ইনস্পেকটর লেসট্রেডের গল্প

অমিত দেবনাথ

স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের যত প্রতিভাবান পুলিশ অফিসার আছে, তার মধ্যে আমার মতে সেরা হল চিফ ডিটেকটিভ ইনস্পেকটর লেসট্রেড। যেমন বিচক্ষণ, তেমনই সফল। তার অবসর নেওয়ার অনেক পরেও তার সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিল এবং আমি তাকে প্রায়ই সারে-র এক নার্সিং হোমে দেখতে যেতাম। জীবনের শেষ কটা বছর তার সেখানেই কেটেছিল। তাকে সামান্য খোঁচালেই সে মহা উৎসাহে বলতে শুরু করত তার কর্মজীবনের নানা রকম সাফল্যের কথা। শুধু তারই নয়, গ্রেগসনের, অ্যাথেলনি জোনসের, তরুণ স্ট্যানলি হপকিন্সের এবং আরও সব চৌকস অফিসারের... সে সময়টা, তার মতে, ইয়ার্ডের স্বর্ণযুগ।

তা সত্ত্বেও, খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার, তার মুখে শার্লক হোমসের নাম খুব কমই শোনা যেত। আমার মনে আছে, শার্লক হোমসের বহু অভিযানের সঙ্গে তার নাম জড়িয়ে ছিল। খুবই অবাক লাগত আমার এ বিষয়টা, ভাবতাম লেসট্রেড হয়ত হোমসের বিশাল নামডাকের কারণেই তার ওপর ঈর্ষান্বিত। যখনই আমি হোমসের নাম করতাম, সে নাক সিটকে একটা অবজ্ঞাসূচক মন্তব্য করেই আবার তার নিজের জগতে ফিরে যেত, ঢাকঢোল পিটিয়ে নিজের কথাই সাতকাহন করে বলত। খুব, খুব কম সময়েই সে আরেকজন (অথবা দুজন) লোকের কথা বলত। কোনও এক ডাঃ ওয়াটসনের কথা, যে নাকি সেই সব দিনগুলোতে হোমসের সঙ্গে কাজ করত, যাদের কথা শোনাবার জন্য আমি অত্যন্তই আগ্রহী ছিলাম। শুধুমাত্র একবারই সে এই দুজনকে নিয়ে একটা ঘটনা আমাকে বলেছিল।

“মিঃ শার্লক হোমস বুদ্ধিমান মানুষ, সন্দেহ নেই, কিন্তু তিনি নিজেকে যতটা চালাক মনে করেন, ততটা নন। আর ওই ওয়াটসন! আমার প্রাক্তন বস মিঃ শার্লক হোমসকে ‘অসাধারণ অপেশাদার’ বলে ডাকতেন, যদ্দুর আমার মনে পড়ছে... কিন্তু কেন ডাকতেন জানি না। উনি আদৌ অপেশাদার ছিলেন না, আর অসাধারণ বলতে, আমাদের মধ্যে এমন কয়েকজন ছিল, যারা যে কোনও দিন হোমসকে রামধোলাই দেওয়া বা বুদ্ধিতে ঘোল খাওয়ানো, সবই করতে পারত।” লেসট্রেডের মুখ থেকে এমন একটা আওয়াজ বেরোল, যাকে আত্মতৃপ্তি বলে ভুল হতেই পারে।

“কিন্তু তিনি তো তোমাকে বহুবার সাহায্য করেছেন? নিজের কিছু না থাকলে কি তা সম্ভব?”

“নিজের কিছু! ফুঃ!” অদ্ভুত মুখভঙ্গি করে বলল লেসট্রেড, “শোন, আমার একটা ঘটনা মনে পড়ছে, যেখানে আমিই হোমসকে সাহায্য করেছিলাম, আর তার সঙ্গে ওয়াটসনকেও। এমন গাড্ডায় পড়েছিল যে আমি না থাকলে... ওদের তো আমার ওপর কৃতজ্ঞ থাকা উচিত। শোনাচ্ছি ঘটনাটা।”

“যদ্দুর মনে পড়ছে, ঘটনাটা ১৮৮৯ সালের। সে সময়, পরিস্কার মনে পড়ছে যে মিঃ শার্লক হোমস বেকার দিন কাটাচ্ছিলেন, হাতে কোনও কাজ না থাকায়, আর ওয়াটসনও কোনও কেস খুঁজে পাচ্ছিলেন না যে লিখবেন (তুমি তো জান, ওই ডাক্তারবাবু যে তার বন্ধুর ঘটনাগুলো ফেনিয়ে ফেনিয়ে লিখত ঢাক পেটানোর জন্য, সে সব কায়দাবাজি আজকাল সবাই ধরে ফেলেছে)। কাজেই ‘ডার্ক ডায়মন্ড’-এর কেসটা যখন আমার হাতে এল এবং দেখলাম ডাঃ ওয়াটসনও এর সঙ্গে জড়িত, ভাবলাম এই সুযোগ, হোমসকে আর ট্যাঁ ফুঁ করতে দেওয়া হবে না। আমাকেই এ বাজি মারতে হবে। দুঃখ হয় লোকটার জন্য। কেন জানো? আসলে আমি ভাবতেই পারিনি, এত সহজে এর সমাধান করে ফেলব। যাই হোক, বেকার স্ট্রিটে চায়ের সময় গিয়ে দেখি দু’জনে মিলে খুব মৌজ করে ধুমপান করছে।

“এই যে, লেসট্রেড,” বলল হোমস তার সুপরিচিত কন্ঠস্বরে, “বরাবরই তুমি আমার কাছে শুভ সংবাদের অগ্রদূত, - তা এবার কী খবর নিয়ে এলে?”

“মনে হচ্ছে আপনাকে ডাঃ ওয়াটসন রেইনহার্ট উইমফেইমার হিরের কেসটার ব্যাপারে কিছু বলেছেন, তাই না?” আমি জিজ্ঞেস করলাম। হোমস হাসল।

“ওয়াটসনের বক্তব্যে বিশেষ কিছু হবে না। তার চেয়ে তুমি বরং কেসটা আরেকবার বল, আমি দেখি তোমাকে কোনও ভাবে সাহায্য করতে পারি কিনা।”

সেই সব দিনগুলোতে, বুঝলে, আমি যা রিপোর্ট বানাতাম, তাতে বড় একটা ভুল থাকত না। কাজেই সেটাই পড়লাম।

মিঃ রেইনহার্ট উইমফেইমার প্রাচ্য দেশে ব্যবসা করে প্রচুর টাকাপয়সা করেছিলেন। তাঁর নাম ডাক আরও ছড়িয়েছিল অন্য এক বিশেষ ব্যাপারে। যে সমস্ত লোকজন বিখ্যাত আর দামি রত্ন জমাত, তিনি ছিলেন তাদের মধ্যে সেরা। এ ব্যাপারে তাঁর সঙ্গে মাত্র আর একজনেরই তুলনা করা যেত, তিনি হলেন তাঁর ছোট ভাই, মিঃ সলোমন উইমফেইমার। এই দুই ভাইয়ের মধ্যে একটা চাপা রেষারেষি চলত, তবে শোনা যায় যে বড় ভাইয়ের সংগ্রহই নাকি বেশি ভাল। মিঃ রেইনহার্ট উইমফেইমার বিপত্নীক, বড়লোকি চালে থাকেন, বাড়ি ১২৩ গ্রেট কাম্বারল্যান্ড প্লেস-এ। বাড়িতে চাকরবাকর ছাড়া আছে তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি, যে তাঁর ব্যবসা এবং সংগ্রহ, দুই কাজেই সাহায্য করে। তাঁর সংগ্রহে যা আছে, তার মধ্যে বহু কিছুই মিউজিয়ামে দান করা হয়েছে অথবা ধার দেওয়া হয়েছে, কিন্তু কিছু কিছু আরও দামি রত্ন বাড়িতেই রাখা আছে। আর এদের মধ্যে আছে ডাংবুরা-এর বিখ্যাত ‘ডার্ক ডায়মন্ড’, যেটা বাড়ির মর্যাদাই অনেক বাড়িয়ে দিয়েছে। তিনি এই হিরেটা এতই পছন্দ করতেন যে রোজই এটা একটা ছোট্ট শ্যাময় চামড়ার ব্যাগে তাঁর গলায় ঝুলিয়ে রাখতেন। একমাত্র রাত্রেই তিনি এটা গলা থেকে খুলে বিছানার পাশের একটা টেবিলে রেখে দিতেন।

“এক মিনিট, লেসট্রেড,” হোমস আমার কথায় বাধা দিয়ে বলল, “তোমার পাশের ওই মোটা বইটা আমায় দিতে পারবে? আমার মনে হচ্ছে এখানে ওই হিরেটার সম্বন্ধে কিছু বলা আছে। - এই যে, পেয়েছি। ডাংবুরার ‘ডার্ক ডায়মন্ড’,বিশ্বের অন্যতম বিখ্যাত হিরে ... এর আকার, অদ্ভুত রঙ এবং বিস্ময়কর ইতিহাসের জন্য। কিভাবে আর কখন এটা তিব্বতের ডাংবুরায় এল, আর কী করেই বা সেখান থেকে ইউরোপে এল, কেউ জানে না, তবে তারপর থেকেই এটা বিভিন্ন লোকের সংগ্রহে ছিল। বেশিরভাগ বহুমূল্য পাথরের সঙ্গেই একটা দুর্ভাগ্যের ইতিহাস জড়িয়ে থাকে, কিন্তু এই হিরেটার খ্যাতি আছে সুখ, শান্তি আর সৌভাগ্য আনার ব্যাপারে। কিন্তু আমি তোমার ধাপে ধাপে কথা বলায় বাধা দিচ্ছি, লেসট্রেড, বলতে থাকো।”

বুধবার ভোরে হঠাৎ মিঃ রেইনহার্ট উইমফেইমার অসুস্থ হয়ে পড়েন। তাঁর ডাক্তার তখন বেড়াতে গেছিলেন এবং ডাঃ ওয়াটসন তার বদলি হিসেবে ছিলেন। নটা নাগাদ তাঁকে জরুরি হিসেবে ডেকে পাঠানো হলে তিনি সেখানে যান এবং রোগীকে দেখে বলেন যে তাঁর ব্রেন ফিভার হয়েছে... ভুল হলে বলবেন, ডাক্তার।

“না না, ঠিক বলছেন, আমি তাঁকে ওষুধপত্র দিয়ে বলেছিলাম সন্ধেবেলা আবার যাব।”

ডাঃ ওয়াটসন বিকেলে আবার গেলেন। মিঃ উইমফেইমার তখনও অচৈতন্য। তবে এই বেলায়, কিছুক্ষণের জন্য হলেও রোগীর জ্ঞান ফিরেছিল এবং তখন – কিছু মনে করবেন না ডাঃ ওয়াটসন – তিনি খুব জোরাজোরি করছিলেন যাতে ডাঃ ওয়াটসনের থেকে আরও ভাল কোনও ডাক্তারকে ডাকা হয়।

“সে তো হতেই পারে,” বলল হোমস, “তিনি হলেন কোটিপতি মানুষ, তাঁর রুচিবোধই আলাদা, আর একজন সাদামাটা চিকিৎসক, যার অভিজ্ঞতাও সীমিত, আর রোগ উপশম করার ক্ষমতা – যাকগে...।”

“হোমস, তোমার কাছ থেকে এ রকম কথা আশা করিনি,” প্রতিবাদ করে ওয়াটসন, “তুমিও কিন্তু অনেক কেসেই সাফল্য পাওনি।”

“কবে? তারিখ মনে আছে?” তিতকুটে স্বর হোমসের।

পাছে আবার দুই বন্ধু মধ্যে ঝগড়া বাধে, তাই আমি তড়িঘড়ি পড়া শুরু করলাম। রোগী ইতিমধ্যেই আবার ভুল বকা শুরু করেছে দেখে ডাঃ ওয়াটসন নার্সকে কী করতে হবে না হবে, সে ব্যাপারে নির্দেশ দিয়ে একটা কাগজে তাঁর পছন্দমত কোনও ডাক্তারের নাম লিখে ও বাড়ি থেকে বেরিয়ে পড়লেন।

“কখন, ওয়াটসন?” জিজ্ঞেস করল হোমস।

“তখন সন্ধে সাতটা বাজে,” গোমড়া মুখে বলল ওয়াটসন, “মিঃ উইমফেইমার নানা ধরণের জিনিস সংগ্রহ করতেন। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় আমি কমপক্ষে চারখানা গ্র্যান্ডফাদার ঘড়ির পাশ দিয়ে গেছি, আর সবকটাই তখন বাজছিল, কাজেই সময়টা আমার মনে আছে।”

“দারুণ, ওয়াটসন। তোমার পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা শনৈঃ শনৈঃ বাড়ছে দেখে ভাল লাগল। তারপর?”

“আজ সকাল দশটার সময় ওখান থেকে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডে খবর পাঠানো হয়। আমি গিয়ে দেখি সারা বাড়ি তোলপাড় হচ্ছে। সকালে যখন ব্রেন ফিভার বিশেষজ্ঞ স্যার ইউস্টোন প্যানক্রাস রোগী দেখতে আসেন, তখন মিঃ উইমফেইমারের খাস চাকর আবিষ্কার করে টেবিলের ওপর রাখা ‘ডার্ক ডায়মন্ড’ উধাও।”

“তুমি যখন গেছিলে, তখন ওটা ছিল, ওয়াটসন?” জিজ্ঞেস করল হোমস।

“ছিল, আমি দেখেছিলাম টেবিলের ওপর রাখা শ্যাময় চামড়ার ব্যাগের ওপর ওটা ছিল।”

তখন থেকে বিশেষজ্ঞ আসা পর্যন্ত পাঁচজন রোগীর ঘরে ঢুকেছিল – রাতের ডিউটিতে থাকা নার্স, সকালের ডিউটিতে আসা নার্স, রোগীর খাস চাকর, তাঁর প্রাইভেট সেক্রেটারি এবং তাঁর মেয়ে।

“তা তুমি কী করলে?” জিজ্ঞেস করল হোমস, “সবাইকে পরীক্ষা করেছিলে?”

“ঘরের আর সবকিছুই ঠিকঠাক ছিল, ফলে রহস্যটা ধরা গেল না। যে পাঁচজনের কথা বলা হয়েছে, তারা কেউই বাইরে যায়নি, একমাত্র মিস উইমফেইমার বেরিয়েছিলেন - হ্যানসমে চেপে অ্যালবানিতে গেছিলেন বাবার শরীর কেমন আছে, সে খবরটা কাকাকে দিতে। তিনি বেরিয়েছিলেন নটা নাগাদ, ফিরে এসেছিলেন মিনিট পঁয়তাল্লিশের মধ্যেই। আর এরা সবাই বলতে গেলে সন্দেহের উর্দ্ধে। খাস চাকর আর সেক্রেটারি এখানে কাজ করছে দশ বছরের ওপর, প্রথম নার্স রাতের ডিউটি শেষ করে রোগীর ঘর থেকে বেরোনর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ঘুমিয়ে পড়েছিল আর পরের নার্স সকালের ডিউটিতে এসে সেই যে ঘরে ঢুকেছে, আর বেরোয়নি। সারা বাড়ি তন্ন তন্ন করে খোঁজা হয়েছে, চিলেকোঠা থেকে সেলার অবধি, কোত্থাও হিরে নেই। আমাকে তখন একটু জোর দিয়েই ভাবতে হল যে বাড়িতে বাইরে থেকে চোর ঢুকেছিল, কিন্তু তাতেও নানা অসুবিধে। প্রত্যেক ঘরেই দুই জানলা, সারা বাড়িতে চোর ধরার অ্যালার্ম লাগানো; তার ওপর মিঃ উইমফেইমারের একখানা বাঘা কুকুর আছে, সাংঘাতিক প্রভুভক্ত, সারাক্ষণ মিঃ উইমফেইমারের পাশে পাশে থাকে আর রাত্তিরে শোওয়ার ঘরেই ঘুমোয়। কাজেই রাত্রে কেউ ঘরে ঢুকলে কুকুরটা ডাকবে না, এটা অবিশ্বাস্য। কিন্তু চুরিটা হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন, চোর কখন আর কিভাবে ঘরে ঢুকল, বেরোলোই বা কিভাবে? আপনি তো আমার পদ্ধতি জানেন, মিঃ হোমস, সেগুলো প্রয়োগ করে দেখুন কোনও রাস্তা বার করা যায় কিনা (আমি প্রায়শই মিঃ শার্লক হোমসকে নানা রকম পরামর্শ দিতাম এবং আমার বিশ্বাস সেগুলোতে তাঁর অশেষ উপকার হত)। আপনার কোনও পরামর্শ থাকলে তাও বলুন।”

শার্লক হোমস আমার দিকে তাকিয়ে উঁচুদরের হাসল।

“লেসট্রেড, কেসটা জলের মতো সোজা হলেও ব্যাপার বেশ ইন্টারেস্টিং। তোমাকে এ ব্যাপারে সাহায্য করতে পারলে খুশিই হব।”

“কখন আপনি হিরেটা উদ্ধার করতে পারবেন বলে মনে হয়?” গলায় একেবারে সঠিক পরিমাণ ব্যঙ্গ মিশিয়ে জিজ্ঞেস করলাম আমি।

“যদি তুমি কাল সকালে... এই ধর সাড়ে নটা নাগাদ এসে ডাঃ ওয়াটসন আর আমার সঙ্গে ব্রেকফাস্ট কর, তাহলে তোমায় কিছু তথ্য দিতে পারব বলেই আমার বিশ্বাস।”

এখনও আমার মনে পড়ছে বেকার স্ট্রিটের ঘরটা, যেন গতকালের কথা। পরদিন সকালে গিয়ে দেখি ড্রেসিং গাউন পরে হোমস চেয়ারে বসে পাইপ খাচ্ছে,সারা ঘর ধোঁয়ায় ভর্তি, আর তাঁর উলটো দিকে ডাঃ ওয়াটসন বসে আছে কালচে মুখে, দেখেই মনে হচ্ছে অসুস্থ। ভাবলাম সেই জিজেল বুলেটের ব্যথাটা বোধহয় আবার চাগিয়ে উঠেছে, যেটার কথা সে প্রায়ই বলে। তার গলার এক পাশে ঝুলছে তার আদ্যিকালের স্টেথোস্কোপটা, দেখে মনে হচ্ছে এক্ষুনি বোধহয় কোনও রোগী দেখতে বেরোবে। হোমস হাত নেড়ে আমায় বসতে বলল।

“ব্যাপারটা বলি শোন,” শুরু করল হোমস, “কাল রাত্তিরে আমি গ্রেট কাম্বারল্যান্ড প্লেস-এ গেছিলাম। গেছিলাম ভেটেরিনারি ডাক্তার সেজে, গিয়ে বললাম মিঃ উইমফেইমার কদিন আগে আমাকে বলেছিলেন তার কুকুরটাকে দেখে যাওয়ার জন্য। সঙ্গে সঙ্গেই ওরা আমাকে ভেতরে নিয়ে গেল। রোগীর ঘরেই ছিল কুকুরটা। দেখে তো মনে হল না জানলাগুলো কয়েক সপ্তাহের মধ্যেও খোলা হয়েছে বলে। আর কুকুরটাকে দেখতে গিয়ে কার্পেটটাও ভাল করে পরীক্ষা করার সুযোগ পাওয়া গেল।”

“কার্পেটে চোখে পড়ার মতো কিছু পেলেন?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।

“কার্পেটে কিছুই পাওয়া যায়নি এবং সেটাই আশ্চর্যের। তুমি যে থিয়োরি বলছ, যে বাইরে থেকে চোর ঢুকেছিল, সেটা একেবারেই খাটছে না” চুপ করে গেল হোমস, দু’হাতের লম্বা লম্বা আঙুলগুলো একসাথে চেপে ধরল।

“তাহলে আমাদের হাতে কিছু অকাট্য তথ্য আছে। ওয়াটসন যখন সন্ধে সাতটা নাগাদ ভিজিটে যায়, তখন হিরেটা ওখানেই ছিল; সকাল দশটায় যখন স্যার ইউস্টোন ওখানে যান, তখন দেখা যায় হিরেটা নেই। পাঁচ-পাঁচজন মানুষ ওঘরে ঢুকেছে এবং একা ঢুকেছে, প্রত্যেকেই সন্দেহের উর্দ্ধে, এবং কারোরই চুরি করার উদ্দেশ্য নেই। ব্যাপার হল, সমস্ত অসম্ভবগুলোকে সরিয়ে দিলে যা পড়ে থাকে, সেটাই সত্য, তা যতই অবিশ্বাস্যই হোক না কেন। কাজেই ওই পাঁচজনের মধ্যেই কেউ হিরেটা নিয়েছে।”

“অসাধারণ, হোমস,” বলে উঠল ওয়াটসন। হোমসের ফ্যাকাসে মুখে একটু ঝলসানি লাগল এটা শুনে, কিন্তু সে বলতে লাগল।

“আমরা যদি এটাই ধরে নিই, তাহলে এর পরে কী হতে পারে সেটা দেখা যাক। হিরেটা শোওয়ার ঘর থেকে হারিয়েছে – তার মানে কেউ এটা হাতিয়েছে। এবং এটা যখন বাড়িতেই নেই, তখন অন্য কোথাও পাচার করা হয়েছে। যে চুরি করেছে, সে-ই পাচার করেছে। অন্যান্য তথ্য থেকেও আমি এটাই পাচ্ছি। কোনও হেঁজিপেঁজি চোর ওই ঘরে ঢোকার ঝুকি নেবে না, যখন ওই ঘরে একজন সদা জাগ্রত এবং প্রশিক্ষিত নার্স রয়েছে। আবার কোনও পেশাদার চোর ওই হিরে চুরি করার ঝুঁকি নেবে না, কারণ এ হিরে এতই অদ্ভুত যে চোর কোথাও এটা বিক্রি করতে গেলেই ধরা পড়ে যাবে। কাজেই আমি এই সিদ্ধান্তে এলাম যে এ চুরি সাধারণ চুরি নয়। তাহলে এর মাত্র একটাই সমাধান আছে, লেসট্রেড, তা হল, এই হিরেটা চুরি হয়নি, বরং অন্য কোনও সংগ্রাহকের কাছে গেছে। কোনও কিছু পাওয়ার জন্য কালেকটররা যে কোথায় যেতে পারে, তার কোনও সীমা নেই, আর মনে রাখবে ডাংবুরা হিরে সৌভাগ্য আর সুখশান্তি বয়ে আনে।”

নাটকীয়ভাবে থামল হোমস, তারপর আবার শুরু করল।

“মিঃ সলোমন একজন সংগ্রাহক। মিস উইমফেইমার বিকেলে ওখানে গেছিলেন বাবা কেমন আছে, সেটা কাকাকে জানাতে। আমরা জানি না এই অসুখী মহিলা কিসের জন্য হিরেটা বাবার কাছ থেকে নিয়ে কাকাকে দিয়েছিলেন, কিন্তু এটা জানি, এই পাচার তাঁর হাত দিয়েই হয়েছে। তাহলে কেসটা বোঝা গেল। ব্রেকফাস্ট পরে হবে। টুপিটা পরে নাও, ওয়াটসন, লেসট্রেডকে নিয়ে আমরা একবার অ্যালবানিতে যাব। যদি আমার ভুল না হয়, তবে হিরেটা ওখানেই পাওয়া যাবে।”

“কিন্তু... কিন্তু...” বাধা দিয়ে বলে উঠল ওয়াটসন। হোমস কটমট করে তার দিকে তাকাল। “আবার কিন্তুর কী আছে? যা ঘটেছে, আমি তো বললাম।”

“কিন্তু...আমার স্টেথোস্কোপ?” কথা আটকে গেল ওয়াটসনের। আমরা দু’জনেই ঘুরে তাকালাম, কারণ ডাক্তার কেন জানি না, বুকে হাত দিয়ে খাবি খেতে খেতে চেয়ারের মধ্যেই ঘাড় গুজড়ে পরল। দেখে মনে হল অজ্ঞান হয়ে গেছে।

এই প্রথম আমি হোমসকে দেখলাম মানবিক রূপে। দৌড়ে গিয়ে ওয়াটসনের জমার বোতাম খুলেই সে স্টেথোস্কোপটা বুকে লাগাল।

“এ কি! মরে গেছে?” চেঁচিয়ে উঠল হোমস, “আমি কিছু শুনতে পাচ্ছি না!”

“আমার স্টেথোস্কোপে কিছু শোনা যায় না,” বিড় বিড় করে বলল ওয়াটসন।

আমি টেবিল থেকে সেলটজোজিনের বোতলটা নিয়েই সেটা থেকে খানিকটা ছিটিয়ে দিলাম ওয়াটসনের চোখে মুখে। চমৎকার কাজ হল তাতে, ওয়াটসন খানিকটা ঝাড়াপাড়া দিয়ে উঠল বটে, কিন্তু তখনও সে একটা হাত দিয়ে বুকের একপাশ চেপে রেখেছে, দেখে মনে হচ্ছে খুব যন্ত্রণা হচ্ছে। ঠিক তখনই আমার মাথায় একটা ঝিলিক খেলে গেল। এই ঝিলিক আমার কেরিয়ারে আমায় বহুবার সাহায্য করেছে। “মিঃ হোমস, ডাঃ ওয়াটসন বোধহয় আমাদের কিছু বলতে চাইছেন।” ডাক্তারও সম্মতিসূচক ঘাড় নাড়ল।

“হোমস,” বলল ডাক্তার, “আর চুপ করে থাকতে পারছি না। আমি সেনাবাহিনিতে ছিলাম, কাজেই যখন দেখছি একজন নিরপরাধ চমৎকার মহিলার ঘাড়ে দোষ পড়ছে, তখন আর চুপ করে থাকা যায় না। সেদিন যখন মিঃ উইমফেইমার আমাকে ওরকম বিশ্রিভাবে ছাঁটাই করে দিলেন, তখন আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আর তাঁর পরেই যখন তিনি আবার ভুল বকতে শুরু করেন, আমার চোখ গিয়ে পড়ে টেবিলের ওপর রাখা শ্যাময় চামড়ার ব্যাগটার ওপর, যার ওপর রাখা ছিল হিরেটা। নার্সটা তখন বাইরে গেছিল কিছু ঠান্ডা পানীয় আনতে, যেটা আমিই আনতে বলেছিলাম। তক্ষুনি আমার মাথায় একটা ফন্দি এসে যায়। আমি এটা বেকার স্ট্রিটে নিয়ে আসব, আর তুমি এটা আমাদের ঘর থেকে খুঁজে পাবে। আমার কোনও সন্দেহই ছিল না যে তোমার ধীশক্তি দিয়ে তুমি সহজেই বুঝতে পারবে যে আমার গ্রেট কাম্বারল্যান্ড প্লেস-এ যাওয়ার পরেই বেকার স্ট্রিটে হিরেটা এল কিভাবে। আমি তোমার সঙ্গে আমার বন্ধুত্বের খাতিরেই ভেবেছিলাম যে কোনও উলটোপালটা পরিস্থিতিতে পড়লে তুমি আমায় বাঁচাবে। আমি নিশ্চিত ছিলাম যে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড এই কেস নিয়ে হাবুডুবু খেতে খেতে তোমার কাছে আসবে, তখন তুমি দিব্যি এটা খুঁজে বার করবে এবং বলবে এটা গ্রেট কাম্বারল্যান্ড প্লেসেই ছিল, অন্য কোথাও যায়নি এবং উদারভাবে সমস্ত কৃতিত্বই লেসট্রেডকে নিতে দেবে। ভাবা মাত্রই কাজ করলাম। চোখের পলকে হিরেটা তুলে নিয়েই আমার ব্যাগে পুরে সবশুদ্ধু স্টেথোস্কোপের নলের মুখে গুঁজে দিলাম। তারপর বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমেই যে হ্যানসমটা দেখলাম, সেটাকে দাঁড় করালাম। ভেতরে ঢোকার পরই প্রথম আমার কেমন ভয় ভয় করতে লাগল। ভাবলাম স্টেথোস্কোপের মধ্যে জিনিসটা নিরাপদ থাকবে না বোধহয়। তখন আমি ব্যাগ থেকে হিরেটা বার করে ব্যাগটাকে স্টেথোস্কোপের মধ্যে গুঁজে হিরেটা মুখে পুরে দিলাম। জিনিস লুকোনোর এই কায়দাটা আমি আফগান যুদ্ধের সময় শিখেছিলাম। আমার পরিকল্পনা ঠিকঠাক চালাতে গেলে তোমাকে হিরেটা খুঁজে পেতে হবে। তাহলে আমি এটা কোথায় রাখবো? তোমার তামাকের প্যাকেটে (কিন্তু তুমি যদি ততটা ধুমপান না কর - যতটা করলে তোমার হাত সেখানে যায়)? নাকি তোমার বেহালার মধ্যে (যদি তুমি না দেখ)? গাড়ির মধ্যে বসে এই সব ভাবছি, আচমকা হ্যানসমটা এমন একখানা ঝাঁকি মেরে উঠল যে আমি হিরেটা গিলেই ফেললাম।”

“অসম্ভব,” বলে উঠল হোমস, “এটা অনেক বড়।”

“এর চেয়ে কত বড় বড় জিনিস গিলেছি এক সময়,” বলল ওয়াটসন গর্বের সুরে, তারপরেই আবার ব্যথার চোটে মুখ কালচে মেরে গেল তার।

“বুদ্ধির ঢেঁকি একেবারে!” খেঁকিয়ে উঠল হোমস, “এবার ওটা বেরোবে কিভাবে? ঠেলা বোঝো এখন!”

“এলিমেন্টারি, মাই ডিয়ার হোমস, এলিমেন্টারি,” গোঙাতে গোঙাতে বলল ওয়াটসন, “আমাকে কোনও হাসপাতালে নিয়ে চল। ওটা ঠিক বেরোবে। আমি কায়দা জানি।” হোমস আমাকে একপাশে সরিয়ে দিল। “খুবই লজ্জার কথা যে ওয়াটসন ওটা চুরি করেছে, মনে হয় প্রায়ই করে। ওর উদ্ভট প্ল্যানের অন্তত একটা সুরাহা আমি করব, আমি হিরেটা গ্রেট কাম্বারল্যান্ড প্লেসে ফেরত দিয়ে আসব।”

ঠিক তখনই আমি পুরো ব্যাপারটার রাশ আমার হাতে নিয়ে নিলাম। “উহু, মিঃ হোমস,” আমি বললাম, “সেটি হচ্ছে না। ইয়ার্ড যখন কোনও কেস হাতে নেয়, তখন তার শেষ না দেখে ছাড়ে না। কেসটা হাতে নেওয়ার চব্বিশ ঘন্টার মধ্যেই আমি চোর ধরেছি... সে এখন আপনার চেয়ারে ঘাপটি মেরে পড়ে আছে... আর অনেক সীমাবদ্ধতার মধ্যেও হিরেটাকে সনাক্ত করতে পেরেছি। হাসপাতাল থেকেই আমি হিরেটা পেয়ে যাব আর এটা আসল মালিককে ফেরত দেব।” তখনই হোমসের মুখে একটা বিরক্তির ভাব দেখে তার কাঁধে চাপড় মেরে সান্ত্বনা দেওয়ার ভঙ্গিতে বললাম, “ইয়ার্ড শুধু কাজটা হল কিনা দেখে, মিঃ হোমস, কে কৃতিত্ব নিল, তা নিয়ে মাথা ঘামায় না। যতই হোক, ডাক্তার স্বীকার করাতে আমার অনেক সময় বেঁচে গেছে; আর যখন মিঃ উইমফেইমার সুস্থ হয়ে উঠবেন, আমি তাঁকে বলব যে মিঃ হোমস আমাদের যথেষ্ট সাহায্য করেছেন। এ ব্যাপারে আপনি নিশ্চিন্ত থাকতে পারেন।”

গ্রেট লেসট্রেডের কোঁচকানো মুখে এখন একটা গর্বের হাসি খেলা করছে। “তা, অস্বীকার করে লাভ নেই, এই কেসটার পরই আমার নামডাক চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। তবে আমি ‘অপেশাদার অসাধারন’-এর কাছে করা প্রতিজ্ঞার কথা ভুলিনি। মিঃ রেইনহার্ট উইমফেইমার সুস্থ হয়ে ওঠার মাস তিন চারেক বাদে একদিন মিঃ শার্লক হোমসের সঙ্গে দেখা। দেখলাম সে একটা চমৎকার হিরে বসানো টাইপিন পরে আছে। এ রকম টাইপিন তার আগে ছিল বলে তো মনে পড়ে না।”

সকল অধ্যায়
১.
হারানো হিরের রহস্য
২.
কথোপকথন
৩.
পরিত্রাতা ওইলক
৪.
মোনালিসা রহস্য
৫.
শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্য
৬.
হোমসের ডায়রির কিছুটা
৭.
কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য
৮.
হাস্কারভিল গহ্বরের দুরন্ত কাহিনি
৯.
ভূতের পাল্লায় শার্লগ
১০.
দুর্ধর্ষ গোয়েন্দার দুর্ধর্ষ কীর্তি
১১.
সিলিং-এ পায়ের ছাপ
১২.
জোর বরাত, শিয়ার্লাক
১৩.
শেষ ছড়ের টান
১৪.
শার্লক হোমসের সঙ্গে এক রাত্রি
১৫.
আদম কোথায়? ইভ কোথায়?
১৬.
দি সাউথ সি স্যুপ কোম্পানি
১৭.
ডাউনিং স্ট্রিটে শার্লক হোমস
১৮.
মিঃ হেনেসির অন্তর্ধান রহস্য
১৯.
ইনস্পেকটর লেসট্রেডের গল্প
২০.
সোলার পোনস ও আশ্চর্য পোকা
২১.
শার্লক হোমসের সঙ্গে কী সত্যিই এরকুল পোয়ারোর দেখা হয়েছিল?
২২.
সুমাত্রার দানব ইঁদুর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%