কমলেশ সেন
সমরেশ বসু
সমরেশ বসুর পৈত্রিক নিবাস ঢাকা জেলা। পরবর্তী সময়ে নৈহাটিতে আসেন। এখানে থাকাকালীন শুরু হয় তাঁর সাহিত্য জীবন। সাহিত্য জীবনের সঙ্গে সঙ্গে শুরু হয় রাজনৈতিক জীবন। তদানীন্তন অবিভক্ত কমিউনিস্ট পার্টির সাংস্কৃতিক মুখপাত্র ‘পরিচয়’-এ প্রকাশিত হয় তাঁর প্রথম গল্প ‘আদাব’। প্রথম গল্পই বামপন্থী মহলকে আকৃষ্ট করে। ‘কিমলিস’, ‘পশারিনী তাঁকে খ্যাতির উচ্চ সীমায় নিয়ে যায়। ‘জগদ্দল’-এর মতো উপন্যাস বাংলা সাহিত্যে বিরল তার পটভূমি এবং জীবন সম্পর্কে নতুন মানবীয় মূল্যবোধে। দীর্ঘ সময় ধরে তিনি প্রগতি আন্দোলনের শুধু পাশাপাশিই ছিলেন না, ছিলেন তার একনিষ্ঠ কর্মীও। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৮৮ সালের ১২ মার্চ।
রাত্রির নিস্তব্ধতাকে কাঁপিয়ে দিয়ে মিলিটারি টহলদার গাড়িটা একবার ভিক্টোরিয়া পার্কের পাশ দিয়ে একটা পাক খেয়ে গেল।
শহরে ১৪৪ ধারা আর কারফিউ অর্ডার জারি হয়েছে। দাঙ্গা বেধেছে হিন্দু আর মুসলমানে। মুখোমুখি লড়াই—দা, শড়কি, ছুরি, লাঠি নিয়ে। তা ছাড়া চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়েছে গুপ্তঘাতকের দল— চোরাগোপ্তা হানছে অন্ধকারকে আশ্রয় করে।
লুঠেরারা বেরিয়েছে তাদের অভিযানে। মৃত্যুবিভীষিকায় এই অন্ধকার রাত্রি তাদের উল্লাসকে তীব্রতর করে তুলেছে। বস্তিতে বস্তিতে আগুন। মৃত্যুকাতর নারী-শিশুর চিৎকার স্থানে স্থানে আবহাওয়াকে বীভৎস করে তুলছে। তার উপর এসে ঝাঁপিয়ে পড়ছে সৈন্যবাহী গাড়ি। তারা গুলি ছুঁড়ছে দিকবিদিগ্ জ্ঞানশূন্য হয়ে আইন এবং শৃঙ্খলা বজায় রাখতে।
দুদিক থেকে দুটো গলি এসে মিশেছে এ জায়গায়। ডাস্টবিনটা উলটে এসে পড়েছে গলি দুটোর মাঝখানে খানিকটা ভাঙাচোরা অবস্থায়। সেটাকে আড়াল করে গলির ভিতর থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বেরিয়ে এল একটি লোক। মাথা তুলতে সাহস হল না, নির্জীবের মতো পড়ে রইল খানিকক্ষণ। কান পেতে রইল দূরের অপরিস্ফুট কলরবের দিকে। কিছুই বোঝা যায় না – “আল্লাহ আকবর’, কি ‘বন্দেমাতরম !
হঠাৎ ডাস্টবিনটা একটু নড়ে উঠল। আচম্বিতে শিরশিরিয়ে উঠল দেহের সমস্ত শিরা উপশিরা। দাঁতে দাঁত চেপে হাত পাগুলোকে কঠিন করে লোকটা প্রতীক্ষা করে রইল একটা ভীষণ কিছুর জন্য। কয়েকটা মুহূর্ত কাটে।.... নিশ্চল নিস্তব্ধ।
…. বোধহয় কুকুর। তাড়া দেওয়ার জন্যে লোকটা ডাস্টবিনটাকে ঠেলে দিল একটু। খানিকক্ষণ চুপচাপ। আবার নড়ে উঠল ডাস্টবিনটা, ভয়ের সঙ্গে এবার একটু কৌতূহল হল। আস্তে আস্তে মাথা তুলল লোকটা ওপাশ থেকেও উঠে এল ঠিক তেমনি একটা মাথা। মানুষ। ডাস্টবিনের দুই পাশে দুটি প্রাণী নিস্পন্দ, নিশ্চল। হৃদয়ের স্পন্দন তালহারা-ধীর ... । স্থির চারটে চোখের দৃষ্টি ভয়ে সন্দেহে উত্তেজনায় তীব্র হয়ে উঠেছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করতে পারছে না। উভয়ে উভয়কে ভাবছে খুনি। চোখে চোখ রেখে উভয়েই একটা আক্রমণের প্রতীক্ষা করতে থাকে, কিন্তু খানিকক্ষণ অপেক্ষা করেও কোন পক্ষ থেকেই আক্রমণ এল না। এবার দুজনের মনেই একটা প্রশ্ন জাগল— হিন্দু, না মুসলমান ? এ প্রশ্নের উত্তর পেলেই হয়তো মারাত্মক পরিণতিটা দেখা দেবে। তাই সাহস করছে না কেউ কাউকে সে কথা জিজ্ঞেস করতে। প্রাণভীত দুটি প্রাণী পালাতেও পারছে না—ছুরি হাতে আততায়ীর ঝাঁপিয়ে পড়ার ভয়ে।
অনেকক্ষণ এই সন্দিহান ও অস্বস্তিকর অবস্থায় দুজনেই অধৈর্য হয়ে পড়ে। একজন শেষ অবধি প্রশ্ন করে ফেলে—হিন্দু না মুসলমান ?
—আগে তুমি কও।—অপর লোকটি জবাব দেয়।
পরিচয়কে স্বীকার করতে উভয়েই নারাজ। সন্দেহের দোলায় তাদের মন দুলছে . প্রথম প্রশ্নটা চাপা পড়ে, আবার অন্য কথা আসে। একজন জিজ্ঞেস করে, বাড়ি কোনখানে?
—বুড়িগঙ্গার হেইপারে—সুবইডায়।—তোমার?
—চাষড়া – নারাইনগঞ্জের কাছে ... কী কাম কর ?
–নাও আছে আমার, নায়ের মাঝি। –তুমি ?
—নারাইনগঞ্জের সুতাকালে কাম করি।
আবার চুপচাপ। অলক্ষে অন্ধকারের মধ্যে দুজনে দুজনের চেহারাটা দেখবার চেষ্টা করে। চেষ্টা করে উভয়ের পোশাক-পরিচ্ছদটা খুঁটিয়ে দেখতে। অন্ধকার আর ডাস্টবিনটার আড়াল সেদিক থেকে অসুবিধা ঘটিয়েছে।.... হঠাৎ কাছাকাছি কোথায় একটা শোরগোল ওঠে। শোনা যায় দু-পক্ষেরই উন্মত্ত ধ্বনি। সুতাকলের মজুর আর নাওয়ের মাঝি দুজনেই সন্ত্রস্ত হয়ে একটু নড়েচড়ে ওঠে।
ধারে কাছেই য্যান লাগছে। -
-সুতা-মজুরের কণ্ঠে আতঙ্ক ফুটে উঠল ।
হ, চলো এইখান থেইক্যা উইঠা যাই। - মাঝিও বলে উঠল অনুরূপ কণ্ঠে। সুতা-মজুর বাধা দিল: আরে না না –উইঠো না । জানটারে দিবা নাকি?
মাঝির মন আবার সন্দেহে দুলে উঠল। লোকটার কোন বদ অভিপ্রায় নেই তো ! সুতা-মজুরের চোখের দিকে তাকাল সে। সুতা-মজুরও তাকিয়েছিল। চোখে চোখ পড়তেই বলল, বইয়ো। যেমুন বইয়া রইছ—সেই রকমই থাকো ।
মাঝির মনটা ছাঁৎ করে উঠল সুতা-মজুরের কথায় । লোকটা কি তাহলে তাকে যেতে দেবে না নাকি। তার সারা চোখে সন্দেহ আবার ঘনিয়ে এল। জিজ্ঞেস করল—ক্যান্।
ক্যান্? সুতা-মজুরের চাপা গলায় বেজে উঠল, ক্যান্ কী, মরতে যাইবা নাকি তুমি ?
কথা বলার ভঙ্গিটা মাঝির ভালো ঠেকল না। সম্ভব অসম্ভব নানারকম ভেবে সে মনে মনে দৃঢ় হয়ে উঠল। – যামু না, কি এই আন্দাইরা গলির ভিতরে পইড়া থাকুম নাকি? –
লোকটার জেদ দেখে সুতা-মজুরের গলায়ও ফুটে উঠল সন্দেহ। বলল—তোমার মতলবটা তো ভালো মনে হইত্যাছে না। কোন্ জাতির লোক তুমি কইলা না, শেষে তোমাগো দলবল যদি ডাইকা লইয়া আহ আমারে মারনের লেইগা?
—এইটা কেমুন কথা কও তুমি? স্থান কাল ভুলে রাগে দুঃখে মাঝি প্রায় চেঁচিয়ে ওঠে।
—ভালো কথাই কইছি ভাই; বইয়ো। মানুষের মন বোঝ না ?
সুতা-মজুরের গলায় যেন কী ছিল, মাঝি একটু আশ্বস্ত হল শুনে।
—তুমি চইলা গেলে আমি একলা থাকুম নাকি?
- শোরগোলটা মিলিয়ে গেল দূরে। আবার মৃত্যুর মতো নিস্তব্ধ হয়ে আসে সবমুহূর্তগুলিও কাটে যেন মৃত্যুর প্রতীক্ষার মতো। অন্ধকার গলির মধ্যে ডাস্টবিনের দুই পাশে দুটি প্রাণী ভাবে নিজেদের বিপদের কথা, ঘরের কথা, মা-বউ-ছেলে মেয়েদের কথা ... তাদের কাছে কি আর তারা প্রাণ নিয়ে ফিরে যেতে পারবে, না তারাই থাকবে বেঁচে ... কথা নেই, বার্তা নেই, হঠাৎ কোত্থেকে বজ্রপাতের মতো নেমে এল দাঙ্গা । এই হাটে-বাজারে দোকানে এতো হাসাহাসি, কথা কওয়া-কওয়ি— আবার মুহূর্ত পরেই মারামারি, কাটাকাটি একেবারে রক্তগঙ্গা বইয়ে দিল সব। এমন ভাবে – মানুষ নির্মম নিষ্ঠুর হয়ে ওঠে কী করে? কী অভিশপ্ত জাত ! দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে। দেখাদেখি মাঝিরও একটা নিশ্বাস পড়ে।
—বিড়ি খাইবা ? – সুতা-মজুর পকেট থেকে একটি বিড়ি বের করে বাড়িয়ে দিল মাঝির দিকে। মাঝি বিড়িটা নিয়ে অভ্যাসমতো দু-একবার টিপে, কানের কাছে বার কয়েক ঘুরিয়ে চেপে ধরল ঠোঁটের ফাঁকে। সুতা-মজুর তখন দেশলাই জ্বালাবার চেষ্টা করছে। আগে লক্ষ করেনি জামাটা কখন ভিজে গেছে। দেশলাইটাও গেছে সেঁতিয়ে। বার কয়েক খশ খশ শব্দের মধ্যে এক-আধটা নীলচে ঝিলিক দিয়ে উঠল। বারুদ-ঝরা কাঠি ফেলে দিল বিরক্ত হয়ে।
—হালার ম্যাচবাতি গেছে সেঁতাইয়া। —আর একটা কাঠি বের করল সে। মাঝি যেন খানিকটা অসবুর হয়েই উঠে এল সুতা-মজুরের পাশে।
আরে জ্বলব জ্বলব, দেও দেহিনি –আমার কাছে দেও। সুতা-মজুরের হাত থেকে দেশলাইটা সে প্রায় ছিনিয়েই নিল। দু-একবার খশ খশ করে সত্যিই সে জ্বালিয়ে ফেলল একটা কাঠি।
সোহান্ আল্লা ! নেও নেও –ধরাও তাড়াতাড়ি
ভূত দেখার মতো চমকে উঠল সুতা-মজুর। টেপা ঠোঁটের ফাঁক থেকে পড়ে গেল বিড়িটা। তুমি .... ?
একটা হালকা বাতাস এসে যেন ফুঁ দিয়ে নিবিয়ে দিল কাঠিটা। অন্ধকারের মধ্যে দুজোড়া চোখ অবিশ্বাসে উত্তেজনায় আবার বড় বড় হয়ে উঠল। কয়েকটা নিস্তব্ধ পল কাটে ।
মাঝি চট করে উঠে দাঁড়াল। বলল, – হ, আমি মোছলমান।
– কী হইছে?
সুতা-মজুর ভয়ে ভয়ে জবাব দিল—কিছু হয় নাই, কিন্তু ...
মাঝির বগলের পুটুলিটা দেখিয়ে বলল, ওইটার মধ্যে কী আছে?
পোলা -মাইয়ার লেইগা দুইটা জামা আর একখান শাড়ি। কাইল আমাদের ঈদের পরব, জানো?
আর কিছু নাই তো? –সুতা-মজুরের অবিশ্বাস দূর হতে চায় না ।
মিথ্যা কথা কইতেছি নাকি? বিশ্বাস না হয় দেখো সুতা-মজুরের দিকে। - পুঁটলিটা বাড়িয়ে দিল সে
আরে না না ভাই, দেখুম আর কী। তবে দিনকালটা দেখছ তো?
ভগবানের কিরা কইরা কইতে পারি, একটা সুঁইও নাই। পরানটা লইয়া আপন ঘরের পোলা ঘরে ফিরা যাইতে পারলে হয়। সুতা-মজুরকে তার জামা কাপড় নেড়েচেড়ে দেখায়।
আবার দুজন বসল পাশাপাশি। বিড়ি ধরিয়ে নীরবে বেশ মনোযোগ সহকারে দুজনে ধূমপান করল খানিকক্ষণ!
আইচ্ছা ...... মাঝি এমনভাবে কথা বলে যেন সে তার কোন আত্মীয়-বন্ধুর সঙ্গে কথা বলছে।
–আইচ্ছা –আমারে কইতে পারনি—এই মাইর-দইর কাটাকুটি কিয়ের লেইগা ? সুতা-মজুর খবরের কাগজের সঙ্গে সম্বন্ধ রাখে, খবরাখবর সে জানে কিছু। বেশ একটু উষ্ণ কণ্ঠেই জবাব দিল সে—দোষ তো তোমাগো লিগওয়ালাগোই। তারাই তো লাগাইছে হেই কিয়ের সংগ্রামের নাম কইরা।
মাঝি একটু কটূক্তি করে উঠল—হেই সব আমি বুঝি না। আমি জিগাই, মারামারি কইরা হইব কী। তোমাগো দুগা লোক মরব, আমাগো দুগা মরব। তাতে দ্যাশের কী উপকারটা হইব?
–আরে আমিও তো হেই কথাই কই। হইব আর কী, হইব আমার এই কলাটা—হাতের বুড়ো আঙুল দেখায় সে। —তুমি মরবা, আমি মরুম, আর আমাগো পোলা-মাইয়াগুলি ভিক্ষা কইরা বেড়াইব। এই গেল সনের ‘রায়টে’ আমার ভগ্নিপতিরে কাইটা চাইর টুকরো কইরা মারল। ফলে হইল বিধবা বইন আর পোলা-মাইয়ার আইয়া পড়ল আমার ঘাড়ের উপুর। কই কী আর সাধে, ন্যাতারা হেই সাততলার উপুর পায়ের উপুর পা দিয়া হুকুম জারি কইরা বইয়া রইল আর হালার মরতে মরলাম আমরাই।
—মানুষ না, আমরা য্যান কুত্তার বাচ্চা হইয়া গেছি; নইলে এমুন কামড়াকামড়িটা লাগে কেমবায়?—নিষ্ফল ক্রোধে মাঝি দুহাত দিয়ে হাঁটু দুটো জড়িয়ে ধরে। -হ ।
—আমাগো কথা ভাবে কেডা? এই যে দাঙ্গা বাধল –অকন জুটাইব কোন্ সুমুদ্দি; ; নাওটারে কি আর ফিরা পামু? বাদামতলির ঘাটে কোন্ অতলে ডুবাইয়া দিছে তারে-তার ঠিক কী? জমিদার রূপবাবুর বাড়ির নায়েব মশয় পিত্যেক মাসে একবার কইরা আমার নায়ে যাইত নইরার চরে কাছারি করতে। বাবুর হাত য্যান হজরতের হাত, বখশিস্ দিত পাঁচ, নায়ের কেরায়া দিত পাঁচ, একুনে দশটা টাকা। তাই আমার মাসের খোরাকি জুটাইত হেই বাবু। আর কি হিন্দুবাবু আইব আমার নায়ে।
সুতা-মজুর কী বলতে গিয়ে থেমে গেল। একসঙ্গে অনেকগুলি ভারি ভারি বুটের শব্দ শোনা যায়। শব্দটা যেন বড় রাস্তা থেকে গলির অন্দরের দিকেই এগিয়ে আসছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। শঙ্কিত জিজ্ঞাসা নিয়ে উভয়ে চোখা চোখি করে।
—কী করব? মাঝি তাড়াতাড়ি পুঁটলিটাকে বগলদাবা করে।
না । —চলো পালাই। কিন্তুক যামু কোনদিকে? শহরের রাস্তাঘাট তো ভালো চিনি
মাঝি বলল, চলো যেদিকে হউক। মিছামিছি পুলিসের মাইর খামু না;— ওই ঢ্যামনাগো বিশ্বাস নাই ।
—হ। ঠিক কথাই কইছ। কোনদিকে যাইবা কও-
—এই দিকে।
আইয়া তো পড়ল।
গলিটার যে মুখটা দক্ষিণ দিকে চলে গেছে সেদিকে পথ নির্দেশ করল মাঝি। বলল, চলো কোনগতিকে একবার যদি বাদামতলি ঘাটে গিয়া উঠতে পারি—তাইলে আর ডর নাই ।
মাথা নিচু করে মোড়টা পেরিয়ে ঊর্ধ্বশ্বাসে তারা ছুটল, সোজা এসে উঠল একেবারে পাটুয়াটুলি রোডে। নিস্তব্ধ রাস্তা ইলেকট্রিকের আলোয় ফুটফুট করছে। দুইজনেই একবার থমকে দাঁড়াল—ঘাপটি মেরে নেই তো কেউ? কিন্তু দেরি করারও উপায় নেই। রাস্তার এমোড় ওমোড় একবার দেখে নিয়ে ছুটল সোজা পশ্চিম দিকে। খানিকটা এগিয়েছে এমন সময় তাদের পিছনে শব্দ উঠল ঘোড়ার খুরের। তাকিয়ে দেখল—অনেকটা দূরে একজন অশ্বারোহী এদিকেই আসছে। ভাববার সময় নেই । বাঁ পাশে মেথর যাতায়াতের সরু গলির মধ্যে আত্মগোপন করল তারা। একটু পরেই ইংরেজ অশ্বারোহী রিভলবার হাতে তীব্র বেগে বেরিয়ে গেল তাদের বুকের মধ্যে অশ্বখুরধ্বনি তুলে দিয়ে। শব্দ যখন চলে গেল অনেক দূরে, উঁকিঝুঁকি মারতে আবার তারা বেরল।
—কিনারে কিনারে চলো। সুতা-মজুর বলে।
রাস্তার ধার ঘেষে সন্ত্রস্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে চলে তারা।
– খাড়াও। - মাঝি চাপা গলায় বলে। সুতা-মজুর চমকে থমকে দাঁড়ায়। কী হইল ?
– এদিকে আইয়ো—সুতা-মজুরের হাত ধরে মাঝি তাকে একটা পানবিড়ির – দোকানের আড়ালে নিয়ে গেল।
—হেদিকে দেখো ৷
মাঝির সঙ্কেতমতো সামনের দিকে তাকিয়ে সুতা-মজুর দেখল প্রায় একশো গজ দূরে একটা ঘরে আলো জ্বলছে। ঘরের সংলগ্ন উঁচু বারান্দায় দশ বারোজন বন্দুকধারী পুলিশ স্থাণুর মতো দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের সামনে ইংরেজ অফিসার কী যেন বলছে অনর্গল পাইপের ধোঁয়ার মধ্যে হাত-মুখ নেড়ে। বারান্দার নীচে ঘোড়ার জিন ধরে দাঁড়িয়ে আছে আর একটি পুলিশ। অশান্ত চঞ্চল ঘোড়া কেবলই পা ঠুকছে মাটিতে ।
মাঝি বলে—ওইটা ইসলামপুর ফাঁড়ি। আর একটু আগাইয়া গেলে ফাঁড়ির কাছেই বাঁয়ের দিকে যে গলি গেছে, হেই পথে যাইতে হইব আমাগো বাদামতলির ঘাটে।
সুতা-মজুরের সমস্ত মুখ আতঙ্কে ভরে উঠল।—তবে?
—তাই কইতেছি তুমি থাকো, ঘাটে গিয়া তোমার বিশেষ কাম হইব না ৷ মাজি বলে, এই হিন্দুগো আস্তানা আর ইসলামপুর হইল মুসলমানগো। কাইল সকালে উইঠা বাড়িত যাইব গা ।
—আর তুমি ?
—আমি যাইগা। মাঝির গলা উদ্বেগে আর আশঙ্কায় ভেঙে পড়ে ।
–আমি পারুম না ভাই থাকতে। আইজ আটদিন ঘরের খবর জানি না। কী হইল না হইল আল্লাই জানে । কোন রকম কইরা গলিতে ঢুকতে পারলেই হইল ৷ নৌকা না পাই সাঁতরাইয়া পার হমু বুড়িগঙ্গা
–আরে না না মিয়া, কর কী? উৎকণ্ঠায় সুতা-মজুর মাঝির কামিজ চেপে ধরে। কেমনে যাইবা তুমি, আঁ ? আবেগে উত্তেজনায় মাঝির গলা কাঁপে।
—ধইরো না, ভাই, ছাইরা দেও। বোঝ না তুমি কাইল ঈদ, পোলামাইয়ারা আইজ চান্দ্ দেখছে। কত আশা কইরা রইছে তারা নতুন জামা পিনব, বাপ্জানের কোলে চড়ব। বিবি চোখের জলে বুক ভাসাইতাছে। পারুম না ভাই—মনটা কেমন করতাছে। মাঝির গলা ধরে আসে। সুতা-মজুরের বুকের মধ্যে টনটন করে ওঠে। কামিজ-ধরা হাতটা শিথিল হয়ে আসে।
—যদি তোমায় ধইরা ফেলায়?—ভয়ে আর অনুকম্পায় তার গলা ভরে ওঠে। –পারব না ধরতে, ডরাইও না। এইখানে থাইকো, য্যান উইঠো না। যা ... ভুলুম না ভাই এই রাত্রের কথা। নসিবে থাকলে আবার তোমার লগে মোলাকাত হইব। —আদাব।
আমিও ভুলুম না ভাই—আদাব।
মাঝি চলে গেল পা টিপে টিপে।
সুতা-মজুর বুকভরা উদ্বেগ নিয়ে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বুকের ধুকধুকুনি তার কিছুতে বন্ধ হতে চায় না। উৎকর্ণ হয়ে রইল সে, ভগবান—মাজি য্যান্ বিপদে না পড়ে।
মুহূর্তগুলি কাটে রুদ্ধ নিশ্বাসে। অনেকক্ষণ তো হল, মাঝি বোধ হয় এতক্ষণে চলে গেছে। আহা ‘পোলা-মাইয়ার’ কত আশা নতুন জামা পরবে, আনন্দে করবে পরবে। বেচারা ‘বাপজানের’ পরান তো। সুতা-মজুর একটা নিশ্বাস ফেলে। সোহাগে আর কান্নায় বিবি ভেঙে পড়বে মিয়াসাহেবের বুকে।
মরণের মুখ থেইকা তুমি বাঁইচা আইছ?—সুতা-মজুরের ঠোঁটের কোণে একটু হাসি ফুটে উঠল, আর মাঝি তখন কী করবে? মাঝি তখন—
—হলট্ ...
ধ্বক করে উঠল সুতা-মজুরের বুক। বুটপায়ে কারা যেন ছুটোছুটি করছে। কী যেন বলাবলি করছে চিৎকার করে।
—ডাকু ভাগতা হ্যায় ।
সুতা-মজুর গলা বাড়িয়ে দেখল পুলিশ অফিসার রিভলবার হাতে রাস্তায় উপর লাফিয়ে পড়ল। সমস্ত অঞ্চলটার নৈশ নিস্তব্ধতাকে কাঁপিয়ে দুবার গর্জে উঠল অফিসারের আগ্নেয়াস্ত্র।
গুড়ুম গুড়ুম। দুটো নীলচে আগুনের ঝিলিক। উত্তেজনায় সুতা-মজুর হাতের একটা আঙুল কামড়ে ধরে। লাফ দিয়ে ঘোড়ায় উঠে অফিসার ছুটে গেল গলির ভিতর। ডাকুটার মরণ-আর্তনাদ সে শুনতে পায় ৷
সুতা-মজুরের বিহ্বল চোখে ভেসে উঠল মাঝির বুকের রক্তে তার পোলামাইয়ার, তার বিবির জামা, শাড়ি রাঙা হয়ে উঠেছে। মাঝি বলছে—পারলাম না ভাই ৷ আমার হাওয়ালরা আর বিবি চোখের পানিতে ভাসব পরবের দিনে। দুশমনরা আমারে যাইতে দিল না তাগো কাছে
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন