ড্রেসিং টেবিল

কমলেশ সেন

সলিল চৌধুরী

ড্রেসিং টেবিল

সলিল চৌধুরী শুধু একটি নামই নয়—সঙ্গীতময় জীবনও। পথে ঘাটে, কারখানার গেটে—যেখানেই লড়াকু মানুষ সেখানেই ভাঙা হারমোনিয়াম গলায় ঝুলিয়ে সুরে সুরে স্ফুলিঙ্গ জ্বালিয়ে তুলেছেন তিনি। সেই স্ফুলিঙ্গ এক দিন দাবানলে পরিণত হবে—এই আশ্বাস—এই বিশ্বাস নিয়েই তিনি গণনাট্য সংঘের একজন একনিষ্ঠ কর্মী হয়ে ওঠেন। কর্মী আর স্রষ্টার ঘটে সমন্বয়। শুধু সঙ্গীতের জগতেই তিনি নিজেকে সীমাবদ্ধ করে রাখেননি । তুলে নিয়েছেন কলমকেও। ‘ড্রেসিং টেবিল’,‘গুনময় গুই-এর জীবনচরিত তারই ফসল। লিখেছেন অজস্র কবিতা এবং গান । তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৯৫ সালের ৫ই সেপ্টেম্বর ।

বিয়ের পর নন্দা আমাকে যত চিঠি লিখত তার প্রায় প্রত্যেকটাতেই শেষ ‘পুঃ’ দিয়ে আঁকাবাঁকা অক্ষরে লেখা থাকত : “ঘর যখন নেবে আমার জন্য একটা ড্রেসিং টেবিল কিনতে ভুলো না—আর, আর আয়নাটা যেন খুব বড়ো আর ভালো হয় । ”

বিয়ের আগে নন্দার বাড়ি যখন যেতুম প্রথমেই নজরে পড়ত দরজার সামনের দেওয়ালে একখানি চটা-ওঠা আয়না । তাতে মুখ দেখলে ওঃ যা দেখাত ! নাক থেকে কপাল পর্যন্ত পুরো এক হাত লম্বা, আর ঠোঁট থেকে চিবুক মাত্তর এক ইঞ্চি ! আবার একটু নড়লেচড়লেই আয়নায় নানারকম ভঙ্গি করে মুখ ভ্যাংচাত !

রীতিমত মন খারাপ হয়ে যেত আমার, আর নন্দা হাসত, বলত, “তোমার কাছে যখন যাবো তখন ভালো আয়না কিনে দিও!”

পরবর্তী জীবনে নানা সমালোচকের সম্মুখীন হতে হয়েছে—তাঁদের সমালোচনায় নিজের প্রতিবিম্বও দেখছি, –দেখে বেশির ভাগ সময়েই মনে পড়েছে নন্দার বাড়ির সেই আয়নার কথা। সে কথা থাক—

বিয়ের ঠিক পরে। তখন আমার দু-তিনটে খবরের কাগজে ভালো চাকরি পাওয়ার কথা হচ্ছে, মানে এই হল বলে আর কী!

- - সেটা না হওয়া পর্যন্ত কটা দিন নন্দা তার বাবার কাছে থাকবে—ঠিক হল। আর চাকরি হলেই ঘরভাড়া নিয়ে নন্দাকে কলকাতায় নিয়ে আসব। কেমন করে ঘর সাজানো হবে, কোন্ জায়গায় কী থাকবে— সেসব প্ল্যান দুজনে মিলে আলোচনা করে পুরোপুরি মাথায় নিয়ে কলকাতায় এসে হাজির হলুম। নন্দা রইল গ্রামে তার বাবার কাছে। এর পরে ছ মাসের কাহিনি যদি আপনারা শোনেন – থাকগে, সেসব বলে লাভ নেই, কারণ যে কাহিনি বলতে বসেছি সেটা আমার নিজের কথা নয়। তবু বলে রাখা ভালো যে চাকরি আমি পেয়েছি, নয়তো অনেকে মনে করতে পারেন যে বেকার সমস্যার ওপর আমি কটাক্ষ করছি। অবশ্য যে চাকরিগুলো পাবার কথা ছিল তার একটাও পাইনি, কিন্তু এমন একটা পেয়েছি যা ঘুণাক্ষরে মনে ত্রিসীমানাতেও কোনদিন ঠাঁই পায়নি। এক কথায়, জুতোর দোকানের সেলসম্যান। আর কসবার একেবারে ভেতর দিকে যে এঁদো পুকুরগুলো আছে তারই একটার পাড়ে দুখানা টিন দেওয়া ঘর এক মামাতো ভাইয়ের সঙ্গে বখরা করে ভাড়া নিয়েছি। নন্দাও চলে এসেছে বাপের বাড়ি থেকে—মানে, বেশ আছি। নন্দার একটা আশ্চর্য প্রতিভা আছে, বোধহয় সব মেয়েদেরই ওটা থাকে; সেটা হচ্ছে, অবস্থার সঙ্গে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেবার ক্ষমতা। একদিনের জন্যেও মুখ শুকনো দেখিনি নন্দার—যেন কসবার টিনের ঘর ভাড়া নেওয়াটাই তার আজীবনের স্বপ্ন। কিন্তু একটা ব্যাপার এ ঘরে আসার পর থেকে একবারের জন্যও নন্দা বলেনি ড্রেসিং টেবিলের কথা। আমিও প্রায় ভুলেই গিয়েছিলাম। এমন সময় এক শনিবারের দুপুরবেলা একটা ঘটনা ঘটল। নগদ করকরে ষাট টাকা মাইনে গুনে নিয়ে সেদিন বাড়ি ফিরছি পথের দুদিকে চাইতে চাইতে। ইচ্ছে করলেই কত কী কিনতে পারি, অথচ কিছুই কিনছি না, এটা যেন আমার সম্রাটিক খেয়াল ! বেশ লাগে পকেটে টাকা থাকলে ! হঠাৎ ঠিক কসবার মোড়ে দেখি এক চমৎকার ড্রেসিং টেবিল রাস্তায় নিলেমে বিক্রি হচ্ছে। আরও কত কী ফার্নিচার আশ্চর্য সস্তায় যাচ্ছে। ড্রেসিং টেবিলটার গ্লাসের একটা কোণ কেবল একটু ফাটা, তা ছাড়া প্রায় নিখুঁত—দাম উঠল মাত্র তিরিশ টাকা—ভাবুন! হুপের মাথায় ‘যা থাকে বরাতে' বলে কিনে ফেলে মুটের মাথায় চাপিয়ে সটান বাড়ির দিকে পা বাড়ালুম। বাড়িভাড়া যাবে ১৫ টাকা, বাকি ১৫টি টাকায় সারা মাস সংসার চালাতে হবে। নন্দার মুখটা চোখের সামনে ভেসে উঠল—কত আশা কত স্বপ্ন বুকে নিয়ে বেচারি ভালোবাসতে শুরু করেছিল, তার তো কিছুই মিটল না ! তিরিশ টাকা যায় যাক, কুছ পরোয়া নেই।

বাড়ি ঢুকতেই নন্দা প্রথমটা অবাক হয়ে গেল—তারপরে কী যেন ভেবে কী - ভীষণ খুশি যে হয়ে উঠল কী বলব। অন্য মেয়ে হলে হয়তো টাকার হিসেব করে এতক্ষণে প্যানপ্যান করতে বসত—কিন্তু দরিয়ার মতো দিল আছে নন্দার – কবি না হোক, কবি-স্ত্রী হবার সে নিশ্চয় উপযুক্ত। প্রায় সারাক্ষণ নন্দা আয়নার সামনেই বসে কাটাল, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে চুল বাঁধল —কাপড় ছেড়ে কপালে টিপ পরল—মাথায় ঘোমটা টেনে অকারণে দু-একবার হাসল। বিছানায় শুয়ে শুয়ে খুশিতে যেন আবেশ আসছে—কখন ঘুমিয়ে পড়েছি। বিয়ের আগের দিনগুলো স্বপ্নে ভাসছে— কেমন যেন সার্থক মনে হচ্ছে জীবন। হঠাৎ ঘুমটা ভেঙে গেল—নন্দা ডাকছে। ধড়মড়িয়ে উঠে বসলুম—নন্দার দু-চোখ ফুলে লাল হয়ে উঠেছে—চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ছে—সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠছে!

“কী হয়েছে নন্দা? কাঁদছো কেন অত?’

“ও আয়না তুমি ফেরত দিয়ে এসো–ও আমার চাই না' বালিশে মুখ ঢেকে নন্দা কাঁদতে লাগল। হয়তো পুরনো জিনিস বুঝতে পেরে ওর অপমান হয়েছে। কিন্তু নতুনের দাম কত ! সে কি আর আমাদের কেনা সাধ্যি। এত অবুঝ হলে কেমন করে চলবে? আর জিনিসটা তো প্রায় নতুনই বলা যেতে পারে।

‘ছি! নন্দা শোনো।'

“না, না, না, আমার চাই না। তুমি ফেরত দিয়ে এসো।' স্তম্ভিত হয়ে গেলুম ৷ কেবল সংকীর্ণ একটা প্রেসটিজ বড় হল নন্দার। আর আমার কোন দামই নেই ওর কাছে?

“বেশ। তাই হবে। ফেরত দিয়ে আসব।’

নন্দা আস্তে আস্তে উঠে চলে গেল—খানিক পরে ফিরে এল আবার ৷ আমার কোলের ওপর একতাড়া চিঠি ফেলে দিয়ে বলল— ‘এইগুলো পড়ে দেখো।' নীল খামে মোড়া পরিষ্কার বাংলায় লেখা চারখানা চিঠি।

“কার চিঠি এ? কোথায় ছিল?”

‘আয়নার দেরাজের মধ্যে ছিল।'

- চিঠিগুলো নিয়ে বসলুম। খুলে পড়তে শুরু করলুম এক-একখানা করে — হাত কাঁপছে—কী ব্যাপার কে জানে? তারিখ হিসেবে পর পর সাজালে চিঠিগুলো এই:-

প্রিয়তমাসু-

বাগেরহাট

আজ রাত বারোটায় এখানে এসে পৌঁছেছি। মনে হচ্ছে কতদিন যেন ছেড়ে এসেছি তোমাকে। ভাবতে অবাক লাগছে কাল এতক্ষণে তুমি কত কাছটিতে ছিলে।

জায়গাটা শহর থেকে কিছুটা দূরে। অমলের কথা মনে আছে তো? সে এখানকার কলেজে প্রোফেসারি করছে। কাল থেকে তার ওখানেই উঠব। শরীর বড়ো ক্লান্ত লাগছে—অবশ্য ট্রেনে বিশেষ কষ্ট হয়নি। ট্রেনে একটা বড়ো মজার ব্যাপার হয়েছে, শোনো : আমার সামনের বেঞ্চেই একটি প্রৌঢ় ভদ্রলোক, তাঁর স্ত্রী, একটি ছোট ছেলে আর দুটি মেয়ে আমার সহযাত্রী। সুন্দর ঝকঝকে একটি পরিবার— ছেলেমেয়ের নিটোল স্বাস্থ্য—প্রৌঢ়ের অমায়িক হাসি-মুখ আর খাঁটি বাংলার মা— ভীষণ ভালো লাগছিল। স্কেচ বইটা বের করে মনে রাখার মতো করে সাজিয়ে নিচ্ছিলাম। একটি মেয়ের নজরে পড়ল যে আমি ছবি আঁকছি—সে তার বোনকে বলল, বোন মাকে বলল—মা বাবাকে বললেন। প্রৌঢ় ভদ্রলোক ভীষণ উৎসাহে একেবারে ফেটে পড়লেন, “তাই নাকি? দেখি কেমন আঁকলেন আমাদের ? আরে ! এমন অদ্ভুত মশাই ! একেবারে জাদুকর লোক দেখছি আপনি?”

তারপর মহা হই চই ! যাই কেনেন তাই খেতে দেন আমাকে, কিছুতেই ছাড়বেন না।

“আরে মশাই, বাঙালির এত দুর্দশা কেন জানেন? তারা শিল্পীর কদর জানে না । আমারও ওসব শখ ছিল— এককালে নামও ছিল গাইয়ে-বাজিয়ে মহলে। নিন ধরুন—লজ্জা কিসের ?”

খেতে হল। ভদ্রলোক যখন কথা বলেন উত্তরের প্রত্যাশা করেন না— মনের ভাবটা যেন এই যে তাঁর ওপরে আর কোন কথাই চলতে পারে না।

“বিয়ে-থা করেননি তো? বেশ !! এটি যেন করবেন না— এই দেখুন না আমার —হেঁ হেঁ —সব চুলোয় যাবে তাহলে”— আমি বলতে যাচ্ছিলুম আমি বিয়ে করেছি—ভদ্রলোক মুখ থেকে কথাটা কেড়ে নিয়ে বললেন:

“আমার মেয়েদের ছবি আঁকা শেখান না আপনি? যা লাগে দেব, কলকাতায়ই তো থাকেন—আমার বাড়ি হচ্ছে—বিডন স্ট্রীট। আসবেন নিশ্চয়ই। যাক তাহলে, ওই কথাই রইল । হাসি, খুশি ! তোরা খুশি তো? দেখ, কেমন মাস্টার পেয়ে গেলিহেঁ হেঁ–হেঁ।”

কোন কথার উত্তর দেবারই অবকাশ নেই আমার। বোন দুটি জিজ্ঞেস করে, “সত্যি আসবেন তো ? ”

“হ্যাঁ হ্যাঁ, আসব।” উপায় নেই ।

ইতিমধ্যে ছোট ভাইটি আমার ব্যাগ হাতড়ে অ্যালবামটা টেনে বের করেছে—আঙুলে থুথু লাগিয়ে ছবি উলটে দেখছে।

মা বললেন, “ছি খোকা, অসভ্যতা কোরো না, রেখে দাও!”

“না, মা ! মাস্টারমশাই আমাকে দেখতে বলেছেন, বলুন না আপনি, বলেননি ? ” “হ্যাঁ হ্যাঁ, আমি ওকে দেখতে বলেছি।” এরা সব একজাতের।

ভদ্রলোক রানাঘাটে নেবে যাবেন। তোমার তৈরি লুচি বের করলুম—“খেতেই হবে।” খোকাকে দিলুম, বোনদের দিলুম। নানা কথা হল—দেশের স্বাস্থ্য, টেনান্সি অ্যাক্ট, কমনওয়েলথ। তারপর তাঁরা নেমে গেলেন। গাড়ি ছাড়ে ছাড়ে, হঠাৎ ভদ্ৰলোক বললেন : “আরে ভালো কথা, আপনার নাম-ঠিকানাটা তো জানা হল না ! বলুন বলুন—তিনি কাগজ কলম বের করলেন। একবার বললুম—শুনতে পেলেন না—আবার বললুম—রহিমুদ্দিন চৌধুরী।

অ্যাঁ?'

“রহিমুদ্দিন চৌধুরী।”

‘অ’।

লিখে নিলেন কিন্তু হাত কাঁপল। ঢোঁক গিলে বললেন, “তা বেশ বেশ ! কিন্তু ধরার উপায় নেই, দেখলে মনে হয় ঠিক বাঙালী—তাই নয় গো ? ”

দেখলে মনে হয় ঠিক বাঙালী—তাই নয় গো ? আমি চেঁচিয়ে বলতে চাইলাম : “এখন কি বুঝলেন তবে পাঞ্জাবি?” কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হল না ।

আবহাওয়াটা সহজ করার জন্যে বোন দুটি তেমনি হেসে বলল – “ভুলে যাবেন না, আসবেন ঠিক—বিডন স্ট্রীট।” হাসবার চেষ্টা করলুম।

গাড়ি ছেড়ে দিল। দেখতে পেলাম খোকার হাত থেকে মা ছুঁড়ে ফেলে দিলেন খাবারটা। তোমার হাতের তৈরি সেই খাবারের টুকরোটা প্ল্যাটফর্মে পড়ে রইল। ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করল— মনে হল কামরাসুদ্ধ লোককে ডেকে বলি: “দেখো তোমরা,—বড় অবিচার হল, দেখো। কেউ কিছু জানল না। আমি চুপচাপ বসে রইলাম—সমস্ত দিনটাই আমার মাটি !

সব কথা এখন আর মনে নেই—মনে রাখতেও চাইনে, মাঝে মাঝে বোন দুটির কথা কানে ভাসছে : 'ভুলে যাবেন না—আসবেন ঠিক—বিডন স্ট্রীট।' মনে মনে বলি:

- “না, তোমাদের ভুলব না বোন—তোমরাই নতুন বাংলা – তোমাদের মুখ চেয়েই যে আমরা বেঁচে আছি—তোমাদের ভুলব না।” চিঠির উত্তর দিও। ...

খামের উপর ঠিকানা লেখা : আমিনা চৌধুরী উজানীপাড়া, হাওড়া -

তোমার রহিম

[দুই]

বৌ-

বাগেরহাট

আজ সকালে অমলের বাসায় এসে উঠেছি। পথে আসতে দেখছি বহু লোক ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে যেতে শুরু করেছে। থমথম করছে সমস্ত শহরটা–লোকে জোরে কথা পর্যন্ত বলছে না। বুঝতেই পারছ, হঠাৎ একেবারে এর মাঝখানে এসে পড়ে হতভম্ব হয়ে গেছি। ব্যাপারটা ভালো করে বোধগম্য হওয়ার আগেই শুনি অমল চাকরিতে ইস্তফা দিয়েছে—মালপত্র বাঁধাছাদা হচ্ছে। দু-একদিনের মধ্যেই ওরা পাকিস্তান ছেড়ে কলকাতায় রওনা হবে। আমাকে ওরা আশা করেনি –অমলের বৌ একটু ফিকে হাসল ।

“ব্যাপার কী অমল? কী খবর বৌদি? তোমরাও শেষকালে চললে ?”

বৌদি হাসবার চেষ্টা করল, “তোমাদের দেশে তো আর আমাদের জায়গা হবে না ঠাকুরপো!”

“আমাদের দেশ? আমাদের দেশ মানে ? খুলনা অমলের দেশ—আমার দেশ ২৪ পরগণা—যাচ্ছ তো আমার দেশেই শুনছি।”

- “আজকাল আর তা নয়- এখন মোছলমানের দেশ পাকিস্তান আর হিন্দুর দেশ হিন্দুস্থান।” অমল বলল বৌদিকে : “তুমি যা করছিলে তাই করো গিয়ে।” জিনিসপত্র গোছাতে বৌদি চলে গেল। চুপচাপ অমলের দিকে চেয়ে বসে রইলাম। অমলের বাচ্চাটা নতুন হামা দিতে শিখেছে—ফুটফুট করছে সুন্দর–সামনে দুটো দাঁত উঠছে। সে তার বাপের পা ধরে দাঁড়াতে গিয়ে ধপ করে পড়ে কেঁদে উঠল। অমলের ভ্রুক্ষেপ নেই।

“শোন্ রহিম, কথা আছে তোর সঙ্গে।”

“বল্, শুনছি।” বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিলুম ৷

অমলের কাছে যা কথা শুনেছি তার মোট কথাগুলো তোমাকে জানাচ্ছি; শহর থেকে কয়েক মাইল দূরে নমঃশূদ্রদের গ্রামে একটা ভীষণ কাণ্ড ঘটে গেছে। নমঃশূদ্ররা বেশির ভাগই চাষি— নয়তো জেলে। স্বভাবতই তারা গরিব। কিছু দিন ধরে জমিদারদের অত্যাচারের বিরুদ্ধে তারা একজোট হচ্ছিল। তাদের দুজন নেতাকে ধরবার জন্য পুলিশ ওয়ারেন্ট বের করে। নেতাদের মধ্যে একজন হিন্দু, একজন মুসলমান। তাদের ধরার জন্য গ্রামে যখন একদল পুলিস ঢোকে চাষিরা তাদের বলে ফিরে যেতে। তাতে কাজ না হওয়ায় কিছুটা উত্তম মধ্যম দিয়ে তারা তাদের বের করে দেয় গ্রাম থেকে। এর পরেই ঘটনার শুরু। বহু আর্মড পুলিস আর বে-সরকারি গুণ্ডা বাহিনী গিয়ে হাজির গ্রামে। স্ত্রীপুরুষ নির্বিচারে শুরু হয় প্রচণ্ড অত্যাচার। গ্রামকে গ্রাম তারা জ্বালিয়ে দেয়—আর যা পায় লুট করে নিয়ে আসে। সমস্ত মানুষ গাঁ ছেড়ে পালাতে শুরু করে— আর্ত চিৎকারে আকাশ বাতাস ভরে ওঠে। এদিকে জোর প্রচার চলতে থাকে যে হিন্দুরা হচ্ছে পাকিস্তানের শত্রু –ওদের তাড়াও। এই সুযোগে শহরে গুণ্ডারা হিন্দুদের কয়েকটা দোকান লুটপাট করে— আগুন দেয়। সদর রাস্তায় ওরা শাসাতে থাকে হিন্দুদের । আনোয়ারকে তোমার মনে আছে? সেই যে স্কাউ**লটা কলেজে একদিন তোমাকে কুৎসিত ইঙ্গিত করেছিল ? শুনেছিলাম একজনের সঙ্গে শেয়ারের বিজনেস করার নাম করে তার যথাসর্বস্ব মেরে দিয়ে পাকিস্তানে চলে এসেছে। এখন শুনি সেই নাকি এখানকার গুণ্ডা বাহিনীর মস্ত বড় কর্তা। তিনিই নাকি লিড করছেন!

শুনে পর্যন্ত রক্ত টগবগ করে ফুটছে। রাসকেলটার যদি একবার দেখা পাই তো ওর টুটি আমি ছিঁড়ে দেব—এ তুমি দেখে নিও ! অমলরা চলে যাচ্ছে— কাল না গেলে পরশু যাবে—নয়তো তার পরদিন। কী বলব ওদের বলো তো? লজ্জায় দুঃখে আমার বুকটা খান খান হয়ে যাচ্ছে। কী যেন আমার একটা করা উচিত, বুঝতে পারছি না । অমলের দেশ ছেড়ে যদি অমলকে চলে যেতে হয়, আমার দেশকেই বা আমি আঁকড়ে থাকব কোন্ যুক্তিতে? ভাবতে খারাপ লাগছে বড়ো। এখানে বিশেষ কাউকে চিনি না । একটি পরিচিত ছাত্রের সঙ্গে দেখা হয়েছে—তারা পিস কমিটি করছে বলল। সব কাজকর্ম এখানে প্রায় বন্ধ। ভাবছি কাল পরশু নাগাদ ঢাকা চলে যাব। সেখানে শুনছি কিছু কিছু কাজ পাবার সম্ভাবনা আছে। অন্য কিছু ভেবো না। আজকের দিনে মানুষকে আর সহজে বেশি দিন বিভ্রান্ত করে রাখা যায় না। মনুষ্যত্ব জয়ী হবেই—এই আশাতেই বুক বাঁধতে হবে। ওখানকার পরিচিতদের কাছে এখানকার সঠিক খবরটা দিও। ...

তোমার রহিম

[তিন]

বৌ—

ঢাকা

তোমার চিঠি পেয়ে আরও ভাবনা বাড়ল। কলকাতার কাগজগুলো খুলনার ব্যাপারকে যদি এইভাবে প্রচার করতে শুরু করে থাকে তাহলে তার সাংঘাতিক ফল ফলবে। যে পয়সা লাভের আশায় ওরা দানবকে জাগিয়ে তুলছে সেই দানবই ওদের ধ্বংস করবে। তবে ওরা বোধ হয় নিশ্চিন্ত যে সময় বুঝে দাঙ্গা বাঁধানো বা থামানো —এটা ওদেরই হাতে! এখানকার কাগজগুলোও ঠিক তাই শুরু করছে। পরস্পরের ওপর সন্দেহ আর অবিশ্বাস ক্রমশ বাড়ছে, কখন কী ঘটে সেই আশঙ্কায় সবার চোখেমুখে বিষণ্ণতা দেখছি, এমন যদি কোন শক্তি থাকত যা এই সমস্ত নোংরামিকে পায়ে মাড়িয়ে মনুষ্যত্বের ধ্বজাকে উঁচুতে তুলে ধরবে, শুধু আমি নয় প্রায় সবাই মনে প্রাণে এই কথাটি অনুভব করছে—কিন্তু সে কই ? এখানে সরকারি মহলে কিছু কাজের আশায় ঘোরাঘুরি করতে হচ্ছে। আমি যে বাঙালি, এই কথাটাই প্রায় ভুলে যেতে বসেছি। তুমি তো জান, আমি পয়সা খরচ করে উর্দু ভাষা শিখেছিলাম। উর্দু সাহিত্যকে আমি ভালোবাসি। কিন্তু যখন সেটা শাসনের দণ্ড হয়ে সোজা ঘাড়ের ওপর পড়তে চায়, আমার সংস্কৃতির টুটি টিপে ধরে, তখন তাকে বর্জন করাই মানুষের কাজ। সকলের কথায় সোজা বাংলায় উত্তর দিই—বুঝলে ভালো, না বোঝে পরোয়া নেই । কাজেই কাজ যে জুটবে না বেশি, তা বোধহয় বুঝতে পার ।

তোমার রবীন্দ্রসংগীতের ক্লাসে যাওয়া বন্ধ করতে হয়েছে জেনে ভারী কষ্ট হচ্ছে। তোমাকে দেখে যারা কথা না বলে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে, আমি অন্তত বিশ্বাস করি তাদের রবীন্দ্রসংগীত শেখবার কোন অধিকার নেই, কিন্তু এ বিশ্বাস হারিও না যে এরা সবাই ভালো—এদের বাদ দিয়ে একা তুমি যাবে কোথায় ? দুর্ভাগ্য দেশের অভিশাপ এখনো কাটেনি, সে দুর্ভাগ্য থেকে তুমি আমি বাদ যাব কেমন করে বলো, বৌ ! মনুষ্যত্বের অপমান যখন দেখি, মনে হয় আগুন হয়ে ছড়িয়ে পড়ে খাক করে দিই এই হতভাগা দেশের পচা আবর্জনাগুলোকে।

সেদিন শুনলুম কয়েকটা চ্যাংড়া ছোঁড়া মিলে সদর রাস্তার ওপরে এখানকার কলেজের পণ্ডিতকে যাচ্ছেতাই অপমান করেছে—টিকি কেটে দিয়েছে, মুখে গোমাংস দিয়েছে জোর করে। ভাবতে পার? আমি শুনে এখানকার মাতব্বরদের বললুম : “আপনারা থাকতে চোখের সামেনে এইসব অনাচার ঘটছে— আপনারা কি ঠিক জানেন যে আপনারা এখনো বেঁচে আছেন ? ”

তাঁরা বললেন : কী করব—ওদের হাতে বন্দুক আছে, পেছনে পুলিশ আছে।

ওরা হুমকি দিয়েছে যে কেউ ওদের বাধা দেবে তারাই পাকিস্তানের শত্রু। তাদের ঘরদোর ওরা জ্বালিয়ে দেবে, তাদের খুন করবে—ইত্যাদি। মাঝে মাঝে সন্দেহ হয় গোটা জাতটারই শিরদাঁড়া বেঁকে গেছে, নইলে কটা আগাছাকে উপড়ে ফেলা যায় না ? আগাছাই বোধহয় জন্মাচ্ছে বেশি—বিশ্বাস করতে কষ্ট হলেও স্বীকার করতে হবে।

এখানে আর মোটে ভালো লাগছে না বৌ। এধারে এসেই বোধহয় ভুল করেছি—তোমাকে ছেড়ে আর এক দণ্ডও থাকতে পারছি না। ... কাজকর্ম চুলোয় যাক্, দু-একদিনের মধ্যেই পাড়ি দেব। অমলের চিঠি পেয়েছি—ওরা আগামী কাল রওনা হবে। কলকাতায় গিয়ে তোমার সঙ্গে দেখা করবে লিখেছে। ওখানেই ওদের থাকার ব্যবস্থা করে দিও। কোনরকমে চলে যাবেই ।

তোমার রহিম

[এর পরের চিঠিটা প্রায় কুড়িদিন পরে লেখা। মনে হয় এর আগে আরও চিঠি লিখেছিলেন—যে কোন কারণেই হোক সেটা নেই । ]

[চার]

আমিনা—

আমি–বোধহয় শীগগিরই পাগল হয়ে যাব। গত সাত দিন ধরে এক সেকেণ্ডের জন্যও ঘুমোতে পারিনি—পাগলের মতো সারা শহরে ঘুরে বেড়িয়েছি। মনে হচ্ছে মনুষ্যত্ব শেষ হয়ে গেছে—বীভৎস তাণ্ডব চলছে পশুত্বের। চারিদিকে চিৎকার, কান্না আর পৈশাচিক উল্লাস। তার ওপর আজ আট দিন তোমার কোন চিঠিপত্র নেই। হাজার হাজার রিফিউজি এসে জড়ো হচ্ছে। তারা বলছে কলকাতায় আর একজন মুসলমানও বেঁচে নেই। বিশ্বাস করা উচিত কিনা সে বিচারের বুদ্ধিও আমার লোপ পেয়ে গেছে। তুমি কোথায় আছ? তুমি এখনও আছ তো? একথা আজ আর কোন মানুষকে জিজ্ঞেস করি না—জিজ্ঞেস করি সূর্যকে, জিজ্ঞেস করি গাছপালাকে—আর জিজ্ঞেস করি, আমার আমিনা কেমন আছে? কোথায় আছে?

অমলের একখানা চিঠি এসেছে। বর্ডার থেকে ওদের মারধোর করে সমস্ত লুটপাট করে নিয়েছে। বৌদিকে ছিনিয়ে নিয়ে চলে গেছে— অমল কোনরকমে বাচ্চাটাকে নিয়ে রানাঘাটে পৌঁছেছে। অমল লিখেছে— “আমার অবস্থার কথা না লেখাই ভালো, তবে এটুকু জ্ঞান এখনও আছে যে এ খবর কলকাতার কাগজওয়ালাদের হাতে পড়া উচিত নয়। যা ভালো হয় করিস। আমি দেহমনে সম্পূর্ণ অথর্ব হয়ে গেছি।” আমি এখনই বেরিয়ে পড়ছি। এখানে আর কয়েক ঘণ্টা থাকলে বোধহয় আত্মহত্যা করে বসব। বৌদিকে খুঁজে বের করতেই হবে। তোমার খবর পেলে মনে অনেকটা জোর পেতুম। জানি না আবার কবে তোমায় দেখব—জানি না দেখব কিনা।

আমার অক্ষমতাকে ক্ষমা কোরো। বড়ো অহংকার ছিল আমার দেশকে আমি চিনে ফেলেছি—সে অহংকার চূর্ণ হয়েছে। মনুষ্যত্বকে বড়ো করতে গিয়ে পশুত্বকে ছোট করে দেখেছি—তাই পশুর প্রতিরোধ শুরু হয়েছে। যেখানেই থাক, যেমন থাক —সাবধানে থেকো। তোমাকে আমি হারাতে পারব না বৌ, অমলের মহত্ব আমার আছে কিনা, সে পরীক্ষা দিতে আমি পারব না। আমি সাধারণ মানুষ। ...

তোমার রহিম।

চিঠি এই কটাই । পড়ার পর হাওড়া উজানীপাড়ায় গিয়ে খোঁজ করেছি শিল্পী রহিমুদ্দিনের বাড়ি কোনটা। কেউ বলেছে—“জানি না।’কেউ বলেছে—‘এ পাড়ায় কোন নেড়ে-ফেড়ে আর নেই মশাই।' একজন পানওয়ালা শেষ পর্যন্ত দেখিয়ে দিল একটা একতলা বাড়ি— তার দুখানা ঘর নিয়ে ওরা থাকত। বাড়িটার শোচনীয় অবস্থা, দরজা জানালার একটারও কপাট নেই— মাঝখানে কেবল একটা চট ঝুলছে। ডাকাডাকি করলে কেউ সাড়া দেয় না। শেষ পর্যন্ত চট সরিয়ে ভেতরে ঢুকে দেখি অন্তত বিশজন মেয়েছেলে—বাচ্ছাকাচ্ছা সুদ্ধ কেউ বসে কেউ শুয়ে রয়েছে। আমাকে ঢুকতে দেখে সবাই যেন চমকে উঠল। বাড়িটার চেয়েও তাদের অবস্থা খারাপ। জিজ্ঞাসা করলাম : “রহিমুদ্দিন চৌধুরী এখানে থাকেন ?”

তারা কেউ নাম শোনেনি রহিমুদ্দিনের— সেদিন সকালে খালি ঘর পেয়ে আশ্রয় নিয়েছে—পূর্ব বাংলার উদ্বাস্তু সব। শুনলাম এরই মধ্যে চারবার হুমকি দেওয়া হয়েছে—রাতের মধ্যে উঠে যেতে হবে। একটি মধ্যবয়সী মহিলা ঘরের এককোণে বসে বমি করতে শুরু করলেন, সবাই নির্বিকার। একধামা খই মুড়ি নিয়ে দুটি ছেলে ঢুকল—দেখে মনে হল স্কুলের ছাত্র। তারাই ওদের এবাড়িতে জোর করে জায়গা দিয়েছে—দেখাশোনা করছে। তাদের জিজ্ঞাসা করলুম। একজন চিনত রহিমুদ্দিনকে—আমিনাকেও চিনত। তার দিদি রহিমুদ্দিনের কাছে ছবি আঁকা শিখতে আসত –সেও আসত দিদির সঙ্গে। তার কাছে সব খবর পেলুম। বলল : “মাস্টারমশাই শুনেছি পাকিস্তানে আছে—কিন্তু আমিনা দিদি বোধহয় বেঁচে নেই। একদিন রাতদুপুরে এই ঘরটায় শিকল বন্ধ করে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। আমরা অনেক চেষ্টা করেছি আগুন নিভিয়ে ওদের উদ্ধার করতে—কিন্তু পারিনি—তখন ভীষণ গুলি চলছিল।” ছেলেটির চোখ ছলছল করতে থাকে। বাড়িটার দিকে চেয়ে দেখলাম—সমস্ত দেওয়ালগুলো পুড়ে কালো হয়ে গিয়েছে— পাশেই একটা নিমগাছ ঝলসে কুঁকড়ে গেছে। আগুন লেগেছিল সত্যিই। নন্দাকে ব্যাপারটা বলিনি—কেননা একটা সন্দেহ আমার হয়েছে আমিনা যদি পুড়েই মরে থাকে—ড্রেসিং টেবিলটা অক্ষত রইল কী করে ?

ছাত্রটি বলেছিল: টেবিলটা ছিল পাশের ছোট ঘরটায়। হয়তো আমিনাও সে ঘরে ছিল। কিন্তু সে গেল কোথায় ?

নন্দার বিশ্বাস, কাগজে খবরটা বেরোলে আমিনা এসে নিয়ে যাবে তার ড্রেসিং টেবিলটা তাই এই কাহিনি লেখা । আয়নাটা নন্দা কাপড় দিয়ে মুড়ে রেখে দিয়েছে।

পরিশিষ্ট

কাহিনির এখানেই শেষ। প্রসঙ্গত একটা ঘটনার উল্লেখ করতে চাই পাঠক-পাঠিকার কাছে। হয়তো তার সঙ্গে এই কাহিনির কোন সম্পর্ক নেই—কিন্তু সাদৃশ্য রয়েছে। গত পয়লা এপ্রিল একটি বাংলা কাগজে খবরটি প্রকাশিত হয়েছে :

“হাওড়া স্টেশনের নিকট গতকাল এক ব্যক্তিকে সন্দেহজনকভাবে ঘোরাফেরা করিতে দেখিয়া পুলিশ গ্রেপ্তার করে। তাহার কাছে একটা ব্যাগের মধ্যে কয়েকটি তুলি ও কিছু স্কেচ ছবি পাওয়া গিয়োছে। সন্দেহ হয় সে হাওড়া স্টেশন ও পুলের প্ল্যান আঁকিয়া নিতেছিল। নাম জিজ্ঞাসা করিলে সে পাগলের ভান করে ও বলে : “একজন মানুষ।”

খবরের হেডলাইনে লেখা – ‘পাকিস্তানের গুপ্তচর গ্রেপ্তার।' -

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%