কমলেশ সেন
রা ঙ্গেয় রা ঘো
রাঙ্গেয় রাঘো হিন্দি সাহিত্যের অন্যতম কথাশিল্পী। নবীন এবং প্রবীণের মাঝে দাঁড়িয়ে তিনি বর্তমান ও অতীতের মধ্যে এক যোগসূত্র রচনা করে চলেছেন। এক সময় তিনি প্রগতি সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। লিখেছেন অসংখ্য উপন্যাস এবং ছোটগল্প। এবং আজও দাপটের সঙ্গে লিখে চলেছেন । তাঁর অধিকাংশ রচনার মধ্যে জনমানস – বিশেষ করে নীচুতলার মানুষ বারবার উঠে এসেছে। দেখিয়েছেন সামন্ততান্ত্রিক শোষণ এবং উৎপীড়ন। ‘কব তক পুকারু’ এমনই এক উপন্যাস। ‘রাই আউর পর্বত'-এ এনেছেন এক নতুন মূল্যবোধ দক্ষিণ ভারতের মানুষ হয়েও তিনি হিন্দি ভাষাকেই তাঁর সাহিত্য প্রতিভার মাধ্যম করে নিয়েছেন।
যখন কোনখানে একটা ঘরের সন্ধান মিলল না, তখন আমরা কোন উপায় না দেখে পরস্পরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করতে লাগলাম।
আমার স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, “সত্যি খোঁজ করেছিলে ?”
আমি রাগে ঠোঁট কামড়িয়ে বললাম, “গিয়েছিলাম, চেষ্টার কোন ত্রুটি করিনি। কিন্তু কেউ-ই কথায় কোন কান দেয় না। এরা আবার নিজেদের হিন্দু বলে পরিচয় দেয়!”
বোন জিজ্ঞেস করল, “এখন তবে কী করা যাবে ?”
আমি রাগে জ্বলে উঠলাম, “বিষ খেয়ে নে।
তারপর স্টেশনের সামনে যে গাছ, সেই গাছের ছায়ার নীচে আমরা আশ্রয় নিলাম। এখানে আমরা ঘুমনোর কোন ব্যবস্থা করলাম না, বলা যায় পড়ে রইলাম।
অনেক, অনেক দিন হয়ে গেল। সব কিছুই অমি ভুলে যেতে চাইলাম। যার কাছেই যাই, সেই-ই টালবাহানা করে। যাদের শক্তি সামর্থ্য এবং টাকা পয়সা আছে, তাদের কোন হৃদয়ের বালাই নেই। আর যাদের হৃদয় আছে এবং আমাদের মতো শরণার্থী নয়, তাঁদের কোন শক্তি নেই।
ঘরের জন্যে উদ্বিগ্নতা ক্রমেই বেড়ে চলল। কতোদিন আর এই গাছের নীচে দিন গুজরানো যায়! যারা যাযাবর তাদের অন্তত মাথা গুঁজবার মতো একটা তাঁবুটাবু আছে, আমাদের তাও নেই। বাচ্চাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। লিভার বড় হয়ে গিয়েছে। ওর মা ওর দিকে তাকিয়ে শুধু কাঁদে। গোটা কয়েক ইট-পাথর জোগাড় করে উনুন বানিয়ে নিয়েছি। সেই উনুনে খোকার মা খাবার বানায়। আর আমি দিনমজুরি করি। দিনমজুরি করে যা পাই তাতেই কোন রকমে চালিয়ে নিই ।
নোংরা মজুররা ক্লান্ত হয়ে যেখানে বসে বিশ্রাম নেয়, আমিও সেখানে বসি । শহরের অবস্থা ভালো নয়। হিন্দু এবং মুসলমানরা দাঙ্গায় জড়িয়ে পড়েছে। হামিদ আমাকে প্রতিদিন জিজ্ঞেস করে, “বলো তো কোথায় যাওয়া যায় ?”
“পাকিস্তানে যাও, পাকিস্তানে।”
“পাকিস্তানে গেলে কী পাব ?”
বলেছিলাম, “আমি এখানে যা পেয়েছি, তাই-ই পাবে।”
আমাকে আর একটি কথাও জিজ্ঞেস না করে হামিদ চলে গেল। ভাবতে লাগলাম, আমি কি ঠিক-ঠিক জবাব দিইনি। এরপর আমি আর বিশেষভাবে কিছু ভাবতে বা চিন্তা করতে পারলাম না।
একটা ঘর .............
মাথার ওপর আচ্ছাদন 1
একটা আশ্রয়
বাচ্চাটা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। বজ্জাতটা কিছুই বোঝে না। ওর মা ওকে চুপ করায়—সান্ত্বনা দেয়। অবশেষে ও ঘুমিয়ে পড়ে।
আমি বললাম, “পাগড়ি (সেলামি) চায়। সবার মাথা নাঙ্গা হয়ে গিয়েছে কিনা ! ” “কত চায় ?”
“তিনশ – পাঁচশ এরকম।” -
বোন কোন কথা বলল না। স্ত্রী বলল, “বেশি ভাড়া দিলে দেবে না ? ”
“এমন দরদী মানুষ কোথায় পাবে ? ”
বোন বলল, “গাছের নীচেই কাটিয়ে দেব।”
স্ত্রী প্রতিবাদ করে বলল, “শীতের সময় কী হবে।”
বাচ্চাটা আবার কেঁদে উঠল। আমি বিরক্তিতে খিঁচিয়ে উঠলাম। “না, ও আমার মরণ না দেখে কান্না থামাবে না দেখছি।”
বোন ওর কান্না থামায়। আমরা আবার কথা বলতে শুরু করি। “আগে জানলে কি আর এখানে পড়ে মরতে আসি?”
আমি কম্পিত কণ্ঠে বললাম, “এখন তো আর ফিরে যাওয়া যায় না।”
বোন বলল, “মানুষ আর মানুষ নেই। কোন শরণার্থীকেই না হয় বলো না।” “তারা তো যে যার বোঝাতেই পিষে মরছে।”
“নতুন নতুন বাড়ি নাকি তৈরি হচ্ছে?”
“হ্যাঁ।”
তারপর আবার রাত্রির নিস্তব্ধতা নেমে এল। স্ত্রী হাত-পা ছড়িয়ে বাচ্চাকে বুকের দুধ দিতে লাগল। ভাবতে ভাবতে আমার মাথা যন্ত্রণায় চিবোতে শুরু করল।
স্ত্রী বোন বাচ্ছা—সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। আকাশে অসংখ্য তারা জ্বলজ্বল করছে। শহরের সমস্ত আলো নিভে গিয়েছে। কোথাও কোথাও দু-একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠছে। আমি ঘুমে ঢুলছিলাম।
পাশ ফিরে শুতে গিয়ে আমার ঘুম ভেঙে গেল। উনুন থেকে গল-গল করে ধোঁয়া বেরুচ্ছে। ভোর হয়ে গিয়েছে। রেললাইনের ধারে স্তূপাকার গুঁড়ো কয়লা আর সেই কয়লার ধোঁয়ার মধ্যে মানুষদের অস্পষ্ট ধোঁয়াটে চেহারা ভেসে উঠেছে। কোদাল দিয়ে তারা কী যেন খুঁড়ছিল।
উঠে আমি পুলের নীচে গিয়ে বসলাম । এক্কা আর টাঙ্গা এপথ দিয়েই সবসময় যাওয়া আসা করে। পুলের ওপর দিয়ে প্রচণ্ড দুম-দড়াম শব্দ করতে করতে রেলগাড়ি যায়। কংক্রিটের তৈরি পুল। পুলের দু-ধারের প্রাচীর থেকে ফলওয়ালা আর চাটওয়ালারা বসে ফেরি করে। ওদের গলাফাটা চিৎকারে মনে হয় যেন এটা কোন রেল-স্টেশন। এই প্রাচীরের সামনেই একফালি জায়গা পড়ে রয়েছে। জায়গাটা ভিখিরিতে গিজগিজ করছে। নোংরা শতচ্ছিন্ন ভিখিরির দঙ্গল দেখে আমার মনটা বেদনায় হাহাকার করে ওঠে। দারিদ্র্য, নগ্নতা এবং পরাজয়ের ভারে এরা নুয়ে পড়েছে। এদের তুলনায় আমি তো অনেক—অনেক ভালো আছি। এরা হাত প্রসারিত করেই রয়েছে। আর পথচারীদের পেছনে পেছনে ছুটছে। ভিখিরিদের এই দঙ্গলে একজন যাযাবরী আছে - রাত্রে সে ওদের সঙ্গে ওইখানেই ঘুমোয়। এক সাধুবাবা তার খাবার থেকে ওকে ভাগ দেয় ৷ সবাই সাধুবাবার পেছনে লাগে। কিন্তু সে টু শব্দটিও করে না। আমিও তাকে ঘৃণা করতাম। কারণ বেশ কিছুদিন হল সাধু বাবা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। ফলে সে খুব চিৎকার করে। এখন কেউ-ই তার দিকে ফিরে তাকায় না ।
এইভাবে ধীরে ধীরে আমি আমার দুঃখবোধকে যখন সয়ে নিতে পেরেছি সেই সময় এক প্যাড়াওয়ালা আমাকে বলল, “তোমার কাছে কি কোন টাকা-কড়ি নেই ? তবে কংগ্রেসে নাম লেখাচ্ছ না কেন ? ”
“হাঁ যাব, গেলে কি পাওয়া যাবে ?”
এ প্রশ্নের কোন উত্তর সে আমাকে দেয় না। হঠাৎ-ই আমার মনে হয়, 'শরণার্থী কমিটি'র একজন সেক্রেটারি আছে। জানি না সে কে। আমি বিরাট এক জুতোর দোকানের এক কংগ্রেসি নেতার সঙ্গে দেখা করি। সে আমাকে বলে, “তুমি তো শরণার্থী নও, পুরুপার্থী।”
“যার মাথার ওপর এক টুকরো চাল নেই, সে আবার পুরুপার্থী !”
“ও তুমি”–একটা আওয়াজ শুনতে পেলাম।—“ভেবেছ, এখানে কোন ভরসা আদায় করবে! না ভাই, না, কাজকর্ম করে খাও। অসুবিধায় কে না পড়েছে।”
একজন ব্যঙ্গ করে বলল, “তোমারও নিশ্চয়ই গোটা কুড়ি বাড়ি ছিল ? সমস্ত পাঞ্জাবি শরণার্থীই দেখছি লাখপতি। খুঁজলে একজন গরিবকেও পাওয়া যাবে না ।”
“ঠিক বলেছ ভাই, ঠিক বলেছ। আমরা তো ভাই এখানেও গরিব ছিলাম। এখানে বসে মনে যা আসে বলে নাও। তাতে কী যাবে আসবে? তোমাদের ওপর যদি বিপত্তি নেমে আসত তবে বুঝতে পারতে।” বলে এক পাঞ্জাবি ঠেলাওয়ালা জোরে হেসে উঠল। ওর কণ্ঠে এক তীক্ষ্ণ ক্রোধের জ্বালা ছিল।
কমলাওয়ালা বলল, “তবে আর কী, ওইখানে যেমন ছিলে এখানেও তেমনিভাবে থাকো। আমরাই বা এমন কী ভালো আছি। জিনিসপত্রের দামে পিষে যাচ্ছি। আমাদের মনই জানে আমাদের অবস্থা। বাচ্চা-কাচ্চারা কিছু চাইলে দিতে পারি না । ”
হতাশায় মাথা কাত করে সে আবার বলল, “ভাই, গরিবরা চিরকাল গরিবই থাকবে।”
পাঞ্জাবি ঠেলাওয়ালা ঠেলাটা একটু ঠেলে হেসে উঠে বলল, “গরিবরা তবে মরবে?”
আমি ওদের কথা শুনছিলাম ।
আর একজন হেসে বলল, “এখন মেহনত করে খাওয়ার দিন নয়, ব্ল্যাকমার্কেটের দিন।”
“শেঠদের দিন এসেছে। ওরা আজাদ হয়ে গিয়েছে।”
আমি শুনছিলাম। কণ্ঠে কেমন একটা আক্রোশ—কেমন একটা ক্ষুব্ধতা । “শালারা কী রকম হু হু করে মুটিয়ে গিয়েছে। পুলিশও ওদের সঙ্গে রয়েছে। ...”
“সবই টাকার জোর ভাই।”
“এই হচ্ছে স্বাধীনতা।” বলতে বলতে পাঞ্জাবি ঠেলাওয়ালা জোর এক ধাক্কা দিয়ে ঠেলা এগিয়ে নিয়ে গেল। শুধু চাটওয়ালার গলার আওয়াজ চারদিক গমগম করছে। হয়তো এতক্ষণে রুটি তৈরি হয়ে গিয়েছে। আমার বেশ খিদে পেয়েছিল।
একটি কথারও জবাব না দিয়ে আমি চুপচাপ ফিরে এলাম।
খেতে শুরু করলাম। বোন বলল, “দাদা, আর কতোদিন এভাবে চলবে।”
“তোরা কি ভেবেছিস আমি বাড়ি খুঁজছি না ?”
“তুমি এত রেগে যাচ্ছ কেন ?”
“ঢাক পেটালেই কি বাড়ি পাওয়া যাবে?”
মনে মনে ঠিক করলাম, কাল থেকে আমিও ঠেলা ঠেলব।
খাবারদাবার খেয়ে আমি বেরিয়ে পড়লাম। স্ত্রী জিজ্ঞেস করল, “তুমি আবার বেরুচ্ছ?”
“একটা কিছু কাজের খোঁজ করি।”
ভীত সন্ত্রস্ত কণ্ঠে এস বলল, “আজকের দিনটা ভালো মনে হচ্ছে না, দাঙ্গা হতে পারে।”
আমি কিছুক্ষণ কোন কথা বলতে পারলাম না। তারপর বললাম, “আর হতে কী বাকি রয়েছে।”
ও আর একটা কথাও বলল না। আমি বেরিয়ে পড়লাম।
সারা শহর তেরঙা ঝাণ্ডাতে ছেয়ে গিয়েছে। চারদিকে সুন্দর সুন্দর পতাকা পতপত করে উড়ছে। কোথাও কোন রেষারেষি বা ভেদাভেদ নেই। পনেরোই আগস্ট এসেছে। সবাই পালাচ্ছে। হিন্দুদের একটা দল মুসলমানদের ওপর হামলা করছে। পুলিশ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সেই হামলা দেখছে। ইচ্ছে করছিল এই লুটে আমিও সামিল হয়ে যাই। কিন্তু লুট করতে গিয়ে যদি মারা যাই? মারা গেলে ছেলে স্ত্রী বোনের কী হবে !
লড়াইটা আগে শেষ হয়ে যাক। লড়াই শেষ হয়ে গেলে যা পড়ে থাকবে তাই নিয়ে পালাব।
একটা মিছিল বেরিয়েছে। সাদা-টুপি পরা অজস্র মানুষ সেই মিছিলে শামিল হয়েছে। অধিকাংশই ভুঁড়িওয়ালা দোকানদার। এদের গর্দান গর্বে কেমন একটু বেঁকে গিয়েছে। দেখে গা ঘিনঘিন করছিল। অপরিচ্ছন্ন জামা-কাপড়ে নিজেকে বেশ কুণ্ঠিত মনে হচ্ছিল। শহরে লুট তরাজ চলছে। আমিও পালালাম। দৌড়তে দৌড়তে থমকে দাঁড়ালাম। গুলির শব্দ ভেসে আসছিল। গুলির ঠাস ঠাস আওয়াজ। আর তার সঙ্গে চলেছে হইহই শব্দ।
আমি ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে পালিয়ে এলাম। আমাকে আবার গুলি করে মেরে না ফেলে। গুলি চলছিল। কেন গুলি চলছিল? আজ স্বাধীনতা দিবস না?
মুসলমানরা ভয়ে বিহ্বল। কোথায় পালাবে? কী করবে?
আমি যখন মুসলমানপাড়ার কাছে এসে হাজির হলাম, তখন সেখানে কোন সাড়াশব্দ নেই—কেমন একটা নিস্তব্ধতা। রাস্তায় মিলিটারি টহল দিচ্ছে। তাদের ভারি বুটের ঠকঠক শব্দ ছাড়া আর কোন শব্দ নেই। বন্দুকের নল ঝকমক করছে।
দুর্গের বাইরে সার্কাসের অনেকগুলো তাঁবু খাটানো হয়েছিল। সার্কাসের একটা মুসলমান মেয়েকে দাঙ্গা বাজরা জবরদস্তি করে টেনে নিয়ে গেল। কারণ মেয়েটি মুসলমান। মেয়ে হয়ে জন্মেও অপরাধ করেছে। বাঘের পিঠের ওপর মেয়েটি দাঁড়াত, হাতির পিঠে চড়ে নাচত। শুনলাম ওরা ওর ইজ্জত নেবার পরে হত্যা করেছে। আমার কোন খারাপ লাগেনি। কিন্তু ওর কথা ভেবে আমি এত কাঁপছি কেন? কেন আমি ভয় পাচ্ছি?
হাঁপাতে হাঁপাতে আমি যখন গাছের কাছে এলাম, দেখলাম, আমার স্ত্রী ভয়েতে এবং চারপাশের নিস্তব্ধতায় কেমন শিঁটিয়ে গিয়েছে। আমার বোন বাচ্চাকে কোলে নিয়ে বসে আছে। দূর থেকে দেখলাম, সার্কাসের ম্যানেজার—যে কিনা হিন্দু, অনেক চেষ্টা করেও নিজেকে বাঁচাতে পারল না। ওখানে তখন যেন লুট তরাজের তাণ্ডব চলছে। চারদিকে শনশন করে হাওয়া বইছে—ধ্বংসের হাওয়া।
বোন জিজ্ঞেস করল, “কোথায় গিয়েছিলে?”
বললাম, “লুট করতে গিয়েছিলাম।”
“কী নিয়ে এসেছ?”
“ঐখানে গুলি চলছে।”
আমাদের কথায় স্ত্রীর কান খাড়া হয়ে গেল।
আমি তখনও ভয়ে ঠকঠক করে কাঁপছিলাম। ও তীক্ষ্ণ কণ্ঠে আমাকে বলল, “তুমি গুণ্ডা !”
আমি ঘাবড়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলাম! “কী, আমাকে বলছ!”
“হ্যাঁ, তোমাকেই বলছি। লুট-তরাজ কারা করে ?” বলতে বলতে ও আমার পাশে এসে দাঁড়াল। আমাকে দু হাত দিয়ে ধরে ঝাঁকি দিতে দিতে বলল, “জানো, আজকে তোমার হিন্দুরা উঠিয়ে নিয়ে যেত!”
আমি অবাক হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন?”
“ওরা ওকে মুসলমান বলে মনে করেছিল। পাজামা পরেছিল, তাই। দেখে, আমি চিৎকার করতে লাগলাম। তখন একজন বলল, আরে ছেড়ে দাও, এ তো সিন্ধি শরণার্থী।”
এমন সময় একজন পুলিস এল। দেখতে বেশ হৃষ্টপুষ্ট। ওকে দেখে কেমন কুঁকড়িয়ে গেলাম। পুলিস দেখে একজন লোক আমাদের দিকে এগিয়ে এল। সে পুলিসকে জিজ্ঞেস করল, “কী ব্যাপার জমাদার সাহেব ?”
সিপাইটি হাসতে হাসতে বলল, “শালাকে দেখ, তামাম জায়গায় কার্ফু লেগে গিয়েছে, আর এ ব্যাটা মেয়েছেলে নিয়ে এখানে গেড়ে বসে আছে।”
আমি গলা ছেড়ে চিৎকার করে বললাম, “মাথা গুঁজবার কোন জায়গা পাচ্ছি না, কী করব।”
সেই চর্বিওয়ালা লোকটি বলল, “কী করবে, বেচারা শরণার্থী। গরিব বলে মনে হচ্ছে।”
“আরে বাবা, ও কথা বলবে না, সবার কাছেই মালকড়ি আছে। ওপার থেকে নিয়ে এসেছে।”
“জমাদার সাহেব, এ ঠিক নয়। হাতের কাছে যা পেয়েছে তাই-ই নিয়ে চলে এসেছে।” বলতে বলতে সেই লোকটি আমার পরিবারের ওপর এক নজর বুলিয়ে নিল। তারপর আবার জিজ্ঞেস করল, “এই-ই তোমার পরিবার? আর কেউ নেই?”
আমার স্ত্রী বলল, “না বাবু আর কেউ নেই। তুমি আমাদের একটু সাহায্য করো না, ভগবান তোমার ভালো করবেন।”
“আরে, কাঁদছ কেন ? সব ঠিক হয়ে যাবে। এ তো তোমাদের নিজেদের রাজ। ভয় পাচ্ছ কেন?”
লোকটির কথায় একটা সমবেদনা ছিল। ও বলে চলেছিল, “এতদিন ধরে যত শরণার্থী এসেছে, তাদের কোন না কোন একটা ব্যবস্থা হয়েই গিয়েছে। চিরদিন কি আর আপদ-বিপদ থাকে। একটা না একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।” বলতে বলতে লোকটি আমার বোনের ওপর চোখ বুলোচ্ছিল। ওর তাকানোর ধরন দেখে আমার বোন লজ্জায় চোখ নামিয়ে নিল। ওর চোখে লালসার বিষ ছিল। আমি বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাচ্ছিলাম। এ কেমনতর মানুষ যে লজ্জা-শরমের মাথা খেয়ে বসে আছে। দেখলাম, বোন ভয়ে কেমন গুটিয়ে গিয়েছে। লোকটি আবার বলল, “তা জমাদার সাহেব, ব্যাপারটা কী ?”
“ব্যাপার হচ্ছে, কার্ফু লেগে গেছে। রাতে যদি কেউ দু-টুকরো করে রেখে যায় ? বেটা দু-টুকরো হয়েই খোয়াব দেখবে। এখানে এমনভাবে আস্তানা গেড়েছে, যেন নিজের বাড়ি।” জমাদারের কথা শুনে লোকটি হো হো করে হেসে উঠল। সিপাইটি আবার বলল, “ওঠো, ওঠো এখান থেকে। ভাগো।”
আমার স্ত্রী চিৎকার করে বলে উঠল, “কিন্তু যাব কোথায় ?”
সিপাইটি অশ্লীল একটা গালি দিল। গালি শুনে আমার দেহের রক্ত রাগে আর ঘেন্নায় চনমন করে উঠল।
“এ কী! এভাবে খিস্তি করবে না বলে দিচ্চি।”
সিপাইটি বলল, “শালা বেশি কথা বলবি তো ছাল-চামড়া টেনে ছিঁড়ে নেব। এই কুত্তিকে এখানে থেকে নিয়ে যা বলছি। আজকাল কুত্তার সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে
জমাদারের কথা শুনে লোকটি খিকখিক করে হেসে উঠল। “চল, চল, , আমার সঙ্গে চল।”
আমি উঠে দাঁড়ালাম এবং সেই লোকটার পেছনে পেছনে যেতে লাগলাম। ইচ্ছে করছিল একটা পাথর ছুঁড়ে সিপাইটির মাথা থেতলিয়ে দিই। কিন্তু স্ত্রী বোন আর বাচ্চাটির কথা মনে করে ….
লোকটি বলে চলেছে, “পুলিস এমনই হয়। ব্যাপার কী জানো, সরকার এদের লাগাম ছেড়ে দিয়ে রেখেছে। আর লাগাম ছেড়ে দিতেও হয়, নইলে লোকে মানবে কেন? ওর কথায় কিছু মনে কোরো না।”
আমি চুপচাপ হেঁটে চলেছি। কথা বলতে বলতে ও চুপ হয়ে গেল। আমরা এ-গলি সে গলি ধরে এগিয়ে চললাম।
কে যেন জিজ্ঞেস করল, “অমন মুখ গোমড়া করে আছ কেন?”
আমার সঙ্গে সেই লোকটি বেশ দরদভরা কণ্ঠে জবাব দিল, “বেচারা বিপদে পড়েছে ...।”
একটি সরু গলিতে এনে লোকটি আমাকে হাজির করল। গলির একদিকে বাড়িগুলোর উঁচু উঁচু প্রাচীর। প্রাচীরের ওপর তেরঙা ঝাণ্ডা পতপত করে উড়ছে তেরঙা পতাকা পতপত করে উড়তে দেখে আমার চোখে-মুখে খুশির ঝিলিক খেলা উচিত ছিল। কিন্তু আমার মধ্যে কোন আবেশই সৃষ্টি হল না ।
আমি লোকটিকে জিজ্ঞেস করলাম, “এই—এই তোমার ঘর?”
লোকটি বলল, “হাঁ ভাই, এইটিই আমার ঘর। এই দেখো রাস্তার ওপর জলের কল আছে। এখান থেকে জল নেবে।” তারপর সে আমার বোনের দিকে সরাসরি তাকিয়ে বলল, “অন্দরে যে জলের কল আছে, তুমি সেখানে যেতে পার। আমি ব্যবস্থা করে দেব। ভেতরে আমিই থাকি। গুদাম আছে কিনা। ঐখান থেকেই জল নিও, ভিড়ভারাক্কা ধাক্কাধাক্কি নেই।”
আমার স্ত্রী আনন্দে চিৎকার করে উঠল। ওর চোখ দুটি খুশিতে ঝকমক করছিল। ঘরের সন্ধান পাওয়ায় ও কী খুশিই না হয়েছে। ওরা যদি না থাকত তবে আমার কোন চিন্তা-ভাবনাই ছিল না। যেখানে সেখানে দিন গুজরিয়ে দিতাম। ওরা দুজন আমাকে কেমন নিস্তেজ আর দুর্বল করে দিয়েছে। কোন উপায়ও নেই। এমন কেউ নেই যে পাশে এসে দাঁড়াবে ।
আনন্দে আত্মহারা হয়ে আমার স্ত্রী সেই লোকটিকে বলল, “ভাই, ভগবান তোমার মঙ্গল করুন। তোমার উপকার আমরা কোন দিন ভুলব না।”
লোকটি আমাকে জিজ্ঞেস করল, “শেঠজির কাছে কাজ করবে?”
বিস্ময়ে আমার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। ওকে বললাম, “না আমি ঠেলা চালাব।”
আমার উত্তর শুনে মুহূর্তে লোকটির গলার স্বর পালটিয়ে গেল। ও ঘরটার দিকে ইশারা করে জিজ্ঞেস করল, “কত টাকা দেবে ?”
“কত টাকা মানে ? ভাড়ার কথা জিজ্ঞেস করছ?”
লোকটি মিচকি হেসে বলল, “শেঠজির সেলামি আর আমার মেহনতের দাম।” ওর কথা শুনে আমি চমকে উঠলাম। বললাম, “তুমি না হিন্দু!”
“কেন পাকিস্তানে কি এসব চলে না ! মুসলমানরা তো সেখান থেকেও পালিয়ে এদিকে আবার আসছে।” হাসতে হাসতে কথাগুলো ও আমাকেই বলছিল। কিন্তু বারবার ঘুরে ঘুরে বোনের দিকে তাকাচ্ছিল। এমন কুৎসিত ভাবে তাকাচ্ছিল, যেন ওকে খেয়ে ফেলবে। বোন মুখ ঘুরিয়ে দাঁড়িয়েছিল। আমি বললাম, “আরে, আমার দিকে তাকিয়ে কথা বলো।”
কিন্তু লোলুপ দৃষ্টিতে ওইভাবে তাকিয়ে থেকে সে বলল, “এতটুকু ক্ষমতা নেই যখন শেঠজির সেলামি দেবে কিভাবে? পাঁচশ টাকা লাগবে। বুঝেছ?” লোকটি বেশ কঠোর হয়ে উঠেছিল। আবার বলল, “পাঁচশ লাগবে। গতকালই একজন সাড়ে চারশ বলে গিয়েছে। ওর বোন নেই বলে ওকে দিইনি।” মনে হচ্ছিল ও খুব কিছু সাংঘাতিক কথা বলছে না। আমার দিকে ঘুরে বলল, “এতে এমন কী হয়েছে? কেউ জানতে পারবে না।”
আমি দু হাতে মাথা ধরে বসে পড়লাম। আমার চোখের সামনে স্ত্রী বাচ্চা কেমন যেন ঝাপসা হয়ে গেল। এমন গল্প যে শুনিনি তা নয়, মাথা গোঁজার ঠাঁই দেওয়ার পরে বিভিন্ন উপায়ে লুকিয়েচুরিয়ে কাজ হাসিল করেছে। আর এ জানোয়ার তো দেখছি সোজাসুজি মুখের ওপর বলছে। আমার সাদাসিধে আর পবিত্র বোন সম্পর্কে এমন কথা বলার সাহস পাচ্ছে।
সে কথা কিনা আমাকেই বলছে! বলতে পারছে তার কারণ আজ আমি নিরুপায় ।
আমার রাগ যতই চড়ে যাচ্ছিল আমার হাতের শক্তি ততই যেন লোপ পাচ্ছিল। সমস্ত শরীর যেন ঝিমঝিম করছিল। মনে হচ্ছিল হাতের সমস্ত রক্ত যেন নিঃশেষিত হয়ে গিয়েছে। আমি যেন স্থির পাথরের চোখ দিয়ে দেখছিলাম ।
বুকটা ফেটে যাচ্ছিল। বোন নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে তাকিয়েছিল। ওর দুচোখ যেন কান্নায় ফেটে পড়তে চাইছিল। কিন্তু চোখে একফোঁটাও জল ছিল না। শুধু জ্বলছিল। লোকটি তখনও বেপরোয়া ভাব নিয়ে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে—যেন দুচোখ দিয়ে ওকে গিলে চলেছে।
আমার স্ত্রী একবার লোকটির দিকে তাকাচ্ছে, আর একবার বোনের দিকে। আর সেই সঙ্গে এক-একবার ঘরটির ওপর চোখ গিয়ে থমকে যাচ্ছে। ঘৃণা সংশয় ভয় ও চোখে কাঁপতে কাঁপতে উধাও হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু ঘরের ওপর চোখ পড়তেই ওর চোখ দুটি ঝিলিক দিয়ে উঠতে লাগল। তারপর ও আমার বোনের দিকে এক বিবশ দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে রইল, যেন ওর কাছে কিছু ভিক্ষে চাইছে। বোনও যেন ওর চোখের ভাষা বুঝতে পারল। মুহূর্তে সে চোখ নামিয়ে নিল। আমার স্ত্রীর চোখের দিকে তাকাতে ওর আর সাহস হল না। কিন্তু ওরা দুজনে একফোঁটাও কাঁদল না। কারণ এ তো মৃত্যু নয়—অন্য কিছু। কিন্তু সেই অন্য কিছু কী?
আমি চিৎকার করে উঠলাম, “না, ও না।” নিজের অজান্তেই আমার চোখ দুটি আমার বোনের ওপর থেকে সরে স্ত্রীর ওপর গিয়ে থমকে গেল। যেন আমি একজনের পরিবর্তে আর একজনকে পেশ করছি। কারণ আমি জানি আমার স্ত্রী তো আমারই। ওর ওপর আমার হক আছে। ঠিক যা ভেবেছিলাম তাই-ই হল। স্ত্রী আমার কথার কোন প্রতিবাদ করল না। শুধু আমার দিকে একবার তাকাল। তারপর বাচ্চার দিকে।
গোটা পৃথিবীটা যেন এক লহমায় থমকে দাঁড়ায়। মন বিদ্রোহ করে উঠল ৷ মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে আমি যেন বসুমতীকে দুভাগ করে দিতে পারি। আমি কি পাগল হয়ে যাচ্ছি !
ধীরে ধীরে আমার সম্বিত ফিরে এল।
আমার স্ত্রী হঠাৎ লোকটিকে জিজ্ঞেস করল, “তুমি কি একাই, না ...”
“হ্যাঁ, আমি একাই।”
“এখানেই থাকব, ভাড়া বলো।”
“পনেরো টাকা ভাড়া তুমি কিভাবে দেবে? সাড়ে সাত টাকা দিও। এর কম হবে না। পয়সা-কড়ি তো তোমাদের কাছেও আছে।”
অন্যান্য শরণার্থীরা পয়সা কড়ি নিয়ে পালিয়ে এসেছে, কিন্তু আমরা তো পাকিস্তানেও গরিব ছিলাম। এখানেও গরিব। তবে কেন পালিয়ে এলাম?
এ আমি কী দেখছি! আমার স্ত্রীর চোখে মুখে কোন ভয়-ডরের চিহ্ন নেই। ও নিজেকে এর মধ্যে সামলিয়ে নিয়েছে। বোনকেও তেমনি মনে হল চোখের ইশারায় সে যেন কোন কিছু বোঝাতে চাইছে।
ও যেন নিজের বক্তব্য, বাস্তব অবস্থা এবং দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। কী কষ্টই না ওকে সহ্য করতে হয়েছে। আর সেই কষ্ট সহ্য করতে করতে আজ ও একখন্ড শিলাতে পরিণত হয়েছে। নিজেকে এমন করে বলি দেবে? মৃত্যু অত সহজ নয়। ও কেন মরবে?
মৃত্যুই যদিও সত্যি সত্যি চাইত তবে ঘর ছেড়ে কি পালাতে পারত না? শৈশব যেখানে কেটেছে, সেখানকার প্রতিটি রাস্তাঘাট ওর জানা। আর এখানে আমরা মানুষের মতো দেখতে জানোয়ারদের মধ্যে বিচরণ করছি। এরা কেউ আমাদের আপনার লোক নয়।
আর ওই লোকটি হেসেই চলেছে। মনে হচ্ছিল ওকে খুন করে দিই। গলা টিপে হত্যা করি। ওর চোখ দুটো আঙুল দিয়ে উপড়ে ফেলি – চোখ তো নয়, যেন এক বিরাট পাপ দাউদাউ করে জ্বলছে। আর চোখের দুই কোটর মাটি দিয়ে ভরাট করে দিই। মনে হচ্ছিল ওর বুক ফেড়ে ফেলে দিয়ে রক্ত চুষি। না, আমি কিছুতেই সায় দিতে পারছি না। এ আমি কোন দিনই সহ্য করতে পারব না। এতদিন যেভাবে যাযাবরের মতো ঘুরেছি, তেমনি ভাবে যাযাবর জীবন কাটাতে পারব।
কাল থেকেই আমি ঠেলা চালাব। ঠেলার ওপরই শোব। ঠেলার নীচে ঘর-সংসার পাতব। কিন্তু ঠেলা রাখব কোথায়? বিশেষ করে এই কার্ফুর দিনগুলোতে ?
কংগ্রেসের নেতাদের সঙ্গে দেখা করেছিলাম। তারা বড় বড় সমস্যা নিয়ে ব্যস্ত। কাশ্মীরে লড়াই চলছে। জিজ্ঞেস করেছি, “বাবু, জিনিসপত্রের দামে যে পিষে যাচ্ছি।” উত্তরে সে আমাকে বলেছিল, “পরে আবার এসো।”
আমি ফিরে এলাম।
লোকটি দাঁড়িয়ে রয়েছে। বোন ফিসফিস করে তাকে কী যেন বলছে। জানি না, বোন তাকে কী বলছে। লোকটি চলে গেল। চলে যাওয়ার সময় ওকে খুব গদগদ মনে হল। ওর চোখ দুটি ঝিলিক দিচ্ছিল। শুনতে পেলাম, এই ঘর দেওয়ার জন্যে শেঠজি ওর ওপর খুব তম্বি করবে। কখনও সখনও পুলিসের ভয়ে বা কনট্রোলের সময় এই ঘরে গমের বস্তা লুকিয়ে রাখা হয়। এখন সেই ভয় নেই। তবু তো এই জায়গাটা ওদের কাজের। ইচ্ছে করলে এই ঘরের জন্যে ও হাজার টাকা চাইতে পারত ।
এর পরে আর কিছু না বললেও আমি ব্যাপারটা বুঝতে পারলাম। ঘরের জন্যে তো বোনেরও একটা দায়িত্ববোধ আছে। বোন হঠাৎ বলে উঠল, “সেলামি দিতে হবে না।”
“কে জানে?” আমার স্ত্রী ভয়ে ভয়ে বলল, যাতে আমি ব্যাপারটা খারাপভাবে না নিই। তারপর সে গলা নামিয়ে বলল, “শেষ পর্যন্ত মাথা গোঁজার অন্তত একটা ঠাঁই হল। সরকারের কাছ থেকে তুমি এ জায়গাটা লিখে নিও।”
আমার স্ত্রী একেবারে ছেলেমানুষ। লিখে নেওয়া কি এত সহজ! এ শেঠজির বাড়ি।
আমি গলির বাইরে পা বাড়ালাম। তিনজন কথা বলছিল। আমি তাদের আলোচনা শুনছিলাম। খুব সম্ভব আশপাশের বাড়ির চাকর।
“কজন মারা গিয়েছে?”
মোটা গলায় একজন বলল, “কে আর গুনেছে!”
“হিন্দু একজনও মরেনি।”
“কিন্তু দাঙ্গা তো মুসলমানরাই শুরু করেছিল।”
“এ দাঙ্গা রোখার মতো শক্তি কারো নেই । ”
এরপর কিছুক্ষণ কোন সাড়াশব্দ নেই; সবারই মুখের কথা ফুরিয়ে গিয়েছিল। “তুমি শরণার্থী?”
বললাম, “হাঁ।”
“ভাই, গমের কনট্রোল হবে।”
একজন মহিলা বলল, “সত্যি?”
“গলির ভেতর যাও, গলির ভেতর। অবস্থা খুব খারাপ। কখন কী হয়ে যায় কে জানে।”
“কেন, কী হয়েছে?
“যে যার বাড়িতে যাও, পুলিস এসে পড়ল বলে।”
ঠিক সেই সময় কয়েকজন চিৎকার করতে করতে ছুটে পালাল। “বাড়িতে ঢুকে পড়ো, পুলিস আসছে। সঙ্গে মিলিটারি। গুলি চালাবার হুকুম হয়ে গিয়েছে। ওরে বাবারে।”
আমি বিবশ হয়ে গেলাম। আজ আজাদির দিন। যারাই হাঙ্গামা করুক না কেন, আমাকেই মুশকিলে পড়তে হবে। চারদিকে তাকালাম। ফটাফট সব দরজা বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। মানুষ পালাচ্ছে। চারদিক অন্ধকারে ছেয়ে গিয়েছে।
কী করব, আমি কিছুই বুঝতে পারছিলাম না। ঘরের কথা মনে পড়ে গেল। একদিন আমারও ঘর ছিল।
বড় বড় ট্রাকগুলো শহরে এসে ত্রাস সৃষ্টি করার জন্যে ছুটে বেড়াচ্ছে। চাকার ঘড়ঘড় আওয়াজে চারদিক থরথর করে কাঁপছে। ট্রাক-ভর্তি খাঁকি উর্দি-পরা সৈনিকরা উদগ্রীব হয়ে আছে। এরা গুর্খা সৈনিক। কোন দয়া মায়া নেই। হাতে বন্দুক। আমি জানি, এরা না আমার কথা বুঝবে, না আমার হৃদয়। গুলি চালাতে এদের মতো নিষ্ঠুর আর নেই। মগজ বলতে কোন পদার্থ নেই।
বাড়ির ভেতর থেকে কে যেন স্লোগান দিচ্ছিল, “স্বাধীন হিন্দুস্থান জিন্দাবাদ।”
আমি পালালাম। অন্ধকার নেমে আসছে। একটা অস্পষ্ট কুয়াশা কুয়াশা ভাব থিরথির করে কাঁপছে। রাস্তাঘাট নিস্তব্ধ। কোথাও কোন টু শব্দটিও নেই। তেরঙা ঝাণ্ডা গর্বে মাথা উঁচু করে আছে। আমার মধ্যে আবার আশা এবং বিশ্বাস ধীরে ধীরে ফিরে আসছিল। আশপাশের কোন মহল্লা থেকে গুলির শব্দ ভেসে আসছে।
সামনেই আমার ঘর দেখা যাচ্ছে।
বাড়ির ভেতর ঢুকতে গিয়ে অন্ধকারে একটা কিসের সঙ্গে যেন আমি ধাক্কা খেলাম। টাল সামলাতে না পেরে পড়ে গেলাম। যার সঙ্গে ধাক্কা লেগেছিল সেও পড়ে গেল। যে পড়ে গিয়েছিল তার মুখ থেকে একটা যন্ত্রণার শব্দ বেরিয়ে এল। আমি ধীরে ধীরে উঠে তাকালাম, তাকে টেনে তুললাম। সে উঠল। উঠে আমাকে বলল, “তোমার লাগেনি তো ! এত তাড়াতাড়ি কেন এলে ?”
“না, পালিয়ে এলাম।”
যার সঙ্গে কথা বলছিলাম, সে আমার স্ত্রী। সে আমাকে জিজ্ঞেস করল, “কেন, কী হয়েছে ?”
“কার্ফু শুরু হয়ে গেছে। দরজা বন্ধ করে দাও।”
“এখন না, একটু দাঁড়াও। এখানে পুলিস কিছু বলবে না। একটু পরেই দরজা বন্ধ করে দেব।”
আমি কিছু বুঝতে না পেরে জিজ্ঞেস করলাম, “কেন? ঘরের মধ্যে অন্ধকার কেন ?”
ও বিব্রত বোধ করল। তারপর গলা নামিয়ে বলল, “চুপ করো, শেঠজির লোক আছে। ওর কাছে কার্ফুর পাস রয়েছে।”
সব বুঝতে পারলাম। আমি ঘুমিয়ে আছি, না ছিটকে পড়েছি। আমার স্ত্রী বলে চলেছে, “জানি, তুমি সহ্য করতে পারবে না। কিন্তু ... আমাকে ওর পছন্দ নয়। .....
ও যা বলছিল, তা নিজের কান দিয়েই শুনছিলাম। আমার রক্ত জল হয়ে গেল ৷
আমার স্ত্রী বলে চলেছে, “কে আর জানবে? থাকার জায়গা একটা হয়ে যাবে।” তারপর সে যেন আমাকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল, “সেলামি আর দিতে হবে না। বিদেশ বিভুঁয়ে আমাদের আর কী ইজ্জত আছে।”
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন