পার্থ প্রতিম পাঁজা
চরিত্র: ঝুনঝুন, টুমটুমি, খটখট, ব্যাব্যা, হোঁদল, দত্যি, পুষি, নেংটি, ওঝা।
[একটি সাজানোগোছানো ঘর। খোলা জানলা দিয়ে চাঁদের আলো ছড়িয়ে পড়ছে ঘরে। একদিকে একটি ছোট্ট খাট। খাটের ওপর ফুটফুটে মেয়ে ঝুনঝুন ঘুমোচ্ছে। পরনে ঝকমকে ফ্রক।
ঘরটি তার শোবার ঘর আবার খেলাঘরও। দেওয়ালে রংচঙে ছবি। কাগজের ফুল, বেলুন দুলছে। মেঝের ওপর তার খেলনা-পুতুল সাজানো। যেন খেলতে খেলতে সাজিয়ে রাখা। দেখা যাচ্ছে, একটা পেট-ফোলা গাবদা-গাবুস পুতুল চিত হয়ে পড়ে আছে। তার পায়ের কাছে একটা ঘোড়া-পুতুল হাঁটু মুড়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার পিঠে লাগাম ধরে বসে আছে একটি ছোট্ট খুকু-পুতুল। পেট-ফোলা পুতুলটার মাথার কাছে হাঁটু মুড়ে হেঁট হয়ে দাঁড়িয়ে আছে একটা ভেড়া-পুতুল। ঝুনঝুন তার পুতুলের মজার মজার নাম রেখেছে। পেট-ফোলা পুতুলটার নাম হোঁদল কুতকুত। ঘোড়ার নাম খটখট। ঘোড়ার পিঠের খুকু-পুতুলের নাম টুমটুমি। আর, ভেড়াটার নাম ব্যাব্যা।
রাত বারোটার ঘণ্টার শব্দ শোনা গেল। শেষ ঘণ্টার শব্দ বাজতে বাজতে মিলিয়ে যাচ্ছে। অনেকদূর থেকে একটা গানের সুর ভেসে আসছে। চাঁদের অস্পষ্ট আলোয় সাদা ধবধবে পোশাক পরে গাইতে গাইতে আর নাচতে নাচতে ঝুনঝুনের ঘরে ঢুকল একঝাঁক ঘুমপরি। তারা গাইছে—]
গান
ঘুম যা, খুকু ঘুমা
নীল আকাশে তারার দেশে
সোনার আলো ছেঁকে,
রঙিন স্বপন খুকুর চোখে
কে দিয়েছে এঁকে!
চাঁদ দিয়েছে খুকুর গালে
জ্যোছনা ধারার চুমা
ঝুন ঝুন ঝুন নূপুর বাজে
ঘুম যা খুকু ঘুমা!
[গান ও নাচ শেষে পরিরা বেরিয়ে গেলে, গানের সুর ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাবে। তারপর সব নিস্তব্ধ। হঠাৎ ব্যাব্যা নড়ে উঠল। চোখ খুলল। মাথা নাড়ল। ঘাড় ঘুরিয়ে এদিক-ওদিক দেখল। তারপর হোঁদল কুতকুতের মুখের কাছে মুখ এনে দুষ্টুমি করে হেঁচে দিল—ফ্যাঁচ-চ-চ! হোঁদল কুতকুতের আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। তার নড়তে-চড়তে সময় লাগে। তাই সেঢিমে তালে উঠে বসল। মুখে হেঁচে দিয়েছে ভেড়া। তাই ঘেন্নায় মুখখানা তার বিচ্ছিরি হয়ে গেছে। সেহেঁড়ে গলায়, টেনে টেনে ব্যাব্যাকে বলল—]
হোঁদল : এঃ! ম্যাগো ম্যা, মুখময় থুতু দিয়ে দিলে! কী হল ব্যাব্যা! অসভ্য কোথাকার! (আবার শুয়ে পড়ল)
ব্যাব্যা : (হোঁদলের মুখের ওপর ভেংচি কেঢেB) ব্য-ব্র্যা-এ্যা!
[ভেংচিকাটার শব্দ শুনে খটখট ঘোড়ার আচমকা ঘুম ভেঙে গেল। সেথতোমতো খেয়ে খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। চিৎকার করে উঠল, চিঁ-হিঁ-হিঁ। পিঠে বসা টুমটুমি ধপাস করে ডিগবাজি খেল মাটিতে]
টুমটুমি : (গা ঝাড়তে ঝাড়তে উঠে দাঁড়িয়ে) উঃ! বাব্বা! আচমকা এমনি করে ফেলে দিতে হয়! মাথাটা যদি ফেটে যেত! দুষ্টু কোথাকার! (তারপর হোঁদল কুতকুতকে দেখে, তার ভুঁড়িতে ঠেলা দিয়ে) এই হোঁদল, ওঠ না! দিন নেই, রাত নেই, খালি কুমড়োর মতো গড়াচ্ছিস!
ব্যাব্যা : (খুনসুটি করে) ব্যা-এ্যা-এ্যা! যা বলেছ! ঘুম ভাঙাতে গেলুম, বলল কিনা অসভ্য!
হোঁদল : (উঠে দাঁড়িয়ে) তা তুই আমার মুখে হেঁচে দিবি কেন?
খটখট : চিঁ-হিঁ-হিঁ-হিঁ, এ তোর ভারি অন্যায়।
ব্যাব্যা : অন্যায়! কেন অন্যায়? পুতুল-পরি এসে ঘুম ভাঙিয়ে দিয়ে গেল, ওমা! তবুও উনি নাক ডাকাচ্ছেন (নাকে শব্দ করে) ফররর-ফর, হোঁতকা কোথাকার!
হোঁদল : (খুব রেগে) এই ভেড়া, আমি যদি নাক ডাকি তোর তাতে কী র্যা! তাই বলে আমার মুখে হেঁচে দিবি! আমার বুঝি ঘেন্নাপিত্তি নেই!
খটখট : তা তো বটেই, তা তো বটেই। তুই ভেড়া, ভেড়ার মতো থাকতে পারিস না? তোর হাঁচি আমরা কেন সইব রে!
[খটখটের কথা শুনে ব্যাব্যা দুষ্টুমি করে আবার হেঁচে দেবে—ফ্যাঁচ-চ-চ]
টুমটুমি : বলি মশাই, আজকের রাতটা সবাই কি ঝগড়া করেই কাটাবে? রাত পোয়ালে ঝুনঝুনের জন্মদিন তার খেয়াল আছে!
ব্যাব্যা : (তাচ্ছিল্যের ভঙ্গিতে) ঝুনঝুনের জন্মদিন তো আমাদের কী!
হোঁদল : কী বলে দেখো! ব্যাব্যাটার মাথার ভেতর গোবর ঠাসা! জন্মদিনেই তো মজা রে! কত খাবার! রসমুন্ডি, পান্তুয়া, রসমালাই—খাও গপাগপ!
ব্যাব্যা : আরে ছ্যা-ছ্যা! রসের খাবার! রসের খাবার খায়, তোদের মতো রস খেয়ে যারা মটকু হয়েছে! এই দেখদিকিনি, কচি কচি ঘাস খেয়ে কেমন ভদ্দরগোছের চেহারাটা বানিয়েছি! হ্যাঁ, খাবার যদি বলতে হয় তো ঘাস, পাতা, ছোলা! ভারি লাগতাই হে, ভারি মুখরোচক—ফ্যাঁচ-চ-চ! (আবার হাঁচল)
টুমটুমি : যেমন হোঁদল, তেমনি ব্যাব্যা—খাবার জন্যে খালি চ্যাঁ—ভ্যাঁ! সব পেটকু কোথাকার! (খটখটের কাছে গিয়ে) বলো না খটখট, সেইটা ঝটপট কাল যেটা মাথা খাটিয়ে বার করেছি!
খটখট : চিঁ-হিঁ-হিঁ! কী করে বলি বলো? এত হট্টগোল করলে কি বলা যায়! ছটফট কোরো না, বলছি!
ব্যাব্যা : বেশ, এই স্পিকটি নট হচ্ছি!
খটখট : হ্যাঁ, কাল আমি আর টুমটুমি একটা মতলব খাটিয়েছি!
ব্যাব্যা : (হেঁচে) ফ্যাঁচ-চ-চ! কী মতলব?
হোঁদল : (তেড়েমেড়ে) কী যে চোপরদিন ফ্যাঁচ ফ্যাঁচ করিস! জ্বালাতন! নাকে বাঁশ পুরে দিতে হয়! শোন না চুপচাপ!
খটখঢ : ঠিক কথা!
ব্যাব্যা : বেশ, আর হাঁচছি না। বলো!
খটখট : বলছিলুম কী, ঝুনঝুন আমাদের কত ভালোবাসে। তার জন্মদিনে আমাদের তো একটা কিছু করা উচিত!
ব্যাব্যা : (মুরুব্বি চালে) কী করতে চাও?
খটখট : একটা কিচ্ছু প্রেজেন্ট করলে কেমন হয়?
হোঁদল : (আনন্দে) বারে বা, একেবারে আমার মনের কথা! আমিও যে এই কথাটাই ভাবছিলুম!
ব্যাব্যা : (ভেংচি কেটে) ভাবছিলুম! ভাবলে কী হবে? শুনি প্রেজেন্টটা করবে কী?
টুমটুমি : সেইটাই ভেবে পাইনি।
ব্যাব্যা : তবে তো সবই হল।
হোঁদল : আচ্ছা, এক কাজ করলে হয় না, ভাঁড়ার ঘরে নিশ্চয়ই মোয়া আছে। লুকিয়ে লুকিয়ে সেই মোয়া এনে প্রেজেন্ট করলে হয় না?
ব্যাব্যা : (রেগে) তুই হোঁদল মানুষ-পুতুল না হয়ে যদি বাঁদর কিংবা গাধা-পুতুল হতিস, তাহলে সবচেয়ে ভালো হত!
হোঁদল : (আরও রেগে) তা আমার কথা যদি পছন্দ না হয়, তো (ভুঁড়িটা নেড়ে) ভেড়ু তুমিই বলো না, দেখি তোমার বুদ্ধি কেমন পাকা!
ব্যাব্যা : (অপ্রস্তুত ভাব) আমি একা কী করতে পারি, এসো সবাই মিলে ভাবা যাক!
খটখট : তা ঠিক, তা ঠিক, সবাই মিলে ভাবাই ঠিক।
হোঁদল : বেশ, তাহলে সবাই ভাবি!
[ভাবতে ভাবতে চারজনে চার কোণে চলে যাবে। হঠাৎ ব্যাব্যা চ্যাঁচিয়ে উঠল)
ব্যাব্যা : (হেঁচে) হয়েছে! হয়েছে!
সবাই : কী হয়েছে? কী হয়েছে?
ব্যাব্যা : কাঠবিড়ালি!
সবাই : (অবাক হয়ে) কাঠবিড়ালি?
ব্যাব্যা : (ছড়ার সুরে) হ্যাঁ, হ্যাঁ।
আমার আছে জানা,
কাঠবিড়ালির ছানা,
খুকুমণি পেলেই হবে,
আনন্দে আটখানা!
খটখট : আচ্ছা, আচ্ছা, আচ্ছা, ভেড়ুরামের বাচ্চা!
টুমটুমি : বুদ্ধিটা নয় কাঁচ্চা, এক্কেবারে সাচ্চা!
হোঁদল : (ঠাট্টা করে) দোষটা কেবল মাঝে মাঝে
ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ হাঁচ্চা!
[খটখট, টুমটুমি আর হোঁদল তিনজনে ব্যাব্যাকে ঘিরে ঘুরে ঘুরে আনন্দে নাচবে আর হাতে তালি দিয়ে ছড়া কেটে চ্যাঁচাবে]
আচ্ছা, আচ্ছা, আচ্ছা,
ভেড়ুরামের বাচ্চা,
বুদ্ধিটা নয় কাঁচ্চা,
এক্কেবারে সাচ্চা,
দোষটা কেবল মাঝে মাঝে,
ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ-ফ্যাঁচ হাঁচ্চা!
[ঠিক তখনই একটা চিৎকার শোনা গেল—‘আঁ-আঁ!’ কে যেন পুতুলদের ভয় দেখাবে বলে এদিকেই ছুটে আসছে। পুতুলদের আনন্দ থমকে গেল। ভয়ে একজন আরেকজনকে জড়িয়ে ধরছে। দেখা গেল, চ্যাঁচাতে চ্যাঁচাতে একটা দত্যিছানা ঘরে ঢুকে পড়েছে। পুতুলরা যে-যেখানে যেমনভাবে ছিল, ঠিক তেমনভাবেই দাঁড়িয়ে পড়ল। পুতুলের মতোই অনড় হয়ে গেল। দত্যিছানাটা ঘরে ঢুকে ভয় দেখানোর সুরে চিৎকার করছে, লাফাচ্ছে, হাঁপাচ্ছে। ছিঁড়ে ফেলছে ঘরে সাজানো কাগজের ফুল। ফাটিয়ে দিচ্ছে বেলুন। এটা টানছে, ওটা ভাঙছে। পুতুলগুলিকে ঠেলে ফেলে দিল। তারপর হঠাৎ দত্যিটার নজর গেল ঘুমন্ত ঝুনঝুনের দিকে। ঝুনঝুনের পায়ের নীচে দিল খামচিয়ে একবার, দু-বার, তিনবার। ঝুনঝুনের ঘুম ভেঙে গেল! দত্যিছানাটার স্বভাব ছোটোদের ভয় দেখানো। সেঝুনঝুনকেও ভয় দেখাল। কিন্তু ঝুনঝুন ভয় কাকে বলে জানে না। ভারি হাসিখুশি সে। ঘুম ভেঙে যেতেই অবাক হয়ে দেখল দত্যিছানাটাকে। তারপর বলল—]
ঝুনঝুন : ওমা-গো-মা! তুমি আবার কে? রাত দুপুরে আমার ঘরে ঢুকেছ? আমার পায়ে সুড়সুড়ি দিয়ে ঘুম ভাঙাচ্ছ?
দত্যিছানা : (ঝুনঝুনের দিকে তেড়ে গিয়ে, ভয় দেখিয়ে) ফিস-স-স-স! (মুখে শব্দ করল)
ঝুনঝুন : (খুব জোরে হেসে ফেলে) এ কী, এ কী, মুখের কাছে অমন করছ কেন? (বিছানা ছেড়ে সেনেমে পড়ল। তারপর দেখল চারদিক। অবাক হয়ে) বলি, আমার বেলুনগুলি ফাটল কী করে! ওমা! আমার পুতুলগুলোরই বা এমন দশা হল কী করে! তোমার কাজ বুঝি! (হেসে ফেলবে)
দত্যি : (খুব রেগে) হুম! আমিই করেছি গুম! অমন করে, হাসলে লাগিয়ে দেব খুনোখুনির ধুম! এই টাক-টাক-টাক-ডুম!
ঝুনঝুন : (জোরে জোরে হেসে) বা রে! সেআবার কী, টাক-টাক ডুম! ভারি মজা করতে জানো তো!
দত্যি : বটে! মজা জানি! জানো আমি কে! একরত্তি হ্যাঁ! একরত্তি আমার নাম। ঘুপচুপ বনে আমার ধাম। (মুখে শব্দ করে ঝুনঝুনকে ভয় দেখিয়ে) এইসব পুঁচকে পেঁচি খোকা-খুকুদের ভয় দেখানো আমার কাম। আমি দত্যিদানার ছানা! অমন করে হাসলে—(হাত ছড়িয়ে ঝুনঝুনের মুখের সামনে চরকি খাবে)
ঝুনঝুন : (খুশিতে হাততালি দিয়ে হাসতে হাসতে) বারে, বারে! তুমি তো বেশ চরকি খেতে পারো!
দত্যি : (খুব রেগে) কী, আমাকে তাচ্ছিল্য করা হচ্ছে! এক্ষুনি মরা বকের ঠোঁট দিয়ে চোখদুটো কানা করে দেব না!
ঝুনঝুন : (মুচকি মুচকি হেসে) বাব্বা! রাগ দেখো! মরা বকের ঠোঁট দিয়ে চোখ কানা করে দেবে! দাও, দাও না আমায় কানা করে!
দত্যি : ওরে মেয়ে! তবু গ্রাহ্যি নেই! এক্ষুনি ফুসমন্তরে ফুসকুড়ি করে দেব না!
ঝুনঝুন : (খুব জোরে হেসে উঠে) ফুসকুড়ি! সেআবার কী? তোমার কথা শুনে হাসতে হাসতে পেট ফেটে যাচ্ছে!
দত্যি : (ঝুনঝুনের মুখের সামনে গিয়ে হাত-পা ছুড়ে) তবে রে মেয়ে!
ঝুনঝুন : (নিজেকে সামলাতে-সামলাতে) ও কী! ও কী! মুখের সামনে অমন করছ কেন? ঘাড়ে পড়বে নাকি!
দত্যি : (রাগ দেখিয়ে লাফিয়ে ঝাঁপিয়ে) আমি রেগে গেলে রক্ষে থাকে না! আমায় হতচ্ছেদ্দা!
ঝুনঝুন : সত্যি বলছি, তোমার কান্ড দেখে আমার খুব মজা লাগছে!
দত্যি : অ্যাঁ! মজা লাগছে! আমায় দেখলে বুড়োখোকাদের বুকের রক্ত শুকিয়ে যায়, আর তোমার মজা লাগছে! আমার সঙ্গে ঠাট্টা! মাথায় মারব এমন গাঁট্টা যে টুনটুনি পাখি করে ছেড়ে দেব!
ঝুনঝুন : (অবাক হওয়ার ভান করে) বলো কী! তোমার এত ক্ষমতা! দাও না একরত্তি, আমার মাথায় গাঁট্টা মেরে টুনটুনি পাখি করে! বনে বনে, গাছে গাছে উড়ে বেড়াব!
দত্যি : উফ! তবু ভয় নেই পুঁচকে মেয়ের! এমন চিমটি কেটে দেব যে, নেংটি ইঁদুর হয়ে যাবে!
ঝুনঝুন : (মুখে ঘেন্নার ভাব) না, না, একরত্তি ইঁদুর-টিদুর কোরো না। মেনিটা সারাদিন পেছনে লেগে থাকবে। কে বাবা ওর সঙ্গে লুকোচুরি খেলবে! তার চেয়ে এক কাজ করো না, তুমি আমার বন্ধু হয়ে আমার সঙ্গে খেলা করো না!
দত্যি : কী! সাহস তো কম নয়! বলে, দত্যিদানোর সঙ্গে বন্ধুত্ব পাতাবে! তবে রে! (ঝুনঝুনের গলা টিপতে চটপট এগিয়ে গেল। হাত গলা অবধি উঠল, কিন্তু টেপা হল না। ঝুনঝুনের হাসি হাসি মুখ আর চোখদু-টি দেখে থমকে গেল) না, আজ আর কিচ্ছু বললুম না। তুমি কেমন না জব্দ হও দেখছি! (বেরিয়ে যাবার জন্য ছুট দিল। ঝুনঝুন তার আগেই ছুটে গিয়ে একরত্তির পথ আটকাল। একরাত্তি ঘুরে দাঁড়াল) সর্বনাশ করেছে! আমায় ছুঁতে আসা! জানে না, আমায় ছুঁলে এক্ষুনি ঘুরঘুরে-পোকা হয়ে কানে ঢুকে যাব।
ঝুনঝুন : বেশ ছোঁব না। তবে তুমি চলে যাচ্ছ কেন? আর একটু থাকো! আর দুটো কথা বলি! তুমি এসে অবধি খালি ঝগড়া করছ!
দত্যি : ভারি যে মিষ্টি মিষ্টি কথা! উঁ! হাড়বজ্জাতির জায়গা পাওনি! জানো না, মানুষের ছেলেপুলের সঙ্গে কথা বললে কী হয়!
ঝুনঝুন : কী হয় একরত্তি?
দত্যি : এইসব মানুষের ছেলেপুলেরা ব্যাঙের বাচ্চা হয়ে যায়! এই ক-দিনে আমি পাঁচজনকে ব্যাঙাচি করে ছেড়েছি।
ঝুনঝুন : (হাতের বুড়ো আঙুল নেড়ে) কই, আমায় তো করতে পারলে না!
দত্যি : (ঝুনঝুনের মতো বুড়ো আঙুল নেড়ে) করতে পারলুম না? ইচ্ছে করে করলুম না। (হঠাৎ ছুটে বেরিয়ে যেতে যেতে) কেমন না পারি দেখাচ্ছি!
ঝুনঝুন : (একরত্তির পেছনে ছুটতে ছুটতে) ও একরত্তি শোনো! শোনো!
[ঝুনঝুনও দত্যির পেছনে পেছনে ছুটে বেরিয়ে গেল]
[এতক্ষণ পুতুলগুলি চুপচাপ মটকা মেরে মেঝেতে পড়েছিল। দত্যিছানা আর ঝুনঝুন বেরিয়ে যাবার পর ব্যাব্যা, খটখট আর টুমটুমি ভয়ে জড়ামড়ি করে এক পা এক পা করে এগিয়ে দত্যি আর ঝুনঝুন যেদিক দিয়ে বেরিয়ে গেল সেইদিকটা উঁকিঝুঁকি মেরে দেখতে লাগল। এদিকে হোঁদলটা যেখানে দাঁড়িয়ে ছিল সেইখানেই ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপতে কাঁপতে হুমড়ি খেয়ে পড়ে গেল! চেঁচিয়ে উঠল—]
হোঁদল : ওরে বাবা ভূত! (বলেই অজ্ঞান হয়ে যাবে)
[হোঁদলের চিৎকার শুনে ব্যাব্যা, খটখট আর টুমটুমি মুখে এ্যাঁ-এ্যাঁ করে হোঁদলের কাছে ছুটে আসবে। তাকে ঘিরে বসে পড়বে। ব্যাব্যা হোঁদলকে ভালো করে দেখে কেঁদে উঠবে।]
ব্যাব্যা : ওমা, হোঁদল অজ্ঞান হয়ে গেল!
[ব্যাব্যার মুখের কথা মুখ থেকে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে খটখট আর টুমটুমিও কেঁদে উঠবে]
সক্কলে : ওমা, কী হবে গো হোঁদল অজ্ঞান হয়ে গেল!
[অমন করে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ওরা যখন কাঁদছে ঠিক তখনই একটা নেংটি ইঁদুর ঘরের মধ্যে ঢুকে পড়বে। পুতুলরা ভয়ে থমকে যাবে]
নেংটি : (তিড়িংবিড়িং লাফিয়ে আর ধমক দিয়ে) এই, এই, এত চ্যাঁচামেচি কীসের অ্যাঁ! রাতদুপুরে ঘরের মধ্যে ছুঁচোর কেত্তন শুরু করে দিয়েছে।
[পুতুলরা প্রথমটা থমকে গেলেও, ইঁদুরের ধমক খেয়ে আরও জোরে কেঁদে উঠবে]
নেংটি : (তেড়ে গিয়ে) তবে রে পাজিগুলো! কানে কথা ঢুকছে না! আবার বলে ছোটোমাসির জ্বর হয়েছে, আর ওনারা এখানে চিলের মতো চ্যাঁচাচ্ছে!
টুমটুমি : (কান্না-কান্না গলায়) ইচ্ছে করে চ্যাঁচাচ্ছি নাকি!
ব্যাব্যা : ইচ্ছে করে কাঁদছি নাকি!
নেংটি : (ঠাট্টার সুরে) না, ইচ্ছে করে কাঁদছেন না! তবে কি গলায় কান্নার কল বসানো হয়েছে! যত্তোসব!
টুমটুমি : তাই বলছি নাকি! আমাদের ঘরে ভূত ঢুকেছিল।
ব্যাব্যা : আবার তুমি ঢুকেছ!
খটখট : বকাবকি করছ। আমাদের ভয় করে না বুঝি!
নেংটি : কচিখোকা! ভয়ে একেবারে গেলেন সব! ভূত ঢুকেছিল, না আর কিছু!
ব্যাব্যা : তুমি নিজেই দেখো না হোঁদলকে ভূতে ধরেছে!
টুমটুমি : দেখো না, অজ্ঞান হয়ে পড়ে আছে!
নেংটি : (ধমক দিয়ে) চুপ! পুতুলকে আবার ভূতে ধরবে কী র্যা! খামোকা মটকা মেরে পড়ে পড়ে ন্যাকামি হচ্ছে!
টুমটুমি : পুতুল বলে কি আমরা মিথ্যুক?
নেংটি : না, না। সত্যবাদী যুধিষ্ঠির!
ব্যাব্যা : ওই দেখো না, ঝুনঝুনকেও ভূতে ধরে নিয়ে গেছে।
নেংটি : আমার সঙ্গে চালাকি হচ্ছে! আমি বলে আমার সাত ভাই-এর দাদা, আমার সঙ্গে মিথ্যে মিথ্যে চালাকি! এক্ষুনি দাঁত দিয়ে কুটোকুটি করে নাড়িভুঁড়ি বার করে দেব না!
খটখট : অমন করে ভয় দেখাচ্ছ কেন?
ব্যাব্যা : ভূতে ধরেছে কিনা নিজেই তো দেখলে পারো!
নেংটি : আমার আর খেয়েদেয়ে কাজ নেই, পুতুলকে ভূতে ধরেছে, বিশ্বাস করতে হবে। ফক্কুড়ি করার জায়গা পায়নি! যতসব দুষ্টু পুতুল! হ্যাঁ, এক্ষুনি আমায় আবার হাকিম বাড়ি যেতে হবে। তোমাদের সঙ্গে তো আর ঝুটমুট চ্যাঁচালে চলবে না। আমি যাচ্ছি (চলেই যাচ্ছিল, হঠাৎ আবার ঘুরে পুতুলদের ধমক দিয়ে) ফের যদি ট্যাঁ-ফুঁ শুনি তাহলে তোদের একদিন, কি আমার একদিন! (এবার সেসত্যিই চলে যাচ্ছিল। হঠাৎ তার নজরে পড়ল একটা বেড়াল আসছে। তাকে দেখে নেংটিটা তিড়িং করে একলাফ মেরে পুতুলদের কাছে ছুটে কাকুতি-মিনতি করে) উরিব্বাস! পুষি-ফ্যাঁস-ফ্যাঁস আসছে। (ভয়ে খুবই ব্যস্ত হয়ে) ওরে ব্যাব্যা, ওরে খটখট বাঁচা নারে! কোথা পালাই! ওরে বাবা, এসে পড়ল রে! (একবার ব্যাব্যার পেছনে, একবার খটখটের পেছনে আবার কখনো টুমটুমির পেছনে লুকিয়ে পড়বার চেষ্টা করবে)
ব্যাব্যা : অত ভয় পাচ্ছ কেন! আমাদের পেছনে লুকিয়ে পড়ো!
নেংটি : দেখতে পাবে যে!
টুমটুমি : না, না, দেখতে পাবে না। আমরা আড়াল করে দাঁড়াচ্ছি।
[নেংটি চটজলদি পুতুলদের পেছনে লুকিয়ে পড়ল। পুতুলরা নেংটিকে আড়াল করে দাঁড়াল। কিন্তু নেংটির ল্যাজটা ওদের পায়ের ফাঁক দিয়ে একটু দেখা গেল। একটা বুড়ি বেড়াল আলতো পায়ে ডিঙি মেরে ঘরে ঢুকল। পুতুলরা তাকে দেখতে লাগল ভয়ে ভয়ে। বেড়ালটা টেনে টেনে কথা বলে।]
বেড়াল : নেংটি, নেংটি গন্ধ পাই। (পুতুলদের দিকে চোখ পড়তে) তোমরা কে বাছারা?
খটখট : আমি কাঠের ঘোড়া খটখট।
টুমটুমি : আমি খুকু-পুতুল টুমটুমি।
ব্যাব্যা : আমি পোড়ামাটির ব্যাব্যা!
পুষি : ও, তোমরা খেলনা-পুতুল?
পুতুলেরা : হ্যাঁ!
পুষি : তা বেশ! তা বেশ! রেতেরবেলা খেলাধুলো করছ?
পুতুলেরা : হ্যাঁ!
পুষি : তা বেশ! তা বেশ! (একটু এদিক-ওদিক দেখে) তা বাছারা, তোমাদের ঘরে নেংটি-টেংটি ঢুকেছে? গন্ধ-গন্ধ পাচ্ছি!
ব্যাব্যা : কই, না তো!
টুমটুমি : আমাদের ঘরে নেংটির গর্ত নেই তো!
খটখট : আমাদের ঘরে নেংটি ঢুকবেই বা কেন!
পুষি : তা তো বটেই! তা তো বটেই! না, তা বলছি না। (গলার স্বরে একটু কিন্তু-কিন্তু ভাব) বলছি, কিছু খাবারদাবার আছে?
ব্যাব্যা : আমরা আর খাবার পাব কোথায়?
পুষি : হ্যাঁ, তা তো ঠিক! তা তো ঠিক! না, বলছিলুম কী, তোমরা তো দুধ-টুধ খেয়েছ, বাটিতে যদি লেগেটেগে থাকে, তাহলে চেটেপুটে খাই!
টুমটুমি : দুধের বাটি রান্নাঘরে। এখানে কোথায়!
পুষি : ঠিক বটে, ঠিক বটে! দেখো না, বুড়ো বয়সে ভীমরতি ধরেছে! (পুতুলদের আড়চোখে দেখে নিয়ে) তা বলছিলুম কী, মাছের কানকো-কাঁটাও নেই?
টুমটুমি : মাছ-টাছ আমরা খাই না।
পুষি : ও হ্যাঁ, তাও তো বটে, তোমরা তো পুতুল! (আদরের সুরে) তা সোনারা তোমরা কী খাও?
টুমটুমি : আমরা লজেন্স খাই, বিস্কুট খাই।
ব্যাব্যা : পাতা খাই, ভুসি খাই।
খটখট : ছোলা খাই, ঘাস খাই।
পুষি : তা বেশ! তা বেশ! তাই বাছা এক-আধখানা বিস্কুট-টিস্কুটই দাও না!
খটখট : বেশ দিচ্ছি। (টেবিলের ওপর রাখা বিস্কুটের বাকসো থেকে বিস্কুট বার করে এনে বেড়ালকে দিয়ে) বিস্কুট নিয়ে তুমি চলে যাও। তোমাকে দেখে আমাদের ভয় করছে!
পুষি : (বিস্কুট নিতে গিয়ে বেড়ালটার হঠাৎ পুতুলদের পায়ের ফাঁকে নেংটির ল্যাজের দিকে নজর পড়ল) তোমাদের পায়ের তলায় ওটা কী বাছা?
ব্যাব্যা : (হকচকিয়ে) কই? (তারপর দেখে) এই রে, এটা ইঁদুরের ল্যাজটা। (পায়ে করে ল্যাজটা সরিয়ে দেবার চেষ্টা করল)
পুষি : অ্যাঁ! কী বললে?
খটখট : (চট করে কথাটা ঘুরিয়ে) না, না, ও কিছু নয়, ও কিছু নয়, ওটা ইজেরের সুতো।
পুষি : ও, তাই বলো! আমিও ঠিক ধরেছি। কার ইজের, খুকুর বুঝি? (বিস্কুটটা মুখে দিতে গিয়ে, হঠাৎ হোঁদলের দিকে নজর পড়ল। হোঁদল এতক্ষণ অজ্ঞান হয়ে পড়েই ছিল) তা, এই পুতুলটির কী হয়েছে?
ব্যাব্যা : হোঁদলটা অজ্ঞান হয়ে গেছে।
খটখট : ওকে ভূতে ধরেছে।
পুষি : (আনমনে) তা বেশ! তা বেশ! (হঠাৎ খেয়াল হতে ভয়ে চমকে) এ্যাঁ! কী বললে, ভূতে ধরেছে? (ভয়ে একবার এদিক ছুটে, একবার ওদিক ছুটে) ওরে বাবা রে ভূত! ভূত! ভূত!
[লাফালাফি করে পালায়]
[বেড়াল পালিয়ে যাবার সঙ্গে সঙ্গে হোঁদলের জ্ঞান ফিরে আসবে]
হোঁদল : (চিৎকার করে) ভূত! ভূত! ওরে বাবারে ভূত-ত-ত! (গড়াগড়ি খাবে)
পুতুলেরা : (কেউ মাথায় হাত বুলিয়ে, কেউ বুকে হাত বুলিয়ে) কী হয়েছে হোঁদল কুতকুত? কী হয়েছে?
[ততক্ষণে নেংটিটা আড়াল থেকে বেরিয়ে পড়েছে। বেড়ালটা চলে গেল কিনা দেখবে। তারপর হোঁদলের চ্যাঁচামেচি শুনে বলবে—]
নেংটি : এই, কাঁদিস না, কাঁদিস না! আমি ঝট করে একটা ওঝা ডেকে আনছি!
[নেংটি বেরিয়ে গেল। হোঁদল ভয়ে চ্যাঁচাতেই লাগল]
টুমটুমি : (হোঁদলকে ভুলিয়ে ভুলিয়ে) কাঁদতে নেই, কাঁদতে নেই। এক্ষুনি ওঝামশাই এসে পড়বেন।
[চ্যাঁচামেচি চলছে—এমন সময়ে কিম্ভূত চেহারার এক ওঝা ঢুকে পড়ল। তার কাঁধে ঝোলানো থলি-ঝুলি। হাতে মড়ার হাড় আর ঝাড়ফোঁকের গাছগাছড়া]
ওঝা : হেঁ-হেঁ-হেঁ, আমি এসে গেছি! এসে গেছি!
টুমটুমি : তুমিই বুঝি ভূত-ছাড়ানোর ওঝা?
ওঝা : হুঁ, হুঁ! তা, কার কী হয়েছে?
খটখট : এই হোঁদলটাকে এইমাত্তর ভূতে ধরেছে।
ওঝা : এইমাত্তর? কীরকম ভূত, দেখেছে কেউ?
টুমটুমি : হ্যাঁ, দেখেছি, বাচ্চা ভূত!
ব্যাব্যা : না আজ্ঞে, বাচ্চা ঠিক নয়, একটু গ্যাঁড়া মতো ভূত!
টুমটুমি : এত্তো বড়ো বড়ো চোখ, যেন গিলতে আসছে!
ব্যাব্যা : (হেঁচে ফেলে) ফ্যাঁচছ! এত্তো বড়ো বড়ো দাঁত, হাতির চেয়েও বড়ো!
খটখট : বাঁশের মতো ঠ্যাং, কীরকম খ্যান খ্যান করে কথা বলছিল!
ওঝা : অ, বুঝেছি, বুঝেছি, এ ব্যাটা ছিঁচকে ভূতের কান্ড। (হোঁদলকে ডেকে) কই দেখি হোঁদল উঠে বসো!
[হোঁদল ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে উঠে বসল]
ওঝা : কী কষ্ট হচ্ছে?
হোঁদল : (খুব জোরে কেঁদে) কী কষ্ট? ভারি কষ্ট।
ওঝা : মাথা বনবন ঘুরছে?
হোঁদল : (কাঁদতে কাঁদতেই) না-এ্যাঁ-এ্যাঁ-এ্যাঁ।
ওঝা : পেট আইঢাই করছে?
হোঁদল : না-এ্যাঁ-এ্যাঁ-এ্যাঁ।
ওঝা : তবে পা টনটন করছে?
হোঁদল : আজ্ঞে না। উঁ:, উঁ:! নাকের বাঁদিকের গর্তটা বড়ো সুড়সুড় করছে।
ওঝা : সুড়সুড় করছে! ওরে বাব্বা, এ তো ভীষণ ব্যাপার।
হোঁদল : (কেঁদে-ককিয়ে) আমার কী হবে ওঝামশাই?
ওঝা : কিচ্ছু হবে না, সব ঠিক হয়ে যাবে। আমি যখন আছি, তখন ভূতের বাপের সাধ্যি কী তোমার নাক কামড়ে খেয়ে ফেলে! হ্যাঁ, এবার বলো, সেতোমার কোন জায়গাটা ছুঁয়েছিল?
হোঁদল : সেতো ছোঁয়নি আমায়!
ওঝা : তবে নিশ্চয়ই তুমি তাকে ছুঁয়েছিলে?
হোঁদল : না, সেআমার পায়ের কড়ে আঙুলের দিকে চেয়েছিল।
ওঝা : কড়ে আঙুলের দিকে চেয়েছিল! ব্যাটার সাহস তো কম নয়!
হোঁদল : আমার কী হবে ওঝামশাই, আমি বাঁচব তো?
ওঝা : বাঁচবে না মানে! ব্যাটার নাকে দড়ি দিয়ে ঠ্যালা গাড়ি ঠেলিয়ে ছাড়ব না! হ্যাঁ, তুমি কিন্তু আর ছটফট কোরো না! লক্ষ্মীটির মতো বসে থাকো! আমি এবার ভূত ছাড়ানোর মন্ত্র পড়ছি, দেখি ব্যাটা কেমন না জব্দ হয়!
[ওঝা ঝুলি নামিয়ে, উপুড় হয়ে বসে মেঝেয় একটা ঘর কেটে খানিকটা ধুলো নেবে। তারপর মড়ার হাড়টা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে মন্তর পড়বে। চোখদু-টি গোল গোল করে, একটা ভয়-জাগানো মুখের চেহারা করবে। তারপর কটমট করে হোঁদলের দিকে চেয়ে, উঠে দাঁড়িয়ে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে মন্তর পড়বে—]
ওঝা : ইস ফিস ফিস ফুস মন্তর
আসকে পিঠের হাঁড়ি,
খুস খুস খুস চুলকে ছেঁদা
চ্যাংড়া ভূতের দাড়ি।
খক খক খক কাশছে ব্যাটা
রক্ত ওঠে মুখে,
ধুক পুক পুক করছে শোনো
প্রাণটি এবার বুকে।
এই মারলুম ল্যাং ভূতের ঠ্যাং-এ
চ্যাঁচায় উহুর উঃ,
উস ফুস ফুস ছু:। উস ফুস ফুস ছু:!
ওঝা : (মন্তর শেষ করে হোঁদলকে হাসি মুখে দেখতে দেখতে) কেমন মনে হচ্ছে হোঁদল?
হোঁদল : (এদিক-ওদিক চেয়ে হঠাৎ বসে পড়ে) আজ্ঞে গড়াগড়ি খেতে ইচ্ছে করছে! (শুয়ে গড়াগড়ি খাবে)
ওঝা : ওকে ধরো, ধরো!
[ব্যাব্যা, খটখট আর টুমটুমি হোঁদলকে চেপে ধরবে। হোঁদল তবুও ছটফট করবে। ওঝা আর একটা মন্তর পড়বে—]
ওঝা : তেল তেল তেলুনি,
তেলে ভাজা বেগুনি।
দিনরাত খাই খাই
পেট তাই আই ঢাই।
কচ কচ খাচ্ছে,
তাইতো গড়াচ্ছে।
কটমট চাউনি,
খড়কুটো ছাউনি।
বক বক বুকনি,
চিঁড়ে ভাজা ঘুগনি।
নাদা পেট হাঁসফাঁস,
জ্বলে খাক হাড়মাস।
উস ছু:, উস ছু:, উস ছু:।
[হোঁদল গড়াতে গড়াতে থামল]
ওঝা : (হোঁদলকে ভালো করে দেখে) এবার কেমন বুঝছ হোঁদল?
হোঁদল : (দাঁড়িয়ে উঠে) আজ্ঞে বড়ো নাচতে ইচ্ছে করছে। (ধেই ধেই করে নাচবে)
ওঝা : (হোঁদলকে নাচতে দেখে থতমতো খেয়ে, নিজেও নেচে নেচে) এ্যাঁ! নাচতে ইচ্ছে করছে!
(হোঁদল থুপথুপ করে নাচতে নাচতে ঘরের চারদিকে গোল হয়ে ঘুরবে। ওঝাও হোঁদলের নাচের তালে নিজেও নাচতে নাচতে মন্তর আওড়াবে—)
ওঝা : ইরিশি বিরিশি, ঝাঁটার কাঠি
তেলা মাথায় গাঁট্টা চাঁটি।
ঘুরছে মাথা বাঁই বাঁই বো।
ভাঙছি এবার পাজির গোঁ!
দামড়া ধাড়ি ভূতের ছা,
ঘরে যাবি তো শিগগির যা!
লঙ্কা জিরে পাঁচফোড়ন
তবুও ব্যাটার নেই নড়ন।
তবে রে ব্যাটা ইস্টুপিট,
কোঁতকা মেরে ভাঙব পিঠ!
[হোঁদলের পিঠে কনুই দিয়ে, কোঁতকা মারবে ওঝা। হোঁদল মাটিতে চিতপটাং হয়ে পড়ে যাবে। ওঝা নাচতে নাচতে দাঁড়িয়ে পড়বে। দেখবে হোঁদলকে মুহূর্তের জন্য। তারপর বলবে—]
ওঝা : এই তো জাদু কুপোকাত,
স্লেটের পিঠে একশো আট!
ফুস ফুস ছু:! ফুস ফুস ছু:!
ওঝা : (হোঁদলকে একটু দেখে) এবার নিশ্চয় অনেকটা ভালো বুঝছ হোঁদল?
হোঁদল : (ধীরে ধীরে দাঁড়াল। তারপর হঠাৎ ‘ভ্যাঁ’ করে কেঁদে চেঁচিয়ে উঠল।) আজ্ঞে বড্ড কাঁদতে ইচ্ছে করছে। (কাঁদতে লাগল)
ব্যাব্যা : (এতক্ষণ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল হঠাৎ তার বাইরের দিকে নজর পড়ল) ওরে বাবা ওই যে!
ওঝা : কী ওই যে?
টুমটুমি : (বাইরের দিকে চেয়ে) ঝুনঝুনকে তাড়া করেছে ভূতটা!
[ওঝা প্রথমটা কেয়ারই করেনি। তারপর বাইরের দিকে চেয়ে ভয়ে চিৎকার করে একবার এদিক ছুটবে, একবার ওদিক ছুটবে। ঘর থেকে বেরিয়ে যাবার পর খুঁজবে আর চ্যাঁচাবে ‘ওরে বাবারে ভূত’। ভূত ভূত বলে চ্যাঁচাতে-চ্যাঁচাতেই বেরিয়ে যাবে। পুতুলগুলোও ভূত ভূত বলে এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করে ঘর থেকে বেরিয়ে যাবে। বেরিয়ে যাবার ঠিক পরেই ছুটতে ছুটতে ঝুনঝুন ঢুকবে। তার পেছনে তাড়া করে দত্যিছানা ঢুকবে]
ঝুনঝুন : (হাঁপাতে হাঁপাতে) উঃ! বাব্বা! কী জোর তাড়া করেছ! হাওয়ার মতো কোত্থেকে এসে আমার পেছনে এমন করে ছুটতে লেগেছ? কী, আবার এলে যে?
দত্যি : (হাসিমুখে) এসেছি বেশ করেছি! একশোবার আসব!
ঝুনঝুন : (হাসিমুখে) আমি জানি, কেন তুমি এসেছ, আমার সঙ্গে খেলা করতে এসেছ!
দত্যি : অমন করে কথা বললে আমি এক্ষুনি কেঁদে ফেলব। জানো আমি যদি কাঁদি সব্বোনাশ হয়ে যাবে!
ঝুনঝুন : কী সর্বনাশ হবে?
দত্যি : আমার কান্নার জল মাটিতে পড়লে এক-এক ফোঁটায় এক-একটা দত্যিছানা মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে আসবে!
ঝুনঝুন : ও একরত্তি, একটু কাঁদোই না! তোমার কান্নার জল মাটিতে পড়ে দু-চারটে দত্যি মাটি ফুঁড়ে বেরোক না দেখি, তাদের সঙ্গেও তোমার মতো ভাব করে নেব। খেলা করব। দেখো না, আমার একজন জানাশোনা ছেলে আছে, সেভারি ঝগড়াকুটে। রাতদিন খুনসুটি করবে। ঠিক তোমার মতো!
দত্যি : কী, আমাকে মানুষের ছেলের সঙ্গে তুলনা! এক্ষুনি তুলকালাম করে ছাড়ব। আর যাই বলো, আমাকে মানুষ বোলো না!
ঝুনঝুন : না, না, তোমাকে মানুষ বলব কেন! আচ্ছা একরত্তি তুমি তো দত্যি। তা তোমাকে এমন পুঁচকে মতো দেখতে কেন? দত্যিরা তো শুনেছি খুব লম্বা-চওড়া হয়। হাতির মতো নাকি!
দত্যি : হাতি! আরে ছ্যা ছ্যা! হাতি তো আমাদের কড়ে আঙুল! আমি বাচ্ছা-দত্যি। আমি যদি ইচ্ছে করি এক্ষুনি তালগাছের মতো লম্বা হয়ে যেতে পারি। হ্যাঁ, আমাকে যা-তা ভেব না!
ঝুনঝুন : হ্যাঁ, ঠিক বলেছ। আমার ঠানদির কাছেও এমন সব অনেক গল্প শুনেছি। তা একরত্তি এমন দুষ্টুমি করে তোমাদের লাভ কী হয়? কারো অনিষ্ট করতে তোমাদের কষ্ট হয় না?
দত্যি : কষ্ট? কীসের কষ্ট? মানুষের বাচ্চাদের আচ্ছা করে জব্দ করতে না পারলেই আমাদের কষ্ট।
ঝুনঝুন : এতে তোমরা কী আনন্দ পাও?
দত্যি : ওসব বুঝি-টুঝি না। এমনি করেই কচিবেলা থেকে আমরা বড়ো হয়ে উঠি। আমার বাবা যখন আমার মতো ছিল তখন কী করেছিল জানো?
ঝুনঝুন : কী করেছিল?
দত্যি : (থমকে থেমে) না, না, আমি কেন তোমাকে সে-গল্প শোনাই!
ঝুনঝুন : বলো না একরত্তি! গল্প শুনতে আমার খুব ভালো লাগে।
দত্যি : আবদার পেয়েছ!
ঝুনঝুন : আবদারের কী দেখলে? বেশ, তবে একটা গান শোনাও।
দত্যি : (রেগে) আমাকে কী মনে করেছ অ্যাঁ? ন্যাকা পেয়েছ যে, তোমাকে গান শোনাব?
ঝুনঝুন : তবে একটা নাচ দেখাও!
দত্যি : আরে ছ্যা-ছ্যা-ছ্যা!
ঝুনঝুন : আচ্ছা তুমি কী বলো তো! গল্প বলতে বলছি, বলবে না। গান শোনাতে বলছি, শোনাবে না। নাচ, তা-ও না। তবে একরত্তি তুমি আমার বাড়িতে এসেছ, আমি তোমায় একটা নাচ দেখাই।
দত্যি : (রেগেমেগে) না, আমি নাচ দেখব না!
ঝুনঝুন : কেন, নাচ দেখতে দোষ কী?
দত্যি : আমি ওসব পছন্দ করি না।
ঝুনঝুন : জানো একরত্তি, আমি রোজ গান গাই, নাচি। আমার কেউ গানও শোনে না, নাচও দেখে না। তুমি একটু দেখো!
দত্যি : ভালো হবে না বলে দিচ্ছি। আমি না দেখব না, দেখব না, দেখব না!
ঝুনঝুন : তোমাকে দেখতেই হবে!
দত্যি : তবে আমি পালাচ্ছি। (পালাতে উদ্যত)
ঝুনঝুন : (দু-হাত আড়াল করে) তোমায় যেতে দিলে তবে তো!
দত্যি : তাহলে আমি চোখে হাত দিয়ে বসে থাকব!
ঝুনঝুন : থাকো, বড়ো বয়েই গেল। আমি তো নাচি।
[ঝুনঝুন নাচবে। দত্যিছানা চোখে হাত দিয়ে এককোণে বসে থাকবে। তারপর একটু একটু করে চোখ থেকে আঙুল সরিয়ে চুপিসাড়ে নাচ দেখার চেষ্টা করবে। ঝুনঝুন নাচতে নাচতে দত্যিছানার দিকে ফিরবে, দত্যিছানা ঝট করে চোখে হাত চেপে ধরবে। এমনি সেকয়েকবার করবে। তারপর একসময়ে দত্যিছানা তার চোখ থেকে হাত একেবারে সরিয়ে নেবে। উঠে দাঁড়াবে]
ঝুনঝুন : (নাচ শেষ হলে) কী, কেমন লাগল নাচ? কথা বলছ না যে? এ কী, তোমার চোখে জল! কী হল তোমার?
দত্যি : (মুহূর্ত নির্বাক থেকে, কান্না-ভেজা গলায়) তুমি আমার সঙ্গে এমন করে ভাব করলে কেন? জানো না, আমি দত্যি! আমায় এক্ষুনি চলে যেতে হবে যে।
ঝুনঝুন : (হাসি মুখে) কোথায় চলে যাবে?
দত্যি : ভোর হয়ে আসছে, দেখছ না!
ঝুনঝুন : বারে, তাতে তোমার কী?
দত্যি : দিনের আলো আমরা যে সহ্য করতে পারি না। আমি তো মানুষ নই। আমি যদি মানুষ হতুম!
ঝুনঝুন : তাহলে কী করতে একরত্তি?
দত্যি : তাহলে তোমার সঙ্গে খেলা করতুম। তোমার গান শুনতুম, নাচ দেখতুম। ঝুনঝুন সত্যি তুমি খুব ভালো।
[ছুটে গিয়ে ঝুনঝুনকে জড়িয়ে ধরবে]
সঙ্গে সঙ্গে মঞ্চ অন্ধকার হবে। ঝুনঝুন নিজের বিছানায় গিয়ে শুয়ে পড়বে। দত্যি বেরিয়ে যাবে। ধীরে ধীরে আলো জ্বলবে। বোঝা যাবে ভোর হচ্ছে। ঝুনঝুন যেন স্বপ্ন দেখছে। সেঘুমের ঘোরে এপাশ-ওপাশ করছে আর ঘুমের আবেশে ডাকছে, ‘একরত্তি, শোনো! শোনো! ও একরত্তি!’)
ঝুনঝুন : (হঠাৎ ঘুম ভেঙে যাবে। অবাক হয়ে চারদিক চাইবে। উঠে বসে চোখ মুছবে।) কই একরত্তি? (একটু ভাবল) আমি কি তবে এতক্ষণ ধরে স্বপ্ন দেখছিলুম! আচ্ছা দেখি তো, কাল কাকামণি আমায় যে দত্যি-পুতুলটা এনে দিয়েছেন সেটি ঠিক আছে কিনা! (ঘরে রাখা টেবিলের কাছে যাবে। হাতে একটা দত্যি-পুতুল রাখা বাকসো নিয়ে মঞ্চের সামনে আসবে। তারপর হাসতে হাসতে বলবে) ওরে দস্যি দত্যি-পুতুল, তুমিই সারারাত দস্যিপনা করছিলে!
[বলতে বলতে বেরিয়ে যাবে। পরদা নেমে আসবে]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন