যেদিন জাগবে মুকুল বিমল ঘোষ

পার্থ প্রতিম পাঁজা

চরিত্র: মুকুলরানি, অতীত, বর্তমান, ভবিষ্যৎ, রেশমি, শৌখিনী, খাদি, রাখাল ছেলে, বাসনওয়ালা, চোর, ডাক্তার, ফুলবাবু, সৈনিক।

[সাতটি মেয়ের সাজপোশাক]

মুকুলরানি : হালকা সবুজ রং-এর শাড়ি, হলদে জামা, মাথায় ফুলের কুঁড়ির মুকুট, হাতে ও গলাতে ফুলের কুঁড়ির গয়না পরবে। অন্য কোনো গয়না পরা চলবে না। মেয়েটি স্বাস্থ্যবতী ও সুন্দরী হওয়া চাই।

রেশমি : যেকোনো একরঙা সিল্ক বা গরদের শাড়ি ও জামা—নকল মুক্তার হার, চুড়ি প্রভৃতি গয়না পরবে। চুলগুলি রুক্ষ করে নিলে ভালো হয়।

শৌখিনী : পাতলা অর্গ্যান্ডি বা ভয়েলের ফ্রক পরবে, চুলগুলি বব করা, ছোট্ট একটি মেয়ে হলেই ভালো হয়, পায়ে মোজা ও জুতো। মাথায় মেমেদের মতো ‘বো’ বাঁধা।

খাদি : সবুজ খদ্দরের জামা, গেরুয়া রঙের খদ্দরের শাড়ি, গায়ে সাদা খদ্দরের ওড়না।

অতীত : পুরোনো ধরনের তাগা, বাজু, মল, নাকে নথ বা নোলক প্রভৃতি গয়না পরবে, পুরোনো ফ্যাশনের বেনারসি শাড়ি, পুরোনো ফ্যাশনের জামা পরবে। সবসময়ে ঘোমটা দিয়ে থাকবে। এই মেয়েটি মোটাসোটা ও একটু জবুথবু গোছের হলে আরও ভালো হয়।

বর্তমান : খুব হাল ফ্যাশনের জামা, কাপড় ও গয়না পরবে, বিনুনি ঝুলিয়ে চুল বাঁধবে, ঠোঁটে ও গালে রং মাখবে, হাতে একটা ভ্যানিটি ব্যাগ নেবে, পায়ে হাই-হিল জুতো পরবে। অভিনয়ের সময় মাঝে মাঝে ব্যাগ থেকে আরশি বার করে ঠোঁটে ও গালে রং দেবে, রুমাল দিয়ে মুখ মুছবে ইত্যাদি অর্থাৎ যথাসম্ভব আধুনিক ভঙ্গি করতে হবে।

ভবিষ্যৎ : চওড়া, লালপাড় মোটা মিলের শাড়ি গাছকোমর করে পরবে, হাতে থাকবে শুধু দু-গাছি কঙ্কণ, মাথার চুলগুলিকে মাথার ওপরে টেনে এনে সাঁওতালদের মতো চুড়ো করে বাঁধতে হবে। কপালে থাকবে চন্দন আর সিঁদুরের টিপ। এক হাতে থাকবে কতকগুলি বই, অপর হাতে শঙ্খ, কোমরে গোঁজা থাকবে চকচকে ছোরা। মেয়েটি নিখুঁত স্বাস্থ্যবতী হওয়া চাই।

[ছ-টি ছেলের সাজপোশাক]

রাখাল ছেলে : কোমর বেঁধে খাটো করে করে হলদে রঙের কাপড় পরবে, খালি গা, মাথায় গামছার পাগড়ি, হাতে বাঁশের বাঁশি, আর পাঁচন বাড়ি।

বাসনওয়ালা : ফতুয়া গায়ে দিয়ে, খাটো করে কাপড় পরবে, মাথায় নেবে ঝুড়িতে কতকগুলো বাসনকোসন, হাতে নেবে একটা ছোটো কাঁসি, টং-টং করে বাজাতে হবে, যেমন করে বাসনওয়ালারা বাজায়।

চোর : গোঁফদাড়ি পরে বা কালিঝুলি মেখে চেহারাটাকে ভয়ংকর করতে হবে। পোশাকটা কালো প্যান্ট আর কালো ফতুয়া হলেই ভালো হয়। হাতে থাকবে খেলার রিভলভার আর কোমরে ছোরা।

ডাক্তার : বুড়ো সাজতে হবে, প্যান্ট-কোট বা ধুতি চাপকান পরবে, গলায় থাকবে স্টেথোস্কোপ, হাতে থাকবে মস্তবড়ো বোতলে রং করা জল, বোতলের গায়ে বড়ো বড়ো করে লেখা থাকবে Mixture, আর এক হাতে বড়ো যেকোনো একটা সাদা পিচবোর্ডের বাক্স, তার গায়ে লেখা থাকবে Tablets.

ফুলবাবু : কোঁচানো কাপড়, গিলে করা আদ্দির পাঞ্জাবি, পায়ে শৌখিন জুতো, গলায় জরির চাদর, চোখে চশমা।

সৈনিক : এই ছেলেটি খুব সুস্থ সবল ও বেশ লম্বা-চওড়া হওয়া চাই, ছেলেটিকে পরতে হবে খাকি হাফপ্যান্ট, খাকি হাফশার্ট, মাথায় খাকি গান্ধি টুপি, কোমরে তলোয়ার, পায়ে মোজা, জুতো আর পট্টি। হাতে লম্বা লাঠিতে জাতীয় পতাকা।

এইভাবে সকলের সাজগোজ করার আগে আর একটি জিনিস আগে থেকে শিখে রাখতে হবে, সেটি হচ্ছে ‘ভবিষ্যৎ’ যে-সাজবে তাকে সামনে রেখে, দু-জন দু-জন করে পরপর থেকে—একসঙ্গে সকলে বাজনার তালে তালে মার্চ করতে শেখা। কারণ এটি ভালো শেখা না হলে, নাটকটি মোটেই জমবে না। বাজনার সঙ্গে সঙ্গে মার্চ করাটা আগে থেকেই অভ্যেস করবে এইভাবে—সামনে থাকবে ভবিষ্যৎ, তার পরেই মুকুলরানি আর সৈনিক পাশাপাশি, তারপর থাকবে রাখাল ছেলে আর খাদি, তারপর থাকবে ডাক্তার আর অতীত, তারপর বাসনওয়ালা আর রেশমি, ফুলবাবু আর বর্তমান, চোর আর শৌখিনী। নাটকের শেষ যখন হবে, তখনও ঠিক এইভাবে পরপর দাঁড়িয়ে মার্চ করতে হবে স্টেজের ওপর। এটা ভুললেই সব মাটি। আচ্ছা এইবার নাটিকাটি শুরু করা যাক।

যেদিন জাগব মুকুল

[স্টেজের ঠিক মধ্যিখানে একটা বেদিতে মুকুলের সাজিটি পড়ে রয়েছে। মুকুলরানি ছুটতে ছুটতে এল, চোখে তার চঞ্চলতা আর আনন্দ! কী যেন সেজানতে পেরেছে, তাই ভারি খুশি হয়ে বলছে—]

মুকুলরানি : জেনেছি, জেনেছি ঠিকই জেনেছি, নয়কো এত ভুল

আমরা সবাই বাংলা দেশের আশারই মুকুল

গুণে-জ্ঞানে বড়ো হয়েই, ফুটব হয়ে ফুল!

...কিন্তু উপায় বলে দেবে কে? (সাজিতে মুকুলগুলির দিকে আঙুল দেখিয়ে)

ওরাই পারে বলে দিতে, ওরাই জানে জীবনের জয়গান, ফুটে ওঠার সন্ধান।

মুকুলরানি : গান

সৌরভে কীসে দিক ভরে যাবে

হাসিবে জন্মভূমি,

কীসে হবে আশা সফল মোদের

বলো তো মুকুল তুমি?

বলো তো মুকুল, ভেঙে দাও ভুল,

কোন পথে যাব আমি?

‘অতীত’ হবে কি মোদের প্রিয়?

‘বর্তমান’ কি দামি?

কারে নেব বেছে, কারে নেব কাছে,

বলে দাও তুমি,

সৌরভে কীসে দিক ভরে যাবে,

হাসিবে জন্মভূমি।

[স্টেজের বাঁ-দিক থেকে ‘অতীত’ খোঁড়াতে খোঁড়াতে ঢুকল।]

অতীত : ‘অতীত’ তোমার প্রিয় হউক, ওগো মুকুলরানি

‘অতীত’কে ভাই চেনা সহজ—সহজে নাও জানি

‘বর্তমান’টা জটিল বড়ো, নয়কো মোটেই সোজা

‘বর্তমান’কে নিয়ে শেষে, বাড়াবে কি বোঝা?

[‘অতীত’ বেদির বাঁ-পাশে গিয়ে দাঁড়াল। স্টেজের ডান দিক থেকে ‘বর্তমান’ ঢুকল।]

[অতীতের মুখের কথা কেড়ে নিয়েই সেবলবে]

বর্তমান : ‘অতীত’ নিয়ে চলবে না আর যুগ চলেছে ঘুরে,

সামনেতে তাই ‘বর্তমান’টাই, ‘অতীত’ গেছে দূরে,

হয়তো ‘অতীত’ মহান ছিল আদর্শতেও বড়ো,

কিন্তু ‘অতীত’ আজ পেছনে, ভয়েই জড়সড়,

‘বর্তমান’-এর মান বেড়েছে, লোকের কাছে তাই,

‘বর্তমান’কে নাও-না বেছে, এটাই আমি চাই।

[বর্তমানের কথা শেষ হওয়ার আগেই ‘ভবিষ্যৎ’ খুব ভয়ে ভয়ে পা টিপে টিপে এসে, মুকুলরানির পেছনে দাঁড়াবে, তারপর বর্তমানের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সেখুব করুণ সুরে ও ভয়ে ভয়ে বলবে—]

ভবিষ্যৎ : ‘বর্তমান’-এর মতো আমার নেই তো পরিচয়

কেউ দেখেনি আমায় আজও, তাই তো এত ভয়।

‘বর্তমান’-এর মেজাজ রুক্ষ, করছে হানাহানি

ঘটবে তাতেই মৃত্যু ওদের, সেটাও আমি জানি।

‘বর্তমান’-এর বাড়াবাড়ি—সইবে কেমন করে?

হিংসাদ্বেষের আগুনে সব মুকুল যাবে ঝরে!

কিন্তু আমি কেমন করে, সেই কথাটাই বলি?

চিনবে না তো ওরা আমায়, তার চেয়ে যাই চলি।

[‘ভবিষ্যৎ’ ঘাড় ফিরিয়ে চোখ মুছতে মুছতে চলে যেতে উদ্যত—এমন সময় মুকুলরানি তার হাত ধরে ফেলল।]

মুকুলরানি : মোদের মতন নতুন তুমি, মিষ্টি তোমার কথা!

বর্তমানের দম্ভ দেখে, জেগেছে ভাই ব্যথা?

অচেনা আর অ-দেখা গো বন্ধু তুমিই হলে

নূতন প্রাণের আলো কোথায়, তুমিই দেবে বলে।

এই যে আমার সাজির মুকুল, তোমায় এনে দেছে,

ওর-ই কথায় আরও ক-টি জিনিস নেব বেছে।

বোসো আমার এই বেদিতে, সখা, বন্ধু, গুরু!

সব পাওয়া মোর শেষ হলে ভাই, যাত্রা হবে শুরু।

[মুকুলরানি ভবিষ্যৎকে ধীরে ধীরে বেদিতে বসিয়ে, সাজি থেকে ফুলের মালা নিয়ে তার গলায় পরিয়ে নিয়ে, নিজে বেদির নীচে বসল, তারপর সাজি থেকে একটি মুকুলশাখা নিয়ে আবার প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে গান ধরল—]

গান

মুকুলরানি : বলো তো মুকুল, ভেঙে দাও ভুল,

পোশাক কোনটি দামি?

খাদি, শৌখিনী, রেশমি রঙিন।

কারে বেছে নেব আমি?

মোরে কে সাজাবে সুন্দর করে,

বলো তো মুকুল তুমি?

সৌরভে কীসে দিক ভরে যাবে,

হাসিবে জন্মভূমি?

কীসে হবে আশা সফল আমার,

বলো তো মুকুল তুমি?

[বাঁদিক থেকে রেশমি নাচতে নাচতে ঢুকল]

রেশমি : বড়োলোকের মতো যদি বাহার দিতে চাও

আজেবাজে জিনিস ফেলে, আমায় বেছে নাও

চকচকে রূপ, ঝকঝকে দেহ, অনেক টাকা দাম,

আমায় বেছে নাও যদি তো—বাড়বে তোমার নাম।

[ডান দিক থেকে শৌখিনী নাচতে নাচতে ঢুকল]

শৌখিনী : হালকা পোশাক, হালকা মন আর বিলাস যদি চাও

রেশমি পশমি বাদ দিয়ে সব, আমায় বেছে নাও!

বিলিতি সুতোয়, বিলিতি কলে, জন্ম লভেছি আমি,

‘অর্গ্যান্ডি’, ‘ভয়েল’ বলে পরিচিতি, নই খুব বেশি দামি।

[মুকুলরানি বিরক্ত হয়ে চোখে হাত চাপা দেবে, কিন্তু সহসা খাদির কান্নার সুরে সেচমকে উঠবে—মন দিয়ে ‘খাদি’-র কথাগুলি শুনবে।]

[বাঁ দিক থেকে ‘খাদি’ চোখ মুছতে মুছতে ঢুকল, গলায় তার কান্নার সুর, সেবলবে]

খাদি : সৃষ্টি আমার মানুষেরই হাতে—

চাষেরই কাপাস ফলে,

গরিবের ঘরে জন্ম আমার, অভাবে চোখের জলে।

স্বদেশের তাঁতে, মোটা সুতো দিয়ে,

গড়া বলে মোর দেহ

শৌখিন যত বাবু-বিবি তাই, ছোঁয় না

আমারে কেহ

দেখতেও আমি নই চকচকে—রঙেতে অরূপ নই

সাধারণ মোর পরিচয়টুকু কেমনে মুকুলে কই?

[মুকুলরানি ‘খাদি’র কান্নার সুরে নিজেও কেঁদে ফেলেছিল, এইবার সেতাড়াতাড়ি উঠে ‘খাদি’র হাত দু-টি ধরে বলবে]

মুকুলরানি : হবে নাকো দিতে পরিচয় আর,

চিনেছি তোমারে আমি

এ-দেহ সাজাবে তুমিই আমার

‘খাদি’ই পোশাক দামি

এই যে, আমার সাজির মুকুল।

তোমায় দিয়েছে এনে

এর-ই কাছ থেকে সাথি কেবা মোর,

শুধু নিই সেটা জেনে।

[খাদি বাঁ-দিকে গিয়ে দাঁড়াল, মুকুলরানি আবার বেদির নীচে বসে সাজি থেকে একটি ‘মুকুলশাখা’ তুলে নিয়ে প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে গান ধরল—]

মুকুলরানি : বলো তো মুকুল, ভেঙে দাও ভুল,

কে মোর বন্ধু হলে,

জীবনের পথে জয়গান গেয়ে,

নির্ভয়ে যাব চলে?

মোরে কে তুষিবে সবচেয়ে বেশি,

বলে দাও আজ তুমি,

সৌরভে কীসে দিক ভরে যাবে,

হাসিবে জন্মভূমি?

কীসে হবে আশা সফল আমার,

বলো তো মুকুল তুমি?

[ডান দিক থেকে রাখাল ছেলে বাঁশি বাজাতে বাজাতে ঢুকল, তারপর বাঁশি থামিয়ে সেবলবে—]

রাখাল ছেলে : শ্যামল দেশের রাখাল ছেলে—

বাজিয়ে বাঁশি দিবস রাতি

গান গেয়ে যাই আপনমনে—

আপন-সুরে আপনি মাতি।

শিক্ষা, সমাজ সকল ফেলে, খেয়াল-পথে চলি

আমায় তুমি নাও না বেছে—তোমার সাথি বলি।

মুকুলরানি : (বিরক্ত হয়ে)

খেয়াল-খেলার যুগ গিয়েছে—ভালো লাগে না বাঁশি

‘ঘুম-পাড়ানি’ গানটা তোমার, থামাও সর্বনাশী।

[রাখাল ছেলে ভয়ে বাঁশি ফেলে বেদির ডান ধারে গিয়ে দাঁড়াল। সঙ্গে সঙ্গে বাসনওয়ালা কাঁসি বাজাতে বাজাতে মাথায় বাসনের ঝুড়ি নিয়ে ঢুকল]

বাসনওয়ালা : বাঁশির বাদ্য নয়কো ভালো, ঠিক বলেছ ভাই,

কাঁসির বাদ্য বাজিয়ে তো তাই, বলি ‘বাসন চাই’

গেলাস, ঘটি, কলসি, বাটি, বাসন দ্যাখো কত

আমায় সাথি করলে পাবে, চাইবে তুমি যত।

নেমন্তন্ন করে এঁদের, খেতেই যদি দাও,

বাসন তোমার পড়বে না কম, দিচ্ছি বলে তাও।

মুকুলরানি : (বিরক্ত হয়ে)

অনশনে মরছি মোরা ওই ‘আসন’, ‘বসন’ নিয়ে

দুঃখ অভাব ঘুচবে না তো! কী হবে ও দিয়ে?

বাসন তরে বাসনা মোর, নেইকো মোটেই কিছু

সটান সোজা সরে পড়ো, মাথা করে নীচু!

[বাসনওয়ালা মুখ কাঁচুমাচু করে বাসনের ঝুড়ি এক কোণে নামিয়ে রেখে বেদির বাঁ-দিকে অন্য সকলের পাশে গিয়ে দাঁড়াল। বার দুই বন্দুকের শব্দ করেই চোর ডানদিক থেকে এসে পা টিপে-টিপে ভেতরে ঢুকে পড়ল]

চোর : ঠিক বলেছ, রাশি রাশি বাসন নিয়ে

কী হবে আর ভাই?

আসন, অশন, বসন কিছু,

তার সাথে তো চাই।

সেসব কোথায় পাবেন উনি?

আমি পারি দিতে,

চুরি করে এনে দেব,

করলে আমায় মিতে!

মুকুলরানি : (বিরক্ত হয়ে) বেরোও তুমি হতভাগা, লক্ষ্মীছাড়া চোর,

সাথি তোমায় করার আগে, মরণ হউক মোর!

[চোর আর কথাটি না কয়ে চুপটি করে গিয়ে দাঁড়াল বেদির ডানপাশে। ডাক্তার লম্বা লম্বা পা ফেলে প্রবেশ করল বাঁদিক দিয়ে, হাতে তার সেই মিক্সচারের শিশি আর ট্যাবলেটের বাক্স; বুড়োদের মতো গলা কাঁপিয়ে সেবলবে]

ডাক্তার : মরবে যদি নেহাত তবে, ওষুধ খেয়েই মরো,

তাই তো বলি মুকুলরানি আমায় সাথি করো।

তেতো বড়ি, মিষ্টি ওষুধ, যা-কিছু চাও পাবে।

আমায় সাথি করলে পরে, রোগ তো দূরে যাবে।

মুকুলরানি : (হেসে বলল) শিশি শিশি ওষুধ খেয়েই—আধমরা এই জাতি

এর পরেতেও আশা করো—করব তোমায় সাথি?

[ডাক্তার নিরাশ হয়ে বেদির বাঁ-দিকে গিয়ে দাঁড়াল, মিক্সচারের শিশি ও ট্যাবলেটের বাক্স সবই সেদূরে সরিয়ে রাখল। ফুলবাবু কোঁচার খুঁট ধরে হাওয়া খেতে খেতে ডান দিক দিয়ে ঢুকল]

ফুলবাবু : ঠিক বলেছ, দাওয়াই খাওয়া ছেড়ে

এখন ‘হাওয়াই’ খেতে হবে

ফুলের গন্ধে ঢুলে পড়ে,

‘ফুলবাবুটি’ই হবে।

কবিতা লিখে, কল্পনার রথে

আকাশপথে উড়ি

সাথির মতো সাথি আমিই,

পাবে না মোর জুড়ি।

মুকুলরানি : (হতাশ হয়ে) হায় ভগবান! এ-দেশে কি সত্যি মানুষ নাই?

সাহস তেজে দীপ্ত সাথি কোথায় আমি পাই?

[মুকুলরানি মাটিতে লুটিয়ে পড়ল, এমন সময় পেছনে সৈনিকদের মার্চের বাজনা বেজে উঠল, খানিকক্ষণ বাজনা বাজার পর ‘সৈনিক’ বাজনার তালে তালে ‘লেফট-রাইট, লেফট-রাইট’ মার্চ করতে করতে স্টেজে ঢুকল, কিন্তু মুকুলরানি মাটিতে লুটিয়ে রয়েছে দেখে, সেশিউরে উঠল, সঙ্গে সঙ্গে মার্চের বাজনাও হঠাৎ যেন থেমে গেল, তারপর স্টেজের মাঝখানে এসে সেদর্শকদের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে পা ঠুকে ঠুকে ‘লেফট-রাইট, লেফট-রাইট’ করতে লাগল।]

সৈনিক : নতুন যুগের নতুন মানুষ, ‘মাভৈ: মাভৈ:’ বল

এক হয়ে সব তালে তালে পা ফেলে ভাই চল

দুঃখ আসুক, ঝঞ্ঝা আসুক, আসুক ঝড়বাদল

সঙ্গী লাগি কাঁদিস না তুই, কাঁপিয়ে মাটি চল।

দেশের সেবায়, যোদ্ধা হয়ে দেশকে স্বাধীন কর

দেশ যে, তোদের নেহাত আপন, নয়কো সেতো পর

নিজের স্বার্থে ডাকছে যে-জন তফাত তাদের কর।

তারা কেউই নয়রে আপন,—তারা সবাই পর।

[সৈনিক যখন দাঁড়িয়ে ‘লেফট-রাইট’ করতে থাকবে, তখন মুকুলরানিও তার পায়ের সঙ্গে পায়ের তাল মিলিয়ে আস্তে আস্তে এগিয়ে আসবে। সৈনিকের কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈনিকের পাশে এসে দাঁড়াবে, কিন্তু কেউ কারো দিকে তাকাবে না, তখন মুকুলরানি বলবে—]

মুকুলরানি : তোমার সাথে চলব আমি, তুমিই সাথি ভাই

দেশের সেবায় তোমার পাশেই থাকতে আমি চাই

যাও যদি ভাই যুদ্ধে মরে এগিয়ে যাবে বোন

‘মুকুল’রা ভাই ফুটবে তবেই বলছে আমার মন।

[মুকুলরানির কথা শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সৈনিক আর মুকুলরানি দু-জনই ‘রাইট-টার্ন’ করে ঘুরে দাঁড়াবে; এবং ‘ভবিষ্যৎ’ তখন পেছন থেকে আসবে সৈনিক আর মুকুলের সামনে—মুকুল ও সৈনিক দু-জনে একসঙ্গে হাঁটু গেড়ে বসে ‘ভবিষ্যৎ’-এর হাতে দেবে জাতীয় পতাকা—সেই সময়ে অন্য সকলে ঠিক আগের নির্দেশমতো ‘লেফট-রাইট’ করতে করতে দু-জন দু-জন করে পর পর দাঁড়িয়ে পড়বে। ‘ভবিষ্যৎ’ পতাকাটি নিয়ে ঘুরে দাঁড়াবে—সবার পরিচালক হয়ে, তখন ‘ভবিষ্যৎ’ তার শঙ্খে ফুঁ দিলেই সঙ্গে সঙ্গে আবার মার্চের বাজনা বেজে উঠবে এবং সবাই একসঙ্গে গাইতে গাইতে স্টেজের ওপর বার দুই-তিন মার্চ করে বেরিয়ে যাবে।]

সকলের গান : এখন তোদের ভয়টা কীসের

দীপ্ত মুকুলদল?

সামনে তোদের ভবিষ্যৎ যে,

সঙ্গে মনের বল।

দেশের তাঁতের তৈরি পোশাক,

তোরাই এখন পর।

গরিব দুঃখী সবার ঘরে

বিলিয়ে দেরে সুখ।

ছেলেবুড়োর আবার দেখি

ফুল্ল হাসিমুখ।

সকল অধ্যায়
১.
ছাত্রের পরীক্ষারবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
২.
পেটে ও পিঠেরবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৩.
বেচারাম কেনারামউপেন্দ্রকিশোর রায়চৌধুরী
৪.
বৃক ও মেষ পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৫.
কাক ও পনীর পালাঅবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর
৬.
লক্ষ্মণের শক্তিশেল সুকুমার রায়
৭.
অবাক জলপান সুকুমার রায়
৮.
কাজির বিচারকাজী নজরুল ইসলাম
৯.
রাজপুত্রের নীতিশিক্ষা কাজী নজরুল ইসলাম
১০.
ঝড়ের দিনেসুনির্মল বসু
১১.
আলোলীলা মজুমদার
১২.
দরদিদিগিন্দ্রচন্দ্র বন্দ্যোপাধ্যায়
১৩.
যেদিন জাগবে মুকুল বিমল ঘোষ
১৪.
ভীম বধনারায়ণ গঙ্গোপাধ্যায়
১৫.
বহুরূপীদেবনারায়ণ গুপ্ত
১৬.
গুপীগাইন বাঘাবাইন সত্যজিৎ রায়
১৭.
দত্যি দানোর ছানাশৈলেন ঘোষ
১৮.
সৌরভবৈদ্যনাথ মুখোপাধ্যায়
১৯.
শ্রেয়সী অমল রায়
২০.
বোকা বাঘের ছানাড. পার্থপ্রতিম পাঁজা
২১.
রাক্ষসের সঙ্গে টক্কর ড. পার্থপ্রতিম পাঁজা

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%