অমিত দেবনাথ
কয়েক বছর আগে দক্ষিণ আমেরিকার জঙ্গলে “অজ্ঞাত জগৎ”-এর খোঁজে আমরা কয়েকজন যে বিস্ময়কর অভিযান চালিয়েছিলাম, সে সম্বন্ধে আমি আগেই লিখেছি। তার কিছুদিন পরে লিখেছিলাম আরও বিস্ময়কর একটা ঘটনা, যেখানে পৃথিবী ইথারে ভরা এক “বিষ বলয়”-এর মধ্যে দিয়ে গেছিল। তাই আমার মনে হয়েছে, আমাদের আরেকটা অভিযানের ঘটনাও এই ফাঁকে লিখে রাখা দরকার, কারণ এই ঘটনার খুঁটিনাটি এখনও আমার মনে টাটকা এবং এ ঘটনাও একই রকমের আশ্চর্য এবং রোমাঞ্চকর।
নোটবই ঘেঁটে দেখছি, দিনটা ছিল জুনের চোদ্দ তারিখ। সেদিন থেকেই এই অভিযানের শুরু বলা যায়। মিঃ ম্যাকআরডেল-এর অফিস থেকে সবে বেরিয়েছি... সেই সহৃদয় প্রবীণ মিঃ ম্যাকআরডেল, স্কটল্যান্ডের মানুষ, ডেইলি গেজেট-এর বহুদিনের সম্পাদক, অবসর নেবেন কিছুদিনের মধ্যেই, আর মালিকরা ভাবছেন সেই জায়গায় আমাকে বসাবেন। মিঃ ম্যাকআরডেল আমাকে কিছু পরামর্শ দিয়েছেন, যেগুলো পরবর্তীকালে আমার কাজে লাগবে, নিজের ছোট অফিসঘরখানায় বসে বসে সেগুলোই ভাবছিলাম, একটু পরেই বেরোব অফিস থেকে। অতীত ভবিষ্যতের নানারকম চিন্তায় মাথা যখন ভরপুর, ঠিক সেই সময় অফিস-বয় ঝড়ের বেগে ঘরে ঢুকল, তার ময়লা আঙুলের ফাঁকে একটা ভিজিটিং কার্ড।
“এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন, মিঃ ম্যালোন,” ঘোষণা করল সে দরজা খুলে।
আমি তখন বেরোনোর তাল করছি, কাজেই সাবধানী গলায় বললাম, “ঠিক জানো, আমার সঙ্গে? মিঃ ম্যাকআরডেলের সঙ্গে নয়?”
“উনি আপনার নামই করলেন, স্যার,” বলল সে।
“ঠিক আছে, পাঠিয়ে দাও,” আমি কার্ডটা দেখতে দেখতে বললাম। সেখানে লেখা রয়েছেঃ ডাঃ ওয়াটসন, যার তলায় স্পষ্ট অক্ষরে হাতে লেখাঃ মিঃ ম্যালোন, কিছুক্ষণ সময় দিলে ভাল হয়। কিছুই বুঝলাম না। এই ডাঃ ওয়াটসনই বা কে? কোন কোন ডাক্তারকে চিনি, খানিকক্ষণ ভাবলাম, বেশ কয়েকজন ওয়াটসনের নামও মনে এল... যাদের সঙ্গে আমার পরিচয় আছে, আর ঠিক সেই সময় সেই ছোকরার সঙ্গে ভেতরে ঢুকলেন এক ভদ্রলোক, সাদাসিধে মুখ, আর দেখেই মনে হচ্ছে তিনি ডাক্তার।
“কেমন আছেন, মিঃ ম্যালোন?” আমার দিকে তাকিয়ে বললেন ভদ্রলোক। গলা শুনে মনে হল তিনি কোনও কারণে খুবই চিন্তিত।
“শুভ সন্ধ্যা, ডাঃ ওয়াটসন,” আমি উত্তর দিলাম। “আপনার জন্য কী করতে পারি বলুন। আমার যদ্দুর মনে হচ্ছে, আপনার বোধহয় কোথাও ভুল হচ্ছে...।”
“বোধহয় না,” ঝটপট বললেন ভদ্রলোক, “মাফ করবেন, কিন্তু আপনি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের বন্ধু সেই মিঃ ম্যালোন তো?”
“বিলক্ষণ,” আমি বললাম, “তবে আমি তাঁর বন্ধু, এটা বলাটা বোধহয় একটু বাড়াবাড়ি হয়ে যায়।”
“ঠিক, ঠিক। মিঃ ম্যালোন,” তিনি সেই রকমই দ্রুতস্বরে বললেন, “আমি আপনার কাছে একটা সাহায্য চাই। প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে হবে। জীবন মরণের প্রশ্ন। আমি জানি উনি বা ওঁর স্ত্রী নতুন কোনও লোককে সাক্ষাৎকার দেন না, তাই আপনার কাছে সাহায্য চাইতে এসেছি।”
“কিন্তু ডাঃ ওয়াটসন,” আমি বললাম, “আমি যদি যাইও, তাহলেও উনি আপনার সঙ্গে দেখা করবেন কিনা সন্দেহ।”
“তিনি আপনার বন্ধু, আর আমিও এক বন্ধুর তরফেই তাঁর সঙ্গে দেখা করতে চাইছি... যে বন্ধুর নাম আপনি নিশ্চয়ই শুনে থাকবেন। তাঁর নাম মিঃ শার্লক হোমস।”
“দুঃখিত, শুনিনি,” আমি বললাম। “যাই হোক, বন্ধুত্বের কথা যখন বললেন, তখন আমি নিশ্চয়ই আপনাকে প্রফেসরের কাছে নিয়ে যাবো, যদিও তাতে কাজ হবে কিনা জানি না... সেখানে গিয়ে আপনি আপনার কী দরকার বলবেন। এর মধ্যে যেতে যেতে আমাকে ঘটনাটা বলতে পারেন।”
“মিঃ ম্যালোন,” একটা স্বস্তির নি:শ্বাস ফেলে বললেন ডাঃ ওয়াটসন, “আপনি সময় দিলে আমি সত্যিই কৃতজ্ঞ থাকব।”
“শুনুন,” আমি বললাম, “ভিক্টোরিয়া থেকে একটা ট্রেন আছে” কিন্তু তিনি তৎক্ষণাৎ বাধা দিলেন।
“আমার চল্লিশ হর্স-পাওয়ারের হাম্বার গাড়িটা বাইরে দাঁড়িয়ে আছে। ওটাতে গেলে আমরা ট্রেনের আগেই রদারফিল্ড-এ পৌঁছে যাব।”
“তাহলে তো হয়েই গেল,” আমি বললাম, “একটু অপেক্ষা করুন, আমি আমার সহকারীকে কয়েকটা কথা বলে আসি।”
আমার সহকারী হার্পারকে পেলাম প্যাসেজেই, পাইপ টানছিল। ওকে ঝটপট বললাম আমাকে জরুরি কাজে যেতে হচ্ছে। তারপর কোট আর টুপি পরে, কাঁধে কয়েকটা কম্বল চাপিয়েই ডাঃ ওয়াটসনের সঙ্গে তাঁর গাড়িতে গিয়ে উঠলাম। একজন ছিমছাম চেহারার শোফার, আমরা বসতেই গাড়ি চালিয়ে দিল, কোনও নির্দেশেরও অপেক্ষা করল না।
সবে রওনা হয়েছি, হঠাৎই শুনলাম আমার নাম ধরে কে যেন চিৎকার করছে পেছন থেকে। গলাটা আমার খুবই পরিচিত। ঘুরে তাকিয়ে দেখি একজন লম্বা ছিপছিপে চেহারার ভদ্রলোক... ধূসর টুইডের স্যুট পরা... আমাদের কয়েক গজ পেছনের একটা মোটরগাড়ি থেকে গলা বাড়িয়ে ডাকছেন। আরে, এ যে লর্ড জন রক্সটন!
“হ্যালো, ইয়ংম্যান,” চেঁচিয়ে বললেন তিনি। তাঁর পাশে বসে আছেন আরেকজন লম্বা মানুষ, যদিও তাঁর সঙ্গে লর্ড রক্সটনের কোনও সামঞ্জস্যই নেই। ভদ্রলোক বসে আছেন স্তব্ধ হয়ে, মনে হল গভীরভাবে কিছু ভাবছেন। তিনি বসে আছেন এতই স্থির হয়ে, যে তাঁকে জীবিত মানুষ বলে মনেই হচ্ছে না। শুধুমাত্র কপালের দু’পাশের শিরাগুলো দপদপ করা দেখেই বোঝা যাচ্ছিল তাঁর মধ্যে প্রাণের চিহ্ন আছে। আমি লর্ড রক্সটনের দিকে তাকিয়ে হাত নাড়তেই আচমকা লাফিয়ে উঠলেন আমার সঙ্গী, পেছনের গাড়িটার দিকে নির্দেশ করে বললেন, “আরে, হোমস! তুমি এখানে...”
“ভায়া ওয়াটসন,” ঠান্ডা গলায় বললেন লর্ড রক্সটনের গাড়ির সহযাত্রী ভদ্রলোক, “আমাদের যখন একই জায়গায় যেতে হবে, তখন ভাবলাম এক গাড়িতে যাওয়াই ভাল।” তারপর লর্ড জনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “আমরা ওদের সঙ্গেই যাব তো? আমার মনে হয় এই ট্যাক্সির চেয়ে ডাঃ ওয়াটসনের গাড়িতে গেলে অনেক তাড়াতাড়ি হবে।”
“বটেই তো,” বললেন লর্ড জন, “আর তাছাড়া, অধিকন্তু ন দোষায়।”
দুটো গাড়িই থেমে গেল। লর্ড জন তাঁদের ট্যাক্সির ভাড়া মিটিয়ে দিলেন, দুজনে এসে উঠলেন আমাদের গাড়িতে, আমাদের চারজনকে নিয়ে চল্লিশ অশ্বশক্তির গাড়িটা শোঁ শোঁ করে ছুটতে লাগল দক্ষিণ অভিমুখে।
উচ্ছসিত হয়ে পড়েছিলেন লর্ড জন রক্সটন। তাঁর মেজাজি সুরে নানা কথা বলার মাঝখানেই খেয়াল করলাম তাঁর সঙ্গী ভদ্রলোক আমার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছেন, এবার চমৎকার কিন্তু আবেগহীন স্বরে বললেন, “শুভ দিন, মিঃ ম্যালোন।”
“ভায়া হোমস,” বাধা দিয়ে বললেন তাঁর বন্ধু,“আমারই তোমার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দেওয়া উচিত ছিল... কিন্তু তুমি কী করে মিঃ ম্যালোনকে চিনলে জানি না... আমি যে ওঁর কাছে আসব, তাও তো তুমি জানতে না!”
“অসাধারণ!” বলে উঠলেন লর্ড রক্সটন,”সত্যিই আশ্চর্য!”
“এতে অসাধারণত্বের কিছুই নেই,” আমার দিকে তাকিয়ে বললেন হোমস, “আপনি নি:সন্দেহে একজন সাংবাদিক, কারণ আপনার পকেটে গোটা কয়েক নোটবই রয়েছে, একটা ওয়াটারম্যান আপনার ওয়েস্টকোটের পকেট থেকে উঁকি মারছে, আপনার ডান হাতের মধ্যমাটা বাঁদিকে একটু চাপ খেয়ে আছে... পরিস্কার বোঝাই যাচ্ছে কলম আর পেনসিলের ব্যবহারটা খুব বেশিই হয়, আপনার দৃষ্টিশক্তি ক্ষীণ, খুব বেশি পড়া বা লেখার ফল। তাছাড়াও, ডেইলি গেজেট কাগজের কপি যে শুধু আপনার কোটের পকেটেই গোঁজা আছে, তাই নয়, আপনার হাতে ঝোলানো কম্বলের ভাঁজের মধ্যেও ঢুকে রয়েছে... বোঝাই যাচ্ছে আপনি ওই কাগজেরই কর্মচারী। আবার এখন আমি আমার বন্ধু ডাঃ ওয়াটসনকে দেখতে পাচ্ছি আপনার সঙ্গে, যিনি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের ব্যাপারটা নিয়ে খুবই চিন্তিত, আর প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সাংবাদিক বন্ধু খুবই কম... সব মিলিয়ে আপনিই যে মিঃ ম্যালোন, এ তো যে কোনও শিশুও বলে দিতে পারবে।”
“আরিব্বাস!” বলে উঠলেন লর্ড জন, আর আমি যে কী বলব, ভেবেই পেলাম না।
“যাই হোক,” তাঁর বন্ধুর দিকে ঘুরে বললেন সেই অসাধারণ মানুষটি,“ভায়া ওয়াটসন, তুমি যে মিঃ ম্যালোনের কাছে এসেছ, তার জন্য তোমাকে ধন্যবাদ। একেবারে সঠিক কাজ হয়েছে। এই মুহূর্তে ইংল্যান্ডের যে দুজন মানুষ প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে দেখা করার সাহস রাখেন, মিঃ ম্যালোন তাঁদের মধ্যে একজন। আমি নিজেই ওঁর অফিসে গেছিলাম ওঁর সঙ্গে দেখা করার জন্য, কপাল জোরে ওখানে আমার সঙ্গে লর্ড জন রক্সটনের সঙ্গে দেখা হয়ে যায়। মিঃ ম্যালোনের বর্ণনা থেকে আমি তাঁকে একবারই চিনেছি।”
“বটেই তো,” বললেন আমার বন্ধু, “অসাধারণ ব্যাপার, কাউকে কোনও দিন না দেখেও তাকে একবারেই চিনে ফেলাটা।”
এবার আমি শার্লক হোমস এবং তাঁর বন্ধুর দিকে ফিরলাম, বললাম, “এবারে বোধহয় আপনারা ব্যাপারটা খুলে বলবেন। আর ধৈর্য রাখা যাচ্ছে না।”
“ঠিক বলেছ, ইয়ং ম্যান,” ধুয়ো ধরলেন লর্ড জন, “মশাইরা,এবার খুলে বলবেন কি?”
“জানতে তো চাইবেনই,” বললেন ডাঃ ওয়াটসন, “আর আমাদের যেতে এখনও অনেকটা সময় লাগবে, কাজেই বলেই ফেলা যাক। আপনারা নিশ্চয়ই জানেন, প্রফেসর চ্যালেঞ্জার নিখোঁজ হয়ে গেছেন।”
আমরা একেবারে চমকে উঠলাম।
“মানে? চেঁচিয়ে উঠলেন লর্ড জন। “তাঁর মতো একজন মানুষ,একটা সভ্য দেশ থেকে উধাও?” “অসম্ভব! হতেই পারে না!” আমি বললাম।
“তাঁর পুরোন শোফারের কাছ থেকেই আমি খবরটা পাই,” হোমস ঠাণ্ডা গলায় বললেন, “এবং তৎক্ষণাৎ কাজে নামি। আমি এর মধ্যেই কিছু তথ্য পেয়েছি;যেমন যে লোকটা প্রফেসরকে গুম করেছে বলে আমি সন্দেহ করছি, সে আকারে ছোটখাটো, চুলের রঙ সোনালি, আঙুলের নখ বড় বড়; এখন যথেষ্ট অসুবিধের মধ্যে আছে, আগে বেশ অভিজাত ছিল, এখন অবস্থা... সামাজিক বা নৈতিক... সব দিক দিয়েই পড়ে গেছে। আশা করছি ওকে খুব শিগগিরই ধরব, কিন্তু তার আগে প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের বাড়িটা একটু খুঁটিয়ে দেখা দরকার। সে কারনেই আমি আপনার খোঁজে গেছিলাম, লর্ড জন রক্সটনের যে দেখা পাব, ভাবতেই পারিনি, আর আমার বন্ধু ডাঃ ওয়াটসনও যে একই কাজে লেগেছেন, তাও জানা ছিল না।”
“হোমস,” উত্তেজনায় চেঁচিয়ে উঠলেন ডাঃ ওয়াটসন, “তোমার কাজের সঙ্গে আমি দীর্ঘদিন ধরে পরিচিত, তাও আমি ধরতে পারছি না তুমি এত কিছু জানলে কী করে। আমি চলে আসার পর কি নতুন কোনও তথ্য পেয়েছ?”
“একেবারেই না,” নির্বিকার গলায় বললেন আশ্চর্য মানুষটি। “তুমি যা জান, আমিও তাই জানি। যখন প্রফেসরের শোফার এসে এই খবরটা দিল, তখন তুমি আর আমি তো একই সঙ্গে বেকার স্ট্রিটে ছিলাম।”
“আশ্চর্য!সত্যিই আশ্চর্য!” বলে উঠলেন লর্ড জন।
“তাহলেও আমি মিঃ হোমসকে অনুরোধ করছি,” আমি বললাম, “দয়া করে যদি ব্যাপারটা বুঝিয়ে দেন।”
“খুবই সাধারণ ব্যাপার,” বললেন শার্লক হোমস। “অস্টিন যখন এল, তখনই বুঝেছি। অস্টিনের চেহারাটা খেয়াল করুন; মাঝারি উচ্চতা, বিরাট চেহারা নয়, কিন্তু গায়ে জোর আছে, আর একেবারেই আবেগহীন। এগুলো থেকে তো বোঝাই যায়, কিডন্যাপারের চেহারা ছোটখাটো...।”
“কী বলছ হোমস!” বলে উঠলেন ডাক্তার।
“হ্যাঁ রে বাবা!” বললেন তাঁর বন্ধু। “যদি সে লম্বা-চওড়া চেহারার হত, নিদেন পক্ষে মাঝারি উচ্চতা আর শক্তিরও হত, তাহলে নিশ্চয়ই অস্টিনের চোখে পড়ত এবং সে সেটা বলতও। অস্টিন কিছুই বলেনি, তাহলে নিশ্চয়ই কিডন্যাপারের চেহারা চোখে পড়ার মতো নয়। তাঁর চুলের রঙ আর অস্বাভাবিক লম্বা নখের ব্যাপারটা বুঝলাম অস্টিনের মাথার টুপি দেখে... আর টুপিটা ওর নিজেরও নয়, তোমার বোধহয় মনে আছে ওয়াটসন, আমি ওকে তক্ষুনি জিজ্ঞেসও করেছিলাম সেটা... ও বলল যে ওটা ওর মালিকের; যাই হোক, দেখলাম ওর টুপি প্রচুর লম্বা লম্বা লালচে চুলে ভর্তি, আর টানাহ্যাঁচড়ার দাগও আছে, যেগুলো আঙুলে লম্বা নখ থাকলেই হয়। এ ব্যাপারগুলো নিয়ে আমার একটা পুস্তিকা আছে, খুঁটিনাটিগুলো সেখানেই পাওয়া যাবে।”
“দারুণ!” বলে উঠলেন লর্ড জন রক্সটন।
“কিন্তু তার সামাজিক বা নৈতিক ব্যাপারটা আপনি ধরলেন কী করে?” আমি জিজ্ঞেস করলাম।
“একই রকমের সোজা, মিঃ ম্যালোন,” হাসলেন মিঃ হোমস, বললেন, “প্রথমত, কেউই প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের মতো একজন মানুষকে গুম করার সাহস দেখাবে না, যদি সে অন্য কোনও কাজ করে, কাজেই বোঝা যাচ্ছে তার অবস্থা এখন খুবই খারাপ। আবার, এত বড় একজন জিনিয়াসকে যে কিডন্যাপ করে, সে নিশ্চয়ই অনেক কিছু খোঁজখবর রাখে। সাধারণ অপরাধীরা কিডন্যাপ করে কোনও কোটিপতিকে, তারপর একটা বড়সড় মুক্তিপণ দাবি করে... কিন্তু কোনও বিজ্ঞানীকে করে না। সবশেষে বলি, এই লোকটা নিশ্চয়ই কোনও বদসঙ্গে পড়েছিল, না হলে এত বড় একটা ঝুঁকি নিত না। ...তাহলে দেখতেই পাচ্ছেন, ব্যাপারটা খুবই সহজ।”
“আপনি তো ইউক্লিডকেও হার মানিয়ে দিচ্ছেন মশাই,” জোর গলায় বললেন লর্ড জন, “কী বল, ইয়ংম্যান?”
“আমি যদ্দুর জানি,” আমি শ্বাস ছেড়ে বললাম, “ইউক্লিডের অনুমিতিগুলো ছিল সেই সব বিষয়ের ওপরেই, যেগুলো সবাই জানত, অন্তত জানা উচিত, আর মিঃ হোমস তো সম্পূর্ণ অজানা জিনিসকে এমনভাবে বলছেন, যেন সেগুলো চোখের সামনেই ঘটেছে।”
“খুবই নিখুঁত উপস্থাপনা,” বললেন ডাঃ ওয়াটসন, “কিন্তু আমরা বোধহয় এসে গেছি।”
আমাদের খানিকটা পেছনে, একটা বেড়ার ফাঁক দিয়ে দেখা যাচ্ছিল প্রফেসর চ্যালেঞ্জারের সেই বিখ্যাত (বা কুখ্যাত) নোটিসবোর্ডটা। গেট পেরিয়ে ভেতরে ঢুকে খানিকটা এগিয়েই দেখা যাচ্ছিল সেই পরিচিত লাল ইটের বাড়ি... একগাল হেসে যেন অভ্যর্থনা জানাচ্ছিল আমাদের, মানে, আমাদের মধ্যে দু’জনকে।
বাড়ির ভেতর ঢুকতেই দেখা হয়ে গেল ছোটখাটো চেহারার মিসেস চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে, বরাবরের মতোই ছিমছাম, রুচিশীল সেই চমৎকার মহিলা... কিন্তু দেখলাম কেঁদে কেঁদে তাঁর চোখদুটো লাল হয়ে গেছে, আর সারা মুখে উদ্বেগ আর বিষাদের ছায়া। অবশ্য যে পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে তিনি যাচ্ছেন, তাতে তো এটা হওয়ারই কথা। আমাকে এবং লর্ড জনকে দেখে তিনি যেন খুবই আশ্বস্ত হলেন।
“লর্ড জন! মিঃ ম্যালোন!” হর্ষ-বিষাদ মেশানো গলায় বললেন তিনি, “আপনারা এসেছেন! আমি তো সাহস পাচ্ছিলাম না আপনাদের খবর দিতে! কতটা ভরসা পেলাম আপনাদের দেখে, ভাবতে পারবেন না।”
“কোনও চিন্তা নেই, মাই ডিয়ার মিসেস চ্যালেঞ্জার,” উৎফুল্ল গলায় বললেন লর্ড জন রক্সটন। “আমি আর ম্যালোন তো আছিই, তার ওপর আমার এমন এক বন্ধুকে নিয়ে এলাম, যিনি প্রফেসর চ্যালেঞ্জারকে... আমি যে সময় একটা মোষ শিকার করব, তার অর্ধেক সময়ে খুঁজে বার করে দেবেন। ...এই যে আমার সেই বন্ধু মিঃ শার্লক হোমস, আর ইনি হলেন ডাঃ ওয়াটসন, আর ভদ্রমহোদয়গন, ইনি হলেন মিসেস চ্যালেঞ্জার।”
মিসেস চ্যালেঞ্জার খুবই কৃতজ্ঞচিত্তে তাঁদের সঙ্গে করমর্দন করলেন এবং ডাঃ ওয়াটসনকে অভ্যর্থনা জানালেন, কারণ আমি খেয়াল করলাম হোমস ঘরে নেই। ওয়াটসন তৎক্ষণাৎ ক্ষমা চাইলেন তাঁর বন্ধুর এ হেন আচরণের জন্য, বললেন হোমস নিশ্চয়ই রহস্যের কোনও সূত্র পেয়েছে। তারপর মিসেস চ্যালেঞ্জারের সঙ্গে আমরা ভেতরের ঘরে গেলাম, সেই ঘর, যেখানে আমরা স্মরণীয় কয়েক ঘন্টা কাটিয়েছিলাম, যখন পৃথিবী “বিষ বলয়”-এর ভেতর দিয়ে গেছিল।
মহিলা বললেন তাঁর স্বামীর অদৃশ্য হওয়ার ঘটনাটা, যেটা ঘটেছে গতকাল। প্রফেসর চ্যালেঞ্জার রোজকার মতোই ব্রেকফাস্ট করে তাঁর স্টাডিরুমে গেছিলেন। লাঞ্চের সময় অস্টিন গিয়ে দরজায় টোকা দেয়, কিন্তু কোনও সাড়া পায়নি। শেষ অবধি সে ভেতরে ঢুকে দেখে ভেতরে কেউ নেই। প্রফেসর কোথাও বেরোবেন বলে বলেনওনি এবং সত্যি বলতে, বাড়ির দরজা দিয়ে কেউ বাইরে যায়নি। বলতে বলতে মিসেস চ্যালেঞ্জার কান্নায় ভেঙে পড়লেন, আমরা তিনজন মিলে অনেক কষ্টে তাঁকে সামলালাম।
হঠাৎই দরজা খুলে ঘরে ঢুকলেন শার্লক হোমস, সতর্ক এবং তীক্ষ্ণ নজর মেলে সোজা চলে এলেন ডাঃ ওয়াটসনের কাছে।
“ওয়াটসন,” বললেন হোমস ঠান্ডা গলায়, কিন্তু শুনেই মনে হল তিনি উত্তেজনা দমন করার চেষ্টা করছেন। ‘জিমান’স ফেনোমেনন’ সম্বন্ধে কিছু জান? আমি বিজ্ঞান নিয়ে ডাবল করেছি – কিন্তু এই নতুন ধারণা সম্বন্ধে কিছুই জানি না।”
“ভায়া হোমস,” বললেন ওয়াটসন মুষড়ে পড়া গলায়, “এই কেসটায় জিমান ক্রিয়া জেনে তোমার কী লাভ হবে বুঝতে পারছি না। আরও ব্যাপার হল, আমার মতো একজন সামান্য চিকিৎসকের পক্ষে এ জিনিস বোঝা বা বোঝানো খুবই মুশকিল। তাও যতটুকু জানি বলছি। জিমানই প্রথম দেখিয়েছিলেন বর্ণালী বিশ্লেষণ করলে যে সমস্ত রঙ আর রেখা উন্মুক্ত হয়, সেগুলো অন্য কোনও শক্তিশালী মাধ্যমের... যেমন চৌম্বকক্ষেত্র... কাছে এলে বেঁকে যায়।”
“পেয়েছি তাহলে,” বলে উঠলেন হোমস, গলা শুনে মনে হল খুবই উত্তেজিত।
“কী বললেন?” চেঁচিয়ে উঠলেন মিসেস চ্যালেঞ্জার, “তার মানে আপনি ওর খোঁজ...।”
“প্রফেসর চ্যালেঞ্জার কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের মধ্যে ফিরে আসবেন,” আবার সেই আগেকার মতো আবেগহীন গলায় বললেন হোমস। “ভদ্রমহোদয়গণ, আমার সঙ্গে একটু প্রফেসরের স্টাডিরুমে চলুন। মাফ করবেন, ম্যাডাম।”
আমরা চারজনেই গেলাম সেই স্টাডিরুমে, যে ঘর আমার পরিচিত। আমরা সবাই অবাক হয়েছিলাম, হোমস ছাড়া। তিনি নির্বিকার, আগের মতোই। এখন তিনি বললেন, “প্রথমেই স্বীকার করে নিচ্ছি, এখানে আসার পথে আমি আপনাদের যা বলেছিলাম, সেগুলো সবই ভুল। যা যা বলেছিলাম, সেগুলো ভুল নয়, ভুল হয়েছিল আমার দৃষ্টিভঙ্গিতে। এতেই বোঝা যাচ্ছে, আগে থেকে কোনও ধারণা করে রাখলে বিপথে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং সেই জন্যই সেটা করা কখনোও উচিত নয়। যাই হোক, বলতে পেরে ভাল লাগছে যে এ ঘরে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গেই আমি ভুলটা ধরতে পেরেছিলাম।”
“ঘরে ঢুকেই তুমি ভুল ধরতে পেরে গেলে?” ডাঃ ওয়াটসন অবাক হয়ে তাকালেন তাঁর বন্ধুর দিকে।
“দেখুন,” প্রথমে সিলিং, পরে প্রফেসরের টেবিলে ডাই হয়ে জমে থাকা কাগজপত্রের স্তুপের দিকে দেখিয়ে বললেন হোমস, “সিলিং-এ ওই দাগগুলো পায়ের ছাপ। আর এই কাগজপত্রগুলো জুড়ে রয়েছে নানারকম আঁকিবুঁকি আর লেখা, সেগুলো সবই জিমান ক্রিয়ার ওপরে। এটা দেখুন,” তিনি দেওয়ালের সঙ্গে আটকানো একটা বাক্স দেখিয়ে বললেন, “এখানে রয়েছে একটা ইলেকট্রিক সুইচ, যেটা ল্যাবরেটরির একটা বৈদ্যুতিক-চুম্বকের সঙ্গে যুক্ত। দেখুন, এটা কিন্তু চালু রয়েছে, মানে বিদ্যুৎ-প্রবাহ চলছে। খোঁজখবর নিয়ে আরও জানতে পারলাম, কোম্পানির লোক শেষ যেদিন এসেছিল (সেটা সম্ভবত গতকাল), তখন থেকেই এটা চলছে। এতে যে পরিমাণ বিদ্যুৎ-প্রবাহ চলছে, সেটা ঘন্টায় ২০০০০ কিলোওয়াটের কম না, আর ওয়াটসন যখনই আমাকে জিমান ক্রিয়া বুঝিয়ে দিল, তখনই হারানো যোগসূত্রটা খুঁজে পেলাম ...আর দেখুন, এক্ষুনি প্রফেসর চ্যালেঞ্জার ফিরে আসবেন।”
শার্লক হোমস কী যে বোঝালেন, কিছুই না বুঝতে পেরে হাঁ করে তাকিয়ে রইলাম, শুধু আমি নয়, আমরা তিনজনেই। আমি কিছু একটা জিজ্ঞেস করতে যাচ্ছিলাম, আর সেই ফাঁকে শার্লক হোমস এগিয়ে গিয়ে সুইচটা বন্ধ করে দিলেন। হঠাৎই একেবারে নিস্তব্ধ হয়ে গেল ঘর। আমরা সবাই হতভম্ব হয়ে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছি, আচমকাই... যেন বাতাস থেকেই সিলিং-এর জায়গাটায় আবির্ভাব হল এক বিশাল অবয়বের।
হোমসই প্রথমে কাজে নামলেন, এক লাফে আঁকড়ে ধরলেন
ছায়ামূর্তিটাকে, ধরার সঙ্গে সঙ্গেই বিকট এক চিৎকার ভেসে এল সেখান থেকে। উত্তেজনায় আমার দম বন্ধ হয়ে আসছিল, তার মধ্যেই দেখলাম, ছায়াছায়াভাবে ভেসে উঠছে একটা কালো দাড়ি, একটা বিশাল মাথা, বিশাল চওড়া কপাল, কুচকুচে কালো একরাশ চুল, তারপর দেখা গেল দুটো পরিস্কার ধূসর চোখ, উদ্ধত চোখের পাতা, তারপর হঠাৎই চিনতে পারলাম হারানো মানুষটাকে। হোমস চিতাবাঘের ক্ষিপ্রতায় মানুষটার হাত ধরে টেনে এনে দু’পায়ে দাঁড় করিয়ে দিল।
“অ্যাই! কী হচ্ছে কী এখানে? এই যে, ইয়ং ফ্রেন্ড, কী ব্যাপার?”
আহা! কানে যেন মধু ঝরল সেই সুপরিচিত বচন শুনে!
“এই যে! হের প্রফেসর!” চেঁচিয়ে উঠলেন লর্ড জন।
“হ্যাঁ, সেই প্রফেসর,” সে কী বাজ ডাকা গলা প্রফেসরের! হঠাৎই তাঁর চোখ পড়ল বাকি দুজনের ওপর। “কী ব্যাপার? এরা কারা? বাড়িতে ঢুকল কী করে?”
“ডিয়ার প্রফেসর চ্যালেঞ্জার,” আমি তাঁকে শান্ত করার চেষ্টা করলাম, “এই দুই ভদ্রলোক আমার আর লর্ড জনের সঙ্গে এসেছেন, আর এঁরাই এইমাত্র আপনার উধাও হওয়ার রহস্যভেদ করেছেন।”
“আমার উধাও হওয়া! তার মানে?” গর্জন করলেন প্রফেসর
“আমি আবার কী উধাও হব? আমি তো একটা পরীক্ষা চালাচ্ছিলাম! ব্যাপারটা কী, অ্যাঁ? এই যে, আপনি! আমার কথার উত্তর দিন!” তিনি আঙুল তুললেন শার্লক হোমসের দিকে।
আমাদের আশ্চর্য মানুষটি প্রফেসরের দিকে তাকালেন শান্ত চোখে। “প্রফেসর, আজ কত তারিখ বলতে পারবেন কি?”
“কত তারিখ? আজ কত তারিখ জিজ্ঞেস করছেন আমাকে?” গমগমে গলায় বললেন বিজ্ঞানী। “বলছি... আজ হল জুনের তেরো তারিখ। সময়টাও বলে দিচ্ছি” ...বলেই ঘড়িটা দেখে বললেন, “এখন বাজে বিকেল তিনটে পঁয়ত্রিশ।”
“ভুল বললেন স্যার,” বললেন হোমস, “একেবারেই ভুল। অবশ্য যে অভিযান আপনি চালিয়ে এলেন, তাতে এটা স্বাভাবিক। আজ তেরো নয়, চোদ্দ। আপনি আমাদের জগত থেকে সাতাশ ঘন্টারও বেশি সময় হারিয়ে গেছিলেন।”
“অসাধারণ!” বিড়বিড় করলেন লর্ড জন রক্সটন।
“অবিশ্বাস্য!” না বলে পারলাম না।
“একটু বুঝিয়ে বললে ভাল হয় মশাই, আমার তীক্ষ্ণবুদ্ধিতেও থই পাচ্ছি না,” প্রফেসরের গলাটা একটু নরম হয়েছে দেখলাম।
“খুব সহজ ব্যাপার,” বললেন শার্লক হোমস। “গতকাল সকালে আপনি আপনার স্টাডিরুমে এসে জিমান ক্রিয়ার ওপর পরীক্ষা শুরু করেন। আপনি অতি শক্তিশালী একটা বৈদ্যুতিক-চুম্বকের মধ্যে দিয়ে বিদ্যুৎ প্রবাহিত করেন, আপনার মতো একজন বিশাল চেহারার মানুষের শরীরে যে বিপুল পরিমাণ লৌহ রয়েছে, সেটা সম্পূর্ণ ভুলে গিয়েই, অথবা এর ফলে যে মারাত্মক চৌম্বকীয়-ক্ষেত্র তৈরি হবে, তা শরীর কতটা নিতে পারবে, খেয়াল না করেই। সংক্ষেপে, এটা আপনার শরীরের ওপর যে সাংঘাতিক প্রভাব ফেলেছিল, তার ফলেই আপনি... অবশ্যই অবচেতনভাবে... শূন্যে অথবা ইথারে মিলিয়ে গেছিলেন। ওই যে আপনার যাওয়ার চিহ্ন,” বলে তিনি নির্দেশ করলেন সিলিং-এর ওপর সেই পায়ের ছাপগুলোর ওপর।
“দেখতেই পাচ্ছ, ওয়াটসন, ব্যাপারটা খুবই সাদামাটা... আচ্ছা, ভদ্রমহোদয়গণ, চলুন এবারে মিসেস চ্যালেঞ্জারের কাছে ফেরা যাক।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন