কমলেশ সেন
রমেশ চন্দ্র সেন
রমেশ চন্দ্র সেনের জন্ম অধুনা বাঙলা দেশের বরিশাল জেলায় ৷ ছাত্ৰ জীবন শুরু হয় টোলে। প্রাইভেটে ম্যাট্রিক পাশ করেন। কিছু দিন কলেজে পড়েন। উত্তরাধিকার সূত্রে কবিরাজি ব্যবসা শুরু করেন। এই বৃত্তির জন্যে তাঁকে গ্রাম-গঞ্জে ঘুরতে হয়। আর আসেন অজস্র মানুষের সংস্পর্শে। তাঁর প্রথম উপন্যাস ‘শতাব্দী’নিয়েই তিনি সাহিত্য ক্ষেত্রে পদার্পণ করেন। এপিকের সমস্ত গুণাবলীই শতাব্দী তে আছে। ‘কাজল’— তাঁর শ্রেষ্ঠ উপন্যাস, ‘ইয়ামা দি পিটের’সমতুল্য। ‘সাদা ঘোড়া’,‘কোষ্টা কি পাশা,’বাংলা সাহিত্যে দুর্লভ সংযোজন ।
দাঙ্গার সময়ের একটি ঘটনা।
ক্রমান্বয়ে কয়েকদিন রক্তস্নানের পর কলিকাতার অবস্থা একটু শান্ত হইয়াছে। হিন্দু ও মুসলমান নিজ নিজ পল্লীতে কিছুটা নিঃসংকোচে বাহির হয়। কিন্তু কেমন যেন থমথমে ভাব।
একদিন বৈকালে শূন্য ঠিকাগাড়ির স্ট্যাণ্ডে সাদা একটি ঘোড়া দেখা গেল। ধবধবে সাদা, শরীরের কোথাও একটা দাগ পর্যন্ত নাই। চামরের মতন তার সুন্দর ল্যাজের গোছার উপর রোদ ঝলমল করে।
প্রাণীটি যেন পথভোলা এক পথিক। এ পাড়ায় আগে কেহই তাকে দেখে নাই । আশ্রয় হারাইয়া, আশ্রদাতাকে হারাইয়া ঘুরিতে ঘুরিতে এইখানে আসিয়া উপস্থিত হইয়াছে। ক্ষুধার জ্বালায় খালি রাস্তা শোঁকে। তার নিঃশ্বাসে নিঃশ্বাসে পথের ধুলা ওড়ে। কিন্তু বেচারি কোথাও কিছু পায় না। শুধু আবর্জনার দুর্গন্ধময় স্তূপ শুঁকিয়া শুঁকিয়া মুখ ফিরাইয়া নেয় ।
জানালা দিয়া দেখিয়া শীলার মা বলিলেন, আহা বেচারি হয়তো কিছুই খেতে পায় না। সইস কোচোয়ান ফেলে পালিয়েছে।
তাঁর নববিবাহিতা মেয়ে শীলা কাছেই দাঁড়াইয়াছিল। সে বলিল, কেউ হয়তো তাদের মেরে ফেলেছে।
অ্যা—শীলার মার মুখখানা একেবারে কালো হইয়া যায় ৷
এই মহিলা কয়দিনে একটা মৃত্যুও দেখেন নাই। কিন্তু নিজের চোখে দু-একটা নৃশংস ব্যাপার ঘটিতে দেখিয়াছেন। আর হত্যার কাহিনি শুনিয়াছেন অজস্র, হত্যা এবং হত্যার চেয়েও নির্মম।
শুনিয়া শুনিয়া গা ঘিনঘিন করে, অরুচি হয়। আসে অনিদ্রা। তবুও মানুষ যে এত নৃশংস হইতে পারে তিনি তাহা বিশ্বাস করিতে চান না। বলেন, সইস কোচোয়ান বেঁচে থাকতেও তো পারে ।
দাঙ্গা-বিধ্বস্ত পল্লিতে সাদা এই জানোয়ারটা যেন নতুন প্রাণের সঞ্চার করিল তাকে লইয়া ছেলের দল মাতিয়া উঠিল ।
একেবারে ছোটরা দূর হইতে দেখিয়াই খুশি হয়। বড়রা তার গায়ে হাত বুলায় । ঘাড়ে হাত দিলে ঘোড়াটাও আনন্দে চিঁহি চিঁহি করে।
তাকে লইয়া জল্পনা চলে নানা রকম। প্রায় সকলেই সিদ্ধান্ত করে, কোন রাজার কিংবা জমিদারের ঘোড়া হইবে। তারপরেই ওঠে খাদ্যের কথা, বড়লোকের ঘোড়া কী খায়, খায় কতটা পরিমাণ। একজন বলে, জানিস, ওরা মদ খায়, বিলিতি মদ !
নন্তে মন্তব্য করে, মদ না খেলে আর অত তেজী হয় ?
একটি ছেলের দুর্বুদ্ধি হইয়াছিল। সে বলিল, ঘোড়াটা সম্ভবত ছেকরা গাড়ির। সঙ্গে সঙ্গেই হাসির রোল ওঠে। নন্তে বলে, কত ঘোড়াই না তুই দেখেছিস। তোদের বিলেন দেশে জুড়ি -চৌঘুড়ি চলে কিনা ।
এই আলোচনার মধ্যেই ঘোড়ার মুখে দড়ির লাগাম পরাইয়া যমুনাপ্রসাদ তার পিঠে চাপিয়া বসিল । হাতে নিল একখানা ছোট্ট ছড়ি।
ছেলেটির বয়স বাইস-তেইশ, কালো রং। ছিপছিপে গড়ন। গায়ে একটা গেঞ্জি সে বায়োস্কোপের টিকিট কিনিয়া বুকিং ঘরের সামনে দাঁড়াইয়া চড়া দামে সেই টিকিট বেচে। ফুটপাতের উপর জুয়া খেলিয়া আধ ঘণ্টার মধ্যে লাভের কড়ি উড়াইয়া দেয় । কিছু অবশিষ্ট থাকিলে খাঁটি খাইয়া চিল্লাচিল্লি করে।
কিন্তু দাঙ্গার এই কয়দিনে সে বেশ লোকপ্রিয় হইয়া উঠিয়াছে। যখনই পল্লি বা নিকটের দেবমন্দির আক্রান্ত হয় তখনই সর্বাগ্রে শোনা যায় যমুনার কণ্ঠস্বর। সে সকলের আগে আগে ছুটিয়া চলে।
গোরা সৈন্যদের চা ও সিগ্রেট খাওয়াইয়া যমুনা তাদের সঙ্গেও বেশ ভাব করিয়া ফেলিয়াছে। ছেলেরা তাকে ডাকে—মিলিটারি টি ক্যান্টিন।
কিন্তু এই দুই দিন আর কিছু করার তার অবকাশ হয় নাই। প্রায় সব সময়ই ঘোড়ার উপর থাকে। বলে, হাম সার্জিন বন গিয়া ।
ছেলের দল তার পিছন পিছন ছোটে। দু-একবার কেহ হয়তো বলে, তুমি নেমে পড় যমুনা, এবার আমরা উঠি।
যমুনা কোন জবাব দেয় না, ভ্রূক্ষেপ করে না। শুধু তালুতে জিভ ঠেকাইয়া শব্দ করে টক্ টক্ ।
হাবুল বলিল, বাঃ রে, তুমি ঘোড়ায় চড়বে আর আমরা বসে বসে দেখবো? তা হবে না।
যমুনা বলে, যা, মোড়ের দুকানসে পান ঔর সিগ্রেট লিয়ে আয়, তারপর চড়বি। পয়সা ? হামার নাম করবি। বলবি যোমনা পারসাদ মাংছে।
মিনিট দুই-তিন পরে হাবুল ফিরিয়া আসিয়া বলিল, দিলে না। বললে, পৈসা লে আও।
শালা ভেড়ীকা বাচ্চা। শালার দুকান বাঁচিয়েছিলাম, জুয়াসে ভি কত পৈসা নাফা করল। আভি পানকো ওয়াস্তে দোঠো পয়সা মাংছে—বলিয়া যমুনা পানের দোকানের দিকে ঘোড়াটা চালাইয়া দিল। হাবুলের আর ঘোড়ায় চড়া হইল না ।
অন্যবার এই সময়ে ছেলেরা সার্বজনীন পূজামণ্ডপে ভিড় করে। পটুয়া খড় দিয়া কাঠামো গড়ে, মাটি ছানে, কাঠামোয় মাটি দেয়। ছেলের দল দাঁড়াইয়া দাঁড়াইয়া দেখে । টুকিটাকি জিনিসপত্র আগাইয়া দিয়া পটুয়াকে সাহায্য করিয়া কতই না আনন্দ পায় ।
এবার এখনও মণ্ডপ ওঠে নাই, ছেলেরা সারাদিন ঘোড়াটাকে লইয়া ব্যস্ত। তারা তার নাম দিয়াছে চাঁদ।
চাঁদের রঙের ঔজ্জ্বল্য ও কান্তি দিনের পর দিন ম্লান হয়। সে পা টানিয়া টানিয়া চলে। পিছনের বাঁ পায়ে ছোট্ট কিন্তু দগদগে একটা ঘা।
শীলের বাবা হৃষীকেশ বাবু পাড়ার প্রবীণ লোক, ছেলেদের মুরুব্বি স্থানীয়। তিনি হাবুলকে জিজ্ঞাসা করিলেন, ঘোড়াটাকে খেতে দিস্ তো রে ?
হাবুল বলিল, নন্তেদা দিয়েছে বোধ হয়।
নন্তেকে প্রশ্ন করিলে সে কহিল আমি তো জানি না। যমুনা বলতে পারে ।
স্বামীর নিকট ব্যাপার শুনিয়া শীলার মা ছেলে সন্তুকে দিয়া বাড়ির নিচের দোকান হইতে কিছু ভুষি কিনিয়া পাঠাইয়া দিলেন। ঘোড়াটা অল্প একটু মুখে তুলিয়াই আর খাইল না। সন্তুর বন্ধু খোকন বলিল, চাঁদের গলায় আটকে গেছে। আয় জল নিয়ে আসি ।
দুইজনেই জল আনিল, কিন্তু একজনের ভাঁড়ের মুখ ছোট হওয়ায় এবং অপরের মগের তলায় ছেঁদা থাকায় ঘোড়াটার আর জল খাওয়া হইল না।
হাতের কাছে অন্য পাত্র না পাইয়া বালক দুটি পাশের চায়ের দোকান হইতে একখানা ভাঙা ডিশে খানিকটা চা আনিয়া বলিল, খা, চাঁদু খা। গোকুলের চা খুব ভাল, খেয়ে দেখ ।
কিন্তু গোকুলের চায়ের মাহাত্ম্য চাঁদকে মোটেই আকৃষ্ট করিতে পারিল না। দু-একবার ডিশ শুঁকিয়াই সে মুখ ফিরাইয়া নিল।
ঘোড়াটা আরও রোগা হইয়া গিয়াছে, কেমন যেন জবুথবু ভাব! ঘায়ের অবস্থাও আগের চেয়ে খারাপ। কিন্তু যমুনার চড়ার বিরাম নাই। হৃষীকেশ তাকে কহিলেন, ঘোড়াটাকে একটু রেহাই দিও যমুনা, নইলে যে মরে যাবে।
যমুনা মদ খাইয়া বুঁদ হইয়াছিল। সে আধা-হিন্দি আধা-বাংলায় যাহা বলিল তার সারাংশ এই—যেখানে হাজার হাজার মানুষ মরিল সেখানে সামান্য একটা জানোয়ারের জন্য আর দুঃখ করা কেন? – বলিয়াই হাসিল, শাণিত ছুরির ফলার মতন তীক্ষ্ণ ক্রুর হাসি । -
সন্ধ্যার সময় ছেলেদের সাহায্যে হৃষীকেশ ঘোড়াটাকে সামনের ফাঁকা গ্যারেজে তুলিয়া দিলেন, সঙ্গে দিলেন এক বালতি জল আর কিছু বিচালি। সবেমাত্র তাঁরা বাহিরে আসিয়াছেন এমন সময় চলমান লরি হইতে শান্তি-রক্ষীর দল ফুকারিয়া গেল, ভিতরে যাও, ভিতরে যাও।
পরদিন সকালে দেখা যায়, গ্যারেজে তালা লাগানো, দরজার পাশেই হৃষীকেশের বালতি, অদূরে ঘোড়াটা নিস্পন্দভাবে দাঁড়াইয়া। চোখে একটু দীপ্তি নাই, লেজ নাড়াইয়া মাছি তাড়াইবারও শক্তি নাই। মনে হয় এখনই পড়িয়া যাইবে।
সপ্ত তাড়াতাড়ি চারটি ছোলা আনিয়া দিল। চাঁদ তাহা মুখে তুলিল না । নন্তে বলিল, দে তো সন্তু, দেখি আমার হাতে খায় কি না। অনেক ঘোড়াকে আমি খাইয়েছি। জানিস, আমাদের ঘোড়ার গাড়ি ছিল?
কিন্তু মূক প্রাণীটি তার এই আত্মবিশ্বাসেও আঘাত করিল! নন্তে বলিল, রোগটার সিরিয়সিটি দেখছি খুবই।
শীলার মা দুঃখ করিতে লাগিলেন, আহা বেচারার দেখছি দাঁড়াবার ক্ষ্যামতা নেই । কিন্তু একবার শুলে আর উঠবে না।
শীলা জিজ্ঞাসা করে, ঘোড়া নাকি দাঁড়িয়ে ঘুমোয় ?
হৃষীকেশ বলিলেন, কে বললে? আট-দশ দিন বাদে ওরাও একবার গড়িয়ে নেয়।
বেলা দশটা। কড়া রোদ যেন গায়ে চাবুক মারে। চাঁদ ছটফট করে, ছেলেরা তাকে ধীরে ধীরে হাঁটাইয়া টেবুদের গাড়িবারান্দার তলায় লইয়া যায়। নন্তে তাদের আশ্বাস দেয়, সাদা জানোয়ারগুলোর রোদ সহ্য হয় না। ওতে ভয়ের কিছু নেই ।
এই সময় বড় রাস্তার মোড়ে বেঁটে খাটো একটি মানুষের আবির্ভাব হয় । এদিক ওদিক চাহিয়া লোকটি রাস্তায় ঢোকে। একগাল পাকা গোঁফ-দাঁড়ি, খালি গা, পরনে ময়লা লুঙ্গি, মাথায় ফেজ, হাতে টিনের মগ। মগটা রোদের চকচক করিতেছিল।
এমনিতেই সে দৃষ্টি আকর্ষণ করিত। তার উপর এই সময় এই পাড়ায় তাকে দেখিয়া সকলেই মুখ চাওয়া-চাওয়ি করিতে লাগিল, হৃষীকেশবাবু বলিয়া উঠিলেন, ইশ, ও এখন এ পাড়ায় এল কেন?
কিন্তু লোকটির কোন দিকেই ভ্রূক্ষেপ নাই। সে কী যেন খোঁজে, দীর্ঘ পথের উপর বার দুই চোখ বুলাইয়া নেয় ৷
প্রথমে লক্ষ করে নাই, একটু পরে সাদা ঘোড়াটিকে দেখিয়া তার চোখ যেন জ্বলিয়া ওঠে। দ্রুতপদে কাছে যাইয়া তার গায়ে গায়ে হাত বুলাইতে বুলাইতে বৃদ্ধ তাদের দেশি ভাষায় বলে, আঃ সুরাব, তোর এমন দশা হয়েছে !
পরিচিত এই স্পর্শে প্রাণীটি চঞ্চল হইয়া ওঠে। সেও চোখ তুলিয়া চায় । মানুষের চাহনির মতন অর্থপূর্ণ সেই দৃষ্টি অনেক কিছুই প্রকাশ করে। ভাষায় হয়তো ততটা বলিতে পারিত না।
বুদো ভাঙা হিন্দিতে জিজ্ঞাসা করিল, এর নাম বুঝি সোরাব ? আমরা ডাকি চাঁদ ।
বৃদ্ধ সহিস কহিল, উ তো একই হ্যায় ।
নন্তে জিজ্ঞাসা করিল, ঘোড়াটা তোমার?
না বাবু, ভাড়াগাড়ির ঘোড়া। আমি সইস। সইস কোচোয়ান দুইই।
নন্তে বলিল, তার মানেই তোমার ঘোড়া।
ঠিক হ্যায়—বলিয়া বৃদ্ধ একটু হাসে। তারপর কল হইতে মগটায় জল ভরিয়া আনিয়া ঘোড়ায় মুখের কাছে ধরে। ঘোড়াটা জলটুকু নিঃশেষে খাইয়া ফেলিলে ছেলের দল চীৎকার করিয়া ওঠে, জয় হিন্দ !
সইস লুঙ্গির ভিতরে গোঁজা একটা ঠোঙায় ছোলা আনিয়াছিল। সেই ছোলা সে ঘোড়াটাকে হাতে করিয়া খাওয়াইল। ছোলা ফুরাইয়া গেলে ছেলেদের বলিল, ঔর চারঠো দানা মিলেগা বাবু ?
জরুর—বলিয়া নন্তে ছুটিল। সঙ্গে ছুটিল হাবুল ও গবার দল। একসঙ্গে ছোলা আসিল চার ঠোঙা।
জানোয়ারটা আর-একটু চাঙা হইলে বৃদ্ধ বলিল, বেমার হলে সোরাব আমার হাতে ছাড়া খায় না ৷
তার মনে পড়িল অনেক কথা, ঘোড়াটাকে কত টাকায় কেনা হইয়াছিল, তার বয়স তখন কত, কয়টা দাঁত উঠিয়াছিল, এইসব।
সোরাবের চলন দেখিয়া লোকে তাকে জিজ্ঞাসা করিত, বাজি জিতিবার এই ঘোড়াটাকে সে ঠিকাগাড়িতে জুড়িয়াছে কেন ?
নিজের কপালে হাত ছোঁয়াইয়া সে উত্তর করিত, নসিব! মানুষের মতন জানোয়ারেরও নসিব আছে কিনা।
একটু পরে সে হৃষীকেশকে প্রশ্ন করিল, কব সব ঠাণ্ডা হোবে বড়বাবু? ফিন ঠিকাগাড়ি চালু হোবে ? রাস্তামে ডর-উর কুছ থাকবে না ?
লোকটি আগের মতন শান্তিপূর্ণ দিনের কথা ভাবিতেছিল। হৃষীকেশ তার প্রশ্নের কোন উত্তর খুঁজিয়া পাইলেন না।
হঠাৎ যেন দানবের নিদ্রাভঙ্গ হয়। অদূরে চৌরাস্তার মোড়ে সে আড়মোড়া ভাঙে। ঝঞ্ঝার বেগে খবর ছুটিয়া আসে লালপট্টিতে খুনোখুনি শুরু হইয়াছে। খালের মধ্যে নদীর বেনো জলের মতন বড় রাস্তার জনস্রোতের একটা অংশ হু-হু করিয়া এই রাস্তায় ঢুকিয়া পড়ে। আরম্ভ হয় ছুটাছুটি, কলরব, মার মার শব্দ।
বুড়া সহিস এদিক ওদিক চায়, এক-একবার ছেলেদের মুখের দিকে তাকায়। সোরাবের চোখেও ফুটিয়া ওঠে অপরূপ করুণ দৃষ্টি, হয়তো সে তার পালকের বিপদ বুঝিতে পারে।
নন্তে সহিসকে বলে, কিছু ভয় নেই তোমার।
কিন্তু অপরিচিত শত শত হিংস্র চোখের সামনে সহিস কেমন যেন ভরসাও পায় না। কয়েকটি লোক আগাইয়া আসে। যমুনা নন্তে হাবুল প্রভৃতি তরুণের দল বৃদ্ধের চারধারে কর্ডন দাঁড়ায়। হৃষীকেশ আক্রমণকারীদের শান্ত করিবার চেষ্টা করেন। বলেন, এ একটা নিরীহ লোক, ওকে মারবেন না ।
জনতার মধ্যে হইতে নানা ভাষায় প্রতিবাদ আসে, মানুষ নেই, উ শয়তান আছে। এর মধ্যে মেটিয়াবুরুজ ভুলে গেলেন মশায় ?
টুথ ফর এ টুথ্ ।
হৃষীকেশ বলিলেন, কত জায়গায় ওরা আমাদের বাঁচিয়েছে জানেন ?
আমরাও ঢের বাঁচিয়েছি। ওসব ছেঁদো কথা ছেড়ে দিন ।
বুঝাইবার চেষ্টা বৃথা, তর্ক করা শুধু নিরর্থক নয়, ক্ষতিকরও বটে। তাই যমুনা আর নন্তে বলে, “চুপ করুন কাকাবাবু,” বলিয়াই দুজনে বুক ফুলাইয়া দাঁড়ায়। যমুনা বলে, “আও, মারনেওয়ালা কোন্ হ্যায়, আও । ”
একটি ছোকরা চেঁচাইয়া উঠিল, আমাদের সাদা ঘোড়ার সইসকে, আমাদের চাঁদের সইসকে কেউ মারতে পারবে না।
জনতা একটুক্ষণ স্তব্ধভাবে দাঁড়াইয়া থাকে। তারপরই আবার কলরব শুরু হয় । ছেলেদের গায়ে ঢিল পড়ে।
এই সময় মোড়ের চারতলা বাড়ির ছাদে একজন চিৎকার করিয়া ওঠে, মিলিটারি আ গিয়া ।
আরম্ভ হয় দৌড় প্রতিযোগিতা। আশেপাশের গলিঘুঁজি, খোলা দরজা যে যেখানে সম্ভব ঢুকিয়া পড়ে। বৃদ্ধ সহিসকে পাঁজাকোলা করিয়া যমুনাপ্রসাদ হৃষীকেশের বাড়ির মধ্যে ছুটিয়া যায় ।
গুম গুড়ম গুম্।
গাড়ি হইতে নামিয়া সৈনিকেরা রাজপথে টহল দেয়। তাদের জুতার শব্দ ভিন্ন সারাটা পল্লিতে আর কোনও শব্দ নাই।
সে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা, দরজা জানালা বন্ধ । জানালার খড়খড়ি ফাঁক করিয়াও কেহ কৌতূহল নিবৃত্তি করিতে ভরসা পায় না। সবারই মুখে অজানা উদ্বেগের ছাপ ।
ঘণ্টাখানেক পরের কথা।
প্রথমে বাহির হয় নন্তে আর যমুনাপ্রসাদ। পিছনে বৃদ্ধ সহিস। দরজা খুলিতেই তাদের চোখে পড়ে রৌদ্রদগ্ধ রাজপথের রিক্ত রূপ, যেন মহাশশ্মান।
বাঁ দিকে মুখ ফিরাইয়া তিনজনেই শিহরিয়া উঠে।
এ কী! ঘোড়াটা পথে পড়িয়া আছে। কালো পিচের মধ্যে তার সাদা রঙ আরও খুলিয়াছে। দেহ পথের উপর, মাথাটা ফুটপাথে। ডান কানের পাশে গোল একটা ক্ষতচিহ্ন।
বুড়া সহিস ডাকিল, মেরা সোরাব ।
সোরাব কোনও উত্তর করিল না। বুদ্ধের ডাকে সোরাবের সাড়া না দেওয়া এই প্ৰথম ।
সোরাব তখন আকাশের দিকে চাহিয়া আছে। হীরকস্বচ্ছ আকাশেরই মতো নির্মল দৃষ্টি; সে চাহনিতে কোনও বেদনা নাই, গ্লানি নাই। হৃষীকেশও পাশে আসিয়া দাঁড়াইয়া ছিলেন। ঘোড়াটার চোখের দিকে চাহিয়া তিনি একটা চাপা দীর্ঘ নিশ্বাস ত্যাগ করিলেন।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন