ভূতের পাল্লায় শার্লগ

অমিত দেবনাথ

শার্লগ কোম্বস বসেছিলেন তাঁর স্টাডিরুমে, গভীর চিন্তায় মগ্ন হয়ে। পরনে জেগার ড্রেসিং-গাউন। তিনি বুঝতে পারছিলেন, তাঁর বয়স বাড়ছে। বয়সটা কম থাকলে কিছুতেই রেসের মাঠের ওই জোচ্চোরটা তাঁকে ভুজুং ভাজুং দিয়ে আধ-ক্রাউনের বদলে একখানা মানিব্যাগ গছিয়ে দিতে পারতো না, যার মধ্যে তিনখানা আধ-ক্রাউন থাকবে বলে তিনি ভেবে বসেছিলেন। একেবারে মূর্খের মত কাজ। “কিন্তু ফেরার সময় ট্রেনে তিন তাস খেলার সময় যে আমি এক টেনার হারলাম, সে নেহাতই আমার কপাল খারাপ। আমি ভাবতাম আমি ভাল খেলি। সেদিন আর নেই।”

“যাই হোক,” নিজের মনেই ভাবছিলেন তিনি, “ডাঃ পটসন যখন আবার আসবেন... অবশ্য কবে আসবেন জানি না, বহুদিন দেখাসাক্ষাৎ নেই... তখন তাঁকে কিছু চমকপ্রদ ঘটনা শোনানো যাবে। ওপারের জগত সম্পর্কে আমি কিছু জ্ঞান লাভ করেছি।”

প্রবীণ ডিটেকটিভ মানুষটি হাত বাড়িয়ে এখন তুলে নিয়েছেন “দি স্টিক্স” নামের জার্নালখানা, যে জার্নাল “স্পিরিট” (কড়া নয়, মাঝারি)-দের জন্যই উৎসর্গীকৃত। হঠাৎই তাঁর চোখ আটকে গেল এক জায়গায়। সেখানে লেখা আছেঃ

“প্রেতাত্মার সঙ্গে সাক্ষাৎ করুন! দারুণ সুযোগ! বিশ্বসেরা মিডিয়াম প্রফেসার ট্রিক্সটার তিনটের সময় প্রেতচক্রের আসর বসাবেন। আলাপ করবেন নাকি জুলিয়াস সিজারের সঙ্গে? চলে আসুন। প্রবেশমূল্য- এক শিলিং।”

ঘন্টাদুয়েক বাদে তাঁকে দেখা গেল একটা সিক্স-হর্স পাওয়ারের মোটরে চড়ে (জেনারেল অমনিবাস কোম্পানি) ব্লুমসবেরির দিকে যেতে, যেখানকার একটা ফ্ল্যাটেই বসবে সেই প্রেতচক্রের আসর।

ফ্ল্যাটটা বোধহয় খুব তাড়াহুড়ো করে যোগাড় করা হয়েছিল। কোনও আসবাবপত্রের বালাই নেই, তার উপর আবার নোংরা। দোতলায় একটা বড়ো ঘরে বসবে আসরটা, যে ঘরটা অন্ধকার ঘুটঘুটে, জানলায় পরদা ঝোলানো আর কতগুলো প্যাকিং বাক্স আর তক্তা পেতে বসার ব্যবস্থা করা।

তাগড়াই চেহারার যে লোকটা শার্লগ কোম্বসকে ভেতরে নিয়ে গেল, তাকে দেখেই যে কোনও ডিটেকটিভের উৎসাহ কমে যেতে বাধ্য। ভেতরে ঢুকে কোম্বস দেখলেন ঘর বোঝাই লোকজন, তার মধ্যে বেশ কিছু বিখ্যাত ব্যক্তিও আছেন। আছেন দু’জন মহিলা ঔপন্যাসিক, লেবার পার্টির একজন সাংসদ, রয়েছেন জীববিজ্ঞানের বিখ্যাত অধ্যাপক ফোলজাম্ব, এফ আর এস, যিনি সেই বিখ্যাত ধাঁধার সমাধান করেছেন এই বলে যে হাঁসের দিকে তাকিয়ে প্যাকপ্যাক করা অসম্ভব।

যিনি মিডিয়াম, তিনি খাঁটি মার্কিন উচ্চারণে প্রেতচক্রের ব্যাপারটা সংক্ষেপে বুঝিয়ে দিলেন, তারপর গিয়ে বসলেন ঘরের মাঝখানে রাখা একমাত্র চেয়ারটায়, আর তাঁর সেই তাগড়াই চেহারার হোঁৎকা সহকারী একটা মোটা দড়ি দিয়ে সেই চেয়ারটার সঙ্গে তাঁকে আচ্ছা করে বাঁধল।

তারপর ঘরের সব লোককে বলা হল আসনে বসে পাশের লোকের হাতে হাত ছোঁয়াতে। বসতে গিয়ে শার্লগ কোম্বস আর একটু হলেই প্যাকিং বাক্সের উঠে থাকা একটা পেরেকের ওপর বসে পড়ছিলেন। যাই হোক, সবাই ঠিকমতো বসার পর ঘরের আলো নিভিয়ে দিল সেই লোকটা।

কয়েক মুহূর্তের জন্য ঘরে নেমে এল সম্পূর্ণ নিস্তব্ধতা। তারপর কোথাও একটা ব্যাঞ্জো বেজে উঠল। এটা সম্ভবত কোন সংকেতই হবে, কারণ তারপর ঘরে বাজতে শুরু করল বাজনা... আধ্যাত্মিক ধরণের... এসব আসরে যেরকম হয়। তারপর সেই বাজনার সুর ক্রমাগত পাল্টে যেতে লাগল, যেন জগাখিচুড়ি কোনও সংগীতের আসর বসেছে। বারদুয়েক শার্লগের টাক মাথাতেও কে যেন খঞ্জনি ঠুকে দিয়ে গেল। তারপর হঠাৎই থেমে গেল সব বাজনা, যেরকম আচমকা শুরু হয়েছিল। সবাই সচকিত হয়ে দেখল সামনে একটা আবছা চকচকে মূর্তি দাঁড়িয়ে আছে।

“কে আপনি?” একটা স্বর শোনা গেল।

“আমি জুলিয়াস সিজার,” বলল সেই ছায়ামূর্তি, তারপর খানিকটা অবান্তরভাবেই বলে উঠল, “জিনিসপত্র সরিয়ে নাও।”

এই অতি বিখ্যাত রোমান সম্রাটের প্রেতাত্মা বোধহয় কথা বলতে খুব ভালোবাসে। পরবর্তী দশ মিনিট ধরে সে তার ১০৬৬ সালে ইংল্যান্ড আগমন এবং ডিউক অব মার্লবরোর অধীনে বানকবার্ন-এর যুদ্ধে ব্রিটিশের হারের কথা সবিস্তারে বর্ণনা করল। তারপর আবছা হতে শুরু করল তার ছায়া, কমতে শুরু করল তার অনুপ্রভা, তারপর মিলিয়ে গেল।

“সবাই যার যার জায়গায় বসে থাকুন,” শোনা গেল সেই হোঁৎকা লোকটার গলা, “এরপর আরও আশ্চর্য জিনিস আসবে।”

আবার বেজে উঠল ব্যাঞ্জো, আর দরজার সামনে থেকে বেশ কয়েকটা জোরাল আওয়াজ শোনা গেল। তারপর আবার ঘরে নেমে এল নিস্তব্ধতা। পরবর্তী পাক্কা পনেরো মিনিট ধরে ঘরে চুপচাপ বসে রইল সবাই, কিন্তু কিছুই হল না।

“বাবারে, আমার তো ভয় লাগছ,” এক মহিলা ঔপন্যাসিকের গলা শোনা গেল।

“আর কিছু না থাকলে ওরা আলো জ্বালিয়ে দিচ্ছে না কেন?” বলে উঠলেন প্রফেসার ফোলজাম্ব।

লেবার পার্টির সাংসদই এর পরের কাজটা করলেন। পাশের লোকের হাত ছাড়িয়ে উঠে গিয়ে লাইটের সুইচগুলো জ্বালিয়ে দিতেই আলোয় ভরে উঠল সারা ঘর।

ঘরের মাঝখানে রাখা সেই চেয়ারটা আছে, দড়িটা আলগোছে রাখা আছে তার ওপর, কিন্তু মিডিয়াম আর তার সহকারীর কোন চিহ্ন নেই।

“তাজ্জব ব্যাপার!” বলে উঠলেন শার্লগ।

কেমন কেমন লাগছিল তাঁর গোটা ব্যাপারটা। একটা সিগারেট খাওয়া দরকার। তিনি পকেটে হাত ঢোকালেন সোনার সিগারেট-কেসটা বার করার জন্য... যেটা সবসময় তাঁর সঙ্গে থাকে। কিন্তু খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, তাঁর পকেটে কিছু নেই। কিছুই নেই। হতভম্ব হয়ে তিনি বাকি সবার দিকে তাকালেন, দেখলেন সবার মুখ একই রকম হতভম্ব।

“এর মানে কী?” তাঁর গলা অসহায়।

ঘরের মধ্যে একমাত্র প্রফেসার ফোলজাম্বই উত্তর দেওয়ার মত অবস্থায় এসেছেন। তাঁর গলা এখন খুব গম্ভীর। “এর মানে হল, ওই চিটিংবাজেরা আমাদের সবার পকেট মেরে পালিয়েছে।”

“কি সর্বনাশ!” বলে উঠলেন শার্লগ, “ভাগ্যিস ডাঃ পটসন এখানে নেই, না হলে কেলেংকারির আর শেষ থাকত না!”

সকল অধ্যায়
১.
হারানো হিরের রহস্য
২.
কথোপকথন
৩.
পরিত্রাতা ওইলক
৪.
মোনালিসা রহস্য
৫.
শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্য
৬.
হোমসের ডায়রির কিছুটা
৭.
কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য
৮.
হাস্কারভিল গহ্বরের দুরন্ত কাহিনি
৯.
ভূতের পাল্লায় শার্লগ
১০.
দুর্ধর্ষ গোয়েন্দার দুর্ধর্ষ কীর্তি
১১.
সিলিং-এ পায়ের ছাপ
১২.
জোর বরাত, শিয়ার্লাক
১৩.
শেষ ছড়ের টান
১৪.
শার্লক হোমসের সঙ্গে এক রাত্রি
১৫.
আদম কোথায়? ইভ কোথায়?
১৬.
দি সাউথ সি স্যুপ কোম্পানি
১৭.
ডাউনিং স্ট্রিটে শার্লক হোমস
১৮.
মিঃ হেনেসির অন্তর্ধান রহস্য
১৯.
ইনস্পেকটর লেসট্রেডের গল্প
২০.
সোলার পোনস ও আশ্চর্য পোকা
২১.
শার্লক হোমসের সঙ্গে কী সত্যিই এরকুল পোয়ারোর দেখা হয়েছিল?
২২.
সুমাত্রার দানব ইঁদুর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%