অমিত দেবনাথ
সময়টা এই শতকের তিনের দশকের প্রথম দিক। গ্রীষ্মের মাঝামাঝি এক বিকেলে আমি সবে আমাদের ৭ বি প্র্যাড স্ট্রিটের বাসায় ঢুকেছি, চেঁচিয়ে উঠল সোলার পোনস, “এই যে, পার্কার! এক্কেবারে ঠিক সময়ে এসেছ! লন্ডনের অপরাধ জীবনের আরেকখানা উদাহরণ দেখতে পাবে এখনই। তোমার তো এসবে বেশ ফুর্তিই হয়।”
“আবার কোনও কেস এসেছে নাকি?” আমি বললাম।
“তা বলতে পার। একখানা চিঠি এসেছে, আমি তাতে সাড়াও দিয়েছি।”
কথা বলতে বলতেই পোনস নামিয়ে রাখল তার পিস্তলখানা, যেটা দিয়ে সে এতক্ষণ টিপ প্র্যাকটিস করছিল। এই এক হতচ্ছাড়া অভ্যেস যে আমাদের দীর্ঘদিন ধরে রোগে ভোগা বাড়িওয়ালি মিসেস জনসনের কী পরিমাণে অসুবিধে করে, কী বলব! টেবিলের ওপর রাখা কাগজের গাদা থেকে সে একখানা কার্ড বার করে আমার দিকে এমন ভাবে ছুঁড়ে দিল যে সেটা আমার কাছে এসে পড়ল খোলা অবস্থায়। তাতে লেখা:
“প্রিয় মিঃ পোনস,
মিঃ হামফ্রেস সব সময়েই বলেন যে আপনার কাজ পুলিশের থেকে অনেক ভাল, তাই সব কিছু ঠিকঠাক থাকলে আজ বিকেলে – সন্ধ্যে নাগাদ জুলিয়া ফিরলে আপনার ওখানে গিয়ে সব বলব। ডাক্তার বলেন যে মিঃ পি-র সব কিছুই ঠিক আছে, কিন্তু আমার সন্দেহ হয়।”
শ্রদ্ধাসহ
মিসেস ফ্লোরা হোয়াইট
আমি এটা পড়ার সময় তার চোখে একটা মৃদু ঝলসানি লক্ষ্য করলাম।
“সাংকেতিক চিঠি নাকি?”
পোনস জিভ দিয়ে একটা চুকচুক আওয়াজ করল। “সব কিছুই অত জটিল ভাবে নিয়ো না পার্কার। মহিলা খুবই উদ্বিগ্ন এবং সম্ভবত ক্রুদ্ধও, আর কিছু না।”
“আমি কিন্তু কিছুই বুঝলাম না।”
“তাতে আর আশ্চর্য কী!” গজগজ করল পোনস। “তবে এটা অতি সোজা। মহিলা কোনও এক মিঃ হামফ্রেস-এর কথা লিখেছেন। আমার মনে হয় ইনি সেই অ্যাথোস হামফ্রেস, যাঁর জন্য আমরা সেই পেনি ম্যাজেন্টার ছোট ঘটনাটার তদন্ত করেছিলাম। মহিলা যে ব্যাপারটা আমাদের দেখতে বলেছেন, সে ব্যাপারে এর মধ্যেই একজন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া হয়ে গেছে। ডাক্তার কিন্তু তাঁকে কোনও রকম ভাবেই আশ্বস্ত করতে পারেননি। মহিলা তক্ষুনি আসতে পারেননি, কারণ তিনি রোগীকে একা রেখে আসতে চাননি। তার মানে রোগী এখনও বেঁচে আছে। তিনি এখানে আসতে চান সন্ধ্যে নাগাদ। কেন? না, জুলিয়া না ফিরলে তাঁর পক্ষে বেরোন সম্ভব নয়। তাহলে ধরে নেওয়া যায় জুলিয়া তাঁর মেয়ে, অন্ততপক্ষে স্কুলে পড়া মেয়ে; যতক্ষণ না স্কুল ছুটি হবে, ততক্ষণ সে বাড়ি আসতে পারবে না। সে বাড়িতে এসে মিসেস হোয়াইটের জায়গাটা নিলে তবেই মিসেস হোয়াইট আমাদের এখানে আসার সময় পাবেন।
“আর তিনি বোধহয় এসেও পড়লেন, কারণ বাইরে এই মাত্র একটা গাড়ি এসে থামল।”
আমি জানলা দিয়ে গলা বাড়িয়ে দেখলাম সত্যিই আমাদের বাড়ির নিচে একটা গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে আর ভেতর থেকে নামছেন এক মাঝবয়সী মোটাসোটা মহিলা। একেবারে সাদামাটা পোশাক পরা, দেখলেই বোঝা যায় সরাসরি কাজ থেকে আসছেন। গায়ে - মাথার অস্বাভাবিক টুপিটার কথা বাদ দিলে - শুধু একটা পাতলা শাল জড়ানো, কারণ আগস্ট মাসের পক্ষে আজকের দিনটা বেশ ঠান্ডা।
একটু বাদেই তাঁকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন মিসেস জনসন। মহিলা আমাদের মুখের দিকে তাকালেন পর্যায়ক্রমে, মুখের অনিশ্চিত হাসিটা দেখে বোঝাই যাচ্ছিল তিনি বুঝতে পারছেন না, কার সঙ্গে কথা বলবেন। তারপর আমার সঙ্গীর দিকে তাকিয়ে বললেন, “আপনিই তো মিঃ পোনস?”
“আজ্ঞে হ্যাঁ, মিসেস হোয়াইট,” বলল পোনস ভীষণ নম্র গলায়, চোখের কোনা দিয়ে ভদ্রমহিলাকে খুঁটিয়ে দেখতে দেখতে। “বসুন। বলুন আপনার সমস্যাটা কী?”
মহিলা বসলেন। মনে হল তাঁর আত্মবিশ্বাস বাড়ছে ক্রমশ। শালটা গলা থেকে খানিকটা গুটিয়ে এনে মনে মনে ঠিকঠাক করতে লাগলেন কোত্থেকে শুরু করবেন। গলার স্বর আর উচ্চারণ যান্ত্রিক, শুনে মনে হয় লন্ডনের ইংরেজি তো নয়ই, বরং আঞ্চলিক টান আছে।
তিনি বুঝিয়ে বলছিলেন কিভাবে তিনি “মিঃ আমফ্রেসকে সমস্যার কথা বলছেন,” কিভাবেই বা মিঃ হামফ্রেস “আমাকে কইলেন আমার বন্ধু আছে সোলার পোনস, তুমি তেনার সঙ্গে কতা কও, তাই আমি আপনার কাচে এয়েচি”। তাঁর বোনঝি স্কুল থেকে ফেরার সাথে সাথেই তিনি এসেছেন। পোনস এক মনে তাঁর গৌড়চন্দ্রিকা শুনে যাচ্ছিল কোনও রকম বাধা না দিয়ে। তারপর যখন আসল কথায় এলেন মহিলা, তখনও কোনও রকম বাধা না দিয়ে শুনতে লাগল।
মহিলা বাড়ি বাড়ি ঘুরে ধোয়ামোছার কাজ করেন। আজকে তাঁর দিন ছিল হ্যাম্পস্টেড হিথ-এর আইডোমেনো পারসানোর বাড়িতে কাজ করার। ভদ্রলোক একজন স্প্যানিশ বংশোদ্ভূত আমেরিকান, দেশ ছেড়ে এখানে এসেছেন। হ্যাম্পস্টেড হিথ-এর একেবারে শেষ প্রান্তে তিনি একটা বাড়ি কেনেন এগারো বছর আগে এবং তখন থেকেই তিনি প্রায় গৃহবন্দি। এখানকার লোকজন তাঁকে জানে একজন পোকামাকড়ের বিশেষজ্ঞ হিসেবে। আশেপাশের বাচ্চাদের সাথে তাঁর ভালই ভাবসাব আছে। ওরা তাঁকে একজন নরমসরম বৃদ্ধ মানুষ হিসেবেই জানে, যিনি কিনা, তাঁর সংগ্রহের জন্য পোকামাকড় এনে দিলেই তাদের সিক্সপেন্স বা একটা গোটা শিলিংই দিয়ে দেন।
পারসানোকে দেখে সব দিক দিয়েই মনে হয় তিনি এখন অবসর জীবন যাপন করছেন। মিসেস হোয়াইট তাঁর নিজস্ব ভঙ্গিতে বলছিলেন যে তিনি তাঁর অন্যান্য কীটপতঙ্গ বিশেষজ্ঞ বন্ধুদের সাথে প্রায়ই যোগাযোগ করতেন এবং বিভিন্ন নমুনা আদানপ্রদান করতেন। তাঁকে দেখে মনে হত একদমই সরল সাদাসিধে একজন মানুষ, কিন্তু মাসখানেক আগে তিনি আমেরিকা থেকে একটা পোস্টকার্ড পেয়ে ভীষণ ঘাবড়ে যান। এর মধ্যে তাঁর নাম ঠিকানা ছাড়া আর কিছুই লেখা ছিল না, এবং কার্ডটাও আসলে একটা কমিক পিকচার কার্ড। কিন্তু এই পোস্টকার্ডটা পেয়েই তিনি এমন বিচলিত হয়ে পড়েন যে বাড়ি থেকেই আর বেরোতেন না।
যে দিনটার কথা বলা হচ্ছে, সে দিনটায় মিসেস হোয়াইটের ওখানে যেতে একটু দেরি হয়ে গেছিল, প্রায় বিকেল। গিয়ে দেখেন, ভদ্রলোক তাঁর ডেস্কে অদ্ভুতভাবে বসে আছেন। তিনি প্রথমে ভেবেছিলেন ভদ্রলোকের বোধহয় মাথা খারাপ হয়ে গেছে। তিনি ভদ্রলোককে ওঠানোর অনেক চেষ্টা করলেন, কিন্তু লাভ হয়নি, শুধু ভদ্রলোকের মুখ থেকে বিড়বিড় করে বেরিয়ে আসা কয়েকটা কথা শুনতে পেয়েছিলেন, “অদ্ভুত পোকা – বিজ্ঞান জানে না”। আরও কী সব বলছিলেন তিনি “ওই কুকুরটা, ওই কুকুরটা” করে, কিন্তু তাঁর বাড়িতে কখনোই কোনও কুকুর ছিল না, এবং এখনও নেই। ভদ্রলোক একটা দেশলাইবাক্সে ভরা পোকার দিকে তাকিয়েছিলেন, সম্ভবত সেই মাত্রই ডাকে এসেছিল সেটা।
“ওরে বাবারে বাবা, সে কী সাংঘাতিক পোকা, মিঃ পোনস। গা ঘিনঘিন শিরশির করে!” বললেন মহিলা।
মিসেস হোয়াইট তৎক্ষণাৎ একজন ডাক্তার ডাকেন। ডাক্তার স্থানীয় এক তরুণ, কিন্তু তিনি এসে রোগীকে দেখেই পরিষ্কার বলে দেন তিনি এ কেসের মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারছেন না, কারণ এরকম কেস তিনি আগে কখনোও দেখেননি, তবে এটা বলে দেন যে রোগীর মাংসপেশিতে পক্ষাঘাত হয়েছে এবং পারসানোর হার্টঅ্যাটাক হয়েছে দারুণ রকম। মিসেস হোয়াইটের কাছ থেকেও ডাক্তার যা শুনলেন, তার ভিত্তিতে রোগীকে ঘুমের ওষুধ দিয়ে যান এবং বলেন যাতে রোগী কোনও ভাবেই নড়াচড়া না করে।
যাই হোক, মিসেস হোয়াইট, ডাক্তারের ভাবভঙ্গিতে মোটেই খুশি হননি এবং ডাক্তার বিদায় নিতেই তিনি “মিঃ আমফ্রেস” -এর সঙ্গে পরামর্শ করেন, এবং সেই মতোই ওই লেখাটা পাঠান, যা আমি নিজেও একটু আগে দেখলাম। মিঃ পোনস কি একবারটি গিয়ে তাঁর মনিবকে দেখবেন?
আমি একটা কথা না বলে পারলাম না। “আপনার কিসে মনে হল ডাক্তার ভুল করছেন, মিসেস হোয়াইট?”
“আমার মনে হচ্ছে, তাই,” বললেন মহিলা আন্তরিকভাবেই, “মেয়েছেলেরা অনেক কিছু বুঝতে পারে, স্যার।”
“ঠিকই বলেছেন, মিসেস হোয়াইট,” পোনস এমন সুরে কথাটা বলল যে আমি আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহসই পেলাম না। “আমার বন্ধু পার্কারও একই কথা বলে। আর ওর যে সব বন্ধুবান্ধব চিকিৎসকেরা আছে, তারা এমন ভাব করে যেন তারা সাধারণ মানুষের উর্ধ্বে। আমি যাব, মিসেস হোয়াইট, যদিও দুঃখের সঙ্গে জানাচ্ছি যে আমার চিকিৎসাশাস্ত্রে জ্ঞান খুবই সীমিত।”
“এই যে স্যার,” বললেন আমাদের মক্কেল, “এই কার্ডটা আমরা পেইচি।”
বলেই তিনি পোনসের হাতে একটা রঙিন পোস্টকার্ড তুলে দিলেন। খুবই সাধারণ পোস্টকার্ড, আমেরিকায় হরদম দেখা যায়। যে সব লোকেরা ছুটিছাটায় যেতে পারে না, তাদের এই কার্ডে ছুটির শুভেচ্ছা জানানো হয়। সেখানে আঁকা আছে একটা কার্টুন, তাতে দেখা যাচ্ছে একজন খুব মোটা লোক প্রাণপণে দৌড়োচ্ছে, পেছনে তাড়া করেছে একটা বকলশ ছেঁড়া কুকুর। আঁকাটাও খুব পোক্ত হাতের নয়, আর লেখাটাও একেবারেই গতানুগতিক। “ফক্স লেকে দারুণ কাটাচ্ছি। তুমি যদি থাকতে!” চিঠিতে আর কিছুই নেই, শুধু পারসানোর নাম ঠিকানা লেখা ছাড়া, ডাকের ছাপ শিকাগোর।
“এ তো দেখছি খুবই নিরীহ একটা চিঠি,” আমি বললাম।
“তাই তো দেখছি,” বলল পোনস, একটা ভুরু তুলে।
“এটা দেখেই পারসানো ওরকম ঘাবড়ে গেল?”
“ঘাবড়ানো না বলে বিপর্যস্ত বললেই বোধহয় ভাল হয়, তাই না মিসেস হোয়াইট?”
“ঠিকই বলেছেন মিঃ পোনস। ভয়ংকর বিপর্যস্ত। আমিই তো তেনাকে কার্ডটা দিলাম স্যার, বললাম, আপনার বন্ধুরা তো খুব ফুত্তিতে দিন কাটাচ্চে। কী আর বলব স্যার, এই চিটিটা পেয়েই তো ওনার মুক-চোক সাদা হয়ে গেল। বিষম-টিষম খেয়ে এমন কাশতে লাগলেন যে কি বলব! তিনি তো ছুঁড়েই ফেলে দিলেন এটা, কোনও কতাই কইলেন না। আমিই তো তারপর এটা তুলে রেকেচিলাম।”
পোনস ডান কানের লতিটা ধরে নাড়াচাড়া করতে করতে মহিলার কথা শুনছিল। এবার বলল, “মিঃ পারসানো মোটাসোটা, তাই না মিসেস হোয়াইট?”
মহিলার সাদামাটা মুখ হাসিখুশি হয়ে উঠল। “ঠিক বললেন মিঃ পোনস, কিন্তু কেমন করে জানলেন কে জানে। মিঃ আমফ্রেস তো ঠিকই বলেছিলেন, আপনি একটা আশ্চজ্জি মানুষ!”
“তাঁর বয়স কত হবে বলে আপনার মনে হয়?”
“ষাট মতো হবে।”
“আচ্ছা, আপনি যে বললেন আপনার মনিব বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিলেন, তার মানে কি এই যে তিনি ভয়ও পেয়েছিলেন?”
আমাদের মক্কেলের ভুরু কুঁচকে গেল। “তিনি বিপর্যস্ত ছিলেন স্যার,” তাঁর গলায় একটা একগুঁয়ে ভাব।
“রাগ-টাগ ছিল না?”
“না স্যার। বিপর্যস্ত। মহা সমিস্যেয় পড়লে য্যামোন হয় আরকি। মুক-টুক সব পাঙাশপানা হয়ে গেল, আর বিড়বিড় করে কিছু একটা কইলেনও বটে, তা সে আমার কানে সেঁদোয়নি। কার্ডখানাও ছুঁড়ে ফেললেন এমনভাবে, যেন আর কোনও দিন সেখানাকে দেকতে চান না। আমিই তো তুলে রাকলাম স্যার।”
পোনস খানিকক্ষণের জন্য চোখ বন্ধ করে কী যেন ভাবল। তারপর ঘড়িতে সময় দেখে বলল, “এখন তো প্রায় সাড়ে ছ’টা বাজে। কিন্তু ব্যাপারটা জরুরি। আপনি কি গাড়ি দাঁড় করিয়ে রেখেছেন?”
মাথা নাড়লেন মিসেস হোয়াইট। “জুলিয়া না হলে খুব চিন্তা করবে।”
“যাক, ভাল হয়েছে,” লাফিয়ে উঠল পোনস, বলল, “আপনার সঙ্গে আমরা সোজা ওখানে যাব। এক মুহূর্তও সময় নষ্ট করা যাবে না। এর মধ্যেই অনেক দেরি হয়ে গেছে।”
বেগুনি রঙা ড্রেসিং গাউনটা খুলে এক পাশে ফেলে পোনস ঝটপট বেরোনোর জন্য তৈরি হয়ে নিল, মাথায় ডিয়ারস্টকার টুপি চড়িয়ে।
গোটা রাস্তায় পোনস ধ্যানমগ্ন হয়ে রইল একটি কথাও না বলে, মাথা ঝুঁকে রইল বুকের ওপর, রোগা রোগা আঙুলে ভর দেওয়া রইল থুতনিটা।
হ্যাম্পস্টেড হিথ-এর একেবারে প্রান্তের বাড়িখানার আশেপাশে আর কোনও বাড়ি নেই। পাথরের পাঁচিল তো আছেই, তার চারপাশে গাছের বেড়াও আছে গোটা বাড়িটা ঘিরে। বাড়িটা ছোট আর একতলা। মহিলা লাফিয়ে নামলেন গাড়ি থেকে, পেছন পেছন পোনস, আমি রয়ে গেলাম ভাড়া মেটানোর জন্য। বাড়িতে ঢুকে দেখি একটা ছোট মেয়ে, শুকনো মুখ... আমাদের দেখে ভরসা পেয়েছে বোঝাই যাচ্ছিল।
“কোনও কিছু হয়েছে নাকি, জুলিয়া?” জিজ্ঞেস করলেন মিসেস হোয়াইট।
“না, ম্যাম। উনি ঘুমোচ্ছেন।”
“কেউ এয়েচিল?”
“না, ম্যাম। কেউ আসেনি।”
“ঠিক আছে। তুমি এখন বাড়ি যাও, নক্কি মেয়ে।” তারপর আমাদের দিকে ঘুরে তাঁর বাঁদিকের একটা দরজা দেখিয়ে বললেন মিসেস হোয়াইট, “ওই ঘরে, মিঃ পোনস।”
ঘরে দুটো পুরোন ধাঁচের বাতি জ্বলছিল, তাতেই ঘরের সব কিছু পরিস্কারভাবে দেখা যাচ্ছিল। মিসেস হোয়াইটের মনিব বসে আছেন একটা পুরোন চিপেন ডেল উইং চেয়ারে, একটা বড় টেবিলের সামনে, সবকটাই ওই বাতিগুলোর মতোই মান্ধাতার আমলের, যেগুলোর আলোয় ভূতুড়ে লাগছিল ঘরখানা। স্থুলকায় মানুষটিকে একঝলক দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তিনি মোটেই ঘুমোচ্ছেন না, বরং একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন তাঁর সামনে রাখা একটা অদ্ভুত জিনিসের দিকে, যেটা রয়েছে একটা খোলা দেশলাই বাক্সের মধ্যে, আমার অনভিজ্ঞ চোখে যেটাকে একটা একটু বেশি মাত্রায় গোদা শুঁয়োপোকা ছাড়া আর কিছুই মনে হল না। একটা ভয়াবহ হাসি, যাকে বলে risus sardonicus লেগে রয়েছে পারসানোর ঠোঁটে।
“মিঃ পারসানোর ব্যাপারটা বোধহয় তোমার কাছে চলে গেছে, পার্কার,” শান্ত গলায় বলল পোনস।
মুহূর্তের মধ্যেই বুঝতে পারলাম পোনস কী বলতে চাইছে। চেঁচিয়ে উঠলাম আমি, বললাম, “পোনস, ভদ্রলোক মারা গেছেন!”
“ওঁকে আমরা জীবিত দেখলেই আশ্চর্য হতাম,” বলল পোনস। তারপর মহিলাকে বলল, “এবার তো আপনাকে পুলিশে খবর দিতে হবে, মিসেস হোয়াইট। আপনি বলুন স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ইনস্পেক্টর টেলরকে পাঠাতে, বলবেন যে আমি এখানে আছি।”
মনিব আর নেই শুনেই মিসেস হোয়াইট এক বিকট চিৎকার ছেড়েছিলেন, তিনি এখন শুধু এটুকুই বলতে পারলেন যে বাড়িতে টেলিফোন নেই, তাঁকে কাছাকাছি যে বাড়িতে টেলিফোন আছে, সেখানে যেতে হবে।
আমাদের মক্কেল ঘর থেকে বেরোবামাত্র পোনসের কাজ শুরু হয়ে গেল। একটা বাতি তুলে নিয়ে সে ঘরটা পরীক্ষা করা শুরু করল, হাঁটু গেড়ে বসতে লাগল যখন তখন, পরীক্ষা করল দেওয়াল, বইয়ের তাক, দেওয়ালের লাগোয়া লেখার টেবিল এবং সব শেষে মৃতদেহের হাত আর মুখ পরীক্ষা করল অত্যন্ত যত্ন নিয়ে।
“গায়ের রঙটা কেমন যেন হয়ে গেছে না, পার্কার?” বলল সে অবশেষে।
আমি ঘাড় নাড়লাম। ও ঠিকই বলেছে।
“করোনারি থ্রম্বোসিসে এরকম হতে পারে?”
“সাধারণত হওয়ার কথা নয়।”
“একটা আঙুলের রঙ দেখ কেমন পাল্টে গেছে। খুব সামান্যই যদিও,” বলল পোনস, “আর ফুলেও গেছে, তাই না?”
“হ্যাঁ, দেখেছি। আর সামান্য কেটেও গেছে, খেয়াল কর।”
“তাহলে তো নির্ঘাত শরীরের অন্যান্য খোলা জায়গাগুলোও একইরকম ফ্যাকাশে হয়ে ফুলে গেছে,” বলল পোনস।
“আমি তোমাকে একটু ধরিয়ে দিচ্ছি পোনস,” আমি বললাম, “যদি ভদ্রলোককে বিষ দেওয়াই হয়ে থাকে, তাহলেও সেটা কোনও সাধারণ বিষ নয়। আর্সেনিক, অ্যান্টিমনি, স্ট্রিকনিন, প্রুসিক অ্যাসিড, সায়ানাইড, অ্যাট্রোপিন... কোনওটার সঙ্গেই এই লক্ষণগুলো খাপ খায় না। কাজেই আমি এক্ষুনি বলতে পারছি না যে ভদ্রলোকের অস্বাভাবিক কোনও উপায়ে মৃত্যু হয়েছে।”
“এত রেখেঢেকে বললে কী করে হবে!” রুক্ষস্বরে বলল পোনস, “তাহলে আমি ধরে নিচ্ছি, লক্ষণগুলো করোনারি থ্রম্বোসিসের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।”
“তাই তো মনে হচ্ছে।”
পোনস একটু সন্তুষ্ট হল মনে হয়। এবার সে সামনের লেখার টেবিলটাকে নিয়ে পড়ল। টেবিলে নানারকম, বহুরকমের জিনিসপত্র এমনভাবে ছড়ানো ছিল যে বোঝাই যাচ্ছি আক্রান্ত হওয়ার আগে পর্যন্ত পারসানো পোকাটাকে চেনার চেষ্টা করছিলেন। পোকামাকড়ের ওপর নানারকম বই আর গাইড খোলা অবস্থায় অর্ধবৃত্তাকারে রাখা ছিল খোলা দেশলাই বাক্সটার সামনে, যার মধ্যে ছিল সেই অদ্ভুত পোকাটা। এছাড়াও টেবিলের একটু পেছনে, যেখানে ঘরের আলোটা সরাসরি পড়েনি, আবছায়া হয়ে আছে জায়গাটা... সেখানে ছিল একটা বাক্স, যার মধ্যে আটকানো ছিল নানারকমের পোকামাকড়ের নমুনা... তাদের জীবনচক্রের নানা দিক, একেবারে লার্ভা থেকে পিউপা পর্যন্ত, এ থেকেও বোঝা যাচ্ছিল পারসানো শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিজ্ঞানের অজানা এই পোকাটার সঙ্গে তাদের কোনও রকম মিল খুঁজে পাওয়ার জন্য চেষ্টা চালিয়েছিলেন।
আমি হাত বাড়িয়ে দেশলাই বাক্সটা নিতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু পোনস বাধা দিল।
“না, পার্কার। কোনও কিছু ধরা ঠিক হবে না। বাক্সের ঢাকনাটা লক্ষ্য কর। কয়েকটা ফুটো দেখা যাচ্ছে না?”
“সেটা পোকাটার জন্য। ওর বাতাস দরকার ছিল।”
পোনস জিভ দিয়ে একটা চুকচুক আওয়াজ করল। “মাঝে মাঝে এরকম বোকার মতো কথাবার্তা বলে আমাদের হাসিও, কেমন? পোকাটা মরে গেছে, আর আমার ঘোরতর সন্দেহ আছে এটা কখনোও জ্যান্ত ছিল কিনা। তার ওপর পার্সেলটাও মোড়ানো ছিল। এসো, ঢাকনাটা সামান্য সরালেই বোঝা যাবে ব্যাপারটা।”
সে তাই করল এবং তৎক্ষণাৎ বোঝা গেল ফুটো ফুটো করে লেখা আছে একটা লাইন। আমি আর পোনস দু’জনেই পড়লাম সেটা।
“ছোট্ট কুকুর বড় বেড়ালকে ধরেছে।”
আমি এক ঝলক তাকালাম পোনসের দিকে। “এ তো মনে হচ্ছে কোনও সাংকেতিক বার্তা।”
“হুম! তবে খুবই সংক্ষিপ্ত,” বলল পোনস।
“কিন্তু সত্যিই কি তাই?” আমি বললাম, “এর কি সত্যিই কোনও মানে আছে?”
“হয়তো তাই,” একমত হল পোনস, “তবে আমি আশা করছি, এর থেকে আমি, কে আইডোমেন পারসানোর মৃত্যুর জন্য দায়ী, সেটা বার করে ফেলব।”
“কি বলছ পোনস! এ তো প্রায় অসম্ভব কাজ!” “আরে না না, ব্যাপারটার মধ্যে খুব জটিলতা কিছু নেই,” বলে উঠল পোনস, “তুমি আমার কর্মপদ্ধতি জান, পার্কার। তোমার কাছে সমস্ত তথ্য আছে। এবার শুধু এগুলো কাজে লাগাতে হবে।”
বলেই সে চলে গেল বাতিল কাগজ ফেলার ঝুড়িটার কাছে, হাঁটু গেড়ে বসে তার মধ্যে হাত ঢুকিয়ে খুঁজতে খুঁজতে বার করে ফেলল একটা বাক্স – ছয় ইঞ্চি চৌকোনা – দড়ি আর মোড়ক সমেত
“মনে হচ্ছে এর মধ্যে করেই জিনিসটা এসেছে,” বাক্সটা দেখতে দেখতে বলল সে। “এমনভাবে প্যাক করা ছিল, যাতে ভেতরের জিনিসটা একটুও না নড়ে। কী বুঝলে, পার্কার?”
“বুঝলাম মানে... নমুনাগুলো তো এভাবেই পাঠানো হয়, নাকি?”
“বটেই তো,” সে মোড়কটার দিকে তাকাল। “ফিরতি ঠিকানা লেখা আছে ‘ফাউলার, ২৯ ব্রুক স্ট্রিট।’ যদিও এটা পোস্ট করা হয়েছে ওয়াপিং থেকে। মনে হচ্ছে পারসানো এটা খেয়াল করেননি। খুঁটিনাটি কয়েকটা ব্যাপার বোঝানো হয়েছে। যেমন খোঁজ নিলে বেরোবে যে ফাউলার নি:সন্দেহে এ ধরণের কীটপতঙ্গের একজন জোগানদার, তবে খুব সম্ভবত ও এ জিনিস পাঠায়নি।”
তখনই ঘরে ঢুকলেন মিসেস হোয়াইট হাঁপাতে হাঁপাতে, তাঁর পেছন পেছন সেই স্থানীয় ডাক্তার; নি:সন্দেহে মহিলা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে ফোন করার পর তাঁকে ডাকতে গেছিলেন এবং তারও পেছনে আসতে দেখা গেল কঠোর মুখের ইনস্পেক্টর ওয়াল্টার টেলরকে, বছর তিরিশেক বয়স, যে কিনা এর মধ্যেই একাধিকবার দক্ষতার সঙ্গে অপরাধের কিনারা করেছে।
ঘরে ঢুকেই ইনস্পেক্টর টেলর ঘরের দখল নিল, আমরা ফিরলাম আমাদের ৭বি, প্র্যাড স্ট্রিটের বাসায়। ফেরার সময় ইনস্পেক্টরের অনুমতি নিয়ে পোনস অতি সাবধানে সঙ্গে করে নিয়ে এল সেই পার্সেলটা, যার মধ্যে রয়েছে সেই সাংঘাতিক পোকাটা, যেটা পারসানোকে উন্মাদ করে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছে।
বাসায় ফিরে সেই দেশলাই বাক্সের মধ্যে থাকা পোকাটাকে পোনস আবার খুব ভাল করে দেখল তার ডেস্কে আলোর তলায় রেখে। সত্যিই, দেখার মতো জিনিসই বটে! শুঁয়োপোকার মতোই এর গায়ে রোঁয়া আছে বটে, কিন্তু আবার শিংও আছে, পিউপা পর্যায়ে যেরকম থাকে, আর শিং একটা নয়, চারটে – একজোড়া বেরিয়েছে মাথার পেছন দিক থেকে, আরেক জোড়া এর মুখোমুখি, তবে সেটা আবার বেরিয়েছে পোকাটার পেছন দিক থেকে। মাথায় রোঁয়া নেই, সেখানে আছে একটা লম্বা একটা চোষক, সেখান থেকে আবার বেরিয়ে এসেছে একটা সরু আর দড়ির মতো চেহারার জিভ। দেখে যা মনে হচ্ছিল, এর পা-ও আছে চারটে লাইনে, দুটো করে লাইনেই পা চলে গেছে লম্বালম্বিভাবে, কেন্নোদের যেরকম থাকে। একজোড়া অ্যান্টেনা বেরিয়েছে মাথার পেছন থেকে, চলে গেছে একেবারে প্রায় শিং পর্যন্ত, লেজটা মোটা আর ভোঁতা। লম্বায় ইঞ্চিচারেক তো হবেই, ব্যাস প্রায় দুই ইঞ্চি।
“এরকম আগে দেখেছো কোথাও?” চকচকে চোখে তাকিয়ে ফুর্তির গলায় বলল পোনস।
“উঁহু! আর দেখবোই বা কী করে, যেখানে বিজ্ঞানই এর খবর রাখে না?”
“আঃ, পার্কার, অন্য কারোর কথাকেই অভ্রান্ত বলে ধরে নিয়ো না। এমন কোনও জিনিস নেই... যেমন এই পোকা... বিজ্ঞান যার খবর রাখে না। যে কোনও ধরণের পোকাই কোনও বিজ্ঞানী আবিষ্কার করলে শ্রেনিবিভাগ করা যায়, এমনকি যদি তক্ষুনি সেটাকে বোঝা না-ও যায়।”
“বেশ তো, কর তাহলে,” আমি বলে উঠলাম, “ওটা তো আমাদের সামনেই আছে।”
“ব্যাপারটা এভাবে ভাবা যাক, যদি কোনও পোকার খোঁজ বিজ্ঞান না পায়, তাহলে সেই পোকাটা নেই।”
“আমার বলা সামান্য একটা কথার জন্য আমাকে এভাবে খোঁচানোটা কি ঠিক হচ্ছে, পোনস?” আমি একটু কঠোর হয়েই বললাম।
“অপরাধ স্বীকার করে নিচ্ছি,” বলল পোনস, “কিন্তু বিশ্বাস কর, এই ব্যাপারটায় আমি কিন্তু সত্যিই তোমাকে টিটকিরি দিচ্ছি না। এই পোকাটার সম্পর্কে বিজ্ঞান কিছু জানে না মানে সত্যিই এরকম কোনও পোকা নেই।”
“কী বলছ? ওটা তো তোমার সামনেই রয়েছে।”
“বন্ধু হে, আবার বলছি, ভাল করে দেখ। আমি আমার বক্তব্য পেশ করছি – পোকার যে মাথাটা দেখছ, সেটা একটা স্ফিংস মথ-এর মাথা, সাধারণত যাকে হক মথ বা হামিং-বার্ড মথ বলে... খুব সম্ভবত সাধারণ স্ট্রাইপড স্ফিংস, বৈজ্ঞানিক নাম ডেইলেফিলা লিনেয়াটা। কেন্নোর মতো যে পাগুলো দেখছ, ওগুলো কেন্নোরই পা, এ ধরণের কেন্নো উত্তর আমেরিকায় পাওয়া যায়, এগুলোকে বলে স্কুটিগেরা ফোরসেপস। অ্যান্টেনাগুলো সম্ভবত দু’জায়গা থেকে এসেছে, রোঁয়াওয়ালা জোড়া এসেছে অ্যাকটিয়াস লুনা বা সাধারণ লুনা মথ থেকে, সরু সবুজ জোড়াটা এসেছে টেরোফাইলা ক্যামেলিফোলিয়া থেকে, এই ধরণের বিরাট ফড়িং আমেরিকায় দেখা যায়। গায়ের রোঁয়াগুলোও ওরকমভাবেই লাগানো হয়েছে আর শিং... বুঝলে পার্কার, সত্যিকারের শিল্পকর্ম যদি বলতে হয় তো এই শিংজোড়াই। সত্যিই, এটা একটা মনে রাখার মতো পোকা বটে! আচ্ছা, তুমি পারসানোর আঙুলের ক্ষতটা কতটা খুঁটিয়ে পরীক্ষা করেছ?”
“যতটা ভালভাবে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করা যায়,” আমি একটু সাবধান হয়েই বললাম কথাটা।
“কিসের থেকে ক্ষতটা হয়েছে বলে তোমার মনে হয়?”
“খুব গভীরভাবে কেটে গেছে, মনে হচ্ছে যে ওঁর আঙুলে কাঁটা বা পেরেক ফুটেছে। যদিও ক্ষতটা পরিস্কার।”
“তাহলে কি তুমি এটা বলতে চাইছ যে পারসানোর মৃত্যুর কারণ বিষাক্ত কোনও সাপের কামড়?”
“দেখ পোনস, আমার কল্পনাশক্তি অত উর্বর নয় যে আমি...” আমি বলতে গেলাম, কিন্তু পোনস আমায় থামিয়ে দিল।
“খেয়াল কর,” বলল পোনস।
সে একটা সন্না দিয়ে আইডামেনো পারসানোর সেই পোকাটা ধরার সঙ্গে সঙ্গেই সেই চারটে শিং থেকে বেরিয়ে এল চারটে বিষদাঁত, যার দুটোর মধ্যে খানিকটা পাতলা হলুদ রঙের জলীয় বস্তু এখনও চকচক করছে।
“একমাত্র এরই একটা চিহ্ন পাওয়া গেছে,” শুকনো গলায় বলল পোনস, “এটাই যথেষ্ট।” তারপর আমার দিকে তাকাল চোখ পিটপিট করতে করতে, বলল, “সাপের বিষে যে পারসানোর মৃত্যু হতে পারে, এটা বোধহয় তুমি ভাবতেও পারনি, তাই না?”
আমি একেবারে কিংকর্তব্যবিমুঢ় হয়ে গেছিলাম, কয়েক মুহূর্ত কোনও কথাই বলতে পারিনি। তারপর কোনও ক্রমে বললাম, “এ তো আমার স্বপ্নেরও অগোচর ছিল।”
“কিন্তু তুমিই তো অন্যান্য সব সম্ভাবনাগুলোকে বাতিল করে দিয়েছিলে বন্ধু,” বলল পোনস, “কাজেই আমার কাছে আর কোনও সম্ভাবনা ছিল না বললেই চলে।”
“কিন্তু তাহলে কুকুরটা?” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
“কুকুরটা? মানে!” পোনস সত্যিই অবাক হল।
“যদি আমার ভুল না হয়, তাহলে মিসেস হোয়াইট বলেছিলেন পারসানো একটা কুকুরের কথা বলেছিলেন, মনে পড়ে? কুকুরের কামড় থেকেও তো ওরকম হতে পারে!”
“ভুল রাস্তায় যাচ্ছ, পার্কার,” পোনসের গলায় এত ধৈর্য, যেটা আমি বহু চেষ্টা করেও আয়ত্তে আনতে পারিনি। “এখানে ওই ধরণের কোনও কুকুরের গল্প নেই। ওটা মিসেস হোয়াইটের কথার কথা।”
“তাহলে তুমি বলছ মিসেস হোয়াইট তাঁর মনিবের মৃত্যুকালীন কথাটা বুঝতে পারেননি?”
“একদমই না। বরং আমি বলব তিনি কথাটা একদম ঠিকঠাক শুনেছিলেন।”
“ও, আচ্ছা! পারসানো কুকুরের কথা বললেন, কিন্তু কোনও কুকুর ছিল না,” আমি তেতো গলায় বললাম, যেটা পোনসের নজর এড়ালো না।
“আরে আরে পার্কার, রাগ করছ কেন?” হেসে ফেলল পোনস, “তুমি যেমন আমার মতো ডিটেকটিভ নও, আমিও কিন্তু তোমার মতো ডাক্তার নই। এসো, দেখা যাক, কত কায়দা করে জিনিসটা বানানো হয়েছে।”
বলতে বলতেই পোনস খুব সাবধানে জিনিসটার রোঁয়া আর অন্যান্য জিনিসগুলো ছাড়িয়ে নিল। সে কাজ করছিল এমনভাবে, যাতে কোনও ক্রমেই স্প্রিং-এ আবার চাপ না লাগে। শেষ পর্যন্ত সে সেখান থেকে বার করে আনল অতি চমৎকার এবং জটিল একটা যন্ত্র, যেটা থেকে বেরিয়ে আসে দাঁতগুলো এবং বিষ ঢেলে দেয়। বিষটা ছোট্ট একটা রবারের থলিতে রয়েছে, যেটা টিউবের মাধ্যমে দাঁতের গোড়ায় চলে আসে।
“বিষদাঁতগুলো খুব ছোট ছোট না?”
“যদ্দুর মনে হচ্ছে, এগুলো কোরাল বা হার্লেকুইন সাপের দাঁত – মাইক্রুরাস ফালভিয়াস, দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণে আর মিসিসিপি ভ্যালিতে পাওয়া যায়। এর বিষ নিউরোটক্সিক – স্নায়ুতে গিয়ে মেশে; মনে হচ্ছে এই বিষই ব্যবহার করা হয়েছে, তবে খাঁটি বিষটা নয়; অন্য কোনও অ্যালক্যালয়েড বিষও এর সঙ্গে মেশানো হয়েছে, যাতে পারসানোর নিশ্চিত মৃত্যু হয় এবং কোনও ওষুধেই কাজ না হয়। এই সাপটা হল প্রোটেরোগ্লিফস শ্রেনির – এদের সঙ্গে কেউটে আর মাম্বার খুব মিল আছে। অতএব, এই ‘পোকা’-টা এমনভাবে তৈরি করা হয়েছে, যাতে একে ছুঁলেই এর বিষদাঁতগুলো বেরিয়ে আসে। সেই জন্যই ওটাকে এমনভাবে প্যাক করা হয়েছিল, যাতে নাড়াচাড়া হলেও বিষটা না বেরোয়।” পোনস তাকাল আমার দিকে। “আমি কি তোমাকে সন্তুষ্ট করতে পারলাম, পার্কার?”
“কিন্তু এ যে খুব বেশি তত্ত্বকথা হয়ে যাচ্ছে!”
“তাই যদি বল, তাহলে আমরা ধরে নিচ্ছি এটা অসম্ভব, ঠিক যেমন এই পোকাটা অসম্ভব। ঠিক আছে?”
“বেশ, তাই হোক।”
“দারুণ! আমরা তাহলে এগোচ্ছি!”
“কিন্তু এই পদ্ধতিটাই তো গোলমেলে! এতে কি নিশ্চয়তা ছিলই যে খুন করা যাবে?”
“ছিল তো না-ই। এবং এই পদ্ধতি যদি ফেল করত, আমি নিশ্চিত, যে এর মূলে, সে আবার চেষ্টা করত। ব্যাপার হল, ও পারসানোকে টার্গেট করেছিল। যেভাবেই হোক, ও খুন করতই। সফলও হয়েছে। যদি এর আগেও ও এরকম চেষ্টা করে থাকে, সে সম্বন্ধে আমরা কিছু জানি না। যদি পারসানোকে লক্ষ্য কর, দেখবে তার মধ্যে একটু গোপনীয়তার ছাপ আছে, কিন্তু সে আগেই বুঝতে পেরেছিল এরকম একটা আক্রমণ হতে পারে। সেই সাবধানবাণী সে আগেই পেয়েছিল।”
“পোস্টকার্ডটা?”
পোনস ঘাড় নাড়ল। “এবারে এসো পোস্টকার্ডের লেখা আর প্যাকেটের মোড়কের লেখাটা মিলিয়ে দেখা যাক।”
এক ঝলক দেখেই বোঝা গেল দুটো হাতের লেখা সম্পূর্ণ আলাদা। পোনস এতে হতাশ হল কিনা বুঝলাম না, তবে দেখলাম ওর চোখদুটো উৎসাহে নাচছে, ঠোঁটেও একটা চাপা হাসির রেখা।
“আমরা আপাতত এটাকে ইনস্পেক্টর টেলরের দেখার জন্য রেখে দিই। আর এর মধ্যে – নটা বাজেনি এখনও – আমি একটা কাজ সেরে আসি। যদি টেলর এর মধ্যে চলে আসে, ওকে বসতে বলবে।”
যাওয়ার সময় এমন একটা হাসি দিয়ে গেল পোনস, যে দেখে গা জ্বলে গেল আমার।
রাত প্রায় বারোটা বাজিয়ে বাসায় ফিরল আমার বন্ধু। ৭বি-র বাসার জানলায় তখন কুয়াশা জাঁকিয়ে বসেছে, বাইরের পরিচিত শব্দগুলোও – কয়েকটা রাস্তা আগে ঘড়ির ঘন্টা বাজার শব্দ, গাড়ির যাতায়াত, ক্বচিৎ হ্যানসমের ঘোড়ার ক্ষুরের শব্দ – সবই মিলিয়ে যাচ্ছিল ধীরে ধীরে।
ইনস্পেক্টর টেলর ঘন্টাখানেক ধরে বসে আছে। আমি এর মধ্যে তাকে ওই মারাত্মক পোকারূপী অস্ত্রটা দেখিয়েছি, যেটা আইডোমেনো পারসানোর খুনি বানিয়েছে, এবং পোস্টকার্ডটাও দেখিয়েছি, যেটা খুব খুঁটিয়ে দেখেও সে স্বীকার করেছে কিছুই ধরতে পারেনি... আমার মতোই। কিন্তু যেহেতু পোনসের ওপরে তার অগাধ আস্থা, তাই এত দেরি হলেও সে কোনও মন্তব্যই করছিল না।
পোনস যেন আমাদের চমকে দেওয়ার জন্যই একেবারে নি:শব্দে ঘরে ঢুকল।
“এই যে, টেলর, বেশিক্ষণ বসোনি তো?”
“মাত্র এক ঘন্টা,” বলল ইনস্পেক্টর।
“আরে ছি ছি! কিছু মনে কোরো না! ভাবলাম, যখন আইডোমেনো পারসানোর খুনিকে ধরেই ফেলেছি, তখন তাকে তোমার হাতে তুলে দেওয়াই ভাল।”
ঠাট্টা করছেন নাকি, মিঃ পোনস?”
“বরং উল্টোটা। ওয়াপিং-এর ‘সেলার’স রেস্ট’-এ তাকে পেয়ে যাবে। খাটো চেহারা, গায়ের রঙ ময়লা, ইতালিয়ান বা স্প্যানিশ রক্ত আছে গায়ে। মাথার চুল কালো আর কোঁকড়া, কপালের দুপাশে সাদা রঙ ধরেছে। কপালে একটা বিচ্ছিরি ক্ষতচিহ্ন আছে আর ডান চোখটা একটু ছোট। লোকটার নাম অ্যাঞ্জেলো পেরো। খুনের উদ্দেশ্য প্রতিহিংসা। বহু বছর আগে আমেরিকায় পারসানোর সঙ্গে ওর ঝামেলা হয়েছিল। সময় নষ্ট না করে ওকে এক্ষুনি গিয়ে ধরো, একবার যদি ও শোনে পারসানো খতম হয়েছে, তাহলে সেই মুহূর্তেই ও লন্ডন ছেড়ে পালাবে। কাল চলে এসো, সব কিছু জানিয়ে দেব।”
ইনস্পেক্টর টেলর বিদায় নিল বিড়বিড় করে “ধন্যবাদ, ধন্যবাদ।” করতে করতে। পোনস কিছু বললে তারপর তার আর কিছু বলার থাকে না।
“এ যে অবিশ্বাস্য, পোনস! তোমার পক্ষেও!” আমি বলে উঠলাম, তখনও টেলরের পায়ের শব্দ পাওয়া যাচ্ছে সিঁড়ি দিয়ে নেমে যাওয়ার।
“তুমি অনেক বাড়িয়ে বলছ, পার্কার,” বলল পোনস, “ব্যাপারটার মধ্যে জটিল কিছু নেই, বিশ্বাস কর।”
“কিন্তু আমি তো মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারলাম না। তুমি এই লোকটা... পারসানোর সম্পর্কে কিচ্ছুই জানতে না। তুমি এমনকি কোনও তদন্ত পর্যন্ত করলে না...”
“উঁহু, উঁহু, বরং আমি তাঁর সম্পর্কে অনেক কিছুই জানতাম,” বাধা দিয়ে বলল পোনস। “তিনি আমেরিকা ছেড়ে চলে আসা একজন স্বাধীনচেতা মানুষ। কীটতত্ত্ববিদ। একা থাকতেন। টেলিফোন ছিল না। কারোর সঙ্গে মেশামেশির ধার ধারতেন না। গোপনীয়তা বজায় রাখতেন। এসবের মানে কী? তিনি কি কাউকে ভয় পাচ্ছিলেন? যদি পেয়ে থাকেন, তাহলে নি:সন্দেহে সেই লোক আমেরিকার বাসিন্দা।”
“কিন্তু তিনি কী ধরণের ভয় পাচ্ছিলেন যে একটা কার্ড দেখেই তাঁর প্রায় হয়ে এসেছিল?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
পোনস কার্ডটা ছুঁড়ে দিল আমার দিকে। “এ কার্ডটা তোমায় বিশেষ কিছু না বললেও পারসানোর কাছে অবশ্যই এর বিশেষ কোনও মানে ছিল।”
“ঠিকানাটা ধরার কোনও মানেই হয় না। তাহলে নিশ্চয়ই ছবিটা!”
“সাবাস, সাবাস,” বলে উঠল পোনস হাত কচলাতে কচলাতে। “অনেক উন্নতি হয়েছে দেখছি! চালিয়ে যাও!”
“বেশ, তাহলে বলি,” আমি ওর উৎসাহে দেওয়াতে উৎসাহ পেয়ে গেলাম। “ছবিতে দেখাচ্ছে একটা মোটা লোক জোর ছুটছে, পেছন পেছন তাড়া করে আসছে একটা ছোট্ট কুকুর, যার শেকলটা ছেঁড়া।”
“বাহবা, পার্কার!”
আমি পোনসের দিকে তাকালাম অবাক হয়ে। “কিন্তু এর অন্য মানেটা কী?”
“এমনিতে দেখতে গেলে মানে কিছু নেই। এ ধরণের সাধারণ চিঠিতে যা লেখা থাকে তাই। কিন্তু অন্য মানেটা দাঁড়ায়ঃ “তোমার ছুটি খতম। কুকুর ছেড়ে দিয়েছি।” একটা গোবদা লোককে কুকুর তাড়া করেছে। আর পারসানো স্থুলকায়।”
“সে তো বটেই।”
“বেশ। তাহলে দেখ, পোস্টকার্ডটা হচ্ছে ‘কুকুর’-এর ব্যাপারে প্রথম ঘটনা। দ্বিতীয় ব্যাপার হল, তুমি খানিকক্ষণ আগে যেটা মনে করিয়ে দিয়েছ, মিসেস হোয়াইট বলেছিলেন তাঁর মনিব মারা যাওয়ার আগে বেশ কয়েকবার ‘ওই কুকুরটা, ওই কুকুরটা’ বলেছিলেন, তার পরই তাঁর কথা বন্ধ হয়ে যায়। আর সবশেষে বলি, দেশলাই বাক্সের ঢাকনায় লেখা ছিল, ‘ছোট্ট কুকুর বড় বেড়ালকে ধরেছে’। এবার বল, কোন জায়গায় অসুবিধে হল?”
“কী বলব ভেবে পাচ্ছি না। আমার এখনও কানে বাজছে তুমি জোর গলায় বলছ এখানে কোনও কুকুর নেই,” আমি ঠান্ডা গলায় বললাম।
“আমার বিশ্বাস, আমি বলেছিলাম “এখানে ওই ধরণের কুকুরের কোনও গল্প নেই”। তুমি বলছ আসল কুকুরের কথা – কার্নিভোরা, ক্যানিস গ্রুপ। এখানে ওরকম কোনও কুকুরের ব্যাপার নেই।”
“হেঁয়ালি করছ নাকি?”
“তোমার হেঁয়ালি মনে হচ্ছে? তাহলে তোমাকে এটা বোধহয় সাহায্য করতে পারে।”
পোনস তার পকেট থেকে মাস দেড়েকের পুরোন “দি শিকাগো ট্রিবিউন”-এর তিনটে কাটিং বার করে তার থেকে একটা বেছে আমার হাতে দিল।
এটা একটা ছোট্ট প্রবন্ধ-খবর। আমি মন দিয়ে পড়লাম সেটা।
“শিকাগো, ২৯ জুনঃ যে সব বন্দিরা লিভেনওয়ার্থ দুর্গ থেকে শর্তাধীন মুক্তি পেয়েছে, তাদের মধ্যে চারজন শিকাগোর। তাদের নাম – মাও সুই-চ্যাং, অ্যাঞ্জেলো পেরো, রবার্ট সাল্লিকার এবং ফ্রাঞ্জ উইটকেনস্টাইন। এই চারজনকে ১৯১৪ সালে মাদক পাচার এবং বিক্রির জন্য ধরা হয়। এরা এগারো বছর ধরে জেল খাটছিল। যার সাক্ষ্যপ্রমাণের পরিপ্রেক্ষিতে এদের সাজা হয়েছে, সে এই দলেরই পঞ্চম সদস্য – নাম ‘বিগ ইড’ পারসানো। এই কারণে এর সাজা মকুব করে দেওয়া হয়েছিল। বিচারের পরই ‘বিগ ইড’ চোখের আড়ালে চলে যায়। এই চারজন প্রাক্তন অপরাধী শিকাগো ফেরার কথা ভাবছে।”
লেখার সঙ্গে দু’জনের ছবিও ছাপা হয়েছে, তার মধ্যে একজন হল পেরো। পোনস নির্ঘাত ওয়াপিং-এর হোটেল আর সরাইখানাগুলোয় ঘুরে ঘুরে পেরোর ছবি দেখিয়েছে, শেষ অবধি তাকে পেয়েছে “সেলার’স রেস্ট”-এ।
“বিগ ইড’-ই তাহলে আমাদের মক্কেল মিসেস হোয়াইটের মনিব?” পেপার কাটিং-টা ফিরিয়ে দিয়ে আমি জিজ্ঞেস করলাম পোনসকে।
“ঠিক।”
“কিন্তু পেরোই যে খুনি, সেটা তুমি বুঝলে কী করে?”
“বন্ধু হে, সেটা আন্দাজ করা কি খুব কঠিন ছিল?”
আমি মাথা নাড়লাম। “আমি হলে তো চিনাম্যানকে ধরতাম। ও ধরণের পোকা প্রাচ্যদেশীয় ধারণারই ফসল।”
“দারুণ বলেছ। এরকম হতেই পারে - প্ল্যানটা সবার, তবে পোকাটা বানিয়েছে ওই চিনাম্যান। কিন্তু খুনি হল পেরো। তোমার হিউম্যানিটিজ নিয়ে পড়াশোনায় একটু ঘাটতি ছিল বলে মনে হচ্ছে যেন।”
“এ খবরটা কাগজে বেরোনোর দুদিন পরে পোস্টকার্ডটা ছাড়া হয় – ডাকের ছাপ তাই বলছে – এবং সেটা পারসানো কোনও এক বন্ধুর তরফে ঘোষণা করে যে ‘ছোট্ট কুকুর ছাড়া পেয়েছে’। এই ‘ছোট্ট কুকুর’ নি:সন্দেহে পারসানোর সমস্ত খবরাখবরই রেখেছিল, জানত কিভাবে তাকে পাওয়া যাবে, এমনকি পারসানো যদি – তার লন্ডনে বসবাসের খবর আমেরিকায় কতটা পৌঁছেছে – তা উপলব্ধি না-ও করে থাকে, তাহলেও। পারসানো কার্ডের মানেটা সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পেরেছিল।”
“পেরো যদি পারসানোকে যে সে নিজেই খুন করবে, তা না জানাতে চাইত, তাহলে আমার পক্ষে এটা ধরা আরও মুশকিল হয়ে যেত। ‘ছোট্ট কুকুর বড় বেড়ালকে ধরেছে’। পেরো ছোটখাটো মানুষ। পারসানো বড়সড় চেহারার। স্প্যানিশ ভাষায় পেরো মানে কুকুর। এটা আর নিশ্চয়ই বলতে হবে না যে স্প্যানিশে পারসানো মানে পার্সিয়ান। আর পার্সিয়ান মানে একটা বিশেষ প্রজাতির বেড়াল।”
“একটা চমৎকার ছোট্ট ধাঁধা, বুঝলে পার্কার, যদিও সমাধানটা কিন্তু সোজাই।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন