শেষ ছড়ের টান

অমিত দেবনাথ

যে ঘটনাটা আমি এখন জনসমক্ষে আনতে চলেছি, তার কোনও কৈফিয়ত আমি দেব না, কারণ এই একবারই আমি দেখেছিলাম আমার বিখ্যাত বন্ধু হোমলক শিয়ার্স একটা কেস নিয়ে ফ্যাসাদে পড়েছিল।

এক বৃষ্টিভেজা বিকেলে আমরা বসে আছি আমাদের বেকার স্ট্রিটের ঘরে, আমার হাতে কাগজ পেনসিল, চেষ্টা করছিলাম কিছু পুরোন ঘটনা লেখার, আর শিয়ার্স নীল ধোঁয়ার কুণ্ডলীর মধ্যে ডুবে বেহালা বাজাচ্ছিল, এমন সময় এক মহিলা ঘরে ঢুকলেন।

মহিলা লম্বা, তবে মাঝারি উচ্চতার; মাথায় ঘন তবে হালকা চুল; একটা মুখ আর দুটো চোখ আছে; পরনে বর্ষাতি, ফেস-পাউডার, চিন্তিত চাহনি। মহিলা দরজা থেকে প্রায় দৌড়ে এলেন আমার দিকে।

আমি পাশ কাটালাম। বেশ অসুবিধের হল যদিও, কারণ সেই মাইওয়াল্ড-এর যুদ্ধে গিয়ে আমি যে আহত হয়েছিলাম, সেটা এখনও আমাকে ভোগায়, একটা আড়ালে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম তিনি কী চান?

“খুন হয়েছে,” মহিলা হাঁপাতে হাঁপাতে বললেন, “মিঃ হোমলক শিয়ার্স কোথায়? দেখতে পাচ্ছি না যে?”

আমি নি:শব্দে দেখিয়ে দিলাম ধোঁয়ার কুণ্ডলীটা, যেখান থেকে ভেসে আসছিল মেন্ডেলসন-এর “লিডার”-এর সুর। প্রতিটি সুরই এমনভাবে বাজাচ্ছিল শিয়ার্স যাতে মেন্ডেলসন নিজে এলেও তাঁর নিজের সুর চিনতে না পারেন।

“ওর ভেতরে আছে,” আমি বুক ফুলিয়ে বললাম।

“আমার সঙ্গে কথা বলবেন কি?”

আমি এগিয়ে গিয়ে ধোঁয়ার মেঘ-কুন্ডলীর প্রান্তে টোকা মারলাম।

“এক মহিলা দেখা করতে এসেছেন, শিয়ার্স।”

মেন্ডেলসন-এর “লিডার-এর সুর ...যদি এখনও সেটাকে লিডার বলা যায়... সঙ্গে সঙ্গেই পাল্টে গেল “আমি কাউকেই ভালবাসি না”-এর সুরে; বাজানো হতে লাগল ছড়ের পেছন এবং জামার আস্তিনের একটা বোতাম দিয়ে; ধোঁয়ার আস্তরণ সরে গেল; হোমলক শিয়ার্স আবির্ভূত হল আমাদের চোখের সামনে।

আমার এই অতি পরিচিত বন্ধুটিকে সবাই চেনেন, কাজেই তার চেহারার সামান্যতম বর্ণনা দেওয়ারও কোনও মানে হয় না। তার উচ্চতা, তার কৃশতা, তার লম্বাটে আঙুল, তার তীক্ষ্ণ চোখ, এসবের সঙ্গে প্রত্যেকেই পরিচিত। আমি তার বাজপাখির মতো বাঁকানো নাকের কথা পাঠকদের মনে করিয়ে দিতে চাই না, যে নাক তাকে এত সতর্ক করে দিয়েছে। একইরকমভাবে বাদ দিতে চাই তার থুতনি আর হাতের কথা, যে হাত রসায়নে রঞ্জিত, নিকোটিনে চর্চিত আর হাইপোডারমিক সিরিঞ্জের ফুটোয় ক্ষতবিক্ষত। এসব বর্ণনা দেওয়ার কোনও দরকার আছে বলে আমি মনে করি না। ওই যাঃ, কথায় কথায় দিয়েই ফেললাম!

“আপনি বিবাহিত,” হঠাৎই বলে উঠল আমার সঙ্গী, মহিলার বাঁ হাতের দিকে তাকিয়ে। “আজ বিকেলে ফেস পাউডার মেখেছেন।”

“জানলেন কী করে?” আচমকা এই মন্তব্যে কেমন যেন থতমত খেয়ে পিছিয়ে গেলেন মহিলা, আর আমি, যে আমি শিয়ার্সের অতিমানবিক পর্যবেক্ষণ, বর্জন এবং সিদ্ধান্তগ্রহণের সঙ্গে পরিচিত, সেই আমি পর্যন্ত চমকে গেলাম।

“এখন বলুন, কী দরকার?” বলল শিয়ার্স, “সংক্ষেপে সারবেন, মাত্র দুপাতা বরাদ্দ আছে আমার জন্য।”

“আমার বাড়িতে... দক্ষিণ লন্ডনে... একটা খুন হয়েছে। তেমন কিছু গুরুতর নয় অবশ্য; খুন হয়েছে আমার স্বামী; তবে ব্যাপারটাতে আমার আগ্রহ হল, তাই...বুঝতেই পারছেন...।”

“এক মিনিট। স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড নিশ্চয়ই সেখানে গেছিল, এবং কোনও তথ্য বা সূত্র না পেয়ে ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছে?”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, ওরা এসেছিল, যা যা করার করে চলেও গেছে। তবে ব্যাপারটা খুব অদ্ভুত। খুন একটা হয়েছে বটে, কিন্তু খুনিকেও পাওয়া যায়নি, লাশটাও পাওয়া যায়নি। এরকম একটা সামান্য ব্যাপারে আপনাকে বিরক্ত করছি বলে খুবই দুঃখিত।”

“বড় মনের কাছে কোনও কিছুই ছোট নয়। আমি এক্ষুনি আসছি।” তার চোখ মহিলাকে একঝলক নজর করল, “বাইরে বৃষ্টি হচ্ছে।” এমনভাবে বলল যেন এটা পৃথিবীর সবচেয়ে সাধারণ কথা।

“দারুণ!” আমি বলে উঠলাম, মহিলা অবাক হয়ে তার দিকে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন। একটা ছোট্ট ঘটনা, কিন্তু তা দিয়েই এই মহান গোয়েন্দার আশ্চর্য বিশ্লেষণ ক্ষমতার পরিচয় পাওয়া যায়। অন্যান্য সাধারণ লোক যেখানে জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখত, সেখানে ও একঝলক মহিলার বর্ষাতি থেকে চোঁয়ানো জল আর ভেজা ছাতা দেখেই এটা বলে দিল।

আধ ঘন্টার মধ্যেই আমরা পৌঁছে গেলাম সেই বাড়িতে, যেখানে হয়েছে সেই কাপুরুষোচিত খুনটা। শিয়ার্সকে যে শুধু খুনিকেই খুঁজে বার করতে হবে, তাই নয়, লাশটাকেও খুঁজে বার করতে হবে। সে ঢুকেই ব্যস্ত হয়ে পড়ল। একটা পকেট লেন্স বার করে বাইরের রাস্তা দেখল, ভেতরের গলি দেখল, সামনের বসার ঘরের আস্পিডিস্ট্রা গাছটা, মানে যা যা ওর পরীক্ষা করার দরকার মনে হল, সবই করল – তার মধ্যে আমাকেও দেখল দুবার – সারাক্ষণ নিজের মনেই বলে গেল ক্রেমোনা বেহালার কথা, আর চাপা স্বরে চিৎকার করতে লাগল মাঝে মাঝেই, নিজেকে চাগানোর জন্য।

“একশো চোদ্দ রকমের চুরুট আর সিগারেটের ছাই আছে, বুঝলে ওয়াটনট,” সে বলল, “আমি এই বিষয়ে একটা মনোগ্রাফ লিখেছি। এই ছাইটা হচ্ছে ত্রিচিনোপল্লি চুরুটের ছাই...না, হচ্ছে না,” সে থেমে গেল হঠাৎই। বলল, “এটা অবশ্য ওসব কিছু না। আর এটা যে কি, আমি আদৌ জানি না। আচ্ছা, সবাই খালি ত্রিচিনোপল্লি চুরুটই খায় কেন?” তার গলায় বিরক্তির সুর। “বরাবরই অবশ্য সবাই খেয়ে আসছে দেখে আসছি।”

তবে শুধু এই ছাইয়ের রহস্যটার সমাধান করতে গিয়ে টাল খেলেও তার আশ্চর্য বুদ্ধির জোরে সে দশ মিনিটের মধ্যেই এই খুনের একটা থিওরি খাড়া করে ফেলল। আমাদের আপ্যায়নকর্ত্রীকে ডেকে আনল ঘরে, বলল, “খুবই সোজা ব্যাপার। তিনজন লোক মিলে খুনটা করেছে; একজনের ডান চোখ ট্যারা, একজনের বাঁ চোখ ট্যারা, আরেকজনের কোনও চোখই ট্যারা নয়। তিনজনের মধ্যে একজন ত্রিচিনো ...না, এমনি চুরুট খায়... আর কোনও একটা জিনিস কেনার সময় এক শিলিং এগারো পেন্স তিন ফার্দিং কম পড়েছিল। ওরা সাইকেল চালিয়ে লাশ রেইগেট-এর দিকে নিয়ে গেছে।”

“দারুণ, শিয়ার্স,” আমি বললাম।

“দারুণের কিছু নেই, ওয়াটনট, খুবই প্রাথমিক ব্যাপার এগুলো। হাইপোডারমিক সিরিঞ্জটা দাও।”

“কিন্তু যাই বল, তুমি আমাকে অবাক করে দিয়েছ। কী করে...।”

“দু’একটা পয়েন্ট নিয়ে ঘাঁটলেই দেখবে এ একেবারেই সোজা ব্যাপার। শোন। আমাদের এখানকার আপ্যায়নকর্ত্রী কী বলেছিলেন? একটা খুন হয়েছে। তার মানে খুন যে হয়েছে, সে ব্যাপারে নিশ্চিত হওয়া গেল। কোনও লাশ পাওয়া যায়নি। তার মানে লাশ পাচার করা হয়েছে। ভাল কথা। কিন্তু প্রশ্ন হল, কে পাচার করল, আর কিভাবে করল? উত্তর হল, ওই তিনজন খুনি তাদের বাইসাইকেলে চাপিয়ে লাশ পাচার করল। রেইগেট রোডে গিয়ে দেখ তিনখানা বাইসাইকেলের চাকার দাগ আছে। আরও দেখ,” সে আঙুল তুলে জোর দিয়ে বলল, “দাগগুলো পরস্পর সমান্তরাল। এটা সম্ভব হয়েছে, কারণ ওরা একটা মরে কাঠ হয়ে যাওয়া লাশ আড়াআড়িভাবে তাদের হ্যান্ডেল বারে চাপিয়ে চালিয়েছে। আমি এর মধ্যেই আমার বেকার স্ট্রিটের ছন্নছাড়া ছেলের দলকে খবর পাঠিয়ে এদের অনুসরণ করতে বলেছি, আর বলেছি, ওদের জানাতে যে ওদের টেলিফোনে খোঁজা হচ্ছে। ছোট্ট কায়দা, কিন্তু এতেই ওরা ঘাবড়ে যাবে, কাজেই আশা করছি আধ ঘন্টার মধ্যেই ওদের হাতে হাতকড়া পরিয়ে হাজির করানো যাবে।”

“দারুণ! কিন্তু,” আমি বিড়বিড় করে বললাম, “ট্যারা চোখের ব্যাপারটা!”

“একেবারেই প্রাথমিক ব্যাপার, ওয়াটনট। যে দু’জন লোক দু’পাশে ছিল, তারা নির্ঘাত পরস্পরের দিকে ট্যারা, না হলে এ কাজ ঠিকমতো করতে পারত না। আর তখন যদি নাও হয়, তাহলে এখন হয়েছে। আর এক শিলিং এগারো পেন্স তিন ফার্দিং দিয়ে জিনিস কেনার ব্যাপারটা? ওটা বুঝেছি চুরুটের ছাই দেখে। যে লোকটা চুরুট খাচ্ছিল, ওটা ওকে দেওয়া হয়েছিল খুচরো ফারদিং ছিল না, তার বদলে।”

হঠাৎ থেমে গেল শিয়ার্স, কারণ বাইরে একটা গলা শোনা গেছে। আমাদের আপ্যায়নকর্ত্রী দৌড়ে চলে এসেছেন দরজার কাছে।

লাফিয়ে উঠল শিয়ার্স।

“কী হল?” জিজ্ঞেস করল সে।

“জয় ভগবান! আর চিন্তা নেই,” চেঁচিয়ে উঠলেন মহিলা, “আমার স্বামী মরেননি, খুন হননি, কিছুই হননি। তিনি এইমাত্র ফিরে এসেছেন। তিনি ট্রাইসাইকেলে চড়ে বেড়াতে গেছিলেন।”

রাগে শিয়ার্সের মুখ থমথম করতে লাগল। পাইপ ধরিয়ে সে উধাও হয়ে গেল নীলচে ধোঁয়ার মেঘের মধ্যে, সাথে নিয়ে গেল তার হাইপোডারমিক সিরিঞ্জ আর সাধের বেহালাটা, যাতে এখনও শোনা যাচ্ছিল তার শেষ ছড়ের টান...।

সকল অধ্যায়
১.
হারানো হিরের রহস্য
২.
কথোপকথন
৩.
পরিত্রাতা ওইলক
৪.
মোনালিসা রহস্য
৫.
শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্য
৬.
হোমসের ডায়রির কিছুটা
৭.
কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য
৮.
হাস্কারভিল গহ্বরের দুরন্ত কাহিনি
৯.
ভূতের পাল্লায় শার্লগ
১০.
দুর্ধর্ষ গোয়েন্দার দুর্ধর্ষ কীর্তি
১১.
সিলিং-এ পায়ের ছাপ
১২.
জোর বরাত, শিয়ার্লাক
১৩.
শেষ ছড়ের টান
১৪.
শার্লক হোমসের সঙ্গে এক রাত্রি
১৫.
আদম কোথায়? ইভ কোথায়?
১৬.
দি সাউথ সি স্যুপ কোম্পানি
১৭.
ডাউনিং স্ট্রিটে শার্লক হোমস
১৮.
মিঃ হেনেসির অন্তর্ধান রহস্য
১৯.
ইনস্পেকটর লেসট্রেডের গল্প
২০.
সোলার পোনস ও আশ্চর্য পোকা
২১.
শার্লক হোমসের সঙ্গে কী সত্যিই এরকুল পোয়ারোর দেখা হয়েছিল?
২২.
সুমাত্রার দানব ইঁদুর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%