু বা লিজ্জে

কাঠায় কুড়ু বা কাঠায় লিজ্জে

ডালে পাতায় মুড়ায়ে লিজ্জে

লিজ্জে লিজ্জে ভিজ্জে ভিজ্জে,

গ্রাস গ্রাস ভিজে ঘাস চিবায়ে লিজ্জে।

[বৃকের গজ্জল গাথা]

বিড়ম্বেনাড়ম

আগড়ম বাগড়ম

যাত্রাং কুড়ু যাত্রাং কুড়ু।

আগে তুষ্টং জনে তুষ্টং কুরু

পরে শিষ্টং জনে তৃপ্তং কুরু

কুড়ু বা কুড়ু কুড়ু বা কুড়ু।

বাঘ : পর্বতের ঝরনায় জল পান করা দায়

তোর নালায় স্রোত ঘোলায়—

জল একদম কর্দম,

অপরাধটা কী হল কম?

ছাগ : আমি বারো মাস নীচে খাই ঘাস

উঁচাতে আপনি খান কাঁচা মাস

শুন হে ওহে মহাত্মন

অধমে কেন করেন ভর্ৎসন অকারণ?

বাঘ : অসম্ভবং ন বক্তব্যম।

ছাগ : ছেড়ে দেন জল ঘোলার বিবরণ

নামাল ধারার উজান গমন।

যুক্তিযুক্ত নয় এ কথন

শোনেন কথা হয়ে স্থিরাত্মন।

বাঘ : দোষ তোর নয় একটা

রটালি আমার নামে কথা পাঁচটা

মামার কাছে পাজি।

কে রাখে রে তোরে আজি?

মস্তক ইস্তক শিং করিব চর্বণ

নাই তোর লজ্জা শরম একদম।

বুড়ো হয়ে কর ছুঁচার কীর্তন

এর শাস্তি থোড়া জাস্তি গর্দান কর্ভন।

রাখ নর্তন, ঘাস চর্বণ।

ছাগ : বুড়া নাহি হই ঝুটা যদি কই

বয়স হয়নি ছয় মাস বই

পোরেনি এখনো এক সন।

নেই কেহ আপনজন।

ছড়ান পাই— দোহাই হুড়ুদুম্বার।

[ছাগের অনুনয়-গীত]

ছাগ : হুকুমদার তেরি এক্তিয়ার

মারবে তুমি মরব আমি পাপটি হবে কার?

গরী পরবার করেন বিচার,

ম্যায় তো বেকার।

মারবে মারো, রাখবে রাখো,

জুলুম করলে আছি লাচার।

ছাইলা মানুষ, মজবুদ নয় হাড়

শক্ত হয়নি ঘাড়,

শৃঙ্গে নেই ধার,

বুঝি না বিচার বিপত্তি

হার-জিত নিষ্পত্তি

আদালতের হের-ফের ফের-ফার।

বাঘ : আরে দুরাত্মন, তুমি কী কারণ

তৃণচয় না করে রক্ষণ

করে হরণ করেছ ভক্ষণ?

অকারণে যত তৃণচয় হল অপচয়

বলো কী খেয়ে বাঁচে গজ-হস্তী-হয়?

তৃণ নহিলে নয় গর্দভের পরাণ-রক্ষণ

কী হবে এই ক্ষণ?

[ছাগের খেদ-গীত]

ছাগ : বেচারা গরীবি অতি ক্ষুদ্রজীবী

রোষ করিলা মনিবি—

ওরে কী দোষ পাইলা?

করি চিরকাল গাছতলে বাস

আহার মাত্র চোরকাঁটা ঘাস

মোরে কী লাগি মেরে ফেলিবা?

বাঘ : চোখ যে রাঙাস ওরে পশ্বাধম

আস্পর্ধা তোর নয় তো কম

কথার উপর কথা কোস, রোস

কর প্রতীক্ষে, আজিকে শিক্ষে

দিচ্ছি বিলক্ষণ

ছাগ : লিজ্জে লিজ্জে ভিজ্জে ভিজ্জে ভাই।

বাঘ : কহিলি যা নয় তাই,

আমি কি ঘাস খাই?

পাঁঠা ধরে কাঁচা মাস খাই

রেখে দে রে চিৎকার,

কী আর বিচার

চলো ঝরনার পার।

ছাগ : হুকুমদার গরী পরবার।

বাঘ : অনন্ত পারম জলশুদ্ধি শাস্ত্রম

স্বল্পং তথায়ুর্বহবশ্চ বিঘ্না:

ইতি বিচিন্ত্য ভব নিশ্চিন্ত

নাই কোনোমতে এবার নিস্তার।

ছাগ : দোহাই হুড়ুদুম্বার।

(ছাগের গীত)

ছাগ : কইতে কইতে আমার কথা

ফুরাবে কি?

রইতে রইতে নটে শাকটা

মুড়াবে কি?

হুড়ুদুম্বার মন্তর এবার

কুলাবে কি?

[পেঁচালো শিং লড়ায়ে মেড়া হুড়ুদুম্বার সদর্পে সতেজে সবেগে আসরে প্রবেশ]

(হুড়ুদুম্বার হাম্বার গীত)

হুড়ুদুম্বা : চ্যাং অ্যাং ওম ওম্বা,

দিন রাত ভালো লাগে না তিন সন্ধ্যা,

ঘ্যান ঘ্যান খ্যান খ্যান প্যান প্যান কত সয় বা।

অজাযুদ্ধে ঋষিশ্রাদ্ধে

শিশুতে বৃদ্ধে কত লড়বা

করিবা বহ্বারম্ভে লঘুক্রিয়া— যা চলিয়া।

বাঘ : ঘাড়মুড় কিলাই মো, হাড়গোড় চিবাই মো।

হুড়ুদুম্বা : যমবাড়ি তাড়াই মো, শিং ঝাড়ি ঢুঁসাই মো।

ছাগ : ও ম্যা হেঁট্যে চলবে পাঁচিল পার আর না।

হুড়ুদুম্বা : ফেলি চারি চারি পা।

ছাগ : রেখে বাড়াবাড়ি তাড়াতাড়ি দৌড় মার না।

সকলে : নীচে উপরে দিনে দুপুরে—

যে পারি যেখানে

পাড়ি জামাই মো দৌড় ধরি মো।

হুড় হুড় দুড় দুড় ও হো

গুড় গুড় ক্ষুর ক্ষুর হো হো

বাঘ : ও হো হো মাজা ভাঙল গো—

[বাঘের পতন ও মূর্ছা]

[কালো ব্যাঙের প্রবেশ]

(চৌপট নৃত্য ও গীত)

ব্যাং : দুষ্টে আর শিষ্টে এমন প্রভেদ কিছুই নাই

ব্যাঘ্রে আর মেষে শুধু নামের ফরক ভাই—

বাগে পেলে মেষও বাঘে করে না রেহাই।

মাতঙ্গ পড়িলে দ’য়ে পতঙ্গে প্রহার করে

হাতিকে ব্যাং লাথি মারে একথার মার নাই।

[প্রস্থান]

[পাঠক ও অধিকারীর প্রবেশ]

পাঠক : সব ভুড় করিলা হু অধিকাড়ি। ছঃ যাত্রা মিটি করিলা।

অধিকারী : কেন, কেন, মাটি আবার কী হল?

পাঠক : বিদোয়া সকড় লিখি গেলা—বাঘ মেষ-শাবকের বাপ তুলিলা। বাপ তুলিয়া ওই অসহায় দুর্বল মেষশাবকের প্রাণসংহার করিল। হুড়ুদুম্বা কিমতি আইলা সেখানে? গড়প খরাপ কড়ি কিড় এ কী কাম কড়িলা হে মহাপ্রভু?

অধিকারী : এ তো বিদ্যাসাগরের কথামালা নয়, এ হল ঈশপ ফেবুল।

পাঠক : এসব ফেবুল? আ, অ, ভল, ভল; ততপড়ে কী হইলা?

অধিকারী : তার পরে আর কী? হুড়ুদুম্বার প্রতাপে ছাগল চরে পাহাড়ের অতি উচ্চস্থানে আর ঢুঁ খেয়ে কাবু বাঘ চরে পাহাড়ের নীচে মাজা-ভাঙা।

অধিকারী : তারপর একদিন—

বাঘ বলে, ভাই ছাগল

তোমার মতো নাহি পাগল।

উচ্চে কেন চরিতেছ আর—

দৈববশে পা পিছলালে

হঠাৎ পড়িয়া ভাঙিবে ঘাড়,

এই ভয় হতেছে আমার।

চেয়ে দেখো নীচের ঘাস

মিষ্ট কেমন ডাগর ডাগর।

পাঠক : বাঘটা বড়ো চতুর—এবার ধরিলা ছাগলাক। ছাগল কী কহিলা কহো।

অধিকারী : ছাগল বলিল, আমি নীচে নামিব না মাপ করো। পর্বতের আড়াল—ছাড়িব না।

[উভয়ের প্রস্থান]

(মাজা-ভাঙা বাঘের গীত)

বাঘ : কোথা গেলে ভাই ছাগল

তোমার মতো নাই পাগল

নেকড়ের ভয়ে উঠতে আছে উঁচু পাহাড়ে?

যদি পা পিছলায় হঠাৎ

হবে এক্কেবারে পপাৎ

ঝরনার জলে; নয় ভূমিতলে।

ছাগ : সেও ভালো, না পড়ি বাঘের কবলে;

বাঘ : পাগল, পাগল—বাঘ এদেশে আছে?

হালুম্বা আমি হলুম হুড়ুদুম্বার খুড়ো

মাজা-ভাঙা বুড়ো।

নেমে এসো কাছে—

ছাগলাদ্য ঘৃতটা মালিস করো

কাঁচা ঘাস খেতে দেব সুমিষ্ট ডাগর ডাগর!

ছাগ : আমি নীচে আর চরিব না মাপ করো।

পর্বতের আড়াল ছাড়িব না

ঘাস হোক না যতই বড়ো।

বাঘ : ভাই, আমার চলৎশক্তি নাই

ঝরনার জল এক পলা দাও

তৃষ্ণাটা মেটাই।

যেইজন তৃষ্ণাতুরে জল দান করে

অন্তেতে বৈকুন্ঠবাস পুণ্যবলে করে

ছাগ : বৈকুন্ঠে কাজ নেই

আকন্ঠ বর্তে থাকি ভাই

দূরে দূরে চরে চরে বারো মাস ঘাস খাই

খাই দাই শিং গজাই আর কাঁসি বাজাই

কুড়ু কুড়ু কড় কড়।

বাঘ : যা:, বেঁচে গেলি বড়ো।

সকল অধ্যায়
১.
ছাত্রের পরীক্ষারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২.
পেটে ও পিঠেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩.
বেচারাম কেনারামউপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
বৃক ও মেষ পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫.
কাক ও পনীর পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬.
লক্ষ্মণের শক্তিশেল সুকুমার রায়
৭.
অবাক জলপান সুকুমার রায়
৮.
কাজির বিচারকাজী নজরুল ইসলাম
৯.
রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা কাজী নজরুল ইসলাম
১০.
ঝড়ের দিনেসুনির্মল বসু
১১.
আলোলীলা মজুমদার
১২.
দরদিদিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩.
যেদিন জাগবে মুকুল বিমল ঘোষ
১৪.
ভীম বধনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১৫.
বহুরূপীদেবনারায়ণ গুপ্ত
১৬.
গুপীগাইন বাঘাবাইন সত্যজিৎ রায়
১৭.
দত্যি দানোর ছানাশৈলেন ঘোষ
১৮.
সৌরভবৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়
১৯.
শ্রেয়সী অমল রায়
২০.
বোকা বাঘের ছানাড. পার্থপ্রতিম পাঁজা
২১.
রাক্ষসের সঙ্গে টক্কর ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%