মিঃ হেনেসির অন্তর্ধান রহস্য

অমিত দেবনাথ

আমার বন্ধু শার্লক হোমসের বিভিন্ন কীর্তিকলাপ আমি যেভাবে দীর্ঘদিন ধরে লিপিবদ্ধ করেছি, এবং জনসাধারণ যেরকম আগ্রহের সঙ্গে সেগুলো পাঠ করেছেন, তাতে আমি কৃতজ্ঞ। তাঁরা আমাকে ক্রমাগত উৎসাহ জুগিয়েছেন যাতে আমি এ ধরণের ঘটনাবলী আরও বেশি পরিমাণে লিপিবদ্ধ করি। এখনও আমার এই অতি বিখ্যাত বন্ধুটির বহু ঘটনা আছে, যেগুলো জনসমক্ষে আনা হয়নি। কিন্তু যে সব তদন্তের ক্ষেত্রে আমিও তার সঙ্গে ছিলাম, তার মধ্যে থেকে কোনটা রাখব, আর কোনটা ছাড়ব, এর বাছাই করা খুবই মুশকিলের ব্যাপার।

আমি রেকর্ড ঘেঁটে দেখছি, এর মধ্যে বহু ঘটনাই আছে, যেগুলোর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আমাদের জাতীয় স্বার্থ, এমনকি অনেক ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক স্বার্থও জড়িত, কিন্তু সেগুলো এখনও সর্বসমক্ষে প্রকাশ করার সময় আসেনি। আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রের উদাহরণ হিসেবে প্যারাগুয়ের সাম্প্রতিক সরকার বদলের ঘটনাটা ধরা যায়। আবার, একটা আস্ত মোটরবাস উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনাটা সাধারণ জনমানসে খুবই আগ্রহ জাগিয়ে তুলবে ঠিকই, কিন্তু আমি এও জানি যে এটা নিয়ে লিখতে গেলে আমার বন্ধুই প্রথমে বাধা দেবে, বলবে ঘটনাটায় অনেক ফাঁক থেকে গেছিল।

ওর কার্যকলাপ যখন লিপিবদ্ধ করি, তখন আমার প্রথমেই নজর থাকে সেই সব ঘটনাগুলোর দিকে, যেগুলোর অদ্ভুত বৈশিষ্টের জন্য আমার বন্ধু তার আশ্চর্য মস্তিষ্কটাকে খেলানোর প্রচুর সুযোগ পেয়েছিল। এগুলোর মধ্যে সেই উল্কি আঁকা বাগানের মালিক বা আলো-জ্বলা চুরুট বাক্সের ঘটনাগুলো খুবই আশ্চর্যের বটে, কিন্তু বছর পাঁচেক আগের এক সেপ্টেম্বরে মিঃ নাথানিয়েল সুইদিনব্যাংকের অদৃশ্য হওয়ার ঘটনাটাই সম্ভবত সবচেয়ে কৌতুহলজনক, যেখানে আমার বন্ধু তার আশ্চর্য মস্তিস্ক সঞ্চালন করে এই রহস্যের সমাধান করে।

শার্লক হোমসের কাছে একজন মক্কেল সবসময়েই একজন মক্কেল, সে সমাজের কোন তলার বাসিন্দা, এসবের তোয়াক্কা সে কখনোই করে না। কাজেই, এক বিকেলে যখন আমরা বেকার স্ট্রিটের ঘরে ফায়ারপ্লেসের সামনে বসেছিলাম – সারা দিনটা রোদ্দুর থাকলেও বিকেল হতে না হতেই ঠান্ডা পড়তে শুরু করেছে – এবং যখন সে বলল যে একজন ঝি আসবে তার সঙ্গে দেখা করতে, যে কিনা দক্ষিণ মিডল্যান্ডসে এক সন্তানহীন দম্পতির বাড়িতে কাজ করে, তখন আমি মোটেই অবাক হলাম না। “এর আগে যে কাউন্টেসের সঙ্গে দেখা করলাম,” সে বলল, “তিনি তো সত্যি কথা মোটে বলছিলেনই না, অথচ তাঁর কেসটা একেবারে সোজা। আশা করি মিসেস জন হেনেসি সেরকম কিছু করবেন না।”

“ও, তাহলে তোমার সঙ্গে মহিলার আগেই দেখা হয়েছে?”

“না। কিন্তু চিঠি পেয়েছিলাম তো, ওতে অনেক কিছু বোঝা যায়। মানুষকে বুঝতে গেলে করমর্দনের চেয়ে হাতের লেখা অনেক ভাল। ওই ম্যান্টলপিসের ওপরেই রাখা আছে মিসেস হেনেসির চিঠিটা। তুমি যদি ভাল করে খেয়াল কর তো দেখবে ওঁর ‘জে’ আর ‘ডব্লু’ লেখাটা অন্যরকম। এর থেকেই বোঝা যায়, তিনি অন্যধরণের মহিলা। ওই যে শোন, বেল বাজছে, আমার যদি ভুল না হয়, তবে কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই আমরা জানতে পারব গাইসবরো সেন্ট মার্টিন কুটিরের মিসেস হেনেসি কেন শার্লক হোমসের সঙ্গে দেখা করতে এলেন।”

কয়েক মিনিটের মধ্যেই আমাদের বিশ্বস্ত বাড়িওয়ালি মিসেস হাডসন যাকে নিয়ে ঘরে ঢুকলেন, তাঁকে দেখে অবশ্য সেরকম কিছুই মনে হল না, হোমস যেরকম বলেছিল। মহিলার বেশ বয়স হয়েছে, আর তাঁর মাথার ঘোমটা থেকে শুরু করে পায়ের ইলাস্টিক-বুট পর্যন্ত সব কিছুই মনে করিয়ে দেয় এধরণের অজস্র পুরোন ধাঁচের চাকরানি শ্রেনির কথা, যারা যে কোনও বসন্তের সকালে লন্ডনের অজস্র অফিস ঘরের সামনের কাচ-টাচগুলো মোছামুছি করে। মহিলা কথা বলার সময় অতিরিক্ত যত্ন নিচ্ছেন খেয়াল করলাম। এধরণের বাড়িতে যারা কাজ করে, তাদের অবশ্য এরকমভাবে কথা বলা অভ্যেস করতেই হয়। মহিলার কথাবার্তার মধ্যে এমন একটা গোছানো ব্যাপার ছিল, যা শুনলে মনে হতেই পারে মহিলা খুব গুছিয়ে কথাবার্তা বলেন এবং এটাও খেয়াল করলাম তাঁর মধ্যে কিছু শিক্ষাদীক্ষার ছাপ আছে।

“আপনার কথা আমি পড়েছি, মিঃ হোমস,” বললেন মহিলা, “যখনই আমাদের ওখানে গন্ডগোল শুরু হল, আমি তখনই ভেবেছি, সারা ইংল্যান্ডে যদি কেউ এ ব্যাপারে আলোকপাত করতে পারেন তো তিনি মিঃ শার্লক হোমস। আমার স্বামী চেস্টারে রেলে কাজ করতেন, ভালই ছিল আমাদের অবস্থা। কিন্তু তিনি বাতে এমন কাবু হয়ে পড়লেন যে শেষ অবধি তাঁকে চাকরিটাই ছেড়ে দিতে হয়। তখন আমরা বানবেরির থেকে খানিকটা দূরের এক গ্রামে চলে যাই এবং যে কোনও ধরণের কাজেরই খোঁজ করতে থাকি।

“আমরা ওখানে যখন সপ্তাহখানেক হল গেছি, তখনই ওখানকার হলটা ভাড়া নেন মিঃ সুইদিনব্যাংক এবং তাঁর স্ত্রী। তার আগে দীর্ঘদিন ওই হলটা খালি পড়ে ছিল। ওঁরা ওখানে নতুন এসেছিলেন, চাহিদা সামান্য, ছেলেপুলেও নেই, তাই তাঁরা আমাকে আর আমার স্বামীকে বলেন ওখানকার লজে থেকে ...বাড়ির লাগোয়াই সেটা ...তাঁদের যাবতীয় কাজকর্ম করে দিতে। মাইনেও ভাল, কাজও হালকা, কাজেই আমরা খুশি মনেই কাজটা নিই।”

“এক মিনিট,” বলল হোমস, “ওঁরা কী বিজ্ঞাপন দিয়েছিলেন, নাকি কারোর কথা শুনে আপনাদের নিয়েছিলেন?”

“না না, ওঁরাই আমাদের বলেছিলেন কয়েকদিনের জন্য কাজটা করতে। কিন্তু পরে যখন দেখলেন ওঁদের সঙ্গে আমাদের খাপ খেয়ে গেল, তখন ওঁরা বললেন কাজটা চালিয়ে যেতে। ওঁরা নিজেদের মধ্যেই থাকতেন, কারোর সঙ্গে মেলামেশা করতেন না, এবং ওঁরা বোধহয় চাইতেনও না একগন্ডা ঝি-চাকর ওখানে কাজ করুক আর বাইরে গিয়ে গল্প ছড়াক।”

“তাই নাকি? বেশ। বলে যান।”

“এ সবই গত জুলাই মাস থেকে শুরু। ওঁরা এর মধ্যে মাত্র একবারই লন্ডনে এসেছিলেন, বাকি পুরো সময়টাই কাটিয়েছেন গাইসবরোতে, এবং স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে দেখা প্রায় করেনইনি। পাদ্রিকে বলা হয়েছিল, কিন্তু তিনি নিজে থেকে কেউ না ডাকলে যান না, আর আমার ধারণা, ওঁরা মোটামুটি এরকম একটা ধারণা তৈরি করে দিয়েছিলেন যে ওঁকে আসতে হবে না, ওঁরাই যাবেন তাঁর কাছে। কাজেই ওঁদের নিয়ে গালগল্প কিছু ছড়ালো না বটে, কিন্তু নানারকম ধারণা দানা বাঁধল লোকজনের মনে। তবে স্যার, সারাদিন ঘরে থেকে ঘরের কাজ করবেন, কিন্তু সেখানকার কোনও কথা কানে যাবে না, তা তো হয় না। কয়েকদিনের মধ্যেই আমি আর আমার স্বামী দুটো ব্যাপার বুঝতে পারলাম। এক হচ্ছে, তাঁদের প্রচুর ধারদেনা আছে এবং দুই... তাঁদের স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে প্রচুর ঝামেলা।”

“কোনও লোকের ধারদেনা আছে কিনা, সেটা তাদের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। চেহারায় একটা ছাপ পড়ে যায়,” বলল হোমস, “আর তাদের বাজে কাগজের ঝুড়ি যে পরিস্কার করে, সে তো আরও ভাল বুঝবে। কিন্তু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেকার সম্পর্ক... আচ্ছা, ওঁরা কি আপনাদের সামনেই ঝগড়াঝাঁটি করতেন নাকি?”

“হ্যাঁ, মিঃ হোমস, করতেন। এই তো, গত সপ্তাহেই আমি সবে একটা পুডিং নিয়ে ঘরে ঢুকছি, শুনলাম ভদ্রলোক বলছেন, “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি কফিনে ঢুকলেই তো তুমি খুশি হও।” তার পরই অবশ্য উনি আমাকে দেখে সামলানোর চেষ্টা করেন, আর মহিলা এমন একটা ভাব করলেন, যেন কিছুই হয়নি। কিন্তু মিঃ হোমস, আমার বয়স অনেক হল, মেয়েরা কখন কাঁদে, আমি বুঝি। তারপর গত সোমবার, যখন আমি জানলার পর্দাগুলো নামিয়ে দরজাটা বন্ধ করে বেরোচ্ছি, শুনলাম ভদ্রলোক চিৎকার করে বলছেন, “হয় তুমি থাকবে, নয় আমি!” এর চেয়ে বেশি কিছু আমি আর শুনিনি, আর শুনতেও চাই না। তবে, মিঃ হোমস, আমি কিন্তু এই সব কথা বলার জন্যই আসিনি।

“আজকে যখন আমি বাজে কাগজের ঝুড়িটা পরিস্কার করছি, তখন একটা দোমড়ানো চিঠি পাই। চিঠিটা ভদ্রলোকের নিজের হাতে লেখা। চিঠিটা একবার পড়লেই বুঝতে পারবেন মিঃ হোমস, যে কোনও ধর্মপ্রাণ খ্রিস্টান মহিলার পক্ষে এ চিঠি পড়ে কিছু না করে থাকা সম্ভব কিনা।”

মহিলা তাঁর ব্যাগ খুলে বার করে আনলেন একটা কাগজ। হোমস সেটার ওপর চোখ বুলিয়ে আমার হাতে দিল। দেখলাম, লেখা আছে:

“যা করছি ঠান্ডা মাথাতেই করছি, যে যা খুশি বলুক না কেন।”

“লেখাটা কার জানেন?” জিজ্ঞেস করল হোমস।

“আমার মালিকের, মিঃ হোমস,” বললেন মিসেস হেনেসি, “আমি তাঁর হাতের লেখা চিনি। আপনি ব্যাংকে গেলে ওরাও একই কথা বলবে।”

“মিসেস হেনেসি, এখনই এটা নিয়ে ভাবার দরকার নেই। কৌতুহল মানুষের একটা পরিচিত প্রবৃত্তি। আপনি এ কাগজটা দেখেছেন, ভুল করেছেন, এবং আমি বাজি ফেলছি, আপনি ওই ঝুড়িতে অনেক খোঁজাখুঁজি করেছেন, যদি আরও কোনও কাগজের টুকরোটাকরা পাওয়া যায়।”

“হ্যাঁ স্যার, করেছি, আমার স্বামী আর আমি অনেক খুঁজেছি, কারন কে জানে এর ওপর কোনও মানুষের জীবন নির্ভর করছে কিনা? কিন্তু ওখানে আর এক টুকরো কাগজই ছিল স্যার, হাতের লেখা একই। এই যে সেটা।” বলে মহিলা আরেকটা কাগজের টুকরো বার করে হাঁটুতে রেখে সমান করে হোমসের হাতে দিলেন। দেখে মনে হল একই কাগজের টুকরো, কিন্তু একটু অন্যরকম। মনে হল যেন এটা কোনও লাইনের মাঝখান থেকে ছেঁড়া হয়েছে, তাতে এই কয়েকটা কথাই পাওয়া গেলঃ “পুকুরের ধারের শরবন, যেখানে পুরোন মিনার আড়াল হয়ে গেছে দোতলার মাঝখানের জানলার জন্য, সেখানকার একটা জায়গা...।”

“এতে কিছু নির্দেশ দেওয়া আছে স্যার। বাগানের পাশেই একটা ছোট পুকুর আছে, সেখানে একটা পুরোন ভাঙাচোরা বাড়িও আছে। সেই জায়গার কথাই তো বলছে মনে হয়। বলেই ফেলি স্যার, আপনারা হয়ত ভাবছেন আমরা কেন ওখানে গিয়ে কিছু পাওয়া যায় কিনা দেখলাম না। আসলে স্যার, আমরা ভয় পাচ্ছিলাম। আমার মালিক এমনি সময় খুব ভদ্র, কিন্তু রেগে গেলে তাঁর চোখের চাহনি বদলে যায়। তখন তাঁকে কিছু বলতে গেলে কিন্তু কপালে দুঃখ আছে। তাই আমি ভেবেছিলাম আপনার কাছে এসে সব কথা খুলে বলব।”

“বেশ। একটা কথা বলছি আপনাকে মিসেস হেনেসি, আপনি যে সব ঘটনা বললেন, সেগুলো এতই সাধারণ যে আমি ভেবেই ফেলেছিলাম এটা বাতিল করে দেব। ডাঃ ওয়াটসন আছেন, উনি জানেন যে ব্যাংক অব মরিশাসের একটা গন্ডগোলের ব্যাপারে আমার এই মুহূর্তে লন্ডনে থাকা খুবই জরুরি। কিন্তু আপনার শেষ কথাগুলোই আমাকে ভাবাচ্ছে এবং সেই জন্যই আমি কেসটা নেব। কিন্তু একটা সমস্যা আছে, খুবই বাস্তব সমস্যা। আমরা যদি গাইসবরোতে যাই, তাহলে আপনার মালিককে, আপনি এবং আপনার স্বামী যে তাঁদের পারিবারিক ব্যাপারে নাক গলিয়েছেন, সেটা না জানিয়ে থাকব কী করে?”

“তাও ভেবেছি স্যার,” উত্তর করলেন বয়স্ক মহিলা, “একটা রাস্তা আছে। আমি আজকে বেরোতে পেরেছি, কারণ আমার মালকিন তাঁর এক কাকিমাকে দেখতে ডিপি-র কাছে এক জায়গায় গেছেন, মিঃ সুইদিনব্যাংক তাঁর সঙ্গেই শহরে এসেছেন তাঁকে ছাড়তে। আমাকে বিকেলের ট্রেনেই ফিরতে হবে। আমি একবার ভেবেছিলাম আপনাদের আমার সঙ্গে যেতে বলব, পরে ভেবে দেখলাম সেটা ঠিক হবে না। তাঁর অনুপস্থিতিতে তাঁর বাড়িতে কেউ গেছিলেন, এটা তাঁর কানে যেতে পারে। তার চেয়ে বরং আপনারা কাল সকাল সওয়া দশটার ট্রেনে আসুন, গিয়ে বলবেন যে আপনারা বাড়িটা দেখতে এসেছেন। ওঁরা তো অল্প ক’দিনের জন্য ওটা ভাড়া নিয়েছেন, কাজেই বহু লোকই ওটা দেখতে যায়।”

“আপনার মালিক এত তাড়াতাড়ি ফিরবেন?”

“উনি ওই ট্রেনটাই ধরেন স্যার, আর সত্যি কথাই বলি, আমি চাই যে উনি জানুন ওঁকে নজরে রাখা হচ্ছে। নিজেকে শেষ করে দেওয়ার এই যে সাংঘাতিক কথা, এতে তো যে কোনও লোকই ওঁর ব্যাপারে চিন্তায় পড়ে যাবে। আপনি ওঁকে সহজেই চিনতে পারবেন, মিঃ হোমস,” বলে চললেন মহিলা, “ওঁর বাঁদিকের থুতনিতে একটা কাটা দাগ আছে, কমবয়সে একবার কুকুরে কামড়েছিল।”

“সাবাস মিসেস হেনেসি, আপনি সব দিকই ভেবেছেন। তাহলে কাল আমরা দশটা পনেরোর ট্রেনে বানবেরিতে যাচ্ছি। আপনি শুধু স্টেশনে একটা গাড়ির ব্যবস্থা রাখবেন। গ্রামের রাস্তায় হাঁটাহাঁটি স্বাস্থ্যের পক্ষে ভাল ঠিকই, তবে সময় আরও বেশি মূল্যবান। আমি সোজা আপনার কটেজে চলে যাব, আপনি অথবা আপনার স্বামী... যে কেউ একজন সঙ্গে থাকবেন।” হাত নাড়িয়ে সাক্ষাৎকারের সমাপ্তি ঘটাল আমার বন্ধু।

দরজা বন্ধ হয়ে যাওয়ার পর হোমস বলল, “ওয়াটসন, মহিলার সম্পর্কে কী বুঝলে?”

“পরিশ্রমী মহিলা। এরা খাটাখাটনি করে বলেই তো সমাজের উঁচুতলার লোকজনেরা আয়েস করে। আমি মহিলার মুখ দেখতে পাইনি, কারণ উনি বসেছিলেন জানলা আর আমাদের মাঝখানে, আর মাথার ঢাকনাটাও চোখ অবধি নামানো ছিল। কিন্তু ওঁর কথাবার্তা শুনে মনে হল উনি সত্যি কথাই বলছেন আর আসন্ন ঘটনার কথা ভেবে বেশ চিন্তিতও। যাই হোক, আমি কিন্তু এর মাথামুন্ডু কিছুই বুঝতে পারিনি, বিশেষত পুকুরের ধারের ওই শরবনের উল্লেখে, তোমার মতোই। এটার মানে কী? কারোর সঙ্গে দেখাটেখা করার ব্যাপার?”

“সম্ভাবনা কম, ওয়াটসন। বছরের এই সময় ওরকম জায়গায় গেলে ঠান্ডা লাগার সম্ভাবনা। কোনও লুকোনোর জায়গা হতে পারে, সেটার সম্ভাবনাই বেশি। কিন্তু কেন? আর কেনই বা কোনও লোক কোনও কিছু লুকোতে চাইবে, কিন্তু তার সমস্ত খুঁটিনাটি কাগজে লিখে সেটা আবার ছিঁড়ে বাজে কাগজের ঝুড়িতে ফেলে রাখবে? জল তো অনেক গভীর মনে হচ্ছে, ওয়াটসন। এ ব্যাপারে আরও খোঁজখবরের দরকার আছে। তুমি আসছো তো আমার সঙ্গে?”

“তুমি বললে নিশ্চয়ই যাব। আমার রিভলভারটা নেব কি?”

“যদিও এই মুহূর্তে আমি তেমন কোনও বিপদ দেখতে পাচ্ছি না, তবে নিয়ে রাখা ভাল। মিঃ সুইদিনব্যাংকের সঙ্গে তাঁর প্রতিবেশীদের সম্পর্ক তো খুব ভাল নয়। যাই হোক, এখন যদি তুমি তোমার পাশে যে যন্ত্রটা ঝুলছে, সেটা আমাকে দাও তো আমি গাইসবরো সেন্ট মার্টিনের সমস্যাটা সরিয়ে রেখে তোমাকে স্কারলাট্টি-র দু-একটা পিস বাজিয়ে শোনাতে পারি।”

শার্লক হোমসের বরাবরের অভ্যেস ট্রেন ধরার আধ মিনিট আগে স্টেশনে গিয়ে পৌঁছনো, কিন্তু মিসেস হেনেসির সঙ্গে কথাবার্তা বলার পরদিন আমরা প্যাডিংটন স্টেশনে সকাল দশটার মধ্যেই চলে গেলাম, এবং গিয়ে দেখলাম প্রথম শ্রেনির জানলায় এক ভদ্রলোকের মুখ, বাঁদিকের থুতনিতে একটা কাটা দাগ।

“ওঁর সঙ্গে যাবে ভাবছ নাকি?” আমি খানিকটা দূরে গিয়ে বললাম, যাতে ভদ্রলোক শুনতে না পান।

“সম্ভাবনা কম। ইনিই যদি আমাদের সেই লোক হন, তাহলে উনি গার্ডের হাতে একটা আধ ক্রাউন গুঁজে একা যাওয়ার ব্যবস্থা করে ফেলেছেন।” এবং দেখলাম, সেটাই ঠিক হল। কয়েক মিনিট পরেই এক ভদ্রলোক হন্তদন্ত হয়ে এসে প্রথম শ্রেনির দরজাটা ধরে খুব টানাটানি করেও খুলতে না পেরে গালাগাল দিতে দিতে পরের কামরায় চলে গেলেন। আমরা মিঃ সুইদিনব্যাংকের একটা কামরা পরেই উঠলাম। এ কামরাটাও আমরা ওঠার পরেই বন্ধ করে দেওয়া হল, অন্যান্য প্রথম শ্রেনির কামরার মতোই। আমাদের পরের যাত্রীরা এখানে জায়গা না পেয়ে দ্বিতীয় শ্রেনির কামরায় উঠল।

“কেসটা ইন্টারেস্টিং, বুঝলে,” বলল হোমস। তখন আমাদের ট্রেন বার্নহ্যাম বিচেস পেরোচ্ছে। “আমার তো জেমস ফিলিমোরের ঘটনাটা মনে পড়ে যাচ্ছে... যে ভদ্রলোকের অদৃশ্য হওয়ার ঘটনার তদন্ত করেছিলাম আমরা, কিন্তু সফল হইনি। তুমি নির্ঘাত ভুলে গেছ, তাই না? কিন্তু এই সুইদিনব্যাংক ভদ্রলোকের ব্যাপারটা অনেক গভীর। যেমন ধর... এই ভদ্রলোক কেন তাঁর বাড়ির কাজের লোকের সামনেই তাঁর আত্মহত্যা... অথবা কাল্পনিক আত্মহত্যার ব্যাপারটা খোলাখুলি বলছেন? নিশ্চয়ই খেয়াল করেছ, তিনি কথাগুলো তখনই বলছেন, যখন মিসেস হেনেসি ঘরে ঢুকছেন, অথবা ঘর থেকে বেরোচ্ছেন? শুধু তাই নয়, তাঁর কথার সপক্ষের প্রমাণ-ট্রমাণগুলোও ফেলে রাখছেন বাজে কাগজের ঝুড়িতে? এতে কিন্তু তাঁর পুরো প্ল্যানটাই বানচাল হয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকছে। তার মানে, তাঁর অদৃশ্য হওয়ার ঘটনাটা জনসমক্ষে আসার জন্য যথেষ্ট সময় পাচ্ছে। আবার এও হতে পারে যে তিনি আসলে জানিয়ে দিতে চাইছেন তিনি কোনও জায়গায় কোনও কিছু লুকিয়ে রাখতে চাইছেন।”

রিডিং-এ এসে বেশ কিছুক্ষণ আমাদের ট্রেন দাঁড়িয়ে রইল। হোমস জানলা দিয়ে গলা বাড়াল কী হয়েছে দেখার জন্য, কিন্তু বলল সব কামরার দরজাই বন্ধ। আমাদের সেই যাত্রীরও কোনও খোঁজখবর পেলাম না, তবে আমরা যখন টাইলহার্স্ট-এর গ্রামাঞ্চল পেরোচ্ছি, সেই সময় দেখলাম একগাদা কাগজের টুকরো কামরার ডানদিকের জানলার পাশ দিয়ে উড়ে যাচ্ছে, এবং তার মধ্যে দুটো টুকরো গ্রামাঞ্চলের হেমন্তের চমৎকার সকাল উপভোগ করার জন্য খুলে দেওয়া জানলা দিয়ে ভেতরে ঢুকে এল। আমরা প্রায় ঝাঁপিয়ে পড়লাম সে দুটোর ওপর।

সেই একই হাতের লেখা, মিসেস হেনেসির দেখানো যে হাতের লেখার সঙ্গে আমরা আগেই পরিচিত। একটায় লেখা “এ জীবন রেখে লাভ নেই,” আরেকটায় লেখা “এ’ছাড়া আর কোনও রাস্তা নেই।” আমার ধৈর্য বাঁধ না মানলেও হোমস দেখলাম ভুরু কুঁচকে কী সব ভাবছে।

“চেন টানবো নাকি?” আমি বললাম।

“পয়সা বেশি হলে টানতে পারো,” বলল হোমস, “পাঁচ পাউন্ড বেরিয়ে যাবে এখনই। তুমি আরও কী বলবে বলে দিচ্ছি। তুমি বলবে জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে লাইনের দু’পাশটা দেখতে, তাই না? দুটো দরজা পরের লোকটা যদি নিতান্ত পাগল না হয়, তাহলে ও লোকটা আত্মহত্যা করতে গেলেও অন্য লোকদের দেখে ভয় পাবে না। এবং আমার ধারণা, ও যা করছে, খুব ঠান্ডা মাথায় করছে এবং আমাদের খুব সুচতুরভাবে একটা নির্দিষ্ট পথে চালিত করতে চাইছে। খুবই সম্ভব, ও চাইছে আমরা জানলা দিয়ে মুখ বাড়াই, এবং সেই জন্যই উচিত হবে মুখ না বাড়ানো। অক্সফোর্ড এলে আমরা গার্ডকে সমঝে দেব যাত্রী-কামরার দরজা বন্ধ করে রাখার মজাটা কী।”

ঠিক তাই হল। অক্সফোর্ড আসার পরে দেখা গেল মিঃ সুইদিনব্যাংকের কামরায় কেউ নেই, তবে তাঁর কোট পড়ে আছে। তাঁর টুপিটাও রয়েছে, গার্ডের ভ্যানে থাকা তাঁর পোর্টম্যান্টোটাকেও পাওয়া গেল। কামরার ডানদিকের দরজাটা, যেটা প্ল্যাটফর্ম থেকে বেরিয়ে রয়েছে, সেটা বন্ধই রয়েছে। হোমসও নানারকমভাবে খুঁটিয়ে দেখেও বলতে পারল না যে ভেতরের যাত্রীটি কোথায় গেল।

বানবেরি স্টেশনে আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিল একটা বেতো ঘোড়ার গাড়ি, কোচোয়ানও তথৈবচ। গাছপালা ঢাকা রাস্তা দিয়ে সে গাড়ি ধুঁকতে ধুঁকতে আমাদের পৌঁছে দিল এক পাহাড়তলিতে গাইসবরো সেন্ট মার্টিন-এর ছোট্ট গ্রামে। মিসেস হেনেসি বাড়ির দোরগোড়ায় আমাদের জন্য অপেক্ষা করছিলেন, পুরোন দিনের ধাঁচে অভ্যর্থনা করলেন আমাদের। আমরা যখন তাঁর মনিবের উধাও হওয়ার কথা ঘোষণা করলাম, তখন কী পরিমাণ হাত কচলানো হল, আর কতবার অ্যাপ্রনে চোখ মোছা হল, তা সহজেই অনুমেয়। মিঃ হেনেসি কাছাকাছিই কোথাও গেছিলেন কোনও কাজে, বয়স্ক মহিলাই আমাদের নিয়ে গেলেন মূল বাড়িতে।

“এক ভদ্রলোক এসেছেন, মিঃ হোমস,” মহিলা জানালেন আমাদের, “সকালেই এসেছেন, তবে কেন এসেছেন, কিছুই বলেননি।”

“তবেই তো মুশকিল,” বলল হোমস, “আমি তো একটু নিজের মতো করে তদন্ত চালাতে চেয়েছিলাম। আশা করি মিঃ সুইদিনব্যাংকের সঙ্গে দেখা করার কোনও প্রশ্ন নেই শুনলে তিনি বিদেয় হবেন।”

গাইসবরো গ্রামের খানিকটা বাইরে অবস্থিত। জমিদারবাড়ি ছিল বোঝাই যাচ্ছে, তবে সেই আমলের কোনও ছাপ নেই। পুরোন আমলের দেওয়ালগুলো সারানো হয়েছে, গরাদওয়ালা জানলার বদলে কাচ বসানো – এখনকার যা রুচি আর কী, আর সামনের দরজার থেকে বেরিয়ে এসেছে একটা পোর্টিকো, বহিরাগতদের অভ্যর্থনা জানানোর জন্য। মূল এলাকা থেকে একটু নিচুতে বাগান, আর একপাশে একটা পুকুর, সেখানে একটা জীর্ণ ছাউনি, বসে চারদিক দেখা-টেখার জন্য।

বাড়ির ভেতরে আসবাবপত্র খুবই কম, বোঝাই গেল সুইদিনব্যাংকরা এটা ভাড়া নিয়েছেন বটে, তবে নিজেদের কিছুই আনেননি, যা ছিল, তাই দিয়েই কাজ চালাচ্ছেন। মিসেস হেনেসি আমাদের বাড়ির ভেতর নিয়ে যেতে ভেতরে বসা যে শক্তপোক্ত চেহারার লোকটা আমাদের দেখে হাত তুলল, তাকে দেখে আমরা মোটেই অবাক হলাম না। লোকটা হল আমাদের পুরোন প্রতিদ্বন্দ্বী ইন্সপেক্টর লেসট্রেড।

“আপনি খুবই দ্রুতগামী, আমি জানি, মিঃ হোমস,” বলল লেসট্রেড, “তবে অবাক লাগছে এই ভেবে যে আপনি মিঃ সুইদিনব্যাংকের মতো এরকম একজন অতি সাধারণ ছ্যাঁচোড়কে নিয়েও মাথা ঘামাচ্ছেন।”

“ছ্যাঁচোড়?” বলল হোমস, “কেন, সে কী করেছে?”

“ব্যাংকের চেক জাল করে টাকাপয়সা মেরেছে, এইরকম আর কী। যাই হোক, আপনি যদি ওর খবর জানেন, তাহলে আমাকে বলুন, ব্যাটাকে ধরা দরকার।”

“বেশ বেশ। তা তুমি যদি তোমার নিয়মেই চল, তাহলে আমি বলব তুমি গ্রেট ওয়েস্টার্ন রেললাইন ধরে রিডিং থেকে অক্সফোর্ড অবধি তল্লাশি চালাও। আশা করি তোমার সঙ্গে লোকজন আছে, কারণ লাইনটা লম্বা, আর কম পক্ষে চার জায়গায় এটা নদী পেরিয়েছে।” তারপর হোমস লেসট্রেডকে সংক্ষেপে আমাদের তদন্তের ব্যাপারটা বুঝিয়ে বলল।

আমাদের খবরটা পেয়েই চাঙ্গা হয়ে উঠল লেসট্রেড, তক্ষুনি বেরিয়ে পড়ল কাছাকাছি টেলিগ্রাফ অফিসের খোঁজে, যেখান থেকে সে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড, গ্রেট ওয়েস্টার্ন রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ এবং টেমসের দু’ধার যারা দেখাশোনা করে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারবে। সে বলে গেল যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ফিরবে। মনে মনে নির্ঘাত হোমস তখন নিজেকেই গালাগাল করছিল স্টেশন থেকে আমাদের নিয়ে আসা গাড়িটাকে ধরে রাখার জন্য, লেসট্রেডের কাছে যেটা অপ্রত্যাশিত।

গাড়ির শব্দটা দূরে মিলিয়ে যেতেই চেঁচিয়ে উঠল হোমস, “জলদি, ওয়াটসন!”

“পুকুরের ধারে, তাই না?”

“কতবার আমি তোমায় বলেছি অপরাধী যে জায়গার কথা নির্দেশ করবে, সেখানে না যেতে? ওখানে নয়, সূত্র লুকিয়ে আছে বাড়ির মধ্যেই। যা করার তাড়াতাড়ি করতে হবে।”

বলার সঙ্গে সঙ্গেই সে হাতড়ে হাতড়ে দেখতে শুরু করল ঘরের তাক, আলমারি, লেখার টেবিল, ডেস্ক – সমস্ত কিছু। তার কথা মতো আমি চলে গেলাম বাড়ির অন্যান্য ঘরগুলো খুঁজে দেখতে যে, সব কিছু ঠিকঠাক আছে কিনা, এবং এমন কোনও চিহ্ন আছে কিনা, যা দেখে বোঝা যায় যে সে চম্পট দিয়েছে কিনা। যাই হোক, সব কিছু দেখেশুনে এবং কিছুই না পেয়ে আবার ড্রয়িং রুমে ফিরে এসে দেখলাম হোমস ঘরের সবচেয়ে ভাল আরামকেদারাটায় বসে একটা বই পড়ছে... তাক থেকেই নামিয়েছে বোধহয়... সে বইটা, যদি ভুল না করি, বোর্নিওর আদিম অধিবাসীদের ওপর।

“রহস্যের কী হল, হোমস?” আমি চেঁচিয়ে উঠলাম।

“সমাধান হয়ে গেছে। সামনের তাকের ওপর দেখ কিছু হিসেবের আর অন্যান্য টুকিটাকি জিনিসের খাতাপত্র আছে, মিসেস সুইদিনব্যাংক সুন্দরভাবে সেগুলো সাজিয়ে রেখে গেছেন। সত্যি, মানুষ যে কী করে এ ধরণের তুচ্ছ ভুল করে, ভাবা যায় না। যাই হোক, তোমাকে বলছি ওয়াটসন, ওগুলো ভাল করে দেখে আমাকে বলতো তোমার চোখে আলাদা করে কিছু ধরা পড়ছে কিনা।”

চোখে পড়তে অবশ্য বেশিক্ষন লাগল না। “হোমস,” আমি বলে উঠলাম, “হেনেসিদের টাকাপয়সা দেওয়া হয়েছে কিনা, সে ব্যাপারে তো কিছু লেখা নেই।”

“সাবাস ওয়াটসন! তুমি আরেকটু খুঁটিয়ে দেখলেই বুঝবে হেনেসি বলে আসলে কেউ নেই। কাজেই গোটা ব্যাপারটা কী হয়েছে বুঝতেই পারছ।”

“না হোমস,” আমি ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে বললাম, “আমি কিছুই বুঝতে পারিনি।”

“পারলে না? বেশ। ওই টেবিলে আমি একটা খবরের কাগজ রেখেছি, ওটা নিয়ে এস। ওখানে একটা প্যারাগ্রাফ আমি নীল পেনসিলে দাগিয়ে রেখেছি। ওটা পড়ো।”

কাগজখানা অস্ট্রেলিয়ার। হোমস যে জায়গাটা দাগিয়ে রেখেছে, সেটা এরকমঃ

বড়লোকের উইলের জবর খবর

বিখ্যাত জাহাজ ব্যবসায়ী মিঃ জন ম্যাকরেডির মৃত্যুর পর জানা গেছে যে তিনি কোনও উইল করে যাননি। তাঁর পুত্র মিঃ আলেকজান্ডার ম্যাকরেডি কয়েক বছর আগে ইংল্যান্ডে চলে গেছেন। শোনা যায়, যাওয়ার আগে তাঁর পিতার সঙ্গে তাঁর খুব ঝামেলা হয়েছিল, কারণ তিনি যে মহিলাকে বিবাহ করবেন বলে স্থির করেন, তিনি মঞ্চাভিনেত্রী। বড় বড় আইনজীবীদের বহু চেষ্টা সত্ত্বেও তাঁর কোনও খোঁজ পাওয়া যায়নি। হিসেব করে দেখা গেছে যে, যে সব সৌভাগ্যবান উত্তরাধিকারী, তাঁরা যেই হোন না কেন, এই সম্পত্তি পাবেন, তাঁরা কমপক্ষে এক লক্ষ স্টার্লিং পাউন্ডেরও বেশি টাকার মালিক হবেন।

বাইরে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পাওয়া গেল এবং মিনিটখানেকের মধ্যেই ঘরে ঢুকল লেসট্রেড। আমি এই ডিটেকটিভকে এত হতাশ চেহারায় আগে আর দেখিনি। “ইয়ার্ডের লোকজন আমাকে নিয়ে প্রচুর হাসাহাসি করছে, বুঝলেন,” বলল সে, “আমাদের কাছে খবর ছিল সুদিনব্যাংক লন্ডনেই আছে, কিন্তু আমার মনে হচ্ছিল এটা অসম্ভব, তাই আমি সকালের ট্রেন ধরেই এখানে চলে এসেছিলাম, দশটা পনেরোর ট্রেনের বদলে, আর লোকটা ওই ট্রেনেই ছিল। যত বার ওকে পাকড়াতে গেছি, ততবারই ও হাত ফসকে পালিয়েছে, আর এখন তো ইউরোপের পথে অর্ধেক রাস্তা চলেও গেছে।”

“অত হতাশ হওয়ার কিছু নেই, লেসট্রেড। এখানে আছেন মিঃ আর মিসেস হেনেসি, ওঁদের সঙ্গে কথাবার্তা বল। আমরা তোমার লোকের খোঁজ মনে হচ্ছে ওঁদের কাছেই পাব।”

রুক্ষ চেহারা, লাল ঝুপো গোঁফের একটা লোক চা খাচ্ছিল লেসট্রেডের সঙ্গে। বিকেল হয়ে এসেছে প্রায়। তেলচিটে ওয়েস্টকোট আর কর্ডুরয়ের প্যান্ট দেখেই বোঝা যাচ্ছিল লোকটা মজুর শ্রেনির। আমাদের দেখে উঠে দাঁড়াল লোকটা, মুখে একটা বেপরোয়া ভাব। তার স্ত্রী অবশ্য বরাবরের মতোই অমায়িক।

“মনিবের কোনও খবর পেলেন স্যার?” জিজ্ঞেস করলেন মহিলা।

“অনেক খবরই পেয়েছি,” বলল হোমস। “লেসট্রেড, তুমি জন হেনেসিকে গ্রেট ওয়েস্টার্ন রেলওয়ে কোম্পানির মজুরদের পোশাক চুরির দায়ে গ্রেফতার করতে পারো। অথবা তুমি ইচ্ছে করলে তাকে আলেকজান্ডার ম্যাকরেডি ওরফে নাথানিয়েল সুইদিনব্যাংক হিসেবেও গ্রেফতার করতে পারো।” যখন আমরা এটা শুনে দাঁড়িয়ে আছি বজ্রাহতের মতো, হোমস এগিয়ে গিয়ে একটানে খুলে ফেলল লোকটার লাল গোঁফখানা, যার তলায় পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে একটা কাটা দাগ।

“কেসটা জটিল ছিল,” পরে হোমস বলল আমায়, “যেহেতু কোনও কারণ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। সুইদিনব্যাংকের যা ধার হয়েছিল, তা প্রায় ম্যাকরেডির সম্পত্তির সমান। কাজেই এই দম্পতির উধাও হয়ে আবার কোনও নতুন পরিচয়ে সম্পত্তির দাবি করাটা জরুরি হয়ে পড়েছিল। মানে ব্যাপারটা দাঁড়াচ্ছে, ওই দুজন চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যাবে, বদলে আসবে নতুন লোক, যদিও ব্যাপারটা খুব কঠিন কিছু নয়। মহিলা ছিল আসলে অভিনেত্রী, আর সুইদিনব্যাংক তার কঠিন সময়ে সত্যিই রেলের কুলির কাজ করেছে। রিডিং থেকে নেমে সে যখন ছ’ফুট রাস্তা পেরিয়ে একটা তৃতীয় শ্রেনির কামরায় উঠল, তখন কেউই তাকে খেয়াল করেনি, কারণ তার পরনে তখন ছিল রেলের কুলির পোশাক। লন্ডন থেকে আসার পথেই সে তার পোশাকটা পালটে নিয়েছিল। টুপিটা নিশ্চয়ই তার পকেটে ছিল। সে কামরার দরজা খুলে যখন আত্মহত্যার কথা লেখা কাগজের টুকরোগুলো উড়িয়ে দেয়, তখন ভেবেছিল এগুলো ওড়ার সময়ে দু একটা টুকরো নিশ্চয়ই পেছনের কামরায় গিয়ে পড়বে।”

“কিন্তু তাহলে লন্ডনে গেল কেন? এবং সবচেয়ে বড় কথা, বেকার স্ট্রিটে যাওয়ার দরকারটাই বা কী?”

“সেটাই তো এই কেসের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য অংশ। ও চেয়েছিল নাথানিয়েল সুইদিনব্যাংকের পুরোপুরি অন্তর্ধান, এমনভাবে, যাতে কেউ কোনও দিনই খোঁজ না পায়। তাহলে, ওর মাত্র দুটো কামরা পেছনে থাকা শার্লক হোমসই যদি তার পাত্তা না পায়, তাহলে আর কে পাবে? ওদের একমাত্র ভয় ছিল, যদি আমি কেসটায় আগ্রহী না হই, তাই ওদের অত সব গল্প ফাঁদা... শরবনের গল্প, লুকোনোর জায়গা... যেগুলোর কথায় তুমি প্রায় বিশ্বাস করে ফেলেছিলে। আরও দেখ, ওরা ইন্সপেক্টর লেসট্রেডকেও প্রায় একই ট্রেনে নিয়ে ফেলেছিল আরেকটু হলেই। ওর ওপরওয়ালা এই কেসটা এত চমৎকারভাবে সমাধান করেছে বলে ওর খুব প্রশংসা করেছে শুনলাম। ভার্জিলের সেই লাইনটা মনে কর, ওয়াটসন, ‘তোমার কাজ, কিন্তু তুমি করনি’ ...যদিও আজকাল শুনি সবাই বলে এ লাইনটাও ভার্জিলের লেখা নয়।”

সকল অধ্যায়
১.
হারানো হিরের রহস্য
২.
কথোপকথন
৩.
পরিত্রাতা ওইলক
৪.
মোনালিসা রহস্য
৫.
শার্লক হোমস ও ড্রুড রহস্য
৬.
হোমসের ডায়রির কিছুটা
৭.
কাপড়-মেলা দড়ির রহস্য
৮.
হাস্কারভিল গহ্বরের দুরন্ত কাহিনি
৯.
ভূতের পাল্লায় শার্লগ
১০.
দুর্ধর্ষ গোয়েন্দার দুর্ধর্ষ কীর্তি
১১.
সিলিং-এ পায়ের ছাপ
১২.
জোর বরাত, শিয়ার্লাক
১৩.
শেষ ছড়ের টান
১৪.
শার্লক হোমসের সঙ্গে এক রাত্রি
১৫.
আদম কোথায়? ইভ কোথায়?
১৬.
দি সাউথ সি স্যুপ কোম্পানি
১৭.
ডাউনিং স্ট্রিটে শার্লক হোমস
১৮.
মিঃ হেনেসির অন্তর্ধান রহস্য
১৯.
ইনস্পেকটর লেসট্রেডের গল্প
২০.
সোলার পোনস ও আশ্চর্য পোকা
২১.
শার্লক হোমসের সঙ্গে কী সত্যিই এরকুল পোয়ারোর দেখা হয়েছিল?
২২.
সুমাত্রার দানব ইঁদুর

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%