ঠাণ্ডা প্রাচীর

কমলেশ সেন

গুরমুখ সিং জিত

ঠাণ্ডা প্রাচীর

গুরমুখ সিং জিত পাঞ্জাবের মানুষ। মাতৃভাষা গুরুমুখী। কিন্তু তিনি হিন্দিতেই লেখেন। হিন্দি ভাষার ওপর তাঁর অসাধারণ দখল। দখল আছে বলেই, ছন্দের মাধুর্যে তাঁর গদ্য অলঙ্কৃত। আর এই অলঙ্কৃত ছন্দের মাধুর্য নিয়ে তিনি ছুটে গিয়েছেন দেহাতি মানুষের কাছে, শহরের মধ্যবিত্ত মানুষের কাছে। কখনও তিনি মানুষের মন নিয়ে খেলা করেছেন, কখনও সমস্যার গভীর থেকে গভীরে চালিয়ে দিয়েছেন তীক্ষ্ণ তরোয়াল। আর সেই গভীর থেকে তুলে এনেছেন রক্তাক্ত মানুষের মন—মানুষের হৃদয় । তাঁর ‘চেনাব বহতা রহা’, ‘দুখতি রগ’, ‘তুম হি বাতাও’–শুধু মনস্তাত্ত্বিক গল্পই নয়— এসেছে নতুন ধরনের মানুষ। ভীল কা বিবাহ লোককথার আমেজে লেখা। উপন্যাস ‘শিখর কা শূন্য’ আত্মকথনমূলক—বিশ্লেষিত হয়েছেন একজন বুদ্ধিজীবী। তিনি মূলত গল্প লেখক। -

গভীর এক চিন্তায় ঈশ্বরদাস ডুবে গেল। মে মাসের, প্রচণ্ড গরম, লু বইছে। ও বারবার অন্যমনস্ক এবং বিচলিত হয়ে পড়ছে। ডান হাত দিয়ে কপালের ঘাম মুছলো। খসখস করে পিঠ চুলকোতে লাগল। বিক্ষিপ্ত চিন্তাগুলো তার মগজ সমানে খামচে চলেছে, তার এতটুকু সুরাহা না দেখে গায়ের গেঞ্জিটা সে খুলে ফেলল। এবার খোলা গেঞ্জিটা দিয়ে পিঠ রগড়াতে লাগল। ওর মনের গভীরে যে ভয় এবং বিহ্বলতা দানা বেঁধে রয়েছে তা যেন বাইরের ভয় এবং বিহ্বলতাকে হার মানাচ্ছে। নিজের মনের সঙ্গে যুঝে একটা সিদ্ধান্তে উপনীত হতে চাইছে। সেই সঙ্গে সে করছিল কৃতকর্মের লাভ-ক্ষতির একটা হিসেব। অতীতের ঘটনাকে সমস্ত দিক থেকে উলটে পালটে সে পরখ করে নিতে চাইল । ভাবতে ভাবতে ওর মাথা টনটন করে উঠল।

পাকিস্তান হয়েছে খুব বেশি হলেও মাত্র বছর আষ্টেক হল। কুচা নবী করিষে, তার প্রতিবেশী মোহনলালের বাড়ি থেকে প্রায় সব সময়েই গুমরে গুমরে কান্নার একটা করুণ আওয়াজ ভেসে আসে। মায়াবন্তীর এই গুমরে গুমরে কান্না কখনো বা উচ্চরোলে ওঠে। পাকিস্তান হওয়ার পর বিপদ সবার ওপরেই একসঙ্গে নেমে এল, কিন্তু ওদের বিপদ ছিল একটু ভিন্ন ধরনের,–অন্যের তুলনায় অনেক বেশি। পিণ্ডি ভাটিয়াতে সব কিছু খুইয়ে ওরা সুখে মণ্ডিতে আসে ট্রেন ধরতে। মৃত্যুভয়ে ওদের প্রাণ কুঁকড়ে ছিল। ওই সুখে মণ্ডি স্টেশন থেকে এর আগেও ওরা বহুবার ট্রেন ধরে হাফিজাবাদ সাঁগলা হিল বা জড়াওয়ালে গিয়েছে। প্লাটফর্মের ওপর একটা পিপুল গাছ। তার নীচের বেঞ্চটায় মোহনলাল এসে হামেশাই বসত। এই বেঞ্চে বসে থাকতে খুব ভালো লাগত ওর। সুখে মণ্ডি স্টেশনের প্রতিটি ইট কাঁকর ওর পরিচিত। কিন্তু সেদিন এই প্লাটফর্মের সবকিছুই অপরিচিত। মনে হল এ যেন প্লাটফর্ম নয়, কোন অন্ধকার পাহাড়ি ঘাঁটির শেওলা-পড়া পিছল ঢাল। তখন মনের মধ্যে একটা সাংঘাতিক ভয়, আতঙ্ক।

অবশেষে এই ভয়টাই একটা ঘটনায় রূপান্তরিত হল ।

সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন থেকে ঘনতর হয়ে উঠল। সেই থমথমে অন্ধকারে মোহনলাল আর মায়াবন্তীদের পরিবারের সবাই আরও সিঁটিয়ে গেল। বেঞ্চের ওপর আর যারা বসেছিল তারাও তাদের তল্পিতল্পা সামলাচ্ছে। ভয়ে তাদের বুক ধুকধুক করছিল। এর মধ্যে ট্রেন এসে গেল। শুধু পা দুটো রাখার জন্যে কোনরকমে একটু জায়গার প্রয়োজন । স্টেশনে ঢুকে ট্রেনটা ঝিমুতে লাগল, ছাড়বার আর নামগন্ধ নেই। ট্রেনের পুরুষ মহিলা শিশু – সবাই ভয়ে থরথর করে কাঁপছে। একটা আর্ত গুঞ্জন কন্ঠনালি দিয়ে নিরুচ্চারে বেরিয়ে এল। স্টেশনের আশেপাশে কোথায় যেন ঢাকের আওয়াজের মতো একটা গুমগুম শব্দ। আর সেই শব্দের এক বিকট ভয়-ধরানো চিৎকার মিলেমিশে একাকার হয়ে আছে। -

কামরায় যারা বসেছিল তাদের মধ্যে একটা চাঞ্চল্য ছড়িয়ে পড়ল। মায়েরা শিশুদের বুকের মধ্যে টেনে নিল, পুরুষরা লটবহরগুলো আরও কাছে টেনে আগলে ধরল। চারদিকেই চিৎকার আর চেঁচামেচি। প্ল্যাটফর্ম জুড়ে ভালা আর বল্লম বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিচ্ছে। জ্বলন্ত মশালগুলো এদিক-ওদিক ছোটাছুটি করছে। মুহূর্তে চারিদিকে একটা উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ল।

জাঠরা প্রতিটি কামরায় লুটতরাজ চালাচ্ছে। সামনে যাকে পাচ্ছে, তাকেই কেটে দুটুকরো করে ছুঁড়ে ফেলছে। কামরাগুলোতে লাশের স্তূপের মধ্যে রক্তের ঢেউ বইতে লাগল। এক সময় এই রক্ত শুকিয়ে জমাট বাঁধল। কিন্তু কেউই জানল না, কে মরেছে, আর কে প্রাণে বেঁচে আছে। যারা কোনরকমে প্রাণে বেঁচে গিয়েছিল, তারাও নিজেদের মৃত বলেই মনে করল। লাশের স্তূপের মধ্যে তারা শ্বাস বন্ধ করে মরা মানুষের মতো পড়ে রইল ।

পরের দিন ট্রেন যখন অমৃতসরে পৌঁছল, তখন কয়েকটি সেবাদলের স্বেচ্ছাসেবক বাহিনী রুটি আর জল নিয়ে প্ল্যাটফর্মে হাজির ছিল। ট্রেনের কামরার মধ্যে মৃত মানুষের স্তূপ দেখে তাদের মধ্যে হই চই শুরু হয়ে গেল। মোহনলাল আহত হয়েছিল, কিন্তু তখনও জ্ঞান হারায়নি। মায়াবন্তী কামরার এক কোণে ভয়ে বিহ্বলতায় সিঁটিয়ে বসেছিল। এই প্রথম তারা পরস্পরকে দেখতে পেল। কাঁদতে কাঁদতে মায়াবন্তীর চোখের জল চোখেই শুকিয়ে গিয়েছিল। কোনরকমে সে কোলের বাচ্চাটাকে সামলে রেখেছে। দাঙ্গাবাজরা ছোট কৃষ্ণাকে দুটুকরো করে ফেলেছে। তার মাথা একদিকে আর ধড় অন্যদিকে পড়ে আছে। বেঞ্চের নীচে নিজেকে কোন রকমে গুটিয়ে লুকিয়ে রেখেছিল মোহনলাল। মায়াবন্তী ওকে বেঞ্চের নীচ থেকে টেনে বের করে বুকে জড়িয়ে ধরল। কান্তার কথা মনে পড়তেই তার খোঁজ শুরু হয়ে গেল। থই থই জমাট-বাঁধা রক্তে মোহনলালের পা লাল হয়ে গেছে। মৃত মুখগুলো সে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগল । কিন্তু কামরায় পড়ে থাকা মৃতদেহের স্তূপের মধ্যে কান্তা নেই, কান্তার কোন হদিশ ছিল না।

প্রাণে বেঁচে থেকেও মায়াবন্তী যেন প্রাণহীন— মৃত। খবর পাওয়া গেল জালিমরা কান্তাকে তুলে নিয়ে গেছে। সেই সময় কান্তার বয়স খুব বেশি হলে বারো-তেরো। জীবনের এত বড় একটা দগদগে ঘা ও কিভাবে সারিয়ে তুলবে? মোহনলাল কৃষ্ণার মাথাটা দু হাতে তুলে আবেগে চুমু খেল। মায়াবন্তীর দু চোখ কান্নার আবেগে ফেটে পড়তে চাইছে, কিন্তু তার চোখে এক ফোঁটাও জল নেই। তার কাছে কিছু আর অবশিষ্ট নেই।

ঘন ঘোর অন্ধকারের মধ্যে খড়কুটোর মতো উড়তে উড়তে ওরা দিল্লীতে এসে পৌঁছল। প্রাণের ধ্বনি, স্বর কাঁপতে কাঁপতে ক্রমশ স্থির হয়ে যেতে লাগল। একদিন সেই মোহনলাল চাঁদনীচকে একটা ঘড়ির দোকান খুলে বসল দোকান ভালোই চলছে। তারপর সোহনলাল বি.এ. পাস করে ডেপুটি কমিশনার অফিসে উচ্চপদে চাকরি পেল। কিন্তু এই আট বছর ধরে কান্তার জন্যে যে দগদগে ঘা সৃষ্টি হয়েছে তা এতটুকুও শুকোয়নি; বরং সেই ঘা থেকে এখনও পুঁজ আর দুর্গন্ধ বেরুচ্ছে। আর মায়াবন্তী শূন্যতার ব্যথায় হামেশাই বেহুঁশ হয়ে পড়ে। চন্দ্রকান্তাকে খুঁজে বের করার জন্যে মোহন সব রকম চেষ্টা করে দেখেছে। হোম মিনিস্টারের সঙ্গে দেখা করে তাঁকে দিয়ে পাকিস্তানের হোম মিনিস্টারের কাছে বিশেষ আবেদন করে চিঠি পাঠিয়েছে, ‘স্পেশাল স্টাফ দিয়ে দয়া করে কান্তার খোঁজ করুন। সোহনলালও ডেপুটি কমিশনারকে দিয়ে পাকিস্তান হাই কমিশনারের কাছে আবেদন জানায়, যাতে তিনি ওর বোনকে খুঁজে বের করার জন্যে যথাসম্ভব চেষ্টা করেন। হাই কমিশনার পাকিস্তান সরকারকে দিয়ে খবরের কাগজে পুরস্কার ঘোষণা করে সংবাদ ছাপেন। তাদের জেলার যে সব মেয়েদের লুট করে নেওয়া হয়েছিল, এই আট বছরে তাদের অনেককেই ফিরে পাওয়া গিয়েছে। সেইসব মেয়েদের কাছ থেকে খবর পাওয়া গেল, কান্তা এখন চৌধুরী পরিবারের বৌ। এই খবর পাওয়ার পর তারা আরও জোর তল্লাশি চালাল। কিন্তু তবুও কান্ডার কোন হদিশ পাওয়া গেল না। মায়াবন্তী নিজের কপাল চাপড়াতে চাপড়াতে চিৎকার করতে থাকে, “হায়, কান্তার মৃত্যু কেন হল না। এর চেয়ে ওর মৃত্যু ভালো ছিল। গাড়িতেই ওকে কেন কেটে ফেলল না।” কাঁদতে কাঁদতে সে ভগবানের কাছে মিনতি করে বলে, “ভগবান, এর মৃত্যুর খবর যেন ঠিক হয়। বহুলোলপুরে চৌধুরী নিসার আহমদের ঘরে ও আছে এ খবর যেন মিথ্যে হয়।” কিন্তু মনকে নায়াবন্তী কেমন করে বশ করবে? বুকের মধ্যে তো সবসময়েই চন্দ্রকান্তার নাম গুনগুন করছে! চন্দ্রকান্তা যে তার দুই সন্তানের চেয়ে অনেক, অনেক প্রিয়। কান্তাকে সে তার হাতের তালুতে সযত্নে রাখা কুলের মতো আগলে রেখেছিল। গরম হাওয়ার কাপটা এসে তার শরীরকে ঝলসে দেবে, সে তা কখনই ভাবতে পারেনি। কান্তা, এর থেকে ভালো ছিল আতুর ঘরে তোর মৃত্যু। তোকে আমি মেরে ফেললাম না কেন? এরা আমার দুঃখ— আমার ব্যথা বোঝে না।' বলতে বলতে সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকে। সোহনলাল হয়ত সবে অফিস থেকে ফিরেছে, কাঁদতে দেখে সান্ত্বনা দেয়, 'মা কেঁদো না।'

ঈশ্বরদাসকে যেন একটা মশা জোরে কামড়ে দেয়। জ্বালায় সে আবার জেগে ওঠে। কখন যে তার দু চোখের পাতা ঘুমে জড়িয়ে এসেছিল সে জানে না। তন্দ্রার আমেজ ছুটে গেলে ও আবার দরদর ঘাম মুছতে লাগল। পুছতে পুছতেই ওর দু' চোখ আবার তন্দ্রায় ঢলে পড়ে।

“চাচাজি, বাবা আপনাকে ডাকছেন। তাড়াতাড়ি আসুন, মা বেহুঁশ হয়ে পড়েছে।” ঈশ্বরদাস সবে কাছারি থেকে ফিরেছে। ফিরতে না ফিরতেই মোহনলালের ছেলে ওকে ডাকতে আসে।

এর আগেও সে মারাবন্তীকে দেখেছে, আজকেও বিশেষ কোন নতুন বৈশিষ্ট্য ওর চোখে ধরা পড়ে না। কিন্তু কেমনতরো যেন সব ব্যাপারটা। মায়াবন্তী অনেকক্ষণ ধরে বেহুঁশ হয়ে পড়ে আছে। ওর দাঁত ফাঁক করে মোহনলাল একটা চামচে করে জল দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু কিছুতেই কপাটি লাগা দাঁত ফাঁক করতে পারছে না।

ভোর থেকেই কান্তার কথা আজ কেন যেন মায়াবতীর বারবার মনে পড়ছিল। তাই হা-হুতাশ করে সমানে কেঁদে চলেছে। ডাক্তার মারাবতীকে পরীক্ষা করে ইঞ্জেকশন দিলেন। ইঞ্জেকশন দেওয়ার পর ডাক্তার প্রতিক্রিয়া লক্ষ করতে লাগলেন। এমন সময় বাইরে একটা লরি এসে থামল। লরির শব্দ শুনে ঈশ্বরদাস ঝটিতি বাইরে ছুটে গেল। দেখল, একটা পুলিশের গাড়ি এসে দাঁড়িয়েছে। গাড়ি থেকে থানার বড়বাবু নামলেন। নেমে জিজ্ঞেস করলেন, “এটা কি মোহনলালজির বাড়ি ?”

বড়বাবুর প্রশ্নের উত্তরে ঈশ্বরদাস শুধু ঘাড়টা সামান্য একটু কাত করল।

বড়বাবু ইশারা করে কাকে যেন গাড়ি থেকে নামতে বললেন। একজন যুবতী গাড়ি থেকে নামল। মেয়েটি ঈশ্বরদাসের মুখের দিকে চেয়ে রইল। ইতিমধ্যে মোহনলালও বাইরে বেরিয়ে এল। মোহনলাল যুবতীটিকে দেখেই চিনতে পারল—এতো কান্তা। নিজের চোখকে যেন বিশ্বাস করতে পারছে না মোহনলাল । সামনে এগিয়ে গিয়ে সে কান্তাকে বুকে জড়িয়ে ধরে তার মাথায় কপালে সস্নেহে চুমু খেতে লাগল।

কিন্তু কান্তার উদাস চেহারার কোন উচ্ছ্বাস বা পরিবর্তন দেখা গেল না। সে এই অপ্রত্যাশিত পরিবেশকে জানার, বোঝার চেষ্টা করছিল। মোহনলাল তাকে বাড়ির ভেতর নিয়ে গেল। ধীরে ধীরে মায়াবন্তীর জ্ঞান ফিরে আসছিল। মোহনলাল মায়াবন্তীকে বলল, “এই দেখ, এই যে কান্তা এসে ঘেছে।” কিন্তু সে মোহনলালের কথা বিশ্বাস করতে পারছে না। মায়াবন্তী চোখ মেলে চাইল। সত্যিই তার সামনে কান্তা দাঁড়িয়ে রয়েছে। হ্যাঁ, কান্তাই, যাকে সে তার প্রাণের চেয়েও বেশি ভালোবাসে, যার জন্যে গত আট বছর ধরে সে তার জ্ঞান বুদ্ধি বিবেচনা হারিয়ে ফেলেছে, যার জন্যে সে দুঃখ এবং বেদনার জর্জরিত। এই কান্তার জন্যেই তো সে তার কন্যা কৃষ্ণার ভাগ্যের পরিণতি ভুলে রয়েছে।

চন্দ্রকান্তাও তার মার দিকে খাঁ খাঁ চোখ নিয়ে তাকিয়ে রইল। মুহূর্তে মায়াবন্তী উঠে মেয়েকে বুকে জড়িয়ে ধরল। আজ কত বছর বাদে তার চোখ কান্নায় ভরে উঠল। এ ক'বছর মায়াবন্তীর দু চোখের জল শুকিয়ে মরুভূমির মতো হয়ে গিয়েছিল, আজ আবার তাতে বান ডাকল। কিন্তু কান্তাকে দেখে মনে হচ্ছে, সে যেন ঠাণ্ডা ছাই। বাড়ির কাউকেই সে মনে করতে পারছে না। ছোট ভাই সোহনলালের সঙ্গেও সে মন খুলে মিশতে পারছে না। মা আদর করে কান্তাকে পাশে বসালো।

কাররই খেয়াল হয়নি, থানার বড়বাবু তখনও দাঁড়িয়ে রয়েছেন। মোহনলাল বড়বাবু এবং সঙ্গের তিনজনকে খুব আদর-আপ্যায়ন করে বসাল। রোশন কাপুর রিকভারি স্টাফের সঙ্গে যুক্ত, চন্দ্রকান্তাকে উদ্ধার করার জন্যে তিনি স্বয়ং অপারেশনে গিয়েছিলেন। সমস্ত ঘটনা তিনি ধীরে ধীরে বলতে লাগলেন। ইতিমধ্যে চা তৈরি হয়ে গিয়েছিল, যত্ন করে সবাই তাদের চা খাওয়াল। অনেকক্ষণ ধরে ওদের কথাবার্তা চলল। এর মাঝে চন্দ্রকান্তা একটি কথাও বলেনি। ওকে দেখে মনে হচ্ছিল, সে যেন নিজের বাড়িতে নয়, অন্য কারো বাড়িতে এসেছে। ওর চোখে মুখে কোন আনন্দ উচ্ছ্বাসের ঝলক নেই, নেই একবিন্দু চোখের জল। থানার বড়বাবু যখন ঘটনার বিস্তৃত বিবরণ দিচ্ছিলেন কান্তা তখন মাথা হেঁট করে বসেছিল। আর মায়াবন্তী মাঝে মাঝে ওর মাথায় সস্নেহে হাত বুলিয়ে দিচ্ছিল।

বারান্দায় কার যেন পায়ের শব্দ। ঈশ্বরদাসের স্বপ্নের জাল মুহূর্তে ছিন্নভিন্ন হয়ে গেল। প্রচণ্ড গরমে অবস্থা কাহিল, গেঞ্জিকে হাত পাখা বানিয়ে হাওয়া খেতে লাগল। মাঝ-দুপুরের ঢলে পড়া প্রচণ্ড রৌদ্রতাপে নিজেকে সে ভীষণ ক্লান্ত অনুভব করছে।

কয়েক দিন যেতে না যেতেই মায়াবন্তীর সে উৎসাহ আর উদ্দীপনা ঝিমিয়ে পড়ল। সস্নেহে চন্দ্রকান্তাকে কাছে বসিয়ে খোঁজখবর তো নেয়ই না, বরং কথায় কথায় এর ওপর খিঁচিয়ে ওঠে। কান্তা তার হৃদয়ের গোপন কথা গোপন রেখে সেই বহুদিন আগের দুর্ঘটনার কথা বলে চলে.......

“ওরা যখন ভালা আর বল্লম উচিয়ে আল্লাহ আকবর ধ্বনি দিতে দিতে গাড়িতে উঠল, আমি ভয়ে চিৎকার করে উঠলাম। কৃষ্ণা আমার পাশেই বসেছিল। দৈত্যের মতো একটা লোক কৃষ্ণাকে হেঁচকা টানে তার কাছে টেনে নিয়ে রাম-দা দিয়ে ওর গলা নামিয়ে দিল। আর একজন জোর করে টেনে হিচড়ে আমাকে গাড়ি থেকে নামাবার চেষ্টা করতে লাগল। আমি গলা ফাটিয়ে চিৎকার করতে করতে কখন যে জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছিলাম, জানি না।

জ্ঞান ফিরলে দেখলাম, একটা খাটিয়ার ওপর আমি শুয়ে আছি। পাশেই একজন মহিলা বসে আছেন। তিনি আমার দিকে এক গ্লাস জল এগিয়ে দিলেন। মহিলাটির ওপর চোখ পড়তেই আমি ভয়ে চীৎকার করে উঠলাম। মহিলাটি এবং চারপাশের এই পরিবেশ আমাকে আর দেখতে না হয়, আমি চোখ বন্ধ করে ফেললাম। বেশ কয়েকদিন এইভাবে কেটে গেল। খাওয়া নেই, মনের কোন স্থিরতা নেই। একজন যুবক মাঝে-মধ্যে এসে উকি মেরে দেখে যেত। সে এলেই আমি দু হাঁটুর কাঁকে মাথা গুঁজে থাকতাম। জানি না কখন আমার নিজের অজাটে চোখের জল শুকিয়ে গিয়েছিল। কর্মেই আমি আশ্বস্ত হয়ে উঠলাম এবং নিজেই নিজেকে সান্ত্বনা দিতে লাগলাম। জানতে পারলান, আমাকে সুখে কী নস্তি থেকে তুলে বহালালপুরে নিয়ে আসা ভাসছে। এখন বাসালপুরে জেলাধীন চৌধুরী গুলাম কাদিরের বাড়িতে আছি। এই কদিন ধরে প্রায় সারাক্ষণ যিনি আমার পাশে বসেছিলেন তিনি চৌধুরী সাহেবের বেথান। তাঁর চোখ দুটি গভীর ননতার ভরা। বুঝতে পারলাম, আমি আমার পরিবার, ফেলে আসা দিন এবং যে বিশ্বাস ও সংসারে অভ্যস্ত তা আর কোন দিনই ফিরে পাব । আমি স্বাভাবিক ভাবে নিতে পারছিলাম না, বিশ্বাস করতে পারছিলাম না।

ক্রমশ সমস্ত রহস্য আমার কাছে খোলসা হয়ে গেল। বুঝতে পারলাম, আমি আর কোন দিনই বাবা-মার কাছে ফিরে যেতে পারব না। আমার মধ্যে যে সামান্য শক্তি এবং আবেগ অবশিষ্ট ছিল তা নিস্তেজ হয়ে পড়তে লাগল। রহমত বিবি আমাকে খুব স্নেহ করতেন— আমার দুঃখকে ভোলানোর জন্যে সমস্ত রকম চেষ্টাই করতেন। বড় চৌধুরী সাহেবও সস্নেহে আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেন। দেখতে দেখতে এইভাবে কয়েক বছর কেটে গেল। ....

বাতাসের এক ঝটকায় দরজা হাট খুলে গেল। একটা পাল্লা অন্য একটা পাল্লার সঙ্গে ঠোকর খেয়ে শব্দ হল। জ্বলন্ত আগুনের মতো লু এসে ঈশ্বরদাসের সমস্ত শরীর জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দিল। 'হায় রাম!' বলে ঘাম মুছল, মুছে আবার ঝিমুতে লাগল।

ঈশ্বরদাসের মেয়ে সন্তোষ ওকে অনেকবার বলেছে, কান্তা সবসময় আনমনা থাকে, কারোর সঙ্গেই কথা বলে না। ওর দুচোখ যেন পাথরের মতো কঠিন হয়ে গেছে। আর এর মুখের ওপর পড়েছে বিমবতার একটা পুরু পলেস্তারা।

একদিন সন্তোষ কান্তাকে পাকড়াও করে বলল, “কান্তা, তুই যে একেবারে বাড়ির বাইরে বেরুল না! এভাবে কদ্দিন চলবে?”

সন্তোষের প্রশ্নের জবাব না দিয়ে কাস্তা চুপ করে বসে রইল। কিন্তু বারবার প্রশ্ন করাতে সে দায়সারা গোছের একটা উত্তর দিল, “কী করব বল! মন কিছুতেই মানতে চার না। আমার এই হৃদর নিয়ে কী করব? আমাকে সবাই তাকিয়ে দেখে, আর ফিসফিস করে কী যেন বলাবলি করে। ওদের এই ফিসফিসানি দেখলে ইচ্ছে করে আত্মহত্যা করে মরি।”

সন্তোষ থাকে নাহনা দেন, “যখনই তোর মন চাইবে আমাদের বাড়িতে আসিস। ভালো লাগবে।”

একদিন নতোর কান্তাকে চেপে ধরল, “বল, তুই কেন এত মনমরা থাকিস।” কান্তার মনটা ভাল ছিল সেদিন, “তোকে সব কিছুই বলব কিন্তু একটি শর্তে। কাউকে একথা বলতে পারবি না। ...দু-তিন বছর চৌধুরী গুলাম কাদিরের বাড়িতে আরান-আয়াসেই কেটে যায় আমার। ওরা কোনদিন কোন খারাপ ব্যবহার করেনি। নাম রাখল, বইদা খাতুন। নাম বদলের সঙ্গে সঙ্গে বুঝতে পারলাম, সারা জীবন আমাকে এখানেই থাকতে হবে। রহমত বিবি আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ওঁর ছেলে নিপার আহমদ লাহোরে পড়াশোনা করত। সে যখন বহলোলপুরে আসত, আমার সঙ্গে তাসিমুখে কথা বলত। মেয়েদের ওপর কোন অন্যায় অবিচার দেখলেই তার কটু সমালোচনা করত। এর সঙ্গে কথা বলার জন্যে আমি অধীর আগ্রহে প্রহর গুনতাম।

কোন কোন দিন ও আমাকে নিয়ে চেনাবের তীরে বেড়াতে যেত। চেনাব আমাদের গ্রাম বহলোলপুর থেকে মাত্র ক্রোশ খানেক দূরে।

“চেনাবের যে কী আকর্ষণ তা তোকে আমি বোঝাতে পারব না, সন্তোষ। সন্ধ্যার সময়ে আমরা দুজনে চেনাবের জলে তামাটে সূর্যের অস্ত দেখতাম। আর যখন এক ফালি চাঁদ চেনাবের অন্য পাড় থেকে উঠে ঢেউয়ের তালে তালে নাচত তখন আমরা গল্প বন্ধ করে ঢেউয়ের দিকে অপলক চেয়ে থাকতাম। চাঁদনি রাতে চেনাবের যে কী সৌন্দর্য তোকে আমি তা ভাষায় বোঝাতে পারব না...।” বলতে বলতে কান্তা এক দীর্ঘ নিশ্বাস ছাড়ল যেন হৃদয়ের গভীর থেকে একরাশ ধোঁয়া বেরিয়ে এল। শুকিয়ে যাওয়া ঠোঁটের ওপর আলতো ভাবে জিভ বোলাল কান্তা ৷ - •

সন্তোষের দু চোখ যেন কান্তার মুখের ওপর স্থির হয়ে গেঁথে রইল ৷ এই প্ৰথম সন্তোষ কান্তার মুখে আনন্দের ঝিলিক দেখল। অভিভূত হয়ে ও কান্তার কাহিনি শুনছিল।...

“চেনাবকে চিনতে হলে বর্ষার সময়েই দেখা ভালো। সে সময় চেনাবের এপাড়-ওপাড় দেখা যায় না। শুধু জল আর জল। চেনাব আপন মনে গুরগুর করে ডেকে চলেছে, ঘোলা জলের এক একটা ঘূর্ণি ঢেউ তুলে সে ছুটে চলেছে। ... যারা চেনাবের এই ভয়ঙ্কর দৃশ্য দেখেছে, একমাত্র তারাই জানে এর কী অসাধারণ শিহরণ। আমার বয়েস তখন খুবই কম। তাই পরের দিকে শুধু বৈশাখী পূর্ণিমায় আমি চেনাবে পাড়ে যেতাম। তখন আমার বুদ্ধি-সুদ্ধি এবং ভাবনা ছিল শিশুর মতো। চেনাবের ঢেউ যেন আমার হৃদয়েও উচ্ছ্বাসের ঢেউ তুলত। আর এই ঢেউ আমাকে এত মুগ্ধ করত, এত আকৃষ্ট করত, আর এমন ভাবে হাতছানি দিত আমি নিজেকে সামলাতে পারতাম না; একা একা গিয়ে হাজির হতাম চেনাবের পাড়ে। নিসার আহমদ যখন আমার সঙ্গে থাকত, সেই মুহূর্তগুলো যে কত মধুর হয়ে উঠত, কী বলব!”

কান্তা ওড়না দিয়ে তার ভিজে-ওঠা চোখের পাতা ধীরে ধীরে মুছল। ওর চোখের কোণ দিয়ে তুলোর মতো নরম কী একটা যেন গড়িয়ে গড়িয়ে নেমে আসছিল । আর সন্তোষ বিস্ময়ে ওর দিকে চেয়ে রইল। সে যেন কান্তার ভেতর পাথরের মতো স্থবির একটা কান্না – একটা বুক ফাটা হাহাকার দেখতে পাচ্ছিল।

“রহমত বিবিকে আমি আম্মা বলে ডাকতাম। একদিন তিনি আমাকে কাছে টেনে বললেন, ‘এখন থেকে আমিই তোর আম্মা। মনে কর, তোর আগের মার মৃত্যু হয়েছে। তোর প্রতি আমাদেরও তো একটা কর্তব্য আছে। এভাবে তোকে আর থাকতে দিতে পারি না।'

“মনোযোগ দিয়ে আমি আম্মার কথা শুনছিলাম। উনি আমার গালে আলতো একটা টোকা মেরে বললেন, 'আমার ইচ্ছে তোর বিয়ে দিই। চৌধুরী সাহেবেরও তাই ইচ্ছে। তোর কী মত, বল ? '

“উনি জিজ্ঞাসু দৃষ্টি নিয়ে অধীর আগ্রহে আমার দিকে চেয়ে রইলেন। আমার বুকের ভেতর ধুকধুক করতে লাগল।

“তোকে ছেড়ে আমি কিভাবে থাকব! খোদা কী এক মোহ আর মায়াই না সৃষ্টি করেছেন! নিসার আহমদের সঙ্গে আমি তোর শাদি দিতে চাই। তোর কোন অমত নেই তো”?

“খোদার কাছে এর বেশি আমি আর কি চাইতে পারতাম ! তাই চুপ করে রইলাম। কিন্তু আম্মা আমার নীরবতার ভাষা বুঝে নিলেন। সন্তোষ, তুই কোনদিন একই সঙ্গে একজন মহিলাকে মা এবং শাশুড়ি; একজন পুরুষকে বাবা এবং শ্বশুর হতে দেখেছিস? আমার শাদি ওরা কী ধুমধাম করেই না দিয়েছে, কী বলব। ...”

সন্তোষ কান্তার সারা মুখে চোখে বিদ্যুৎ-এর চমক দেখল।

ঈশ্বরদাস ভীষণভাবে চমকে ওঠে। সদর দরজায় কে যেন খুব জোরে জোরে কড়া নাড়ল। কিন্তু কাউকেই সে দেখতে পেল না। সন্ধ্যার অন্ধকার ক্রমেই গাঢ় থেকে গাঢ়তর হয়ে উঠছে, কিন্তু গরম ভাবটা তখনও কমেনি। ওর দু'চোখ ঘুমে ঢুলঢুল করছে।

একদিন মোহনলাল ওকে বলল, “ভাই সাহাব, আপনার সঙ্গে একটু পরামর্শ করচে চাই। কান্তাকে কি করা যায় বলুন তো? ও সব সময় কেমন যেন মনমরা, কারোর সঙ্গে একটা কথাও বলে না। আর ওর মা সব সময় ওর সঙ্গে খিচখিচ করে চলেছে।”

ঈশ্বরদাস ওদের বাড়িতে গিয়ে বসতে না বসতেই মায়াবন্তী ডুকরে কান্না জুড়ে দিল। “ভাই সাহাব, ভগবানের কাছে আমি কী প্রার্থনা করেছিলাম, তা উনি বুঝতে পারেননি। ভগবান, এর চেয়ে কান্তার মৃত্যু ভালো ছিল। তা হলে আর এ ঝামেলা পোয়াতে হত না। দাঙ্গায় মারা গেলেও ভালো হত।” বলতে বলতে মায়াবন্তী কান্নায় ভেঙে পড়ল।

মায়াবন্তীকে সান্ত্বনা দিতে দিতে ঈশ্বরদাস বলল, “বোন, ঈশ্বরের যা ইচ্ছে তা তো ফেরাবার নয়। তিনি যা করেন ভালোর জন্যেই করেন।” তারপর সে মোহনলালের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল, “ভাই সাহাব, আপনি কী বলতে চান ? ”

“ভাবছি, কান্তাকে কোথাও বিয়ে দিয়ে নতুন করে ওর জীবন শুরু করাই। কিন্তু কেউই ওকে বিয়ে করতে রাজি নয়। কান্তাকে আট বছর বাদে পাকিস্তান থেকে উদ্ধার করা হয়েছে, এ কথা যারাই জানতে পারছে, তারাই পিছু হটছে। আর দ্বিতীয়বার এমুখো হচ্ছে না। ওর বিয়েতে আমি সবকিছু দিতে তৈরি, কিন্তু তবুও কেউ রাজি হচ্ছে না। আপনার কাছে অনুরোধ, আপনিই ওর জন্যে একটা ঘর দেখুন।” মোহনলালের গলায় হতাশা ৷

“আপনি ঠিক কথাই বলেছেন। আপনার কষ্ট আমি অনুভব করছি।” তারপর ঈশ্বরদাস কথার মোড় ঘুরিয়ে বলল, “উপায় একটা বের করতেই হবে। আমাদের এই কট্টর সমাজের গায়ে যতই কালিমা থাক না কেন, কেউ তা নিয়ে মাথা ঘামায় না । কিন্তু কোন অবলা নারীর ওড়নার ওপর যদি ছিটেফোঁটা দাগ থাকে, তবে আর কথা নেই। কেউ তাকে গ্রহণ করতে রাজি হয় না। আমার কথা শুনে আপনি হয়তো ভাবছেন, ঈশ্বরদাস কীরকম পাগলের মতো আবোল-তাবোল বকছে। যদি ওদের গ্রহণ করতেই না পারি, তবে কী দরকার ছিল সরকারের কাছে আর্জি পেশ করার?—কী দরকার ছিল ওদের ওপার থেকে ফিরিয়ে আনার? ওরা ওপারে অন্তত কোন রকমে একটা মাথা গুঁজবার ঠাঁই তো করে নিয়েছিল। আজ এত বছর বাদে ওদের আমরা শিকড়সুদ্ধ উপড়ে নিয়ে এলাম। উপড়ে নিয়ে এলাম সত্যি, কিন্তু মাটির গভীরে ওদের শিকড় নতুন করে বসাতে রাজি নই।”

মোহনলালও ঈশ্বরদাসের কথাগুলো বুঝল। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল ওর গলা দিয়ে।

মায়াবন্তীর দুচোখ বেয়ে জলের ধারা নেমে আসে। ওড়না দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল, “এর চেয়ে ওর মৃত্যু হলেই খুশি হতাম। ভগবান, আমি যে ওর জন্যে জ্বলেপুড়ে খাক হয়ে যাচ্ছি। কান্তাকে জন্ম না দিলেই পারতাম। কোন্ জন্মের হিসেবনিকেশ ও নিচ্ছে কে জানে ?”

ঈশ্বরদাস মায়াবন্তীকে সান্ত্বনা দিয়ে উঠে দাঁড়াল; যেতে যেতে বলল, “বোন, ভুলেও যেন কান্তার সামনে এসব কথা বল না। তুমি নিজেই বল, এর জন্যে ওর কি অপরাধ ছিল? আমি ওর জন্যে ছেলে খুঁজব, তোমরাও খোঁজখবর নাও । সবাই মিলে চেষ্টা করলে একটা না একটা ছেলে পাওয়া যাবেই। কিন্তু ভগবানের দিব্যি দিয়ে বলছি, চন্দ্রকান্তার মন তুমি ভেঙে দিও না। কোন দিন কি তুমি ওর হৃদয়ের গভীরে উঁকি মেরে দেখার চেষ্টা করেছ?”

ঘর থেকে বেরুতেই ঈশ্বরদাস সামনে কান্তাকে দেখল। পাথরের মতো নিশ্চল প্রাণহীন ওর মুখের ওপর একটা আতঙ্কের ভাব ঈশ্বরদাস লক্ষ্য করল। খুব দরদের সঙ্গে সে কান্তাকে জিজ্ঞেস করল, “কান্তা-মা, কী হয়েছে? এখানে তুমি কী করছ?”

ঈশ্বরদাসের প্রশ্নে কান্তার মুখের আদল কঠিন হয়ে ওঠে। কান্তা ওর কথার কোন জবাব দেয় না। ঈশ্বরদাস ওর চোখের কোণে কয়েক ফোঁটা জল যেন টলমল করতে দেখল। বুঝতে পারল, ও ওদের সমস্ত কথাই শুনেছে।

ঘুম ভাঙার পর ঈশ্বরদাস দেখল, সন্ধ্যার অন্ধকার ঘন হয়ে এসেছে। দুপুরের উত্তাপটা অনেক কমে গিয়েছে। ঘুম থেকে উঠে ঈশ্বরদাস সারা ঘরে একবার পায়চারি করল, তারপর গ্যাট হয়ে বসল বিছানায়। আজকে ওর মগজ কেমন যেন ফাঁকা ফাঁকা। ও আবার কান্তার কথা ভাবতে লাগল ।

একমাত্র সন্তোষের কাছেই চন্দ্রকান্তা মুখ খোলে। ওর জন্যে ঈশ্বরদাসের যে দুঃখ, যে দরদ তা কান্তার মনকে নাড়া দেয়। কান্তা মাঝে মাঝে ঈশ্বরদাসের কাছে তার দুঃখ এবং ব্যথা ব্যক্ত করে ফেলে। কিন্তু যে গোপন কথা ঈশ্বরদাসকে বলতে তার বাধত, তা সে সন্তোষকে বিনা দ্বিধায় বলত।

একদিন কান্তা সন্তোষের পাশে নিবিড় হয়ে বসে ওর মনের অব্যক্ত ব্যথাগুলো, শুকনো পাপড়ির মতো নিজের হাতেই টেনে তুলল। তুলে ফেলার সঙ্গে সঙ্গে বেরিয়ে পড়ল একটা শাশ্বত বেদনা ।

“দু বছর হয়ে গেল, এখানে আসার পর থেকে এক রাতের জন্যেও আমি ঘুমতে পারিনি, সন্তোষ। এমন কি দিনের আলোতে আবছা লোহার পর্দার পেছনে দাঁড়িয়ে নিসার আহমদ যেন আমার সঙ্গে কথা বলে। কান পাতলেই ওর কথা শুধু আমি শুনতে পাই। স্বপ্নের মধ্যে ও আমার হাত আবেগে জড়িয়ে ধরে সঙ্গে করে নিয়ে যায়—চেনাবের স্মৃতি মনে করিয়ে দেয়। নইম আর সালমা যেন কাঁদতে কাঁদতে আমাকে আকুল ভাবে ডাকে। ব্যথা-জর্জরিত ওদের মুখ দেখে বুক ফেটে যায়। চন্দ্রকান্তা বা সইদা, আমি যেই হই না কেন আমার সবচেয়ে বড় পরিচয়, আমি মা। এই দুই পরিবারই আমার কাছে সমান। আমার বুকের ভেতর যে ভালোবাসা, যে মমতা তা ব্যথায় মুচড়ে উঠছে। মমতা ভালোবাসা আমার দু চোখকে ভাসিয়ে দিচ্ছে। কে যেন আমার এই কান্নাকে ভেঙে খানখান করে দিয়েছে! সন্তোষ, তুই কি আমার জন্যে কিছু করতে পারিস না?

সন্তোষ কোন মতে ওড়নার খুঁটে মুখ গুঁজে কান্নার দমক রোখার চেষ্টা করছিল, আর কান্তার কাহিনি শুনে চলেছিল।

“সন্তোষ, আজকে তোকে আমি যে কাহিনি বলছি, সে কাহিনি যেন তুই ছাড়া দুনিয়ার আর দ্বিতীয় কোন ব্যক্তি না জানে। আমার স্বামী নিসারের কাছ থেকে আমি যে ভালোবাসা পেয়েছি, সে ভালোবাসা আমি এ জীবনে কখনও ভুলতে পারব না। বিয়ের এক বছর বাদেই নইমের জন্ম হয়। আর নইমের বছর দেড়েক বাদে সালমা হয়। জানি না, তোকে কোনদিন আমি ওদের দেখাতে পারব কিনা! ওদের দেখলে তুই-ই আমাকে বলবি, ‘সইদা তুই জালিম। এমন সুন্দর আদুরে বাচ্চা দুটিকে ছেড়ে তুই কেমন করে আছিস?' তোর এ প্রশ্নের জবাব আমি হয়তো কোনদিনই দিতে পারব না, তবু শোন, যতটুকু সম্ভব বলছি।

“সালমার জন্মের পরে আব্বাজানের ইন্তেকাল হয়। খোদা যেন তাঁর আত্মাকে শান্তিতে রাখেন !... আব্বাজানের মৃত্যুর পর নিসার আহমদ জেলাধীশ হয়। জমি-জমা আমাদের কমতি ছিল না। এলাকায় আমাদের প্রচণ্ড প্রতিপত্তি। তাই নিসার আহমদকে সবাই সম্মান করে, খুব ইজ্জত ওর। পাকিস্তানের পুলিস যখন আমাদের এলাকায় মেয়ে উদ্ধারের জন্যে ছানবান করতে আসত, ভয়ে ওরা আমাদের বাড়িমুখো হত না । নিসার আমাকে অনেকবার বলেছে, পাকিস্তান গভর্নমেন্ট ‘সিভিল এ্যাণ্ড মিলিটারি গেজেট’ ‘নবায়ে ওয়াক্ত'-এর মারফত জানিয়েছে, আমার খবর যে দিতে পারবে, তাকে এক হাজার টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে। কয়েকবার দরদ নিয়ে ও আমাকে জিজ্ঞেস করেছে, “তুমি কি হিন্দুস্থানে তোমার বাবা-মার কাছে যেতে চাও ?' আমি যদি হ্যাঁ বলতাম, তবে ও নিজেই আমাকে সীমান্তে পৌঁছে পার করে দিত । এসব কথা শুনলে আমি হাত দিয়ে ওর মুখ চেপে ধরতাম। বলতাম, ‘আমি বোধ হয় এখন তোমার কাছে বোঝা হয়ে উঠেছি! নইম আর সালমার মুখের দিকে চেয়েও কি আমাকে তোমার বোঝা মনে হয় ?' আমার কথা শুনে ও আমাকে দু হাত দিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ত। আর মুহূর্তের মধ্যে সমস্ত বিপদের দুর্ভাবনা হারিয়ে যেত ।

“কিন্তু একদিন পরিষ্কার আকাশ ঘন কালো মেঘে ছেয়ে গেল। সারা গ্রামে হৈ চৈ পড়ে গেছে। গ্রামে পুলিস এসেছে, সঙ্গে বড় অফিসার। হিন্দুস্থানের পুলিস অফিসারও তাদের সঙ্গে ছিল। পুলিসের দলটি আমাদের বাড়ির সামনে এসে দাঁড়াল। এসে জিজ্ঞেস করল, ‘চৌধুরী সাহেব বাড়িতে আছেন ?' ওদের কথা শেষ হওয়ার আগেই নিসার আহমদ বাইরে বেরিয়ে আসে। সন্তোষ, তারপরের ঘটনাগুলো আমি ঠিক ঠিক করে বলতে পারব না। ওরা আমার স্বামীর কোন কথাই শুনল না। আমি নিজে ওদের কত কাকুতি-মিনতি করে বললাম, “আমি হিন্দুস্থানে যেতে চাই না, আমাকে আপনারা জোর করে নিয়ে যাবেন না। আমার বাবা-মা মারা গ্যাছে। এই আমার দুটি সন্তান, এদের মুখের দিকে চেয়ে আপনারা আমার ওপর জোর করবেন না। আমি চৌধুরী সাহেবের বেগম, নিজের খুশিতেই তাকে শাদি করেছি।' কান্নায় আমি তখন ভেঙে পড়েছি। কাঁদতে কাঁদতে বললাম, 'চন্দ্রকান্তা আর বেঁচে নেই, সে মারা গেছে। সেখানে জন্ম নিয়েছে সইদা খাতুন, – আমি। আপনারা চন্দ্রকান্তার কথা ভুলে যান।' ... আমি নইমের দিকে এগিয়ে গিয়ে বললাম, ‘আপনারা আমার মুখের আদলের সঙ্গে নইমের মুখ মিলিয়ে দেখুন । দেখুন তো আমার চেহারার সঙ্গে ওর চেহারার মিল আছে কিনা ?” কিন্তু ওরা বারবার একই জবাব দিচ্ছিল, “আমাদের করার কিছু নেই, আইনের কাছে আমরা বন্দি। পাকিস্তান গভর্নমেন্টের কড়া আদেশ, আপনাকে হিন্দুস্থানে ফেরৎ পাঠাতেই হবে।'

“সত্যি বলছি সন্তোষ, সেই সময়ে যেন আকাশ থেকে সূর্য কোথায় পালিয়ে গিয়েছিল—জহ্লাদ যেন মানবতাকে নির্মমভাবে হত্যা করছিল। আর বিক্ষত মানবতার সেই গাঢ় লাল রঙ যেন সমস্ত পরিবেশকে রাঙিয়ে তুলেছিল। আর কোন উপায় না দেখে নিসার আমাকে হাতে ধরে জিপে তুলে দিল। তারপর ও অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল মাটিতে। আমার আম্মা রহমত বিবি আমার জন্যে খোদার খাছে নোনাজাত করতে লাগলেন। নইম আর সালমা সমানে কেঁদে চলেছিল। সেপাইরা ঠেলে ওদের পেছন দিকে হটিয়ে দিল। আম্মা ওদের ভোলাতে লাগলেন,– তোদের মা বাইরে বেড়াতে যাচ্ছে, এখুনি এই তো এখুনি ফিরে আসবে। কিন্তু সেই নিষ্পাপ শিশু হৃদয় দুটিও বুঝতে পারছিল, কী ঘটছে। আমার মন জিপ থেকে উড়ে বাইরে আছড়ে পড়তে লাগল। হঠাৎ একসময় জিপ চলতে লাগল আর আমার দু চোখের সামনে যেন কিয়ামতের অন্ধকার নেমে এল। এর পরের ঘটনা আমার কিছুই মনে নেই।”

ইতিমধ্যে ঈশ্বরদাসের জন্যে রুটি এসে গেছে। ও কোন কথা না বলে রুটি ছিঁড়ে ছিঁড়ে খেতে লাগল। রুটির একটি টুকরোও ওর গলা দিয়ে নামছিল না। খেতে খেতে ওর হাত চলা থেমে গেল। ও আবার চিন্তার সমুদ্রে ডুবে গেল।

একদিন সন্তোষ ওকে বলল, “বাবা, তুমি কি নিজের হাতে আমাকে গলা টিপে মারতে পারবে?

“এমন মা-বাবার অভাব নেই, যারা অজান্তে নিজের হাতে আপন সন্তানকে গলা টিপে হত্যা করে।”

কান্তার যে দুঃখ, যে বেদনা তার প্রতিটি পরতকে তুমি জানো। তোমার কাছে ওর জন্যে একটা আর্জি আছে বাবা। আমার অনুরোধ, তুমি ‘না’ করবে। ওর মৃত্যু তো অনেক আগেই হয়েছে, এখন শুধু তোমার না শুনে ও মরতে চায়।”

“তোষি, আমাকে সব খুলে বল।”

“তোমার সঙ্গে একজন দেখা করতে চায়, তুমি বললে দেখা করিয়ে দেব।” “কে?”

“নিসার আহমদ। না, না আব্দুল হামিদ ।”

“নিসার আহমদ। ... কি করে সে এখানে এল? কান্তার খবরই বা কার মারফত পেল সে?” ঈশ্বরদাস এক নাগাড়ে প্রশ্ন করে চলে।

“সব কিছু জানার প্রয়োজন নেই। আমি ওর বোন, মনে কর আমি সব ব্যবস্থা …

হাঁটুর ওপর রাখা ঈশ্বরদাসের হাত হঠাৎ ছিটকে থালার ওপর আছড়ে পড়ল । থালার কানায় লেগে ওর আঙ্গুলটা একটু ছড়ে গেল । হাতটাকে ধীরে চাপ দিতে দিতে এক ঝটকায় ও ঘাড়টাকে টান করে আবার খাওয়ায় মন দিল । আজ কী যেন হয়েছে ঈশ্বরদাসের, কিছুতেই কান্তার কথা মাথা থেকে ঝেড়ে ফেলতে পারছে না।

অবশেষে ঈশ্বরদাসকে ম্যাজিস্ট্রেটের এজলাসে পেশ করা হল। তার হাতে হাতকড়া পরানো। পুলিস তার বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের করেছে। তার বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তা পাঠ করে শোনানো হল। অভিযোগের সার কথা, সে কুচা নবী করিষের একটি মেয়ে চন্দ্রকান্তাকে গুজরাতের বাসিন্দা সইদা খাতুন— এই নাম দিয়ে জাল পারমিট দেয়। জাল পারমিট দিয়ে সে চন্দ্রকান্তার পাকিস্তানে পালিয়ে যাওয়ার ষড়যন্ত্রের সঙ্গে জড়িত ।

ঈশ্বরদাস দেখল, মোহনলাল আর মায়াবন্তী তার সামনে দাঁড়িয়ে। আরও অনেকেই মামলা দেখার জন্যে এসেছে। মোহনলাল বলছে, “হে ভগবান, শত্রুরও যেন এরকম প্রতিবেশীনা থাকে। আমার মেয়েকেএ লোকটা পাকিস্তানে পাচার করেছে। এ হিন্দুস্থানী, না পাকিস্তানী !”

মায়াবন্তী মুখে কাপড় চাপা দিয়ে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে চলেছে। কিন্তু চোখে এক ফোঁটাও জল নেই ।

সোহনলাল চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। মুখে চোখে চিন্তার বলিরেখাগুলো দেখা যাচ্ছিল।

সন্তোষ অসীম ধৈর্যে বুক বেঁধে সমস্ত কথাই শুনছিল।

ঈশ্বরদাস নিজের পক্ষ সমর্থন করে একটি কথাও বলল না ।

ম্যাজিস্ট্রেট ওকে দুবছরের সাজা দিল।

ওয়ার্ডার যখন থালা নিতে এল, তখন ঈশ্বরদাস উদাসভাবে চোখ মেলে তাকাল । ওর মনে এতটুকু ক্লেশ বা আফশোষ নেই। জেলের ভ্যাপসা গরম, বিস্বাদ রুটি আর গরাদ—সব কিছুই যেন কোথায় অতলে তলিয়ে গেছে। আর সেই অতল থেকে যেন সটান ওর সামনে উঠে এল নিসার আহমদের ঋজু তলোয়ারের মতো তীক্ষ্ণ চেহারা। ভালোবাসায় ভরপুর নিসার আহমদের যে আঙ্গিনা, সেই আঙ্গিনায় যেন সইদা খাতুনের খুশি আর আনন্দের চারাগাছ পল্লবিত হয়ে উঠছে। ...ওয়ার্ডার থালা টেনে নিতেই ও উঠে দাঁড়াল। দাঁড়িয়ে তৃপ্তির একটা ঢেকুর তুলল ঈশ্বরদাস।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%