অমিত দেবনাথ
নকল গোঁফ সামলে একটা হাই তুললেন তরুণ উচ্চাকাঙ্ক্ষী অনুসন্ধানী হার্লক শোমস, একটা গ্লাসে সোডা ঢেলে কোকেন মিশিয়ে নিলেন তার সঙ্গে, পান করার জন্য। তারপর আঙুল দিয়ে হালকা করে টোকা দিলেন তাঁর বার্মিজ ওয়াকা-ওয়ারাতে। এই জিনিসটি তিনি সংগ্রহ করেছেন একটা ফরাসি ইন্দো-চিন মন্দির থেকে। এই বিশেষ ধরণের টোকা মারার অর্থ তিনি তাঁর মাথামোটা সহকারী সটওয়ানকে ডাকছেন। হামাগুড়ি দিয়ে ঘরে ঢুকল সটওয়ান, সারা মুখে একটা হাঁদাটে ভাব।
“১৯২৭ সালের ১ মার্চের ‘জু-জু জার্নাল’-টা পড়ছিলে, তাই না সটওয়ান? বিরক্ত করলাম বোধহয়? দুঃখিত।”
হার্লকের আশ্চর্য দূরদৃষ্টি দেখে শ্রদ্ধায় অবনত হল সটওয়ান।
“কী করে বুঝলে, অ্যাঁ?”
হাসলেন শোমস। “তোমার নাকে সামান্য প্লাস্টার-অব-প্যারিস লেগে আছে। এ বাড়িতে কোথায় টাটকা প্লাস্টার-অব-প্যারিস আছে জানো? আছে পাশের ঘরে। আজ সকালেই জুলিয়াস সিজারের মূর্তির নাকটা আমি সারিয়েছি। অতএব তোমার নাকটা নিশ্চয়ই মূর্তির নাকে ঘষেছে। তোমার সঙ্গে, সটওয়ান, আমি প্রায়ই শরীর মন সব দিক দিয়েই বাঁদরের মিল পাই। কাজেই মনে হল তুমি নিশ্চয়ই এই রকম নাকে নাক ঘষেছ কোনও ছবি দেখে। এরকম ছবি তাহলে তুমি দেখেছ। এ বাড়িতে এরকম ছবি আছে... যেখানে লোকে নাকে নাক ঘষছে... যে বইতে, সেটা হল জো-জো জার্নাল, সেটা ১ মার্চ, ১৯২৭-এর। কয়েক বছর আগে দেখেছিলাম ছবিটা।”
সটওয়ান ধাতস্থ হয়ে উঠতে না উঠতেই শোমস বলে ফেললেন তাকে ডাকার কারণটা।
“সটওয়ান, সাউথ সি স্যুপ কোম্পানিতে আমি যে অ্যাপ্লিকেশনটা করেছিলাম ওদের গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান হিসেবে যোগদান করার জন্য, সেটার উত্তর ওরা দিয়েছে কি? ওদের কাজ হল ঝিনুকের স্যুপে ঝিনুক আছে কিনা, সেটা দেখা। উত্তর দেয়নি? কী আশ্চর্য!”
বলেই হার্লক হাঁচলেন সশব্দে।
“ফোন এসেছে!”
শোমসের ফোনের বৈশিষ্ট হল, যখনই কোনও ফোন আসে, এতে কোনও রিং হয় না, তার বদলে ওখান থেকে একটা গ্যাস বেরোয়। এই গ্যাস নাকে গেলে হাঁচি হবেই। এতে শোমস কোনও অবাঞ্ছিত আওয়াজ ছাড়াই বুঝতে পারেন ফোন এসেছে।
রিসিভার তুললেন শোমস এবং গলা শোনামাত্র বুঝে গেলেন ও প্রান্তের লোকটির বয়স তেষট্টি, বাদামি স্যুট পরেছে, তার সঙ্গে অন্যান্য কাপড় চোপড়ও পরেছে এবং আঠেরোবার বিয়ে করেছে।
ওপাশ থেকে উত্তেজিত গলা শোনা গেল, “মিঃ শোমস? আপনি এক্ষুনি সাউথ সি স্যুপ কোম্পানিতে চলে আসুন। মিঃ অক্স-টেইলবি খুন হয়েছেন!”
নির্বিকারভাবে ভুরু থেকে কাল্পনিক ধুলো ঝেড়ে শোমস দ্রুত পোশাক বদলে নিলেন। এখন তাঁকে এক জন সুদর্শন, চিন্তাশীল তরুণের বদলে একজন চমৎকার-দেখতে, চিন্তা নিমগ্ন যুবকের মতো লাগছে। তারপর লাফ দিয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগলেন। একেক বারে আটটা করে সিঁড়ি ভাঙছেন তিনি। সেই অবস্থাতেই তিনি বেঁধে ফেললেন জুতোর ফিতে, ধরিয়ে নিলেন আফিম-পাইপ।
তারপর একটা ঘোড়ার গাড়িকে থামতে বলে চড়ে বসলেন তাঁর বাইসাইকেলে, চালাতে লাগলেন সেটা সোজা সাউথ সি স্যুপ কোম্পানির অফিসের দিকে, পেছন পেছন দৌড়তে লাগল সটওয়ান।
ঝড়ের গতিতে সেখানে পৌঁছে ঝড়ের গতিতে ঘরে ঢুকলেন তিনি, ঝড়ের গতিতে কোটের বোতাম খুলতে খুলতে।
ঘরের মেঝেতে পড়ে আছে কোম্পানির বার্লি বিভাগের কিংকর্তব্যবিমুঢ় কমিশনার অসওয়াল্ড অক্স-টেইলবির লাশ, বুকে বুলেটের ছ্যাঁদা। লাশ দেখার সঙ্গে সঙ্গেই হার্লক শোমসের অভিজ্ঞ চোখে ধরা পড়ে গেছে যে এ দেহ থেকে প্রাণ পাখি অনেক আগেই ফুড়ুৎ হয়েছে।
শোমস পাক্কা এক সেকেন্ড ধরে গভীর ভাবে চিন্তা করলেন। তারপর বললেন, “সটওয়ান, রেয়ারিং-রিলে – আমার খাস চুনোপুঁটি – ওকে গিয়ে বল জামাইকা জো-কে ডাকতে।”
পরের পনেরো মিনিট পঁয়তাল্লিশ সেকেন্ড ধরে খুন হওয়া মানুষটির সহকর্মীরা সেই ঘরে জড়ো হয়ে সসম্ভ্রমে, সশ্রদ্ধায় লক্ষ্য করতে লাগল হার্লক শোমসের চিন্তামগ্ন ললাট। তারপর ঘরে ঢুকল সটওয়ান, তার পেছনে আরেকটা কে যেন রয়েছে।
নির্বিকার ভাবে নেকলেস থেকে কাল্পনিক ধুলো ঝেড়ে বললেন শোমস, “ভদ্রমহোদয়গণ, অনুমতি দেন তো আপনাদের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিই, ইনি হলেন মিস জোসেফাইন বার্টলে, সাধারণত জামাইকা জো নামেই পরিচিত।”
ইনি একজন মহিলা!
“মিস বার্টলে,” বললেন শোমস, “আজ অবধি কেউ আপনাকে সুন্দরী বলেছে?”
মহিলার মুখে লালচে ছাপ পড়ল। “হ্যাঁ স্যার, মানে – আমার প্রেমিক তো আমাকে মাঝ মাঝে সুন্দরী বলেই থাকে।”
বিজয়োল্লাসে চেঁচিয়ে উঠে আমাদের নায়ক খামচে ধরলেন মহিলার হাত। “কোথায় থাকে সে?” বললেন তিনি। গলা তো নয়, যেন বজ্র নির্ঘোষ।
মহিলা তাঁকে রাস্তা আর বাড়ির নম্বর দিতেই তিনি চড়ে বসলেন সাইকেলে, উন্মত্তের মতো চালাতে লাগলেন সেদিকে। নির্দিষ্ট জায়গায় পৌঁছে দৌড়ে গেলেন দরজার দিকে, ধাক্কা দিতে লাগলেন ভয়ংকর ভাবে এবং দরজা খুলে ভেতর থেকে এক জন বেরিয়ে আসা মাত্র তার হাতে চমৎকার ভাবে পরিয়ে দিলেন হাতকড়া।
লোকটা কিছু বলার আগেই শোমস তাঁর আসুরিক শক্তি প্রয়োগ করে তাকে ঝুলিয়ে দিলেন সাইকেলের হ্যান্ডেলের সঙ্গে, তারপর পেডাল চালিয়ে ফিরে এলেন অফিসে।
“এই হল আপনাদের লোক!” বললেন তিনি নির্বিকারভাবে, মোকাসিন জুতো থেকে ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে। তিনি যে বার অ্যান্টার্কটিকায় গেছিলেন এক বিশেষ প্রজাতির গুবরে পোকা শিকারে, এ জুতো তখনকার।
সবাই চেঁচিয়ে উঠল, “কে?”
“আশা করি আপনারা আমাকে বোঝানোর সময় দেবেন,” বললেন গোয়েন্দা, পকেট থেকে ব্যাকরণ বই বার করতে করতে। লিথুয়ানিয়ার ভাষার ওপর এখন পড়াশোনা করছেন তিনি, আর তিনি ফালতু সময় নষ্ট করেন না।
সম্মতি জানালো সবাই।
অভিধানের পাশটা দেখিয়ে শুরু করলেন শোমস। “ঘরে ঢুকেই প্রথম যেটা আমার নজর কাড়ে, তা হল, মৃতদেহে একটা গুলির দাগ। তাতেই আমার মনে পড়ে গেল সেই বিখ্যাত উগা-উলা কেসটার কথা, যেটার কথা আপনাদের সবার নিশ্চয়ই মনে আছে। সেই কেসটাতেও মৃতদেহের গায়ে একটা বুলেটের দাগ ছিল। দুটো ঘটনাই হুবহু এক, আর এটাই আমার আশ্চর্য লাগল, যা আমি আপনাদের আগেই বলেছি। তখনই আমি বুঝতে পারলাম দুটো খুনই করেছে একই লোক। এই উগা-উলা রহস্যের সমাধানও আমিই করেছিলাম, যদিও খুনিকে পুলিশের হাতে তুলে দিতে ভুলে গেছিলাম। খুনি ছিল ব্ল্যাক ব্লিয়ারস্টোন।
“আমার চুনোপুঁটি রেয়ারিং-রিলে মাসখানেক আগেই আমাকে জানিয়েছিল যে ব্ল্যাক ব্লিয়ারস্টোন হল এই জামাইকা জো মহিলার প্রণয়ী। ব্ল্যাক ব্লিয়ারস্টোনের চোখের অবস্থা খুব খারাপ। এর আগে ও উলওয়ার্থের চশমা পড়ত। ব্লিয়ারস্টোনই সেই প্রণয়ী কিনা, নিশ্চিত হওয়ার জন্য আমি জো-কে জিজ্ঞেস করি যে কেউ কোনওদিন তাকে সুন্দরী বলেছে কিনা। জো বলল যে তার প্রেমিক তাকে এটা বলেই থাকে। এখন, জো-র মতো মহিলাকে যদি কেউ... কোনও পুরুষ সুন্দরী বলে, তাহলে তার চোখ নির্ঘাত খারাপ। তাহলে জো-র প্রেমিকের চোখও খারাপ... আপনারা তার পুরু চশমা দেখেও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন। আর ব্লিয়ারস্টোনেরও চোখ খারাপ। তাহলে পুরোটাই খাপে খাপে মিলে গেল, অতএব আপনাদের সামনে যে দাঁড়িয়ে আছে, সে-ই হল ব্ল্যাক ব্লিয়ারস্টোন, জামাইকা জো-র প্রেমিক এবং অসওয়াল্ড অক্স-টেইলবির খুনি।”
তারপরেই ঘিরে থাকা দর্শকদের মাঝখান দিয়ে লম্বা লম্বা পা ফেলে আবির্ভূত হলেন পিটার পি. স্যুপ, যিনি কোম্পানির চিকেন-স্যুপ বিভাগে ঘোড়ার মাংস কাটার দেখাশোনা করেন। বললেন, “হার্লক শোমস, কোনও নির্দোষ লোককে আমি স্ক্যাফোল্ড-এ পাঠাতে দিতে পারি না। অসওয়াল্ড অক্স-টেইলবিকে আমিই খুন করেছি, কারণ ও একটা বিশ্রি মন্তব্য করেছিল যে আমি নাকি গত সপ্তাহে আমাদের চিকেন-স্যুপে বাছুরের মাংস মেশাইনি। কিন্তু সেটা যে কত বড় মিথ্যে কথা, সেটা আমার চেয়ে ভাল আর কেউ জানে না। আমি মিশিয়েছি! প্রচুর পরিমাণে মিশিয়েছি! কি, মেশাইনি, বন্ধুরা?” বলেই তিনি তাঁর সহকর্মীদের দিকে তাকালেন। যদিও তাদের দেখে মনে হল তারা আর তাঁকে মোটেই সহকর্মী বলে ভাবছে না।
“বাজে কথা! পুরো বাজে কথা! তুমি ঘোড়ার মাংস মিশিয়েছিলে!” তাদের সমস্বরে জবাব। এই বাক্য শোনার পর, শোমস নির্বিকার ভাবে তাঁর বক্সিং গ্লাভস থেকে কাল্পনিক ধুলো ঝেড়ে, যে বক্সিং গ্লাভস তিনি জোগাড় করেছিলেন হিন্দুস্তানে বক্সার বিদ্রোহের সময়, ঝাঁপিয়ে পড়লেন স্বীকারোক্তি করা খুনি পিটার পি. স্যুপের ওপর।
কিন্তু স্যুপ হুঁশিয়ার ছিলেন। বছরের পর বছর ধরে ঘোড়ার মাংস কেটে কেটে এবং তাকে সাধারণ স্প্রিং চিকেনের মতো শক্ত মাংস বানাতে বানাতে তাঁর হাত এখন গদার মতো শক্ত হয়ে উঠেছে। সেই হাতের একটি জবরদস্ত ঘুষি খেয়ে হার্লক শোমস খোলা জানলা দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়লেন বাইরের ঘাসের ওপর। লাগেনি যদিও।
নির্বিকার ভাবে তাঁর মুখ থেকে হাজার হাজার ধুলোর গুঁড়ো ঝেড়ে নিয়ে শোমস আবার ছুটে গেলেন অফিসে, গিয়ে দেখলেন ঠিক সেই মুহূর্তেই পিটার পি. স্যুপ মুখে পুরে দিচ্ছেন একটা সাদা বড়ি। শোমস চেষ্টা করলেন সেটা তাঁর মুখ থেকে নিয়ে নেওয়ার, কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই এর প্রাণঘাতী কাজ শুরু হয়ে গেল। স্যুপ পড়ে গেলেন মেঝের ওপর, আস্তে আস্তে শক্ত হয়ে যেতে শুরু করল তাঁর হাত-পা। একটা পুরোন দিনের জনপ্রিয় গানের দু কলি গেয়ে তিনি তাঁর শেষ নি:শ্বাস ত্যাগ করলেন... সে গানটা হল – “রক অব এজেস” – যা শুনলে সাধারণ ভাবে স্লট-মেশিন মিন্টের কথাই মনে পড়ে যায়।
অনুসন্ধান কার্যে এত নিপুণ দক্ষতা দেখানোর পরই শোমস সাউথ সি স্যুপ কোম্পানির গোয়েন্দা বিভাগের প্রধান নিযুক্ত হন।
কিন্তু দুঃখের বিষয়, ঝিনুকের স্যুপে কোনও ঝিনুক তিনি কখনোই খুঁজে পাননি, যদিও বহু খোল পেয়েছিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন