অমিত দেবনাথ
এটা ছিল গ্রীষ্মের প্রথম দিকের এক সকাল। ঘ্যানঘ্যান করে বৃষ্টি পড়ছে, চারদিক ধোঁয়া ধোঁয়া, লন্ডনের রাস্তাঘাটের বিশ্রি অবস্থা, ফুটপাথগুলো কাদায় ভরা আর পিছল। বাড়িঘরগুলো এই আবহাওয়ায় এমন গোমড়া মুখে দাঁড়িয়ে আছে যে দেখলে যে কোনও লোকেরই বুক দমে যেতে বাধ্য। রোগী দেখে ফিরছিলাম, পথে পড়ল বেকার স্ট্রিট, ভাবলাম বন্ধু শার্লক হোমসের সঙ্গে দেখা করে যাই। ঘরে ঢুকে দেখলাম চমৎকার অগোছালো ঘরে চেয়ারটাকে আগুনের সামনে টেনে নিয়ে পছন্দের পাইপ টানছে বন্ধুবর।
“এসো ওয়াটসন, তোমায় দেখে খুশি হলাম,” খোশমেজাজে বলল সে। “বোসো, বোসো, চুরুট নাও একটা। এই বাদলা আবহাওয়ায় একেবারে হাঁপিয়ে উঠেছি। তোমার সঙ্গই আমার এখন দরকার।”
চুরুট ধরালাম, চেয়ার টেনে আগুনের পাশে বসলাম, চুপ করে রইলাম হোমস কি বলে শোনার জন্য, কারণ আমি বুঝতেই পারছিলাম মনের এই অবস্থায় ওকে আগে বিরক্তিটা বার করতে দেওয়া দরকার, স্বাভাবিক অবস্থায় যেটা হয় না।
“কি জান,” খানিকক্ষণ চুপচাপ ধূমপান করার পর বলল হোমস, “আমার সর্বশেষ অ্যাডভেঞ্চারটা তুমি যেভাবে লিখেছ, সেটা আমার পছন্দ হয়নি। আমি তখনই তোমাকে বলেছিলাম ওখানকার গোয়েন্দা যে খেলাটা খেলল, তাতে আমার পদ্ধতির সঙ্গে তার পদ্ধতির তুলনা করে আমার কৌশলকে খাটো করে দেখানোর চেষ্টা হয়েছে।”
অধুনা বিখ্যাত অ্যাম্বার নেকলেস কেসটার দিকেই ইঙ্গিত করছে হোমস, যেটা আমার মতে তার অন্যতম সেরা কীর্তি – সেটা জেনেও চুপ করেই রইলাম।
“শুধু তাই নয়, ওয়াটসন,” কৈফিয়তের সুরে বলল হোমস, “তুমি কলম ধরে রোমান্টিকতার চূড়ান্ত করেছ। আরও সাবধানে লেখো বন্ধু। তুমি খুব ভালই জান, আমি কত সাদাসিধে পদ্ধতিতে সমাধানে পৌছোই, কোনও অলৌকিক পদ্ধতিতে নয়। যেমন ধর – যে কোনও মুহূর্তেই একজন অতিথি আসবে দেখা করতে – খুবই মামুলি ব্যাপার নিয়ে, কিন্তু সেটাই তোমার কাছে বিরাট রহস্যের ব্যাপার বলে মনে হতে পারে।”
বলতে না বলতেই সদর দরজায় টোকার শব্দ পেলাম। আমার অবাক চোখে তাকানোয় হেসে বলল হোমস, “ভায়া ওয়াটসন, খুবই সোজা ব্যাপার। তুমি শোননি, আমি শুনেছি – তুমি আমার কথা শুনছিলে – একটা মোটরগাড়ির হালকা হর্ন বাজানোর শব্দ মোড়ের মাথা থেকে এসেছে; তুমি বুঝতে পারনি যে আমার জানলার ঠিক নিচে এসে থেমেছে একটা গাড়ি এবং আমি জানি, এক্ষুনি বাইরে তাকালে দেখব গাড়িটা নুড়ি পাথরের ওপর অপেক্ষা করছে।”
সে জানলার পর্দাটা সরাতেই আমি তার ঘাড়ের ওপর দিয়ে দেখলাম সত্যিই তাই, নিচে একটা গাড়ি। ক্যানোপির ওপর দিয়ে দেখলাম পেছনের সিটে দুজন ভদ্রলোক বসে আছেন। সদর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে শোফার। তক্ষুনি দরজায় টোকা মেরে ঘরে ঢুকলেন হোমসের বাড়িওয়ালি, হাতে একটা ট্রে, তাতে দুটো কার্ড। তিনি কার্ড দুটো এগিয়ে দিলেন হোমসের দিকে।
“মিঃ উইলিয়াম এস. রিচার্ডসন – মিঃ উইলিয়াম ও. ফুলার,” কার্ডটা দেখে জোরে জোরে পড়ল সে। “হুম। আমাদের আমেরিকান বন্ধু অনেক সম্মান পেয়েছেন। মিসেস হাডসন, ওঁদের ওপরে আসতে বলুন।”
“তুমি কি করে জানলে যে ওঁরা আমেরিকা থেকে আসছেন?” আমি শুরু করতে যাচ্ছিলাম, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল, এবং হোমস “চলে আসুন” বলতেই দুই ভদ্রলোক ভেতরে ঢুকেই দোরগোড়ায় দাঁড়িয়ে অভিবাদন করলেন। দুজনেরই গায়ে রেনকোট, একজনের মাঝারি উচ্চতা, পরিস্কার কামানো মুখ, চেহারায় অভিনেতা আরভিং-এর ছাপ আছে; অন্যজনের চেহারা তুলনায় ছোটখাটো, মিঃ পিকউইকের চশমায় একটু আলাদা রকমের লাগছে।
“চলে আসুন, ভদ্রমহোদয়গণ,” চমৎকার সহজাত সৌজন্য দেখিয়ে বলল শার্লক হোমস। “রেনকোট খুলে রাখুন, চুরুট ধরিয়ে আগুনের পাশে বসুন আরাম করে। আপনারা লন্ডনে পা দিয়েই যে আমার কাছে এসেছেন, এতে আমি ধন্য হয়ে গেছি। আপনারা কথাবার্তা বলুন, শুনতে শুনতেই আমি একটা ককটেল বানাই – আপনারাই তো একদা এই চমৎকার জিনিসটা আমাদের উপহার দিয়েছিলেন।”
দর্শনার্থীরা এ ব্যাপারে সহজেই একমত হলেন। ঝটপট চারটে চেয়ার অর্ধচন্দ্রাকারে সাজিয়ে ফেলা হল আগুনের পাশে; টেবিলের ওপর রাখা ট্রে-তে হোমসের বাছাই করে রাখা চুরুট থেকে চুরুট নেওয়া হল, এবং হোমস আমার পরিচয় করিয়ে দিল।
“ইনি হলেন ডাঃ ওয়াটসন, আমার কাহিনি-টাহিনিগুলো অনেক বাড়িয়ে বাড়িয়ে লেখেন,” বলল হোমস তার পাইপ ধরিয়ে, “উনি খুবই অবাক হয়ে যাচ্ছিলেন আমি আগ বাড়িয়ে আপনারা কোথা থেকে আসছেন বলে দেওয়ায় – আপনারা ঢোকায় বাধা পড়ল।”
লম্বা লোকটির নাম রিচার্ডসন – তিনি হাসলেন।
“আমিও কম অবাক হইনি, যখন আপনি বললেন আমরা এ শহরে নতুন এসেছি। বাস্তবিক, আমাদের চব্বিশ ঘন্টাও হয়নি।”
শার্লক হোমস হাসল। খোশমেজাজি হাসি। “বোঝালেই দেখবেন এটা কিছুই নয়। মাঝে মাঝেই আমি ডাঃ ওয়াটসনকে বুঝিয়ে থাকি। আমি মাঝে মাঝেই বিভিন্ন বিষয় নিয়ে নাড়াচাড়া করি, সে সবের বিস্তৃত বিবরণ ওয়াটসন তার লেখায় দিয়ে থাকে আর পাঠক পড়েও ফেলে। এই সব বিচিত্র বিষয়ের মধ্যে, ধরা যাক, মোটরগাড়িও আছে। আর মোটরগাড়ি সম্বন্ধে জানতে গেলে তারা কোথাকার তৈরি, কোন দেশের তৈরি – সেগুলোও জানা দরকার। এখন, যদি আমার স্মৃতি বিরুদ্ধাচারণ না করে - একশো তিরিশ রকমের মোটরগাড়ি আছে, যাদের সহজেই আলাদা করা যায়। একটু আগেই যখন ওয়াটসন আমার ঘাড়ের ওপর দিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল, ও কিন্তু কিছুই খেয়াল করল না যে এটা আমেরিকার গাড়ি, যেটা আমি দেখলাম। এ দেশে ও গাড়ি প্রায় দেখাই যায় না। কাজেই এটা চাপছে যারা, তারাও নিশ্চয়ই ও দেশ থেকেই আসছে।
“আর অন্যটার ব্যাপারে বলা যায় – যে সব মহিলা বা পুরুষ আমেরিকা থেকে সদ্য এখানে আসেন – তাঁরা এসেই একেবারে হাল ফ্যাশনের লন্ডন স্টাইলে নামের কার্ড বানাতে দেন। এই মরশুমে – যদ্দুর জানি – কার্ডের যে ফ্যাশন চলছে, তাতে কার্ড হচ্ছে ছোট, আর অক্ষরগুলো পুরোন ধাঁচের। মিসেস হাডসন যে কার্ড দিলেন, সেটা মাঝারি সাইজের আর অক্ষরগুলো গত বছরের ধাঁচে ছাপা। বোঝাই যাচ্ছে আমার আমেরিকার অভ্যাগতরা দীর্ঘ যাত্রার শেষে এ দেশে এসেছেন, কিন্তু এসে বেশি সময় পাননি। একটু জটিল ব্যাপার – কিন্তু না, এসব ব্যাপারে অনেক সময় খোলাখুলি আন্দাজ করতে হয়। কিছু ধরতে পারছ, ওয়াটসন?”
আমি একটু হেসে বুঝিয়ে দিলাম অবশ্যই পারছি। আমেরিকার ভদ্রলোক দুজন পরস্পরের দিকে তাকালেন। বোঝাই গেল তাঁরা আমার বন্ধুর কথাবার্তায় চমৎকৃত।
“আপনারা যে এসেছেন,” গলগল করে পাইপের ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে বলল হোনস, “তার আসল কারণ আমি এক্ষুনি বলে পারি। আমি আপনাদের দেশ সম্পর্কে খুবই উচ্চ ধারণা পোষণ করি এবং আপনাদের দেশেরই একজন দুরন্ত সাহিত্যিকের গড়া ফরাসি গোয়েন্দাকে আমি সম্পূর্ণ নতুন ধারার এক অসাধারণ সৃষ্টি বলে মনে করি। তাঁর কাছে আমি সর্বদাই ঋণী। আমার বন্ধু ওয়াটসন সেরকম ধাঁচের কিছু চেষ্টা করেছে বটে, তবে,” বলল হোমস মাথা নাড়তে নাড়তে, “আমার মনে হয় না সেগুলোর একটাও “দি মার্ডার্স ইন দ্য র্যু মর্গ”-এর কাছাকাছি পৌছেছে বলে।”
শার্লক হোমস চুপ করতেই, আমাদের দর্শনার্থীরা – যাঁরা গম্ভীর হয়ে গেছিলেন – পরস্পর পরস্পরের দিকে তাকালেন প্রশ্ন করার ভঙ্গিতে।
“আপনিই বলুন,” চশমা পরা ভদ্রলোকটি বললেন। রিচার্ডসন নামের ভদ্রলোক সহমত হলেন।
“আমার বোধহয় প্রথম থেকে শুরু করাই ভাল,” বললেন ভদ্রলোক, “যদি বেশি লম্বা হয়ে যায় বা বেশি খুঁটিনাটি হয়ে যায় তো থামিয়ে দেবেন দয়া করে।”
“পুরো ঘটনাটাই বলুন,” বলল হোমস। “আমি ধরে নিচ্ছি আপনারা কোনও সমস্যায় পড়েছেন বলেই আমার কাছে এসেছেন। সে ক্ষেত্রে কোনও জিনিসই অদরকারি নয় এবং সে জন্যই কোনও কিছুই বাদ দেবেন না, আপনাদের কাছে যত তুচ্ছ বলেই মনে হোক না কেন।”
চুরুটের ছাই ঝেড়ে শুরু করলেন ভদ্রলোক।
“আমার বন্ধু এবং আমি দিন দশেক কি আরও কয়েকদিন আগে লিভারপুল এসে নামি, ইচ্ছে – এই গ্রীষ্মে আপনাদের দেশটা মোটরগাড়িতে চড়ে ঘুরব। লন্ডন অবধি খুব আরামেই এসেছিলাম, এখানে থেমেছিলাম শুধু আমাদের ব্যাঙ্কারের সঙ্গে দেখা করার জন্য, তার সঙ্গে গোটা দুই তিনেক দেশ থেকে নিয়ে আসা চিঠি মেল করার জন্য।”
“মেল করার –” হোমস থামিয়ে দিল তাদের, তারপর হেসে ফেলল, বলল, “ও আচ্ছা, আপনারা চিঠি পোস্ট করলেন। মার্জনা করবেন।”
“হ্যাঁ, চিঠি পোস্ট করলাম,” হোমসের কথার জের টেনে বললেন ভদ্রলোক, “তারপর চললাম দক্ষিণ ইংল্যান্ডের দিকে। ক্যান্টরবেরিতে এসে লর্ড এম.-এর কাছ থেকে একটা চিরকুট পেলাম, আমরা যে তাঁকে চিঠি পাঠিয়েছিলাম, তারই প্রত্যুত্তর। তিনি লিখেছেন এ সপ্তাহের বুধবার – মানে গতকাল – ডিনারে তাঁর আতিথ্য গ্রহণ করতে, কারণ এরপর তিনি শহরে থাকবেন না। সব দিক ভেবেচিন্তে আমরা লন্ডনে ফিরে যাওয়াই ঠিক করলাম, কারণ আমাদের ইচ্ছেই ছিল লর্ডের সঙ্গে দেখা করার। সুতরাং বুধবার আমরা লন্ডন ফিরে পোর্টল্যান্ড প্লেসের ল্যাংহাম-এ ঘর নিলাম। তারপর পোশাক আশাক পরে আমরা ধীরেসুস্থে বেরিয়ে হাঁটতে হাঁটতে ওয়ার্ডার স্ট্রিটে গেলাম। সেখানকার কিউরিওর দোকানগুলোতে – সমস্ত আমেরিকান পর্যটকদের মতোই – আমাদের সময়টাও যে খুব দ্রুত কাটছিল, সেটা নিশ্চয়ই আর আলাদা করে না বললেও চলবে। এর মধ্যে একটা ছোট দোকানের মালিককে আমরা আগেই চিনতাম – এর আগে আসার সুবাদে। সেই দোকানে একটা ট্রের মধ্যে কিছু অদ্ভুত পাথর ছিল, সেগুলো দেখছি, এমন সময় মালিক সিন্দুক থেকে একটা প্যাকেট বার করে আমাদের কাছে এসে এর মোড়ক খুলে বলল, “দেখবেন নাকি স্যার?”
“দেখলাম অ্যান্টিক শিল্পকর্মের একটা চমৎকার উদাহরণ সেটা – একটা সোনার বার, যাতে খোদাই করা রয়েছে একটা বালক একটা ইঁদুর ধরছে – পুরোটা হিরে আর চুনি খচিত, আর পেনডেন্ট হিসেবে রয়েছে একটা বড় আর দামি মুক্তো। দোকানের ভেতরের মলিন আলোতেও এর ঝলকানিতে বোঝা যাচ্ছিল জিনিসটা অত্যন্ত দামি।
“এটা ওয়ারিংটন-এর কাউন্টেসের ব্যক্তিগত সংগ্রহ থেকে এসেছে,” বলল দোকানদার। “এটার আসল মালিক ছিলেন স্কটল্যান্ডের রানি মেরি কুইন। গত তিনশো চল্লিশ বছর ধরে এটা বিভিন্ন হাত ঘুরেছে এবং এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় লিখিত প্রমাণ রয়েছে। খেয়াল করলেই দেখবেন এতে রয়্যাল আর্ম-এর ছাপ খোদাই করা আছে।”
হোমসের গলা শোনা গেল। এ আওয়াজেই মালুম তার এ কেসটাতে বেশ আগ্রহ জেগেছে। আমি বহুদিন ধরেই এর সঙ্গে পরিচিত।
“যাকে বলে রয়্যাল আর্ম অব স্কটল্যান্ড – সিংহের ছাপওয়ালা, প্রথম জেমসের কন্যা এবং স্কটল্যান্ডের রানি হিসেবে এই ছাপ মেরিরই উত্তরাধিকার বহন করে। আপনারা যে রত্নখচিত বস্তুটির কথা বলছেন, সেটি একবারই আমার দেখার সৌভাগ্য হয়েছিল, একটা চুরির তদন্তে কাউন্টেসের ডাকে সেখানে গিয়ে। তোমার নিশ্চয়ই মনে আছে ব্যাপারটা, ওয়াটসন। আমি শুনেছি, কাউন্টেসের মৃত্যুর পর ওই পরিবার অর্থনৈতিক সমস্যায় পড়ে, ফলে কিছু কিছু ধনরত্ন এই সব দোকানে পাঠানো হয় বিক্রির জন্য।”
“দোকানদারও আমাদের তাই বলেছিল,” বললেন ভদ্রলোক, “সে আমাদের আরও বলেছিল যে এটা যেহেতু ইংল্যান্ডে খুবই পরিচিত, সে জন্য এটা সে আমেরিকান খদ্দেরদের কাছে বিক্রি করবে, যাতে এটা বাইরে যেতে পারে। স্বীকার করা ভাল, জিনিসটা দেখে আমার খুবই ভাল লাগে। আমার এক ভাইঝির সদ্য বিয়ে হয়েছে, কিছু দেওয়া হয়নি, এটা দিলে ভালই হয়।
“দাম কত?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“হাজার পাউন্ড দিলেও কম হয়ে যায়,” বলল দোকানদার, যেরকম দরদাম তারা আমেরিকানদের সঙ্গে করেই থাকে।
“আরও খানিকক্ষণ কথাবার্তা বললাম আমরা, তারপর সময় ফুরিয়ে গেলে আবার ল্যাংহাম-এ ফিরে এলাম। ডিনারের জন্য তৈরি হচ্ছি, এমন সময় দরজায় টোকা পড়ল। খুলে দেখি, কিউরিও শপ থেকে একজন এসেছে, হাতে একটা ছোট প্যাকেট। সেটা সে আমার হাতে দিয়ে বলল যে এটা সেই অ্যান্টিক শিল্পকর্ম – দোকানের মালিক আমাকে পাঠিয়েছে আরও খুঁটিয়ে দেখার জন্য। আমি এতই হতভম্ব হয়ে গেছিলাম যে, যে কাজটা করা উচিত ছিল, সেটাই করতে পারলাম না। আমার উচিত ছিল ওটাকে ফেরত পাঠানো। লোকটা টুপিতে হাত ছুঁইয়ে বিদায় নিল, আমি তখনও দরজায় দাঁড়িয়ে।
“তারপর ফুলারের ঘরে গেলাম। বেড়াতে বেরোলে আমরা পাশাপাশি ঘর নিই, যাতে একজনের ঘর থেকে আরেকজনের ঘরে যাওয়া যায় – এটা আমাদের নিয়ম। গিয়ে ফুলারকে বললাম যে একজন ইংরেজ দোকানদার প্রায় অচেনা একজনের কাছে তার জিনিস গচ্ছিত রাখছে, এ অতি আশ্চর্য ব্যাপারই বটে। এসব ব্যবসাদারের সঙ্গে সম্পর্ক রাখা তো বিপদজনক।
“আমার বন্ধু একটা কথাতেই পরিস্থিতিটা পরিস্কার করে দিলেন।
“আরও বিপদজনক ব্যাপার,” বললেন তিনি, “যদি কেউ তোমাকে সিন্দুক হিসেবে ব্যবহার করতে চায়। নতুন শহরে এসে কেউ নিশ্চয়ই চাইবে না অন্য লোকের জিনিসের জিম্মাদার হতে।”
“সত্যি কথা। তখন ডিনারের সনয় হয়ে গেছিল, ট্যাক্সিও দাঁড়িয়েছিল, কাজেই সেটা যে অফিসে রেখে যাব, তার সময় ছিল না, ফলে আমি প্যাকেটটা আমার কোটের ভেতরের পকেটে রেখে দিলাম। যতই হোক, এ জায়গাটা নিরাপদ। মাঝে মাঝেই হালকা চাপ দিয়ে দেখে নিচ্ছিলাম, বুঝতে পারছিলাম জিনিসটা ওখানেই আছে, কাজেই চিন্তা করার কিছু ছিল না।
“আমাদের সাদর অভ্যর্থনা জানালেন লর্ড ও লেডি এম.-, যেটা তাঁরা আমাদের দেশের কেউ এলে সর্বদাই করে থাকেন। খাওয়ার টেবিলে খুব বেশি লোকজন ছিল না। টুকটাক কথাবার্তা বলছিলাম আমরা। প্রথমদিককার কথাবার্তা শুরু হয়েছিল আমেরিকার নানারকম বিষয় নিয়ে – এসব ক্ষেত্রে সাধারণত যেরকম হয় আরকি – এবং জলপথ বিষয়ে কথাবার্তা বলার সময় বারবার করেই ধরা পড়ছিল – মার্জনা করবেন আমাকে – ইংরেজদের অজ্ঞতা এবং সরলতা। এখান থেকেই আলোচনাটা ঘুরে গেল অন্যান্য বিভিন্ন দিকে, যেগুলোর মধ্যে কোনও মিল নেই, কিন্তু শুনতে ভাল লাগে – যুদ্ধে মহামান্য লর্ডশিপের প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ; পিচফলের স্বাদ কত চমৎকার; রাজার স্বাস্থ্য; লেডিশিপের নতুন বার্লিওয়াটারের রন্ধনপ্রণালী; নতুন গ্রন্থাগার এবং লর্ড আর্লব্যাংকের সাংঘাতিক ব্যাপার-স্যাপার। এখান থেকেই আবার আলোচনা ঘুরে গেল বিভিন্ন পারিবারিক সংগ্রহে থাকা সম্পত্তির ব্যাপারে, এবং তৎক্ষণাৎ আমার পকেট থেকে বেরিয়ে এল অলংকারটা, ঘুরতে লাগল হাতে হাতে, সেই সঙ্গে উচ্চারিত হতে লাগল উচ্ছসিত প্রশংসা।
“এই অলংকারের খবরটা ছড়িয়ে পড়ল সেখানে। এমনকি চাকরবাকরেরা পর্যন্ত উঁকিঝুঁকি মারতে লাগল এটা দেখবে বলে। আমি দেখলাম আন্ডার-বাটলার ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারুর পানীয়ের গ্লাস ভরে দিতে দিতে হাঁ করে দেখছে সেই অলংকারটার দিকে, যেটা ক্যাপ্টেন হাতে ধরে ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছিলেন, আর সেটা থেকে আশ্চর্যরকমের ঝলসানি বেরোচ্ছিল। দেখতে দেখতে সে এতই বিভোর হয়ে গেল যে প্রায় ঝুঁকে পড়ল ক্যাপ্টেনের কাঁধের ওপর, ভুলেই গেল যে সে ক্যাপ্টেনের গ্লাসে পানীয় ঢালছে। ফলে গ্লাস উপচে হুড়হুড় করে পানীয় গিয়ে পড়ল টেবিল ক্লথের ওপর। আমি ফেরত নিলাম অলংকারটা।
“ও জায়গাটা কিন্তু খুব নিরাপদ নয়,” হেসে বললেন ক্যাপ্টেন। এ কথার অর্থ আমি পরে বুঝেছিলাম।
“হোটেলে ফিরতে বেশ রাত হল। খুব ক্লান্ত ছিলাম বলে সোজা চলে গেলাম বিছানায়। আমাদের ঘর, আগেই বলেছি, পরস্পর লাগোয়া, এবং আমাদের বহুদিনের অভ্যেস ধরাচুড়া ছাড়তে ছাড়তে সারাদিনের কথা আলোচনা করা। ঘটনার সঙ্গে সম্পর্ক আছে বলেই এটার উল্লেখ করলাম। আমিই প্রথম শুতে গেলাম এবং শুতে শুতে শুনতে পেলাম মিঃ ফুলার আলো নেভানোর আগে জানলাটা খুলে দিলেন। আমি বোধহয় বিছানায় পড়ার সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। হঠাৎ জেগে উঠলাম। কে যেন জোরে জোরে আমার নাম ধরে ডাকছে। ফুলারের গলা। তক্ষুনি ছুটে গেলাম তাঁর ঘরে, ঝটপট বিজলি বাতি জ্বালিয়ে দেখলাম, ফুলার পাজামা পরে বিছানার ধারে বসে আছেন। বাকিটা ওঁর মুখেই শুনুন।”
পিকউইকের চশমা পরা ভদ্রলোক বলা শুরু করলেন।
“আমিও সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়েছিলাম,” বললেন তিনি, “কিন্তু হঠাৎই চমকে জেগে উঠলাম, তখন কটা বাজে জানি না – মনে হল বিপদ। আবছায়া চোখে তাকিয়ে দেখি আমার বিছানার কাছেই একটা মূর্তি, আমাকে উঠতে দেখেই সে ঝটপট নড়ে উঠল। নিজের অজান্তেই দেখলাম আমি লোকটার কোটের বুকটা চেপে ধরেছি। খুব শক্ত করেই ধরেছিলাম বোধহয়, কারণ লোকটা এক ঝটকা মেরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিল, কিন্তু কোটের খানিকটা ছিঁড়ে এল আমার হাতে। মুহূর্তের মধ্যে লোকটা ঘর ছেড়ে জানলা দিয়ে উধাও হয়ে গেল, যাওয়ার সময় টান পড়ল তার স্কার্ফটায়। আমি এই সময়েই চেঁচিয়ে উঠি, আর মিঃ রিচার্ডসন দৌড়ে আমার ঘরে ঢোকেন।”
“আমরা দুজন ভাল করে ঘরটা পরীক্ষা করে দেখলাম,” বললেন প্রথম জন, “আমার ইভনিং কোটটা মেঝেতে পড়ে আছে। মনে পড়ল কোটটা খুলে আমি ফুলারের খাটের ছত্রীতে রেখেছিলাম। আর বেশি বলে লাভ নেই, মোদ্দা কথাটা হল - অলংকারটা উধাও। আমরা দুজন দুজনের দিকে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম।
“লোকটা জিনিসটা নিয়ে জানলা দিয়ে পালিয়েছে!” বলে উঠলেন ফুলার, হাত মুঠো করে, “কিন্তু একটা জিনিস রেখে গেছে। সেটা এটা!” বলেই তিনি হাতের মুঠো খুললেন – সেখানে একটা বোতাম।”
শার্লক হোমস চট করে উঠে জিনিসটা হাতে নিয়ে আতস কাচ দিয়ে দেখল।
“ডার্ক-হর্ন বোতাম দেখছি,” বলল সে, “জার্মানিতে তৈরি, সদ্য এ দেশে এসেছে। কয়েকটা সুতোও উঠে এসেছে। কাজে লাগবে।” তারপর বলল, “আর কিছু বলবেন?”
“মানে – প্রায় সবই বলা হয়ে গেছে। যা যা তখন করার – সবই করেছিলাম। রাত্তিরে যে কেরানি থাকে, তাকে ডেকেছিলাম, রক্ষীকে ডেকেছিলাম – আর যতরকমভাবে সম্ভব পরীক্ষা করেছিলাম। চোর একটা সরু লোহার ব্যালকনি দিয়ে ঢুকেছিল, যেটার একটা মুখ হোটেল করিডোরে মিশেছে, জানলার কিনার ধরে ভেতরের উঠোনে ঢুকেছে, পালিয়েছেও সেই পথেই। রাত পাহারাদারটা দেখে শুনে আমতা আমতা করে নানারকম জগাখিচুড়ি কথাবার্তা বলল। সে বলল চোরটা হয় চাকরদের ঘর দিয়ে পালিয়েছে, অথবা সে হয়ত এখানকারই কোনও নিয়মিত অতিথি, এখানকার গলিঘুঁজি সব কিছুই সে ভালমতো জানে, কাজেই সে নির্ঘাত কম্ম সেরে তার ঘরে ফিরে দরজা এঁটে ঘুম দিচ্ছে।”
“আপনি কি চুরির কথা কিছু বলেছেন?” বলল হোমস।
“না, বলিনি, কারণ প্রয়োজন মনে করিনি। আমরা শুধু ঘরে কেউ ঢুকেছিল, এটাই বলেছিলাম।”
“খুবই বুদ্ধিমানের কাজ করেছেন,” মাথা নেড়ে বলল হোমস। “আপনারা, আমেরিকানরা কিন্তু কখন থামতে হবে জানেন।”
“আমরা তাড়াতাড়ি ব্রেকফাস্ট করেই এখানে চলে এসেছি একটাই কারণে – যে আপনিই আমাদের ভরসা।” বললেন ভদ্রলোক হাত তুলে, “আমরা শার্লক হোমসের হাতে এই তদন্তভার তুলে দিতে চাই।”
হোমস আবার বসে পড়ল চেয়ারে, দু আঙুলে বোতামটা নাড়াচাড়া করতে করতে হঠাৎ বলল, “সেই আন্ডার-বাটলারটার খবর কি?”
কথাটা শুনে একটু অবাক হলেন তিনি। বললেন, “ও, তার কথা বলছেন? আমার মনে আছে হেড-বাটলার যে জায়গাটায় মদ ছলকে লালচে দাগ ধরিয়েছিল, সেখানে এক চামচ নুন ফেলে দিয়েছিল, তারপর সেই আন্ডার-বাটলারকে ঘর থেকে বার করে দিয়েছিল। কিন্তু পুরোটাই এত সাধারণভাবে হয়েছিল যে কেউ আলাদা করে এটা খেয়াল করেনি। পরে লাইব্রেরিতে চুরুট খেতে খেতে – মনে পড়ছে, লর্ড ঠাট্টা করে বলছিলেন যে ওয়াটকিনসের – এই নামেই তিনি ডাকছিলেন ওকে – একটা ছোটখাটো সংগ্রহ আছে, ও এসব খুবই পছন্দ করে, কাজেই অত চমৎকার একটা অলংকার দেখার উত্তেজনাতেই ওর হাত কেঁপে গেছিল। নেহাতই চাকরের হয়ে সাফাই দেওয়া ছাড়া আমার এটাকে আলাদা করে কিছু মনে হয়নি।”
শার্লক হোমস এখনও দেখেই যাচ্ছে বোতামটাকে।
“আপনাদের কেসটা শুনলাম,” আরও খানিকক্ষণ নীরবতার পর বলল হোমস। “এটা নিয়ে আরও ভাবা দরকার। কাল হোটেলে আপনাদের সঙ্গে দেখা হবে। নতুন কোনও খবর হয়ত দিতে পারব।”
যথাবিহিত সৌজন্য প্রদর্শন করে বিদায় নিলেন দুই ভদ্রলোক। ঘরে রয়ে গেলাম আমরা দুজন।
“ওয়াটসন,” বলল হোমস, “কী মনে হচ্ছে?”
“ওই আন্ডার-বাটলারটাকে বাজিয়ে দেখা দরকার,” আমি বললাম।
“তোমারও তাই মনে হচ্ছে?” অদ্ভুত সুরে বলল হোমস, তারপর একটু থেমে বলল, “লর্ড এম.-এর দর্জির ঠিকানা জানো?”
অভিজাত সম্প্রদায়ের পোশাক আশাক কোত্থেকে বানানো হয়, তা আমার জানাশোনার বাইরে, স্বীকার করলাম সেটা। হোমস বর্ষাতি আর টুপি পরে নিল।
“আমি একটু বেরোচ্ছি, ওয়াটসন,” বলল হোমস, “ওয়েস্টএন্ড-এর ফ্যাশনদুরস্ত দর্জির দোকানগুলোতে একটু ঢুঁ মারতে হবে। - সময় হলে ক্লাবে চলে এস, লাঞ্চ করব একসঙ্গে। তোমার সঙ্গে কেসটা নিয়ে আলোচনাও সেরে নেওয়া যাবে।”
শার্লক হোমস বেরিয়ে গেল, আমি বাড়ি ফিরলাম। আজ কোনও রোগীই ছিল না। তাতে অবশ্য আমি খুশিই হলাম, লাঞ্চের সময় হতেই সোজা চলে গেলাম অ্যাথেনিয়াম-এ, গ্যাঁট হয়ে বসলাম আমাদের বরাবরের কোনার টেবিলে। ভীষণ অধৈর্য লাগছিল, কারণ লাঞ্চের সময় পেরিয়ে যাওয়ার বহুক্ষণ বাদে হোমস এল।
“খুব দৌড়ঝাঁপ হল, ওয়াটসন,” চেয়ারে বসে সংক্ষেপে বলল সে।
“কাজ কিছু এগোল?”
কথার কোনও উত্তর না দিয়ে স্যুপে মনোনিবেশ করল সে, ধ্যানমগ্ন খাওয়া দেখে মনে হল সে আমার কথা ভুলেই গেছে। বুঝলাম, চিন্তার গভীরতম পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। আমি এ ব্যাপারটা জানি বলেই ওকে কোনও রকম বিরক্ত করলাম না, তবে মনে হল সকালে এত ঘোরাঘুরি করে যা হল, সেটা ও আমাকে বলবে।
মধ্যাহ্নভোজ নিঃশব্দে গলাদ্ধকরণ করে বলল হোমস, “তোমাকে একটা কাজ দেব। আজ রাতে আলহাম্ব্রা-র টিকিট কিনতে হবে – চারখানা টিকিট। চারটেই মাঝের, তার মধ্যে একটা যেন ধারের সিট হয়। তারপর হোটেলে গিয়ে আমাদের বন্ধুদের ওখানে নিয়ে যাওয়ার ব্যবস্থা করবে। অথবা তাঁরা আমাদের সঙ্গে না গেলে আমরাও তাঁদের সঙ্গে যেতে পারি – ওঁদের মোটরগাড়িতে। ওঁদের বলবে আমাদের বেকার স্ট্রিট থেকে তুলে নিতে। পারবে তো, ওয়াটসন? চমৎকার! তাহলে বেকার স্ট্রিটে দেখা হচ্ছে!” তারপর এক চুমুকে বাকি কফিটা পান করে চেয়ার ছেড়ে উঠে দরজার সামনে থেকে আমার দিকে একবার টুপিটা নাড়িয়ে বিদায় হল শার্লক হোমস, আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়েই। যাই হোক, সে যখন রহস্য সমাধানের ভেতরে ঢুকে পড়েছে, বাকি ছোটখাটো কাজগুলো তো আমাকে করতেই হয়। বাকি দিনটা সে যা যা বলেছিল, সেই করেই কাটল, সন্ধ্যেয় বেকার স্ট্রিটে গিয়ে দেখি হোমস বিকেলের পোশাক পরে তৈরি।
“একটা অতি সাধারণ জিনিসের মধ্যেও যে কত গভীর ইঙ্গিত আর বৈচিত্র লুকিয়ে থাকে, সেটাই ভাবছিলাম, ওয়াটসন,” বলল সে হালকা গলায়। “এই বোতামটা। সব দেশেই দেখা যায়, কবে এ জিনিসের উদ্ভাবন হয়েছিল, কেউ জানে না। কতভাবে ব্যবহার হয়, হিসেবের বাইরে। ডাক্তারভায়া, তুমি কি জান, গত একটি বছরে এই ধরণের যত বোতাম ইংল্যান্ডে আমদানি করা হয়েছে, তার সংখ্যা কত? জিনিসটা দেখতেও চমৎকার, সময়ে সময়ে দারুণ কাজও দেয়। যেমন ধর – এই হর্ন বোতাম কত ধরণের উপাদান দিয়ে তৈরি, ধারণা করাই মুশকিল। আর যদি খাঁটি হর্ন বোতামের খোঁজ পাওয়া যায় তো –” বলেই চলল হোমস রসালো সুরে, যতক্ষণ না আমাদের সকালের দর্শনার্থীরা এসে তাঁদের মোটরগাড়িতে আমাদের নিয়ে গেলেন জাঁকজমকের আলহাম্ব্রা হলে, আমোদপ্রমোদের বিচিত্রানুষ্ঠান দেখতে। থিয়েটার হল যথারীতি ভর্তি। আমরা পৌঁছনোর কিছুক্ষণ পর দেখলাম একটা বক্স-এ ফ্যাশনদুরস্ত কিছু লোকজন এসে বসলেন, তাঁদের মধ্যে কয়েকজন আগের দিনের ডিনার পার্টিতে ছিলেন, বললেন আমাদের আমেরিকান বন্ধুরা। তারপর আমিও দেখলাম ওপর থেকে গলা বাড়িয়ে এদিক ওদিক দেখছেন ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারু, এঁদের দেখেই মাথা ঝোঁকালেন। তারপর দেখলাম তাঁর চোখ পড়ল শার্লক হোমসের ওপর, এবং আমার মনে হল যেন তিনি এক মুহূর্তের জন্য চোখটা তার ওপর রাখলেন, পরক্ষণেই চোখ সরিয়ে নিলেন দূরের গ্যালারির দিকে। কেন যে আমরা এখানে এলাম, কিছুই বুঝতে পারলাম না। অবশ্য কোনও কারণ না থাকলে হোমস শুধু শুধুই এখানে আসবে, এটা বিশ্বাস হয় না। ধারের সিটেই বসেছিল হোমস, একবার দেখলাম তড়াক করে উঠে সে লবির দিকে গেল, পরক্ষণেই ফিরে এসে বুঁদ হয়ে দেখতে লাগল স্টেজের কার্যকলাপ।
অনুষ্ঠান শেষ হল। ধীরে ধীরে এগোতে লাগল ভিড়, আমরাও তার পেছন পেছন। লবিতে ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারুর সঙ্গে দেখা হয়ে গেল, তাঁর সঙ্গে কেউ নেই, একাই হাঁটছিলেন। আমেরিকানদের সঙ্গে সংক্ষেপে কথা বললেন তিনি, কিন্তু বাইরের দিকে এগোতে লাগলেন আমাদের সঙ্গেই, যেখানে রয়েছে আমাদের মোটরগাড়ি। আমার আর হোমসের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া হল ক্যাপ্টেনের, এবং ওঁরা বললেন আজকের অনুষ্ঠান দেখার সব ব্যবস্থাই করেছে হোমস। এবং তারপর, আমাকে অপ্রস্তুত করে হোমস বলে উঠল, ক্যাপ্টেন তো আমাদের গাড়িতেই বাড়ি ফিরতে পারেন।
“পেছনের সিটে বসুন,” বলল হোমস অমায়িক সুরে, “আমি শোফারের পাশে বসব”খন। কোনও অসুবিধে হবে না, দেখবেন।”
ক্যাপ্টেন রাজি ছিলেন না মোটেই, তবে হোমসের আন্তরিকতায় তা অনেকটাই কেটে গেল। স্বাভাবিক শিষ্টাচারেই তিনি গাড়িতে এসে বসলেন এবং অল্প সময়ের মধ্যেই আমাদের গাড়ি চলে এল বার্লে স্ট্রিটে তাঁর বাড়ির সামনে।
শার্লক হোমস চট করে নেমে পড়ল গাড়ি থেকে। “এক পাত্তর ককটেল আর একটা করে চুরুট হয়ে যাক ক্যাপ্টেনের সঙ্গে। সময় আছে,” বলল সে।
“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই,” ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারু বললেন নিতান্ত বিরস বদনে। “চলুন মশাইরা, আসুন আমার ব্যাচেলর হোমে। আমার খুবই – ইয়ে – ভাল লাগবে।”
তাঁর কথা সুরে আমাদের মেজাজ এমন বিগড়ে গেল যে তৎক্ষণাৎ আমরা মুখে হাসি রেখেই বিদায় নিতাম, কিন্তু শার্লক হোমসের দেখলাম কোনও বিকার নেই, সে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে আজে-বাজে বকবক করতে করতে দরজার দিকে এগিয়ে গেল। পকেট থেকে চাবি বার করে দরজা খুললেন ক্যাপ্টেন, আমরা ভেতরে ঢুকলাম। হালকা আলোর একটা হল, সেটা পেরিয়েই একটা বড় অ্যাপার্টমেন্ট, চমৎকার সাজানো, বোঝাই যায় গৃহকর্তার রুচি আছে।
“আসন গ্রহণ করুন, ভদ্রমহোদয়গণ,” বললেন ক্যাপ্টেন। “আমার চাকরটা এখনও ফেরেনি দেখছি – ও-ও থিয়েটার হলে গেছিল – আমি আবার আপনাদের গাড়িতে চলে এলাম কিনা। নিজেই চেষ্টা করি – দেখা যাক, পারি কিনা।” বলেই তিনি পানীয়ের বোতল, পানপাত্র আর চুরুটের বাক্স সাজাতে লাগলেন।
আমরা চুপ করে বসে ক্যাপ্টেনের কান্ড দেখছি, হঠাৎই শার্লক হোমস পকেট থেকে রুমাল বার করে নাকে চেপে ধরল, সঙ্গে “ওরে বাবা” গোছের একটা আওয়াজ।
“আরে কিছু না, কিছু না,” বলল সে, “নাক দিয়ে রক্ত পড়ছে, থিয়েটারে গেলেই আমার এটা হয়।” তার মাথা সামনে ঝোঁকানো, সারা মুখ রুমালে ঢাকা।
“খুব বিশ্রী আর বিরক্তিকর ব্যাপার,” মার্জনা চাওয়ার ভঙ্গি তার। “ঠাণ্ডা জল – ইয়ে – ক্যাপ্টেন, আপনার ড্রেসিং রুমে একটু যেতে পারি?”
“নিশ্চয়ই, নিশ্চয়ই,” বললেন ক্যাপ্টেন, “সোজা দরজা দিয়ে, মিঃ হোমস।”
হোমস দ্রুত অদৃশ্য হয়ে গেল দরজা দিয়ে, শুনতে পেলাম কল থেকে জল পড়ার আওয়াজ। আমরা সবে আবার আমাদের কথাবার্তা চালাতে শুরু করেছি, দরজায় এসে দাঁড়াল হোমস, হাতে একটা জ্যাকেট।
“ধন্যবাদ, ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারু,” এগিয়ে এসে বলল সে, “নাকের অবস্থা এখন অনেক ভাল, তবে এটা হওয়ায় একটা জিনিস আবিস্কার করলাম - ধৃষ্টতা মাপ করবেন, ক্যাপ্টেন, এটা কি আপনার?”
ক্যাপ্টেনের মুখ দেখলাম শুকিয়ে গেছে, কিন্তু তিনি জোর গলায় বললেন, “এটা তো আমার চাকরের জ্যাকেট, মিঃ হোমস। ও বোধহয় ভুলে গেছে। জিজ্ঞেস করছেন কেন?”
“বোতামগুলো দেখছিলাম,” বলল হোমস, “আমার পকেটে একটা বোতাম আছে, সেটা হুবহু এগুলোর মতো।” বলে পকেট থেকে সে বার করল সেই বোতামটা।
“তাতে কি হল?” গরগরে গলায় বললেন ক্যাপ্টেন, “এরকম তো কতই আছে!”“সে তো আছে,” একমত হল হোমস, “কিন্তু আমার হাতের এই বোতামটা এটার গোড়া থেকে উপড়ে এসেছে – এবং সেটা এই জ্যাকেট থেকেও হতে পারে।”
“মিঃ হোমস,” নাক সিটকে বললেন ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারু, “আপনার ঠাট্টাটা একেবারেই মাঠে মারা গেল। ও জ্যাকেটটার সব কটা বোতামই ঠিকঠাক আছে।”
“তা আছে, তবে ছিল না,” ঠাণ্ডা গলায় বলল হোমস, “এই যে, দেখুন না, এই বোতামটা সেলাই করা হয়েছে এমন কাঁচা হাতে যে সেলাইয়ের সব সুতোগুলোই দেখা যাচ্ছে। দর্জি সেলাই করলে এমন হত না। হাত পাকা না হলে, বা খুব হুড়োহুড়ি করলে এরকম হয়। কিছু বুঝলেন, ক্যাপ্টেন?”
কথা বলতে বলতেই শার্লক হোমস এগিয়ে গেল সেদিকে, যেখানে ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারু দাঁড়িয়েছিলেন ফায়ার-প্লেসের সামনে পাতা কম্বলটার ওপর, তাঁর মুখ কালচে মেরে গেছে উত্তেজনায়। হোমস জ্যাকেটটা হাতে নিয়ে কিছু একটা করতে গিয়ে ক্যাপ্টেনের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে ম্যান্টেলের গায়ে জোর ধাক্কা খেল এবং সেই মুহূর্তে নিজেকে সামলানোর জন্য হাত ছুঁড়তেই সেটা একটা চমৎকার পাত্রকে স্থানচ্যুত করল, উলটে পড়ল সেই পাত্রটা মেঝের ওপর, টুকরো টুকরো হয়ে গেল মুহূর্তেই। ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারুর মুখ দিয়ে একটা আর্তনাদ বেরিয়ে এল, তিনি ঝাঁপিয়ে পড়লেন টুকরোগুলোর ওপর। কিন্তু শার্লক হোমস তাঁর চেয়েও দ্রুত বেগে মেঝে থেকে কুড়িয়ে আনল চকচকে একটা বস্তু।
“মিঃ রিচার্ডসন,” বলল সে শান্ত গলায়, “এই জিনিসটায় আপনার আগ্রহ হবে বলেই আমার ধারণা।”
সমস্ত ঘটনাটায় আমরা ঘোর কাটিয়ে ওঠার আগেই দেখলাম ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারু নিজেকে সামলে নিয়ে একটা চুরুট ধরাচ্ছেন।
“দারুণ হল, মিঃ শার্লক হোমস,” বললেন তিনি, “এমন চমৎকার একটা সন্ধ্যা উপহার দেওয়ার জন্য আমি সত্যিই আপনার এবং আপনার বন্ধুদের কাছে কৃতজ্ঞ। আমি বলি কি, রাত অনেক হয়েছে, আর মোটরগাড়ি যখন আপনাদের আছেই, বেকার স্ট্রিট কি বড্ড দূর হয়ে যায়?”
ঘরে পৌঁছে আরাম করে রাত্তিরের শেষ চুরুটটা ধরানোর পর হোমস বলল, “সে তো বটেই। আমার কাছ থেকে পুরো ঘটনাটা শুনতে চাওয়া এবং তার রস পুরোটা উপভোগ করতে চাওয়াটা তো স্বাভাবিক। ওয়াটসনের লেখা পড়ে আপনাদের এই ইচ্ছেটা আরও জোরদার হয়েছে। যাই হোক, মাননীয় লর্ডশিপের আন্ডার-বাটলারের দিকেই এই বোতামটার ব্যাপারে আমার নজর গেছিল বটে, তবে প্রথম চোটেই যা বেরোল, তাতে অবাক হয়ে গেলাম। চাকরটা সম্পূর্ণ অন্য লোক। আরও আশ্চর্য, দর্জি বলল যে তার একই দিনে দুবার ওই বোতামের ব্যাপারে ডাক পড়েছিল, এবং সেটা পোল-ক্যারুর চাকরের জন্য। শুরু করার পক্ষে যথেষ্ট সূত্র পাওয়া গেল।
“তদন্ত শুরু করে আরও দেখলাম ওই আন্ডার-বাটলার এ ব্যাপারে কিছুই জানে না, বরং উঠে এল ক্যাপ্টেন এবং তাঁর চাকরের ভূমিকা। চুরির প্ল্যানটা ক্যাপ্টেনের মাথা থেকেই বেরিয়েছে, যদিও চুরিটা করেছে তাঁর চাকর। এমনকি আমি এ ব্যাপারটা আরও খুঁটিয়ে দেখতে ল্যাংহাম-এও একবার ঢুঁ মেরেছি, যেরকম বলেছিলাম।”
আমেরিকান ভদ্রলোক দুজন পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করলেন।
“অসম্ভব!” বলে উঠলেন দুজনেই। “আমরা সারাক্ষণ ঘরেই ছিলাম। একজনই এসেছিল দেখা করতে, আর সে হল ওই দোকানদারেরই পাঠানো একটা লোক – একেবারেই গোবেচারা একটা বুড়ো – ঘরে ঢুকে আমাদের বেড়ানোর ব্যাপারে হাবিজাবি জিজ্ঞেস করছিল।”
“পেশার জন্য আমাকে নানারকম ছদ্মবেশ ধরতে হয়,” হেসে বলল হোমস, “যদিও আমি আপনাদের ঘরে সরাসরিই ঢুকতে পারতাম, তবুও আপনাদের বোকা বানানোর লোভ সামলাতে পারলাম না। কিন্তু ছদ্মবেশে তো আর ক্যাপ্টেন পোল-ক্যারুর ঘরে ঢোকা যেত না, যেটা এখন সবচেয়ে জরুরি। এখন মনে হচ্ছে, কাজটা ভালই হয়েছে। তুমি তো জানই ওয়াটসন, থিয়েটারের যোগাযোগ খাটিয়ে বক্স কে ভাড়া নিয়েছে জানাটা আমার কাছে কোনও ব্যাপারই না।
“এরপরের পুরো ব্যাপারটাই আমার হাতে। আমি জানতাম পোল-ক্যারু আমায় চিনে ফেলবে – তোমার জন্যই চিনেছে, ওয়াটসন – আর যখন দেখলাম তিনি এক ঝলক তাকালেন গ্যালারির একটা লোকের দিকে, আমি মোটেই অবাক হইনি, কারণ আমি দেখলাম তিনি লোকটার সঙ্গে কথা বলছেন। কথা বলছেনই বলব, কারণ ওটা কথা নয়, ওকে বলে ঠোঁটের ভাষা – ক্যাপ্টেন এই ভাষায় একজন বিশেষজ্ঞ। আমি একসময় এ ব্যাপারটা নিয়ে চর্চা করেছি, কাজেও লেগেছে। কাজেই ক্যাপ্টেন ঠোঁটের ভাষায় কি বলছেন, বুঝতে আমার মোটেই সময় লাগেনি। ভাষাটা ছিলঃ “পাত্রটা লুকিয়ে ফেল! পাত্রটা লুকিয়ে ফেল!” বেশ কয়েকবার বলা হয়েছিল এটা।
“ঠিক তখনই আমি উঠে থিয়েটারের লবিতে যাই একজন বন্ধুভাবাপন্ন গোয়েন্দার সঙ্গে কথাবার্তা বলার জন্য। আমার দৃঢ় বিশ্বাস,” বলল শার্লক হোমস, “ক্যাপ্টেন যে তাঁর ঘরে গিয়ে চাকরকে পাননি, এর পেছনে ওই বন্ধু গোয়েন্দার হাত আছে। অনিচ্ছুক ক্যাপ্টেনকে রাজি করিয়ে গাড়িতে তোলা বেশ কায়দা করেই করা হয়েছে, বাকিটা তো দেখতেই পেলেন।
“যেহেতু আপনারা আপনাদের জিনিসটাই ফেরত চেয়েছেন, কোনও রকম থানাপুলিশ করবেন না বলেছেন, তাই আমার মনে হয় আর কিছু বলার নেই।”
“আছে বইকি,” বললেন ভদ্রলোক পকেট থেকে অলংকারটা বার করে দেখিয়ে, “এত সুন্দর জিনিসটা উদ্ধার হল, তার জন্য আপনার কত প্রাপ্য হয়, সেটা বলবেন না?”
শার্লক হোমস হাসল। খুশির হাসি।
“মাই ডিয়ার আমেরিকান স্যার,” বলল সে, “আমি এখনও আপনাদের কাছে ভীষণভাবে ঋণী। আপনাদের এডগার অ্যালান পো-র জন্য।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন