কমলেশ সেন
খাজা আ হা ম দ আব্বা স
খাজা আহামদ আব্বাসের জন্ম ১৪ জুন ১৯১৪, পানিপথে। শিক্ষা শুরু হয় হালি মুসলিম হাইস্কুলে। আলিগড় মুসলিম ইউনিভারসিটি থেকে তিনি স্নাতক হন । চিন্তা-ভাবনায় তিনি ছিলেন সমাজতন্ত্রী। ১৯৩৭ সালে তিনি বোম্বে ক্রনিকলে সাব এডিটর হিসেবে সাংবাদিকতা শুরু করেন। প্রথম গল্প ‘আবাবিল’উর্দু সাময়িকপত্র ‘জামায়া’-তে প্রকাশিত হয়। এরপর থেকে তিনি অসংখ্য গল্প এবং উপন্যাস লেখেন। ‘এক লেড়কি’, 'লাল আউর পীলা’, ‘লাভ ইন মুসৌরী' তাঁর গল্প সংকলনগুলির মধ্যে অন্যতম । ‘ইন দ্য ইমেজ অব মাও’ এবং ডাঃ কোটনিসের অমর জীবনের ওপর লেখা ‘ফেরে নাই শুধু একজন’—দুটি অসাধারণ গ্রন্থ। এই দুটি গ্রন্থ বামপন্থী মহলে তাঁকে জনপ্রিয় করে তোলে। আই.পি.টি. এ-এর সঙ্গেও তিনি যুক্ত ছিলেন।
ভগবান নিজ হাতে মাটির এক পুতুল তৈরি করে তাতে প্রাণ দিলেন, আর ক্রমবিকাশের ঘূর্ণাবর্তে বানর থেকে মানুষে রূপান্তরিত হল। এই গল্পকথা অনেক অনেক বছর ধরে চলে আসছে, এবং আজ পর্যন্ত এই কথার কোন ফয়সালা হয়নি, কিন্তু মা-ই যে মানুষের জন্মদাত্রী একথা কেউই অস্বীকার করতে পারবে না। ন'মাস পর্যন্ত মা তার রক্তকে সিঞ্চিত করে—নিজের জীবনকে বিপন্ন করে আসন্ন শিশুর জীবন গড়ে তোলে । মা আর শিশুর এই মধুর আত্মীয়তা দৃঢ় এবং অবিচ্ছিন্ন।
আজও মানুষ যে জিনিসের সঙ্গে সবচেয়ে বেশি বন্ধনে আবদ্ধ তা হচ্ছে তার মায়ের ভালোবাসার স্মৃতি। নিজের দেশকে ‘মাতৃভূমি’, ‘মাদরে-বতন’বা ‘মাদারল্যাণ্ড’ বলা হয়। নিজের ইউনিভারসিটি বা কলেজকে ‘আলমামাতের' (Alma-Mater) ‘মাদরে তালিমি’বা ‘জ্ঞান মা’বলা হয়। আর মাটি—যে মানুষকে মার মতো ভালোবেসে পরিচ্ছদ এবং আহার্য দেয় তাকে বলা হয় ‘ধরিত্রী মাতা’।
আমরা ভারতবাসীরা তো হাজার হাজার বছর ধরে এই দেশের যে আত্মা তাকেই ‘ভারতমাতা’ নাম দিয়েছি।
ভারতমাতা কি জয়।
বন্দে মাতরম্ !
এই দুটি জাতীয় স্লোগানের মধ্যে নিজের দেশকে মা বলে ডাকতে শিখেছি।
লক্ষ লক্ষ এবং কোটি কোটি মানুষ এই স্লোগান তুলেছে ঠিকই, কিন্তু কেউ কি ভেবে দেখেছে এই ‘ভারতমাতা’কে?
পণ্ডিত জওহরলাল নেহরু তাঁর ‘হিন্দুস্থান কী কহানী'-তে লিখেছেন যে তিনি একদল কৃষককে জিজ্ঞেস করেছিলেন তাদের ‘ভারতমাতা’ কে? কোন একজন কৃষক তাঁর এই প্রশ্নের উত্তরে বলেছিল, যে মাটিতে আমরা জন্ম নিই, যে মাটি আমাদের খাদ্য এবং কাপড় দিয়ে পালন করে, সেই মাটিই হচ্ছে আমাদের ভারতমাতা। পণ্ডিতজী কৃষকদের বলেছিলেন, হ্যাঁ, এটাই সত্য। আর ভারতবর্ষের সমস্ত মানুষকেই 'ভারতমাতার সন্তান' বলা হয়।
একদিক দিয়ে অবশ্যই এ কথা ঠিক যে সমস্ত ভারতবাসীর একাত্মীয়তার সাংকেতিক নামই হচ্ছে ‘ভারতমাতা'। কিন্তু ঠিক ঠিক ভাবে যদি একে বিচার করে দেখানো হয় তবে তা পুরুষের রূপে দেখানো সম্ভব নয়। ‘ভারতমাতা' একমাত্র নারীই হতে পারে। কিন্তু সে নারী কী ধরনের ?
‘ভারতমাতা’কি স্বর্গে বসবাসকারী কোন দেবী, যিনি ভগবানের মতো আমাদের দেশের ভালোমন্দ দেখাশোনার জন্যে নিযুক্তা ? ‘ভারতমাতা' কী দীর্ঘকেশী, গোলাপী কপোল-যুক্তা, সুন্দরশাড়ি পরিহিতা, সোনার অলঙ্কারে ভূষিতা হৃষ্টপুষ্ট কোন মহারানি—যে মহারানিকে প্রতিমায় অথবা নাটকে দেখা যায় ?
না, ‘ভারতমাতা’ এই তেত্রিশ কোটি ভুখা-নাঙ্গা মানুষের মা। সে কোন দেবী, অপ্সরা বা মহারানি হতে পারে না। ভারতবর্ষের কোটি কোটি গরিব মাতাদেরই সে একজন; কিংবা তারা প্রত্যেকেই একজন ‘ভারতমাতা'। যে শকুন্তলার সন্তানের নাম অনুসারে এই দেশকে ভারত বলা হয়, সেই শকুন্তলা তো এমনই একজন মা ছিল। —গরিব, আশা ভরসাহীনা, অসহায়া। তার পিতা ঋষি আর মা একজন নর্তকী। সে আশ্রমে পালিত হয়েছিল, স্বামী তাকে ভুলে গিয়েছিল আর সারা জীবন ভর সে শুধু দুঃখই পেয়ে গেল। কিন্তু সে মা ছিল— সে ছিল এমন এক মা, যে একাকী হওয়া সত্ত্বেও তার সন্তানকে প্রতিপালনের জন্যে দুনিয়ার সমস্ত রকম বাধা বিপত্তি দারিদ্র্য অনাহার বনবাসের সম্মুখীন হয়েছিল। তিনিই প্রথম ‘ভারতমাতা’!
আর তারপর ? আমাদের যুগে কি এমন মা নেই যে নিজেকে 'ভারতমাতা' বলে পরিচয় দিতে পারে ?
আমি যখনই ‘ভারতমাতা কি জয়' স্লোগান শুনি তখনই আমার সামনে ভেসে ওঠে যেসব মুখ সে মুখগুলি খুব সাধারণ সাদামাটা মায়েদের। তাদের মধ্যে কেউই নামি দামি নয় । তাদের ছবি তো দূরের কথা, তাদের কারো নামই আজ পর্যন্ত পত্র-পত্রিকায় ছাপা হয়নি। কিন্তু তবু (আমার মতে) তাদের প্রত্যেককেই ‘ভারতমাতা' বলে অভিহিত করা যেতে পারে ।
খদ্দরের কফন
তিরিশ বছর আগেকার কথা, তখন আমি খুব ছোটো, আমাদের পাড়ায় এক বৃদ্ধা তাঁতি থাকত। তার নাম ছিল হাকিমা, কিন্তু সবাই তাকে ‘হক্কো’, ‘হক্কো’বলে ডাকত। তখন তার বয়স হয়েছিল প্রায় ষাট। তরুণী অবস্থাতেই সে বিধবা হয়েছিল, আর নিজ হাতে কাজকর্ম করে সে তার সন্তানকে প্রতিপালন করেছিল। বৃদ্ধা বয়সেও —কী গরম কী শীতে সে সূর্য ওঠার আগে উঠত। আমরা লেপের তলায় শুয়ে শুয়েই তার ঘর থেকে যাঁতা পেষার শব্দ শুনতাম। সারা দিন ধরে সে ঝাঁট দিত, চরকা কাটত, কাপড় বুনত, রান্না করত, ছেলে-মেয়ে এবং নাতি-পুতিদের কাপড় ধুত। তবে বাড়িটা ছিল খুবই ছোট ।
আমাদের এই বিরাট আঙিনা যুক্ত বাড়ির তুলনায় ওর বাড়ি ছিল একটা জুতোর বাক্সের মতো দেখতে। দুটি ঘর, এক অপ্রশস্ত বারান্দা, আর দু-তিন গজ লম্বা চওড়া আঙিনা। কিন্তু এই বাড়িকেই সে এমন পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং লেপে মুছে রাখত যে সারা পাড়ার মানুষ বলত, হক্কোর বাড়ির আঙিনায় খাবার রেখে খাওয়া যায় ।
ভোর থেকে অর্ধেক রাত পর্যন্ত সে কাজ করে চলত। আর হক্কো যখন আমাদের বাড়িতে আসত, তখন তার চোখে মুখে আমরা লাবণ্যের কী ছটাই না দেখতাম ! খুব হাসিখুশি ছিল সে। গায়ের রঙ ছিল বেশ শ্যামলা আর সেই শ্যামবর্ণের ওপর বকের মতো ধবধবে সাদা চুল খুব সুন্দর লাগত। তার দেহের গঠন ছিল বেশ মজবুত, মৃত্যুর আগ-মুহূর্ত পর্যন্ত তার কোমর আমরা ঝুঁকতে দেখিনি। হাঁ, শেষ বয়সে তার কয়েকটা দাঁত পড়ে গিয়েছিল, ফলে কথা বলার সময় বোঝা যেত সে ফোকলা । খুব মজার মজার কথা বলত। আমরা ছোটরা যখন তাকে ঘিরে ধরতাম তখন সে তিন শাহজাদা, সাত শাহজাদী, রাক্ষস এবং পরিদের গল্প শোনাত। সে পর্দানশিন ছিল না। নিজের কাজকারবার নিজেই চালাত। হক্কো লেখাপড়া জানত না। সে কোন দিন স্ত্রী পুরুষের সমানাধিকারের কথা শোনেনি; শোনেনি গণরাজ বা সমাজবাদের কথা। না শুনেও হক্কো কোন দিন পুরুষের কাছে নত হয়নি, বা বড়লোক, অফিসার এবং দারোগা দেখে ভয়ও পেতো না ।
হক্কো সারা জীবনভর মেহনত-মজদুরি করে তার ছেলে-মেয়ের জন্যে সামান্য কিছু টাকা-পয়সা জমিয়েছিল। ব্যাঙ্কের নাম সে কোন দিন শোনেনি। তার সমস্ত পুঁজি (সম্ভবত তা দুশো টাকা হবে) দিয়ে সে রুপোর গয়না করে কানে গলায় হাতে পরে ছিল। রুপোর কানছাবিতে ঝুঁকে-পড়া তার কান দুটো এখনও আমার চোখের সামনে ভাসছে। এই গয়না তার জীবনের থেকেও প্রিয় ছিল, কারণ এ ছিল তার বৃদ্ধ বয়সের সম্বল । একদিন পাড়ার সমস্ত মানুষ অবাক হয়ে দেখল হক্কোর কানে কানছাবি নেই, গলায় হার নেই, তার হাতে বালা চুড়ি কিছুই নেই। তবু ওর মুখে লেগে রয়েছে সেই আগের হাসি, আর কোমরটা একটুও বেঁকে যায়নি।
মহাত্মা গান্ধী সেই সময় মুহম্মদ আলী, শওকত আলীর সঙ্গে একবার পানিপথে এসেছিলেন। আমার ঠাকুরদার বাড়িতে তিনি স্বরাজ এবং অসহযোগের ওপর বেশ কয়েকটি ভাষণ দিয়েছিলেন। তারপর যখন চাঁদা তোলা হল তখন হক্কো তার সমস্ত গয়না খুলে থলিতে দিয়ে দিল। তার দেখাদেখি অন্যান্য মেয়েরাও গয়না খুলে চাঁদা দিয়ে দিয়েছিল।
সেই দিন থেকে হক্কো ‘স্বরাজী’ হয়ে গেল। আমাদের বাড়িতে এসে ঠাকুরদা আর বাবার কাছ থেকে খবর শুনত আর প্রায়ই জিজ্ঞেস করত, “ এখানে ইংরেজ রাজ কবে শেষ হবে ?” খিলাফত কমিটি বা কংগ্রেসের সভা হলে সে খুব উৎসাহের সঙ্গে ছুটে যেত এবং সাধ্যমত সে রাজনৈতিক আন্দোলনকে বোঝার চেষ্টা করত। কিন্তু সারা জীবন ভর মেহনত করে তার শরীর ভেঙে গিয়েছিল—প্রথমে তার চোখ তাকে জবাব দিয়ে দিল, তারপর তার হাত-পা। ঘর থেকে বেরনোই তার বন্ধ হয়ে গেল, কিন্তু সে চরকা কাটা ছাড়ল না। চোখ ছাড়াই হাতের আন্দাজে সে কাপড় বুনে যেত। ছেলে এবং নাতিপুতি তাকে নিষেধ করলে সে বলত, এ কাপড় আমার কফনের জন্যে বুনছি।
তারপর হক্কো একদিন মারা গেল। তার শেষ ইচ্ছে ছিল, “আমার হাতে বোনা কাপড় দিয়ে আমাকে কফন দিও । ইংরেজি মিলের কাপড় দিয়ে কফন দিলে আমার আত্মার শান্তি হবে না।” সেই সময় সাধারণত লং ক্লথ দিয়েই কফন হত। খদ্দরের কফন হক্কোই প্রথম পেয়েছিল।
হক্কোর যখন জানাজা হয় তখন শুধু তার কয়েকজন আত্মীয় এবং দু-একজন পাড়া প্রতিবেশীই উপস্থিত ছিল। না কোন মিছিল হয়েছে, না কোন ঝাণ্ডা উড়েছে, এন্তেকালের পর একটা ফুলও জোটেনি হক্কোর—শুধু এক ফালি খদ্দরের কফন !
এই সময় যদি আমার একটুও বোঝার বয়স হত তবে আমি অন্তত একটি স্লোগান দিতাম—‘ভারতমাতা কি জয় !’
মহর্ষি মনুর পরাজয়
মহর্ষি মনু মানুষকে চার ভাগে ভাগ করেছিলেন। ব্রহ্মার মুখ থেকে যাদের জন্ম তারা ব্রাহ্মণ, বাহু থেকে যাদের জন্ম তারা ক্ষত্রিয়, উদর থেকে যাদের জন্ম তারা বৈশ্য, আর ব্রহ্মার পা থেকে যাদের জন্ম তারা শূদ্র—সেই শূদ্ররা সব সময়েই অন্যান্য জাতির পায়ের তলায় পিষ্ট হচ্ছে। এদের সবার থেকে আলাদা এবং শূদ্রদের থেকেও অপবিত্র হচ্ছে ম্লেচ্ছ। অন্য ধর্মাবলম্বীরা হচ্ছে ম্লেচ্ছ, ঋষিপ্রবর মনুর সমাজে তাদের কোন স্থান নেই। মনুর যুগে এই শ্রম বিভাজন সমাজের প্রগতির জন্যে খুব সম্ভব লাভদায়ক ছিল এবং বিদেশি আক্রমণকারীদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সঙ্গে সঙ্গে ঘৃণার ভাব সৃষ্টি করারও প্রয়োজন ছিল। কিন্তু বিগত কয়েক হাজার বছর ধরে এই বর্ণ-বৈষম্যটা বিবেককে ধ্বংস করে চলেছে এবং একটা অনড় কঠিন পাথরের মতো হয়ে গেছে। পৃথিবী তার রূপ বদল করে চলেছে; যাযাবর জীবনে থেকে কৃষি, কৃষি থেকে জমিদারি, জমিদারি থেকে জায়গিরদারি, জায়গিরদারি থেকে বাদশাহি, বাদশাহি থেকে বিদেশি সাম্রাজ্য, আর বিদেশি সাম্রাজ্য থেকে স্বরাজ ! একটা দৌড় শেষ হতে না হতেই আরেক দৌড় শুরু হয়ে যাচ্ছিল; কিন্তু জাতিভেদের থাবা আগের মতোই অটুট রইল। এবং এখনও অনেকটা সে রকম রয়ে গেছে।
সমস্ত ভারতীয়র মা যে ভারতমাতা' সে কি তাঁর সন্তানদের মধ্যে এই যে বৈষম্য এবং বৈরি মনোভাব মানবে? তাঁর কাছেও কি ব্রাহ্মণ আর শূদ্র, হিন্দু আর মুসলমানের উঁচু-নীচু; বা কোন শিশুর ময়লা সাদা, সুন্দর বা কুৎসিত, বুদ্ধিমান বা মূর্খের ভেদাভেদ আছে? ‘ভারতমাতা’তো অশিক্ষিত— প্রাচীন রীতি এবং প্রথাকে সে শুধু মানেই না, পুজোও করে। সে কি কখনো ওই ঋষিপ্রবর মনুর প্রদর্শিত পথকে ছেড়ে সমস্ত মানুষকে ভাই এবং এক – এই বিশ্বাসের রাস্তায় চলতে পারবে ? -
আমি যখন এই সব প্রশ্ন নিয়ে ভাবি, তখন আমার বন্ধুর দিদিমা— যিনি পুনাতে থাকতেন, তাঁর কথা আমার মনে পড়ে যায়। আশি বছরের এই বৃদ্ধা ব্রাহ্মণী সমসাময়িক কালের অনেক উঁচু-নীচু ভেদাভেদ দেখেছিলেন। তাঁর কোঁচকানো মুখে এক অদ্ভুত শান্তি বিরাজিত ছিল, যেন তিনি তাঁর জীবনের শেষ রহস্যের হদিস পেয়ে গিয়েছিলেন। আর যেন তার মনে মৃত্যুর কোন ভয় ছিল না। জানি না কত দিন ধরে তিনি বৈধব্য নিয়ে তাঁর নাতি-নাতনিদের সেবা আত্তি করে কাটাচ্ছিলেন। সে সময়ে খুব কাজকর্ম করেন; তাঁর হাতে পায়ে এমন জোর ছিল না কিন্তু তবু তিনি ওই বৃদ্ধ বয়সেও বাড়ির মধ্যে সবার আগে ঘুম থেকে উঠতেন, ঠাণ্ডা জল দিয়ে স্নান করতেন এবং পূজো আচ্চায়ও বসতেন।
দিদিমা মারাঠি ছাড়া অন্য কোন ভাষা জানতেন না। তাঁদের শিশু বয়সে মেয়েদের লেখাপড়া শেখানো হত না। তিনি কোন দিন খবরের কাগজ পড়েননি; না শুনেছেন রেডিও না কোন জনসভায় নেতাদের ভাষণ শুনেছেন। তিনি কোন দিন ইনক্লাব’ স্লোগান দেননি, কিন্তু তবু কিভাবে ইনক্লাব স্বয়ং দিদিমাকে খোঁজ করতে করতে পুনার অন্ধকার আর সরু গলি দিয়ে তাঁর ঘরে উপস্থিত হয়েছিল।
ব্যাপারটা হয়েছিল এরকম, দিদিমার এক নাতি বিয়াল্লিশের আন্দোলনের সময় পুনার নওজোয়ান সোস্যালিস্টদের সঙ্গে যোগ দেয়। তারপর? তারপর দিদিমার সেই এতটুকু ঘরে, যে ঘরে যুগ যুগ ধরে ঈশ্বর ভজন ছাড়া আর কোন আওয়াজ শোনা যায়নি, সেই ঘরটায় ‘আণ্ডার গ্রাউণ্ড' তরুণ বিপ্লবীদের গুজুর-গুজুরে মুখরিত হয়ে উঠল। নতুন নতুন কথা আর নতুন নতুন ভাবনা দিদিমার কানে আসতে লাগল!—আজাদি, ইনক্লাব, আন্দোলন, সাম্রাজ্যবাদ, স্বরাজ, প্রজাতন্ত্র !
দিদিমার বাড়ি এক সরু গলিতে ছিল বলেই গোপন কাজের খুব উপযুক্ত ছিল। কত ‘আণ্ডার গ্রাউন্ড' বিপ্লবীই না সেখানে এসে থাকতে লাগল—কত নতুন মুখ আসতে লাগল, তাদের কোন নাম ছিল না, কোন জাত ছিল না। তারা সবাই ছিল বিপ্লবী ভ্রাতৃত্বে আবদ্ধ। রাত্রির অন্ধকারে তারা আসত আর ভোরে সূর্য ওঠার আগেই চলে যেত। তাদের মধ্যে দু'চারজন পুলিসের হাত থেকে বাঁচার জন্যে দোতলায় দিনের পর দিন বন্ধ হয়ে লুকিয়ে থাকত। আর দিদিমা তার নিজের নাতির মতোই তাদের আদরযত্ন করতেন। তাদের জন্যে চা করতেন, রান্না করতেন, শোয়ার জন্যে বিছানা দিতেন আর প্রতিদিন পুজোর পরে তাদের রক্ষার জন্যে ভগবানের কাছে প্রার্থনা করতেন। কারণ দিদিমার অশিক্ষিত মনেও এই বিশ্বাস গভীরভাবে রেখাপাত করেছিল—এই তরুণরা তাদের জীবনকে হাতের মুঠোয় করে দেশের স্বাধীনতার জন্যে লড়াই করছে।
- দিদিমা অশিক্ষিত ছিলেন সত্য, কিন্তু মূর্খ ছিলেন না। কথা কম বলতেন, কিন্তু সব কিছু শুনতেন আর বুঝতেন তার চেয়েও অনেক অনেক বেশি। খুব অল্প দিনেই তিনি বুঝতে পারলেন তার নাতির বন্ধুবান্ধদের মধ্যে সবাই ব্রাহ্মণ নয়, - নীচ জাতিরও অনেকে আছে। শূদ্রও আছে। শুধু তাই নয়, মুসলমানও আছে। জানি না দিদিমা কেন তাদের ছোঁয়াছুঁয়িতে কিছু মনে করতেন না। চা দেওয়ার সময় তিনি জিজ্ঞেস করাও আবশ্যক মনে করতেন না, পেয়ালাটায় ব্রাহ্মণ, শূদ্র না ম্লেচ্ছ বা মুসলমান কে-চা খাবে। দিদিমার কী যেন হয়ে গিয়েছিল, ঋষিপ্রবর মনুর নিয়মকানুন নির্দ্বিধায় ভাঙার জন্যে তিনি প্রস্তুত হয়ে গিয়েছিলেন।
যখন ছেলেরা সব শুয়ে পড়ত, দিদিমা সারা রাত ধরে জানলার কাছে সজাগ হয়ে বসে থাকতেন, যাতে করে পুলিশের সামান্যতম পায়ের শব্দেই ছেলেগুলোকে হুঁশিয়ার করে দেওয়া যায় ৷
একদিন গভীর রাতে অন্ধকারের মওকা দেখে পুলিস এসে গেল। সবাই ঘুমিয়ে ছিল, শুধু দিদিমা জেগে ছিলেন। বাইরে রাস্তায় পুলিশের গাড়ি থামার শব্দ শুনতেই দিদিমা তার নাতি এবং তার সমস্ত সাথীদের জাগিয়ে দিলেন। পুলিশ ঘরে ঢোকার আগেই তারা সবাই সোজা বাড়ির ছাদের ওপর উঠে গেল এবং এক ছাদ থেকে আরেক ছাদে লাফিয়ে বিপজ্জনক এলাকা পার হয়ে চলে গেল। তারপর পুলিশ যখন ঘরে ঢুকল তখন তারা সেখানে অল্পদৃষ্টিসম্পন্ন বৃদ্ধা দিদিমাকে ছাড়া আর কাউকে পেল না, কিন্তু ফরাসের ওপর তখনও গোটা কয়েক কম্বল পড়েছিল। পুলিশ দিদিমাকে থানায় নিয়ে গেল । বৃদ্ধ বয়সেও তাঁকে এই অপমান সহ্য করতে হল। সেখানে তাকে কয়েক ঘণ্টা ধরে জেরা করা হল। –তোমার ঘরে কে কে ছিল? তারা কি কথাবার্তা করছিল? তোমার নাতি কোথায়? তার সাথী কে? ... কিন্তু দিদিমা তাদের প্রতিটি জেরার জবাবে না বোঝার ভান করে উত্তর দিয়েছে—“আমি কিছু জানি না। আমি অশিক্ষিত বুড়ি, এসব আমি কী করে জানব?” রেগে মেগে পুলিশ দিদিমাকে ছেড়ে দিল । দিদিমার কাছ থেকে বিপ্লবীদের সন্ধান পাওয়া যায়, এমন একটি কথাও পুলিশ বের করতে পারল না ।
দিদিমা এখনও পূজা-আর্চা করেন, কিন্তু কোন ছোঁয়াছুঁয়ি মানেন না। গত বৎসর যখন তাঁর সেই সোস্যালিস্ট নাতির বিয়ে হয়, তখন সেই বিয়েতে তার কয়েকজন মুসলমান বন্ধুও আসে এবং তাদের বাড়িতেই ওঠে। বিয়ের উৎসবে তারা অংশ গ্রহণ করলে তাদের কয়েক জন গোঁড়া আত্মীয় বিয়েতে থাকতে সোজাসুজি অস্বীকার করেছিল। দিদিমাকেও বলা হয় তাঁদের বংশের মর্যাদা রক্ষার জন্যে তিনি যেন নাতিকে রাজি করান, যাতে বিয়ের উৎসবে ম্লেচ্ছরা না থাকে। কিন্তু দিদিমা তাদের কোন কথাই শুনলেন না। বরং আমি বিয়ের আগের দিন সকালে দেখলাম দিদিমা আমার স্ত্রীর পাশে বসে তাকে চা খাওয়াচ্ছেন এবং তার নাতিকে নিয়ে গল্প করছেন— ঠিক আমার দিদিমা যে ভাবে কথা বলেন আর যা করেন উনিও হুবহু তাই করছেন।
আর সেই দিন থেকে আমি প্রায় সব সময় ভাবতাম যখন ভারতবর্ষের স্বাধীনতা-সংগ্রামের ইতিহাস লেখা হবে তখন কি তাতে অজ্ঞাত অখ্যাত এই দিদিমার নামটাও থাকবে? স্বাধীনতা এবং বিপ্লবের জন্যে তাঁর যুগ-যুগান্তের চিন্তা ভাবনা ত্যাগ করেছিলেন। আমার আরও প্রশ্ন জাগে এই রোগা শুকনো ফোকলা বৃদ্ধা মহিলার মধ্যে এমন কী শক্তি ছিল যা ঋষিপ্রবর মনুর মোকাবিলা করতে এতটুকু ভয় পায়নি ? এই জন্যেই কি যে তিনিই হলেন স্বয়ং; ‘ভারতমাতা’ আর এই ‘ভারতমাতা’ মনুস্মৃতি থেকে অনেক বেশি দৃঢ় এবং অমর ।
হিন্দুস্থান আমাদের
আমরা যারা উত্তরে থাকি তারা দক্ষিণ-ভারত সম্পর্কে অনেক ভুল ধারণা পোষণ করি—যেমন সারা দক্ষিণ ভারতে মাদ্রাজি’রা থাকে। তারা সবাই মাদ্রাজি ভাষায় কথা বলে, আর ছোঁয়াছুঁয়ির ব্যাপারে এরা এত গোঁড়া যে শূদ্রের ছায়া কোন ব্রাহ্মণের ওপর পড়লে শূদ্রকে পেটানো হয় এবং ব্রাহ্মণকে সঙ্গে সঙ্গে স্নান করতে হয়।
কিন্তু আমি বিস্মিত হলাম, যখন আমি এবং আমার স্ত্রী মাদ্রাজে গেলাম । আমার এক তরুণ বন্ধুর সঙ্গে দেখা হতেই সে বলল, ‘আপনি আমাদের ওখানে খাওয়া-দাওয়া করবেন।’আমি জানতাম, আমার বন্ধু ব্রাহ্মণ হওয়া সত্ত্বেও জাতিভেদ মানত না কিন্তু তার মা-বাবা? বিশেষ করে তার মা? তাদের ওখানে দু'জন ‘ম্লেচ্ছ’খাবে তা কি তিনি মেনে নিতে পারবেন? আমি ভাবলাম, খুব সম্ভব রান্নাঘরের বাইরে বসিয়ে আমাদের খাওয়ানো হবে। এসব ভাবতে ভাবতেই আমরা তাদের বাড়িতে পৌঁছলাম। বাড়িতে আমার বন্ধুর দু বোন আর তার মা ছিলেন, বাবা বাইরে কোথাও গিয়েছিলেন। এই রক্ষণশীল ব্রাহ্মণদের আচার-আচরণ কেমনটা হবে, সেই কথা ভেবে আমার স্ত্রী খুব ভীত হল। কিন্তু সেখানে পৌঁছতেই এমন হৃদ্যতার সঙ্গে তারা আমাদের আপ্যায়ন করল যে আমাদের আগের সমস্ত সন্দেহ আর ভুল ভেঙে গেল ৷
আমরা মাত্র দশ দিন মাদ্রাজে ছিলাম, আর এই দশ দিনই আমরা দিনের খাবার এই ব্রাহ্মণ পরিবারেই খেয়েছি। তারা কেতা দুরস্ত ছিল অথচ ইংরেজি কায়দায় চেয়ার টেবিলে খাওয়াদাওয়া না করে মাটিতে বসে কলার পাতায় বা তামার থালায় খাবার খেত। যতদিন আমরা সেখানে ছিলাম কোনদিনই কোনভাবেই ছোঁয়াছুঁয়ির বা বাছবিচারের কথা ওঠেনি। এমন কি আমরা তাদের রান্নাঘরেও যেতে পারতাম । আমার বন্ধুর মা আমার স্ত্রীকে তাঁর নিজের মেয়ের মতো করে নিয়েছিলেন, আর আমরা তাদের সঙ্গে এমন মিলে মিশে গিয়েছিলাম যে মনে হচ্ছিল আমরা যেন তাদের পরিবারেরই মানুষ। এই ব্রাহ্মণ পরিবারে এমন স্বাধীন চিন্তা এবং সহনশীলতা কোথা থেকে এল? এ কথা ঠিক যে আমার বন্ধুর বাবা গান্ধীজির পুরনো বন্ধুদের একজন। বছর কুড়ি আগে তিনি দেড়-দু হাজার টাকার চাকরি ছেড়ে দিয়ে গান্ধীজির সঙ্গে সমাজ সংস্কারের কাজে নামেন। তখন থেকেই এই পরিবার জাতীয় আন্দোলনের প্রথম সারিতে আছে। কিন্তু এই উদারতা এবং প্রগতিশীলতার ভিত্তি শুধুমাত্র জাতীয় চেতনার ওপর নির্ভর করে ছিল না। এঁরা বিগত তিরিশ বছর ধরে দিল্লী, কলকাতা, জামশেদপুর, এলাহাবাদ, আলমোরা, ওয়ার্ধা, বোম্বাই আর না জানি কত জায়গায় ছিলেন। ওঁদের মাতৃভাষা তামিল, কিন্তু আমার বন্ধুর মা তাঁর অল্প বয়স থেকেই মালাবারে ছিলেন, তাই তিনি মালয়ালমও বলতে পারতেন। কয়েক বছর ইউ.পি.-তে থাকার জন্যে বাড়ির সবাই পরিষ্কার হিন্দি বলতেন, আর বাংলা তো বাঙালিদের মতোই বলতেন। এক মেয়ের বিয়ে হয়েছিল এক বাঙালি ফিল্ম ডাইরেক্টরের সঙ্গে। আর এক মেয়ের বিয়ে হয়েছিল এক বাঙালি সাংবাদিকের সঙ্গে। মেয়েদের বাচ্চাকাচ্চারা যারা বোম্বাইতে থাকে তারা তামিল, বাংলা, হিন্দি, গুজরাতি, মারাঠি এবং ইংরেজি—এই ছ ভাষা মিলিয়ে এক জগাখিচুড়ি করে কথা বলত, আর বাড়িতে যে রান্না হত তাও পাঁচ-মিশেলি। এই পরিবার অবশ্যই দাবি করতে পারে, হিন্দি আমাদের ভাষা আর হিন্দুস্থান আমাদের দেশ।
মা-ই ছিলেন এই পরিবারের এক অসাধারণ ব্যক্তিত্ব। এক কালে, আজ থেকে বছর তিরিশেক আগে এই রমণী কলেজে পড়াশোনা করেছেন, দেখতেও ছিলেন পরমা সুন্দরী। বিদেশি ইংরেজি ভাষা শুধু অনর্গল বলতেই পারেন না, লিখতেও পারেন সুন্দর করে; ইংরেজিতে অনেক প্রবন্ধ কবিতা লিখেও ছিলেন। তিনি তাঁর ছেলেমেয়েদের উচ্চ শিক্ষা দিয়েছেন। তাঁর যোগ্য স্বামী এক সময় আঠারো শো টাকা মাইনের চাকরি করতেন। জাঁকজমকের বাংলোয় থাকা, ফার্স্ট ক্লাশে ভ্রমণ তো ছিলই । আর আজ? আজ তিনি একটা ছোট্ট ঘরের মধ্যে গোটা পরিবারটা নিয়ে মাথা গুঁজে আছেন। পরনে খদ্দরের শাড়ি, পায়ে ছেঁড়া চটি। নিজের হাতেই রান্নাবান্না করছেন । বাড়ির সবাইকে, আর অতিথি অভ্যাগতদের খাইয়ে তবে নিজে দুটি খাবার মুখে তোলেন। গেরস্থালিতে ব্যস্ত থাকলেও, মগজে তালাচাবি আঁটেননি । ইংরেজি, তামিল, হিন্দি সব ভাষার নানা পত্রপত্রিকা, বই প্রায় রোজই পড়তেন তিনি। দেশ-বিদেশের রাজনীতি নিয়ে আলোচনা সমালোচনা, রাজনৈতিক এবং সাংস্কৃতিক সম্মেলনে যোগদান, শিল্প সংগীত বিষয়ে কৌতূহল, সবকিছুতে তাঁর একটা সক্রিয় ভূমিকা ছিলো। দুটি মেয়েকে তিনি ক্লাসিক্যাল নাচ গান শিখিয়েছিলেন। ফিল্ম দেখতেন তিনি; আর প্রয়োজনে তীব্র সমালোচনা করতেও ছাড়তেন না। জাতীয় আন্দোলনের টানে মোটা মাইনের বিলাস-সুখের জীবনটা ছেড়ে এই স্বামী-স্ত্রী বেরিয়ে এসেছিলেন। দেশভক্তদের মধ্যে সাধারণত যে ধরনের একটা অসহিষ্ণুতা এবং রূঢ়তা থাকে, ত্যাগের বড়াই থাকে, হামবড়া একটা ভাব থাকে, এই দেশপ্রেমী দম্পতির মধ্যে তার বিন্দুমাত্র ছিল না। এই মহিলা, তাঁর স্বামী, তাঁদের ছেলে বেশ কয়েকবার কারাবরণ করেছেন; তবু কোথাও তাঁরা সেটা ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করেননি। প্রতিদিনের জীবনে অভাব ছিল, অনটন ছিল-কিন্তু সবকিছু ছাপিয়ে ওঁদের মুখে থাকত অমলিন হাসি। শুধু হাসতেন আর হাসতেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে প্রাণভরে উপভোগ করতেন। এই মহিলার বয়েস ষাটের কাছাকাছি, চুলে পাক ধরেছে, মুখের ওপর বয়েসের ভাঁজ পড়েছে : কিন্তু তবু তাঁর মন এখনও তরুণ, সবুজ। সময় এখনও তাঁর মুখের সেই অমল হাসি কেড়ে নিতে পারেনি; যৌবনে ওই হাসিটাই তো ছিল তাঁর স্বকীয়তা, তাঁর বৈশিষ্ট্য।
এক দুপুরের কথা আজও আমার মনে আছে। আমরা তাঁর ঘরের মেঝেতে সবাই শুয়ে ছিলাম। গরমের দিন, ঘরে কোন বৈদ্যুতিক পাখা ছিল না। আমি চোখ খুলে দেখলাম, তিনি চশমা পরে একখানা তামিল বই পড়ছেন আর সেই সঙ্গে আমাদের হাওয়া করে চলেছেন। অথচ তাঁর নিজের মুখের ওপর ফোঁটা ফোঁটা ঘাম চকচক করছে। তাঁর মন ছিল বইয়ের মধ্যে আর হৃদয় ছিল সন্তানদের জন্য। নিজের সম্পর্কে তাঁর কোন খেয়ালই ছিল না। জানতাম, আর কিছুক্ষণের মধ্যে তিনি উঠবেন এবং বই রেখে আমাদের জন্যে চা বানাবেন, বাচ্চাদের স্নান করাবেন। আমি খুব আশ্চর্য হয়েছিলাম, এত কাজ উনি কিভাবে করেন।
কোনদিন কি তাঁর মনে দ্বন্দ্ব জাগেনি? একদিন কী ঐশ্বর্যময় জীবন ছিল— আজ কী দারিদ্র্য-ক্লিষ্ট দিনযাপন। কী করে তিনি এর পরেও হাসেন? কী করে অন্যকে হাওয়া করতে করতে বইয়ের মধ্যে মন ডুবিয়ে দেন—রুটি বানাতে বানাতে রাজনীতি নিয়ে যুক্তিতকে নামেন ?
আমার মনে হল, এ তো ‘ভারতমাতা-'র নতুন এক রূপ আর বিস্ময়কর এক দৃশ্য— এই ‘ভারত-মাতা'-র এক হাতে বই অন্য হাতে পাখা, চুলে গোলাপ ফুল আর পায়ে ধুলো । চোখে বাংলার জাদু আর ঠোঁটে মালাবারের হাসি, দেহে রাজস্থানের ছন্দ আর পাঞ্জাবের লালিমা, চেহারায় বয়সের গাম্ভীর্য আর হৃদয়ে তরুণের দুরন্ত সাহস । শরণার্থী উনিশ শ সাতচল্লিশ সাল, অগাস্ট-সেপ্টেম্বরের ঝড় প্রায় এক কোটি মানুষকে শুকনো পাতার মতো উড়িয়ে কোথা থেকে কোথায় নিয়ে ফেলল। পেশোয়ারের মানুষ বোম্বাই, দিল্লীর মানুষ করাচী, করাচীর মানুষ বোম্বাই, লাহোরের মানুষ দিল্লী, রাওয়ালপিণ্ডির মানুষ আগ্রায়, আগ্রার মানুষ লায়ালপুর আর লায়ালপুরের মানুষ পানিপথে এল । সারা জীবনের বন্ধু, সাথী এবং পাড়া প্রতিবেশী পরস্পরের থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। খানদানি পরিবারগুলো ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। ভাই ভাইয়ের কাছ থেকে পৃথক হল । যাদের গৃহ ছিল তারা গৃহহীন হলো এবং লাখপতি ভিখিরি হয়ে গেল। চার দেয়ালের মধ্যে লালিত কুমারী যৌবন বিক্রির জন্যে মেয়েরা বাজারে হাজির হল ।
এই ঝড় সাতচল্লিশের অক্টোবরে দুটি বৃদ্ধাকে তাদের নিজ নিজ দেশ থেকে সমূলে উঠিয়ে হাজার মাইল দূরের বোম্বাই-এ নিয়ে এসে ফেলল। এঁদের মধ্যে একজন ছিলেন আমার মা, অন্যজন আমার এক শিখ বন্ধুর মা। একজন পূর্ব পাঞ্জাব থেকে এসেছিলেন, আর একজন পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে। তাঁরা দুজনে খুব সম্ভব একই দিনে বোম্বাইয়ে আসেন। আমার মা পানিপথ থেকে রাতারাতি মিলিটারি ট্রাকে করে দিল্লী আসেন, আর সেখান থেকে প্লেনে করে বোম্বাই; কারণ এই সময়ে রেলে করে আসা ছিল খুব বিপজ্জনক। আর আমার বন্ধুর মা খুব বিপদের মধ্যে দিয়ে পশ্চিম পাঞ্জাবের বীভৎস দাঙ্গা থেকে পালিয়ে রাওয়ালপিণ্ডি হয়ে অমৃতসরে আসেন, তারপর অমৃতসর থেকে দিল্লী, এবং দিল্লী থেকে বোম্বাই।
আমি আমার মাকে ‘আম্মা’ বলতাম। আমার শিখ বন্ধু তার মাকে ‘মাজি’ বলত । আমাদের দুই মা এখানে এলে, আমি বুঝতে পারলাম, এঁদের দুজনের মধ্যে পার্থক্য শুধুমাত্র এই একটি ।
মাজি রাওয়ালপিণ্ডিতে তাঁর বাড়িতে থাকতেন। দোতলায় নিজেরা থাকতেন, আর নিচের ঘরগুলো দোকানের জন্য ভাড়া দেওয়া ছিল। ভাড়াটেদের অধিকাংশ মুসলমান। সারা পাড়াটাই ছিল মুসলমানদের। সর্দারজি আর মাজি দুজনেই প্রতিবেশীদের খুব প্রিয় ছিলেন। শৈশব থেকেই সবার সঙ্গে আন্তরিক মেলামেশা করতেন। সবাই মিলে হাসি তামাশা করতেন। পাড়ার প্রতিটি মুসলমান মহিলা সর্দারনিকে ‘বহেনজি’ বলত, আর মেয়েরা ‘মাজি’ কিংবা ‘কাকি” বলে ডাকত।
রাওয়ালপিণ্ডিই ছিল মাজির দুনিয়া; কোন দিন তিনি রাওয়ালপিণ্ডির বাইরে যাননি । তাঁর ছেলে প্রথমে লাহোর, তারপর কলকাতা, আর তার পরে বোম্বাইয়ে চাকরির জন্য এসেছিল, কিন্তু মাজির কাছে এই সব শহর ছিল আর এক দুনিয়া। ক্ষমতা থাকলে ছেলেকে অন্য কোথাও যেতে দিতেন না, নিজের কাছে রাওয়ালপিণ্ডিতেই রাখতেন। তিনি হামেশাই ভাবতেন, টাকা রোজগার করে কী লাভ, যদি খাঁটি ঘি, খাঁটি দুধ, খুবানি, বগ্গু গোশে সেব আর আঙুর না পাওয়া যায়।’বাড়িতে মোষ ছিল। মোষ পাক্কা দশ সের দুধ দিত। দই পাততেন, মাখন বের করার পর সব সারা পাড়ায় বিলি করতেন, আর সবাই সর্দারনিকে দোয়া করত, কিন্তু ছেলে বোম্বাইতে ঠিকমতো খাবার দাবার পাচ্ছে কিনা মনে পড়তেই মাজির কান্না পেয়ে যেত ৷
রাওয়ালপিণ্ডির কাছেই তাঁর বেশ কিছু পৈতৃক জমিজমা ছিল। খেত থেকে অনেক ফসল পেতেন। দুধ ঘি দই তো বাড়িতেই ছিল। দোকানগুলো থেকে আসত বেশ কিছু। আর ছেলেও যাহোক কিছু টাকা পাঠাত। জুন মাসে যখন দেশভাগ এবং পাকিস্তান হওয়ার খবর বেরুল, তখনও মাজি এতটুকু ভয় পাননি। রাজনৈতিক গণ্ডগোলে তাঁর কী আসে যায়? হিন্দুস্থানই হোক আর পাকিস্তানই হোক, তাঁর প্রয়োজন তো কেবল পাড়াপ্রতিবেশীদের সঙ্গে। আর প্রতিবেশীদের সঙ্গে তাঁর সদ্ভাব তো বরাবরই ছিল। লক্ষ বার সাম্প্রদায়িক গণ্ডগোল হয়েছে, মাজি বা তাঁর বাড়ির লোকজনদের তা স্পর্শও করেনি।কিন্তু এবার আগুন ভয়ানকভাবে জ্বলে উঠল। রাওয়ালপিণ্ডিতে হিন্দু এবং শিখরা পড়ল দারুণ বিপদে। কিন্তু তা সত্ত্বেও মাজি শান্ত ছিলেন। ছেলে তাঁকে তাড়াতাড়ি বোম্বাই চলে যাবার জন্যে চিঠি লিখল, কিন্তু রাওয়ালপিণ্ডি ছাড়তে তিনি রাজি হলেন না। তাঁর অনেক আত্মীয়স্বজন এবং পরিচিত মানুষ পূর্ব পাঞ্জাব এবং দিল্লীতে চলে এল, কিন্তু মাজি তাঁর বাড়ি থেকে নড়লেন না। কেউ যদি তাঁকে বলত এখানে থাকা বিপজ্জনক, হিন্দুস্থানে চলে যাও, তিনি বলতেন, কে মারবে? এই পাড়ার চারদিকে তো আমার ছেলেরাই থাকে !
কিন্তু পূর্ব পাঞ্জাব থেকে মুসলমান শরণার্থীরা আসার পর রাওয়ালপিণ্ডির অবস্থা ভীষণ খারাপ হয়ে উঠল। মুসলমান প্রতিবেশীদের মধ্যে দু-চার জন তাঁকে বলল, আপনি কোন নিরাপদ জায়গায় চলে যান, না হলে প্রাণের ভয় আছে। আবার কেউ কেউ তাঁকে বলল, ঘাবড়াবেন না, আমাদের প্রাণ দিয়েও আপনাকে বাঁচাব। তাঁর ভাড়াটে এক মুসলমান দর্জি—সর্দারজির ওখানে তার যাওয়া-আসা ছিল, বেচারি কান্নাকাটি অনুনয় করে বলল, “আপনারা যাবেন না । ”
পূর্ব পাঞ্জাব থেকে বিপদে পড়ে যারা এখানে এসেছে, তাদের মধ্যে অনেকেই মাজির বাড়ির কাছে আশ্রয় নিয়েছিল। তাদের খারাপ অবস্থা দেখে মাজি আর ঠিক থাকতে পারলেন না; রাতে গায়ে দেয়ার জন্যে লেপ ইত্যাদি পাঠালেন। তাঁর কখনও মনে হয়নি এরা মুসলমান, এরা শিখদের দুশমন বলে মনে করে, এদের সাহায্য করা উচিত নয়। আর কখনও তিনি ভাবতেই পারেননি। দু-চার দিন পরে তাঁরও এই একই হাল হবে।
সেই দিনই ঠিক তাঁর বাড়ির সামনে একদল হাঙ্গামাবাজ মুসলমান এক হিন্দু টাঙ্গাওয়ালাকে ছুরি চালিয়ে মেরে ফেলল। এই ঘটনার বর্ণনা আমি মাজির কাছ থেকে শুনেছি,–“বাবা, টাঙ্গাওয়ালা তো হিন্দু ছিল ঠিকই, কিন্তু ঘোড়ার তো কোন ধর্ম বা জাত ছিল না। কিন্তু ওরা ঐ হতভাগা জানোয়ারটাকেও ছাড়েনি। ছোরা চালিয়ে ওটাকেও মেরে ফেলল। মনে হচ্ছিল ওদের মাথায় রক্ত চড়ে গেছে, ওরা যেন মানুষ নয় অন্য কিছু।” এরপর তিনি ঠিক করলেন এখানে আর থাকা নয়—থাকা মানেই বিপদের মধ্যে জড়িয়ে পড়া।
তারপর তিনি রাওয়ালপিণ্ডির বাড়ি, সমস্ত জিনিসপত্র ছেড়ে চলে আসেন—বাড়িতে শুধুমাত্র একটা তালা লাগিয়ে দিয়েছিলেন। ভাবতে পারেননি চিরদিনের জন্যে ছেড়ে চলে আসছেন; আশা ছিল এই পাগলামো একদিন না একদিন কমে যাবে, তখন ফিরে যাবেন। কিন্তু দিল্লীতে পৌঁছুতে না পৌঁছুতে তাঁর প্রৌঢ় চোখ বুঝল রাওয়ালপিণ্ডিতে ফিরে যাওয়া আর সম্ভব নয়। তিনি যখন বোম্বাই পৌঁছুলেন, তখনও রাওয়ালপিণ্ডির স্মৃতি তাঁর হৃদয়ে এক বেদনার বোঝা হয়ে রয়ে গেছে।
রাওয়ালপিণ্ডিতে উনি বড় বড় দু-কামরার বাড়িতে থাকতেন, আর বোম্বাইতে যে ঘরটায় তিনি আর তাঁর স্বামী ছেলের কাছে থাকতেন—সেখানে তিনটি ঘর ছিল; তার একটিতে এক ধোপা থাকত, আর একটা ছিল কয়লার দোকান। পেছনের ছোট ঘরটা একই সঙ্গে রান্না, স্নান এবং ভাঁড়ারের ঘর হিসেবে ব্যবহৃত হত। আমার বন্ধুটি যখন ওখানে একলা থাকত, ওই ঘরকে মনে হত একটা ভাঁড়ার ঘর। সেখানে পুরনো খবরের কাগজ, এঁটো বাসনপত্র এবং ময়লা জামাকাপড় স্তূপ হয়ে থাকত। আর আজ আপনি সেখানে দেখবেন ওই ছোট্ট জায়গায় সমস্ত কিছু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন এবং পরিপাটি করে সাজানো গোছানো। মেঝে এমন ঝকঝক তকতক করছে যে কোথাও এককণা ধুলো বা মাটি খুঁজে পাওয়া যাবে না। ছেলে আর স্বামীর জন্যে মাজি নিজের হাতে রান্না করতেন, আর কেউ যদি দেখাসাক্ষাৎ করতে আসত তবে তাকে না খাইয়ে তিনি ছাড়তেন না। মাজির ঘরবাড়ি আসবাবপত্র চলে গিয়েছিল, জমি আর বাড়ির মালিক থেকে আজ তিনি এক শরণার্থী; কিন্তু তাঁর আতিথেয়তা নষ্ট হয়ে যায়নি।
মাজির গায়ের রঙ ছিল ফর্সা, দেখতে ছোটখাটো, আর আগে তাঁর মাথার চুল ছিল আধ-পাকা-আধ-কাঁচা, কিন্তু রাওয়ালপিণ্ডি ছাড়ার পর থেকে তাঁর চুল সব সাদা হয়ে গিয়েছিল। প্রায়ই অসুস্থ থাকতেন, কিন্তু কখনও কাজ ছাড়া থাকতে পারতেন না। কখনও ছেলের জন্যে খাবার তৈরি করছেন, স্বামীর ঝাপড়ে তালি লাগাচ্ছেন, কখনও বা অতিথিদের জন্যে চা বা লস্যি বানাচ্ছেন—সমস্ত কাজই তিনি নিজের হাতে করতেন। তাঁকে দেখে কারুর কখনই মনে হত না যে তিনি এত বিপদআপদ পার হয়ে আসা এক শরণার্থী। তিনি কোন দিন বলেননি মুসলমানরা খারাপ, অথচ মুসলমানদের জন্যই তিনি গৃহহারা হয়েছেন। আর তাঁর প্রতিবেশী মুসলমানদের কথা তিনি আজও খুব মমতার সঙ্গে স্মরণ করেন। তিনি তাদের কাছে চিঠি লেখেন আর চিঠির উত্তর এলে খুব খুশি হন। যেদিন আমার সঙ্গে তাঁর প্রথম পরিচয় হল সেদিন দুজন দুজনের গলা জড়িয়ে ধরলেন এবং কোন কথা বলার আগেই দুজনে কয়েক মিনিট ধরে নিজের নিজের দেশের কথা স্মরণ করে কাঁদতে লাগলেন। আর তাঁরা পরস্পরকে এমন সান্ত্বনা দিতে লাগলেন যেন তাঁরা দুজনে দুই বোন। একজন শিখ আর একজন মুসলমান মহিলার মিলিত কান্না দেখে আমার মনে হল মুসলমান আর শিখের মধ্যে আজ তিন বছর যে ঘৃণা এবং বিদ্বেষ জমে আছে তা বুঝি চোখের জলে ধুয়ে মুছে গেল।
শরণার্থী হওয়া সত্ত্বেও মাজি তাঁর দুঃখ এবং ক্ষতির কথা বলতেন না । হ্যাঁ, কখনও কখনও এক আলতো ঠাণ্ডা শ্বাস নিয়ে বলতেন, “বাবা, তোমার বোম্বাই বিরাট শহর, কিন্তু আমি তো কোন দিন রাওয়ালপিণ্ডি ভুলতে পারব না। সেই খুবানি, সেই বগ্গু গোশে .....।”
বলতে বলতে উনি চুপ হয়ে যেতেন আর তাঁর বসে যাওয়া ফ্যাটফেটে চোখ দুটি জলে ভরে উঠত। মনে হত এই শরণার্থী-ভারতমাতার হৃদয়ে ক্রোধ এবং ঘৃণার এতটুকু স্থান নেই—আছে শুধু পুরনো স্মৃতি, যে স্মৃতি মিশে আছে তাঁর হারিয়ে যাওয়া জন্মভূমির সঙ্গে; এ স্মৃতি যেন বগ্গু গোশের মতো মসৃণ আর তুলতুলে এবং খুবানির মতো সুন্দর।
ঘৃণার মৃত্যু
প্রতিটি মানুষের কাছেই তার আপন মা-ই হচ্ছে পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে মহীয়ান এবং প্রিয়। তাই এই ভারতমাতাদের মধ্যে আমার স্বর্গীয়া মাকে যদি আমি স্থান দিই তবে তা কোন আশ্চর্যের ব্যাপার হবে না। আমি না হয়ে আমার জায়গায় অন্য কেউ হলেও এ ব্যাপারে তার নিজের মার কথা বলত এবং মাকে ভারতমাতার স্থান দিত। কারণ আমার মার মুখাবয়বের মধ্যেই আমি প্রথম ভারতমাতার ঔজ্জ্বল্য দেখেছি, এবং ভারতমাতার যত স্বতন্ত্র রূপ আছে তার প্রতিটি সুন্দর, প্রিয় পরিচিত রূপ নিজের মার মধ্যেই প্রত্যক্ষ করেছি।
আমার বলার কথা হচ্ছে, মার জীবনের অন্তিম দিনগুলির মধ্যেই আমি আমার মার সবচেয়ে সুন্দর এবং ভালো দিকগুলো লক্ষ করেছি। তার পূর্বে তিনি শুধুমাত্র আমার মা-ই ছিলেন, কিন্তু সাতচল্লিশের ভয়ানক ঘটনার পটভূমিতে দাঁড়িয়ে আমি আমার মার মধ্যে ভারতমাতার রূপ এবং শক্তি অনুভব করতে শিখেছি।
হিন্দু শরণার্থীরা যখন পশ্চিম পাঞ্জাব থেকে পানিপথে চলে এল সেখানে মুসলমানদের থাকা প্রায় অসম্ভব হয়ে উঠল। তারাও পাকিস্তানে চলে যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছিল। তখন আমার মাকেও আত্মীয়স্বজনরা তাদের সঙ্গে পাকিস্তানে চলে যাওয়ার জন্যে চাপ দিল এবং আমাকেও চিঠিতে বোম্বাই থেকে করাচী চলে আসতে লিখল। কিন্তু মা তাদের সোজাসুজি না করে দিয়ে বললেন, “আমি আমার দেশ ছাড়ব কেন ? আমার ছেলে হিন্দুস্থানেই থাকবে বলে ঠিক করে নিয়েছে। তার এই ফয়সালায় আমার মত আছে।” গণ্ডগোল শুরু হওয়ার বিশ-বাইশ দিন পর্যন্ত তিনি পানিপথেই ছিলেন। সাত দিন ধরে কার্ফু ছিল, শুকনো রুটি আর চাটনি খেয়ে তাঁকে দিন কাটাতে হয়েছে। দিনের পর দিন বাচ্চাদের দুধ পাওয়া যায়নি, নিজের প্রিয় পান পাননি – বাজার থেকে পান উধাও হয়ে গিয়েছিল। পান ছিল তাঁর জীবনের সবচেয়ে প্রিয় জিনিস। যদি বা পানপাতা জুটত তার দাম পড়ত প্রতিটা এক টাকার মতো। উনি সেই পাতাটা ছোট ছোট টুকরো করে সারা দিন চালাতেন।
পরিবারের কোন পুরুষ মানুষ সেই সময় পানিপথে ছিল না। আমি বোম্বাইতে ছিলাম, খুড়তুতো ভাইদের একজন ছিল পুনায় আর একজন দিল্লীতে। এই সময় দিল্লী থেকে পানিপথ—এই পঞ্চাশ মাইল যাওয়া আসা ছিল খুব মুশকিলের। চিঠি এবং টেলিগ্রাফ-যোগাযোগও বন্ধ ছিল। কিন্তু তবুও মা অটল রইলেন, তিনি হিন্দুস্থানে থাকবেন।
- আমাদের যেসব আত্মীয়স্বজন পাকিস্তানে যেতে রাজি হননি তাঁদের বের করে আনার জন্যে পাঠানো হল। জিনিসপত্র বাঁধা ইত্যাদির জন্যে মাত্র এক ঘণ্টা সময় পাওয়া গিয়েছিল। বোরখা পরা মহিলারা যে যা পেরেছেন সঙ্গে করে নিয়ে এসেছেন কিন্তু আসার সময় আমার মা বুঝতেই পারেননি যে চিরদিনের জন্যে তাঁকে তাঁর দেশ আর বাড়ি ছেড়ে চলে আসতে হচ্ছে। তার দৃঢ় বিশ্বাস ছিল, অবস্থা ঠিক হয়ে গেলেই তিনি আবার ফিরতে পারবেন। তাই তিনি দরজায় একটা তালা লাগিয়ে বোর্ড ঝুলিয়ে দিলেন— “এই বাড়ির লোক পাকিস্তানে যাচ্ছে না, বোম্বাইয়ে তাঁর আত্মীয়ের কাছে যাচ্ছে এবং হিন্দুস্থানেই থাকবে।”
তাঁরা কুড়ি দিন দিল্লীতে থাকলেন। তিরিশ জন মানুষ একটি ঘরে বদ্ধ অবস্থায় রইলেন। বিমান বন্দরে পৌঁছনোও অসম্ভব ছিল, আর রেলপথ ছিল আরও বিপজ্জনক। এই সময় খবর এল পানিপথে আমাদের বাড়ি লুট হয়ে গিয়েছে এবং শরণার্থীরা তা দখল করে নিয়েছে। প্রাণের ভয়ে দিনের পর দিন উপবাস আর এক ঘরে বন্দি অবস্থায় কাটাতে হল। সবার চেহারা ফ্যাকাসে হয়ে গেল। বাচ্চাদের মুখ একবারেই শুকিয়ে গিয়েছিল। অবশেষে বিমানের রাস্তা খুলল, আর জীবনে এই প্রথম আমার মা বোরখা ছাড়াই সফর করতে পা বাড়ালেন ৷
যেদিন তাঁর বোম্বাই আসার কথা, তার আগের দিন রাতটা আমি দুশ্চিন্তায় জেগে কাটালাম—না জানি এইসব ভয়ানক ঘটনা মার শরীরকে কী করে দিয়েছে—তিনিও কি ঘৃণা আর বিদ্বেষ, রাগ আর সাম্প্রদায়িকতার জোয়ারে ভেসে গিয়েছেন, সেই সময়ে সারা হিন্দুস্থান এবং পাকিস্তানে ওই বিষস্রোতই তো ছড়িয়ে পড়েছিল ? মানুষের প্রতি তাঁর সর্বদা যে ভ্রাতৃত্ব, করুণা এবং ভালোবাসা, তা কি এই খুনের সমুদ্রে ডুবে গিয়েছে? তাঁর যে ভালোবাসার হৃদয় এবং হাসিখুশি মুখ তা কি চিরদিনের জন্যে বিষাদ আর নিরাশার মেঘে ছেয়ে গেছে? আমি আমার মার শরীরের কথা ভালোভাবে জানি। পনের বছর ধরে তাঁর হাঁপানি ছিল। হিস্টিরিয়া তাঁর পুরনো রোগ । বাবা এবং ছোট বোনের মৃত্যু তাঁর হৃদয়কে দুর্বল করে দিয়েছিল। ষাট বছর বয়সে তাঁকে আশি বছরের বৃদ্ধা বলে ভুল হত। দু পা জোরে চলাও তাঁর পক্ষে কষ্টকর ছিল। এত বিপদ আপদ পেরিয়েও তিনি কি বেঁচে থাকবেন? যদি বেঁচেও থাকেন তবে কি জীবনের প্রতি তাঁর কোন আকর্ষণ থাকবে? বিমানযাত্রাতেও না জানি কত কষ্ট পেয়েছেন তিনি...
বিমান মাটিকে স্পর্শ করার আগের মুহূর্ত পর্যন্ত এইসব প্রশ্ন আমার মনকে বিচলিত এবং চিন্তান্বিত করে রেখেছিল। আমি দেখলাম বিনা বোরখায় একখানা চাদর দিয়ে মুখ ঢেকে মা বোনকে ভর করে বিমান থেকে নামছেন। এই দৃশ্য দেখে আমার চোখ জলে ভরে উঠল। যিনি এত পর্দানশিন ছিলেন—এই পর্দাপ্রথা নিয়ে মা আমার সঙ্গে কত না তর্ক করেছেন—আজ তিনিই নিজের জীবন বাঁচানোর জন্যে পর্দা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়েছেন। যাঁকে পর্দা ছাড়ানোর জন্যে আমি সারা জীবন চেষ্টা করেছি, আজ তাঁকে বিনা বোরখায় আসতে দেখে আমি এতটুকু খুশি হলাম না। বরং ভয় পেয়ে গেলাম, বোধ হয় এ জন্যেই তাঁর দেহ শান্তিতে ভেঙে পড়েছে। দেখে মনে হল, যে জীবন তাঁর প্রিয় বিশ্বাসকে ভেঙে তছনছ করে দিয়েছে সেই জীবনকে তিনি যেন ধিক্কার দিচ্ছেন ।
কথাগুলো ভাবতে ভাবতে আমি তাঁকে ধরে গাড়ির কাছে নিয়ে গেলাম। হাঁপানির টানের জন্যে তিনি কিছুক্ষণ পর্যন্ত কোন কথা বলতে পারলেন না, কিন্তু টান সামলে নিয়ে তিনি যা বললেন তা আমি আজও ভুলতে পারিনি—“আমি এখন হামেশা বিমানে সফর করব, কী আরামের সফর।” জীবন সম্পর্কে তাঁর কী অটল বিশ্বাস !
সেই দিন রাতে পানিপথ আর দিল্লীর কথা শোনাতে গিয়ে তিনি আমার অন্য সব সন্দেহকেও দূর করে দিলেন। তিনি বলছিলেন, “না এ ভালো, না ও ভালো । না মুসলমানরা ছেড়েছে, না হিন্দু বা শিখরা ছেড়েছে। সবার মাথায় খুন চেপেছে। যেহেতু আমি মুসলমান, তাই মুসলমানদেরই আমি বেশি দোষ দেব, কারণ তারা এইসব কাজ করে ইসলামের নামই ডুবিয়েছে।”
বোম্বাইতে সেই সময় দাঙ্গা চলছিল। আমার মা জানতেন, আমরা যেখানে থাকতাম সেই শিবাজী পার্ক হিন্দু এলাকা—সেখানে বড় জোর দু-চার ঘরের বেশি মুসলমান নেই। কিন্তু তিনি পরের দিনই বোরখা পরে দুটো বাচ্চার আঙুল ধরে সমুদ্রের ধারে বেড়াতে বেরুলেন এবং ওদের জন্যে ঝিনুক কুড়োতে লাগলেন। আমি নিচু গলায় তাঁকে নিষেধ করার চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু তিনি আমার কথা শুনলেন না। বললেন, “আরে আমাকে কে মারবে?” তিনি বিনা দ্বিধায় আস্তে আস্তে ঘুরে বেড়াতে লাগলেন আর আমি দুশ্চিন্তা নিয়ে উঠোনের চৌকাঠে বসে দূর থেকে তাঁকে পাহারা দিতে লাগলাম। নিজেকে আমার ভীরু মনে হল। মনে হল তাঁর যে সাহস এবং মানবতা, তা আমার বিশ্বাসের চেয়ে অনেক অনেক বেশি দৃঢ়।
আমার এক পাঞ্জাবী হিন্দু শরণার্থী বন্ধু সেই সময় আমার ওখানে ছিল। আমার মা যখন শুনলেন, তার শহর শেখুপুরাতে বহু হিন্দুকে হত্যা করা হয়েছে, এবং আমার বন্ধুর বাড়ির লোকজন নিজেদের প্রাণ নিয়ে কোনমতে রাতারাতি সেখান থেকে পালিয়ে হিন্দুস্থানে কোন শরণার্থী ক্যাম্পে চলে এসেছে, তখন তিনি অনেকক্ষণ ধরে কাঁদলেন ।
আমাকে একা ডেকে নিয়ে বললেন, “দেখ, এই ছেলে আজ থেকে তোর ভাই, সব সময় একে দেখবি । এভাবেই আমরা আমাদের যে পাপ আমাদের ধর্ম-ভাইরা করেছে সেই পাপের প্রায়শ্চিত্ত করতে পারি।” প্রতিদিন নমাজের পর তিনি প্রার্থনা করতেন, হে আল্লাহ্, সমস্ত গৃহহীন হিন্দু মুসলমান শিখ যেন তাদের নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে যেতে পারে।” যে দিন গান্ধীজি শহিদ হলেন, সেদিন আমাদের বাড়িতে মনে হল, যেন আমাদের কোন নিকটতম আত্মীয় মারা গেছেন। সেদিন রাতে মা কিছু মুখে দিলেন না। পরের দিন ভোর থেকেই তিনি রেডিওর কাছে বসে গান্ধীজির মরদেহের মিছিলের ‘কমেন্টারি’ শুনতে শুনতে লুকিয়ে লুকিয়ে চোখের জল মুছতে লাগলেন, আর বারবার ঠাণ্ডা নিঃশ্বাস টেনে বলতে লাগলেন, “হায়, এখন হিন্দুস্থানের কী হবে ?”
ভাগ্যের কী অদৃশ্য খেলা দেখুন, যার নিজের স্বদেশের প্রতি এত ভালোবাসা, মৃত্যুর পরে হিন্দুস্থানের মাটি তাঁর কপালে লেখা ছিল না। করাচীতে তাঁর ছোট মেয়ের কাছে গিয়েছিলেন, সেখানেই তাঁর পুরনো অসুখ এমন ভয়ানক মারাত্মক হয়ে উঠল, তিনি আর বাঁচলেন না। কিন্তু শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি তাঁর দেশের প্রতি আগের মতোই বিশ্বস্ত ছিলেন। তিনি জানতেন, তাঁর ছেলে জাতীয় আদর্শের জন্যে পাকিস্তানে আসা পছন্দ করবে না। তিনি ঠিকই জানতেন, তাঁর শেষ সময়ের সংবাদ যদি আমি পেতাম- আমি নিশ্চয়ই ছুটে যেতাম। মৃত্যুর মুখোমুখি হয়েও তিনি আমাকে আসার জন্যে চিঠি লেখেননি। বোনকে বলেছিলেন, এমন কোন চিঠি লিখিস না, যাতে ও বিচলিত হয়ে চলে আসে। তিনি হিন্দুস্থানে মরতে চেয়েছিলেন। যখন একটু সুস্থ উঠলেন তখন ‘পারমিট’ করার জন্যে আমাকে চিঠি লেখান। মৃত্যুর কয়েক দিন আগে ভারতীয় হাইকমিশনারের অফিস তাঁকে ভারতীয় নাগরিক হিসাবে স্বীকৃতি দিয়ে হিন্দুস্থানে বসবাস করার জন্যে অনুমতি দিয়েছিল। কিন্তু স্বদেশে ফেরার স্বপ্ন নিয়েই তিনি এই দুনিয়া থেকে বিদায় নিলেন।
মার কবর করাচীর গোরস্তানে আছে, কিন্তু তাঁর আত্মা, তাঁর স্মৃতি, তাঁর জীবনাদর্শ এই হিন্দুস্থানে, আমার কাছে রয়েছে। পানিপথে তাঁর সমস্ত বিষয়সম্পত্তি লুট হয়ে গিয়েছিল, কিন্তু আমি তাঁর কাছ থেকে যা পেয়েছিলাম, তা ওই বাড়ি বা অলংকার থেকে অনেক বেশি মূল্যবান ।
আর পাকিস্তানের ছ ফুট জমি চিরদিনের জন্যে ভারতবর্ষের মাটি হয়ে থাকবে। কারণ সেখানে এক ‘ভারতমাতা'কে দফন করা হয়েছে।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন