রমন্তে তত্র দেবতা

কমলেশ সেন

অজ্ঞেয়

রমন্তে তত্র দেবতা

সচ্চিদানন্দ হীরানন্দ বাৎসায়ন ‘অজ্ঞেয়’মূলত কবি। চিন্তাধারায় বুর্জোয়া মানবতাবাদী। এককালে তিনি সন্ত্রাসবাদী আন্দোলনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তাঁর অবাধ বিচরণ। কবিতা থেকে গল্প, গল্প থেকে স্মৃতিচারণ, সর্বত্র তিনি তাঁর বলিষ্ঠ মানসিকতার পরিচয় দিয়েছেন। ‘এ তেরে প্রতিরূপ’, ‘ছোঁড়া হুয়া রাস্তা’ ‘অপনে অপনে অজনবি'তে তাঁর দক্ষতার পরিচয় পাওয়া যায়। তাঁর ভাষা যেমন স্বচ্ছন্দ তেমনি কাব্যিক লাবণ্যে মণ্ডিত।

অক্টোবর, উনিশশ ছেচল্লিশের কলকাতা। তখন আমরা দাঙ্গায় অভ্যস্ত হয়ে উঠেছি, যখন তখন খুন-লুটতরাজের খবর পড়ে আর শিউরে উঠি না, মনেই হত না তাতে শহরের শান্তি এতটুকু বিঘ্নিত হচ্ছে। শহরের বিভিন্ন এলাকা খুদে খুদে হিন্দুস্থান আর পাকিস্তানে বাঁটোয়ারা হয়ে গিয়েছিল, আর এই সীমান্ত রক্ষার জন্যে কোন সান্ত্রি ছিল না। উভয় পক্ষই জানত এখানটা কার সীমান্ত। সর্দি বসে গেলে মানুষের একটা নাক বন্ধ হয়ে যায়, অন্য নাক দিয়ে শ্বাস-প্রশ্বাস নেয়—তাতে কষ্ট হয় সত্যি, কিন্তু মৃত্যু হয় না; ঠিক সেই রকম বসে যাওয়া সর্দির শ্বাস-প্রশ্বাসের মতো নাগরিক জীবনও বাঁটোয়ারা হয়ে গিয়েছে বলে কী এসে গিয়েছে। শুধু একটি নাকই নয়—একটি হৃদ্যন্ত্রও যদি বন্ধ হয়ে যেত এবং তার গলিত দুর্গন্ধ সারা দেহে ছাড়িয়ে পড়ত আর একটি হৃদযন্ত্রকেও আক্রান্ত করত— যাক, রূপককে এতদূর পর্যন্ত টেনে নিয়ে যাওয়ার কী এমন প্রয়োজন আছে? ,

মাঝে মাঝে এ মহল্লায় বা অন্য মহল্লায় বিস্ফোরণ হত। আর তখন ক্ষণিকের জন্যে সেই মহল্লায় এবং আশপাশের মহল্লায় জীবন স্তব্ধ হয়ে যেত, আর চালু ব্যবস্থা ভেঙে যেত এবং সেখানকার বুকের ওপর এক আতঙ্ক চেপে বসত। কখনও কখনও দু-একদিন ধরে খারাপ অবস্থা থাকত, এ কান সে কান হয়ে কথা ছড়িয়ে পড়ত—“ও পাড়া ভালো না।” আর তখন অন্য পাড়ার লোক দু-একদিনের জন্যে সে পাড়ার দিকে যাওয়া-আসা বন্ধ করে দিত। আবার একদিন অবস্থা পাল্টে যেত—গাড়ি চলাচল শুরু হত।

হঠাৎ একদিন বেশ কয়েকটা পাড়া জুড়ে আতঙ্ক ছেয়ে গেল। এই পাড়াগুলো এমন যে, এখানে হিন্দুস্থান আর পাকিস্তানের সীমারেখা টানা সম্ভব ছিল না । পেঁয়াজের খোসার মতো প্রতিটি পরতে পরতে হিন্দু আর মুসলমান জমাট বেঁধে ছিল। ফলে আশপাশ অঞ্চলে কোন গণ্ডগোল বা গণ্ডগোলের কোন গুজব হোক, –তার উদ্ভব বা কারণ হিন্দু বা মুসলমান যেই শুনুক না কেন— তারা তাদের জানলা-দরজা বন্ধ করে বাড়ির মধ্যে বন্দি থাকত; যারা বাইরে থাকত তারা বাড়িতে না ফিরে বাইরেই রাত কাটিয়ে দিত। আর দু-তিন দিন ধরে বাড়ির লোক জানতে পারত না সে স্বেচ্ছায় কোথাও থেকে গিয়েছে, না রাস্তায় মারা পড়েছে ...

সেই সময় আমি বালীগঞ্জের দিকে থাকতাম। এখানে শান্তি ছিল, আর কদাচিৎ তা নষ্ট হত। সব খবরই এখানে পাওয়া যেত, এমন কি ভবিষ্যতের প্রোগ্রামের কিছু কিছু পূর্বাভাসও। মন্ত্রণা এখানে হত, শরণার্থীরা এখানে আসত, আর যারা সহানুভূতির অভিলাষী তারা তাদের গল্প শুনিয়ে যেত ...

সেদিন ছিল আতঙ্কের দ্বিতীয় দিন। বেলা তিনটে নাগাদ সামনের বারান্দায় একটা চেয়ারে হেলান দিয়ে পথের মানুষের চলাচল দেখছিলাম। মানুষের এই চলাচলও অধ্যয়নের বিষয় হতে পারে—আর বিশেষ করে এই রকম এক আতঙ্কের সময় তা তো আরও বেশিই হবে। ঠিক এই সময় দেখলাম আমার এক প্রতিবেশী শিখ সর্দারজি সঙ্গে তিন চারজন শিখকে নিয়ে বাড়ির দিকে যাচ্ছেন। সর্দারজি সঙ্গের এই শিখদের এর আগে কোন দিন আমি দেখিনি, তাই কৌতূহল ছিল স্বাভাবিক। তাছাড়া সর্দারজির সঙ্গে এক দীর্ঘ কৃপাণ দেখে আরও আশ্চর্য হয়ে গিয়েছিলাম। সর্দার বিশন সিং শিখ হওয়া সত্ত্বেও খুব বিনীত, শান্তিপ্রিয় এবং মুক্ত চিন্তাধারার লোক,— প্রতীক হিসেবে কৃপাণ রাখা দরকার, তাই তিনি রাখতেন; কিন্তু এমন উদ্ধত ঢঙে কোটের ওপর কোমরবন্ধের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখতে কোন দিন দেখিনি।

বেশ খানিকটা পাঞ্জাবি বুলি মিশিয়ে আমি বললাম, “সর্দারজি, অজ্জ কিদ্দর ফৌজা চল্লিয়াঁ নে?” (সর্দারজি, আপনার ফৌজ নিয়ে কোথায় চললেন ? )

বিশন সিং ব্যস্ত সমস্ত চোখ তুলে একবার আমার দিকে তাকালেন। যেন তিনি বলছিলেন, “জানি, তুমি যে ঢঙে কথা বলছ, তাতে মুচকি হেসে তোমার আনন্দে আমার অংশ গ্রহণ করা উচিত, কিন্তু দেখতেই তো পাচ্ছো, আমি কেমন ফেঁসে গিয়েছি....”। তিনি শুধু বললেন, “পরে আসব।”

দঙ্গলটি সামনে এগিয়ে গেল।

যারা আরাম কেদারায় বসে পথের চলাচল দেখে, প্রথমত, তারা বসে বসেই অনেক কিছু দেখতে পায়; আর দ্বিতীয়ত, তারা যা কিছু দেখে তার সঙ্গে তাদের সামান্যতম গাঢ় অনুভূতিরও সম্পর্ক সৃষ্টি হয় না, যে অনুভূতি মনের মধ্যে ছাপ ফেলবে। রাত্রে তিনি যখন আমার এখানে এলেন, তখন আমি বিকেলের ঘটনাটা প্রায় ভুলেই বসেছিলাম। তাই নিজের বিষয়কে চেপে রেখে বললাম, “আসুন, বসুন, খুব খুশি হলাম।”

তিনি বসে পড়লেন। খানিকক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “আজকে মনটা খুব খারাপ।”

আমি পাঞ্জাবি বুলি ছেড়ে বেশ গম্ভীর হয়ে বললাম, “কেন, কী হয়েছে সর্দারজি? শরীর ভালো তো?”

সবই ভালো এই দুর্ভাগা দেশে। ভাই সাহাব, আর কী বলব। এখানে দাঙ্গা আর খুন-খারাপ হবে না তো আর কোথায় হবে, যেখানে প্রতিদিন নতুন নতুন জায়গায় দাঙ্গা আর খুনের শিকড় ছড়িয়ে দিয়েছি, আর তাতে সিঞ্চন করছি ... অবাক লাগে আমাদের জাতি কিভাবে আজ বেঁচে আছে?

তাঁর কথার মধ্যে একটা তীব্র বেদনাবোধ ছিল। ভাবলাম, যে কথা বলার জন্যে তিনি এই ভূমিকার অবতারণা করছেন, তা বলতে না দিলে তিনি কিছুই বলতে পারবেন না। তাই তাঁর কথা চুপচাপ শুনতে লাগলাম। তিনি বলতে লাগলেন, সমস্ত মুসলমানই আরব পারস্য এবং তাতার থেকে আসেনি। শতকরা একজনকে আমরা আজকে আরব, পারস্য এবং তাতারদের বংশধর বলতে পারি। আমার ধারণা,— ধারণা না বলে আমার অভিজ্ঞতা বলতে পারেন, আরব আর ইরানীরা খুব মিশুকে এবং শান্তিপ্রিয় । তাতারদের সঙ্গে আমাদের কোন রকম সম্পর্ক সৃষ্টি হয়নি। আর বাদবাকি সমস্ত মুসলমান কারা? তারা আমাদের ভাই, আমাদের দ্বারা অত্যাচারিত নিপীড়িত, যাদের মুখ আমরা হাজার হাজার বছর ধরে মাটির ওপর ঠেসে ঘসটে দিচ্ছি। সেই –সেই মুখই আজ ওপরে উঠে আমাদের ওপর থুথু ফেলছে, তাই আমাদের খারাপ লাগছে। তারা যেহেতু মুসলমান, তাই আমরা ঘৃণায় নিজেদের ভাইদের মুখ মাটির সঙ্গে ঘসটে দিচ্ছি! শুধু ভাইদেরই বা কেন, বোনদেরও পায়ের নীচে ফেলে দলছি-পিষছি; তাদের টু শব্দটিও করতে দিইনি। কারণ টু শব্দ করলে ধর্ম নষ্ট হয়ে যাবে ....”

আবেশে সর্দারজির কণ্ঠস্বর কাঁপতে লাগল। কিছুক্ষণ তিনি চুপ করে রইলেন। তারপর বললেন, “বাবু সাহাব, আপনি হয়তো ভাবছেন, এ শিখ হয়ে মুসলমানদের পক্ষ নিচ্ছে। হ্যাঁ, মুসলমানদের সঙ্গে যদি কারো কোন শত্রুতা থেকে থাকে তা আমাদের সঙ্গেই আছে। আপনিই বলুন, মুসলমান কারা ? অত্যাচারিত হিন্দুরাই তো মুসলমান ৷ যাদের আমরা বেইজ্জত করছি, তারা যদি আমাদের ঘৃণা করে তাহলে কি খুব অন্যায় হবে? পাওনা থাকলে আমরা উসুল করে নিই না ? আমার এ কথা যদি ঠিক নাও হয় তো খুঁত বের করার আমি কে? মানুষের উচিত প্রথমে তার নিজের দোষ দেখা, তার পরেই তার অন্য কিছু বলার অধিকার আসে। এ কথা কি আপনি স্বীকার করেন না? আমি বললাম, “আপনি ঠিকই বলেছেন। কিন্তু মানুষ তো শেষ অবধি মানুষই—দেবতা নয়।”

তিনি খুব উত্তেজিত ভাবে বললেন, “দেবতা ? আপনি বলছেন দেবতা ? দেবতা যদি মানুষ বা দুর্দান্ত শয়তানও হতে পারত তবে বুঝতাম। শয়তানেরও একটা নিয়ম কানুন আছে। আমি আপনার সঙ্গে তর্ক করতে আসিনি, আপনি আজকের ঘটনাটি শুনুন।”

বললাম, “বলুন, আমি শুনছি।”

“আপনি তো জানেন আমার বাড়ির পাশেই গুরুদ্বার। সেখানে সব সময়েই কিছু না কিছু লোক আশ্রয় পেয়েছে, আর আমিও সেখানে কখনও কখনও পাহারা দিয়েছি। এ কোন তারিফের ব্যাপার নয়, গুরুদ্বারকে সেবা করার নিয়ম আছে, তাই। আশ্রয় দেওয়ারও একটা রীতি চলে আসছে। তাই এই রকম একটা ঘটনা ঘটে গেল। আমরা মনুষ্যত্বের কোন নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করিনি। যাহোক, কালকে আমি শ্যামবাজার থেকে ফিরছিলাম, সেই সময় দেখলাম হঠাৎই রাস্তায় কেমন একটা নিস্তব্ধতা ঘনিয়ে আসছে। দু-একজন আমাকেও ডেকে বলল, “বাড়িতে যাও, দাঙ্গা শুরু হয়ে গিয়েছে।’ কিন্তু তারা বলতে পারল না দাঙ্গাটা কোথায় হয়েছে। ট্রাম তো বন্ধই ছিল।

“ধর্মতলার কাছে দেখলাম, একজন মহিলা ঘাবড়ে সামনের দিকে ছুটছে। তার এক হাতে ছোট্ট একটা প্যাকেট আর অন্য হাতে ছোট্ট একটা মানিব্যাগ চেপে ধরা। সে কাঁদছিল। দেখে কোন ভদ্রঘরের মহিলা বলে মনে হল। এক মুহূর্ত ভাবলাম, তারপর ছুট দিলাম, ভয়ও একটু পেয়েছিলাম,—এই রকম একটা সময়ে একলা যাওয়াটা কি ঠিক—তাও আবার একজন বাঙালি মহিলা। ঠিক হবে না, কিন্তু তবুও তার কাছে পৌঁছে গেলাম। তাকে জিজ্ঞেস করলাম, 'মা, তুমি কোথায় যাবে?” প্রশ্ন শুনে সে প্রথমে খুব ভয় পেয়ে গেল, কিন্তু যখন দেখল আমি মুসলমান নই, একজন শিখ, তখন সে নিজেকে একটু সামলিয়ে নিল। জানতে পারলাম উত্তর কলকাতা থেকে সে আর তার স্বামী ধর্মতলায় এসেছিল। ঠিক করেছিল, দুজনে আলাদা-আলাদা ভাবে মার্কেট করে কে. সি. দাসের দোকানের সামনে সময়মতো দেখা করবে এবং তারপর বাড়িতে ফিরবে। এরই মধ্যে এই ঘটনা ঘটে গেল। নিস্তব্ধতা দেখে ভয়ে সে বাড়ি পালাচ্ছে— কে. সি. দাসের দোকানে আর যায়নি। রাস্তায় চাঁদনি পড়ে, শুনেছে চাঁদনি হচ্ছে মুসলমানদের এক দুর্গ।

“আমি তাকে বললাম, ভয় পেও না। আমার সঙ্গে ধর্মতলাটুকু পার হও, কে. সি. দাসের দোকানে যদি তার স্বামীকে পাওয়া যায় তো ভালো, তা না হলে সেখান থেকে নিশ্চয়ই বালীগঞ্জের ট্রাম পাওয়া যাবে। ট্রামে করে গিয়ে গুরুদ্বারে রাতে থেকে যেও । ভোরে তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসব। সন্ধ্যা ঘনিয়ে আসছিল, রাস্তাঘাটে বৈদ্যুতিক আলো নেই বললেই চলে, এমন অবস্থায় পাঁচ-ছ মাইল দাঙ্গার এলাকা হেঁটে পার হওয়া ঠিক হবে না।” এইটুকু বলে সর্দার বিশন সিং কয়েক মুহূর্তের জন্যে থামলেন, তারপর আমার দিকে চোখ তুলে জিজ্ঞেস করলেন, “বলুন, আমি কি বেঠিক কিছু বলছি? আমিই বা আর কী করতে পারতাম?”

“ঠিক বলেছেন, আর যাওয়ার রাস্তাই বা কোথায় ছিল ?”

“না, আপনি ঠিক বললেন না। পরে বুঝতে পারলাম তাকে একলা ছুটতে দেওয়াই ঠিক ছিল।”

“কেন?” আমি আশ্চর্য হয়ে জিজ্ঞেস করলাম।

“তবে শুনুন।” সর্দারজি দীর্ঘ নিঃশ্বাস টেনে বলতে লাগলেন, “কে সি. দাসের দোকান বন্ধ ছিল। তার স্বামীর কোন নাম-নিশানাই নেই। আমি সেই মহিলাটিকে ট্রামে করে এখানে নিয়ে এলাম। আমি যে একলা মানুষ, তা তো আপনি জানেন ৷ আমার বোন তাকে গুরুদ্বারে খাবার এবং বিছানাপত্র দিয়ে আসে। ভোরে একজন শিখ ড্রাইভারের সঙ্গে কথা বলে ট্যাক্সি ঠিক করি এবং তাকে তার বাড়িতে নিয়ে যাই। দরজা বন্ধ ছিল। কড়া নাড়তে একজন অলস প্রকৃতির ভদ্রলোক—ওর স্বামী—দরজা খুলল।”

“আপনাদের দেখে সে নিশ্চয়ই আনন্দে নেচে উঠেছিল?”

“হ্যাঁ, নেচে তো উঠেছিলই। বৌকে দেখে নয়, আমাকে দেখে।” তারপর সে আবার দীর্ঘ নিঃশ্বাস নিল। “ভদ্রলোক তো কে. সি. দাসের দোকানের সামনে দাঁড়ায়নি, দাঙ্গার খবর শুনে কোন বন্ধুর বাড়িতে চলে যায়। রাত্রে সেখানেই থাকে, আমরা সেখানে পৌঁছনোর কিছু আগে সে ফিরেছিল। চোখ ফোলা ফোলা। দরজা খুলে আমাকে দেখে সে চমকে ওঠে, আর আমার পেছনে তার স্ত্রীকে দেখে মুহূর্তের জন্যে সে থমকে যায়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই সে জিজ্ঞেস করল, “আপনি কে?”

বললাম, “আগে তো এঁকে ভিতরে যেতে দিন, পরে আপনাকে সব বলছি। মহিলাটি প্রথম থেকেই শঙ্কায় মাথা নীচু করে দাঁড়িয়েছিল, এবার সে ঘোমটা সামনে টেনে দিয়ে জড়োসড়ো হয়ে দাঁড়াল।”

বিশন সিং আবার থামল, আমিও চুপ করে রইলাম।

তার স্বামী জিজ্ঞেস করল, “রাত্রে এ আপনার ওখানে ছিল ?”

আমি বললাম, “হ্যাঁ, আমাদের গুরুদ্বারে ছিল । রাত্রে এখানে আসা সম্ভব ছিল না তাই।” সে আবার জিজ্ঞেস করল, “আপনার স্ত্রী ছেলে মেয়ে আছে?” বললাম, “না আমার বিধবা বোন আমার সঙ্গে থাকে, কিন্তু এসবে আপনার কী দরকার ?”

সে আমার কথার কোন জবাব দিল না। সেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই তার স্ত্রীকে বাংলায় জিজ্ঞেস করল, “জানি না, রাত্রে তুমি কোথায় থেকেছ, সকালে এখানে আসতে তোমার লজ্জা করল না?” সর্দার বিশন সিং বলতে বলতে থেমে গিয়ে আমার দিকে তাকালেন।

আমি বললাম, “নীচ কোথাকার !”

বিশন সিং-এর মুখের ওপর এক দরদভরা হাসি ঝিলিক দিয়ে উঠল। বললেন, “না জানি সেই লোকটিকে আমি করতাম—আর ভাবছিলাম, না জানি মহিলাটি কী জবাব দেয়। কিন্তু মেয়েদের এই জবাব না দেওয়াটাই যে কত বড় জবাব আজকালকার মানুষ তা কী করে বুঝবে? পেছনে কিছু পড়ে যাওয়ার শব্দ শুনে ফিরে তাকালাম—দেখলাম মহিলাটি অজ্ঞান হয়ে পড়ে গিয়েছে। আমি সঙ্গে সঙ্গে তাকে তোলার জন্যে ঝুঁকলাম, কিন্তু সেই লোকটি আমাকে এমন এক থাপ্পড় দিল যে, আমার হাত নিশ্চল হয়ে গেল। আমি শুধু তাকে বললাম, ‘ওকে ওঠাও, জলের ছিটে দাও...' সে একটুও নড়ল না, তার ডাগর ডাগর চোখ ছোট হতে হতে শুকনো কাঠের মতো হয়ে গেল। তারপর সে ধীরে ধীরে দরজা বন্ধ করে দিল।”

আমি স্তব্ধ হয়ে শুনছিলাম। বলার কিছুই খুঁজে পেলাম না।

“লোকজন জমতে লাগল। মহিলাটির কথা চিন্তা করে বেশি ভিড়ভাট্টা, যাতে না হয় তাই আমি চাইছিলাম। ড্রাইভারের সাহায্যে আমি মহিলাটিকে ট্যাক্সিতে তুলে বাড়িতে নিয়ে এলাম। বোনকে মহিলাটির দেখাশোনার ভার দিয়ে বাবা বচিতর সিং-এর কাছে গেলাম—তিনি বয়োবৃদ্ধ এবং গুরুদ্বারের ট্রাস্টি। সেখানে আমরা সবাই মিটিং করে পরামর্শ করলাম কী করা যায়। কেউ কেউ বলল, ওই লোকটিকে শেষ করে দাও, কিন্তু তাতে বিধবাটির কোন সুরাহা হবে না। তারপর ঠিক হল গুরুদ্বারের পক্ষ থেকে পাঁচজনের একটি দল মহিলাটিকে নিয়ে সেই লোকটির কাছে যাবে। এবং তাকে বলবে একে ঘরে না তুললে মনে করা হবে তুমি গুরুদ্বারকে বেইজ্জত করছ—তোমাকে কেটে ফেলা হবে।”

“তাই কালকে বেলা তিনটের সময় আপনারা ওখান থেকে ফিরছিলেন।...”

“হ্যাঁ, আপনি জানেন তো, আমি কখনও অমন ভাবে কৃপাণ ঝোলাই না । কোন এক যুগে যে কারণে গুরুরা কৃপাণ ঝোলানোকেই ধর্ম বলে ফতোয়া জারি করেছিলেন, আজকে হলে তাঁরা হয়তো রাইফেল ছাড়া আর কিছু ঝোলাতে বলতেন না। শুধু প্রতীকের এই মোহ নিজের দুর্বল হৃদয়কে লুকানো ছাড়া আর কী হতে পারে। যাক, আমরা তো মহিলাটিকে নিয়ে গেলাম। আমাকে দেখে প্রথমে কিছু লোকের ভিড় জমে গেল, তারপর পুরো দঙ্গলটা দেখে সেই লোকটির বুদ্ধি খেলে গেল। সে আমাকে বলল, “ঠিক আছে, সব আপনাদের মেহেরবানি।” তারপর সে মহিলাটিকে বলল, “চলো, ভিতরে গিয়ে বসো।” আমাদের ভিতরে যেতে বা বসতে বলল না ... বললেও কি আমরা ওই শয়তানের ঘরে বসতাম।”

“মেয়েটি ভিতরে চলে গেল? কোন কিছু বলল না ?”

“কী আর বলবে? জ্ঞান ফেরার পর থেকে তার মুখে কোন শব্দ ছিল না। তার চোখ দুটো যেন কেমন ভাবহীন হয়ে গিয়েছিল। সেই চোখের কাছে চোখ নিয়ে দেখলে শুধুমাত্র একটা প্রাচীর ছাড়া আর কিছুই দেখা যাচ্ছিল না। আমি আর তার কাছে দাঁড়াতে পারছিলাম না। সে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল । আমরা যখন তাকে বললাম, ‘যাও মা, ঘরে যাও ...' তখন সে যন্ত্রচালিতের মতো দু এক কদম এগুলো। সে তার স্বামীর রাগে ফুলে ওঠা-নামা-করা নাকের দিকে একবারের জন্যেও তাকাল না, না তাকিয়ে সে মাথা নীচু করে এক পা-এক পা করে এগুতে লাগল আর ক্রমশ দুমড়ে মুচড়ে যেতে লাগল ৷ দেউড়ি পর্যন্ত পৌঁছতে না পৌঁছতেই সে টলতে টলতে বসে পড়ল। ভাবলাম, সে মাথা ঘুরে পড়ে যাবে; বসতে না বসতেই চৌকাঠের সঙ্গে তার মাথা ঠুকে গেল, কোনমতে সে নিজেকে সামলে নিল। সে বসে পড়ল, আমরা তাকে ওইখানে ওইভাবে ছেড়েই চলে এলাম।”

আমরা দুজনেই অনেকক্ষণ কোন কথা বলতে পারলাম না ।

খানিকক্ষণ বাদে সর্দার বিশন সিং বলল, “ভাই সাহাব, কিছু বলুন।” আমি বললাম, “ছেড়ে দিন, ব্যাপারটা তো কোন রকমে শেষ হয়ে গিয়েছে। লোকটা তো তাকে ঘরে তুলে নিয়েছে ...

বিশন সিং তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে আমার দিকে চাইল। “বাবু সাহাব, আপনি সত্যি সত্যি বলছেন?”

আমি চমকে উঠে বললাম, “কেন? এতে মিথ্যের কী আছে?”

“আপনি কি সত্যি সত্যি বিশ্বাস করেন ব্যাপারটা এখানেই শেষ হয়ে গিয়েছে?” আমি তোতলাতে তোতলাতে বললাম, “না, ঠিক তা মনে করি না। আমাদের জন্যে ভালোয় ভালোয় শেষ হয়ে গিয়েছে, কিন্তু ওর জন্যে নয়।”

“আমাদের পক্ষেই বা কী এমন ভালো? ছেড়ে দিন এখন। বলুন, ওই মহিলার কী হবে ?”

আমি প্রতিটি কথা মেপে বললাম, “বাঙলা দেশে প্রায় রোজই খবরের কাগজে দেখা যায়, ননদ আর শাশুড়ির অত্যাচারে বৌ আত্মহত্যা করেছে, বিষ খেয়েছে বা কুয়োয় ঝাঁপ দিয়েছে। আর ... কখনও কখনও বা বউয়ের কাপড়ে আগুন লেগে অ্যাকসিডেন্ট হয়—শুধু আগুন কেরোসিন তেলে ...”

“মাফ করবেন, তা হয়তো হতে পারে। আমি একটু কটু কথা বলতে পছন্দ করি । আপনি হিন্দু, তাই আপনি এভাবে ভাবছেন। ওরা মারা যাবে, না হয় পালাবে। হিন্দু ধর্ম উদার, না? এ ধর্ম মারে না, মরার জন্যে সমস্ত রকম সুবন্দোবস্ত করে দেয়। এতে দু ধরনের লাভ আছে— এক, কখনও ভুলভ্রান্তি হয় না, আর দ্বিতীয়, দয়ারও পথ আছে। কিন্তু আপনি আমাকে বলুন, পুরুষ যদি পশু হয়, তবে নারী কিভাবে দেবী হয়? ‘দেবতা' শব্দটি আমি ভেবেচিন্তেই বলছি। কারণ মানুষের ন্যায়-বিচার তো দেবতাদের চেয়ে অনেক অনেক ওপরে স্থান পেতে পারে। দেবতারা সুদ নেয় না সত্য কিন্তু পাই-পয়সা উসুল করে নেয়। ... বলুন, নেয় কি না ?”

আমি বললাম, “সর্দারজি, আপনি আঘাত পেয়েছেন বলে এই ধরনের কড়া কড়া কথা বলছেন। ওই লোকটি ভালো এ কথা আমি বলছি না। বলছি একজন লোককে দেখে গোটা হিন্দুদের ওপর অপবাদ দিচ্ছেন।”

“এ কি শুধু একজন মানুষের ব্যাপার? যখন ভাবি, ওই লোকটির মধ্যে কি কোন ন্যায়বোধ আছে, তখন দেখি সেই মহিলাটি পরিত্যক্তা হয়ে মুসলমান হয়েছে। মুসলমান হয়ে সে এমন মুসলমানের জন্ম দেয় যে হাজার হাজার হিন্দুকে মারার জন্যে কসম খায়। আপনি তো সাইকোলজি পড়েছেন, সুতরাং বুঝবেন, হিন্দু মহিলাদের সঙ্গে সত্যি সত্যি তাই-ই করা হয়—যে মিথ্যা অপবাদ তার মার ওপরে দেওয়া হয়েছে ! দেবতাদের ন্যায়বিচার চিরদিন ধরে তো এভাবেই চলে আসছে— নিপীড়নের এক একটি বীজ চিরদিনের জন্যে হাজার হাজার বিষাক্ত গাছের জন্ম দিয়েছে। তা না হলে এই জঙ্গল এখানে কিভাবে জন্মেছে— যে জঙ্গলে আজ আমি আপনি সবাই হারিয়ে গিয়েছি। জানি না এখান থেকে আর বেরুতে পারব কি না। আমরা প্রতিদিন কয়েকবার করে নিপীড়নের নতুন বীজ বপন করছি— আর তা থেকে যখন চারা হচ্ছে, তখন আমরা চিৎকার করে বলছি : মাটি আমাদের সঙ্গে বেইমানি করেছে।” :

আমি অনেকক্ষণ ধরে চুপ করে রইলাম । সর্দার বিশন সিং-এর কথাগুলি যেন চামড়ার নীচে কাঁকর হয়ে দলাই মলাই করতে লাগল। পরিবেশ কেমন থমথমে হয়ে গিয়েছিল। আমি তাঁকে হাল্কা করার জন্যে বললাম, “শিখ কমিউনিটির শিভ্যালরি বিখ্যাত। বুঝতে পারছি, এই হতভাগিনীর দুঃখ আপনার শিভ্যালরিকে আঘাত করেছে।”

উঠতে উঠতে তিনি বললেন, “আমার শিভ্যালরি!” কিছুক্ষণ পরে তিনি এমন এক স্বরে কথাটি বললেন— যে স্বরে ছিল এক অদ্ভুত ধরনের গোঙানি “ভাই সাহাব, আমার শিভ্যালরি!”

তিনি মুখ ঘুরিয়ে নিলেন, কিন্তু আমি দেখতে পেলাম, তাঁর ঠোঁট ব্যথায় থরথর করে কাঁপছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%