লাজবন্তী

কমলেশ সেন

রাজেন্দ্র সিং বেদী

লাজবন্তী

রাজেন্দ্র সিং বেদীর জন্ম লাহোর ছাউনিতে—উনিশশো পনেরো সালে । তাঁর জীবনের প্রথম অধ্যায় কাটে গ্রামে। পরবর্তী সময় লাহোরে। এফ.এ. পর্যন্ত পড়াশোনা করেন। উর্দু মাসিক পত্রিকা ‘অদবী’-তে তাঁর প্রথম গল্প প্রকাশিত হয়। এরপর বিভিন্ন পত্রপত্রিকাতে পরপর প্রকাশিত হয় ‘গরম কোট’, ‘হমদোশ’, ‘পানসপ’, প্রভৃতি গল্প। এই গল্পগুলি খুব খ্যাতি লাভ করে। উর্দু গল্পকার হিসাবে বেদী এক বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। একসময় তিনি প্রগতি লেখক শিবিরের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। পাহাড়ের জনজীবনের ওপর লেখা তার অসাধারণ উপন্যাস ‘এক চাদর ময়লা সি'—আকাদেমি পুরস্কার পায়। প্রসিদ্ধ উর্দু সমালোচক সরুর তাঁকে উর্দু সাহিত্যের শ্রেষ্ঠ কথাশিল্পী বলে অভিহিত করেছেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৮৪ সালে।

“হথ লাঁয়া কুমলান নী লাজবন্তী দে বুটে....”

[ও সখি, এ হচ্ছে লজ্জাবতী লতার গাছ, হাত লাগলেই লজ্জায় মুষড়ে পড়ে।]

দেশ ভাগ বাটোয়ারা হয়েছে, আর সেই বাটোয়ারার পর অগণিত আহত মানুষ আবার উঠে দাঁড়িয়েছে। দাঁড়িয়ে শরীর থেকে রক্ত মুছে ফেলেছে। রক্ত মোছার পর তারা মনোযোগ দিল সেই সব মানুষের দিকে, যাদের দেহে সামান্যতম আঘাত লাগেনি, কিন্তু হৃদয় আর মন সম্পূর্ণভাবে আহত–ক্ষত-বিক্ষত।

পাড়ায় আর গলিতে গলিতে ‘ফির বসাও’কমিটি গঠিত হয়ে গিয়েছিল। প্রথম প্রথম বহু কষ্টে ‘ব্যবসা-বাণিজ্যে স্থান দাও', ‘জমিতে বসাও' এবং ‘ঘরে স্থান দাও'—অর্থাৎ স্থান দাও প্রোগ্রাম শুরু হয়। এই প্রোগ্রামের সঙ্গে আর একটি প্রোগ্রাম শুরু হয়েছিল, যে প্রোগ্রাম কাউকেই বিশেষভাবে আকৃষ্ট করে না। প্রোগ্রামটি ছিল চুরি করে নিয়ে যাওয়া মেয়েদের সম্বন্ধে। স্লোগান ছিল—হৃদয়ে স্থান দাও। কিন্তু নারায়ণ বাবাজির মন্দির এবং তার আশেপাশের যে প্রাচীনপন্থী মানুষের বাস তারা এর প্রচণ্ড বিরোধিতা করতে লাগল ।

‘হৃদয়ে স্থান দাও’– এই প্রোগ্রামকে কার্যকরী করার জন্যে মন্দিরের পাশেই যে মহল্লা, সেই মুল্লা শকুর মহল্লায় একটি কমিটিও হয়ে গেল। এবং এগারো ভোটের সংখ্যাগরিষ্ঠতায় সুন্দরলাল বাবু কমিটির সেক্রেটারি নির্বাচিত হলেন। আর উকিল সাহেব হলেন কমিটির সভাপতি। চৌকি কলার প্রধান মহুরি এবং মহল্লার অন্যান্য গণ্যমান্য ব্যক্তিদের ধারণা, সুন্দরলালের চেয়ে অন্য কেউ এতো ভালো কাজ করতে পারবে না। পারবে না, তার কারণ সুন্দরলালের স্ত্রীও এই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে বলে। ওর স্ত্রীর নাম লাজো—অর্থাৎ লাজবন্তী।

প্রভাতফেরিতে সুন্দরলাল এবং তার আর আর সাথীরা—রসালু নেকিরাম যখন গেয়ে চলে, ‘হথ লাঁয়া কুমলান নী লাজবন্তী দে বুটে ...' তখন সুন্দরলালের কণ্ঠ কান্নায় বুজে আসতে চায় । প্রভাতফেরির সঙ্গে নীরবে হাঁটতে হাঁটতে ও লাজবন্তীর কথা ভাবে, “জানি না ও কোথায় আছে, কখনও ফিরে আসবে কি! কে জানে...'। শান বাঁধানো রাস্তায় চলতে চলতে ওর পা টলতে থাকে।

ধীরে ধীরে এমন এক অবস্থায় এসে পৌঁছেছে যে, লাজবন্তীর কথা আর বেশি ভাবতে পারে না সে। ওর দুঃখ ওর ব্যথা যেন সারা বিশ্বের দুঃখ আর ব্যথায় পরিণত হয়েছে। দুঃখ বোধ থেকে নিজেকে ভুলিয়ে রাখার জন্যে সুন্দরলাল নিজেকে জনসেবার কাজে ডুবিয়ে দিয়েছে। কিন্তু সাথীদের কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে গান গাওয়ার সময় লাজবন্তীর কথা বার বার মনে পড়ে যায়। মানুষের হৃদয় কতই না নরম—স্পর্শকাতর। সামান্য একটু কঠিন কথাতেই ও আঘাত পেত, যেন লজ্জাবতী লতা—ছোঁয়া লাগলেই নেতিয়ে পড়ত। কিন্তু তা সত্ত্বেও লাজবন্তীর সঙ্গে রূঢ় ব্যবহার করতে ওর বাঁধেনি। উঠতে বসতে, যখন তখন নিজের আধিপত্য জাহির করার জন্যে ও তুচ্ছ থেকে তুচ্ছতম ঘটনাকে কেন্দ্র করে লাজবন্তীকে কী বেদমই না পিটিয়েছে।

লাজো লবঙ্গতার মতো কৃশাঙ্গী এক গ্রামীণ মেয়ে। খুব ঘেমে যায় বলে ওর দেহের রঙ শ্যামবর্ণ হয়ে গিয়েছে। ওর সারা দেহে এক অদ্ভুত ধরনের চপলতা ছিল। কিন্তু সেই চপলতা ছিল শিশির বিন্দুর মতো টলমল—যে টলমল শিশির বিন্দু বড় বড় কচুপাতার ওপর ছলকে ছলকে ওঠে। লাজোর তনুর কৃশতা কিন্তু অসুস্থতার জন্যে নয়। বরং ওর এই কৃশাঙ্গ সুস্থতারই সার্বিক লক্ষণ। একহারা লাজোকে সুন্দরলাল যেদিন প্রথম দেখে, অবাক বিস্ময়ে চমকে ওঠে, কিন্তু ধীরে ধীরে বুঝতে পারে লাজো সব রকম দায়িত্ব, সব রকম দুঃখ, সব রকম জ্বালা-যন্ত্রণা—এমন কি মারধরও সহ্য করার মতো ক্ষমতা রাখে। সুন্দরলাল ক্রমেই তার ওপর অত্যাচার এবং লাঞ্ছনা বাড়িয়ে চলেছিল, বাড়াতে বাড়াতে তাকে এমন এক পর্যায়ে নিয়ে যাচ্ছিল, যেখানে যে কোন সুস্থ মানুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙ্গে যেতে পারে। কিন্তু লাজো এই বাঁধ-ভাঙ্গা সীমাকেও অতিক্রম করতে পেরেছিল। ও কখনই বেশিক্ষণ নিজের দুঃখকে ধরে বসে থাকতে পারত না। তাই ভীষণ লড়াই ঝগড়ার পর যখন সুন্দরলাল মুহূর্তের জন্যে হেসে ফেলত, ও নিজেকে আর সামলে রাখতে পারত না। সেও হেসে বলত, “কখনও যদি আবার মার, তবে কোনদিন তোমার সঙ্গে কথা বলব না।” বেশ বোঝা যেত, ও সমস্ত মারপিটের কথা বেমালুম ভুলে গিয়েছে। গেঁয়ো মেয়েদের মতো ওরও ধারণা ছিল, স্ত্রীর সঙ্গে স্বামী এর চেয়ে ভালো ব্যবহার করে না। যদি কোন মেয়ে তার স্বামীর সঙ্গে মুখেমুখে এতটুকু তর্ক করে, তবে অন্য মেয়েরাই নাকের ওপর আঙ্গুল রেখে বিস্ময়ে বলে, “কি রকম মরদ দেখেছ, দু-চার ঘা দিয়ে বৌকে সিধে করতে পারে না।” শুধু তাই নয়, এই লড়াইঝগড়াকে তারা তাদের গানের কলিতে বেঁধে রেখেছে। লাজো নিজেই গাইত, “আমি শহরের ছোকরার সঙ্গে বিয়ে বসব না, কারণ তাদের পায়ে থাকে ধামসা ধামসা বুট জুতো, আর আমার কোমর যে সরু।” ... লাজো কিন্তু প্রথম দর্শনেই শহরের এক যুবকের প্রেমে পড়ে যায়। সে ছোকরার নাম সুন্দরলাল। বরযাত্রীদের সঙ্গে সেও লাজোদের গ্রামে গিয়েছিল, আর বরের কানে ফিশফিশ করে বলেছিল, “মাইরি বলছি ভাই, তোর ওই শালি কিন্তু ভারি সুন্দর। খুব তুখোড় বৌ হবে। লাজবন্তী সুন্দরলালের সমস্ত মন্তব্যই শুনে ফেলেছিল। কিন্তু ও নিজেই ভুলে বসেছিল, সুন্দরলাল বড় বড় ধামসা বুট পরে এসেছে। আর ওর নিজের কোমরও সরু।

প্রভাতফেরির সময় এই রকম নানা কথা সুন্দরলালের এক এক করে মনে পড়ে যায়। আর ও মনে মনে ভাবত, শুধু একবারটির জন্যে যদি লাজোকে ফিরে পেতাম, ওকে সত্যি সত্যি আমার হৃদয়ে বসিয়ে রাখতাম। লোককে বলতাম, হতভাগীরা হারিয়ে গিয়েছে বলে ওদের কী দোষ। দাঙ্গার দুর্ঘটনার শিকার হওয়ার জন্যে ওদের কেন দোষী করা হবে। যে সমাজ এই নিষ্পাপ—এই নির্দোষ মেয়েদের সমাজে স্থান দিতে কুণ্ঠা বোধ করে, সেই পচা-গলা সমাজকে জিইয়ে রেখে কী লাভ। এর চেয়ে তার ধ্বংসই শ্রেয়। ... লুট করে নিয়ে যাওয়া মেয়েদের ঘরে ঠাঁই দেওয়ার কথা ও মনেপ্রাণে ভাবে। ও দেখতে চায়, ওরা আবার সমাজে ঠাঁই পেয়েছে। ও জানে, মা মেয়ে বোন বা স্ত্রী—যেই হোক না কেন তারা হচ্ছে ঘরের শোভা।

‘হৃদয়ে স্থান দাও’প্রোগ্রামকে কার্যকরী রূপ দেওয়ার জন্যে মহল্লা মুল্লা শকুর-এর কমিটি বেশ কয়েকটি প্রভাতফেরি বের করে। ভোর চার-পাঁচটাই হচ্ছে প্রভাতফেরির সবচেয়ে ভাল সময়। কারণ সেই সময় মানুষের হৈ-হট্টগোল থাকে না, কেউ টিপ্পনীও কাটতে পারে না। এমন কি সারারাত জেগে যে কুকুরগুলো পাহারা দেয় তারাও পেটের মধ্যে মাথা গুঁজে শুয়ে থাকে। শুধু বিছানায় শুয়ে শুয়েই লোকজন বলাবলি করে, “ঐ যে হৃদয়-পালটানোর দল চলেছে।” কখনও বা তারা শিষ্টভাবে, কখনও বা রাগে-ক্রোধে সুন্দরলালের প্রচার শোনে। কড়া প্রহরা বসিয়ে যে মেয়েদের এপারে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে, তারা সবাই গমের দানার মতো এদিকে-সেদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়ে রয়েছে। তাদের স্বামী এবং আত্মীয়স্বজনরা উত্তাপহীনভাবে প্রভাতফেরির ধুন আওড়াতে আওড়াতে চলে যায়। গানের শব্দে কখনও বা কোন শিশু মুহূর্তের জন্যে চোখ মেলে তাকায় এবং ‘হৃদয়ে স্থান দাও’–এই ফরিয়াদ, এই হৃদয়বিদারক প্রচারকে নেহাৎ একটি গান ভেবে আবার ঘুমে ঢলে পড়ে।

কিন্তু ভোরে, কানের মধ্যে যে শব্দ গুঞ্জরিত হয়, তা একেবারে ব্যর্থ হয়ে যায় না । সারাদিন ধরে সেই শব্দ সেই কলি মগজের মধ্যে গুনগুন করতে থাকে। মাঝেমধ্যে মানুষ এর অর্থ হৃদয়ঙ্গম না করেই গুনগুন করে গেয়ে চলে। যখন এই ধুন মানুষের মনের গভীরে স্থান করে নিচ্ছিল ঠিক সেই সময় মিস মৃদুলা সারাভাই ‘বদলা-বদলি’ করে লুণ্ঠিতা মেয়েদের একটা দল পাকিস্তান থেকে ভারতে নিয়ে এলেন। তারা ভারতে এলে মহল্লা শকুরের অনেকেই তাদের ‘স্থান’ দেওয়ার জন্যে উন্মুখ হয়ে ওঠে। তাদের ভাই বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজনরা তাদের সঙ্গে দেখা করার জন্যে শহরের বাইরে চৌকি কলাতে উপস্থিত হয়। হতভাগী অবলারা এবং তাদের ভাই বন্ধু এবং স্বজনরা অনেকক্ষণ ধরে পরস্পরের দিকে চেয়ে রইল। তারপর মাথা হেঁট করে তারা তাদের বিধ্বস্ত ঘরদোর পুনর্গঠনের জন্যে ফিরে গেল। আর রসালু নেকিরাম এবং সুন্দরলাল সমানে কখনও মহেন্দ্ৰ সিং জিন্দাবাদ', কখনও বা ‘সোহনলাল জিন্দাবাদ' স্লোগান দিয়ে চলেছিল। এত জোরে জোরে ওরা গলা ফাটিয়ে স্লোগান দিচ্ছিল যে, চিৎকারে একসময় তাদের গলা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেল।

লুণ্ঠিতা মেয়েদের অনেকেই তাদের স্বামী মা বাবা ভাই বোন চিনতে পারছে না বলে জানিয়ে দিল। ‘এরা কেন বেঁচে রয়েছে, নিজেদের মর্যাদা এবং লজ্জাকে বাঁচানোর জন্যে কেন এরা বিষ খায়নি, কেন কুয়োতে ঝাঁপ দিয়ে আত্মহত্যা করেনি? ভীরু বলেই এরা এমন ঘৃণ্য জীবনকে আঁকড়ে ধরে রয়েছে। হাজার হাজার মেয়ে তো তাদের মর্যাদা—তাদের সম্মান লুণ্ঠিত হওয়ার আগেই প্রাণ দিয়েছে।...' কিন্তু এই মানুষগুলো কীভাবে জানবে, বেঁচে থেকে ওরা কী বীরাঙ্গনারই না পরিচয় দিয়েছে! পাথরের মতো নিথর চোখ নিয়ে ওরা কত মৃত্যুকেই না অবলোকন করেছে! আর আজ, এই দুনিয়ায়, এমন কি তার স্বামীও তাকে চিনতে অপারগ হচ্ছে! তাদের মধ্যে একজন নিজের নাম বিড়বিড় করে আউড়িয়ে চলল, – “সুহাগবন্তী ... আমি সুহাগবন্তী. ... .কি, তুই আমাকে চিনতে পারছিস না বিহারী? আমি তোকে কোলে পিঠে নিয়ে কত খেলেছি ...।” ওর কথা শুনে বিহারী আর্তনাদ করে উঠতে চাইল। কিন্তু ওর মা-বাবা তাদের বুক দুহাতে চেপে ধরে নারায়ণ বাবার মুখের দিকে করুণ চোখে তাকিয়ে রইল । আর নারায়ণ বাবা উদাসীনভাবে ঊর্ধ্বে আকাশের দিকে চেয়ে রইল। তার এই চেয়ে থাকার মধ্যে কোন বাস্তব সত্য নিহিত নেই, – শুধু হাজার হাজার দৃষ্টিকে ধোঁকা দেয়ার প্রচেষ্টা। আকাশ হচ্ছে এমন এক সীমারেখা, যে সীমারেখার পর আমাদের দৃষ্টি আর প্রসারিত হয় না। -

... পাকিস্তান থেকে মিলিটারি ট্রাকে বসিয়ে মিস সারাভাই বিনিময় করে যে মেয়েদের এনেছিলেন, তাদের মধ্যে লাজো ছিল না। এক হতাশা নিয়ে সুন্দরলাল ট্রাক থেকে শেষ মেয়েটিকে নামতে দেখেছিল। তারপর মনে বল ফিরিয়ে এনে সে আবার দৃঢ়তার সঙ্গে কমিটির কাজকর্ম শুরু করে দিল। এখন আর তারা শেষ রাত্রে প্রভাতফেরি নিয়ে বের হয় না। বরং সন্ধ্যার দিকে মিছিল বের করে। কখনও কখনও বা ছোট ছোট পথসভার আয়োজন করে। এই পথসভার সভাপতিত্ব করেন কমিটির সভাপতি উকিল কালিকাপ্রসাদ ‘সুফি’। আর গলা খাঁকারি দিতে দিতে ভাষণ দিতেন। তিনি যখন ভাষণ দিতেন রসালু একটা পিকদানি হাতে তাঁর পাশে ডিউটি দিত। লাউডস্পিকারে এক অদ্ভুত ধরনের খা... খা... হ... হ.... খা... খা . শব্দ হত। এরপর মাইকে দু-চারটে কথা বলার জন্যে নেকিরামও উঠে দাঁড়াত। সমস্ত ভাষণেই এরা শাস্ত্র এবং পুরাণ থেকে উদাহরণ টানত। এমন সব উদাহরণ টানত যে, তারা নিজেরাই নিজেদের যুক্তিকে দুর্বল এবং নিস্তেজ করে দিত। সভা একেবারে মাঠে মারা যাচ্ছে দেখে, সুন্দরলাল স্বয়ং উঠে দাঁড়াত। কিন্তু ও দু-চারটের বেশি কথা বলতে পারত না। কারণ কান্নায় ওর গলা বুজে আসত, চোখ দিয়ে টপটপ করে জল পড়ত। সে নিজের সিটে ধপ করে বসে পড়ত। শ্রোতাদের মধ্যে এক আশ্চর্য রকমের মৌনতা ছেয়ে যেত। সুন্দরলালের হৃদয়ের গভীর থেকে যে দু-চারটে কথা বেরিয়ে আসত, তা উকিল কালিকাপ্রসাদ 'সুফি'র সারগর্ভ ভাষণের ওপরও প্রলেপ বুলিয়ে দিত। আর শ্রোতারা যে যার জায়গায় বসে হাপুস নয়নে কেঁদে নিজেদের মনের জ্বালা এবং যন্ত্রণাকে অনেকখানি শান্ত করে নিত। তারপর ... তারপর তারা শূন্য মন নিয়ে ঘরে ফিরে যেত একসময়।

একদিন সন্ধ্যার সময় কমিটির লোকজন প্রচার করতে করতে প্রাচীনপন্থীদের যে দুর্গ তার চৌহদ্দির মধ্যে চলে এল। মন্দিরের সামনেই পিপুল গাছের নীচে শান বাঁধানো বিরাট চত্বর, সেই চত্বরে বসে ভক্তরা শ্রদ্ধাভরে রামায়ণ পাঠ শুনছিল। নারায়ণ বাবা রামায়ণের লব-কুশ কাণ্ড পাঠ করছিলেন, সেই কাণ্ডের এক জায়গায় আছে ‘ধোপা ধোপানীকে বাড়ি থেকে বের করে দিচ্ছে। বের করে দেওয়ার সময় বলে, আমি শ্রীরামচন্দ্রই নই, এত বছর রাবণের সঙ্গে ঘর করার পরও তিনি সীতাকে গ্রহণ করার মতো হিম্মত রাখেন। কিন্তু এই রামচন্দ্রজিই একদিন আবার মহারাণী সীতাকে ত্যাগ করলেন, যখন কিনা তিনি গর্ভবতী।' এর চেয়ে রামরাজ্যের আর কী ভালো এবং যথার্থ নমুনা হতে পারে? নারায়ণ বাবা বললেন, “এই এই হচ্ছে যথার্থ রামরাজ্য, যে রামরাজ্যে নগণ্য ধোপার কথাও এত গুরুত্ব দিয়ে দেখা হয়েছে ...”

কমিটির মিছিল মন্দিরের কাছে এসে থেমে যায়। রামায়ণ-কথা এবং শ্লোকের অর্থ শোনার জন্যে ওরা থমকে দাঁড়ায়। নারায়ণ বাবাজির শেষ বক্তব্য শুনে সুন্দরলাল বলল, “বাবাজি, এরকম রামায়ণ-কথা শুনে কী লাভ?”

ভিড়ের মধ্যে কে যেন চিৎকার করে উঠল, “চুপ কর, চুপ কর, তুমি বলার কে?”

সুন্দরলাল সামনে এক পা-দু পা এগিয়ে গিয়ে বলল, “আমার মুখ কেউ জোর করে বন্ধ করতে পারবে না।”

সুন্দরলালকে বাধা দিয়ে অনেকে একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, “চুপ কর, চুপ কর বলছি, আমরা একটি কথাও বলতে দেব না।”

ভিড়ের আর এক দিক থেকে ভেসে এল, “টুটি টিপে ধরব।”

নারায়ণ বাবা খুব মধুর কণ্ঠে বললেন, “সুন্দরলাল, তুমি শাস্ত্রের মর্যাদা দিতে শেখনি।”

উত্তরে সুন্দরলাল বলল, “নারায়ণ বাবা, আমি একটা কথা কিছুতেই বুঝতে পারছি না, আপনি তো রামায়ণের যে ধোপা তার কণ্ঠস্বর স্পষ্ট শুনতে পান, কিন্তু রামরাজ্যের জন্যে উন্মুখ সুন্দরলালের কণ্ঠস্বর কেন শুনতে পান না!”

একটু আগেও যারা মারমুখি হয়েছিল, তারাই আবার গ্যাঁট হয়ে বসতে বসতে বলল, “আরে শোনই না, আসলে ও কি বলতে চায় শোন।....’

রসালু আর নেকিরাম সুন্দরলালকে সামনের দিকে ঠেলে দিল। সুন্দরলাল বলতে লাগল :

“শ্রীরামচন্দ্র ছিলেন আমাদের পথপ্রদর্শক, কিন্তু বাবাজি এ কী রকম ব্যাপার, উনি শুধু ধোপার কথাই সত্য বলে গ্রহণ করলেন— সত্যবতী মহারাণী সীতার সতীত্বের ওপর উনি বিশ্বাস রাখতে পারলেন না কেন ?”

নারায়ণ বাবা নিজের দাড়ি পাকাতে পাকাতে বললেন, “সুন্দরলাল, সীতা হচ্ছেন ওঁর আপন ঘরণী। এই কথার যে গভীরতা তা তুমি উপলব্ধি করতে পারনি।”

সুন্দরলাল বলল, “আপনি ঠিক কথাই বলেছেন বাবাজি, এ দুনিয়ায় এমন বহু কথা আছে, যা আমার মগজে ঢোকে না। কিন্তু সত্যিকারের রাম আমি তাকেই মনে করি, স্বয়ং নিজের ওপর অত্যাচার করে না। যে নিজে নিজের ওপর অত্যাচার করে, তার মতো পাপী আর কে আছে। অন্যের ওপর অত্যাচার করলে এত পাপ হয় না । ভগবান রাম সীতাকে ঘর থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিলেন... তাঁর অপরাধ তিনি রাবণের অন্তঃপুরে বন্দিনী ছিলেন। সীতা এর জন্যে কেন অপরাধিনী হবেন? তিনিও কি আমাদের অনেক মা-বোনের মতোই ছলনা আর কপটতার শিকার হননি? রামায়ণে সীতার সততা অসততা বা রাবণের অত্যাচার যেভাবেই লিপিবদ্ধ হোক না কেন, রাবণের যে দশটা মাথা, তা দেখতে মানুষের মতোই। এর মধ্যে সবচেয়ে বড় মাথাটি হচ্ছে গর্দভের। আর আজকে, আমাদের যে সীতা তাকেও নির্বাসিত করা হয়েছে ... সীতা .... লাজবন্তী ...” বলতে বলতে সুন্দরলালবাবু হাউ-হাউ করে কাঁদতে লাগল। রসালু এবং নেকিরাম সমস্ত পোস্টার এক এক করে তুলে নিল। পোস্টারগুলিতে যে স্লোগান লেখা ছিল স্কুলের ছেলেরা তার ওপর কাগজ সেঁটে দিয়েছিল। মিছিলের একজন হঠাৎ স্লোগান দিল ‘মহাসতী সীতা জিন্দাবাদ।' আর একই সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভিড়ের অন্যপ্রান্ত থেকে স্লোগান ভেসে এল, “শ্রীরামচন্দ্র” ...

স্লোগান এবং পাল্টা স্লোগানকে থামানোর জন্যে অনেকে এক সঙ্গে চিৎকার করে উঠল “আরে থাম, চুপ কর।”

নারায়ণ বাবার রামায়ণ-কথা ভণ্ডুল হয়ে গেল। অনেকেই মিছিলে যোগ দিল। মিছিলের পুরোভাগে ছিল উকিল কালিকাপ্রসাদ এবং মুহুরি হুকুম সিং। পুরনো ছড়িটা মাটির ওপর ঠুকতে ঠুকতে ওরা মিছিল নিয়ে চৌকি কলার দিকে এগিয়ে চলল। কালিকাপ্রসাদ আর হুকুম সিং-এর পেছনে ছিল সুন্দরলাল, ওর দুচোখ বেয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে জলের ধারা নামছিল। আজ ও খুবই আঘাত পেয়েছে। মিছিল খুশিতে গলায় গলা মিলিয়ে গেয়ে চলেছে:

“হথ লাঁয়াঁ কুমলান নী লাজবন্তী দে বুটে। ...”

তখনও গানের ধুন কানের মধ্যে গুনগুন করছে, ভোরের আলো তখনও সম্পূর্ণ ফুটে ওঠেনি। মহল্লা মুল্লা শকুরের চারশ চোদ্দ নম্বর বাড়ির বিধবা বধূ তখনও বিছানায় শুয়ে আড়মোড়া নিতে নিতে বিরহ ব্যাথায় কাতরাচ্ছে, এমন সময় সুন্দরলালের বন্ধু লাল চন্দর ছুটতে ছুটতে এল। নিজেদের প্রচেষ্টা এবং প্রতিপত্তি খাটিয়ে সুন্দরলাল এবং কালিকাপ্রসাদ লাল চন্দরকে রেশনের ডিলারশিপ পাইয়ে দিয়েছে। লাল চন্দরের গায়ে একটা মোটা মতো চাদর জড়ানো। সে হাত জোড় করে বলল :

“সুন্দরলাল বাবু, আপনাকে অভিনন্দন।”

তামাকে গুড় মাখাতে মাখাতে সুন্দরলাল বলল, “কিসের জন্যে আমাকে অভিনন্দন জানাচ্ছ, লাল চন্দর?”

“আমি লাজো ভাবিকে দেখে এলাম।”

সুন্দরলালের হাত থেকে কল্কে ছিটকে পড়ে গেল। মেঝেতে মিঠে তামাক ছড়িয়ে গেল। দু-হাত দিয়ে লাল চন্দরের কাঁধ ধরে ঝাঁকাতে ঝাঁকাতে জিজ্ঞেস করল, “লাজোকে কোথায় দেখেছ?”

“বাগহ-এর সীমান্তে।

ধরা কাঁধ ছেড়ে দিয়ে সুন্দরলাল বলল, “তাহলে নিশ্চয়ই অন্য কেউ হবে ?”

লাল চন্দর তাকে আশ্বস্ত করে বলল, “না ভাইসাহাব, অন্য কেউ নয়, লাজো ভাবি-ই।”

“তুমি ওকে ঠিক চিনতে পেরেছিলে?” সুন্দরলাল মেঝে থেকে মিঠে তামাক হাতের তালুতে ডলতে ডলতে জিজ্ঞেস করল। তারপর রসালুর কল্কে হুকোতে বসিয়ে আবার প্রশ্ন ছুড়ল, “কি দেখে চিনলে যে ও লাজো ?”

“তার থুতনি আর গালের ওপর যে ছোট ছোট কলকা আঁকা ছিল। ...’ "

সুন্দরলাল ওর কথার খেই ধরে বলল, “হাঁ, হাঁ, কপালেও আছে।” ও কিছুতেই চাইছিল না আর কোন সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ থাকুক। লাজবন্তীর শরীরের পরিচিত সমস্ত কলকা ওর এক এক করে চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল—ছেলেবেলায় ও নিজেই সখ করে কলকাগুলো খুদিয়ে নিয়েছিল। কলকাগুলো ছিল আবছা আবছা সবুজ রঙের, দেখতে অনেকটা লজ্জাবতী লতার দানার মতো। কলকার কথা উঠলেই লাজবন্তী লজ্জায় লাল হয়ে উঠত, যেন ওর সমস্ত গোপনীয়তা কেউ জেনে ফেলেছে—ওর গোপন খাজাঞ্জীখানা লুট করে যেন ওকে পথের ভিখারিতে পরিণত করা হয়েছে। ... সুন্দরলালের সারা দেহমনে যেন এক অজ্ঞাত ভালোবাসা এবং পবিত্রতার শিহরণ খেলে গেল। ও আবার লাল চন্দরের কাঁধ চেপে ধরে জিজ্ঞেস করল, “বাগহতে লাজো কিভাবে এল?”

লাল চন্দর বলল, “বাগহ সীমান্তে ভারত এবং পাকিস্তানের মেয়েদের আদান প্রদান হচ্ছে।”

সুন্দরলাল গুটিসুটি মেরে বসে বলল, “তারপর কী হল ?”

রসালুও খাটিয়ায় উঠে বসল, বসে তামাকখোরের যে অদ্ভুত ধরনের কাশি, সেইভাবে কাশতে কাশতে জিজ্ঞেস করল, “সত্যি সত্যি, লাজবন্তী ভাবি এসেছে?”

লাল চন্দর না থেমে গড় গড় করে বলে চলল, “বাগহতে আমরা ষোল জন মেয়ে পাকিস্তানে ফেরত দিই, পরিবর্তে ষোল জনকে নিই। কিন্তু আদানপ্রদানকে কেন্দ্ৰ করে এক তুমুল ঝগড়া বেঁধে ওঠে। আমাদের ভলান্টিয়াররা বলল, ‘তোমরা যে মেয়েগুলো ফেরত দিয়েছ, তার অধিকাংশই হয় বুড়ি, নয় আধবুড়ি। সবাই একজোট হয়ে ঝগড়া করতে লাগল। সেই সময় পাকিস্তানের ভলান্টিয়াররা লাজো ভাবিকে দেখিয়ে বলল, ‘তোমরা একে বুড়ি বলছ? তোমরা যত মেয়ে ফেরত দিয়েছ তাদের কারোর সঙ্গে এর তুলনা হয় ?' আর লাজো ভাবি সবার নজর বাঁচানোর জন্যে তার ছোপ-ছোপ কলকাগুলো লুকনোর চেষ্টা করতে লাগল ।

ঝগড়া বেড়ে চরমে উঠল। দু পক্ষই নিজের নিজের মাল ফেরত নেওয়া ঠিক করল। আমি চিৎকার করে বলে উঠলাম, লোজো ভাবি, চলে এস।' চিৎকার চেঁচামেচি শুরু হয়ে গেলে আমাদের সিপাইরা লাঠি চালাল।

সত্যতা যাচাই করার জন্যে লাল চন্দর কনুই-এ লাঠির আঘাতের চিহ্ন দেখাল । রসালু আর নেকিরাম চুপচাপ বলেছিল, একটি কথাও তাদের মুখ দিয়ে বেরুচ্ছিল না। আর সুন্দরলাল বহুদূর পর্যন্ত তার দৃষ্টি প্রসারিত করে এক অদ্ভুত চিন্তায় মগ্ন হয়ে গেল—‘লাজো আসছে, না না, লাজো নয় ... সুন্দরলালের মুখ চোখ দেখে মনে হচ্ছিল, যেন হাজার হাজার মাইল তেতে-ওঠা বিকানিরের মরুপ্রান্তর পার হয়ে সে হেঁটে এসেছে। এসে গাছের শীতল ছায়ার নীচে বসে হাঁফাচ্ছে, এমন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে যে, মুখ দিয়ে কোন কথা বেরুচ্ছে না, বলতে পারছে না; “আমি পিপাসার্ত, আমাকে একটু জল দাও।” ওর মনে হচ্ছিল, দেশ ভাগের আগে যে রকম হিংসা দ্বেষ ছিল, আজও ঠিক তেমনি আছে। বরং তা যেন আরও শক্ত আরও মজবুত হয়েছে। শুধু তার আদলটুকু পালটিয়েছে মাত্র, কারো প্রতি কারো কোন সহানুভূতিটুকু পর্যন্ত নেই। কাউকে জিজ্ঞেস কর, ‘সাঁভরওয়াল-এ লহনা সিং আর তার ভাবি বন্তী থাকত

...' সঙ্গে সঙ্গে বিনা দ্বিধায় জবাব দেবে, ‘কবে মারা গেছে।’এই মৃত্যু এবং মৃত্যুর যে গভীর তাৎপর্য তা দুপায়ে মাড়িয়ে সে নির্বিকারভাবে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। এগিয়ে গিয়ে নিরুত্তাপ মানবতার জননীর সওদাগর হিসেবে নিজেকে জাহির করে। তারপর মানবতার রক্ত আর মাংসের কেনাবেচা শুরু করে দেয়—যেন হাটে দুগ্ধবতী কোন মেষ বা গাভীর মুখ হাঁ করিয়ে তার বয়স আন্দাজ করা হচ্ছে। বিক্রির জন্যে হাটে নিয়ে আসা এই দুগ্ধবতী গাভীর মতোই যুবতী মেয়েদের রূপ-রস-মমতায় ভরপুর রহস্যময়তা এবং খোদাই করা কলকাগুলোর যেন এক প্রকাশ্য প্রদর্শনী খুলে বসেছে। আর এই রেওয়াজ ক্রমশ সওদাগরদের দেহের শিরা এবং উপশিরায় নিবিড়ভাবে মিশে গিয়েছে। প্রথম প্রথম হাটে মালপত্র নিয়ে দরকষাকষি করে বিক্রি হত, তারপর নিজেদের মধ্যে আপসে রফা হত। আপসরফা হয়ে গেলে হাতের তালুতে রুমাল পেতে নিত। আর সেই রুমালের নীচে আঙ্গুল নাড়িয়ে নাড়িয়ে ইঙ্গিতে জানিয়ে দিত, কত দিলে চলবে। এখন আর রুমালেরও প্রয়োজন হয় না, খোলাখুলিই বেচাকেনা চলে। সওদাগরির সামান্যতম যে নিয়মকানুন তা মানুষ ভুলে বসে আছে। এই বেচাকেনা এই কারবার দেখে ‘বোকাশায়ো’-র গল্প মনে পড়ে যায়। ‘বোকাশায়ো’-তে এমনই এক বাজারের বা হাটের বর্ণনা আছে, যা মেয়েদের প্রকাশ্য কেনাবেচার বর্ণনা ছাড়া আর কিছু নয়। ‘উজবুকরা' নগ্ন নারীর সারা অঙ্গ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরখ করছে। আঙুল দিয়ে টিপে টিপে যখন পরখ করছে, সেখানে গোলাপি রঙের একটা টোল পড়ছে। আর সেই টোলের পাশ দিয়ে চক্রাকারে সাদা আর লালের মিলমিশ ঢেউ খেলে যাচ্ছে। পরখের পর পছন্দ না করে উজবুকরা চলে গেলে পরাজিত মেয়েরা অপমানের জ্বালা বুকে নিয়ে এক হাতে কোমরের দড়ি আর অন্য হাতে মুখ লুকিয়ে দীর্ঘনিশ্বাস ফেলে। কয়েক মুহূর্ত কেটে যাওয়ার পর পরাজয়ের যে গ্লানি, সেই গ্লানিও ধীরে ধীরে সরে যায়। নগ্ন দেহে তারা ‘সিকন্দরিয়া’ বাজারের জনবহুল পথ দিয়ে হেঁটে চলে । তারপর তারা আবার ‘ত্রাইসেরা’-র রূপে বিভূষিত হয়ে ওঠে। একজন তার বান্ধবী সায়সোকে বলে, ‘সায়সো, বলতো এ কী ধরনের নির্মম ঠাট্টা ! দেখ সামনের দেয়ালে কী লিখে রেখেছে:

“বাকিস থেরসাইটিসের জন্যে

শুধু দুটো ‘সিকি’ খরচ কর।”

ও আবার নিজেই অস্ফুটস্বরে উচ্চারণ করল, “মাত্র দুটি সিকির বিনিময়ে ... ?” সায়সো তখন বলল, “আমাদের নিয়ে ঠাট্টা করার অধিকার কোন পুরুষ মানুষের নেই। বাকিসের জায়গায় যদি আমার নাম লেখা থাকত, তবে আমি লেখাগুলো মুছে দিতাম ... ” বলতে বলতে ওরা মাত্র কয়েক পা এগিয়েছে, দেখল আর একটা দেয়ালে রেখা রয়েছে :

“নিদুসের সায়সো টায়মনের জন্যে

একটি রৌপ্য মুদ্রা ...”

মুহূর্তের মধ্যে সায়সোর মুখে একটি গোলাপি আভা খেলে গেল। ও দেয়াল-লিখনের কাছে এগিয়ে গিয়ে অপেক্ষা করতে লাগল। আর অন্যান্য মেয়েরা ঈর্ষা এবং বিদ্বেষভরা চোখে তার দিকে তাকাতে তাকাতে এগিয়ে গেল।

সুন্দরলাল অমৃতসরের সীমান্তে যাওয়ার জন্যে প্রস্তুতি নিচ্ছিল, এমন সময় খবর এল লাজো এসে গিয়েছে। খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে সুন্দরলাল হকচকিয়ে গেল। চৌকাঠের দিকে এক পা বাড়িয়ে দিয়ে ও আবার পিছিয়ে এল। মনে হচ্ছিল, কমিটির সমস্ত প্ল্যাকার্ড এবং পোস্টার বিছিয়ে এখনই বসে পড়ে এবং মন উজাড় করে খু-উ-ব কাঁদে। কিন্তু সবার সামনে এভাবে কান্না ও ঠিক মনে করল না। পুরুষের যে পৌরুষত্ব তা সে আবার নিজের মধ্যে ফিরিয়ে আনল, নিজের দুর্বলতাকে ছুঁড়ে ফেলে দিল তারপর নিজস্ব ঢঙে মাটিতে পা ফেলে ধীরে ধীরে চৌকি কলার দিকে এগিয়ে গেল এবং যেখান থেকে লুণ্ঠিতা মেয়েদের হাত-বদল করা হয়, সেখানে গিয়ে উপস্থিত হল সুন্দরলাল।

সামনেই লাজো দাঁড়িয়েছিল। অজানা এক আশঙ্কায় ও থরথর করে কাঁপছিল। সুন্দরলালকে তার চেয়ে ভালোভাবে কে চেনে বা জানে। বিয়ের পর থেকেই সুন্দরলাল ওর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করত। আর আজকে ও অন্য পুরুষের সঙ্গে জীবনের অনেকগুলো দিন কাটিয়ে এসেছে, না জানি আজ সে কি করে বসে ! সুন্দরলাল লাজোর দিকে তাকাল, দেখল পুরোপুরি মুসলমানি কায়দায় একটা ওড়না বুকের ওপর দিয়ে ঝুলিয়ে দিয়েছে। আর সেই ওড়নার বাঁ দিকটা বেশ খানিকটা নেমে গিয়ে দোল খাচ্ছে . এ হচ্ছে অভ্যেস, নেহাতই অভ্যেস..... পরবর্তী জীবনের যে অভ্যেস তার সঙ্গে ও নিজেকে কোনমতে খাপ খাইয়ে নিয়েছে। ও জানে, নিজে যে পিঞ্জরে আবদ্ধ তার থেকে উড়ে যাওয়া এমন কোন কঠিন ব্যাপার নয়। সুন্দরলালের কথা ও এত ভাবছিল যে, কাপড় এবং ওড়না ঠিক মতো পরতে ও একেবারে ভুলে গিয়েছিল। হিন্দু আর মুসলমানদের মধ্যে আদব-কায়দায় যে মূল পার্থক্য— আঁচলের ডান খুট আর বাঁ খুটের’তা বেমালুম ভুলে যায়। আর এই মুহূর্তে, সুন্দরলালের সামনাসামনি দাঁড়িয়ে ও আশা আর নিরাশার এক অজানা ভয়ে থরথর করে কাঁপছিল।

সুন্দরলাল যেন আচমকা এক ধাক্কা খেল। দেখল, লাজবন্তীর গায়ের রঙ আগের চেয়ে অনেক খুলেছে, আর গায়ে গতরে বেশ মাংস লেগেছে। না, শুধু স্বাস্থ্যবতীই হয়নি, বেশ মুটিয়ে গিয়েছেও। লাজোকে নিয়ে সুন্দরলাল যেমনটি যেমনটি ভেবেছিল, সবই তাহলে মিথ্যে। ও ভেবেছিল, দুঃখে শোকে লাজবন্তী একেবারে শুকিয়ে গিয়েছে, ওর গলার স্বরও বোধহয় মিহি হয়ে গিয়ে ওকে বোবা করে দিয়েছে। কিন্তু দেখে মনে হল ও পাকিস্তানে বেশ আনন্দেই ছিল। ওর এই রূপ সুন্দরলালের ভালো লাগল না । ও নিস্পন্দের মতো দাঁড়িয়ে রইল, কারণ ও আজ দিব্যি খেয়েছে। শুধু একটা ব্যাপারই ওর মাথায় ঢুকছিল না, পাকিস্তানে যদিও আনন্দেই থাকবে, তবে এখানে এল কেন? খুব সম্ভব ভারত সরকারের চাপে নিজের ইচ্ছের বিরুদ্ধে ও এখানে আসতে বাধ্য হয়েছে। ঠিক বুঝতে পারল না, ওর শ্যামবর্ণের ওপর এমন মসৃণতা কিভাবে এল, শুধু ক্লান্তি আর গ্লানির জন্যেই কি ওর দেহে মেদ হয়েছে—দুঃখের ভারে কি ও মুটিয়ে গিয়েছে, ওকে স্বাস্থ্যবতী বলে মনে হচ্ছে! কিন্তু এত মুটিয়ে গিয়েছিল ও যে, দু'পা হাঁটলেই ওর শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল।

লাজোর সঙ্গে প্রথম দৃষ্টি বিনিময় হতেই ওর ভেতরে এক অদ্ভুত ধরনের মানসিকতার সৃষ্টি হল, কিন্তু তবুও সে তার নিজের মতটাকেই আঁকড়ে ধরে রইল। আশেপাশে আরও অনেক দাঁড়িয়েছিল। কে যেন বলল :

“আমরা মুসলমানদের উচ্ছিষ্ট মেয়েদের নেব না ।”

কিন্তু রসালু নেকিরাম এবং চৌকি কলার বুড়ো মুহুরির স্লোগানের গমগম আওয়াজের নীচে ক্রমশ তা তলিয়ে গেল। কালিকাপ্রসাদের ফ্যাসফ্যাসে গলার যে চিৎকার তা অন্য আওয়াজ থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের ছিল। ও লম্বা লম্বা শ্বাস নিচ্ছে আর সমানে বলে চলেছে। এ হচ্ছে এক নতুন ধরনের বাস্তবতা—এ বাস্তবতা নতুন পরিস্থিতিতেই উদ্ভব হয়েছে। দেখে মনে হচ্ছে, আজ যেন ওরা নতুন বেদ নতুন পুরাণ আর নতুন শাস্ত্র পড়ে এসেছে। এবং ওরা যে লড়াই-এ অংশ গ্রহণ করেছে, সেই লড়াই-এ অন্যকেও শামিল করতে চাইছে।

অজস্র মানুষ এবং তাদের স্লোগানের আওয়াজে আবদ্ধ হয়ে লাজো আর সুন্দরলাল তাদের বাড়ির দিকে এগিয়ে চলল। এই শোভাযাত্রা দেখে হাজার বছর আগের কথা মনে হচ্ছিল, যেন রামচন্দ্র আর সীতা স্বেচ্ছা বনবাস পর্ব শেষ করে অযোধ্যায় ফিরছেন। আর অযোধ্যাবাসীরা সারা হৃদয় উজাড় করে প্রদীপ এবং মালায় সজ্জিত করে বহু দুঃখ-কষ্টের পর তাঁদের যে সাফল্য, সেই সাফল্যের জন্যে তাঁরা জনসাধারণকে অভিনন্দন জানাচ্ছে।

লাজবন্তী ঘরে ফিরে আসার পরও সুন্দরলাল আগের সেই একাগ্রতা নিয়ে এবং পরিশ্রমের সঙ্গে ‘হৃদয়ে স্থান দাও' আন্দোলন অব্যাহত রাখল। কিন্তু তা সত্ত্বেও আগের যে উদ্দীপনা তা অনেকটা থিতিয়ে গেল। সুন্দরলালের কথাগুলো অনেকের কাছে শুধু আবেগ সর্বস্ব বলে মনে হতে লাগল। ফলে তারা শক্তি হারিয়ে ফেলতে শুরু করল।

কিন্তু কে কী ভাবল বা করল তা নিয়ে সুন্দরলাল বাবু একেবারেই মাথা ঘামাত না। ওর হৃদয়ের যে অধিষ্ঠাত্রী দেবী সে ফিরে এসেছে –ওর হৃদয়ে যে ফাটল সৃষ্টি হয়েছিল তা বুজে গিয়েছে। সুন্দরলাল লাজোর স্বর্ণমূর্তি নিজের হৃদয়ে প্রতিষ্ঠা করে স্বয়ং সেই মন্দিরের দোর গোড়ায় বসে আরাধনা শুরু করে দিল। প্রথম প্রথম ভয়ে শঙ্কায় লাজো কুঁকড়িয়ে থাকত, কিন্তু সুন্দরলালের উদারতা দেখে ধীরে ধীরে পাপড়ি মেলতে লাগল ।

সুন্দরলাল লাজোকে আর ‘লাজো' বলে ডাকে না, বলে ‘দেবী' ।

আর লাজো এক অজানা আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে যেন মত্ত হয়ে উঠেছে। ওর ভীষণ ইচ্ছে, সুন্দরলালকে সমস্ত কিছু খুলে বলে। আর বলতে বলতে এমন অঝোরে কাঁদবে, কান্নার স্রোতে ওর সমস্ত অপরাধ সমস্ত পাপ ধুয়ে মুছে নির্মল হয়ে যাবে ।

কিন্তু সুন্দরলাল লাজোর কোন কথাই শুনতে বা জানতে আগ্রহী নয়। তাই লাজো তার পাপড়ি মেলতে মেলতে লজ্জায় সঙ্কুচিত হয়ে ওঠে। সে যেন এই লুকোচুরি খেলায় ধরা পড়ে যায়। সুন্দরলাল এর কারণ জিজ্ঞেস করলে ও ‘উহু’, ‘না’ ‘এমনি’ এর বেশি আর কিছু বলতে পারে না। সারাদিনের খাটাখাটুনির পর ঘরে ফিরে সুন্দরলাল ক্লান্তি আর অবসাদে ঝিমুতে থাকে।

প্রথম দিকে দু-একবার ‘দুর্যোগের দিনগুলির' কথা তুলে সুন্দরলাল জিজ্ঞেস করেছিল, “লোকটা কে?”

মাটির দিকে চোখ নামিয়ে লাজবন্তী উত্তরে বসেছিল, ‘জুম্মা’। তারপর সোজাসুজি চোখ তুলে সুন্দরলালকে সমস্ত কিছু খুলে বলতে চেয়েছিল, কিন্তু সুন্দরলাল এক অদ্ভুত ধরনের এক বিস্মিত দৃষ্টি নিয়ে লাজবন্তীর দিকে তাকিয়ে রইল আর ওর কালো, চুলের গভীরে আলতোভাবে আঙ্গুল দিয়ে বিলি কাটতে লাগল—লাজবন্তী লজ্জায় আবার চোখ নামিয়ে নিল। সুন্দরলাল তাকে জিজ্ঞেস করল, “কোন খারাপ ব্যবহার-ট্যাবহার করেনি তো ?

“না।”

“মারধোর করত ? ”

লাজবন্তী সুন্দরলালের বুকের ওপর মাথা রেখে বলল, “না”।

তারপর সে আবার বলল, “ও আমাকে কোনদিন গালিগালাজ বা মারধোর করেনি। কিন্তু ওকে দেখলেই আমার কেমন ভয় ভয় করত। তুমি আমাকে মারতে, কিন্তু তোমাকে দেখে আমার ভয় লাগত না। ... আমাকে এখন তো আর মারবে না ? ”

সুন্দরলালের চোখ ছল ছল করে উঠল। লজ্জায় আর ব্যথায় ও কঁকিয়ে উঠল, “না দেবী, তোমাকে আর কোনদিন মারব না। না, কোনদিন না।”

লজ্জাবতী মনে মনে উচ্চারণ করল, ‘দেবী'। দুচোখ ওর জলে টলমল করে উঠল।

এরপর লজ্জাবতী ওর সমস্ত কথাই সুন্দরলালকে খুলে বলতে চা‍ইল। কিন্তু সুন্দরলাল বলল, ‘পুরনো কথা ছেড়ে দাও। এর জন্যে তোমার কী অপরাধ? সমস্ত অপরাধ হচ্ছে আমাদের সমাজের—যে সমাজ তোমার মতো দেবীকে মর্যাদা দিতে নারাজ। এতে তোমার কোন ক্ষতি হবে না, ক্ষতি হবে এ সমাজেরই।”

লাজবন্তীর মনের কথা মনের মধ্যেই রয়ে গেল। কোন কথাই ও আর খুলে বলতে পারল না। শুধু মুখ বুজে ওর মুটিয়ে যাওয়া দেহের ওপর চোখ বোলাতে লাগল। দেশ ভাগের পর এই দেহ দেবীর শরীরে রূপান্তরিত হয়ে গিয়েছে—তা আর মানবী লাজবন্তীর শরীর নয়। ও সুখী, ও খুব আনন্দিত। এমন এক অদ্ভুত ধরনের আনন্দে ও আবিষ্ট, যাত্রার মধ্যে শঙ্কা এবং ভয় থরে থরে জমাট বেঁধে রয়েছে। আনন্দ আর খুশিতে থাকতে থাকতে ও অনেকবার চমকে উঠে বসেছে, কে যেন পা টিপে টিপে আসছে। আর সেই পায়ের শব্দে কান খাড়া রেখে আগ্রহে অপেক্ষা করেছে।

তারপর অনেক—অনেক দিন কেটে গিয়েছে, খুশি আর আনন্দের জায়গায় দুঃখ এসে বাসা বেঁধেছে। সুন্দরলাল আবার তার পুরানো পশুত্ব জাহির করছে বলে এই দুঃখবোধ আসেনি। বরং ও লাজোকে খুব আদর আর ভালোবাসতে শুরু করেছে। যে আদর আর ভালোবাসায় লাজো একেবারেই অভ্যস্ত নয়। লাজো আবার সুন্দরলালের সেই পুরনো লাজো হতে চায়—সামান্য কারণে যে তুমুল লড়াই ঝগড়া এবং পরমুহূর্তে ভাব করত। কিন্তু এখন আর লড়াই ঝগড়ার জন্যে তার মন উশখুশ করে না। সুন্দরলাল তার ভেতরে এমন এক অনুভূতির সৃষ্টি করে দিয়েছে যেন সে কাঁচের আসবাব, ছুঁলেই ভেঙ্গে চৌচির হয়ে যাবে।... লাজো আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে নিজের আপাদমস্তক নিরীক্ষণ করতে থাকে—নিরীক্ষণ করতে করতে তার মনে হয় সে আর সব কিছুই হতে পারে, কিন্তু কোন দিন আর লাজো হয়ে উঠতে পারবে না। ও আশ্রয় পেয়েছে সত্য, কিন্তু মনে হল ও আশ্রয়হীন –ছন্নছাড়া। ওর চোখের যে প্রবাহিত জলের ধারা, ওর যে দীর্ঘশ্বাস তা দেখার মতো দৃষ্টি বা শোনার মতো শ্রবণেন্দ্রিয় সুন্দরলালের একেবারেই ছিল না। মহল্লা মুল্লা শকুরের সবচেয়ে যে বড় সংস্কারক, সে নিজেই জানে না— হৃদয় কত কোমল, কত স্পর্শকাতর। .... প্রভাতফেরি বের হয়েছে, রসালু আর নেকিরামের কণ্ঠে কণ্ঠে মিলিয়ে সুন্দরলাল যন্ত্রে ঘড় ঘড় আওয়াজের মত গেয়ে চলেছে । -

“হথ লাঁয়া কুমলান নী লাজবন্তী দে বুটে..... ।

অধ্যায় ১৯ / ১৯
সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%