ওস্তাদের কসম

কমলেশ সেন

কিশোর শাহু

ওস্তাদের কসম

কিশোর শাহু চলচ্চিত্র-অভিনেতা। অভিনয়জগতে আসার আগেই সাহিত্যজগতে তাঁর প্রবেশ । গল্পকার হিসেবে হিন্দি সাহিত্যে তিনি যথেষ্ট সুনাম অর্জন করেছেন। অসংখ্য পত্রপত্রিকায় তাঁর গল্প প্রকাশিত হয় । ‘বীর কুণাল’ তাঁর বহুপ্রশংসিত ঐতিহাসিক উপন্যাস। গল্পসংগ্রহগুলির মধ্যে উল্লেখ্যযোগ্য ‘নাগিনী আউর বুলবুলে’, ‘টেসু কে ফুল’। ভারতীয় গণনাট্য সংঘের সঙ্গে তাঁর ছিল গভীর আত্মিক সম্পর্ক। সাধারণ মানুষের জীবন এবং নৈতিকতার প্রতি ছিল তাঁর প্রগাঢ় বিশ্বাস। এই বিশ্বাস তাঁর সৃজনে উপলব্ধ এবং প্রতিফলিত ।

হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গার চতুর্থ দিন। লাঠি, ইট-পাটকেল এবং সোডার বোতল দিলদরিয়ার মতো ব্যবহার হচ্ছিল। বাছ-বিচার ছাড়াই মেয়েদের ইজ্জতের ওপর হাত পড়ছিল। পটকার মতো দুম ফটাস শব্দ করে মানুষের মাথার খুলি ফাটছিল। শহরের সব পানওয়ালার দোকানে পর্দার নাচনেওয়ালির ছবির বদলে যখন পালোয়ানদের ছবি ঝুলত সেই সময়েই কিন্তু এই লঙ্কাকাণ্ড । দেখুন, পানওয়ালা শম্ভুর দোকানে এখনও কাল্লু ওস্তাদ আর তার সাকরেদ দীনার ছবি ঝুলছে। একসময় সারা শহরে কাল্লু আর দীনার খুব নামডাক ছিল ।

কাল্লু ওস্তাদ তার আখড়ার সবাইকে হুঁশিয়ার করে দিয়েছে, তারা যেন দাঙ্গায় না মাতে। বেচারাদের দেহের শিরায় শিরায় রক্ত টগবগ করে ফুটছে। কিন্তু ওস্তাদের আদেশ কী করে অমান্য করে !

দীনা তার বাড়ির বারান্দায় বৈঠকি দিচ্ছিল। ঘামে তার ঘাড় দুটো চকমক করছে। ভেতর-বাড়ি থেকে ফুটন্ত দুধের একটা মিষ্টি গন্ধ ভেসে আসছে। আর সেই মিষ্টি গন্ধ তার খিদের জ্বালাকে দাউ দাউ করে জ্বালিয়ে দিচ্ছে। কিন্তু পুরো এক হাজার বৈঠক না করে তো যাওয়া যায় না। এখনও দু-শ বাকি। দ্রুত নিঃশ্বাস টানতে টানতে সে বৈঠক ভাঁজতে লাগল। শরীর থেকে তার ঘাম টপটপ করে মাটিতে পড়ে জায়গাটিকে ভিজিয়ে দিচ্ছিল। দীনা গুনে চলেছে, “আটশ বারো, তেরো চোদ্দ। ....' "

ঠিক এই সময় তার পড়শি চন্দ্রর স্ত্রী গঙ্গা চিৎকার আর চেঁচামেচি করতে করতে ছুটে এল, “হায়রে হায়, আমার ইজ্জত নিয়ে নিলো ... তোর বৈঠকিতে আগুন লাগুক . ভগবান ওদের তুমি ধ্বংস কর।” বলতে বলতে সে দীনার দেউড়িতে ধপাস করে পড়ে গেল ৷

বৈঠক করতে করতে দীনা উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কপালের ঘাম আঙুল দিয়ে মুছে চন্দ্রের স্ত্রীর দিকে এগিয়ে এল। দেখল, রক্তে তার সারা শরীর ভেসে যাচ্ছে। দীনা তাকে জিজ্ঞেস করল, “গঙ্গা বৌদি, তোমার এ কী অবস্থা!”

দীনার স্ত্রী ঘটি করে গরম দুধ নিয়ে বাইরের বারান্দায় এল। গঙ্গার অবস্থা দেখে সে চমকে উঠল। গঙ্গা যন্ত্রণায় গোঙাচ্ছিল।

“আরে কী হয়েছে তোমার, বলবে তো ? কে তোমার গায়ে হাত দিয়েছে?” গঙ্গার কথাগুলো জড়িয়ে যাচ্ছিল। “পাষণ্ডগুলোর মাথায় বাজ ভেঙে পড়ুক। মেয়েছেলের গায়ে হাত তুলতে লজ্জা করে না !”

দীনার স্ত্রী বুঝতে পারে কী ঘটেছে। সে তার স্বামীকে বলল, “মনে হচ্ছে মুসলমানরা মেরেছে।”

গঙ্গাকে ঝাঁকি দিয়ে দীনা চিৎকার করে জিজ্ঞেস করল, “কোথায় মেরেছে, দেখাও দেখি । ... কেন তুমি মরার জন্যে বাইরে বেরিয়েছিলে? জানো না দাঙ্গা চলছে !”

দীনার কথা শুনে গঙ্গা ঐ অবস্থাতেও আরও গর্জে উঠল। “চুড়ি পর্, চুড়ি। ঘরে বসে বড় বড় কথা বলতে লজ্জা করে না ৷ ”

“আরে বলবে তো তোমার কোথায় লেগেছে, না শুধু বকবক করে মরবে।”

" ‘দেখতে চাস? তবে দ্যাখ” বলে গঙ্গা বুকের আঁচল সরিয়ে তার স্তন দেখাল ৷ তার স্তন চিরে দিয়েছে। “চোখ মেলে ভালো করে দ্যাখ। যা, বৌয়ের কাপড়ের তলায় লুকো গিয়ে ৷ ”

গঙ্গা আর বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। ব্যথায় আর জ্বালায় তার অবস্থা সঙ্গীন হয়ে উঠেছিল। একটা থাম ধরে সে সেখানেই বসে পড়ল এবং একটু বাদেই জ্ঞান হারিয়ে ফেলল।

দীনার চোখ ক্রোধে জ্বলে উঠল। এক অবলা নারী আজ তার শক্তিকে ধিক্কার দিচ্ছে। তার দু বাহুর পেশি থরথর করে কাঁপতে লাগল। ঝড়ের মতো একলাফে সে ঘরের কোণ থেকে তুলে নিল লাঠিটা।

দীনাকে আগলে ধরে তার স্ত্রী বলল, “এ কী করছ তুমি !”

“আমার সামনে থেকে হটে যা” বলেই দীনা এক ঝটকায় নিজেকে ছাড়িয়ে নিল। দুধের ঘটি গড়িয়ে গিয়ে রাস্তায় পড়ল। “ওস্তাদের নামে কসম খেয়ে বলছি, আজ এ রাস্তা দিয়ে কোন মুসলমানকে জিন্দা যেতে দেব না। ওদের লাস দিয়ে এ রাস্তায় আজ পাহাড় বানাবে।”

শন শন করে লাঠি ঘোরাতে ঘোরাতে দীনা রাস্তায় বেরিয়ে এল। ভয়ে মুসলমানদের হৃদয় কেঁপে উঠল। এ রাস্তা দিয়ে আর একপা এগুতে তাদের কারো সাহসে কুলোল না ।

এদিকে কাল্লু ওস্তাদ সবে দলাই-মলাই শেষ করে উঠেছে। এমন সময় সে দেখল, একটা ছোট্ট হিন্দু ছেলেকে মুসলমানরা ঘিরে ধরেছে। ছ মাসও হয়নি তার একমাত্র শিশুসন্তানটি মারা গেছে। ছেলেটাকে এ রকম বিপদে পড়তে দেখে তার পিতৃ-হৃদয় আকুল হয়ে উঠল— তার পৌরুষ দারুণভাবে আঘাত খেল। দৌড়ে সে ভিড়ের মধ্যে ছুটে গেল। হিন্দু ছেলেটাকে মুসলমানদের কাছ থেকে ছিনিয়ে বলল, “তোমাদের লজ্জা করে না, একটা কচি নিরপরাধ শিশুর ওপর তোমরা বীরত্ব ফলাচ্ছ।”

একজন মুসলমান সামনে এগিয়ে গিয়ে কাল্লুর কাছ থেকে বাচ্চাটাকে ছিনিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে বলল, “ওস্তাদ, তুমি মাঝখান থেকে সরে যাও বলছি, ফল ভালো হবে না ।”

কাল্লু ওস্তাদ তাকে জোরে এক ঘুসি লাগাল। লোকটি ছিটকে পড়ে গিয়ে লাঠির দিকে হাত বাড়াল। কিন্তু কাল্লু ওস্তাদ তার আগেই একটা লাঠি ছিনিয়ে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল। ভিড়ের দিকে মুখ ফিরিয়ে দৃঢ় স্বরে বলল, “তোমরা সামনে থেকে সরে যাও। তা না হলে লাশ পড়বে। ওস্তাদের নামে কসম খেয়ে বলছি, এ বাচ্চাকে আমি ওর বাড়িতে পৌঁছে দেবই। দেখি কার সাধ্যি আমাকে রোখে।”

সবাই জানে কাল্লু ওস্তাদ দু কথা বলে না। সে ওস্তাদের কসম খেয়েছে। তাকে মোকাবিলা করার মতো সাহস বা শক্তি কারো ছিল না। লাঠি হাতে তুলতে না তুলতেই ভিড় নিমিষে উধাও হয়ে গেল ।

কাল্লু ওস্তাদ এক হাতে ছেলেটাকে আর অন্য হাতে লাঠি ধরে হনুমান গলির দিকে এগিয়ে চলল। মুসলমান মহল্লার মানুষরা কেমন একটা আচ্ছন্নের মতো তার পিছু নিল। কারণ সবাই জানে ‘হনুমান গলির মুখ আটকে দীনু দাঁড়িয়ে আছে। হিন্দুরা যখন দেখল কাল্লু ওস্তাদ এক হিন্দু ছেলেকে সুরক্ষিতভাবে নিয়ে আসছে, তখন তারা জোরে জোরে হাততালি দিয়ে চারদিক মুখরিত করে তুলল।

এদিকে দীনা তার বাড়ির সামনে রাস্তা আটকে বসেছিল। কাল্লু ওস্তাদকে এগিয়ে আসতে দেখে দূর থেকেই সে চীৎকার করে উঠল, “ওস্তাদ, আর এগিও না। ঐখানেই থামো।”

কাল্লু ওস্তাদ কিছু বুঝে উঠতে পারল না। এগিয়ে আসতে লাগল ।

—“ওস্তাদ, আবার বলছি, ভাল চাও তো এ রাস্তায় আজ এসো না .... ওস্তাদ, ওস্তাদ।”

কাল্লু ওস্তাদ হাসতে হাসতেই বলল, “দীনা, এ কী আবোল তাবোল বকছিস! আমি যে কসম খেয়েছি, এ বাচ্চাকে আজ ওর বাড়িতে পৌঁছে দেবই – আমাকে যেতে হবেই।” -

দীনা তাকে অনুনয় করে বলল, “এই কথা ওস্তাদ? বেশ, আমিই ওকে বাড়িতে পৌঁছে দেব। কিন্তু আজকে তুমি এরাস্তায় পা বাড়িও না।”

কাল্লু ওস্তাদও দৃঢ়কণ্ঠে দীনাকে বলল, “আমি কোল খালি করে ফিরতে পারব না। আমি আমার ওস্তাদের কসম খেয়েছি।”

দীনা রাগে ফুঁসে উঠল, “কিন্তু আমিও যে ওস্তাদের কসম খেয়েছি আজকে কোন মুসলমানকে এ রাস্তা পার হতে দেব না।”

দীনার কথা শুনে কাল্লু ওস্তাদ অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “যে ওস্তাদের নাম কসম খেয়েছিস, সেও যেতে পারবে না!”

–“না, সেও না”।

কাল্লু ওস্তাদ মুচকি হাসল। হেসে বাচ্চাটাকে কোলে তুলে নিয়ে লাঠি পাকড়িয়ে বলল, “সাবাস বেটা, এ রকম সাকরেদই চাই। আয়, এদিকে আয়। তুই তোর কসম আর আমি আমার কসম রাখি।” বলতে বলতে কাল্লু ওস্তাদ তার লাঠি তুলে নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল ।

দীনা পিছু হটতে হটতে কাল্লু ওস্তাদকে অনুনয় বিনয় করে বলতে লাগল, “ওস্তাদ শোনো ...ওস্তাদ, আমার কথা শোনো।” কিন্তু কাল্লু তার কোন কথাই শুনতে পেল না । মুহূর্তের জন্যে দীনা থমকে গেল। তারপর তার লাঠিতে বিদ্যুৎ ঝিলিক দিয়ে উঠল। সঙ্গে সঙ্গে কাল্লু ওস্তাদের লাঠিও শূন্যে শনশন করে উঠল। দুই পালোয়ানের দুই লাঠি মেঘের মতো গর্জন খরতে করতে পরস্পরের ওপর শপাশপ পড়তে লাগল ।

ওস্তাদ আর সাকরেদের এই লড়াইয়ের খবর দেখতে দেখতে সারা শহরে ছড়িয়ে পড়ল। লড়াই দেখার জন্যে ‘হনুমান গলিতে' হিন্দু আর মুসলমানের ভিড় উপছে পড়ল।

দুজনের লাঠির খটাখট আওয়াজ ক্রমশ বেড়েই চলল। দুজনের শরীরেই বিদ্যুৎ খেলছিল। লাঠির ঘায়ে রাস্তার তখন করুণ দশা। দুজনের দেহই রক্তে ভেসে যাচ্ছিল।

পুরো আধ ঘন্টা ধরে জোর লড়াইয়ের পর দুজনেই রক্তে রাঙা হয়ে মাটিতে পড়ে গেল। জটলা তাদের দিকে এগিয়ে এল। দেহের সমস্ত শক্তি হাতে এনে দাঁড়ানোর চেষ্টা করল দীনা। তারপর হেঁচড়াতে হেঁচড়াতে কাল্লু ওস্তাদের আধমরা দেহের কাছে এগিয়ে গেল! ওস্তাদের পায়ে মাথা রেখে বলল, “ওস্তাদ ... আমাকে ... মাপ ... করে দিও ...”

কাল্লু ওস্তাদও দেহের সমস্ত শক্তি নিয়ে উঠে বসল। দীনাকে বুকে জড়িয়ে ধরে বলল, “সাবাস বেটা, তুই আমার গর্ব।”

দীনার চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয়ে গেল। পাশে কাল্লু ওস্তাদও ঢলে পড়ল। জটলার সমস্ত মানুষ কান্নায় ভেঙে পড়ল। দু হাতে পরস্পরের জড়ানো মরদেহ দুটিকে তারা পৃথক করল । তারপর ব্যাণ্ড বাজিয়ে খুব ঘটা করে হিন্দু আর মুসলমান মিলিত ভাবে ‘হনুমান গলি’ থেকে কাল্লু ওস্তাদের জানাজা আর দীনার শবযাত্রা বের করল।

সেদিনের রক্তক্ষয়ী ঘটনার পর আর কোন দিন সেখানে হিন্দু-মুসলমানের দাঙ্গা হয়নি।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%