অমৃতসর এসে গিয়েছে

কমলেশ সেন

ভীস্ম সাহানী

অমৃতসর এসে গিয়েছে

ভীস্ম সাহানীর জন্ম ১৯১৫, পাঞ্জাবে। জীবনের প্রথম থেকেই বামপন্থী সাহিত্য আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত। কমিউনিস্ট আন্দোলনের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সূত্রে আবদ্ধ থাকায় তাঁর রচনায় জনজীবনের ছাপ খুব দুর্লভ নয়। যদিও সে ছাপ মধ্যবিত্তের বেড়াজালকে ডিঙিয়ে বেরুতে পারেনি। ফলে তাঁর লেখায় মধ্যবিত্ত জীবন এবং সেই জীবনের জটিলতা বারবার এসেছে। ১৯৭৫-এ সাহিত্য আকাডেমি তাঁকে তাঁর ‘তমস' উপন্যাসের জন্যে পুরস্কৃত করেন। ইতিমধ্যে তাঁর পাঁচটি উপন্যাস, পাঁচটি গল্পসংগ্রহ এবং একটি নাটকের বই প্রকাশিত হয়। মূল রুশ থেকেও তিনি কয়েকটি ব‍ই অনুবাদ করেন। তাঁর মৃত্যু হয় ২০০৩ সালের জুলাই মাসে ।

রেলের কামরায় যাত্রীর খুব একটা বেশি ভিড় ছিল না। আমার ঠিক সামনের সিটে একজন সর্দারজি বসে; অনেকক্ষণ ধরে যুদ্ধের গল্প বলে চলেছে। যুদ্ধের সময় বার্মার ফ্রন্টে সে লড়াই করেছিল। গল্প বলছে আর তারই ফাঁকে খিক খিক করে হাসছে এবং মাঝেমধ্যে গোরা সৈন্যদের নিয়ে হাসিঠাট্টা করছে। কামরায় তিনজন পাঠান ব্যবসায়ীও ছিল। পাঠান ব্যবসায়ীদের একজন ওপরের বার্থে শুয়েছিল। তার পরনে সবুজ রঙের পোশাক। লোকটি খুব হাসিখুশি। রোগামতো একজন ভদ্রলোক আমার পাশেই বসেছিলেন, পাঠানটি তাঁর সঙ্গে সমানে মস্করা করে চলেছে। রোগা লোকটিকে দেখে পেশোয়ারের লোক বলে মনে হচ্ছিল। কারণ তারা নিজেদের মধ্যে পতে কথা বলছিল। আমার সামনে ডান দিকে এক বৃদ্ধা আগাপাশতলা ঢেকে বসে সমানে মালা জপ করে চলেছে। কামরায় আরও দু-চারজন যাত্রী ছিল। কিন্তু তাদের আমার ঠিক ভালোভাবে মনে নেই।

গাড়ি মৃদু-মন্দ গতিতে ছুটে চলেছে। যাত্রীরা সমানে বকবক করছে। বাইরে গমের ক্ষেতে আলতো হাওয়ার একটা ঢেউ বয়ে চলেছে। আমার মন স্বভাবতই আনন্দে ভরে আছে। আসন্ন স্বাধীনতা উৎসব দেখার জন্যে আমি দিল্লী যাচ্ছি।

সে সময়কার কথা যখন ভাবি বা মনে পড়ে, তখন মনে হয়, আমি যেন এক ঘোর অন্ধকারের মধ্যে বেঁচে ছিলাম। হয়ত সময় কেটে গেলে অতীতের অনেক ঘটনাই মিথ্যে বা যুক্তিহীন বলে মনে হয়। ভাবীকালের পটপরিবর্তনের প্রতিটি পদে পদে, এই মিথ্যে বা যুক্তিহীনতাও ঠিক তেমনি ধীরে ধীরে কালের অতল গহ্বরে তলিয়ে যায় ৷

সেই সময় পাকিস্তানের জন্ম ঘোষিত হয়েছে। আর এই ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে মানুষ তাদের নিজেদের ভবিষ্যৎ জীবনের রূপরেখা নিয়ে চিন্তা করতে শুরু করেছে। কিন্তু কেউই এ ভবিষ্যৎ জীবন নিয়ে খুব বেশিদূর পর্যন্ত তাদের চিন্তাকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারেনি। আমার সামনে যে সর্দারজি বসেছিল সে বারবার আমাকে জিজ্ঞেস করছিল, পাকিস্তান হওয়ার পর জিন্না সাহেব বোম্বাইয়ে থাকবেন, না পাকিস্তানে চলে যাবেন। তার প্রশ্নের জবাবে প্রতিবারই আমি বলেছি, বোম্বাই ছাড়বেন কেন, বোম্বাই থেকে পাকিস্তানে যাতায়াত করবেন। বোম্বাই ছাড়ার কোন কথাই ওঠে না। লাহোর আর গুরুদাসপুর নিয়ে একই রকম জল্পনাকল্পনা চলছিল। শহর দুটির কোন্‌টা কোন্ দিকে পড়বে। খুব স্বাভাবিকইভাবেই হাসিঠাট্টা এবং গল্পগুজবের মধ্যে সময় কেটে যাচ্ছিল। এদের মধ্যে যারা ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র যাচ্ছে, কেউ কেউ তাদের নিয়েও ঠাট্টা করছে। কেউই জানে না, তারা যা করছে তার কোন্টা ঠিক আর কোন্টা ভুল । একদিকে পাকিস্তান হওয়াতে মনের মধ্যে উল্লাস, আর অন্যদিকে হিন্দুস্থান স্বাধীন হয়ে যাওয়ার আনন্দ। বহু জায়গাতেই তখন দাঙ্গা চলছে, আর তারই সঙ্গে চলছে আজাদির জন্যে লড়াই। ঠিক এইরকম এক পটভূমিতে দাঁড়িয়ে মনে হচ্ছিল, দেশ স্বাধীন হওয়ার পর দাঙ্গা তো এমনিই থেমে যাবে। টালমাটাল এই অবস্থায় একদিকে স্বাধীনতার স্বর্ণাভ ধূলিকণা উড়ছিল; আর অন্যদিকে একটা অনিশ্চয়তাও দোল খাচ্ছিল। এই টালমাটাল অবস্থা—এই অনিশ্চয়তার মধ্যে কখনও বা ভবিষ্যতের বন্ধুত্বের একাত্মতার একটা অস্পষ্ট রূপরেখা ঝিলিক দিয়ে উঠছিল।

খুব সম্ভব জেহলম স্টেশন ছাড়িয়ে যাওয়ার পরেই ওপরের বার্থের পাঠান তার খাবারের পুঁটলি খুলে বসল । পুঁটলি খুলে সেদ্ধ মাংস এবং নান-রুটি বের করে সবাইকে ভাগ করে দিতে লাগল আর আমার পাশে বসা সেই রোগামতো ভদ্রলোকটিকে হাসিঠাট্টার মধ্যেই নানরুটি খাওয়ার জন্যে জোরাজুরি করতে লাগল। “আরে বাবুসাহেব, খেয়ে নাও, গতরে তাগদ হবে। আমার মতো তাগদ হবে। বৌ তোমার সাথে খুশিতে থাকবে। আরে ডালখোর, অত ডাল খাও বলেই তুমি এত রোগাপটকা।”

কামরার সবাই হাসতে লাগল। ভদ্রলোকটি পশতুতে তাকে যেন কী বললেন ৷ সে মুচকি হেসে মাথা ঝাঁকাল।

অন্য একজন পাঠান হেসে বলল, “আমাদের হাতের ছোঁয়া যদি খেতে মন না চায়, তবে নিজের হাতে তুলে নাও। খোদার কসম খেয়ে বলছি, খাসি মাংস, অন্য কিছু নয়। ”

ওপরের বার্থে যে পাঠানটি বসেছিল, সে বলল, “আরে আমাদের হাতে খেলে তোমাকে এখানে কে দেখছে। তোমার বৌকে তো আমি আর বলতে যাচ্ছি না। আমাদের সঙ্গেই বসে খাও। আমরা না হয় তোমার সঙ্গে ডালই খাব।”

জোর হাসিঠাট্টা চলল । রোগা ভদ্রলোকটিও হেসে হেসে মাথা দোলাতে লাগল । পশতুতে দু-চারটে জবাবও দিল।

“আমরা খাচ্ছি, আর তুমি বসে বসে আমাদের মুখ দেখবে—এ খুব খারাপ।”

নাদুসনুদুস একজন পাঠান সর্দার বলল, “কেন ও খাবে, তুমি এঁটো হাতে খাচ্ছ না!” বলে হি হি করে হাসতে লাগল। বেঞ্চের ওপর কাত হয়ে সে আধশোয়া অবস্থায় ছিল। আর তাতেই তার ভুঁড়ির অর্ধেকটা সিট থেকে ঝুলে পড়ছিল। —“ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই তুমি পুঁটলি খুলে খানা খেতে শুরু করে দিলে। তাই বাবুজি তোমার হাতের ছোঁয়া খাবে না—না খাওয়ার আর কী কারণ থাকতে পারে।” পাঠানটি আমাকে চোখ মেরে আবার হি হি করে হাসতে লাগল ।

পাঠান সর্দারটি আবার টিটকিরি মেরে বলল, “বাবুজি মাংস খায় না। মেয়েদের কামরায় গিয়ে বসো, এখানে বসে কী করবে?”

কামরায় আরও যাত্রী ছিল। কিন্তু এই পাঠানটি এই কামরার পুরনো যাত্রী। সফরের শুরু থেকেই সে এই কামরায় আছে। আর যারা ছিল তারা নেমে গিয়েছে, আবার কিছু নতুন যাত্রীও উঠেছে। পুরনো যাত্রী বলেই হয়তো তার মধ্যে কেমন যেন একটা বেপরোয়াভাব এসে গিয়েছিল।

—আরে এদিকে এসো, আমার কাছে এসে বসো। গল্প করা যাক ।

ঠিক এই সময় কোন এক স্টেশনে এসে গাড়ি থামল। একদঙ্গল যাত্রী হুড়মুড় করে কামরায় উঠল। ধাক্কাধাক্কি করতে করতে অনেকে একসঙ্গে কামরার মধ্যে এগুতে লাগল।

কে একজন জিজ্ঞেস করল, “কোন স্টেশন?”

আমি জানলা দিয়ে বাইরের দিকে থাকিয়ে বললাম, “খুব সম্ভব উজিরাবাদ।” স্টেশনে গাড়ি বেশিক্ষণ দাঁড়াল না। কিন্তু গাড়ি ছাড়ার ঠিক আগে একটা খুবই সাধারণ ঘটনা ঘটল। আমাদের পাশের কামরার একজন লোটায় জল নেয়ার জন্যে প্ল্যাটফর্মে নেমেছিল। লোটায় জল ভরতে ভরতে সে ছুটে কামরার দিকে পালিয়ে এল। লোটা থেকে ছলকে ছলকে জল পড়ছিল। আর যেভাবে সে ছুটে পালিয়ে এল তা দেখেই বোঝা যায় কিছু একটা ঘটেছে। জলের কলের কাছে আরও দু-চারজন লোক দাঁড়িয়েছিল। ওর দৌড় দেখে তারাও যে যার কামরার দিকে ছুট দিল। এইরকম ঘাবড়ে যাওয়া লোকদের দৌড় আমি এর আগেও দেখেছি। দেখতে দেখতে সারা প্ল্যাটফর্ম খালি হয়ে গেল। কিন্তু আমাদের কামরায় তখনও হাসি-ঠাট্টা চলছে।

আমার পাশে বসা সেই রোগামতো বাবুটি জিজ্ঞেস করল, “কিছু হয়েছে নাকি ? ” হয়তো কিছু ঘটেছিল। কিন্তু কী ঘটেছিল তা কেউ-ই ভালোভাবে জানে না । আমি অনেক দাঙ্গা দেখেছি। তাই আবহাওয়ার সামান্যতম পরিবর্তন দেখলেই বুঝতে পারি, কী ঘটেছে। লোকজনের ছোটাছুটি, ঠাস ঠাস করে দরজা-জানলা বন্ধ করা, বাড়ির ছাদের ওপর লোকজন আর থমথমে ভাব—এ সমস্ত কিছুই দাঙ্গার চিহ্ন।

ঠিক সেই সময় প্ল্যাটফর্মের উল্টোদিকের যে দরজা, সেই দরজা খোলার একটা শব্দ হল। কে যেন সেই দরজায় ধাক্কা দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে।

একজন তাকে উঠতে বাধা দিয়ে বলল, “আরে কোথায় উঠছ, এখানে কোন জায়গা নেই, বলছি না—এখানে জায়গা নেই ।”

কয়েকজন যাত্রী অনেকক্ষণ ধরেই ভেতরে ঢোকার জন্যে চেষ্টা করছিল আর ভেতরের যাত্রীরা তাদের বাধা দিচ্ছে। কিন্তু একবার কোনরকমে ভেতরে ঢুকতে পারলে আর কেউ বিরোধিতা করে না, বরং অল্পক্ষণের মধ্যেই তারা সেই কামরার হকদার হয়ে ওঠে। আর পরের স্টেশন থেকে তারাই কোমর বেঁধে নেমে পড়ে যাতে অন্য যাত্রীরা না উঠতে পারে : ... “অন্য কোন কামরা দেখ ... এখানে জায়গা নেই। ... তাও উঠছ। .... "

দরজার কাছে শোরগোল ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ঠিক এই সময় দেখতে পেলাম দলা-মোচড়া কাপড় নিয়ে ইয়া-বড়া এক গোঁফওয়ালা লোক ভেতরে ঢুকল। তেল চিটচিটে ময়লা জামা-কাপড় দেখে মনে হল লোকটা নিশ্চয়ই এক হালুইকর। কামরার লোকজনের প্রতিবাদ গ্রাহ্য না করেই সে পেছন ফিরে দাঁড়িয়ে একটা বিরাট কালো ট্রাঙ্ক টেনে তুলতে লাগল ।

লোকটি কাকে যেন বলল, “উঠে এস, ভেতরে উঠে এস।” দরজার কাছে পাতলা লিকলিকে হাড্ডিসার এক মহিলাকে দেখলাম, আর সেই মহিলার পেছনে পেছনে উঠে এল বছর ষোল-সতেরোর শ্যামবর্ণা একটি মেয়ে। কামরার লোকজন তখন ও গলা ফাটিয়ে চীৎকার করে চলেছে। পাঠান সর্দারটি পাশ ফিরে উঠে বসল ৷

প্রায় একসঙ্গে অনেকে চিৎকার করে বলতে লাগল, “দরজা বন্ধ করে দাও, জিজ্ঞেস না করে উঠছ কেন ? এটা তোমার বাবার কামরা নাকি? ওকে ভেতরে ঢুকতে দিও না। ধাক্কা দিয়ে নামিয়ে দাও .... ।”

লোকটি কোন কিছু গ্রাহ্য না করে তার আসবাবপত্র টেনে হিঁচড়ে ভেতরে তুলছিল। আর তার স্ত্রী এবং মেয়ে পায়খানার দরজার সঙ্গে সেঁটে দাঁড়িয়েছিল।

“আর কোন কামরা কি খুঁজে পেলে না? মেয়েমানুষ নিয়ে এই কামরায় উঠলে ?” লোকটি ঘেমে নেয়ে গিয়েছিল। হাঁসফাঁস করতে করতে তার জিনিসপত্র টেনে হেঁচড়ে ভেতরে তুলছিল। ট্রাঙ্ক তুলে দড়ি দিয়ে বাঁধা একটা খাটিয়া সে ভেতরে টেনে তোলার চেষ্টা করছিল।

“আরে মশায়, বিনা টিকিটে যাচ্ছি না, আমাদের কাছে টিকিট আছে। কী করব কোন উপায় নেই, শহরে দাঙ্গা হচ্ছে। কী কষ্ট করেই না স্টেশন অব্দি পৌঁছেছি।” ওর আকুতি-ভরা কথায় সবাই ঠাণ্ডা মেরে গেল। কিন্তু ওপর বার্থের পাঠানটি দাঁত-মুখ খিঁচিয়ে বলল, “এখান থেকে নেমে যাও বলছি, দেখতে পাচ্ছ না এখানে কোন জায়গা নেই।”

পাঠানটি ওপরের বার্থ থেকেই সেই লোকটির দিকে জোরে এক লাথি ছুঁড়ল। কিন্তু লাথিটি লোকটির গায়ে না লেগে তার স্ত্রীর বুকে লাগল। মহিলাটি চিৎকার করে সেখানেই বসে পড়ল।

যাত্রীদের সঙ্গে ঝগড়াঝাঁটি করার মতো তার কোন সময় নেই। সমানে সে তার জিনিসপত্র কামরার মধ্যে টেনে তুলছে। গোটা কামরাটাই ঠাণ্ডা। খাটিয়া তোলার পর সে বড় বড় বাক্স-পাঁটরা টেনে টেনে তুলতে লাগল। অবস্থা দেখে ওপরের বার্থের পাঠানটি এবার ধৈর্য হারাল। সে চিৎকার করে উঠল, “নামিয়ে দাও, একে নামিয়ে দাও, জানোয়ার কোত্থেকে এসেছে?” নীচের সিটে যে পাঠানটি বসেছিল সে উঠে দাঁড়াল। এবং লাল-কুর্তা পরা যে কুলিটি ট্রাঙ্কটা ভেতরে ঢোকানোর চেষ্টা করছিল তাকে এক ধাক্কায় নীচে ফেলে দিল।

মহিলাটির আঘাত লাগার পর থেকে কামরার অন্যান্য যাত্রীরা লোকটিকে আর একটি কথাও বলল না। সবাই চুপ হয়ে গিয়েছিল। শুধু এক কোণায় বসা এক বৃদ্ধা গজগজ করে চলেছিল, “ওকে বসতে দাও, ও মেয়ে, তুই আমার কাছে এসে বস্। আয়, এদিকে আয়। কোন রকমে এ যাত্রা কাটিয়ে নেব। এ জালিমদের কথা ছেড়ে দে, এদের বসতে দাও।”

অর্ধেকের বেশি জিনিসপত্র কামরাতে তোলার আগেই গাড়ি ছেড়ে দিল।

লোকটি হকচকিয়ে চিৎকার শুরু করে দিল, “আরে বাক্স-পাঁটরা রয়ে গেল—সামন রয়ে গেল।”

পায়খানার সঙ্গে সেঁটে-দাঁড়ানো মেয়েটি থরথর খরে কাঁপছিল। আর সমানে চিৎকার করে যাচ্ছিল “বাবা, নীচে জিনিসপত্র রয়ে গেল।”

লোকটি আরও ঘাবড়ে গিয়ে চিৎকার করতে লাগল, “নাম, জলদি, জলদি নাম।” খাট এবং বোঁচকা-কুঁচকি নীচে ছুঁড়ে ফেলতে ফেলতে সে হ্যাণ্ডেল ধরে নীচে ঝাঁপিয়ে পড়ল। সে ঝাঁপিয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে তার মেয়ে এবং স্ত্রীও ঝাঁপ দিল

বৃদ্ধাটি চিৎকার করে বলতে লাগল, “তোমরা, তোমরা খুব অন্যায় করলে— তোমাদের হৃদয়ে কোন মায়া-মমতা নেই—সব মায়া-মমতা পুড়ে খাক হয়ে গ্যাছে। ওদের সঙ্গে একটা শিশুও ছিল। তোমরা খুব অন্যায় কাজ করলে। ধাক্কা দিয়ে ওদের ফেলে দিলে!”

জনমানবহীন প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে গাড়ি তখন সামনে ছুটে চলল ৷ সমস্ত কামরাটাই কেমন যেন এক বিহ্বলতায় স্তব্ধ। বৃদ্ধাটি আর মুখ খুলল না। পাঠানদের বিরুদ্ধে কেউ একটা টু শব্দ করতেও সাহস পেল না।

ঠিক সেই সময় আমার পাশের ভদ্রলোকটি আমার হাত খুব জোরে চেপে ধরে বলল, “দেখুন দেখুন, আগুন লেগেছে।”

গাড়ি প্ল্যাটফর্ম ছেড়ে এগিয়ে চলেছে। সঙ্গে সঙ্গে শহরও পেছনে সরে যাচ্ছে। চলন্ত গাড়ি থেকে আমরা ধোঁয়ার কুণ্ডলী দেখলাম। আর সেই ধোঁয়ার কুণ্ডলীর ভেতর আগুনের শিখা লকলক করছে।

“মনে হচ্ছে দাঙ্গা হচ্ছে। স্টেশনেও লোকজন ভয়ে ছোটাছুটি করছে। কোথাও দাঙ্গা লেগেছে।”

শহরে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলছিল। মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত রেলের কামরার দাঙ্গার খবর ছড়িয়ে পড়ল। সবাই জানলা দিয়ে মুখ বাড়িয়ে ঝুঁকে ঝুঁকে আগুনের দৃশ্য দেখতে লাগল ।

শহর পেছনে ফেলে গাড়ি ছুটে চলেছে। কিন্তু সমস্ত কামরায় কেমন একটা অস্বাভাবিক নিস্তব্ধতা। আমি সমস্ত কামরায় একঝলক চোখ বুলিয়ে নিলাম। রোগামতো ভদ্রলোকটি ভয়ে কেমন ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তার কপালের ওপর চিকচিক ঘাম। মুখটা যেন কোন মৃত মানুষের। চারদিক দেখে মনে হচ্ছিল, প্রত্যেকেই যে যার জায়গায় বসে অন্যকে পরখ করছে। সর্দারজি ওপরের বার্থ থেকে নেমে আমার পাশে এসে বসল। আমার পাশে যে দুজন পাঠান বসেছিল তারা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো। ওপরের বার্থে যেখানে পাঠানটি ছিল, সেখানে গিয়ে উঠে বসল। খুব সম্ভব অন্যান্য কামরাতে এরকমই ব্যাপার ঘটছিল। তিনজন পাঠানই ওপরের বার্থ থেকে নীচের যাত্রীদের পর্যবেক্ষণ করছে। যাত্রীদের সকলের চোখই ভয়ে বিস্ফোরিত।

হঠাৎ কামরার মধ্যে কে যেন জিজ্ঞেস করল, “কোন্ স্টেশন ?”

উত্তরে কেউ বলল, “উজিরাবাদ।”

‘উজিরাবাদ’নাম শোনার সঙ্গে সঙ্গেই সমস্ত কামরার আবহাওয়া আবার পালটে গেল। পাঠানদের সেই তিরিক্ষি মেজাজ যেন এক নিমেষে চুপসে গেল । হিন্দু আর শিখ যাত্রীদের মধ্যে নেমে এল একটা গভীর নিস্তব্ধতা। একজন পাঠান তার ওভারকোটের থেকে নস্যির ডিবে বের করে নস্যি টানতে লাগল । বৃদ্ধাটি সমানে মালা জপ করে চলেছে। মাঝেমধ্যে তার ঠোঁট দুটি নড়ছে, আর তার ঠোটের ফাঁক দিয়ে একটা বিদঘুটে শব্দ বের হচ্ছে।

পরের স্টেশনে যখন গাড়ি থামল, দেখলাম সেই স্টেশনেও একটা থমথমে ভাব। একটা পায়রাও ফরফর করে প্ল্যাটফর্মের ওপর উড়ছে না। শুধু একজন ভিস্তিওয়ালা পিঠে জলের মশক নিয়ে জল দিচ্ছে।

“জল খাবে, জল?” মহিলাদের কামরার জানলা দিয়ে মেয়ে আর শিশুদের অনেকগুলো হাত বাইরে উদ্‌দ্গ্রীব হয়ে জল চাইতে লাগল ।

গাড়ি ছাড়তেই, হঠাৎ জানলা বন্ধ করার শব্দ কানে আসতে লাগল। রেলের ঘটঘটাং আওয়াজের সঙ্গে তালে তাল মিলিয়ে গাড়ির এপ্রান্ত থেকে ওপ্রান্ত পর্যন্ত জানলা বন্ধ করার শব্দ ।

জানি না কী এক অজানা আশঙ্কায় আমার পাশের সেই রোগামতো লোকটি উঠে দুই সিটের মাঝখানের ফালি জায়গাটায় শুয়ে পড়ল। ওর সমস্ত মুখ মরা মানুষের মতো ফ্যাকাশে। ওপরের বার্থের পাঠানটি তাকে কটাক্ষ করে বলল, “আরে, তুমি মরদ মানুষের দুর্নাম করছ।” পাঠানটি একই কথা বারবার ঘুরিয়ে ফিরিয়ে বলছে আর সমানে খিককিক করে হেসে চলেছে। তারপর পশতুতে সে কী যেন বলল। ভদ্রলোকটি কোন কথার জবাব না দিয়ে ঘাপটি মেরে শুয়ে রইল। অন্যান্য যাত্রীদের মুখেও টু শব্দটি নেই। সমস্ত কামরার পরিবেশে কেমন একটা ভয়াবহতা।

“এরকম মেয়েলি মানুষকে এ কামরাতে আমি থাকতে দেব না। বাবু সাহাব, সামনের স্টেশন এলে মেয়েদের কামরায় গিয়ে উঠো।”

ভদ্রলোকটি এই কথারও কোন জবাব দিল না। তার গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গিয়েছিল। কিছুক্ষণ পরে সে নিজেই উঠে সিটে গিয়ে বসল। ও হঠাৎ কেন মেঝেতে শুয়েছিল, আর কেনই বা উঠে জানলা বন্ধ করে দিল জানি না। হয়তো ও ভাবছিল বাইরে থেকে ইট-পাটকেল বা গুলি গোলা ছুটে এসে লাগতে পারে ।

একটা উদ্বেগ এবং অনিশ্চয়তার মধ্যে দিয়ে আমাদের মুহূর্তগুলো কাটছিল। রাত্রি ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হচ্ছে। গাড়ির গতি একটু ঢিমে হয়ে সবাই পরস্পরের মুখের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকাচ্ছি। পথের মাঝে গাড়ি থেমে পড়তেই সঙ্গে সঙ্গে কামরায় ভীষণ একটা স্তব্ধতা নেমে আসছে। শুধু পাঠানদের মধ্যেই কোন উদ্বেগের চিহ্ন নেই। তাদের মুখ চলা অবশ্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল—কারণ ওদের হাসি মস্করাতে আর কেউ সায় দিচ্ছিল না।

পাঠানটি ঝিমুচ্ছিল। অন্যান্য যাত্রীরা ভাবলেশহীন চোখে শূন্যতার মধ্যে উসখুস করছিল। বৃদ্ধাটি আপাদমস্তক ঢেকে, দু-পা বেঞ্চের ওপর তুলে জড়সড় হয়ে বসে ঝিমুচ্ছিল। ওপরের বার্থের আর একজন পাঠান আধশোয়া অবস্থায় পকেট থেকে কালো পুঁতির তসবিহ বের করে হাতে ফেরাতে লাগল ।

আকাশে চাঁদ উঠেছে। চাঁদের আলোয় বাইরের পরিবেশ আরও অনিশ্চিত—আরও রহস্যময় হয়ে উঠেছে। দূরে—বহু দূরে হঠাৎ হঠাৎ আগুনের হলকা নজরে পড়ছে। হয়তো কোন শহরে আগুন লেগেছে। কখনও কখনও গাড়ি হুইসল দিতে দিতে তীব্র বেগে ছুটে চলেছে। আবার কখনও বা তার গতি ঢিমে হয়ে আসছে। তারপর মাইলের পর মাইল ঢিমেতালেই এগিয়ে চলছে।

সেই রোগামতো ভদ্রলোকটি বাইরের দিকে মাথা বাড়িয়ে ঝুঁকে তাকিয়ে হঠাৎ চিৎকার করে উঠল, “হরবংসপুরা পেরিয়ে গেছে।” তার চিৎকারে একটা উত্তেজনা ছিল। কামরার সবাই চমকে উঠে আবার নড়েচড়ে বসল ।

যে পাঠানটি হাতে তসবিহ ফেরাচ্ছিল, সে বলল, “আরে বাবু সাহাব, এত চিল্লাচ্ছ কেন? তুমি কি এখানে নামবে? শিকল টানব!” বলেই সে খিকখিক করে হাসতে লাগল। সে হয়তো হরবংসপুরার নামই শোনেনি, কিংবা জায়গাটা কোথায় তাই জানে না ।

ভদ্রলোকটি পাঠানের মস্করার কোন জবাব না দিয়ে শুধু মাথাটা একটু কাত করল। তার দিকে একঝলক তাকিয়ে জানলা দিয়ে ঝুঁকে পড়ে বারবার বাইরের দিকে তাকাতে লাগল।

কামরায় আবার নিস্তব্ধতা নেমে এল। এক সময় ইঞ্জিন হুইসল দিল। গাড়ির গতিও বেশ কিছুটা কমে গেল। কিছুক্ষণ পরে ঠকাস, ঘটাং করে একটা শব্দ হল । খুব সম্ভব গাড়ি লাইন বদল করল। গাড়ি যে দিকে ছুটছিল ভদ্রলোক সেই দিকে উদ্‌গ্রীব হয়ে তাকিয়ে রইল।

“এসে গিয়েছে, এসে গিয়েছে, অমৃতসর এসে গিয়েছে।” বলে সে চিৎকার করে উঠে উল্লাসে লাফিয়ে দাঁড়াল। তারপর ওপরের বার্থের পাঠানটির দিকে তাকিয়ে বলল, “আবে পাঠান কি বাচ্চে, নীচে নেমে আয় শালা, তোর মার ... নীচে নেমে আয় বলছি। তোর পাঠানত্ব ঘুচিয়ে দেব ...”

ভদ্রলোকটি জোরে চিৎকার আর গালিগালাজ করতে লাগল। যে পাঠানটি তসবিহ ফেরাচ্ছিল, সে পাশ ফিরে ভদ্রলোকটিকে বলল,“আরে বাবুজি, তুমি আমাকে কিছু বলছ?”

ভদ্রলোকটিকে উত্তেজিত দেখে অন্য যাত্রীরাও উঠে দাঁড়াল ৷

“নীচে নেমে আয় শালা ... হিন্দুর মেয়েকে লাথি মেরেছিস, হারামজাদা কোথাকার!”

“আরে বাবু, বকবক মৎ কর। বলছি, গালিগালাজ কোরো না। গালি দিলে তোমার গলা ঘুঁটে দেব।”

“গালি দিচ্ছিস মাদার ...” চিৎকার করতে করতে ভদ্রলোকটি সিটের ওপর উঠে দাঁড়াল। ও তখন থরথর করে কাঁপছে।

সর্দারজি বলল, “আরে রাখ, খুব হয়েছে। এটা লড়াই-ঝগড়া করার জায়গা নয়। কতক্ষণের আর সফর, মাথা ঠাণ্ডা করে বোস।”

ভদ্রলোকটি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করে বলল, “শালা তোকে যদি লাথি না মারি তবে ... গাড়ি তোর বাপের ?”

“আরে তুমি শুধু মিছিমিছি আমাকে কেন দোষ দিচ্ছ, সবাই তো ওকে বের করে দিয়েছে। আমিও ছিলাম ঠিকই। তুমি শুধু আমাকেই গালমন্দ করছ। আর একবার গালি দিলে গলা টিপে ধরব।” পাঠানটির কথা মাঝপথে থামিয়ে দিয়ে বৃদ্ধাটি বলল, “আরে বীরপুঙ্গবরা, আরাম করে বোস। তোমাদের কি কোন আক্কেল-শরম নেই?”

বৃদ্ধার ঠোঁট দুটিকে প্রেতের ঠোঁট বলে মনে হচ্ছিল। আর সেই ঠোটের ফাকটুকু দিয়ে ক্ষীণ একটা ফ্যাসফেসে আওয়াজ বেরিয়ে আসছিল।

ভদ্রলোকটি সমানে চিৎকার করে চলেছে, “শালা নিজের ঘরে শের, এখন দেখি তোর কেমন পাঠানের হিম্মত. ...”

ঠিক এই সময় গাড়ি অমৃতসরের প্ল্যাটফর্মে এসে দাঁড়াল। প্ল্যাটফর্মে তিল ধরার জায়গা নেই, লোকে গিজ গিজ করছে। যারা অপেক্ষা করছিল, তারা সবাই হুমড়ি খেয়ে কামরার ভেতরটা দেখতে লাগল। সবাই বারবার একই প্রশ্ন জিজ্ঞেস করছে, “পথে কী হয়েছে, কোথায় কোথায় দাঙ্গা হয়েছে?”

লোকে-থিকথিক প্ল্যাটফর্মে শুধু দাঙ্গারই চর্চা হচ্ছিল : পথে কোথায় কী ঘটেছে।

হঠাৎ খিদে-তেষ্টা বোধ হতেই কয়েকজন যাত্রী একজন চাটওয়ালার ওপর প্রায় হুমড়ি খেয়ে পড়ল। ঠিক এই সময় তিন-চারজন পাঠান আমাদের কামরার দিকে এগিয়ে এল এবং ভেতরে উঁকি মেরে দেখতে লাগল। পাঠান দোস্তদের দেখতে পেয়েই পশতুতে কী যেন বলল। আমি পেছন ফিরে তাকালাম, দেখলাম ভদ্রলোকটি নেই। জানি না ও কখন গাড়ি থেকে নেমে পড়েছে। আমার টনক নড়ে গেল । রাগে ও দিশেহারা হয়ে পড়েছে। না জানি কী করে বসে। ইতিমধ্যে পাঠানরা তাদের লটবহর নিয়ে নেমে পড়ল এবং পাঠান দোস্তদের সঙ্গে অন্য কামরার দিকে এগিয়ে গেল। আগে একবার যেভাবে সবাই ভাগাভাগি করে কামরায় কামরায় বসেছিল, এবার আবার তাই শুরু হল ।

চাটওয়ালার চারদিকে যে ভিড় জমে উঠেছিল, তা এখন কিছুটা ফাঁকা হয়ে গিয়েছে। ঠিক সেই সময় ভদ্রলোকটিকে আমাদের কামরার দিকে এগিয়ে আসতে দেখলাম। ওর মুখের ফ্যাকাসে ভাব এখনও কেটে যায়নি। কপালের ওপর একগুচ্ছ চুল হাওয়ায় উড়ছিল। কাছাকাছি এলে লক্ষ করলাম, ওর ডান হাতে লোহার একটা ছড়। জানি না লোহার ছড়টা ও কোথা থেকে জোগাড় করল। কামরায় ঢোকার সময় ও ছড়টা পেছনের দিকে লুকিয়ে নিল এবং আমার পাশে বসার আগে ছড়টা সিটের নীচে এক ধাক্কায় ঢুকিয়ে দিল। সিটে বসে ও ওপরের বার্থের পাঠানোর দিকে তাকাল। কিন্তু পাঠানদের দেখতে না পেয়ে হকচকিয়ে গেল।

“হারামিটা পালিয়ে গ্যাছে? ... সব শালাই পালিয়েছে।” বলতে বলতে সে কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে উঠে দাঁড়াল। তারপর চিৎকার করে বলতে লাগল, “তোমরা ওদেরকে ছেড়ে দিলে ? তোমরা সব হিজড়ে ... তোমাদের কি কোন রাগ-অভিমান নেই।”

গাড়িতে প্রচণ্ড ভিড়। বহু নতুন যাত্রী উঠেছে। কেউই তার কথায় কোন গুরুত্ব দিল না ।

গাড়ি ছাড়লে, সে আবার আমার পাশে এসে বসল। কিন্তু সে তখনও উত্তেজনায় কাঁপছে আর সমানে বকবক করে চলেছে।

হেঁচকা টান দিয়ে গাড়িটা এগুতে লাগল। পুরনো যাত্রীরা পেট ভরে লুচি-তরকারি এবং জল খেয়ে নিয়েছিল। অমৃতসর ছেড়ে গাড়ি এগিয়ে চলল। যে দিকে তাদের জীবন বিপন্ন নয় সেদিকেই গাড়িটা এগিয়ে চলল।

নতুন যে যাত্রীরা গাড়িতে উঠেছিল, তারা সমানে কথা বলে চলেছে। গাড়ি আবার মাঝারি গতিতে ছুটতেই অল্পক্ষণের মধ্যে কামরার যাত্রীরা ঝিমুতে শুরু করল। কিন্তু ভদ্রলোকটি ড্যাবড্যাবে চোখ মেলে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল আর বারবার আমাকে জিজ্ঞেস করে চলল, “পাঠানরা কোন দিকে গিয়েছে দেখেছেন?” বুঝলাম ওর মাথায় পাগলামি ভর করেছে।

গাড়ি আবার এক স্টেশনে এসে থামল। চাকার ঘটাং-ঘটাং আওয়াজ বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে একটা নিস্তব্ধতা নেমে এল। মনে হচ্ছিল প্ল্যাটফর্ম থেকে কিছু গড়িয়ে পড়ছে বা কোন যাত্রী নামছে। আমি ধড়মড় করে উঠে বসলাম ।

বার বার তন্দ্রা ছুটে যাচ্ছিল। একবার ঘুম ভেঙে যেতেই দেখলাম, গাড়ির গতি বেশ কম। সারা কামরা অন্ধকার। আমি ঘাড়টা উঁচিয়ে শুয়ে শুয়েই জানলা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালাম। পেছনে যে স্টেশন ফেলে এসেছিলাম, সেই স্টেশনের লাল সিগন্যাল তখনও জ্বলজ্বল করছে। সবে একটা স্টেশন ছেড়েছি। তাই গাড়ির গতি এখনও তেমন তীব্র হয়ে ওঠেনি।

কামরার মধ্যে একটা অস্পষ্ট গুঞ্জন শোনা গেল। দূরে ধোঁয়ার একটা কালো কুণ্ডলী দেখা যাচ্ছিল। ঘুম-ঘুম চোখ নিয়ে আমি সেই ধোঁয়ার কালো কুণ্ডলীর দিকে আবিষ্টের মতো তাকিয়ে রইলাম। বুঝতে পারছিলাম না, এই ধোঁয়ার কুণ্ডলী কিসের। তাই এ নিয়ে আর ভাবলাম না। কামরার মধ্যে অন্ধকার । সমস্ত আলো নিভে গেছে। কিন্তু বাইরের দিকে তাকিয়ে আশঙ্কা হল, বোধহয় আগুনের গোলা এখনই ফাটবে ।

আমার পেছনের যে কামরা, সেই কামরা থেকে কোন কিছু হেঁচড়ানোর শব্দ আসতে লাগল। পেছনের কামরার দরজার দিকে ঘুরে তাকালাম। দেখলাম দরজা বন্ধ। আবার দরজার ঘরঘরানির আওয়াজ শুনতে পেলাম। শব্দটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠল। লাঠি দিয়ে দরজার ওপর কে যেন সমানে ঠকঠক আওয়াজ করে চলেছে। জানলা দিয়ে বাইরের দিকে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করলাম। দেখলাম, একটা লোক পাদানিতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। তার কাঁধে একটা ঝুলি, হাতে একটা লাঠি, আর পরনে বিদঘুটে এক রঙচঙে পোশাক। মুখে একরাশ দাড়ি। কী ঘটছে দেখার জন্যে নীচের দিকে তাকালাম। দেখলাম, গাড়ির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এক মহিলা সমানে ছুটছে। মহিলাটির খালি পা, আর হাতে দুটি বোঝা। বোঝার ভারে সে ভালো করে দৌড়তে পারছে না। পাদানিতে যে লোকটি দাঁড়িয়ে ছিল, সে বার বার ঘাড় ফিরিয়ে মহিলাটিকে দেখছিল, আর হাঁফাতে হাঁফাতে চিল্লোচ্ছে, “ছুটে আয়, কোনরকমে উঠে পড়।”

দরজার ওপর লাঠি দিয়ে আঘাত করতে করতে সে বলতে লাগল, “দরজাটা খোল, খোদার ওয়াস্তে দরজাটা খোল।”

লোকটি হাঁফাচ্ছিল আর বলছিল, “খোদার ওয়াস্তে দরজাটা খুলে দাও। আমার সঙ্গে মেয়েছেলে আছে। গাড়ি ছেড়ে দেবে...”

হঠাৎ আমি দেখলাম, রোগামতো ভদ্রলোকটি হড়বড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। দরজার ফাঁক দিয়ে মুখ বাড়িয়ে সে চিৎকার করে উঠল, “কে? এখানে কোন জায়গা নেই।” পাদানিতে দাঁড়ানো লোকটি বিড়বিড় করতে লাগল, “খোদার ওয়াস্তে বলছি, গাড়ি ছেড়ে দেবে ...”

লোকটি জানলা দিয়ে ভেতরে হাত বাড়িয়ে ছিটকিনি খোলার চেষ্টা করতে লাগল। ভদ্রলোকটি চিৎকার করে বলতে লাগল, “বলছি না ভেতরে জায়গা নেই। নেমে যাও বলছি।” আর ঠিক সেই সময় দরজাটা হাট হয়ে খুলে গেল।

আর তখনই চেয়ে দেখলাম, ভদ্রলোকটির হাতের ছড়টা ঝকমক করছে। সে লোকটির মাথায় সেই ছড় দিয়ে প্রচণ্ড জোরে আঘাত করল। আমি ভয়ে আতকে উঠলাম। পা দুটো কেমন শিথিল হয়ে গেল। সেই ছড়ের প্রচণ্ড আঘাতেও কিন্তু লোকটি পড়ে গেল না। তার দুটো হাত তখনও শক্ত করে গাড়ির হ্যাণ্ডেল চেপে ধরে আছে। কাঁধের ঝোলাটা ছিটকে তার মুঠির কাছে নেমে এসেছে।

চোখ মেলে দেখলাম তার সারা মুখের ওপর রক্তের কয়েকটা ধারা। ভিড়-ভারাক্কার মধ্যেও তার ঠোঁটের ফাঁকে ঝকঝকে দাঁত দেখতে পেলাম। সে শুধু একটা অস্ফুট আর্তনাদ করে উঠল, “হায় আল্লা, হায় আল্লা!” তার পা টলছে। সে ভদ্রলোকটির দিকে পাথর চোখে তাকাল। চোখ তার বুজে আসছিল। সে তার করুণ চোখ দুটি দিয়ে সেই ভদ্রলোকটিকে শনাক্ত করতে চাইছিল, 'তুমি কে? কিসের বদলা নিচ্ছ তুমি?” এর মধ্যে অন্ধকার বেশ কিছুটা সরে গিয়েছে।

তার ঠোঁট থরথর কাঁপছিল, আর ঠোঁটের ফাঁক দিয়ে সাদা দাঁত দেখা যাচ্ছিল। দেখে ভুল হচ্ছিল ও যেন মুচকি মুচকি হাসছে; কিন্তু আসলে ভয়ে ওর ঠোঁট দুটি তখন নেতিয়ে পড়েছিল।

নীচে চলন্ত ট্রেনের সঙ্গে সঙ্গে ওর স্ত্রী সমানে ছুটে আসছিল। আর সমানে অভিশাপ দিয়ে চলেছিল স্বামীকে। স্ত্রী তখনও জানে না তার স্বামীর কী হয়েছে। ভাবছে, গাঁটরির ভারের জন্যে ওর স্বামী গাড়িতে উঠতে পারছে না, তাই পা টলছে। গাড়ির সঙ্গে সঙ্গে সেও ছুটে আসতে লাগল। নিজের বোঁচকা সামলাতে সামলাতে ও স্বামীর পাদুটো ঠেলে ঠেলে পাদানিতে ঠিক করে দিচ্ছিল।

একসময় লোকটির হাত হ্যাণ্ডেল থেকে আলগা হয়ে গেল। হাতটা শিথিল হয়ে যেতেই সে গুঁড়ি কাটা গাছের মতো নীচে ছিটকে পড়ল। ছিটকে পড়তেই মহিলাটি ছোটা বন্ধ করে দিল। যেন তাদের দুজনেরই সফর একসঙ্গে থেমে গেল।

ভদ্রলোকটি হাট-করা দরজার কাছে স্তম্ভিত হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তখনও তার হাতে লোহার ছড়। ভাবলাম ও লোহার ছড়টা বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দেবে। কিন্তু ছুঁড়ে না ফেলে সে ছড়টা নিয়েই তেমনি দাঁড়িয়ে রইল। ওর হাতে যেন কোন বল নেই। আমার জোর জোর নিঃশ্বাস পড়ছিল। অন্ধকারে এক কোণে জানলার সঙ্গে ঠেস দিয়ে বসে আমি ওকে লক্ষ করছিলাম।

ভদ্রলোকটি একটু নড়ে চড়ে উঠল। জানি না কেন ও সামনের দিকে দু-এক পা এগিয়ে এল। এগিয়ে এসে খোলা দরজা দিয়ে পেছনের দিকে ফিরে তাকাল

গাড়ি ছুটে চলছিল। আর কামরার মধ্যে একটা আবছা-আবছা অন্ধকার ।

ভদ্রলোকটি বেহেডের মতো টলছে। এক ঝটকায় সে ছড়টি বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। তারপর সে খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরনের জামা কাপড়, নিজের দু-হাত দেখল ৷ হাত দুটো নাকের কাছে এনে শুঁকল। শুঁকে সে পরখ করছিল, তার হাতে কোন রক্তের গন্ধ নেই তো। তারপর সে পা টিপে টিপে এগিয়ে এসে আমার পাশে বসল।

ক্রমেই অন্ধকার মিলিয়ে গিয়ে দিনের আলো ফুটে উঠল। একটা মেঘমুক্ত আলো চারদিকে ছড়িয়ে পড়তে লাগল । গাড়ি চলছে, কেউই শেকল টেনে গাড়ি থামানোর চেষ্টা করছে না। ইতিমধ্যে ছিটকে পড়া সেই লোকটিকে আমরা কয়েক মাইল দূরে ফেলে এসেছি। ... গমের ক্ষেতে তখনও মৃদু-মন্দ হাওয়ার ঢেউ খেলে চলেছে।

সর্দারজি গা চুলকোতে উঠে বসল। ভদ্রলোকটি মাথার পেছনে দু-হাত রেখে সামনের দিকে উদাস হয়ে তাকিয়ে ছিল। এক রাতের মধ্যেই তার মুখে ছোট ছোট দাড়ি গজিয়ে গিয়েছে। সর্দারজি তার সঙ্গে গল্প শুরু করে দিল। বলল, “দেখতে এমন হলে কী হবে, আপনার মশাই হিম্মত আছে। সত্যি, আপনি হিম্মত দেখিয়েছেন বটে। আপনার ভয়েই পাঠানরা এ কামরা ছেড়ে পালাল। ওরা এখানে থাকলে, আপনি নিশ্চয়ই ওদের মাথা চৌচির করে দিতেন ...” সর্দারজি তোষামোদ করছিল আর সমানে হি হি করে হাসছিল।

ভদ্রলোকটি কোন জবাব না দিয়ে শুধু একটু হাসল। অদ্ভুত বীভৎস সেই হাসি । সে সর্দারজির মুখের দিকে নির্নিমেষ তাকিয়ে রইল ।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%