ব্যথার মঞ্জীর

কমলেশ সেন

অমৃত রায়

ব্যথার মঞ্জীর

অমৃত রায় প্রেমচন্দর কনিষ্ঠ সন্তান। জন্ম বেনারসে, হিন্দি সাহিত্যে প্রেমচন্দ একক যে যুগ সৃষ্টি করে গেছেন, অমৃত রায় অন্য অনেকের সঙ্গে সেই যুগকেই এগিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেছেন। সৃষ্টি করতে গিয়ে ব্যর্থ হয়েছেন, কোথাও বা এক কদম এগিয়েছেন। বৃত্তি অধ্যাপনা। লিখেছেন অসংখ্য গল্প এবং উপন্যাস। এইসব গল্প এবং উপন্যাসে মূলত এসেছে মধ্যবিত্ত জীবন—তার ক্রুরতা নীচতা ভালোবাসা হৃদয়াবেগ জীবন সংগ্রাম —এবং তার জয় পরাজয়। মধ্যবিত্ত জীবনের এই গতির বাইরে তিনি বেরুননি। প্রেমচন্দর জীবন এবং সাহিত্যের ওপর তাঁর গবেষণামূলক গ্রন্থ কলম কা সিপাহী ' বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। উপন্যাসের মধ্যে ‘সুখ-দুঃখ’ এবং ‘হাতি কা দাঁত’–নিঃসন্দেহে তাঁকে হিন্দি কথাসাহিত্যে স্থান করে দিয়েছে। কমিউনিস্ট আন্দোলন এবং প্রগতি লেখক সংঘের সঙ্গে তিনি ওতপ্রোত ভাবে যুক্ত ছিলেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৯৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে।

আজ অমাবস্যার রাত। ঘন, কালো। নীরব নিস্তব্ধ। দূর—বহু দূর থেকে শুধু কুকুরের ঘেউ ঘেউ আর শিয়ালের ডাক ভেসে আসছে। মানুষের কণ্ঠস্বর বলতে মাঝে মাঝে ভেসে আসছে গানের দু-একটা কলি। তাও কোন রিক্সাওয়ালার কণ্ঠে ভেসে আসা ফিল্মি গানের এক-আধটা কলি । তাছাড়া আর কোন সাড়া নেই, শব্দ নেই ৷

আশপাশের কোন বাড়ি থেকে ভেসে আসছে সানাই এর একটা বেদনাসুর। সানাই এমন একটা বাদ্যযন্ত্র যা মানুষের সুখ এবং দুঃখ এই দু সময়েরই সঙ্গী । জানি না আজ সুরেশ্বরের কি হয়েছে।

আপনারা সুরেশ্বরকে কতটুকু জানেন। নিশ্চয়ই আপনারা ওকে কোনদিন বীণা বাজাতে শোনেননি। চোখ বন্ধ করে ও যখন বীণার তারের ওপর আঙুল খেলাতে থাকে তখন ও এক অন্য মানুষ হয়ে যায়। মনে হয় না যে সেই সুরেশ্বরই এখন আমাদের সামনে বসে আছে। এখন ওর উঠতি বয়স। মাত্র তিরিশটি বসন্ত ও পেরিয়ে এসেছে। ওর সংগীতের মূর্ছনা থেকে যে ব্যথার সুর প্রবাহিত সেই সুরের ফল্গুধারায় একবার যে অবগাহন করেছে, তার প্রতিটি তন্ত্রী কেঁপে কেঁপে উঠেছে। আর সেই ফল্গুধারায় স্নাত মানুষের মনে হয়েছে, এই সুরের যে স্রষ্টা - তার অস্থি আর মজ্জায় যেন অনেক –অনেক ঝরা-পাতা আর শিশির বিন্দু সমাহিত । -

সুরেশ্বর রেলওয়ের একজন কেরাণি। রেলের ঘট-ঘটাং আওয়াজ আর ফাইলের বোঝার ক্লান্তিকে সে তার বীণার তন্ত্রীতে বেঁধে নতুন এক মহিমায় রূপ দিয়েছে। সারাদিনের ছোটাছুটির পর রাত্রে এই বীণাই তাকে এনে দেয় শান্তি, যে তার সাথী—তার রক্ষা কবচ। এই বীণা হাতে না থাকলে অফিসের ফাইল তাকে নিশ্চিতই গ্রাস করে ফেলত। রাত্রে দরজা-জানালা বন্ধ করে, প্রতিবেশীদের ঘুমের কোন রকম ব্যাঘাত না ঘটিয়ে অনেক—অনেক গভীর রাত পর্যন্ত সে তার বীণা বাজাত। রাত্রির এই নিঃশব্দ গভীরতা তার বড় প্রিয়। ওর ইচ্ছে, ঘড়ির কাঁটাটা কোন একটা ঘরে এসে স্থির হয়ে যাক। ও দ্রুত ঘুমিয়ে পড়তে চায়; যাতে পরদিন পর্যন্ত সুরের মূর্ছনা তাকে আবিষ্ট করে রাখতে পারে ।

জানি না, আজ সুরেশ্বরের মন কেন এত উদাস। সানাইয়ের একটা তীক্ষ্ণ স্বর ধারালো ছুরির মতো ওর হৃদয়ে এসে ধীরে ধীরে বিঁধছে। একটা অদ্ভুত ধরনের বেদনা— একটা বিচিত্র ব্যথা ক্রমশ ওর হৃদয়ে সঞ্চারিত। আজকে ওর বীণায় কোন ঝংকার নেই—স্তব্ধ। আজও নিজেই শ্রোতা। সানাইয়ের সুরটা বাঁকানো তরোয়ালের মতো তার দেহকে বিক্ষত করছে। সানাইয়ের সুরের এই উঁচু-নীচু স্বরগ্রাম কী বলতে চায় সুরেশ্বর তা বোঝার চেষ্টা করছে। ব্যথার গভীর অতলকে স্পর্শ করার জন্যে দৃঢ় সংকল্প জাগছে তার। সুন্দরী এক পাহাড়ি মেয়ের মতো সানাইয়ের সুরটা বুকের গভীর প্রদেশে চড়াই-উৎরাই ভাঙছে। আর সেই উচ্ছল তরুণী যেন কোন ক্রুর দৈত্যের অভিশাপে বন্দিনী। ওর প্রিয়জনেরা কোথায় হারিয়ে গিয়েছে—ওর আত্মীয়রা ওকে ত্যাগ করেছে। আর ও নিজেই নিজের ব্যথার ভার বহন করে চলেছে। ওর মুখাবয়ব তুষারস্নাত মটর ফুলের মতো। ওর পরনের শাড়িটা যেন তুষারের মতো শুভ্র—মুখের ভঙ্গিমা যেন উদাসী মেঘের মতো বিস্তৃত।

সুরেশ্বর সানাইয়ের এই সুর-মূর্ছনাকে নতুন এক কল্পনায় পরিবর্তিত করে সেই মানস-প্রতিমার দিকে স্বপ্নাতুর চোখ নিয়ে বসেছিল। হঠাৎ কে যেন ওর কাঁধ ধরে খুব জোরে এক ঝাঁকুনি দিয়ে ওকে বাস্তবে ফিরিয়ে আনল। যে মানস-প্রতিমা ওর চোখের সামনে ভাসছিল, তা সানাইয়ের মূর্ছনার ছবি নয়—রক্তমাংসে-গড়া এক তরুণীর অবয়ব।

সে-তরুণীকে আজকেই সে শরণার্থীদের গাড়ি থেকে নামতে দেখেছে। হাজারা জেলার কোন এক সীমান্ত অঞ্চলের হিন্দু পাঠান যুবতী সে। ... গভীর বেদনার সুর যখন সানাই-এ বেজে চলেছে, ঠিক তখনই সেই বেদনার অনিন্দ্য সুন্দর প্রতিমা নিজে নিজেই তার সামনে ভেসে উঠছে—যেন সমুদ্রের ফেনা থেকে কোন ভেনাস উঠে আসছে ...

হ্যাঁ, সত্যিই ভেনাস ... উর্বশী ... তক্ষশীলার রূপবতী ... শরের মতো ছিপছিপে মসৃণ —দীর্ঘাঙ্গী, স্বাস্থ্যবতী, যৌবনে ভরপুর—একহারা, সীমান্তের কাজু বাদামের টানাটানা চোখ, চন্দনের মতো গায়ের রঙ, অভিজাত মুখশ্রী আর দীর্ঘ বেণী। কিন্তু প্রসাধন নেই, সাজ-সজ্জার আড়ম্বর নেই—তাকে কেমন যেন উদাসী-উদাসী দেখাচ্ছিল, তার এই অপরূপ লাবণ্য যেন বদলে গেছে, উচ্ছৃঙ্খল উদ্দাম কোন ভাবই তার মধ্যে নেই। একবার তাকালে আর চোখ ফেরাতে ইচ্ছে করে না। মনে হয় যেন অন্তরের অন্তঃস্থলে ব্যথার একটা সঙ্গীত গুমরে উঠল।

সুরেশ্বর আজকেই ওর ডেরা দেখেছে। ভাগ্যিস দ্বিতীয় মহাযুদ্ধটা হয়েছিল। যুদ্ধ না হলে মিলিটারির জন্যে ব্যারাক তৈরি হত না, আর ব্যারাক তৈরি হয়েছিল বলেই জানোয়ারদের ভয়ে পলাতক মানুষ আজ সেই ব্যারাকে আশ্রয় পেয়েছে। এই তৈরি ব্যারাক শরণার্থীরা পেয়ে গিয়েছিল—যেন ওদের জন্যেই এইগুলো বানানো হয়েছিল । ঘর-বাড়ি, খেত-খামার, দোকান-পাট ছেড়ে ছিন্নমূল মানুষ এই ব্যারাকেই তাদের শেষ সম্বল নিয়ে আশ্রয় নিয়েছে। টিনের বড় মাঝারি ছোট বাক্স, খাটিয়ার পায়া এবং কাঠ, দড়ির গাঁঠরি সব আলাদা করে সাজানো-গোছানো। তাছাড়া আছে চাটাই বালতি ঘটি থালা টিন। কেউ কেউ বা সঙ্গে করে এনেছে হুঁকো। এ সবকিছুই তাদের ঘর গেরস্থালির আসবাবপত্র। এসব জিনিসপত্র নিয়েই নতুন এই জগতে তারা নিজেদের স্থান করে নিচ্ছে। মেয়ে-বৌরা কুয়ো থেকে জল আনছে কিংবা রুটি বানাচ্ছে। শিশুরা ধুলো-মাটি সারা গায়ে মেখে ভয়ে ভয়ে খেলছে। লোহতা আর হাজারার ধুলো মিশে গেছে, ওরা পরখ করছে নতুন জীবনকে। আর ওদের ভেতরে গোপন ভীত-সন্ত্রস্ত মুখগুলো বারবার উকিঝুঁকি মারছে, একটা অদৃশ্য ভয়ের জাল দিয়ে নিজেদের আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধছে।

এই ব্যারাকে—এই নতুন দুনিয়ায় সন্ধ্যার অন্ধকারে সুরেশ্বর বেদনার প্রতিমা, এই অনন্যা সুন্দরীকে ফুলকো ফুলকো রুটি সেঁকতে দেখেছিল।...

আর বন্নোর এই দুর্দশার কাহিনি সুরেশ্বর শুনেছে তার ফেলে আসা অতীত দুনিয়ার কোন এক প্রতিবেশীর কাছ থেকে। আজ এই নতুন দুনিয়াতেও সে তার প্রতিবেশী। এই নতুন আস্তানায় আর কোন বাধার প্রাচীর উঠবে না। কেননা, এই মানব সন্তান সন্ততিরা নিজেদের মেহনতের ওপর বেঁচে নেই, বেঁচে আছে জনসাধারণের দয়া দাক্ষিণ্যের ওপর। এখানে ওর কেমন লাগছে? প্রশ্ন করেছিল সুরেশ্বর। বন্নোর প্রতিবেশী হাজারা জেলার সেই আধ-বুড়ো মানুষটি উত্তরে বলেছিল, “ভিক্ষের অন্ন খেয়ে বেঁচে থাকতে কেমন আর লাগতে পারে বাবুজি।” ওর কাছ থেকেই সুরেশ্বর জানতে পারে, এ বছরেই, কিছু দিন আগেই বন্নোর বিয়ে হয়েছিল। শ্বশুরবাড়ি একই গ্রামে। আর বিয়ের পরেই শুরু হয় দাঙ্গা। ওর স্বামীকে হত্যা করে খুনিরা ওকে তুলে নিয়ে যায় । তারপর বন্নোর ওপর চলে হিংস্র অত্যাচার, শেষমেশ একদিন রাত্রে প্রাণটা হাতের মুঠোয় নিয়ে বন্নো পালিয়ে এসে উদ্বাস্তুদের দঙ্গলে ভিড়ে যায়। সুরেশ্বর জানতে পারে বন্নোর দুঃসাহসিক জীবনের ব্যথার কাহিনি।

সন্ধ্যার ধূসর অন্ধকারে, ছোট্ট একটা খাটিয়ার বসে সেই আধ-বুড়ো লোকটি বন্নোর কাহিনি বলছিল। আর সেই সময়ে সুরেশ্বরের নায়িকা বন্নো বেদনার শিথিল অনুভূতি, দুর্জয় সাহস নিজের কোমল দেহে লুকিয়ে নীরবে রুটি সেঁকে চলেছে। নীরবে মুখ বুজে এই ব্যাথা সইতে সইতে ও কেমন উন্মাদের মতো হয়ে গেছে। কথা বলা, হাসি এসব সে ভুলে গেছে। শুধু একটা তীব্র ব্যথা অনুভব করত। ফেলে আসা দিনের প্রিয় সামগ্রী, প্রিয় অবলম্বন সবকিছু হারিয়ে গেছে; তার সঙ্গে পুড়ে খাক হয়ে গেছে বন্নোর হাসি, কথা । পাঁচ হাজার কিম্বা পঞ্চাশ হাজার বছর আগের এক ভূমিকম্প পলেস্তারাহীন জীবনকে—ওর জীবনের ফাটল ধরা দালানকে (ওর বিয়ের আগের দিনগুলো) ধসিয়ে দিয়ে গেছে। আর সেই ধ্বংসাবশেষের স্তূপের ওপর মরে পড়ে রয়েছে সদ্য ডানা গজানো একরাশ পাখি। পচে গলে সেই পাখির দেহ এখন জমাট বেঁধে গেছে। ঝকমকে পাথরের ফাটলের মধ্যে সেগুলো আয়নার টুকরোর মতো। ঠোঁট ফাঁক করে হাসতে পারছে না বন্নো, হাসি যেন থমকে গেছে।

ব্যারাকের কাছেই ইঁদারা। ইঁদারার পাশে একটা কুঠরি। জানি না, যুদ্ধের সময় এই কুঠরি কী কাজে লাগত। এখন খালিই পড়ে রয়েছে। হয়তো যুদ্ধের সময় ওখানে লুকোচুরি খেলা হত।

আজকে, সন্ধ্যা সাড়ে সাতটার সময় হঠাৎ কুঠরির মধ্যে প্রাণের একটা সাড়া পাওয়া গেল। বন্নো তখন জল আনতে গিয়েছিল। বেশি দূর যায়নি, এমন সময় সেই কুঠরি থেকে একটা আর্ত চীৎকার ভেসে এল। আর কারা যেন সেই চিৎকারটা জোর করে মাঝপথে থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে। চিৎকারের শব্দ কমে গেল—কিন্তু একটা গোঙানি, একটা কাতরানি ভেসে আসছে। কিছু পুরুষ গলার ফিশফিশানিও সে শুনতে পেল। বন্নো ঠিক করল, ব্যাপারটা যাচাই করতে হবে। জল নিয়ে ও ব্যারাকে ফিরল। কলশি রেখে, তাক থেকে একটা চাকু নিয়ে কুঠরির দিকে এগিয়ে গেল বন্নো ।

ও যখন প্রায় গজ দশেকের মতো দূরে, সেই সময় দলের কোন একজন দেশলাই জ্বালাল। এবং জ্বালিয়ে কিছু খুঁজতে লাগল। কিন্তু দেশলাই নিভে গেল ।

মুহূর্তের সেই একঝলক আলোয় বন্নো দেখল, চার পাঁচজন পুরুষ একজন যুবতীকে মাটিতে শুইয়ে জোর করে চেপে ধরে আছে। মেয়েটিকে চিত করে শুইয়ে ফেলা হয়েছিল। হয়তো বা সে নিজেই চিত হয়ে শুয়ে আছে। সারা শরীরে কোন কাপড় নেই—সম্পূর্ণ উলঙ্গ। দু-তিনজন যুবক তার হাত-পা জোরে চেপে ধরে আছে—আর সেই মেয়েটি হাত-পা ছাড়ানোর জন্যে প্রাণপণ ছটফট করছে ....

মেয়েটি আজ একদঙ্গল উন্মত্ত শরণার্থী যুবকের শিকার। ওদের রক্ত, রক্তই—গঙ্গার শুদ্ধ জল নয়। ওরা তাই প্রতিশোধ নিতে চায়—নিজেদের অপমানের প্রতিশোধ। তাদের ধর্মের মেয়েদের ইজ্জত যারা নষ্ট করেছে, সেই দুশমনদেরই এক মেয়ের ইজ্জত নিয়ে তারা বদলা নিচ্ছে।

আশপাশের কোন একটা গ্রামে এই পাঁচ-ছজন তরুণ আক্রমণ চালায় । গ্রামের জিনিসপত্র ওরা লুট করেছে আর তার সাথে এই মেয়েটিকেও তুলে নিয়ে এসেছে। এখন শুধু মেয়েটির ইজ্জত লুটেই প্রতিশোধ নিচ্ছেনা, নিজেদের ক্ষুধাও নিবৃত্ত করছে। তাদের ধর্মের জন্যেও কিছু কর্তব্য পালন করছে তারা ।

এক মুহূর্তের জন্যে যে আলোর রশ্মি ঝিলিক দিয়ে উঠেছিল, সেই রশ্মিতে বন্নো ধর্মের এই উপাসকদের দেখল। দেখল তারা কী করছে।

বুঝতে তার এক মুহূর্তের জন্যে দেরি হয়নি। দেশলাই-এর এক ঝলক লাল রোশনাই-ই মানুষগুলোর পাশবিকতাকে স্পষ্ট করে দিয়েছিল। এর বেশি কিছু আর বন্নোর দেখার দরকার হয়নি, একদিন সে নিজেই এইরকম এক নাটকের নায়িকা হয়েছিল।

বন্নোর ভেতর যে পশুর আত্মা লুকিয়ে ছিল, তা মুহূর্তের জন্য পৈশাচিক আনন্দে উল্লসিত হয়ে উঠল। সে এক প্রতিহিংসার তৃপ্তি অনুভব করল। ... ছিঁড়েকুড়ে খাক । এই মেয়েটির যে খোদা, সে তো সেই জানোয়ারদেরও খোদা।... ওরা একে ছিঁড়েকুড়ে খাক।

বন্নোর মনের মধ্যে এক পৈশাচিক উল্লাসের তরঙ্গ।

কিন্তু মিনিট কয়েকের মধ্যে তার ভেতর আবার এক উলটো ঢেউ আছড়ে পড়ল । সাপ ছোবল মারলে বিষের যেমন প্রবাহ সৃষ্টি হয়, সেই রকম একটা নীল জ্বালার প্রবাহ খেলে গেল তার সারা দেহে, অঙ্গে-প্রত্যঙ্গে ।

বন্নোর মনে হল সে নিজে বুঝি একটা বিরাট আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে।

উলঙ্গ যে মেয়েটি চিত হয়ে মাটিতে শুয়ে আছে, সেই মেয়েটি অন্য কেউ নয়, সে নিজেই। ছটা হাত তাকে মাটিতে পেড়ে ফেলে ঠেসে ধরে আছে। নেকড়ের মতো ক্ষুধার্ত চোখগুলো যেন তার খুবই চেনা। এই ক্ষুধার্ত চোখগুলো সে এর আগেও দেখেছে। ...

“কে, কে ওখানে”চীৎকার করতে করতে বন্নো চাকু উঁচিয়ে কুঠরির মধ্যে ঝড়ের বেগে ঢুকল। ভেতরে একটা হই চই পড়ে গেল। দু একজন পালানোর চেষ্টা করল। কিন্তু পর মুহূর্তেই তারা ভাবল, না, দেখা দরকার কোন্ শয়তান আমাদের কাজে বাধা দিতে এসেছে।

বন্নো দু-একজনের ওপর চাকু চালিয়েছিল। কিন্তু তারা ছিল ওস্তাদ খেলোয়াড়। বন্নোর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তারা চাকু ছিনিয়ে নিতে চেষ্টা করতে লাগল। কিন্তু ছিনিয়ে নেওয়ার আগেই উন্নত্ত বন্নো মেয়েটির দিকে ছুটে গিয়ে তার পেটে চাকু চালিয়ে দিল ; পরে সে চাকুটা নিজের বুকেই বসিয়ে দিল।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%