অমিত দেবনাথ
এক রাত্তিরে হঠাৎই আক্রান্ত এক বদহজমের রোগীকে দেখে বাড়ি ফিরছিলাম। তখন আমার সদ্যই ডিভোর্স হয়েছে, কাজেই পেট চালানোর জন্য আমাকে আবার পুরোন পেশাতেই ফিরতে হয়েছিল। দেখলাম, আমার ফেরার রাস্তাটা পড়ছে ফকির স্ট্রিট দিয়েই। বাড়ির সামনে পৌঁছলাম বটে... এ বাড়িতেই আমি আর কোম্বস ঘন্টার পর ঘণ্টা কাটিয়েছি, এখানে বসেই আমি পাতার পর পাতা লিখেছি তার বিভিন্ন অভিযান নিয়ে... কিন্তু ভেতরে ঢুকতে মন চাইল না। মন চাইল না যে আমি আবার সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে বন্ধুর হাতটা টেনে ধরি, কারণ, সত্যি কথাটা যদি বলতেই হয় আমি আর কোম্বস একবার রীতিমতো ঝগড়াঝাঁটিতে জড়িয়ে পড়ছিলাম। সে যেভাবে আমার স্ত্রীর হয়ে... সে সময় আমার স্ত্রী ডিভোর্স চাইছিল ... আমার বিরুদ্ধে সমস্ত তথ্যপ্রমাণ জোগাড় করেছিল, সেটা আমার ভাল লাগেনি। আমি সেটা ওকে বলেওছিলাম, কিন্তু ও শুধু বলেছিলঃ “বন্ধু হে, এটাই আমার পেশা, তাই না?” ওর এই ন্যাকামোটা সেদিন আমার মোটেই ভাল লাগেনি, আমার মেজাজ ঠান্ডা হতে অনেক সময় লেগেছিল। তখন থেকেই ওর সঙ্গে আমার সম্পর্কে চিড় ধরেছিল, তাই ভাবলাম, আজ রাত্তিরে যখন সুযোগ এসেছে, তখন সম্পর্কটা জোড়া দেওয়া যাক।
ঘরে ঢুকেই দেখলাম কোম্বস ঘাবড়ানো মুখে এক গ্লাস সোডা ওয়াটার খাচ্ছে। যখন থেকে আমি ওর মরফিনের নেশাটা ছাড়াতে পেরেছিলাম, তখন থেকেই ও চুপচাপ অন্য কোনও উত্তেজক খোঁজার তালে ছিল, শেষ পর্যন্ত খুঁজে পেয়েছে দেখা যাচ্ছে। আমি একটা নি:শ্বাস ছাড়লাম। স্বস্তির নি:শ্বাস।
“গুড ইভনিং, কোম্বস,” আমি বললাম হাত বাড়িয়ে দিয়ে।
“আরে, স্পটসন যে!” আমার বাড়ানো হাতকে পাত্তা না দিয়ে চেঁচিয়ে উঠল কোম্বস, “ভালই আছো দেখছি। কিন্তু তোমার চাকর যে আবার ভেগেছে, এটা তো ভাল কথা নয় ভায়া।” সোডা ওয়াটারে চুমুক দিতে দিতে সে চুকচুক শব্দ করল।
আমি যদিও ওর অসাধারণ ক্ষমতার সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু এই কথাগুলো আমাকেও চমকে দিল।
“আরেব্বাস, ওইলক,” উত্তেজনায় আমি তার নামের প্রথমাংশটা ধরেই ডেকে বসলাম, “কী করে জানলে?”
“এ একেবারে সুনিশ্চিত ব্যাপার, স্পটসন। শুধু পর্যবেক্ষণ, আর কিছু না,” বলল কোম্বস, তুলে নিল তার হারমোনিকাটা, বাজাতে লাগল একটা সুর।
“কিন্তু কিভাবে?” আমি নাছোড়।
“একান্তই যখন জানতে চাইছো, তখন বলি,” বাজনা থামিয়ে বলল কোম্বস, “তোমাকে জানাতে পারলে খুশিই হব। দেখতে পাচ্ছি যে তোমার বাঁ হাতের তর্জনীতে ছোট্ট একটুখানি কোর্ট-প্লাস্টার লাগানো রয়েছে। তার মানে কেটে গেছে। কিন্তু খুব ছোট্ট ক্ষত নিশ্চয়ই, কারণ প্লাস্টারটা খুবই ছোট। তখন আমি নিজেই ভাবলাম কিসের থেকে হল? কোনও পেরেক, বা পিন বা সূচ নিশ্চয়ই। প্রথমে বাদ দিলাম পেরেক, তারপর বাদ দিলাম পিন। তাহলে নিশ্চয়ই সূচ। কিন্তু সূচ কেন? নিজেই ভাবলাম, তারপর তোমার কোটের দিকে তাকিয়েই উত্তরটা পেয়ে গেলাম। কোটের বোতাম পাঁচখানা, তার মধ্যে চারখানা ঢিলেঢালা, কিন্তু পাঁচ নম্বরটা খুব শক্ত করে সেলাই করা। সেলাইটা সদ্যই করা হয়েছে। তার মানে বোঝাই যাচ্ছে, তুমিই বোতামটা সেলাই করতে গিয়ে আঙুলে সূচ ফুটিয়েছ। কিন্তু,” সে এমনভাবে বলছিল যেন আমাকে নয়, নিজেকেই শোনাচ্ছে, “আমি কখনোই শুনিনি কোনও লোক একান্ত বাধ্য না হলে সূচসুতো হাতে নেয়। স্পটসনের তো সবসময় ঝি থাকে, তাহলে ও নিজেই সেলাই করল কেন? সহজ ব্যাপার, ঝি পালিয়েছে।”
খুব মন দিয়ে আমি ওর ব্যাখ্যাটা শুনছিলাম। দেখে ভাল লাগল যে ওর ক্ষমতা সেই আগের মতোই আছে, যখন আমরা একসঙ্গে থাকতাম।
“দারুণ, কোম্বস, দারুণ,” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।
“একটু পর্যবেক্ষণ ক্ষমতা, আর কিছুই না,” বলল কোম্বস। “আমি কদিন ধরেই ভাবছি, বোতামের ওপর একটা মনোগ্রাফ লিখব। বিষয়টা চমৎকার, কাজেই বইটার ভাল বিক্রি হওয়া উচিত। কিন্তু , আরে, কী হল?”
দরজার সামনে একটা গাড়ি থামার আওয়াজ পেয়েই মন্তব্যটা বেরিয়ে এসেছিল কোম্বসের মুখ দিয়ে। এমনকি তার কথার মাঝখানেই ঘন্টা বাজাল কেউ, তারপর শোনা গেল সিঁড়ি দিয়ে কারও উঠে আসার দ্রুত পদশব্দ। তারপর শোনা গেল দরজায় খটখট আওয়াজ। কোম্বস তার আরামকেদারায় ডুবে পা দুটো ছড়িয়ে দিল নিয়মমাফিক, তারপর বলল, “ভেতরে আসুন।”
দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন এক তরুণী, চোখে মুখে উদ্বেগের ছাপ, বছর তেইশেক বয়স, পরনে দর্জির বানানো নীল স্যুট, পেটেন্ট-লেদারের জুতো, মাথায় টুপি, তাতে কালো পমপন আটকানো। তার পরনে আরও কিছু ছিল, কিন্তু সেটা আমি ঠিক ধরতে পারলাম না। কোম্বসের কাছে অবশ্য এসব কোনও ব্যাপার না। বস্তুতপক্ষে, ও মহিলার দিকে এমন এক অন্তর্ভেদী চাহনি দিল যে তাতেই আমি বুঝে গেলাম মহিলার কোনও রহস্য থাকলেও তা কোম্বসের কাছে আর গোপন নেই।
“জয় ভগবান,” চেঁচিয়ে উঠলেন মহিলা আমার দিকে তাকিয়ে, “আপনাকে ঘরে পাব ভাবতেই পারিনি!”
“শরীর খারাপ নাকি ম্যাডাম,” বলে আমি শুরু করতে যাচ্ছিলাম, হঠাৎ মনে পড়ল আমি আমার ঘরে নেই, কোম্বসের কনসাল্টিং রুমে আছি। গম্ভীর হয়ে বললাম, “ইনি মিঃ কোম্বস।”
তরুণী ঘুরে দাঁড়ালেন তার দিকে। তারপর তাঁর রুমাল বার করে দু চোখ ঢেকে “বাঁচান আমাকে, বাঁচান, মিঃ কোম্বস” বলতে বলতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন। কোম্বস অবশ্য কোনও উত্তর দিল না। এসব কথার উত্তর দেওয়াটা তার কাছে নেহাতই মামুলি। মহিলা রুমাল সরিয়ে আমার দিকে সন্দেহের দৃষ্টিতে তাকিয়ে কোম্বসকে বললেন, “আপনার সঙ্গে আলাদা করে কথা বলা যাবে?”
এর আগে অথবা তখনও পর্যন্ত মাত্র একবারই আমি কোম্বসের মুখ এমন থমথমে হয়ে উঠতে দেখেছিলাম। আর তা হল সেই সুইজারল্যান্ডে প্রফেসর ও ‘ফ্ল্যাহারটির সঙ্গে মোলাকাতের সময় (পাঠক, মনে না থাকলে পড়ুন’ মেমোয়ার্স অব ওইলক কোম্বসঃ আর্পার অ্যান্ড কোং; $ ১.৫০)।
“ম্যাডাম,” সে বলল গম্ভীর গলায়, “আপনার যা কিছু বলার, ডাঃ স্পটসনের সামনে বলতে পারেন। আরে, লোকজন কি আমার কীর্তিকলাপ জানতে পারত,” মুহূর্তের জন্য মেজাজ হারিয়ে চেঁচিয়ে উঠল কোম্বস, “যদি ও না লিখত?”
কোম্বস সোডা-ওয়াটারের জন্য হাত বাড়ানোর ফাঁকে আমি তার দিকে একটা কৃতজ্ঞ চাহনি দিলাম। আমাদের দর্শনার্থী মহিলা থতমত খেয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন কয়েক মুহূর্তের জন্য, তারপর ধাতস্থ হয়ে বললেন, “বেশ। বলছি ঘটনাটা।”
“বলুন,” তখনও কোম্বসের গলা তিতকুটে।
“আমার নাম ইসাবেল। স্বাবিয়া-র ডাচেস,” বললেন মহিলা।
“এক মিনিট,” কোম্বস বলল, “স্পটসন, আমার নোটবইটা খুলে সূচিপত্রে দেশের নামটা দেখতো।”
আমি নামালাম বইখানা, যেখানে কোম্বস বিভিন্ন লোকজন এবং উল্লেখযোগ্য ঘটনার হাজার হাজার নোট লিখে রেখেছে। পেয়েও গেলাম...”ওয়াইপোনোমিউটিডি” এবং “ইট্রিয়াম”-এর মাঝখানে। জোরে জোরে পড়তে লাগলামঃ
“ইসাবেল, স্বাবিয়ার ডাচেস; স্টাইনহাইমবাখ-এর কাউন্টেস; রাইসেনডর্ফ-এর কাউন্টেস ইত্যাদি ইত্যাদি। জন্ম-২৯ ফেব্রুয়ারি, ১৮৭৬, শ্ক্লোস অশেনফাস-এ। পিতা হলেন হুগো, কাফেকুচেন-এর ডিউক, মা জুইফেলফেল্ড-এর ডাচেস। মাত্র তিন বছর বয়সেই তিনি জার্মান, ফরাসি, ইংরেজি, ইতালিয়ান এবং স্প্যানিশ ভাষায় ‘হা হা!’ করে হাসতে শেখেন। পাঁচ থেকে পনেরো বছরের মধ্যে তিনি ক্লাইনপ্ল্যাৎজ বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বনামধন্য অধ্যাপক গ্রস্কপফ-এর কাছে শিক্ষা নেন। ষোলো বছর বয়সের মধ্যেই তাঁর সব আক্কেল দাঁত বেরিয়েছিল। খুবই উল্লেখযোগ্য মহিলা।”
শেষ লাইনটা পড়ার সময়েই মহিলা আবার কান্নায় ভেঙে পড়লেন।
“শান্ত হোন, ডাচেস, শান্ত হোন, নিজেকে সংযত করুন,” টেবিল থেকে একটা পাইপ তুলে নিয়ে তাতে তামাক ভরতে ভরতে বলল কোম্বস, যেটা সে অন্যমনস্কভাবে আমার পকেট থেকে তুলে নিয়েছিল।
কোম্বসের কথায় শান্ত হলেন ডাচেস। তারপর সম্রাজ্ঞীর ভঙ্গিতে উঠে দাঁড়িয়ে তাঁর অসামান্য সুন্দর দুই চোখ মেলে তাকালেন কোম্বসের দিকে, যে দুই চোখের চাহনিতে ঘায়েল হয়ে গেছে বহু রাজকীয় হৃদয়, বললেন ম্লান গলায়ঃ
“আমি হারিয়ে গেছি!”
যে ভাবে এবং যে ভঙ্গিতে তিনি কথাটা বললেন, সেটা কোম্বসের মনে গভীর ছাপ ফেলল বোধহয়, কারণ কথা না বলে সে পাক্কা চার মিনিট সেখানেই বসে রইল। যেরকম নার্ভাস হয়ে সে লম্বা লম্বা টান দিচ্ছিল পাইপে, তাতে বুঝলাম সে গভীরভাবে চিন্তা করছে কোনও কিছু। তারপর আচমকা এক চিৎকার ছেড়ে সে তীরবেগে ঘর থেকে বেরিয়ে দুরদার করে সিঁড়ি দিয়ে নামতে লাগল, হতভম্ব ডাচেস এবং আমাকে ঘরে রেখে। তবে বেশিক্ষণের জন্য নয়। ঠিক তেতাল্লিশ সেকেন্ডের মধ্যেই সে আবার হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকে তার আরামকেদারায় বসেই এক চিৎকার ছাড়ল:
“পেয়েছি!”
আমার বন্ধুর চোখে আমি এরকম বিজয়োল্লাস আগে কখনোও দেখিনি। ধীরে ধীরে দেখলাম সে ক্লান্তিটা কাটিয়ে উঠছে। তারপর বলল, “ম্যাডাম, উত্তর পেয়ে গেছি।”
মহিলার ফোঁপানিতে শোনা গেল আনন্দের সুর।
কোম্বস বলল, “যে মুহূর্তে আপনি বললেন হারিয়ে গেছেন, তক্ষুনি একটা চিন্তা মাথায় এল। তুমি নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ স্পটসন, যে আমি কত অন্যমনস্ক ছিলাম। ওই হল আমার মাথায় চিন্তা আসার চিহ্ন। সেটা মিলিয়ে যাওয়ার আগেই আমি কী করলাম? আমি ঝটপট দৌড়ে নিচে নেমে এই বাড়ির নম্বরটা দেখলাম, খাতায় টুকে নিলাম, ঘরে ফিরে এলাম। ম্যাডাম,” সে পকেট থেকে একটা নোটবই বার করে পাতা ওল্টাতে ওল্টাতে একটা জায়গায় এসে থেমে গেল। “এই দেখুন, আপনি বেঁচে গেছেন! আপনি আর হারিয়ে যাননি! এই বাড়ির ঠিকানা ৬২ ফকির স্ট্রিট। আপনাকে পাওয়া গেছে!”
যতক্ষণ ধরে কোম্বস বলে গেল, ডাচেস একটি কথাও বলেননি। কোম্বসের বলা শেষ হলে তিনি পাক্কা একটি মুহূর্ত স্তব্ধ হয়ে রইলেন, যেন কথাগুলোর মানেই বুঝতে পারছেন না, তারপর যখন দেখলেন তিনি উদ্ধার পেয়েছেন, তিনি আরেকবার কেঁদে উঠলেন।
“আপনি আমায় বাঁচিয়েছেন, আপনি আমার রক্ষাকর্তা,” ঘর থেকে বেরোবার প্রস্তুতি নিতে নিতে বললেন তিনি, “আপনাকে কী বলে ধন্যবাদ দেব জানি না।” কোম্বসের বাড়ানো হাতে তিনি গুঁজে দিলেন হীরকখচিত স্বর্ণবর্ণের একটা বড়সড় থলে।
বন্ধ হয়ে গেল দরজা, শোনা গেল গাড়ির এগিয়ে যাওয়ার আওয়াজ, চলে গেলেন স্বাবিয়ার ডাচেস।
ব্যাগটা খুলল কোম্বস। ভেতরে দু’শো পাউন্ডের নোট সুন্দর করে ভাঁজ করা।
“মোটে এই! ছিঃ! রাজপরিবারের লোকজন দেখছি এরকমই হয়।” অবজ্ঞার সুরে বলল ওইলক কোম্বস।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন