অমিত দেবনাথ
বহু বছরের মধ্যে-বস্তুতপক্ষে রাজনীতিতে আসার পর থেকেই শার্লক হোমসের সঙ্গে আমার কোনও যোগাযোগ ছিল না, কাজেই যখন ওর কাছ থেকে ছোট্ট একটা চিরকুট পেলাম ডাউনিং স্ট্রিটে ওর নতুন বাসায় যাওয়ার জন্য, তখন যে যারপরনাই আনন্দ পেয়েছিলাম, বলাই বাহুল্য।
“এস ওয়াটসন,শুভ দিন,” বলল হোমস। “সদ্য বিক্ষোভ সেরে এলে,তাই না? জাপানি দূতাবাসে তো?”
“হোমস!” আমি বিস্ময়ে চেঁচিয়ে উঠলাম।
“আরে,এ’তো সোজা ব্যাপার, ওয়াটসন। তোমার বাঁদিকের বুটজুতোয় যে কাদা লেগে রয়েছে, আমি ঠিক সেইরকম কাদাই গতকাল জাপানি রাষ্ট্রদূতের মোজায় দেখেছি। আর তোমার পকেট থেকে উঁকি মারছে গতকালের “ডেইলি টেলিগ্রাফ,” যাতে তিন কলম জুড়ে লেখাঃ “ক্যান্টনের ওপর আবার বিমান থেকে বোমাবর্ষণ, বহু হতাহত।” তুমি নিশ্চয়ই মিছিল করে গিয়ে গলা ফুলিয়ে শ্লোগান দিয়েছ, “জাপানি খুনেরা চিন থেকে দূর হঠো!” তাই না, ওয়াটসন?”
“ঠিক।”
“তোমার শ্লোগান তোলা সার্থক হোক! আমাদের বিনয়ী ব্রিটিশরা তাহলে একটু বেশি তাড়াতাড়িই মাথা গরম করে ফেলছে।”
“কিন্তু মাথা ঠান্ডা রাখা কি সম্ভব? যেখানে... এই তো, তুমি নিজেই পড়ে দেখ না। ক্যান্টনের সমস্ত বাড়িঘর গুঁড়িয়ে গেছে। তিন হাজার মৃত। তুনশান স্কুল মুছে গেছে। জাপানি বিমানহানার হাত থেকে বাচ্চারাও রেহাই পায়নি।”
“তোমাকে কে বলল ওগুলো জাপানি প্লেন?”
“হোমস!”
“যে কোনও অপরাধ ঘটলে প্রথমেই তার পেছনের কারণগুলো দেখতে হয়। চটজলদি সিদ্ধান্ত কক্ষনো নিতে নেই। ব্রিটিশ স্বার্থে হাত পড়লে আমরা প্রতিবাদ করতে পারি। নানকিং-এ আমাদের দূতাবাসের ছাদে বোমা পড়েছে, সেটা একটা ব্যাপার। যদি আমাদের দূতাবাসের এক বর্গগজেরও ক্ষতি হয়, সে ক্ষতি তোমার তুনশান স্কুলের চেয়েও অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ওই স্কুল কিন্তু অক্সফোর্ডের
মতো নয়, এটা মনে রাখা দরকার, ওয়াটসন।”
হোমসের চোখে একটা অদ্ভুত ঘোর লক্ষ করলাম।
“অক্সফোর্ডকে নিয়েই ভাবা যাক। ধর, কোনও অজানা দেশের বিমান অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটির ওপর বোমা ফেলল। তখন কী করব? তখন আমরা অনুসন্ধান চালাব। বোমার টুকরোগুলো পরীক্ষা করতে হবে... বিস্ফোরকের রাসায়নিক বিশ্লেষণ দরকার, এবং অবশ্যই পায়ের ছাপ...।”
“বিমান কখনও পায়ের ছাপ ফেলে না, হোমস,” কথাটা বলতে পেরে একটা অদ্ভুত আনন্দ হল।
“ওই হল আর কী। পাইলট কি আর চুরুট খেয়ে ছাই ফেলবে না, নাকি তার শেষাংশটা ছুঁড়ে ফেলবে না? ...দেখ তো ওয়াটসন, দরজায় কে যেন টোকা মারছে।”
আমি দরজা খুলতেই ঘরে ঢুকল লেসট্রেড। তার উসকোখুসকো চেহারা দেখেই মনে হল হোমসের সহকর্মী হিসেবে সে এখনও এই নতুন দুনিয়ায় ততটা পোক্ত হয়ে উঠতে পারেনি।
“এই যে লেসট্রেড,” হেসে বলল হোমস, “বিদেশ রাজনীতিতে তুমি যখন থেকে ঢুকেছ, তখন থেকেই তুমি কোনও ভাল খবর আনতে পারোনি। যাই হোক, এখনকার সমাচার কী?”
“মিঃ হোমস,” উষ্মার সুরে বলল লেসট্রেড, “আমি কিন্তু আপনার নির্দেশ মাফিকই কাজ করছি। নতুন কোনও খবর নেই। আর খুঁটিনাটি বলতে, প্যারিসের ওপর রহস্যময় বোমাবর্ষণ, আর জেনারেল মিলারের অন্তর্ধান...।”
“ও কিছু না,” হাই তুলে বলল হোমস, “ও নিয়ে আমরা মাথা ঘামাবো না। তারপর বল।”
“স্প্যানিশ বিদ্রোহীরা যে সব বন্দর দখল করে রেখেছে, সেখানে পাঠানোর জন্য পাঁচ ডিভিশন ইতালিয়ান সেনা তৈরি।”
“স্পেনের ব্যাপার আমাদের দেখার দরকার নেই। তারপর বল।”
“মিঃ হোমস, সেপ্টেম্বরের এক থেকে পঁচিশ তারিখ পর্যন্ত আরও ছ’খানা ব্রিটিশ জাহাজ জলদস্যুদের হাতে আক্রান্ত হয়েছে। নিওন সম্মেলনে চুক্তি সাক্ষরের দিনেই স্টেনমোর-কে গোলা মেরে ডুবিয়ে দেওয়া হয়েছে।”
“এটা কি অফিসিয়াল, লেসট্রেড?”
“বলতে বাধ্য হচ্ছি, মিঃ হোমস, হ্যাঁ।”
“ঠিক আছে, আমি এ ব্যাপারে নোট দেব’খন।”
“হোমস,” আমি বললাম, “এই ইতালিয়ান বোম্বেটেগুলোকে থামানোর কী ব্যবস্থা তুমি নেবে?”
“ইতালিয়ান? ইতালিয়ান আবার কোত্থেকে এল!” হোমস অবাক হল।
“আমাদের সমস্ত প্রচেষ্টা সত্ত্বেও আমরা ওই বোম্বেটে সাবমেরিনগুলো কোন দেশের, জানতে পারিনি। লেসট্রেড, বলে যাও।”
“সাংহাই-তে এক জাপানি বিমান হানায় “অ্যাস্টর” নামে আমাদের একটা হোটেল ধ্বংস হয়ে গেছে।”
“আরে, সে তো দারুণ হোটেল!” বলে উঠল হোমস, “আমার খুব ভাল মনে আছে। আর কী, লেসট্রেড?”
“জার্ডিনের মদ কারখানাও ধ্বংস হয়ে গেছে।”
“ক্ষয়ক্ষতি কী হল?”
“প্রায় এক মিলিয়ন পাউন্ড। মিঃ হোমস, মনে রাখবেন, এ সবই গত দু’দিনে হয়েছে।”
হোমস ভুরু কোঁচকালো।
“আর একটু দেখা দরকার, লেসট্রেড। জাপানি রাষ্ট্রদূতকে বিরক্ত করাটা ঠিক হবে না। আর কিছু আছে?”
“দুর্ভাগ্যের ব্যাপার, আরও আছে। জাপানিরা সমানে ব্রিটিশ জাহাজ ধরছে। আপনার হয়তো মনে আছে, মিঃ হোমস, সেপ্টেম্বরের সাত তারিখে ওরা তাইশিং নামের ব্রিটিশ স্টিমার আটকেছে। সেপ্টেম্বরের আট তারিখে আটকেছে ফুশিয়ানকে। নয় তারিখে, একটা জাপানি ডেস্ট্রয়ার তুনহাং আর তিনয়াত – যেগুলো ক্যান্টন যাচ্ছিল, সেগুলোকে আটকে তল্লাশি চালিয়েছে। আর এখন ওদের সাহস এত বেড়েছে যে, মিঃ হোমস, ওরা আমাদের সেন্ট মোনাপস যুদ্ধ জাহাজে তল্লাশি চালিয়েছে।”
“ও কিছু না, লেসট্রেড। মিঃ কাওয়াগোয়ে জানিয়েছেন যে ব্রিটেন আর জাপান... এই দুই দেশের মধ্যে বন্ধুত্ব আর বোঝাপড়া আরও গভীর করার জন্যই এসব করা হয়েছে।”
আমি আর ধৈর্য রাখতে পারলাম না।
“হোমস!” আমি চিৎকার করে উঠলাম, “তুমি এটা বলতে পারো না। চিনে যা হয়েছে, তার চেয়েও বেশি মানসম্মান আমাদের ডুবেছে সাংহাই-এর যুদ্ধে। তুমি নিজে পড়ে দেখ,” বলে আমি “ডেইলি টেলিগ্রাফ”-টা ওর দিকে ছুঁড়ে মারলাম। “সাংহাই-এর এই অতি সমৃদ্ধ জেলা... যেখানে অজস্র ব্রিটিশ সংস্থা রয়েছে, সেগুলো সব রসাতলে গেছে। আমাদের মানসম্মানের সঙ্গে ধ্বংস হয়েছে লক্ষ লক্ষ পাউন্ড। জাপানি যুদ্ধবিমান থেকে একেবারে খোলাখুলি আমাদের কলকারখানা, আমাদের হোটেল, আমাদের জাহাজের ওপর বোমা ফেলা হচ্ছে, মেশিনগান থেকে আমাদের রাষ্ট্রদূতদের দিকে গুলি ছোঁড়া হচ্ছে...।”
পাক্কা রাজনীতিকের মতোই হোমসের মুখে কোনও আবেগ দেখা গেল না।
“হিউজেসেনের ফোল্ডারটা দাও তো, লেসট্রেড।”
ফোল্ডারটা হাতে নিয়ে কয়েকটা পাতা ওলটাতেই তার মুখে হাসি দেখা গেল।
“বেচারা হিউজেসেনের জন্য দুঃখ হয়, কিন্তু এর জন্য ও নিজেই দায়ী। এসবের জন্য জাপানকে এখন বিরক্ত করার কোনও দরকারই নেই। তাহলে ওয়াটসন, দেখতেই পাচ্ছ, সবকিছুই একেবারে ঠিকঠাক চলছে। আমরা দাবী জানিয়েছি, যাতে ওরা এরকম কাজ আর কখনই না করে। ওরা তো বলেছে ব্যাপারটা দেখবে। আর কী চাই?”
“জাপান যা উত্তর দিয়েছে, তাতে মিঃ হোমস সন্তুষ্ট,” বলল লেসট্রেড।
আমি হাত ওলটালাম হতাশায়।
“তোমার গদি রাখতে গিয়ে যদি তুমি চোরদের সমর্থন কর, তাহলে আমার আর কিছু বলার নেই। সবই বুঝলাম, হোমস। তুমি কি সত্যিই মনে কর আগ্রাসীদের ছাড় দিলে তারা আগ্রাসন ছেড়ে দেবে?”
“যা শুনেছ, সেগুলোই বললে, ওয়াটসন,” বলল হোমস। “আমি এ ধরণের কথা জেনেভা-তে আগেই শুনেছি। কোদালকে কোদাল বলে ডাকার ভারি বদ অভ্যাস আছে এই রাশিয়ানদের। আমাদের পার্লামেন্টে যে ধরণের চমৎকার তর্কবিতর্ক হয়, সে সবের অভিজ্ঞতা তো ওদের নেই।”
হোমসের চোখ বুজে এল ক্লান্তিতে।
“শ্ শ্ শ্,” ফিসফিস করে বলল লেসট্রেড, “মিঃ হোমস শান্তির জন্য চিন্তা করতে করতে বড়ই ক্লান্ত হয়ে পড়েছেন। ওঁর এখন বিশ্রাম দরকার। চলুন ডাক্তার, যাওয়া যাক।”
আমরা পা টিপে টিপে ঘর থেকে বেরিয়ে এলাম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন