কমলেশ সেন
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ
সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহ্ আদি নিবাস চট্টগ্রাম। জন্মস্থান অধুনা বাঙলাদেশের নোয়াখালি জেলায় । নোয়াখালি থেকে আসেন কলকাতায় । সেন্ট পলস কলেজে পড়াশোনা করেন এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এম.এ. পাশ করেন। ১৯৪৫-এ স্টেটসম্যান পত্রিকায় যোগ দেন। '৪৭ পর্যন্ত স্টেটসম্যানে কাজ করেন। দেশ বিভাগের পর তিনি পাকিস্তানে যান এবং কেন্দ্রীয় তথ্য বিভাগে কাজ নিয়ে বিদেশে যান। সরকারি চাকরি করেও তিনি চিন্তাভাবনায় ছিলেন বামপন্থী। তাঁর রচনায় এর নজির সর্বত্র ছড়িয়ে আছে। ‘লাল সালু’উপন্যাস তাঁকে খ্যাতির উচ্চ শিখরে তুলে দেয়। কাঁদো নদী কাঁদো'-তেও সেই একই বেদনা-বিধুর সুর বেজে উঠেছে। গল্প গ্রন্থগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য ‘নয়নতারা’, ‘দুই তীর' ইত্যাদি। ১৯৭১, ১০ অক্টোবর প্যারিসে মৃত্যু হয় ।
ধনুকের মতো বাঁকা ইট-সিমেন্টের চওড়া পুলটির একশ গজ পরে বাড়িটা। দোতালা, মস্ত; রাস্তা থেকে খাড়া উঠে গেছে। এদেশে ফুটপাথ নেই, তাই বাড়িটারও একটু জমি ছাড়বার ভদ্রতার বালাই নেই। তবে বাড়িটার পেছনে কিন্তু অনেক জায়গা । গোসলখানা—পাকঘর-পায়খানার মধ্যেকার খোলামেলা স্থানটি ছাড়াও আরও ঢের জায়গা। সেখানে আম-জাম-কাঁঠালের দুর্ভেদ্য প্রায় জঙ্গল, মোটা ঘাসে আবৃত স্যাঁতসেঁতে মাটিতে ভ্যাপসা গন্ধ, আর প্রখর সূর্যালোকেও সূর্যাস্তের ম্লান অন্ধকার ।
অত জায়গা যখন, সামনে খানিকটা ছেড়ে একটা বাগানের মতো করলে কী দোষ হতো? সে কথাই এরা ভাবে। মতিন ভাবে, বাগান না থাক, সামনে একটু জমি পেলে ওরা নিজেরাই বাগান করে নিতো, যত্ন করে লাগাতো মরশুমি ফুল, - গন্ধরাজ-বকুল-হাস্নাহানা, দু-চারটে গোলাপও। তারপর সন্ধ্যার দিকে আপিস থেকে ফিরে ওখানে বসতো। বসবার জন্য না হয় একটা হাল্কা বেতের চেয়ার, নয় ক্যানভাসের আরাম-কেদারা কিনে নিতো। গল্প করতো বসে বসে। আমজাদের হুঁকোর অভ্যাস। সে না হয় বাগানের সম্মান বজায় রাখবার মতো মানানসই একটা নলওয়ালা সুদৃশ্য গড়গড়া কিনে নিতো সন্ধ্যার বিশ্রামবিলাসের জন্য। গল্প-জমিয়ে কাদেরও ছিলো। ফুরফুরে খোলা হাওয়ায় তার গল্পটা কাহিনিময়, হাস্নাহানার গন্ধের সঙ্গে মিশে মধুর হয়ে উঠতো। কিংবা, জ্যোৎস্নারাতে কোন গল্প না করলেই কী এসে যেতো? মুখ-বরাবর আস্তে চাঁদটার পানে চেয়ে চুপচাপ কী বসে থাকা যেতো না? –আপিস থেকে শ্রান্ত হয়ে ফিরে প্রায় রাস্তা থেকে ওঠা দোতলায় যাবার সিঁড়ি ভাঙতে ভাঙতে সে কথা আরও বারবার মনে হয়।
এরা দখল করেছে বাড়িটা। অবশ্য দখল করবার সময় লড়াই করতে হয়নি, অথবা তাদের সামরিক শক্তি অনুমান করে কেউ এমনি হার মেনে নেয়নি। দেশ-ভঙ্গের হুজুগে এ শহরে আসা অবধি উদয়াস্ত তারা একটা যেমন তেমন ডেরার সন্ধানে ঘুরছিলো। একদিন দেখলো ওই বাড়িটা, মস্ত বড় বাড়ি জনমানবহীন অবস্থায় খাঁ খাঁ করছে। প্রথমে তারা বিস্মিত হয়েছিলো। পরে সদলবলে এসে দরজার তালা ভেঙে রৈ রৈ আওয়াজ তুলে বাড়িটায় প্রবেশ করে, বৈশাখের আমকুড়ানো ক্ষিপ্র উন্মাদনায় এমন মত্ত হয়ে উঠলো যে, ব্যাপারটা তাদের কাছে দিনদুপুরে ডাকাতির মতো মোটেই মনে হলো না। মনে কোন অপরাধের চেতনা যদি বা ভার হয়ে নামবার প্রয়াস পেতো, সে ভার তুলোধুনো হয়ে উড়ে যেতো তীক্ষ্ণ সে হাসির ঝলকে।
বিকেলের দিকে শহরে যখন খবরটা গেলো, তখন অবাঞ্ছিতদের আগমন শুরু হলো। মাথার উপর একটা ছাদের আশায় তারা দলে দলে আসতে লাগলো। এরা কিন্তু রুখে দাঁড়ালো। ডাকাতি নাকি? যথাসম্ভব মেজাজ ঠাণ্ডা রেখে বললে, জায়গা কোথায়, সব ঘর ভর্তি। বললে, দেখুন সাহেব, এই ছোট অন্ধকার ঘরেও চার-চারটে বিছানা পড়েছে। এখন তো বিছানা পড়ে দু ফুট বাই তিন ফুটের চারটে চৌকি, খান ছয়েক চেয়ার বা টেবিল এলে ঘরে জায়গা বলে কোন বস্তু থাকবে না। কেউ সমবেদনা করে বললো, আপনাদের তকলিফ বুঝতে পারছি। আমরা কি এ কদিন কম কষ্ট করেছি? তা ভাই, আপনার কপাল মন্দ। যদি চার ঘণ্টা আগে আসতেন। চার ঘণ্টা কেন, ঘণ্টা দুয়েক আগেও তো নীচে কোণের ঘরটা অ্যাকাউন্টস অফিসের মোটা মত একটা লোক এসে দখল করলো। রাস্তার উপর ঘর, তবু মন্দ কী। জানালার কাছেই সরকারি আলো, কোনদিন যদি আলো নিবে যায়, রাস্তার ওই আলোতেই তোফা চলে যাবে।
দেশময় একটা ঘোর পরিবর্তনের আলোড়ন হয়েছে বটে, তবু কোন প্রান্তে সঠিক মগের মুল্লুক বসেনি। কাজেই পরে এ বে-আইনি কাজের তদারক করতে পুলিস এসেছিলো।
পলাতক গৃহকর্তা যে বাড়ির উদ্ধারের জন্য সরকারের কাছে ধরনা দিয়েছিলেন, তা নয়। দখলের কথা জানলে দিতেনও কিনা সন্দেহ। যিনি প্রাণের ভয়ে এত বড় একটা পরিবার দুদিনের জন্য স্রেফ দেশ থেকে উধাও করে দিতে পারেন, তাঁর সম্পর্কে সেটা আশা করা বাড়াবাড়ি। পুলিসে খবর দিয়েছিল ওরাই যারা শহরের অন্য কোন প্রান্তে তখন ডাকাতির ফিকিরে ছিল বলে এখানে চারঘণ্টা আগে বা দু ঘণ্টা আগেও এসে পৌঁছুতে পারেনি। নেহাত কপালের কথা হচ্ছে, এদের কপালও মন্দ হবে না কেন। ভাগ্যের ফলে নিরীহ লোকেরাও আবার রীতিমত লেঠেল হয়ে উঠতে পারে। সত্যি সত্যি লাঠালাঠি না করলেও তার জন্য তৈরি হয়ে থেকে এরা সমগ্র ব্যাপারটা পুলিসকে এমনভাবে বুঝিয়ে দিলো যে সাব-ইন্সপেক্টর দ্বিরুক্তি না করে সদলবলে ফিরে গেলো। রিপোর্ট দেবার কথা। তা এমন ঘোরালো করে রিপোর্ট দিলে যে মর্মার্থ উদ্ধারের ভয়ে তার ওপরতলার কাছে সে রিপোর্ট চাপা দিয়ে রাখাই শ্রেয় মনে হলো । তা ছাড়া, তাড়াতাড়িই বা কী। যারা পালিয়ে গেছে তাদের প্রতি সমবেদনার কোন কথা ওঠে না এবং বাড়ির নিরুদ্দিষ্ট মালিক যদি এসে কিছু না করে তবে কেন অনর্থক মাথাব্যথা। তা ছাড়া, এরা কেরানি হলেও ভদ্রলোকের ছেলে, দখল করে আছে বলে জানালা দরজা ভেঙে ফেলেছে বা ছাদের আস্ত আস্ত বিম সরিয়ে সোজা চোরাবাজারে চালান করে দিচ্ছে, তা নয় ।
রাতারাতি সরগরম হয়ে উঠলো বাড়িটা। এদের অনেককেই কলকাতায় ব্লকম্যান লেনে, খালাসিপট্টিতে, বৈঠকখানায় দপ্তরিদের পাড়ায়, সৈয়দ সালেহ লেনে তামাক-ব্যবসায়ীদের সঙ্গে অথবা কমরু খানসামা লেনের অকথ্য দুর্গন্ধ নোংরার মধ্যে দিন কাটাতে হয়েছে। এ বাড়ির বড় বড় কামরা, নীলকুঠি দালানের ফ্যাশানে দেওয়ালে মস্ত মস্ত জানালা, পেছনে খোলামেলা উঠোন, আরো পেছনে বনজঙ্গলের মতো আম-জাম-কাঁঠালের বাগান এদের কী যে ভালো লেগেছে বলবার নয়। একেকজন বেলাটের মতো এক-একখানা ঘর দখল করে নেই সত্যি, তবু ঘরে নির্ঝঞ্ঝাট হাওয়া চলাচল এবং আলোর ছড়াছড়ি দেখে অত্যন্ত খুশি। এবার মনে হয় বাঁচল, ফরাগত মত থেকে আলোবাতাস খেয়ে জীবনে এবার সতেজ সবুজ রক্ত ধরবে, হাজার দু-হাজারওয়ালাদের মতো মুখে জৌলুস আসবে, দেহ ম্যালেরিয়া কালাজ্বরের জীবাণু থেকে মুক্ত হবে।
যেমন ইউনুস থাকতো ম্যাকলিয়ড স্ট্রিটে। সাহেবি নাম হলে কী হবে, গলিটার এক-এক অংশ যেন সকাল বেলাকার আবর্জনাভরা আস্ত ডাস্টবিন। সে গলিতেই নড়বড়ে ধরনের কাঠের দোতালায় কচ্ছদেশীয় চামড়া ব্যবসায়ীদের সঙ্গে সে থাকতো । কে কবে বলেছিলো চামড়ার গন্ধ নাকি ভালো, যক্ষ্মার জীবাণু ধ্বংস করে। তা ছাড়া, সে উৎকট গন্ধ ড্রেনের পচা ভোসকা গন্ধও বেমালুম ডুবিয়ে দিত; ঘরের কোণে দশদিন ধরে ইঁদুর কিংবা বিড়াল মরে পচে থাকলেও নাকে টের পাবার জো ছিলো না। ইউনুস ভাবতো, মন্দ কী। অন্ততপক্ষে যক্ষ্মার জীবাণু ধ্বংস হবার কথাটা মনে বড় ধরেছিলো। শরীরটা তার ভালো নয় তেমন; রোগাপটকা দুর্বল মানুষ। এখানে দোতালার দক্ষিণ দিকের বড় ঘরটায় জানালার পাশে শুয়ে সূর্যালোকের সোনালি ঝলকানি ম্যাকলিয়ড স্ট্রিটের আস্তানার কথা মনে করে শিউরে ওঠে। ভাবে, এতদিন কী হয়ে গেছে কে জানে! টাকা থাকলে বুকটা একবার দেখিয়ে আসত ডাক্তারকে। সাবধানের মার নেই ৷
ভেতরে রান্নাঘরের বাঁ ধারে একটা চৌকোণে আধ হাত উঁচু ইটের মঞ্চের ওপর একটি তুলসীগাছ। একদিন সকালবেলায় নিমের ডাল দিয়ে মেছোয়াক করতে করতে মোদাব্বের উঠোনে পায়চারি করছে, হঠাৎ তার নজরে পড়লো তুলসীগাছটি। মোদাব্বের হুজুগে মানুষ, একটু কিছু হলেই প্রাণ-শীতল-করা রৈ রৈ আওয়াজ উঠিয়ে দেয়। এরা সব উঠে এলো । যতটা আওয়াজ ততটা গুরুতর না হলেও কিছু তো অন্তত ঘটেছে।
এই তুলসীগাছটা । এটাকে উপড়ে ফেলতে হবে। আমরা যখন এসেছি বাড়িতে কোন হিন্দুয়ানি চিহ্ন থাকবে না ।
সবাই তাকালো সেদিকে। খয়েরি রঙের আভায় গাঢ় সবুজ পাতাগুলো কেমন ম্লান হয়ে আছে। নীচে ক-দিনের অযত্নে ঘাস গজিয়ে উঠেছে। আশ্চর্য এটা এতদিন চোখেই পড়েনি, কেমন যেন লুকিয়েছিল।
ওরা কিন্তু হঠাৎ স্তব্ধ হয়ে গেলো। যে বাড়ি এত শূন্য মনে হয়েছে, সিঁড়ির ঘরের দেয়ালে কাঁচা হাতে লেখা কটা নাম থাকলেও এমন বে-ওয়ারিশ ঠেকেছে যে, বাড়ির চেহারা হঠাৎ বদলে গেলো। তুলসীগাছটা আচমকা ধরা পড়ে গিয়ে অনেক কথা যেন বলে উঠলো ।
এদের স্তব্ধতা দেখে মোদাব্বের আরেকটা হুঙ্কার ছাড়লো। ভাবছো কী ? কথা নেই, উপড়ে ফেলো।
হিন্দু রীতিনীতি এদের ভালো জানা নেই । তবু কোথায় শুনেছে হিন্দুবাড়িতে প্রতি দিনান্তে গৃহকর্ত্রী তুলসীগাছের তলে সন্ধ্যাপ্রদীপ জ্বালায়, গলায় আঁচল দিয়ে প্রণাম করে। ঘাস-গজিয়ে ওঠা পরিত্যক্ত চেহারার এ তুলসীগাছের তলেও প্রতি সন্ধ্যায় কেউ প্রদীপ দিতো। আকাশে যখন সন্ধ্যাতারাটি বলিষ্ঠ একাকিত্বে উজ্জ্বল হয়ে উঠতো, ঠিক সেই সময় ঘনায়মান ছায়ার মধ্যে আনত সিঁদুরের নীরব রক্তাক্ত স্পর্শে একটি শান্ত ধীর প্রদীপ জ্বলে উঠতো প্রতিদিন, হয়তো বছরের পর বছর এমনি জ্বলছে। ঘরে দুর্দিনের ঝড় এসেছে, হয়তো কারো জীবনপ্রদীপ নিবে গেছে, তবু হয়তো এ প্রদীপ দেওয়ার অনুষ্ঠান একদিনের জন্যও বন্ধ থাকেনি
যে গৃহকর্ত্রী বছরের পর বছর এ তুলসীতলে প্রদীপ দিয়েছে, সে আজ কোথায় ? কেন চলে গেছে? মতিন এক সময় রেলওয়েতে কাজ করতো। সে ভাবে, হয়তো কলকাতায়, নয় আসানসোলে, নয়তো বৈদ্যবাটি বা হাওড়ায় কোন আত্মীয়ের আস্তানায়। লিলুয়াও বা নয় কেন? বিশাল রেলইয়ার্ডের পাশে মসৃণ একটি চওড়া লাল পাড়ের শাড়ি ঝুলছে হয়তো। সেটা এ গৃহকর্ত্রীরই। কিন্তু যেখানেই থাকুন, আকাশে যখন দিনান্তের ছায়া ঘনিয়ে ওঠে তখন হয়তো প্রতি সন্ধ্যায় এ তুলসীতলার কথা মনে করে গৃহকর্ত্রীর চোখ ছলছল করে ।
গতকাল থেকে ইউনুসের সর্দি-সর্দি ভাব। সে কথা বললে, থাক না ওটা। আমরা তো আর পূজা করতে যাচ্ছি না। বরঞ্চ ঘরে একটা তুলসীগাছ থাকলে ভালই। সর্দি-কফে তার পাতার রস উপকারী।
মোদাব্বের এধার ওধার চাইলো। সবার যেন তাই মত। ওদের মধ্যে এনায়েত মৌলবি ধরনের মানুষ। মুখে দাড়ি, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ পড়ে, সকালে নাকি কোরান তালাওয়াতও করে। সে পর্যন্ত চুপ। প্রতি সন্ধ্যায় ছলছল করে ওঠা গৃহকর্ত্রীর চোখের কথা কি ওর মনে হলো ? অক্ষত দেহে তুলসীগাছটা বিরাজ করতে থাকলো । বাড়িটার আবহাওয়া ভালো। কলকাতায় ঝিমিয়ে আসা নিস্তেজ ভাবটা যেন কেটে গেছে। আড্ডাও তাই জমে ভালো, দেখতে না দেখতে মুখে ফেনা ওঠা তর্ক-বিতর্ক লেগে যায় । সামাজিক, রাষ্ট্রীয়, অর্থনৈতিক সবরকম আলোচনা। সাম্প্রদায়িকতার কথাও ওঠে মাঝে মাঝে
—ওরাই তো মূল, মোদাব্বের বলে।
বলে হিন্দুদের নীচতা ও গোঁড়ামির জন্যই তো আজ দেশটা এমন ভাগ হয়ে গেল।
তারপর তাদের অবিচার-অত্যাচারের ভূরিভূরি দৃষ্টান্ত দেয়। রক্ত গরম হয়ে ওঠে সবার। দলের ভেতর বামপন্থী নামে চালু মক্সুদ মিঞা কখনো কখনো প্ৰতিবাদ করে। বলে, অতটা নয়। এতটা হলেও আমরা কম কী। মোদাব্বের দাঁত খিঁচিয়ে ওঠে। দেখে তথাকথিত বামপন্থীর কাঁটা নড়ে। সে হাল ছেড়ে দিয়ে ভাবে, কে জানে বাবা আমরাও হলফ করে বলতে পারি দোষটা ওদের, ওরাও শালা তেমনি হলফ করে বলতে পারে দোষটা আমাদের। ব্যাপারটা বড় ঘোরালো, বোঝা মুশকিল। ভাবে হয়তো আমরাই ঠিক। আমাদের ভুল হবে কেন? আমরা কি জানি না আমাদের ?
কাঁটা সংশয়ে দুলে দুলে হঠাৎ ডানে হেলে গিয়ে স্থির হয়ে গেলো। কাঁটাটি কখনো কখনো না বুঝে বাঁয়ে হেলে আসে বলেই ওর বামপন্থীর অপবাদ ।
পায়খানার দিকে যেতে যেতে রান্নাঘরের পাশে তুলসীগাছটি চোখে পড়ে। কে আগাছা সাফ করে দিয়েছে। পাতাগুলো শুকিয়ে উঠে খয়েরি রং ধরেছিল, আবার যেন গাঢ় রঙের মধ্যে কেমন সতেজ হয়ে উঠেছে। কে তার গোড়ায় পানি দিচ্ছে। অবশ্য খোলাখুলি ভাবে, লোক দেখিয়ে দিচ্ছে না। সমাজে চক্ষুলজ্জা বলে একটা কথা তো আছে।
ইউনুস ভেবেছিল ম্যাকলিয়ড স্ট্রিটের চামড়া-ব্যবসায়ীদের নোংরা আস্তানায় আর কখনো ফিরে যেতে হবে না—এখানে আলোবাতাসের মাঝে জীবনের জন্য সে বেঁচে গেলো। কিন্তু সে ভুল ভেঙেছিলো। শুধু ইউনুস কেন সবাই—যারা ভেবেছিল এ মন্দার দিনে ভালো করে খেতে না পাক, বাড়িতে প্রয়োজনমত জীবনের দুষ্প্রাপ্য আরামটুকু ভোগ করবে—তারা প্রত্যেকে ভুল করেছিল। তবু যাহোক সামনে জমি নেই। থাকলে ওরা আজ বাগান করতো এবং সেই সময়ে অন্য কিছু না হোক, গাঁদাফুলের গাছ বড় হয়ে উঠতো। তাহলে কী প্রচণ্ড ভুলই না হতো ।
মোদাব্বের হন্তদন্ত হয়ে এসে বললো, পুলিশ এসেছে। কেন? ভাবলো, হয়তো রাস্তা থেকে পালিয়ে একটা ছ্যাঁচড়া চোর বাড়িটায় এসে ঢুকেছে। কিন্তু সেটা খরগোশের মতো কথা হলো। শিকারির সামনে পালাবার আর পথ না পেয়ে হঠাৎ বসে পড়ে চোখ বুজে খরগোশ ভাবে, কই আমাকে কেউ দেখতে পাচ্ছে না। তারাই তো চোর, কেবল গা ঢাকা দিয়ে না থেকে চোখ বুজে আছে।
পুলিশের সাব-ইনস্পেক্টর সাবেকি আমলের হ্যাট বগলে রেখে তখন দাগপড়া কপালের ঘাম মুছছে। কেমন একটা নিরীহ ভাব। পিছনের বন্দুকধারী কনস্টেবল দুটোকে মস্ত গোঁফ থাকা সত্ত্বেও আরও নিরীহ দেখাচ্ছে। ওরা নিস্তব্ধ ভাবে কড়িকাঠ গুনতে লাগলো। ওপরে ঘুল-ঘুলির খোপে একজোড়া কবুতর বাসা বেঁধেছে। একটা সাদা, আরেকটা ধূসর। তাও দেখতে পারে তারা তাকিয়ে তাকিয়ে। হাতে বন্দুক আছে কিনা।
মতিন সবিনয়ে বললো, -
—আপনার কাকে দরকার ?
—আপনাদের সবাইকে। আপনারা বে-আইনি ভাবে এ বাড়ি কবজা করেছেন। চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে আপনাদের এ বাড়ি খালি করে দিতে হবে—বলে অর্ডার দেখালো।
বাড়ির কর্তা তাহলে ফিরে এসেছে। ট্রেন থেকে নেমে এখানে এসে কাণ্ডটা দেখে সোজা থানায় চলে গেছে। এখন সঙ্গে এসেছে কিনা দেখবার জন্য আফজল একবার গলা উঁচিয়ে দেখলো । কেউ নেই। পেছনে কেবল গোঁফওয়ালা বন্দুকধারী কনস্টেবল দুটো।
-কেন ? বাড়িওয়ালা কি নালিশ করেছে ?
—গভর্নমেন্ট বাড়ি রিকুইজিশন করেছে।
অনেকক্ষণ স্তব্ধ হয়ে থাকলো তারা। অবশেষে মতিন বললে,–
—আমরা তো গভর্নমেন্টরই লোক।
মাঝেমাঝে মানুষের নির্বুদ্ধিতা দেখে অবাক হতে হয়। কথা শুনে নিস্তব্ধ কনস্টেবল দুটো পর্যন্ত কড়িকাঠ থেকে চোখ নামিয়ে তাকালো তাদের পানে, ভাবাচ্ছন্ন চোখ হঠাৎ কথা কয়ে উঠলো।
বাড়িতে এরপর একটা ছায়া নেমে এলো । ভাবনার অন্ত নেই। কোথায় যাই এই চিন্তা। কেউ কেউ রেগে উঠে বলে, কোথাও যাব না, এইখানেই থাকবো । দেখি কে ওঠায়। কেউ যদি এ বাড়ির চৌকাঠ পেরোয় তবে সে আমাদের লাশের উপর দিয়ে আসবে। (কোথায় ছাত্ররা নাকি এমনি এমনি গায়ের জোরে একটা বাড়ি দখল করে আছে। তাদের ওঠাবার চেষ্টা করে সরকারের উচ্চতম কর্তারা পর্যন্ত নাকি নাস্তানাবুদ হয়ে গেছে। সে কথাই স্মরণ হয়।) অবশেষে রক্ত তাদের গরম হয়ে ওঠে। বলে কখনো ছাড়বো না। যে আসে আসুক, কিন্তু সে যেন একথা জেনে রাখে যে, তাকে আমাদের লাশের উপর দিয়ে আসতে হবে।
ক-দিন গরম রক্ত টগবগ করলো। কাজে মন নেই, খাওয়ায় মন নেই । কেবল কথা, তিক্তরসে সিঞ্চিত ঝাঁঝালো কথা। কিন্তু ক্রমশ কথা কমতে লাগলো। এবং এদের কথা থামলে রক্ত ঠাণ্ডা হতে ক-দিন ।
এরা তো আর ছাত্র নয়। এরা যে কী, সে কথা দর্প করে সেদিন পুলিশকে নিজেরাই তো বলেছিল, কেন, আমরা তো গর্ভনমেন্টের লোক।
একদিন তারা সদলবলে চলে গেলো। যেন ঝড়ের মতো চলে গেলো, ঘরময় ছিটিয়ে রেখে গেলো পুরোনো খবর কাগজের টুকরো, কাপড় ঝোলাবার দড়ির একটা দুর্বল অংশ, বিড়ি-সিগারেটের টুকরো, বা ছেঁড়া জুতোর গোড়ালিটা। নীলকুঠি -বাড়ির ফ্যাশানে তৈরি দরজা-জানালাগুলো খাঁ খাঁ করতে লাগলো। কিন্তু সে আর ক-দিন। রঙ-বেরঙের পর্দা ঝুলবে সেখানে ৷
পেছনে রান্নাঘরের পাশে তুলসীগাছটা কেমন শুকিয়ে উঠেছে। তার পাতায় আবার খয়েরি রঙ ধরেছে। যেদিন পুলিশ এসে বাড়ি ছাড়বার কথা জানিয়ে গেলো সে দিন থেকে তার গোড়ায় কেউ পানি দেয়নি। তুলসীগাছের কথা না হোক, গৃহকর্ত্রীর ছলছল চোখের কথাও কি এদের মনে পড়েনি ?
কেন পড়েনি সে কথা কেবল তুলসীগাছ জানে, যে তুলসীগাছকে মানুষ বাঁচাতে চাইলে বাঁচাতে পারে, ধ্বংস করতে চাইলে এক মুহূর্তে ধ্বংস করতে পারে অর্থাৎ যার বাঁচা বা সমৃদ্ধ হওয়া আপন আত্মরক্ষার শক্তির উপর নির্ভর করে না ।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন