অমিত দেবনাথ
বেকার স্ট্রিট, ১ জানুয়ারি। ওয়াটসনের সাহায্য ছাড়াই কিছু ঘটনা লিখে রাখব বলে ডায়রি লেখা শুরু করলাম। ওয়াটসন মাঝে মাঝেই ভুলে যায় যে অনেক অসফল ঘটনাও সফল ঘটনার চেয়ে বেশি কৌতুহলজনক, আমার মতো পেশাদারদের ক্ষেত্রে। ও অনেক সময়ই বড় যান্ত্রিক হয়ে যায়।
৬ জানুয়ারি। ওয়াটসন হাওয়া বদল করতে কয়েকদিনের জন্য ব্রাইটন গেছে। আজ সকালে এমন একটা ছোট্ট ঘটনা ঘটেছে, যেটা উল্লেখ করার মতো। মানুষ কত সময় আজেবাজে তথ্য বাদ না দিতে পেরে সত্যানুসন্ধান করতে গিয়ে হোঁচট খায়, এটা তার একটা চমৎকার উদাহরণ (সৌভাগ্যের কথা, ওয়াটসনের ক্ষেত্রে এটা হয় না)। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড থেকে লেসট্রেড খবর পাঠাল যে লেডি ডরোথি স্মিথের বিয়ের পাওয়া উপহার থেকে হিরে আর চুনিখচিত আংটিটা উধাও। ঘটনাটা এরকম: বৃহস্পতিবার বিকেলে লেডি ডরোথির বেডরুম থেকে কিছু গয়নাগাটি নিচের ড্রয়িং রুমে নিয়ে আসা হয় বন্ধুবান্ধবদের দেখানোর জন্য। এই আংটিটাও তার মধ্যে ছিল। দেখানো হয়ে গেলে সেগুলো আবার ওপরে নিয়ে গিয়ে সিন্দুকে ভরে দেওয়া হয়। পরদিন সকালে দেখা যায় আংটিটা নেই। লেসট্রেড সেখানে গিয়ে অনুসন্ধান চালানোর পর এই সিদ্ধান্তে আসে যে আংটিটা চুরি যায়নি, সেটা এই ড্রয়িং রুমেই কোথাও পড়ে গেছে, নয়তো অন্য কোনও বাক্সে আছে। কিন্তু ড্রয়িংরুম বা অন্য বাক্সপ্যাঁটরা খুঁজেও কোথাও কিছুই পাওয়া যায়নি। আমি তার সঙ্গে ইটন স্কোয়ারে লেডি ডরোথির মা লেডি মিডলসেক্সের বাড়িতে যাই। সেখানে যখন আমরা ড্রয়িং রুমে খোঁজাখুঁজি চালাচ্ছি, হঠাৎ লেসট্রেড একটা চিৎকার করে লাফিয়ে ওঠে এবং আরামকেদারার লাইনিং-এ আটকে থাকা আংটিটা বার করে আনে। আমি তখন তাকে বললাম সে আনন্দ করছে বটে, কিন্তু ব্যাপারটা এত সোজা নয়। একঝলক দেখেই আমি বুঝেছিলাম, শুধু যে এর পাথরগুলোই ঝুটো, তাই নয়, এটা বানানোও হয়েছে খুব তাড়াহুড়ো করে। আর কে এটা বানিয়েছে, সেটা বোঝাও খুবই সোজা। লেসট্রেড বা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের যে কোনও ছাত্রই একঝলক দেখে বলে দেবে যে আসল আংটিটা যার তৈরি, এটাও তারই তৈরি। আমি জেনে নিলাম মহিলার স্বামীর দেওয়া উপহার কোত্থেকে এসেছে, তারপর সোজা চলে গেলাম সেই জহুরির কাছে, যে এটা বানিয়েছে। যা ভেবেছিলাম, দেখলাম ব্যাপারটা সেরকমই। সপ্তাহখানেক আগে এক তরুণীর জন্য সে আসল পাথরের গুঁড়ো দিয়ে একটা ঝুটো আংটি বানিয়ে দিয়েছে বটে। মহিলা তার নাম বলেনি, তবে পয়সাকড়ি মিটিয়ে দিয়েছে। আমি বুঝে গেলাম লেডি ডরোথি আসল আংটিটা হারিয়েছে – যেটা তার কাকার দেওয়া উপহার, কিন্তু ভয়ে বলতে পারেনি, তার বদলে একটা নকল আংটি বানিয়ে ব্যাপারটা সামলানোর চেষ্টা করছে। আমি সেই বাড়িতে গিয়ে দেখলাম লেসট্রেড, সেই বৃহস্পতিবার কী কী গয়নাগাটি দেখানো হয়েছিল, সেগুলো আরেকবার দেখার তোড়জোড় করছে। আমি লেডি ডরোথিকে ডেকে পাঠাতে, মহিলা তক্ষুনি চলে এসে বলল,“গতকাল মিঃ লেসট্রেড আংটিটা খুঁজে পেয়েছেন।”
“জানি,” আমি বললাম,” কিন্তু কোন আংটি?”
আমি পরিস্কার দেখলাম ওর চোখের পাতা কেঁপে উঠল। বলল “আংটি তো একটাই ছিল।”
আমি তাকে বললাম যে আসল ব্যাপারটা আমি জানতে পেরেছি।
“অসম্ভব,” বলল মেয়েটা,“ওটা অন্য কোনও মহিলার আংটি, মিঃ হোমস। আপনি নিজেই পরখ করে দেখুন না।” বলেই সে যে আংটিটা আমাকে দিল, দেখলাম সেটা আসল আংটি। তার মানে এর মধ্যে সে আসলটা খুঁজে পেয়েছে।
কিন্তু আমার অসহ্য লাগল,যখন মহিলা সেটা লেসট্রেডকে দিয়ে বলল,“মিঃ লেসট্রেড, এটাই আপনার কালকের পাওয়া আংটিটা না?”
লেসট্রেড সেটা ভাল করে দেখে বলল,“কোনও সন্দেহই নেই।”
“এটা কি আপনার নকল বলে মনে হচ্ছে?”
“নকল? পাগল নাকি? এটাই আসল,” বলল লেসট্রেড, তারপর আমার দিকে তাকিয়ে বলল,“হোমস,সমস্ত তথ্য তো তাই বলছে। আমরা,স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের লোকেরা সঠিক তথ্যের ভিত্তিতেই চলি, বুঝলেন।” আমি আর কথা বাড়ালাম না, বরং চলে আসার সময় লেডি ডরোথিকে আসল আংটিটা ফিরে পাওয়ার জন্য অভিনন্দন জানালাম। যদিও আমি জানি আমিই ঠিক, তবুও ওই মাথামোটা লেসট্রেডটা যে বিনা কারণে আমার ওপর চাল খাটাল, তাতে খুবই বিরক্ত লাগল।
১০ জানুয়ারি। সকালে আমি আর ওয়াটসন ব্রেকফাস্ট করছি, একটা লোক এসে হাজির। লোকটা নিজের নাম বলল না, উলটে আমাকেই জিজ্ঞেস করে বসল সে কে, আমি সেটা বলতে পারব কিনা। বললাম, “যা দেখছি, আপনি বিয়ে করেননি, এখন আসছেন সাসেক্স থেকে, ফরাসি সেনাবাহিনীতে ছিলেন, পত্রপত্রিকায় সমালোচনা লেখেন,মধ্যযুগের যুদ্ধ সম্পর্কে বিশেষ আগ্রহী,বিভিন্ন জায়গায় বক্তৃতা দেন,ধর্মে রোমান ক্যাথলিক,একবার জাপান গেছিলেন। এ ছাড়া আপনার সম্পর্কে আর কিছু বলতে পারছি না।”
লোকটা বলল সে বিয়ে করেনি বটে, তবে ম্যানচেস্টারে থাকে, কখনোই সাসেক্সে থাকেনি,কোনও দিন জাপান যায়নি, জীবনে কোনও পত্রিকায় এক লাইনও লেখেনি, ইংরেজ টেরিটোরিয়াল ফোরস ছাড়া অন্য কোনও আর্মিতেই ছিল না, রোমান ক্যাথলিক নয়, বরং সে একজন ফ্রিম্যাসন, আর পেশায় একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়র। আমার সন্দেহ হল লোকটা মিথ্যে বলছে। আমি বললাম তাহলে তার বুটজুতোয় কেন হরশাম অঞ্চলের ধুলো লেগে রয়েছে; কেন তার বুটজোড়ায় ফ্রেঞ্চ আর্মির ছাপ রয়েছে, ইলাস্টিক মোজা সমেত, যেটা সম্ভবত ভালমি থেকে কেনা; কেন তার পকেট থেকে সাউথওয়াটার-এর রিটার্ন টিকিট উঁকি মারছে; কেন তার ঘড়ির চেনে সেন্ট অ্যান্থনি-র মেডেল ঝোলানো; কেন সে কাপোরাল সিগারেট খায়; কেন তার বুক পকেটে এইলো-র যুদ্ধের ওপর লেখা প্রবন্ধের প্রুফ রয়েছে, ট্যাবলেট-এর কপি সমেত; কেন তার হাতে ঝোলানো রয়েছে একটা পার্সেল, যেটা খুবই বিচ্ছিরি আর অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় রয়েছে (এটা আর তার জামাকাপড়ের নোংরা অবস্থা দেখেই বোঝা যায় সে বিয়ে করেনি) আর যেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে তার মধ্যে ফোটোগ্রাফিক ম্যাজিক লন্ঠন-এর স্লাইড রয়েছে, আর কেনই বা তার বাঁ হাতের কবজিতে একটা জাপানি মাছের উল্কি আঁকা।
“তার জন্যই তো আমি আপনার পরামর্শ নিতে এসেছি,” লোকটা বলল। “গতকাল রাত্তিরে আমি ছিলাম উইন্ডসর হোটেলে। আজ সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি আমার জামাকাপড়গুলো সেখানে কিছুই নেই, তার বদলে সম্পূর্ণ অন্য কাপড়চোপড় রয়েছে। আমি ওয়েটারকে ডেকে জিজ্ঞেস করলাম এ সবের মানে কী, কিন্তু সে বা হোটেলের অন্যান্য চাকরবাকররা খুব ভাল করে খোঁজাখুঁজি করেও এর কারণ বলতে পারল না। আর হোটেলের অন্যান্য বাসিন্দারাও কেউ তাদের জামাকাপড় নিয়ে কোনও অভিযোগ জানায়নি। দুই ভদ্রলোক আজ সকাল ৭.৩০ নাগাদ হোটেল ছেড়ে চলে গেছে, একজন আর আসবে না, আরেকজনের ফেরার সম্ভাবনা আছে। আমার নিজের জামাকাপড়গুলো খুব দামি কিছু ছিল না, আর এই জামাকাপড় আর বুটজোড়ার সঙ্গে সেগুলোর খুব মিল আছে। আমার কোটের পকেটেও অনেক কাগজপত্র ছিল। আর এই উল্কিটা বলছেন? এটা একটা টার্কিশ বাথে গেছিলাম, সেখানকার এক শ্যাম্পুওয়ালা এটা করে দিয়েছে। ও এটা নৌবাহিনিতে থাকার সময় শিখেছিল।”
এই কেসটায় আগ্রহী হওয়ার মতো কিছুই নেই। আমি শুধু লোকটাকে বললাম হোটেলে ফিরে গিয়ে জামাকাপড়ের আসল মালিকের জন্য অপেক্ষা করতে। যে লোকটা সকাল ৭.৩০-এ বেরিয়েছে, সে-ই নিশ্চিত আসল মালিক।
সামান্য একটা ভুল ছাড়া এটাও আমার নিখুঁত পর্যবেক্ষণের একটা উদাহরণ। আমি যা যা বলেছিলাম, সবকটাই জামাকাপড়ের আসল মালিকের সঙ্গে মিলে যায়।
ওয়াটসনটা এমন, ও ফট করে আমাকে জিজ্ঞেস করে বসল, লোকটা যে নিজের জামাকাপড় পরেনি, এটা আমি কেন দেখিনি।
বোকার মতো কথা। জামাকাপড়গুলো ওর গায়ে এমন ফিট করে গেছিল যে আমি কী করে বুঝবো ওগুলো ওর নিজের নয়?
১২ জানুয়ারি – আজ পুডিং-এর মধ্যে একটা বড় সাইজের পদ্মরাগমণি পেলাম। বেশ রহস্যজনক ব্যাপার বলেই মনে হল। কিন্তু আমি ওয়াটসনকে এ ব্যাপারে কিছু বলার আগেই ও দেখলাম বেশ উত্তেজিত... মিসেস টার্নার ঘরে ঢুকে ওটা দেখেই বললেন যে তার বজ্জাত ভাইপোটা... যার নাম বিল... ক্রিসমাস ট্রি-র থেকে একটা লাল পাথর খুলে পুডিং-এর মধ্যে ফেলে দিয়েছিল। আমি অবশ্য আতস কাচ দিয়ে পাথরটা পরীক্ষা করে দেখিনি।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন