দলিল

কমলেশ সেন

নারায়ণ ভারতী

দলিল

নারায়ণ ‘ভারতী’ সিন্ধি ভাষা-ভাষী লেখক। মূলত ছোট গল্পকার। দেশ বিভাগের পর অন্যসব হিন্দু সম্প্রদায়ের মতো তাঁকেও চিরদিনের জন্যে মাতৃভূমি সিন্ধু ছেড়ে চলে আসতে হয়। এই লক্ষ লক্ষ সিন্ধি শরণার্থী ভারতবর্ষের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েন। সিন্ধি ভাষা-ভাষী কোন অঞ্চল বা ভূখণ্ড এপ্রান্তে না থাকায় দেশ বিভাগের পর এই সাহিত্য ভারতে মাটিতে তেমনভাবে দানা বেঁধে উঠতে পারেনি। তবু সিন্ধি ভাষা-ভাষী লেখকরা লড়াই করে চলেছেন—তাঁদের ঐতিহ্যময় ভাষা এবং সাহিত্যকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে। নারায়ণ ‘ভারতী' তাঁদের মধ্যে একজন।

গতকাল ক্লেমস অফিসারের দপ্তরে মন্ধনলালের হাজিরার তারিখ ছিল। দলিল-দস্তাবেজ আর রসিদ বই ইত্যাদির পুটলির বাঁধন খুলল ও। খুলে কাগজপত্রের ওপর মৌমাছির মতো তীক্ষ্ণ দৃষ্টি মেলে ও যেন ভনভন করে উড়ে উড়ে কিছু দেখতে লাগল। দেখতে দেখতে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ওর বুকের গভীর থেকে উৎসারিত হল। জমি এবং বাড়ির জন্যে ও ক্লেম করেছে। পার্টিশনের জন্যে সিন্ধুতে যে বসতবাড়ি এবং সম্পত্তি ছেড়ে এসেছে, গতকাল তারই জন্যে ক্লেম অফিসারের দপ্তরে ওকে হাজিরা দিতে হয়েছিল। বাড়ির ক্লেম সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় কাগজপত্র আলাদা করে রাখল মন্ধনলাল।

কাগজপত্রগুলো দেখতে দেখতে চোখের সামনে ছায়াছবির মতো অনেকগুলো দৃশ্য একের পর এক ভেসে উঠতে লাগল ওর। কয়েকটা দলিল প্রায় দশ বছর আগেকার। কয়েকটা বছর বিশেকের পুরনো। আর কয়েকটা তো হবে চল্লিশ বছর আগেকার। তাদের বাড়ির দরজা জানলা তৈরি করেছিল সিদ্দিক ছুতোর। বাড়ির পাশেই সুমরের বাড়ি ৷ সুমর চন্দনের জমি চাষ-আবাদ করত। আজ ... না জানি কত কথাই তার মনের কোণে উঁকিঝুঁকি মারছে। হঠাৎ একটা দলিলের ওপর গিয়ে ওর দৃষ্টি থেমে গেল। এক নিশ্বাসে ও দলিলটা পড়ে ফেলল। দলিলে লেখা ‘নবী বক্সের পুত্র, আমি রসুল বক্স, বৃত্তি চাষ-আবাদ, বয়স তিরিশ, গ্রাম মিরল, তহসিল কম্বর, জেলা লাডকানা, আমি স্বেচ্ছায় এবং স্বজ্ঞানে আমার বসত বাটি ... শেঠ মন্ধনলালের কাছে বিক্রি করিয়া এই কবলা করিয়া দিলাম।”

মন্ধনলাল আর পড়তে পারল না। ওর হৃদয় ব্যথায় মুচড়ে উঠল। রসুল বক্সের বসতবাড়ি, তার স্ত্রী আর ছেলের মুখ ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল। রসুলের ছেলে দেখতে কী আদুরেই না ছিল। দোকানের সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় ও আধো-আধো গলায় ডেকে বলত, “বাবুজি, আমাকে গরু চরানোর জন্যে রাখবে না ? আমি তোমার গরু চরাবো।” বলতে বলতে মিছিমিছি গরু চরানোর ভঙ্গি এবং শব্দ করে এগিয়ে আসত। ফসলের মৌসুমে মন্ধনলাল রসুলকে ডেকে কিছু আনাজ-তরকারি দিয়ে বলত, “তোমার রমজানকে দিও। ও আমার গরুর রাখাল না!” তারপর তারা দু’জনেই রমজানের আধো আধো কথাগুলো স্মরণ করে হো হো করে হেসে উঠত ।

দেশ বিভাগের বছর খানেক আগে, রসুল বক্স একদিন মন্ধনলালের কাছে এল । ঘটনাটা এখনও সে ভুলতে পারেনি। মন্ধলালকে বলল, “বাবুজি, আমার জমি যে খালি পড়ে একেবারে শুকিয়ে যাবে। গরীব মানুষ, মারা পড়ব। বীজ কেনার মতো একটি কানাকড়িও যে আমার নেই।”

ওর কথা শুনে মন্ধনলাল তেলে বেগুনে জ্বলে ওঠে, “মিঞা সাহেব, তোমার কাছে আমি এখনও দু’শ টাকা পাই। আজ পর্যন্ত তুমি তা শোধ করনি। আবার ধারে জন্য এসেছ। একটি পয়সাও আমি তোমাকে ধার দিতে পারব না। অন্য কারো কাছে যাও।” বলে মন্ধনলাল হুঁকোর ওপর কল্কে রেখে, জুতোয় মচমচ শব্দ তুলে যাওয়ার জন্যে পা বাড়াল। রসুল বক্স চৌকাঠ থেকে উঠে বারান্দায় এল। এসে মাথা থেকে পাগড়ি খুলে মন্ধনলালের পায়ের ওপর রেখে বলল, “বাবুজি, গরিবের ওপর দয়া কর। আমার কাছে এক রতি জিনিস নেই, যা বন্ধক দিয়ে ধার পাব। বিয়ের সময় মঞ্জীর বৌ-এর গলার যে একছড়া হার ছিল, তাও জসু বেনিয়ার কাছে বন্ধক দিয়েছি। কাপড়ের প্রয়োজন ছিল। ন্যাংটা তো আর থাকতে পারি না ! আটা আর কাপড়— এ দুটো জিনিস না হলে কে আর বেঁচে থাকতে পারে বল ?”

মন্ধনলাল সুর নরম করে বলল, “বেশ, বেশ মিঞা। এসেছ যখন নিরাশ করব না। বাপ-দাদার আমল থেকে কর্জ নিচ্ছ, আমার কাছে না এলে আর কার কাছেই বা যাবে? কিন্তু ভাই, টাকা-পয়সার ব্যাপার। সবসময় সবার একরকম অবস্থা যায় না । তাছাড়া দিনকাল যা পড়েছে, তাতে নিজের ছেলেকেই বিশ্বাস করা যায় না ! ... পঞ্চাশ টাকা নিয়ে যাও। দেড়শ টাকা তো তোমার কাছে পাওনাই আছে, মোট দুশ টাকার পরিবর্তে তোমার বসতবাড়িটা লেখাপড়া করে দিয়ে যাও।”

রসুল বক্স বিড়বিড় করে বলল, “বাবুজী একমাত্র এই বসতবাড়িটাই আমার সম্পত্তির মধ্যে বেঁচে রয়েছে, তাও যদি ...”

তাকে বাধা দিয়ে মন্ধনলাল বলল, “মিঞা, তোমার কাছ থেকে এ বাড়ি কে ছিনিয়ে নিচ্ছে! বাড়িতে তুমি যেমন আছ, তেমনিই থাক। ভগবান তোমাকে যখন দিন দেবে, তখন নিজের জায়গা তুমি ফিরে পাবে। মাসে শুধু দুটাকা করে দিয়ে যাবে। এই দুটাকাও যদি না নিই তবে ওপরওয়ালার কাছে কী কৈফিয়ৎ দেব? এই সামান্য কটা টাকা না নিলে বেনিয়ারা বলে বেড়াবে, দেখ মন্ধনলাল রসুলকে ... ‘ তোমাকে আর বেশি কী বলব, তুমি সমঝদার মানুষ, সবইতো বুঝতে পারছ।”

… বসতবাড়ি লেখাপড়া হয়ে গেল। সেদিনের সমস্ত ঘটনাই আজ মন্ধনলালের এক এক করে মনে পড়ে যায়। মনে হয়, যেন এই সেদিন ঘটেছে। ওর দুচোখ জলে ভরে ওঠে : জানি না, রসুল কোথায়? আমার কথা কি ওর মনে আছে ? এই দলিল-দস্তাবেজ কি মন্ধনলাল ক্লেম অফিসারের কাছে পেশ করবে? রসুলই তো এখন ওই বাড়ির হক মালিক । অথচ দুশ টাকা তো ও কবে শোধ করে দিয়েছে। কিন্তু আগামীকাল ক্লেম অফিসে এইসব দলিলপত্র পেশ করলেই মন্ধনলাল টাকা পেয়ে যাবে। পাকিস্তান সরকার রসুলের কাছ থেকে বাড়ি ছিনিয়ে নিয়ে নিলামে চড়াবে । কিন্তু রসুল কোথায় মাথা গুঁজবে? … এখানে—এই হিন্দুস্থানে আসার সময়, রসুল হায়দ্রাবাদ পর্যন্তওর সঙ্গে এসেছিল। ওকে পৌঁছে দিয়ে ও চলে যায়। বেচারা গাড়ি-ভাড়া পর্যন্ত নেয় নি। বলেছিল, “বাবুজি, এ আমার একান্ত কর্তব্য। কোরানে লেখা আছে, ‘পাড়া-পড়শির সঙ্গে ভাই-বেরাদরের মতো বাস কর। ... বাবুজি, তুমি কি আর ফিরে আসবে না?”

… আর, আজ কিনা আমি তার মাথা গুঁজবার ঠাঁইটুকুও কেড়ে নিতে যাচ্ছি। বসবাসের জন্যে সবারই মাথারও ওপর ছাদ চাই। মন্ধনলালের দুচোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। কালো কালিতে লেখা দলিলের হরফগুলোর ওপর চোখ বোলাতে বোলাতে ও আবেদনের বয়ানগুলো ছিন্নভিন্ন করে ফেলল ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%