শার্লক হোমসের সঙ্গে কী সত্যিই এরকুল পোয়ারোর দেখা হয়েছিল?

অমিত দেবনাথ

শার্লক হোমসের সঙ্গে কি এরকুল পোয়ারোর কখনোও দেখা হয়েছিল? না না, এটা পড়ে যতটা অবিশ্বাস্য মনে হচ্ছে, ততটা কিন্তু নাও হতে পারে। শার্লক হোমসের শেষ তদন্তের রেকর্ড পাওয়া যায় ১৯১৪ সালে, প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হওয়ার আগের বছর, যার পরে তিনি সাসেক্স-এ মৌমাছি পালনে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। সেই সময়েই, আমাদের পাওয়া অতি নির্ভরযোগ্য তথ্য অনুযায়ী, এরকুল পোয়ারোর বয়স ছিল পঞ্চাশ বছর এবং তিনি তখনও যথেষ্ট সক্ষম, কাজেই ১৯০৪ সালেই তিনি অবসর নিয়েছেন বলে যে ধারণা প্রচলিত আছে, সেটা নিশ্চিতভাবেই ছাপার ভুল।

এখানে যে ঘটনাটির বিবরণ দেওয়া হচ্ছে, তা থেকে এরকম ভাবার যথেষ্ট কারণ আছে, কারণ এই বিবরণটি ডাঃ ওয়াটসনের সেই ভাঙাচোরা টিনের বাক্স থেকে পাওয়া যায়নি, যার মধ্যে বহু গুরুত্বপূর্ণ ঘটনার বিবরণ ছিল এবং যেটি তিনি “চেয়ারিং ক্রস-এর কক্স অ্যান্ড কোম্পানির ব্যাংকের ভল্ট”-এ সুরক্ষিত রেখেছিলেন। এই বিবরণটি পাওয়া গেছে পোয়ারোর বন্ধু ক্যাপ্টেন হেস্টিংস-এর কাগজপত্রের মধ্যে থেকে, যিনি এই বিখ্যাত বেলজিয়ান গোয়েন্দার অনেক ঘটনা নথিবদ্ধ করেছেন। তাহলে শার্লক হোমসের কোনও তদন্ত কাহিনি, যার বিবরণ দিয়েছেন ডাঃ ওয়াটসন, কেন হেস্টিংসের কাগজপত্রের মধ্যে থাকবে? এর উত্তর সম্ভবত বিবরণটির মধ্যেই লুকিয়ে আছে। দুঃখের বিষয়, বিবরণটি সম্পূর্ণ পাওয়া যায়নি, কিন্তু তাতে কিছু যায় আসে না, কারণ এটি পড়লেই বোঝা যায় যে শেষের কয়েকটি মাত্র লাইনই বাদ পড়েছে। তবে এর থেকে এই দুই গোয়েন্দার যে সত্যি সত্যিই দেখা হয়েছিল, তার কোনও গ্যারান্টি দেওয়া যাচ্ছে না।

মালরেডি হাউস, গদিতে থাকা এক প্রধানমন্ত্রী, গোপন নথিপত্র, যুদ্ধ বাধার আশঙ্কা... এই কথাগুলোর উল্লেখ করলেই নির্ঘাত শার্লক হোমস মাথা নেড়ে বলত, “এটা লিখো না হে, এ কেস শোনার জন্য পৃথিবী এখনও তৈরি নয়।” তবে এখন এই অসাধারণ ঘটনাবলী পাঠকদের কাছে তুলে ধরা যেতেই পারে, কারণ মালরেডি হাউসের বাসিন্দাদের কাছে এর থেকে আর ক্ষতির আশঙ্কা নেই, এবং এর স্মৃতিও আমার মনে এখনও জ্বলজ্বল করছে।

হোমসের রিটায়ার করার কয়েক বছর আগের ঘটনা এটা। আগের দিন রাতটা আমি বেকার স্ট্রিটেই কাটিয়েছি পুরোন বন্ধুর সঙ্গে। ব্রেকফাস্ট হয়ে গেছে, খবরের কাগজ দেখা হয়ে গেছে, এখন হোমস ঘুরছে ঘরের মধ্যে, কথা বলছে নানারকম বিষয়ে অভ্যস্ত সুরে, হঠাৎই সে জানলার সামনে এসে দাঁড়াল।

“ওয়াটসন! আমাদের কপাল খুলে গেল! কে আসছে দেখ!”

“হোমস, আবার যদি তুমি তোমার ওইসব কায়দাবাজি শুরু কর।

হেসে ফেলল হোমস। “না হে, না! আসলে যখনই আমি দেখলাম একটা হালফ্যাশনের রোলস রয়েস মোটরকার, যার দরজায় বিশেষ চিহ্ন রয়েছে, তখনই আমি বুঝলাম বেশ নামডাকওয়ালা কেউ নির্ঘাত নামছে গাড়ি থেকে। এখন দেখছি আমি ভদ্রলোককে চিনি। ইনি হলেন লর্ড লিভিংটন।”

কিছুক্ষণ বাদেই ঘরে আবির্ভূত হলেন আমাদের যুদ্ধসচিব। বিভিন্ন ফোটোগ্রাফ আর কার্টুন দেখে আমি তাঁর চেহারার সঙ্গে পরিচিত ছিলাম, কিন্তু এখন দেখলাম আসলের সঙ্গে ছবির অনেক তফাৎ। ঘন ভুরুর নিচে গভীর চোখ আর সারা শরীর জুড়ে এক অদ্ভুত তেজ ওইসব ছবি দেখে কিছুই বোঝা যায় না। তিনি আমাদের দুজনের দিকেই পর্যায়ক্রমে তাকালেন।

“মিঃ হোমস, একটা অত্যন্ত জরুরি ব্যাপারে আপনার কাছে এসেছি, আর ব্যাপারটা খুবই গোপনীয়।”

আমি উঠতে যাচ্ছিলাম, কিন্তু হোমস হাত নেড়ে আমাকে থামাল। “আপনি ডাঃ ওয়াটসনের সামনে সমস্ত কথা স্বচ্ছন্দে বলতে পারেন।”

“আর তা না হলে...” শার্লক হোমস তার পাইপ ধরালো, চুপচাপ টানতে লাগল কোনও কথা না বলে। লর্ড রিভিংটন ক্রুদ্ধ চোখে তাকিয়ে রইলেন তার দিকে, তারপর কাঁধ ঝাঁকিয়ে বললেন, “ঠিক আছে, এখন আর তর্কবিতর্কের সময় নেই। জানেন বোধহয়, ফ্রান্স আর আমাদের মধ্যে বোঝাপড়া চলছে, যাতে যৌথ উদ্যোগে জার্মান আগ্রাসন রোধ করা যায়?”

“কাগজে যতটুকু পড়েছি, তার বেশি নয়।”

“বোঝাপড়াটা খুবই চমৎকার জায়গায় রয়েছে, কিন্তু, আপনি বুঝবেন ব্যাপারটা। আমাদের ইন্টেলিজেন্স সার্ভিস আমাকে জানিয়েছে যে সেই চুক্তির যাবতীয় খুঁটিনাটি - যাবতীয় খুঁটিনাটি - বার্লিনে চলে যাচ্ছে। আমার অবস্থাটা বুঝতে পারছেন? আর আমি এও জানতে পেরেছি যে আমাদের এই বোঝাপড়ার দায়িত্বে যিনি আছেন, সেই স্যার চার্লস মালরেডির মাধ্যমেই খবর সোজা জার্মানিতে পৌঁছে যাচ্ছে। তিনি আমার একেবারে ছোটবেলার বন্ধু, একসঙ্গে স্কুলে পড়েছি, বিশ্ববিদ্যালয়েও পড়েছি। এবং এও জানি তিনি কত মানী লোক। তা সত্ত্বেও দেখতে পাচ্ছি, কাগজপত্র সব পাচার হচ্ছে তার হাত দিয়েই। আপনি নিশ্চয়ই অবাক হচ্ছেন, আমি এত সব জানলাম কী করে। অবাক হবেন না। গতকাল স্যার চার্লস নিজেই আমাকে বলেছেন।”

“অফিসের আর কারোর হাতে ওগুলো যায় কি?”

“একেবারেই না। অফিসের আর কারোর হাতেই ওগুলো যায় না। ওগুলো সিন্দুকে থাকে, আর সিন্দুকে তালা দেওয়া থাকে। স্যার চার্লস যখন বাড়ি যান, চাবি নিয়ে যান। আর ফরাসিদের দিক থেকে কোনও রকম বিশ্বাসঘাতকতার প্রশ্নই নেই।” লর্ড রিভিংটন গলা খাকড়ালেন, “তবে তাদেরও হয়ত কোনও গোপন ব্যাপার আছে। আর কিছু কিছু জিনিস, নোটে যার উল্লেখ আছে, সেগুলো ফরাসিদের সঙ্গে আলোচনা করাই হয়নি, কিন্তু সেগুলোর খবর পর্যন্ত সোজা বার্লিন পৌঁছে যাচ্ছে। অথচ নথিপত্রগুলো চুরি যায়নি, তাহলে নিশ্চয়ই নকল করা হচ্ছে, নয়ত ছবি তুলে নেওয়া হচ্ছে।”

হোমস খুব মন দিয়ে শুনছিল। এবার বলল, “স্যার চার্লসের পরিবারের কেউ জার্মানিতে থাকেন কি?”

“এইবার আসল ব্যাপার ধরেছেন, মিঃ হোমস। তিনি বিয়ে করেছেন এক জার্মান বিধবা মহিলাকে, এক পুত্র সমেত। ভদ্রমহিলার স্বামী, কাউন্ট ফন ব্র্যাঙ্কেল শিকার করতে গিয়ে দুর্ঘটনায় মারা যান। ছেলেটার নাম হানস, তাকে চার্লস এমনভাবে বড় করছে, যেন সে চার্লসের নিজের ছেলে। ছেলেটা বুদ্ধিমান, কিন্তু ঠিকমতো মানুষ হয়নি মিঃ হোমস - ওর স্কুল থেকেও ওকে তাড়িয়ে দিয়েছে - খুঁটিনাটি বিবরণ আমি আর দেব না। তারপর ছেলেটা বছরখানেক ডাক্তারি পড়ে সেটাও ছেড়ে দেয়, বলে স্টেজে অভিনয় করবে। বুঝতেই পারছেন, তাতে কেউ কোনও উৎসাহই দেয়নি। শেষ অবধি সে বাড়িতেই থাকে, কিচ্ছু করে না, বাড়ির অন্ন ধ্বংস করছে। তাদের নিজেদের এক মেয়ে আছে, তার নাম লিলিয়ান। তার মাথায় আবার অদ্ভুত সব আইডিয়া ঘোরে। একটা যেমন ...তার মতে মেয়েদের ভোটদানের অধিকার দেওয়া উচিত। আরেকটা... খুন করার অস্ত্রশস্ত্র বিলোপ করা উচিত। কী আর বলব, আমার বন্ধুর সন্তানভাগ্য ভাল নয়।”

“আরেকটা প্রশ্ন। যদি বলি, আমাদের ফরাসি বন্ধুরা ওই নথিপত্রের যে সব জিনিস দেখেনি, সেগুলো দেখতে আগ্রহী, তাহলে কি ভুল হবে?”

মুহূর্তের জন্য যুদ্ধসচিবকে খুব অবাক দেখাল। “হতে পারে, তবে তাদের সঙ্গে তো আমাদের খুবই বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক। মঁসিয়ে কালামি, যিনি এই দুই দেশের বোঝাপড়ার মধ্যেকার অন্যতম ব্যক্তি, তিনি তো এখন লন্ডনেই আছেন, মালরেডি হাউসে।”

হোমস মাথা নাড়ল।

“এবারে আমি আসল ঘটনায় আসছি। একটা ড্রাফট বানানো হয়েছিল, নাম ধরুন প্ল্যান এক্স, সেটা পুরোপুরি আমাদের মিলিটারি আর নৌবাহিনির সম্পর্ক। তাতে এই দুই বিভাগের বিস্তারিত বর্ণনা দিয়ে বলা হয়েছিল তারা কিভাবে ফ্রান্সকে যুদ্ধের সময় সাহায্য করবে। এর সঙ্গেই ছিল আরেকটা নথি, সেটা ব্রিটেনের প্রতিরক্ষার ব্যাপারে, যেটা একেবারেই আমাদের নিজস্ব বিষয়, এবং মঁসিয়ে কালামির জন্য নয়। এই দুরকম নথিই ছিল স্যার চার্লসের তত্ত্বাবধানে। গতকাল যখন সন্দেহটা জোরালো হয়ে একেবারে নিশ্চিতের দিকে এগোচ্ছে, আমি তাঁকে আমার সঙ্গে দেখা করার জন্য ডেকে পাঠাই। তিনি বাতের ব্যথায় কাবু হয়ে ক’দিন ধরে হোয়াইট হলে আসছিলেন না, তবে আমি ডাকার পর খোঁড়াতে খোঁড়াতে হলেও আমার সঙ্গে দেখা করেন। আমি তাঁকে বলি, আমি কী কী শুনেছি।”

“আমি যা ভেবেছিলাম, তাই হল। তিনি তো প্রথমে পাত্তাই দিতে চাইছিলেন না, তারপর দেখলাম ভয়ে তাঁর মুখচোখ কালো হয়ে গেল। তিনি বললেন তিনি নির্দোষ, এবং আমি তা বিশ্বাসও করেছিলাম।

খানিকক্ষণের জন্য মাথা নিচু হয়ে গেল তাঁর, তারপর যখন তিনি মুখ তুলে পর্যায়ক্রমে আমাদের দিকে তাকালেন, সে মুখে দেখতে পেলাম চরম হতাশা। ...গতকাল রাত্তিরে তিনি তাঁর দোষ স্বীকার করেছেন, তবে কথায় নয়, কাজে। বাতের ব্যথা কমানোর জন্য যে ওষুধ তিনি খেতেন, সেই ওষুধ প্রচুর পরিমাণে খেয়ে তিনি আত্মহত্যা করেছেন। এবং আরেকটা খবরও আছে, সেটা আরও খারাপ। প্ল্যান এক্স এবং নথি... এই দুটোই তিনি বাড়ি নিয়ে গেছিলেন ভাল করে পড়ে দেখবেন বলে। দুটোই গায়েব হয়ে গেছে।”

কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমরা বেরিয়ে পড়লাম বাড়ি থেকে, চড়ে বসলাম রোলস রয়েস-এ, উদ্দেশ্য মেফেয়ার-এর মালরেডি হোম।

সারা বাড়িতেই লম্বা জানলার পর্দাগুলো নামানো ছিল, বিরাজ করছিল এক শোকের ছায়া। বোঝাই যাচ্ছিল, আচমকা এই মৃত্যুর ধাক্কা যথেষ্ট প্রভাব ফেলেছে সেখানে। লর্ড রিভিংটন আমাদের সোজা নিয়ে গেলেন স্যার চার্লসের স্যুইটে, যেটা একটা ড্রেসিংরুম দিয়ে তাঁর স্ত্রীর ঘরের থেকে আলাদা করা।

“লেডি মালরেডি রাত্রে খেয়াল করেন উনি ব্যথায় কাতরাচ্ছেন, সঙ্গে সঙ্গে তিনি ডাক্তার ডাকেন। ডাক্তারের নাম কার্ডিউ। তিনি এসে বলেন স্যার চার্লসের বাতের ব্যথাটা নির্ঘাত এমন বাড়াবাড়ির পর্যায়ে চলে গেছিল যে তিনি একসঙ্গে বেশি ওষুধ খেয়ে নিয়েছেন, কিন্তু আমার ধারণা, ওষুধগুলো তিনি ইচ্ছে করেই খেয়েছিলেন।”

ডাঃ কার্ডিউকে আমি চিনি, আমি বললাম, “খুব ভাল ডাক্তার। সম্পূর্ণ বিশ্বাস করা যায়।” তারপর এগিয়ে গেলাম খাটের সামনে, চাদর সরিয়ে মৃতদেহটা দেখলাম ভাল করে। বিছানার পাশের টেবিলে রাখা আছে একটা খালি গ্লাস, পাশেই রয়েছে এক তৃতীয়াংশ ভরা একটা বোতল, যাতে একটা লেবেল মারা রয়েছে ‘কোলানটিয়াম’। বাতের ব্যথার জন্য এই ওষুধটা হামেশাই ব্যবহার করা হয়। “এতে কলকিকাম নামে একটা উপাদান আছে, যেটা ব্যথা কমাতে সাহায্য করে। অন্য কিছু তো আমি দেখছি না।”

“অন্য কিছু দেখছ না, তাই না ওয়াটসন?” হোমস এতক্ষণ ঘুরছিল সারা ঘরে আর ড্রেসিংরুমে। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করছিল কাগজপত্র, গয়নাগাটি, পাইপ রাখার র‍্যাক, ড্রেসিংরুমের একটা ড্রয়ারওয়ালা লেখার টেবিল, একটা আতসকাচ দিয়ে। এবার সে মৃতদেহ ঢাকা কাপড়টা সরিয়ে দেখল, তারপর ভাল করে দেখল গ্লাস আর বোতলটা। বোতলটা আলোর সামনে ধরেও দেখল, ঠুকে ঠুকেও দেখল।

“কলকিকাম একধরণের বিষ। অনেক গাছগাছড়া আর ফুলও যেরকম বিষ তাদের ব্যথা কমানোর ক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও। হলুদ জুঁই, ছিটছিটে হেমলক, ফক্সগ্লোভ লতা, ক্যালাবার বিন আর প্যাটার্নস্টার মটরশুঁটি। এগুলো আফিম বা ল্যাবারনাম গাছের বীজের মতোই প্রাণঘাতী হতে পারে।”

“আমি একটা পুস্তিকা লিখছি ‘বিষ বাগান’ নাম দিয়ে। সেটা যে কোনও ডাক্তারের কাজে লাগবে বলেই আমার ধারণা। আর কলকিকাম অল্প পরিমাণে খেলে ব্যথা কমে, কিন্তু বেশি খেলে মৃত্যু অবধারিত। বোতলে কি পরিমাণ ওষুধ ছিল বলতে পারবে ওয়াটসন? পারবে না, কারণ বোতলে অতখানি ছিলই না। গ্লাসে অবশ্য কিছু তলানি পড়ে আছে। কেউ ওই বোতলে অতিরিক্ত কলকিকাম ঢেলে সাধারণ বাতের ওষুধকে একটা বিষাক্ত পানীয় করে দিয়ে গেছে।”

আমি বোতলটা আরেকবার দেখলাম। “ঠিকই বলেছ, হোমস। কিন্তু কী করে?”

“সেটাই আমাদের বার করতে হবে। কলকিকাম স্বাদে তেতো, কাজেই প্রথম চুমুক খেয়েই স্যার চার্লসের কিছু বোঝা উচিত ছিল।” সে লর্ড রিভিংটনের দিকে ঘুরে বলল, “মনে হচ্ছে প্ল্যান এক্স আর ওই নথি - দুটোই একসঙ্গে ড্রেসিংরুমের টেবিলের ড্রয়ারে রাখা ছিল। তালাটা খুব সাবধানে খোলা হলেও ঘষার দাগ রয়ে গেছে, আতসকাচ দিয়ে দেখলাম। এখন একটু লেডি মালবেরির সঙ্গে কথা বলা যাক।”

বিধবা লেডি মালরেডি বেশ লম্বা, সম্ভ্রান্ত চেহারার মহিলা, মাথার চুল ধূসর হয়ে এসেছে। লর্ড রিভিংটন তাঁকে ইলস বলে ডাকলেন দেখলাম, তিনিও লর্ডকে ডাকলেন জেরাল্ড বলে। উষ্ণ অভ্যর্থনা জানালেন ভদ্রমহিলা হোমসকে।

“মিঃ হোমস, লর্ড রিভিংটন কী ভাবছেন আমি জানি, কিন্তু আমি এও জানি যে তাঁর ধারণা ভুল। আমি জার্মান এবং তার জন্য গর্বিত, আমার স্বামীও ব্রিটিশ ছিলেন এবং তার জন্য তিনিও গর্বিত ছিলেন। কোথাও একটা ভুল বোঝাবুঝি হচ্ছে।”

“তাঁর সুনামের যাতে বিন্দুমাত্র হানি না হয়, তার একটা ব্যাখ্যা আমরা শিগগিরই বার করে ফেলতে পারব বলেই আমার বিশ্বাস। কাল হোয়াইট হল থেকে ফেরার পর কী হয়েছিল যদি বলেন, তাহলে ভাল হয়।”

“আমার স্বামী আমাকে রাজনীতির ব্যাপারে তো কিছুই বলতেন না, আর বললেও খুব সামান্যই বলতেন। কাল যখন তিনি ফিরলেন, দেখলাম মনটা খুবই খারাপ, কিন্তু কী ব্যাপার আমাকে কিছুই বলেন নি, আর আমিও জিজ্ঞেস করিনি, কারণ জানি জিজ্ঞেস করে লাভ হবে না। তাঁর নিজস্ব ঘরে ডিনারের আগে পর্যন্ত তিনি ছিলেন। ডিনার টেবিলে আমরা ছিলাম পাঁচজন। আমি, আমার স্বামী, আমাদের দুই ছেলেমেয়ে হানস আর লিলিয়ান, আরেকজন হলেন মঁসিয়ে কালামি। সত্যি বলতে কী, কালকের ডিনার টেবিলে মোটেই মজা ছিল না। আমার স্বামীর বাতের ব্যথাটা তাঁকে খুবই ভোগাচ্ছিল, তিনি কথা বলছিলেনও খুব কম, একমাত্র লিলিয়ান কালকে মেয়েদের ভোটাধিকারের ব্যাপারে কী একটা মিটিং-এ গেছিল, সেই নিয়ে যখন বলছিল, তখনই যা একটু হুঁ হাঁ করছিলেন। হানসও কথা বলছিল না, কী ভাবছিল সে-ই জানে, আর মঁসিয়ে কালামি বরাবরই সামনে খাবারদাবার থাকলে অন্যদিকে বিশেষ নজর দেন না।”

একটা ক্ষীণ হাসি দেখা দিয়েই মিলিয়ে গেল তাঁর মুখে। “আমরা এখানে খুব সাধারণভাবেই থাকি। আমার স্বামী কী খেতেন না খেতেন খেয়ালও করতেন না, আর আমিও এত বছর ধরে এখানে থেকে ইংরেজি রান্নার সঙ্গে নিজেকে মানিয়ে নিয়েছি। মঁসিয়ে কালামির এসব খাবার গলা দিয়ে নামত না। তিনি সঙ্গে করে তাঁর নিজস্ব বাবুর্চি নিয়ে এসেছিলন। খাস চাকরও এনেছিলেন, তা সত্ত্বেও খাবার নিয়ে তাঁর অভিযোগের আর শেষ ছিল না। কাল রাত্তিরেও তিনি গজগজ করছিলেন। ডিনার শেষ হলে আমার স্বামী আমাকে একপাশে ডেকে নিয়ে গিয়ে বলেন, ‘ইলস, আমাকে একটা সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে, তোমার বোধহয় তাতে কষ্টই হবে’ এই ছিল তাঁর আমার সঙ্গে শেষ কথা।”

“ঘটনাটা ঘটল কখন?”

“রাত তিনটের সময়। আমি ওঁর ঘর থেকে একটা চিৎকার শুনি। তাড়াতাড়ি ঘরে ঢুকে দেখি তিনি যন্ত্রণায় চেঁচাচ্ছেন। তক্ষুনি ডাঃ কার্ডিউকে ডাকা হয়েছিল, কিন্তু তিনি যখন এসে পৌঁছন, তখন আমার স্বামী কোমায় চলে গেছেন, তাঁর আর কিছু করার ছিল না। সকাল সাতটা নাগাদ সব কিছু শেষ হয়ে যায়।”

“তখন আপনার ছেলেমেয়েরা ছিল?”

“লিলিয়ান ছিল। আর হানস-” তিনি একটু ইতস্তত করলেন। “ওকে তো তোলাই যাচ্ছিল না, তাও শেষ পর্যন্ত যখন বাড়ির ঝি ওকে ডেকে তুলল, তখন ও টলমল করছে, যেন প্রচুর মদ্যপান করেছে। ওর ঘর থেকে বাবার ঘরে আসতে গিয়েই ও সিঁড়ির বেশ কয়েকটা ধাপ পিছলে পড়ে যায়, ফলে গোড়ালি ভাঙে। ওকে ওর ঘরে নিয়ে যাওয়া হয়েছে, ডাঃ কার্ডিউ বলেছেন ও যেন অবশ্যই শুয়ে থাকে, ঘর থেকে না বেরোয়।”

“আর একটিমাত্র প্রশ্ন করব। আপনি বললেন আপনার স্বামী কী খেতেন না খেতেন খেয়াল করতেন না। এর পেছনে বিশেষ কোনও কারণ আছে কি?”

“হ্যাঁ, আছে। বছর পাঁচেক আগে তাঁর নাকে একটা অপারেশন হয়েছিল, ফলে তাঁর স্বাদ আর গন্ধ নেওয়ার ক্ষমতা প্রায় লোপ পেয়েছিল। তিনি চিকেনের সঙ্গে বিফের অথবা ক্ল্যারেটের সঙ্গে ব্র্যান্ডির তফাৎ করতে পারতেন না। এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ কি?”

“এটা জিগস পাজলের একটা অংশমাত্র, আর কিছুই না।”

ড্রইংরুমের বাইরে বেরিয়েই দেখা হয়ে গেল এক তরুণীর সঙ্গে। বোঝা গেল এ হল ইলস মালবেরির কন্যা, যদিও এর চোখেমুখে বা চলাফেরায় ততটা শোকের ছাপ দেখলাম না, যতটা এর মায়ের মধ্যে রয়েছে। এখন সে একটা খাম আমাদের দিকে বাড়িয়ে ধরে আছে। “আপনাদের মধ্যে মিঃ শার্লক হোমস কে? তাঁর একটা চিঠি আছে।”

হোমস হাত বাড়িয়ে খামটা নিল, খুলল, পড়ল, বাড়িয়ে দিল আমার দিকে। একটা কাগজে বড় হাতের লেখায় রয়েছে কয়েকটা কথা:

মিস্টার হোমস কেটে পড়ুন

এখানে আপনাড কোনও দরকার নেই

“রেনলাঘ-ওয়েভ কাগজের ওপর ওয়েভার্লি নিবে লেখা হয়েছে,” হোমস বলল। “এটা কি কেউ হাতে হাতে দিয়ে গেল, মিস মালরেডি?”

“না না। হলঘরের টেবিলে রাখা ছিল। একজন চাপরাশির চোখে পড়েছে। কী লেখা আছে?”

হোমস তাকে লেখাটা দেখাতেই তার মুখটা লাল হয়ে গেল। “ঠিকই লিখেছে। বাবা মারা গেছেন বলে আমার খুবই দুঃখ হয়েছে ঠিকই, কিন্তু এখন তো তাঁকে শান্তিতে থাকতে দেওয়া উচিত। তিনি কেন মারা গেছেন, আমি জানি। তিনি যুদ্ধের ব্যাপারে যুক্ত ছিলেন, আপনার মতোই, লর্ড রিভিংটন। তিনি হানসকে দু’চোখে দেখতে পারতেন না। কেন জানেন? হানস ওইসব যুদ্ধবিগ্রহ আর খুনোখুনি পছন্দ করত না। আমি কাল রাত্তিরে শুনেছি, বাবার ঘরে দু’জনের মধ্যে জোর তর্কাতর্কি হচ্ছে।”

“বিষয়টা কী ছিল?”

“আমি জানি না, আর জানলেও বলব না,” সে ঘুরে এক দৌড়ে চলে গেল ওপরে। লর্ড রিভিংটন কাশলেন, গলা খাকরানিও দিলেন, তবে বললেন না কিছুই।

“কাগজের লেখাটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ, হোমস,” আমি বললাম। “এটা যে লিখেছে, সে লেখাপড়া প্রায় শেখেইনি।”

“হতে পারে যে সে আমাদের সেইরকম ভেবেছে। আবার এও...”

তার কথা থেমে গেল, কারণ এক ব্যক্তির আবির্ভাব ঘটেছে। খুবই অভিজাত পোশাক-আশাক, চকচকে চুল, চমৎকার গোঁফ। আমার কেন জানি না মনে হয় ফরাসিদের মধ্যে একটা হীনমন্যতার ভাব আছে, যেগুলো ওরা বেশি করে পোমেড আর পারফিউম মেখে চাপা দেয়। এই ভদ্রলোক নিশ্চয়ই মসিয়ে কালামি, যিনি লর্ড রিভিংটনের কাছে দুঃখপ্রকাশ করতে এসেছেন। হলও তাই। হাসি হাসি মুখে বললেন তিনি, “যা ঘটল, তার পরে নিশ্চয়ই আমাদের আলাপ আলোচনার ব্যাপারটা বন্ধ হয়ে যাবে – স্থগিত থাকবে তো বটেই, তাই না?”

“মোটেই না,” তীক্ষ্ণ গলায় জবাব দিলেন লর্ড রিভিংটন, “এখন তো ব্যাপারটা আগের থেকেও জরুরি হয়ে গেল, এখন আমি নিজেই দেখব ব্যাপারটা।”

“শুনে সুখী হলাম। তাহলে আমরা দু’পক্ষই আরও খোলা মনে কথাবার্তা চালাতে পারব।” ফরাসি মানুষটার হাসিটা সামান্য চওড়া হল। “আরেকটু পরেই আমি এ বাড়ি ছেড়ে ফরাসি দূতাবাসে চলে যাচ্ছি।”

“আপনার লোকজন নিয়ে?” কড়া গলায় জিজ্ঞেস করলেন লর্ড রিভিংটন।

“তা তো বটেই। ঠাকুর চাকর ছাড়া আমার চলবে কী করে?” সামান্য একটু মাথা নুইয়ে বিদায় নিলেন মঁসিয়ে কালামি। যুদ্ধসচিব বিড়বিড় করে কিছু একটা বললেন, তার মধ্যে আমার যেন “ফাটের আর শেষ নেই” কথাটা কানে এল।

হোমস ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়েছিল অদ্ভুত চোখে, এবার কী যেন ভাবতে লাগল একমনে। লর্ড রিভিংটন অধৈর্য্য হলেন, “মিঃ হোমস, এখন কিন্তু আর চিন্তাভাবনার সময় নেই।”

“মার্জনা চাইছি, তবে প্ল্যান এক্স এখনই আপনি ফেরত পেয়ে যাবেন।”

“মানে? ওটা কোথায় আপনি জানেন?” যুদ্ধসচিবের গলায় বিস্ময়।

“সেটাই তো আসল সমস্যা, তাই না?”

হোমস একটা ঝিকে ডেকে বলল আমাদের মিঃ হানসের ঘরে নিয়ে যেতে। বিশাল বিশাল সিঁড়ি দিয়ে ওপরে উঠে গিয়ে পড়লাম একটা লম্বা প্যাসেজে। যেতে যেতে হোমস আমার কানের পাশে বিড়বিড় করে বলল, “ওয়াটসন, কয়েকটা জিনিস আমি এখনও বুঝতে পারছি না।”

ছেলেটা দেখলাম একটা সোফায় বসে আছে, একটা পায়ে বিরাট ব্যান্ডেজ। ছেলেটাকে বলতে গেলে খুবই সুন্দর দেখতে, চেহারাও চমৎকার, কিন্তু এখন তার মধ্যে একটা যন্ত্রণার ছাপ পড়েছে। জানলার গোবরাটে একটা বাটিতে একগাদা ফুল রাখা রয়েছে দেখে হোমস তার থেকে একটা তুলে নিল।

“একে বলে অটাম ক্রোকাস,” বলল সে, “চমৎকার দেখতে, কিন্তু খুব সাংঘাতিক ফুল।”

ছেলেটা চমকে উঠল দারুণভাবে, তারপর বলল, “ঈশ্বর জানেন, মিঃ হোমস, আমার কোনও ইচ্ছে...”

“আমি আপনার কথা বিশ্বাস করতে রাজি আছি, কিন্তু বিচারক আমি নই। আগে শুনুন আমি কী বলি, তারপর আপনি নিজেই দেখবেন এটা সত্যের কাছাকাছি কিভাবে যাচ্ছে।”

হোমস আমাদের দিকে ফিরল। “আপনারা খেয়াল করেছেন নিশ্চয়ই, হানসকে দেখতে খুবই সুন্দর, প্রায় নারীসুলভ কমনীয়তা আছে ওর মধ্যে। এই ধরণের লোকজনের ...খুবই দুর্ভাগ্যজনক ব্যাপার – সন্দেহজনক, এমনকি অপরাধ জগতের ব্যাপারস্যাপারের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার খুবই সম্ভাবনা থাকে। আমাদের রাজপরিবারের এরকম একটা কেলেংকারির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ার খবরও নিশ্চয়ই এখনও আপনাদের মনে আছে। ক্লিভল্যান্ড স্ট্রিটে পুরুষ বেশ্যালয়ে রাজপরিবারের লোকেদের যাতায়াতের খবরটা। এই অভ্যেসটা হানসেরও আছে এবং জার্মান গুপ্তচর বিভাগ খবরটা জানতে পেরে হানসকে ব্ল্যাকমেল করা শুরু করে। ফলে হানস বাধ্য হয় তার সৎ বাবার ড্রয়ার থেকে সমস্ত কাগজপত্র বের করে সেগুলো নকল করে তাদের হাতে তুলে দিতে। লর্ড রিভিংটন, আপনি যখন স্যার চার্লসকে এ ব্যাপারে প্রশ্ন করেন, তিনি বিলক্ষণ এর উত্তর জানতেন।”

তরুণ হানস হাত কচলাচ্ছিল। বলল, “ওরা বলেছিল সব ফাঁস করে দেবে। আমাকে জেলে যেতে হবে। আমার আর কী করার ছিল?”

“আপনার সব কিছু আপনার সৎ বাবাকে খুলে বলা উচিত ছিল,” রুক্ষ গলায় বলল হোমস। “এবার কাল রাত্তিরের ঘটনাটা বলছি। স্যার চার্লস আপনাকে তাঁর ঘরে ডাকেন। আমি জানি না উনি আপনাকে ঠিক কী বলেছিলেন, হয়তো আপনাকে বলেছিলেন অবশ্যই দেশ ছেড়ে চলে যেতে, কিন্তু আপনি তখন বেশ সাহসী হয়ে উঠেছিলেন। আপনার এ ব্যাপারে যথেষ্টই জ্ঞান আছে যে আপনার সৎ বাবা কলকিকাম ওষুধটা খান আর এটা ওই অটাম ক্রকাস থেকে খুব ভালভাবেই বানানো যায়। হয়তো আপনি তখনই এটা তৈরি করেন, অথবা এও হতে পারে যে জরুরি দরকার হতে পারে ভেবে আপনি ওটা আগেই বানিয়ে রেখেছিলেন। আপনি ওষুধের সঙ্গে এটা মিশিয়ে দেন।”

“আমি এটা করেছিলাম যাতে তাঁর ঘুম ভাল হয়, তার জন্য। শপথ করে বলছি, তাঁকে খুনের জন্য নয়।”

“আমারও মনে হয় না আপনি খুনের জন্য করেছিলেন। কিন্তু চিকিৎসাশাস্ত্রে অল্পবিদ্যা ভয়ংকরী হতে পারে জানেন তো? নাহলে তো আপনার কারবার ভালই চলছিল, কাগজ বার করে নকল করা আর আসলগুলো রেখে দিয়ে নকলগুলো ওদের হাতে তুলে দেওয়া। এবারে করলেন না কেন?”

“কী করে করব? আমাকেও তো ওষুধ খাওয়ানো হয়েছিল। আপনি যা বললেন সবই ঠিক, মিঃ হোমস, কিন্তু আমার ক্ষেত্রে কী হয়েছিল আপনি বলতে পারবেন কী? যখন বুঝলাম সৎ বাবা ঘুমিয়ে পড়েছেন, আমি তাঁর ড্রেসিংরুমে চলে যাই এবং ড্রয়ার খুলে প্ল্যান আর নথিগুলো বার করি। ড্রয়ারটা খোলা খুবই সোজা। আমি এর আগে বহুবার খুলেছি। আমি কাগজপত্রগুলো এ ঘরে এনেছিলাম সেগুলো নকল করে ড্রয়ারে রেখে, নকলগুলো পোস্ট করব বলে, কিন্তু তখন আমার চোখ এমন জড়িয়ে আসছিল যে হাতই চলছিল না। আমি কাগজগুলো সরিয়ে রেখে ঘুমিয়ে পড়ি এবং সকালে যখন আমাকে ডেকে তোলা হয়, আমি ভাল করে দাঁড়াতে পর্যন্ত পারছিলাম না। সেই কারণেই আমি পড়ে গিয়ে গোড়ালি ভাঙি।” হানস ব্যান্ডেজটা দেখাল। “তারপর ডাঃ কার্ডিউ আমাকে একটা ঘুমের ওষুধ দেন, ফলে আমি আজ সকাল দশটা অবধি ঘুমিয়েছি, আর আমাকে বলা হয়েছে নড়াচড়া না করতে।”

“কাগজগুলো তাহলে এখনও তোমার কাছে আছে?” চেঁচিয়ে উঠলেন লর্ড রিভিংটন, “তাহলে তোমার বাঁচার একটা সুযোগ আছে। কোথায় সেগুলো?”

“বুককেসে,” মুখ কালো করে বলল হানস, “ডানদিকের একদম ওপরের বইগুলোর পেছনে।”

লর্ড রিভিংটন ঝটিতি গেলেন বুককেসের সামনে, ওপরের তাক থেকে কিছু বই নামালেন, তারপর আরও কিছু, তারপর ঘুরে দাঁড়ালেন এদিকে, রাগে তাঁর মুখ লাল হয়ে গেছে। “কিচ্ছু নেই! ব্যাপারটা কী?”

“কিচ্ছু নেই?” আমি জীবনে কোনওদিন কাউকে এরকম ভয়ে কুঁকড়ে যেতে দেখিনি। “অসম্ভব!” লর্ড রিভিংটন তার দিকে শাসানির ভঙ্গিতে এগিয়ে আসতে সে আরও সিটিয়ে গেল।

“দাঁড়ান!” শার্লক হোমসের গলায় আদেশের সুর, “কিছু একট গন্ডগোল আছে, যেটা আমি এখনও ধরতে পারছি না।” সে ঘরে পায়চারি শুরু করে দিল এধার থেকে ওধারে, আমরা দেখছিলাম তাকে। “আপনি কি আমাকে ওই কার্ডটা পাঠিয়েছেন, যেটায় আমাকে চলে যেতে বলা হয়েছে? আমার অবশ্য মনে হয় না আপনি দিয়েছেন বলে, তাহলেও ওটা কিন্তু এ বাড়ির কেউই লিখেছে। আপনারা কি কাল রাত্তিরে সবাই একই খাবার খেয়েছেন?”

“মঁসিয়ে কালামি খাননি। তাঁর খাবার তাঁর বাবুর্চি বানায়।”

“তারপর?”

“আমার সৎ বাবা উঠে গেলেন। কফি দেওয়া হয়েছিল, কিন্তু কফি আমার সহ্য হয় না, আমি বরাবর এক কাপ চকোলেট খাই।”

“এক কাপ চকোলেট, বেশ। আর মঁসিয়ে কালামি কালকে খুব খুশি ছিলেন। আমি একটা গাধা, ওয়াটসন।”

“হোমস, কী বলছ বুঝতে পারছি না,” আমি বুঝতে পারছিলাম লর্ড রিভিংটনও আমার মতো হতবুদ্ধি হয়ে গেছেন।

“কার্ডটা, ওয়াটসন! কার্ডটা খেয়াল করা উচিত ছিল। ওখানে বানান ভুল আছে। ফরাসিরা ও বানানটা ভুল করে। কিন্তু আর এক মুহূর্তও দেরি করা যাবে

না, লোকটা চলে যাবে।”

“মঁসিয়ে কালামি?”

“না, তাঁর বাবুর্চি। ও-ই চকলেটের কাপে মাদক মিশিয়েছিল।”

বাবুর্চিকে পাওয়া গেল চাকরদের জন্য নির্দিষ্ট একটা শোওয়ার ঘরে, বাক্সপ্যাঁটরা গুছিয়ে বেরোনোর জন্য তৈরি হচ্ছিল। এবং তাকে দেখে মনে হল না যে সে আমাদের দেখে অবাক হয়েছে।

“এই যে, মঁসিয়ে হোমস, এসে গেছেন! এই আপনার জিনিস, যেটা আপনি খুঁজছেন।” দেখলাম বিছানার ওপর একটা লম্বাটে খাম রাখা। “এই সেই দুর্দান্ত প্ল্যান এক্স, আর অন্যান্য কাগজপত্র।”

“যেগুলো তুমি নকল করেছ।”

“বিলক্ষণ! এখন আর ব্রিটেন আর ফ্রান্সের মধ্যে গোপন করার কিছু নেই, সবকিছুই খোলামেলাভাবে করা যাবে।”

“তাহলে তুমিই আমাকে ওই পোস্টকার্ডটা পাঠিয়েছিলে।”

“আজ্ঞে! আমার বানানে একটু গন্ডগোল আছে, তবে কাজ চলে যায়, কী বলেন?”

“তুমিই চকোলেটে ড্রাগ মিশিয়েছ, তারপর নথিপত্রগুলো ঝেড়েছ।”

“যা করেছি, সবই আমার দেশ ফ্রান্সের জন্য। আমাকে ডাকা হয়েছিল মঁসিয়ে কালামির বাবুর্চি হিসেবে, কিন্তু দেখি আমার রান্না খেয়ে তাঁর উল্টে বদহজম হচ্ছে।” জিভ দিয়ে চুকচুক আওয়াজ করল লোকটা। “আমি অনুসন্ধান চালিয়ে শিগগিরই জানতে পারলাম যে আমাদের তরুণ হানসবাবু হলেন – আপনাদের অস্কার ওয়াইল্ড যা ছিলেন আরকি – আর যা কিছু হচ্ছে, সবকিছুর মূলে উনিই আছেন। আমি বুঝলাম চরম মুহূর্তটা ঘনিয়ে আসছে শিগরিরই, যখন মূল প্ল্যানটাই গাপ হয়ে যাওয়ার দারুণ সম্ভাবনা, তখন আমাকে হানসের জন্য একটু ঘুমের ব্যবস্থা করে প্ল্যান এক্স আর কাগজের ভার নিতে হল। কিছু ক্ষতি হয়নি, তবে স্যার চার্লসের ঘটনাটা দুঃখের, খুবই দুঃখের। অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা।”

বাবুর্চিটিকে দেখতে অদ্ভুত ধরণের – খুবই বেঁটেখাটো চেহারা, মাথাটা একেবারে ডিমের মতো। চুল কুচকুচে কালো, মাঝখানে সিঁথি করা, লম্বা আর সুচালো গোঁফ। পায়ে চকচকে পেটেন্ট লেদার জুতো। এক কথায় মনে হচ্ছিল যেন কোনও মিউজিকাল-কমেডিতে কোনও ফ্রেঞ্চম্যানকে দেখছি।

“তার মানে তুমি ফরাসি সরকারের এজেন্ট,” হোমসের গলা কঠোর।

“এই মুহূর্তে সেরকমই বটে, তবে আমি আপনার মতোই একজন প্রাইভেট ডিটেকটিভ। ব্রিটেনের সর্বশ্রেষ্ঠ গোয়েন্দার সঙ্গে যে আমার সাক্ষাত হল, এজন্য আমি নিজেকে ধন্য মনে করছি।”

হোমসের মুখে হাসি দেখা খুবই বিরল ঘটনা, তবে সেই বিরল ঘটনাই আজ ঘটতে দেখলাম। হাসল হোমস এবং প্রায় পরমুহূর্তেই সেই হাসি মিলিয়ে গেল লোকটার পরের কথাটা শুনে।

“আমি হলাম ইউরোপের সর্বশ্রেষ্ঠ ডিটেকটিভ। অধমের নাম...”

লেখাটা এখানেই শেষ হয়েছে, কাজেই বাবুর্চি সেজে থাকা লোকটার পরিচয় জানা যায়নি। স্যার চার্লসের মৃত্যু নিয়ে যে কেলেংকারিটা হয়েছিল সেটাও ধামাচাপা পড়ে গেল। হানস মালরেডি পরে পেশাদার নাট্যমঞ্চে একজন নারীচরিত্রাভিনেতা হিসেবে খুবই খ্যাতি অর্জন করে।

সকল অধ্যায়
১.
হারানো হিরের রহস্য
২.
কথোপকথন
৩.
পরিত্রাতা ওইলক
৪.
মোনালিসা রহস্য
৫.
শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্য
৬.
হোমসের ডায়রির কিছুটা
৭.
কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য
৮.
হাস্কারভিল গহ্বরের দুরন্ত কাহিনি
৯.
ভূতের পাল্লায় শার্লগ
১০.
দুর্ধর্ষ গোয়েন্দার দুর্ধর্ষ কীর্তি
১১.
সিলিং-এ পায়ের ছাপ
১২.
জোর বরাত, শিয়ার্লাক
১৩.
শেষ ছড়ের টান
১৪.
শার্লক হোমসের সঙ্গে এক রাত্রি
১৫.
আদম কোথায়? ইভ কোথায়?
১৬.
দি সাউথ সি স্যুপ কোম্পানি
১৭.
ডাউনিং স্ট্রিটে শার্লক হোমস
১৮.
মিঃ হেনেসির অন্তর্ধান রহস্য
১৯.
ইনস্পেকটর লেসট্রেডের গল্প
২০.
সোলার পোনস ও আশ্চর্য পোকা
২১.
শার্লক হোমসের সঙ্গে কী সত্যিই এরকুল পোয়ারোর দেখা হয়েছিল?
২২.
সুমাত্রার দানব ইঁদুর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%