পার্থ প্রতিম পাঁজা
চরিত্র: আবুল কাশেম, গিন্নি, কয়েকজন খরিদ্দার, প্রহরী/ চৌকিদার, কাজি,
পেয়াদা, জেলে, জেলেনি, সই, যুবক, ছালাওয়ালা, ইহুদি।
১ম অঙ্ক
১ম দৃশ্য
[আবুল কাশেমের বাড়ি]
আবুল কাশেম : গিন্নি ও গিন্নি, কোথায় গেলে গো।
[গিন্নির প্রবেশ]
গিন্নি : কোথা আর যাব? খবর কী? ডাকছ কেন?
আবুল কাশেম : খবর আর কী হবে? খবর খারাপ। হাতের সম্বল সব শেষ। একটা ব্যাবসা করব, তা হাতে নাই পয়সা। কী করব, তাই ভাবছি!
গিন্নি : আমি টাকা দিচ্ছি, তুমি আবার ব্যাবসা করো। পৈত্রিক আতরের ব্যাবসা। এই নাও টাকা (টাকা দেওয়া)
আবুল কাশেম : গিন্নি, টাকা কোথায় পেলে?
গিন্নি : এ-আমার বিয়ের মুখ দেখানো টাকা।
আবুল কাশেম : এই টাকা নিয়ে বাজারে যাব। বুড়ো চাচার দোকানে আতর কিনে বোগদাদের পথে পথে ফিরি করব। এখন যাই।
[প্রস্থান]
২য় দৃশ্য
[বোগদাদের রাজপথ]
[আতরের বাক্স কাঁধে আবুল কাশেমের প্রবেশ]
আবুল কাশেম : চাই আতর, আতর চাই, চাই আতর।
গোলাপ, বেলি, চামেলির সুগন্ধে ভর ভর।।
পচা আতর কেবা নেবে,
কানের পুঁজা ভালো হবে,
আবার জামাতে লাগাও আতর, মনটি তর।।
এসো ভাই আতর দিয়ে,
বিবি যদি না থাকে ভাই, সাজো নটবর।।
এসো ভাই ছোকরা বঁধু,
দিব একটু আতর শুধু,
ছুকরি বিবি এসে কাছে ধরবে কুহুস্বর।।
নজরুল এসলামে ভনে,
সুগন্ধি আতর কিনে,
রাখো ভাই গুঁজে কানে, দিলটি হবে তর।।
[যুবক, বৃদ্ধ চার-পাঁচজন খরিদ্দারের প্রবেশ]
খরিদ্দার : দাও ভাই, আতর দাও (আবুল কাশেম আতর বিক্রি করে)
[সকলের প্রস্থান]
৩য় দৃশ্য
[আবুল কাশেমের বাড়ি]
[আবুল কাশেমের প্রবেশ]
আবুল কাশেম : গিন্নি, ও গিন্নি।
[গিন্নির প্রবেশ]
গিন্নি : কী গো, খবর কী? আতর কেমন বিক্রি হল?
আবুল কাশেম : আতর ভালোই বিক্রি হয়েছে। এই নাও টাকা (গিন্নিকে টাকা দেয়) গিন্নি, এখন খরচ বেশি কোরো না, খুদের ঘাটা করো। আমার শরীরটা ম্যাজ ম্যাজ করছে, হামামখানা হতে গোসল করে আসি।
গিন্নি : তাই যাও, গোসল করে এসো। আমি খুদ-ঘাটা করি।
[সকলের প্রস্থান]
৪র্থ দৃশ্য
[বোগদাদের হামামখানা]
[পশ্চিমা প্রহরীর প্রবেশ]
প্রহরী : এই হামামখানা কা মেই চৌকিদার।
বাবু গো মুজুমমে হ্যায় হাম, বাবুগো মুজুমকে হ্যায় হাম।
বাবু গো এই হামারা কাম, বাবুগো এই হামারা কাম।।
দ্যেশ হত মোর চিঠি আয়া,
বাড়িতে মোর লেড়কা হুয়া,
কোন শালাকো পয়দা কিয়া, হামারি বদনাম।
[আবুল কাশেমের প্রবেশ]
আবুল কাশেম : আচ্ছা গানা, আচ্ছা গানা। টাকা লেও। হাম, হামাম মে গোসল করেগা।
চৌকিদার : বাবু আপকা জুতা, ইধার মে রাখিয়ে। (আবুল কাশেম জুতো রেখে হামামে ঢোকে) এ তো আচ্ছা জুতা। খালি পট্টি, সেলাই, পট্টি সেলাই। (জুতো দুটো হাতে করে সামান্য তুলে আবার নামিয়ে।) এ তো আধমন ভারী।
আবুল কাশেম : (হামামে নেমে) যখন টাকা দিয়েছি, তখন হামাম গাবিয়ে গোসল করব। (হামামে একবার এদিকে যায়, একবার উদিকে যায়)
[কাজির বাহির দ্বারে প্রবেশ]
কাজি : কই হে চৌকিদার, গোসলের ব্যবস্থা করো। (কাজি সাহেব তার পায়ের দামি জুতো খুলে একপাশে রাখে)
চৌকিদার : উঠিয়ে বাবু, হামাম সেউঠিয়ে। কাজি সাহেব গোসল করে গা।
আবুল কাশেম : ও রে বাবা, কাজি সাহেব। (আবুল কাশেম হামাম থেকে উঠে নিজের বদলে কাজি সাহেবের জুতো দুটো নিয়ে) পালাই, তাড়াতাড়ি পালাই।
[প্রস্থান]
[কাজি সাহেব হামামে গোসল সেরে নিজের জুতো খুঁজে পায় না। চৌকিদার পট্টিমারা জুতা দুটো আনে।]
কাজি : (পট্টিমারা জুতো দেখে) এ-জুতো তো আমার নয়। এই পট্টিমারা ভারী জুতো কার হে?
চৌকিদার : হুজুর, এ আবুল কাশেম কা জুতা।
কাজি : বেটার সাহস তো কম নয়। তার পট্টিমারা জুতো রেখে, আমার জুতো নিয়ে পালায়। অ্যায় কে আছিস? আবুল কাশেমকে আমার দরবারে তলব কর।
[প্রস্থান]
৫ম দৃশ্য
[আবুল কাশেমের বাড়ি]
[আবুল কাশেম ও তার গিন্নির প্রবেশ]
[গিন্নি একটি থালায় আবুল কাশেমকে খুদ-ঘাটা দেয়। আবুল কাশেম খায়। গিন্নি পাখা হিলায়।]
আবুল কাশেম : খুদ-ঘাটাটা ভারি সুন্দর হয়েছে।
[পেয়াদার প্রবেশ]
পেয়াদা : আবুল কাশেম, আবুল কাশেম, বাহির মে আও।
আবুল কাশেম : (গলায় খুদ-ঘাটা লেগে গিয়েছে) উঁ- উঁ - উঁ কে।
পেয়াদা : আমরা কাজির পেয়াদা। এখুনি বেরিয়ে আয়, যেতে হবে কাজির দরবারে।
আবুল কাশেম : ওরে বাবা, কাজির ডাক। চল চল, জুতো দুটো নিই (জুতো দুটো নেওয়া)
৬ষ্ঠ দৃশ্য
[কাজির দরবার। কাজি বসে আছে দরবারে। পাশে পেশাদার।]
[পেয়াদাসহ আবুল কাশেমের প্রবেশ]
পেয়াদা : হুজুর, আবুল কাশেমকে ধরে এনেছি।
কাজি : আবুল কাশেম। তোমার এত সাহস যে, আমার জুতো নিয়ে, তোমার ছেঁড়াজুতো রেখে দাও।
আবুল কাশেম : হুজুর এই দেখুন, আপনার জুতো। হুজুর আপনি হামামে এসেছেন শুনে, ভয়ে আমার জুতো ফেলে, আপনার জুতো বগলে নিয়ে গিয়েছি। হুজুর আপনার জুতো পায়েই দিইনি। এই নিন হুজুর আপনার জুতো। (জুতো জোড়া নামিয়ে রাখে)
কাজি : আচ্ছা বেশ। তবে তুমি যে, তোমার ছেঁড়া পট্টিমারা জুতো হামামে ফেলে রেখে আমার জুতো নিয়ে গিয়েছ, তার জন্য তোমার এক-শো একটাকা জরিমানা।
আবুল কাশেম : (এক-শো একটাকা জরিমানা দিয়ে, নিজের জুতো নিয়ে) হায়রে জুতো, তোর জন্য আমার এক-শো এক টাকা গেল।
[প্রস্থান]
৭ম দৃশ্য
[টাইগ্রেস নদীর ধার। সন্ধ্যার নির্জন]
[আবুল কাশেমের প্রবেশ]
আবুল কাশেম : (হাতে তার পট্টিমারা ভারী জুতো) আহা রে কত সাধের! আহারে কত বছর আগে কিনেছি মনে নাই। যতবার ছিঁড়েছে, ততবার মুচিকে দিয়ে পট্টি লাগিয়ে সেলাই করেছি। তাদের পয়সা দিইনি। গালে জামায় একটু আতর ঘষে দিয়েছি। সেই জুতো। কত আদরের জুতো। বেটা কাজির ভয়ে, তোকে ফেলে দিলাম নদীর জলে। (জুতো ফেলে দিয়ে) এখন পালাই।
[প্রস্থান]
[জাল ঘাড়ে জেলে ও জেলেনির প্রবেশ]
জেলে : চাঁদনি রাত, এসো আমরা একটা গান গাই। তারপর জাল ফেলব।
জেলেনি : বেশ তাই হোক।
জেলেনি : আমার জেলে গিয়েছে মাছ ধরিতে।
আমার জেলে গিয়েছে জাল ফেলিতে।।
জেলে : কেঁদো না, কেঁদো না, ও হে নয়না,
চেয়ে দ্যাখো স্বামী এসেছে।।
জেলেনি : কই, কই, মাছ কই?
জেলে : জাল ফেলেছি, খেয়া বেঁধেছি, ধরেছি মস্তবড়ো রুই,
জেলেনি : আন-না দেখি, করি কুটি, কুটি, যাই বাজারে বেচিতে।।
জেলে : এই বার জাল ফেলি। (জেলে জাল ফেলেই কিছুক্ষণ পর দড়ি ধরে টেনে) জাল বেশ ভারী। মনে হয় বেশি মাছ পড়েছে। লাভ ভালোই হবে। (টেনে জাল তোলে) এ কী জালে এ কার জুতো উঠেছে?
জেলেনি : জালটাও ছিঁড়ে গেছে জুতোতে। মাছগুলো সব বেরিয়ে পালিয়েছে। এ কার জুতো? পট্টিমারা ছেঁড়া, আধমন ভারী।
জেলে : এ-জুতো আবুল কাশেমের। আমরা গরিব জেলে, তার জুতোতে আমাদের জাল ছিঁড়ে গেল। এখন কী করি?
জেলেনি : সকাল হলে, ছেঁড়া জাল আর জুতো নিয়ে আমরা যাব কাজির কাছে।
[প্রস্থান]
৮ম দৃশ্য
[কাজির দরবার। কাজি বসে আছে। পেশকার, পেয়াদা যথাস্থানে]
[ছেঁড়া জাল ও জুতোসহ জেলে-জেলেনির প্রবেশ]
জেলে : হুজুর সালাম।
কাজী : কী খবর, এত সকালে দরবারে কেন?
জেলে : হুজুর, আমরা গরিব জেলে। বাদশার কাছে ইজারা নিয়ে আমরা ট্রাইগ্রেস নদীতে মাছ ধরি। গতরাতে মাছ ধরতে গিয়েছিলাম। জাল ফেলেছিলাম। জালে উঠেছে এক ভারী পট্টিমারা জুতো। জুতোর ভারে জাল ছিঁড়ে গেছে। জালে যা মাছ পড়েছিল, সব মাছ পালিয়ে গিয়েছে।
জেলেনি : হুজুর, আমাদের আজ উপোস থাকতে হবে।
কাজি : দেখি, দেখি জুতো জোড়া। (জুতো দেখে) আরে এ তো আবুল কাশেমের জুতো। পেয়াদা...
পেয়াদা : হুজুর। আদেশ করুন।
কাজি : ধরে নিয়ে এসো বেটা আবুল কাশেমকে।
[পেয়াদার প্রস্থান ও সকলে প্রস্থান]
৯ম দৃশ্য
[আবুল কাশেমের বাড়ি। আবুল কাশেম খুঁদ ঘাটা খাচ্ছে। সামনে বসে বিবি পাখা হিলাচ্ছে।]
[দুয়ারে পেয়াদার প্রবেশ]
পেয়াদা : আবুল কাশেম, আবুল কাশেম।
আবুল কাশেম : কোন শা...
পেয়াদা : কাজি সাহেবকা পেয়াদা। বাহির মে আও।
আবুল কাশেম : ও রে বাবা, আবার কাজির পেয়াদা। (বাইরে আসে)
পেয়াদা : চল শালা, কাজির দরবার মে।
[আবুল কাশেমসহ পেয়াদার প্রস্থান]
১০ম দৃশ্য
[কাজির দরবার। বিচারাসনে কাজি। সামনে জেলে-জেলেনি। জালের ভেতর পট্টিমারা জুতো।]
[আবুল কাশেমকে নিয়ে পেয়াদার প্রবেশ]
পেয়াদা : আবুল কাশেমকে এনেছি হুজুর।
কাজি : (রাগে) আবুল কাশেম।
আবুল কাশেম : হুজুর।
কাজি : (ছেঁড়া জালের ভেতর জুতো দেখিয়ে) এ জুতো কার?
আবুল কাশেম : হুজুর, এ-জুতো আমার।
কাজি : তোমার জুতো নদীতে কীভাবে এল?
আবুল কাশেম : হুজুর, এই জুতোর জন্যে আপনার দরবারে অপমানিত হয়েছি। তাই মনের দুঃখে, গতরাতে ট্রাইগ্রেস নদীর জলে ফেলে দিয়েছিলাম।
কাজি : (জেলে-জেলেনিকে দেখিয়ে) আর ওই জুতো এই গরিবদের জালে উঠে, ছিঁড়ে দিয়েছে জাল। এখন জাল কিনতে হবে ওদের। জরিমানা দাও এক-শো এক টাকা। (আবুল কাশেম এক-শো এক টাকা জরিমানা দেয়। কাজি সেই টাকা জেলেকে দেয়)
শোনো আবুল কাশেম, তোমার এই জুতো চোখে চোখে রাখবে। ভবিষ্যতে যেন, তোমার এই জুতো আর কোনো নগরবাসীর ক্ষতি না করে।
আবুল কাশেম : হুজুর, জুতো আমি এবার চোখে চোখে রাখব।
[প্রস্থান]
১১তম দৃশ্য
[আবুল কাশেমের বাড়ি]
[জুতো হাতে আবুল কাশেমের প্রবেশ]
আবুল কাশেম : ওঃ এই জুতোর জ্বালায়, দু- দু-বার জরিমানা দিতে হল। আবার কাজি সাহেবের হুকুম, জুতো চোখে চোখে রাখতে হবে। (নিজের শোয়ার খাটের কিছু ওপরে একটা শাঙায়, দড়ি দিয়ে জুতো দুটোকে শক্ত করে বেঁধে রাখল।) ব্যস এই জুতো বাঁধা থাকল। জুতোও থাকবে।
[গিন্নির প্রবেশ]
গিন্নি : জুতো নিয়ে, কী করছ, গো?
আবুল কাশেম : জুতো দুটো, চোখে চোখে রাখবার জন্যে শাঙায় বেঁধে রাখলাম। এখন বাজারে আতর বিক্রি করতে যাই।
[প্রস্থান]
[কোলে দামাল ছেলে নিয়ে আবুল কাশেমের বিবি সই-এর প্রবেশ।]
সই : সই আছ নাকি? সই।
গিন্নি : এসো, এসো, সই এসো। (সই-এর ছেলেকে কোলে নেয়।)
সই : সই, সয়া কোথা।
গিন্নি : সেবাজারে গেল। তুমি দু-দিন বেড়াও।
সই : সই হে সই, দুটো মনের কথা কই।
২য় অঙ্ক
১ ম দৃশ্য
[দু-দিন পর]
সই : (কোলে ছেলে নিয়ে) উঠল নাকি দেখি। (এদিকে ইঁদুর জুতো, দড়ি কেটে দিয়েছে, আর জুতো পড়ে ঘুমন্ত ছেলের বুকে, আর মরে পড়ে আছে ছেলে।) এ কী? ও মা গো, আমার ছেলে মরে গিয়েছে গো!
[হন্তদন্ত গিন্নির প্রবেশ]
গিন্নি : কী হল সই? কী হল?
গিন্নি : (কান্না) ও গো আমার কী হল গো?
ও গো আমার সাঁঝের চেরাগ নিবিয়ে গেল গো।
গিন্নি : দেখি, দেখি ছেলে দেখি।
সই : (কান্না) ও গো, আমার ছেলে দেখতে হবে না গো, আমি কাজির কাছে যাব গো।
[ছেলে নিয়ে কাঁদতে কাঁদতে সই-এর প্রস্থান]
২য় দৃশ্য
[কাজির দরবার। বিচারাসনে কাজি। পেশকার, পেয়াদা ও অনুচরগণ যথাস্থানে মরা ছেলে কোলে সই-এর প্রবেশ।]
কাজি : কে তুমি, কী চাও?
সই : হুজুর, আমি বোগদাদ শহরের, আপনার এক প্রজার স্ত্রী। (মরা ছেলেকে দেখিয়ে) আমার এই শিশুকে আবুল কাশেম, তার জুতো দিয়ে মেরে ফেলেছে।
কাজি : (রাগান্বিত হয়ে) আবার আবুল কাশেমের জুতো, এবারে জাল ছেঁড়া নয় শিশুহত্যা।
[এক ইহুদির প্রবেশ]
ইহুদি : সালাম কাজি সাহেব।
কাজি : কে তুমি? কী চাও?
ইহুদি : আমি একজন ইহুদি। আমি সুদে টাকা ধার দিই। এই শহরের আবুল কাশেম চুক্তি করে আমার নিকট টাকা ধার করেছে। এখন চুক্তিমতো কাজ করছে না। তাই তার বিরুদ্ধে আপনার দরবারে নালিশ জানাতে এসেছি।
কাজি : পেয়াদা।
পেয়াদা : হুজুর।
কাজি : যাও, আবুল কাশেমকে তলব দিয়ে দরবারে হাজির করো।
[অনুচরসহ পেয়াদার প্রস্থান]
৩য় দৃশ্য
[আবুল কাশেমের বাড়ি। খুঁদ-ঘাটা খাচ্ছে। গিন্নি পাখা হিলাচ্ছে। বাহির দরজায় পেয়াদার প্রবেশ]
পেয়াদা : আবুল কাশেম, আবুল কাশেম।
আবুল কাশেম : ওই এসেছে কাজির পেয়াদা। এই বার নির্ঘাত ফাঁসি হবে।
[আবুল কাশেম বাইরে আসে।]
পেয়াদা : চল ব্যাটা, কাজির দরবারে।
[সকলের প্রস্থান]
৪র্থ দৃশ্য
[পথে যেতে যেতে সন্ধ্যা]
[পেয়াদা অনুচর ও আবুল কাশেমের প্রবেশ]
পেয়াদা : সন্ধ্যা হয়েছে। আজ রাতটা এই গ্রামে থাকতে হবে।
[পথের ধারে এক বৈঠকখানা। বারান্দায় বসে এক বৃদ্ধ। সামনে এক যুবক।]
পেয়াদা : মশায় আমি কাজি সাহেবের পেয়াদা। সঙ্গে একটা আসামি আছে। আজ রাতটা আপনাদের এখানে একটু থাকতে চাই।
যুবক : বেশ, থাকুন এখানে।
পেয়াদা : আমরা থাকব বাইরে। আর (আবুল কাশেমকে দেখিয়ে) এই আসামিটিকে ঘরে রাখতে হবে।
যুবক : (বুড়োকে দেখিয়ে) এই আমার বাবা, বুড়ো মানুষ ঘরে থাকবে, আর ওই ঘরের একপাশে আসামি থাকবে।
পেয়াদা : তাই হবে।
[বুড়ো ঘরের ভেতর তক্তার ওপর থাকল। একপাশে থাকল আবুল কাশেম। বাইরে থাকল পেয়াদা ও অনুচর।]
[গভীর রাত। বুড়ো ঘুমিয়ে আছে। আবুল কাশেম ঘুম থেকে জেগে।]
আবুল কাশেম : আর নিস্তার নাই। শিশুর মৃত্যু। নির্ঘাত ফাঁসি হবে। তার চেয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মরি। বুড়ো যেখানে শুয়ে আছে, তার ওপরের শাঙায় গলায় দড়ি দিয়ে ঝুলে পড়ল আবুল কাশেম। সঙ্গে সঙ্গে দড়ি ছিঁড়ে পড়ল বুড়োর ওপর।
[সকাল হল। পেয়াদা ও যুবক ঘরে ঢুকল।]
পেয়াদা : এই আবুল কাশেম ওঠ।
যুবক : বাবা, অনেক ভোরে ওঠে, তা এখন উঠল না। (বুড়োর ওপর আবুল কাশেমকে দেখে) এ কী। আরে বাবার ওপর আসামি। (বুড়োকে নাড়া দিয়ে) বাবা, বাবা। এ কী। বাবা যে, মরে গেছে।
আবুল কাশেম : (তক্তা থেকে নেমে) অ্যাঁ। আমি মরি নাই। আমি যে গলায় দড়ি দিয়েছিলাম। তা পড়ে গেলাম বুড়োর ওপরে। (দর্শকদের দিকে চেয়ে) তা ‘কঁক’ করে একটা শব্দ হল, বোধ হয় বুড়ো মরেছে গো।
যুবক : (আবুল কাশেমকে) তুমি আমার বাবাকে মেরেছ। চল আমিও যাব কাজির দরবারে। চাইব কাজির বিচার।
[সকলের প্রস্থান]
৫ম দৃশ্য
[জল-কাদা পথ। এক ছালাওয়ালা, পথে যেতে যেতে তার ছালার বলদ পথের ওপর নালার কাদায় বসে গিয়েছে। বলদ উঠতে পারছে না।]
[পেয়াদা, আবুল কাশেম, যুবক ও অনুচরদের প্রবেশ]
যুবক : এ যে, ছালার বলদ বসে গিয়েছে।
ছালাওয়ালা : (সকলকে) ও ভাই, আমার ছালার বলদটা কাদায় বসে গিয়েছে। আপনারা সকলে মিলে ধরে একটু তুলে দিন। নইলে এখানেই পড়ে থাকতে হবে। বলদটা মরে যাবে।
পেয়াদা : ধরো হে সকলে মিলে।
[পেয়াদা ধরে মুখ, যুবক ধরে পাঁজর আর আবুল কাশেম ধরে ল্যাজ।]
আবুল কাশেম : তোলো-তোলো-তোলো হেঁৎ-হেঁৎ-হেঁৎ
[বলদ উঠল, কিন্তু বলদের ল্যাজটা ছিঁড়ে গেল, ল্যাজটা রইল আবুল কাশেমের হাতে।]
ছালাওয়ালা : আঃ। করলে কী গো? হায়, হায়, আমার বলদের ল্যাজটা ছিঁড়ে দিলে গো। এই বলদটা আমার সম্বল। ছালা বয়ে কোনো রকমে আমার পেট চলে।
আবুল কাশেম : তা আমি কী করব, ধরতে বললে, টান দিয়ে ধরলাম। তোমার বলদের ল্যাজ পোকা লাগা। তাই টানে ছিঁড়ে গেল। ভালো ল্যাজ হলে কখনো ছেঁড়ে।
ছালাওয়ালা : তা জানি না, আমার বলদের ল্যাজ যেমন ছিল, তেমনি করে দিতে হবে।
আবুল কাশেম : আমি কী জাদু মন্তর জানি? তাই যেমনকার ল্যাজ, তেমনি করে দিব?
ছালাওয়ালা : তা না-হলে, আমি যাব কাজির কাছে।
আবুল কাশেম।। তা চলো কাজির কাছে, বিচারে যা-হয় হবে।
[প্রস্থান]
৬ষ্ঠ দৃশ্য
[কাজীর দরবার। পেশকার, অনুচর যথাস্থানে বসে। কাজী বিচারাসনে। সামনে ফরিয়াদি, সই ও ইহুদি।]
[পেয়াদা আবুল কাশেম, যুবক, ছালাওয়ালার প্রবেশ]
পেয়াদা : সালাম হুজুর। আবুল কাশেমকে ধরে এনেছি।
কাজী : এরা সব কারা?
পেয়াদা : হুজুর, ওদের জিজ্ঞাসা করুন, সব জানতে পারবেন।
কাজী : (সকলকে) তোমরা একে একে তোমাদের কী বলার আছে বলো।
যুবক : হুজুর, আপনি বিচারক, হুজুর এই আবুল কাশেম আমার পিতাকে মেরেছে।
ছালাওয়ালা : হুজুর, এই আবুল কাশেম, আমার ছালার বলদের ল্যাজ ছিঁড়ে দিয়েছে।
কাজি : আ-বু-ল কা-শে-ম।
আবুল কাশেম : হুজুর, আমার কোনো দোষ নাই।
কাজি : (সই, ইহুদি, যুবক, ছালাওয়ালাকে দেখিয়ে) এরা সকলেই তোমার ফরিয়াদি।
আবুল কাশেম : হুজুর, আপনি দেশের কাজি। আপনি বিচার করে যে, রায় দেবেন, আমি মাথা পেতে তা মেনে নেব।
কাজি : আমি সূক্ষ্ম বিচার করব। (সইকে) তোমার মামলা কী?
সই : এই আবুল কাশেম, আমার সোনার শিশুকে মেরেছে।
কাজি : আবুল কাশেম, তুমি কী বলতে চাও?
আবুল কাশেম : হুজুর, আমি ওর শিশুকে মারি নাই। হুজুর, আমি কী এমনিই পাষন্ড যে, একটি নিষ্পাপ শিশুকে মেরে ফেলব। হুজুর, আপনি হুকুম দিয়েছিলেন, জুতো চোখে চোখে রাখতে। তাই হুজুর সেই জুতো জোড়া, আমি যে-ঘরে শুই, সেইঘরে, খাটের ওপরে শাঙায় বেঁধে রেখেছিলাম। এই মেয়েটি আমার গিন্নির সই। আমাদের বাড়িতে বেড়াতে এসে, দিনের বেলায় ছেলেটি শুইয়ে রেখেছিল, আমার খাটে। ইঁদুর জুতোবাঁধা দড়ি কেটে দিয়েছে, আর জুতো দুটো পড়েছে ঘুমন্ত ছেলের ওপরে। ভারী জুতো, ছেলে সঙ্গে সঙ্গে মরে গিয়েছে। আমি হুজুর বাজারে ছিলাম। এই ছেলে, আমি মারিনি হুজুর।
কাজি : (সইকে) আবুল কাশেম তো তোমার ছেলে মারেনি। এ তো দুর্ঘটনা। তুমি কিছু টাকা নাও।
সই : টাকা আমি নিব না হুজুর, আমি ছেলের বদলে ছেলে চাই।
কাজি : তাই কী হয়। যাও তুমি চলে যাও।
[সই-এর প্রস্থান]
আবুল কাশেম : (দর্শকদের দিকে চেয়ে) কাজির বিচার সূক্ষ্ম বিচার।
কাজী : (ইহুদিকে) তোমার কী অভিযোগ?
ইহুদি : হুজুর, আবুল কাশেম, আমার কাছে একশত টাকা ধার নিয়েছে। চুক্তি ছিল, দু-দিনের মধ্যে ধার শোধ করবে। শর্ত ছিল, দু-দিন পার হলে, ওর শরীরের যেকোনো অংশ হতে এক সের মাংস কেটে নিব। কোনো সুদের কথা ছিল না।
কাজি : আবুল কাশেম। ইহুদির সঙ্গে তোমার এই শর্ত ছিল?
আবুল কাশেম : হ্যাঁ হুজুর ছিল।
কাজি : (ইহুদিকে) আবুল কাশেম তোমার সঙ্গে এই চুক্তির কথা স্বীকার করছে, তা তুমি এক কাজ করো। টাকাটা সুদসমেত ফেরত নাও।
ইহুদি : না হুজুর, আমি টাকা নেব না, মাংসই নেব।
কাজি : চুক্তি যখন আছে, আর আসামি চুক্তি যখন স্বীকার করেছে, তখন সঠিক বিচার আমাকে করতে হবে। ইহুদি, তুমি আবুল কাশেমের শরীর হতে এক সের মাংস কেটে নিতে পারো। ছুরি নিয়ে এসো।
ইহুদি : (ধারালো ছুরি হাতে এগিয়ে আসে) হুজুর, সূক্ষ্ম বিচারক। মাংস কাটতে এগিয়ে যায়।
কাজি : (ইহুদিকে) দাঁড়াও। যে-মাংসটা কাটবে, সেটা যেন, ঠিক এক সের হয়। একটু কম বা একটু বেশি যেন না-হয়। আর খুন যেন না পড়ে।
ইহুদি : হুজুর আন্দাজে কাটব, একটু বেশি-কম হবে। আর মাংস কাটতে গেলেই খুন পড়বে।
কাজি : চুক্তিপত্রে এক সের মাংসের কথা আছে, আর খুন ঝরার উল্লেখ চুক্তিপত্রে নাই।
ইহুদি : তাহলে, আমি মাংস নেব না, সুদসমেত টাকাটা আমাকে দেওয়া হোক।
কাজি : না, তাও তুমি পাবে না। প্রথমেই তোমাকে তা দিতে চেয়েছি, তুমি তা নাওনি। তুমি যাও। (পেয়াদাকে) ডাকো ওই যুবককে।
[যুবকের প্রবেশ]
আবুল কাশেম : কাজির বিচার, সূক্ষ্ম বিচার।
[যুবক আসে কাজির সামনে]
কাজি : তোমার অভিযোগ কী?
যুবক : হুজুর, এই আবুল কাশেম, আমার বুড়ো বাপকে মেরেছ।
কাজি : আবুল কাশেম।
আবুল কাশেম : হুজুর।
কাজি : তুমি এই যুবকের বুড়ো বাপকে মেরেছ?
আবুল কাশেম : না হুজুর, আমি মারি নাই।
কাজি : তাহলে বুড়ো মারা গেল কীভাবে?
আবুল কাশেম : হুজুর আপনার পেয়াদা, আমাকে ধরে আনছিল। পথে রাত হল। রাতে আমাকে এই যুবকের বাবা বুড়ো যে-ঘরে থাকে, সেই ঘরে রাখল। পেয়াদারা বাইরে শুল। রাতে আমি ভাবলাম, আমার ফাঁসি হবে, তাই ভয়ে গলায় দড়ি দিয়ে মরতে গেলাম। দড়ি ছিঁড়ে পড়লাম বুড়োর ওপরে। আমার মনে হয়, বুড়ো আগেই মরে গিয়েছিল।
কাজি : তাহলে গলা টিপে, বুড়োকে মারোনি তুমি।
আবুল কাশেম : না হুজুর। তা হলে পাপ হবে না।
কাজি : এটা দুর্ঘটনা। আবুল কাশেম তো তোমার বুড়ো বাপকে মারেনি। তা তুমি কিছু টাকা নাও।
যুবক : না হুজুর, আমি টাকা চাই না, বাপের বদলে বাপ চাই।
কাজি : তাহলে তুমি এই আবুল কাশেমকে, তোমার বাড়ি নিয়ে যাও। একেই তোমার বাপ মনে করবে। তোমার বাপ যা খেত, একেও তাই খাওয়াবে। মরা মানুষকে তো বিচার করে বাঁচানো যাবে না।
[যুবকের প্রস্থান]
আবুল কাশেম : কাজির বিচার, সূক্ষ্ম বিচার।
কাজি : (পেয়াদাকে) ডাক, ছালাওয়ালাকে।
[ছালাওয়ালা কাজির সামনে আসে]
তোমার কী অভিযোগ?
ছালাওয়ালা : হুজুর, এই আবুল কাশেম, আমার ছালার বলদের ল্যাজ ছিঁড়ে দিয়েছে।
কাজি : আবুল কাশেম।
আবুল কাশেম : হুজুর।
কাজি : তুমি এই ছালাওয়ালার ছালার বলদের ল্যাজ ছিঁড়ে দিয়েছ?
আবুল কাশেম : না হুজুর, আমি ওর ছালার বলদের ল্যাজ ছিঁড়ি নাই।
কাছি : তাহলে ল্যাজ ছিঁড়ল কীভাবে?
আবুল কাশেম : হুজুর, পেয়াদা আর এই যুবকের সঙ্গে আমরা পথে পথে আসছিলাম। পথের মাঝে একটা ভাঙালের কাদায় বসে গিয়েছিল ওর ছালাওয়ালা বলদ। ছালাওয়ালা আমাদের দেখে বললে, ভাই ছালার বলদটা তুলে দিন। বলদটার চারিপাশে সবাই ধরল। আর আমি ধরলাম ল্যাজ। টান দিতেই ল্যাজ ছিঁড়ে গেল। ল্যাজে ছিল ঘা, পোকা হয়েছিল। তবে বলদ কাদা থেকে উঠে গেল।
কাজি : তাই নাকি?
কাজী : (পেয়াদাকে) এ-কথা ঠিক।
পেয়াদা : হ্যাঁ হুজুর ঠিক।
কাজি : (ছালাওয়ালাকে) তুমি কিছু টাকা নাও। কারণ আবুল কাশেম তো ইচ্ছা করে তোমার বলদের ল্যাজ ছিঁড়ে দেয়নি।
ছালাওয়ালা : না হুজুর, আমি টাকা নেব না, আমার সাধের বলদের ল্যাজ যেমন ছিল, তেমনি করে দিতে হবে।
কাজি : ছেঁড়া ল্যাজ জোড়া লাগে না। তুমি এক কাজ করো। ওই বলদ আবুল কাশেমকে দাও। খড়, খইল, খরচ-পত্র দাও। বলদটাকে ও খাওয়াবে যখন ল্যাজ হবে, তখন তুমি বলদ নিয়ে যাবে।
আবুল কাশেম : সূক্ষ্ম বিচার, কাজির বিচার।
ছালাওয়ালা : আমি নিজেই খড় খইল খাওয়াব, নিজের বাড়িতে রাখব।
কাজি : যাও তাহলে।
[প্রস্থান]
আবুল কাশেম : (দর্শকদের দিকে চেয়ে) কাজির বিচার সূক্ষ্ম বিচার। কাজি সাহেব, তাহলে আমার ছুটি।
কাজী : হ্যাঁ তুমি বাড়ি যাও।
[সকলের প্রস্থান]
[ছোটোদের মতো করে সম্পাদিত
কৃতজ্ঞতা স্বীকার: ‘বুলবুল’ পত্রিকা]
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন