কমলেশ সেন
দর্শক
দর্শক উনিশ শ' বত্রিশ সালে হিমাচল প্রদেশের উনা জেলায় জন্ম গ্ৰহণ করেন। গ্রামের নাম বাথু। খুবই পশ্চাদপদ গ্রাম বাথু। অধিকাংশ জমির মালিক রাজপুতেরা। অত্যাচার এবং শোষণ এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা। দারিদ্র্যর সঙ্গে প্রতিনিয়ত সংগ্রাম করে তাঁকে লেখাপড়া শিখতে হয়। ম্যাট্রিক পাশ করার পর পড়াশোনা ত্যাগ করে চাকুরির খোঁজে বেরিয়ে পড়েন। প্রাইভেটে তিনি ইন্টার পাশ করেন। উনিশ শ’ চুয়ান্ন সালে উর্দু ‘মিলাপে’ তাঁর প্রথম গল্প ‘খুদা সে বেহতর হ্যায় ইনসান' প্রকাশিত হয় ৷ ছোট গল্পকার হিসেবে তিনি বিশেষভাবে সমাদৃত। যে নির্যাতিত শ্রেণি থেকে তিনি উঠে এসেছেন সেই শ্রেণি, সচেতনভাবে তাঁর গল্পে বিচরণ করেছে। “ভটকা হুয়া মুসাফির' তাঁর একমাত্র উপন্যাস। গল্পগুলির মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে উপহার’, ‘তেল কা কনস্তার’,‘কংকাল’,‘পতিতা' ।
বাড়ির পেছন দিকের যে প্রাচীর তা এখনও দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর প্রাচীরের ওপর বসানো কাচের টুকরোগুলো ঝকমক করছে। বাড়ির মালিক ফিরোজ খাঁ। ফিরোজ খাঁ দেখতে সাধারণ, হৃষ্টপুষ্ট, আধবুড়ো। পেন্সনপ্রাপ্ত সৈনিক। নিজের এবং আশপাশের গ্রামে সে ‘মোল্লা’নামে পরিচিত। একটি মেয়ে আছে, মেয়েটির বিয়ে হয়ে গিয়েছে। এখন তার জীবনে কাজ কেবল দুটি, লালা মিলখিরামের দোকানে বসে পাশা খেলা আর কোরানশরিফ পড়া ফিরোজ খাঁর বাড়ির গায়েই রলা খাঁর বাড়ি। দেখতে লম্বা, ছাঁটা সাদা দাড়ি । বৃদ্ধ । খুবই শরিফ আদমি। মিষ্টি, হাসি-খুশি। ঘোড়াতে মাল বওয়ার কাজ করে।
রলা খাঁর বাড়ির সামনেই দু'ভাই—বরকত আলী আর এনায়েত খাঁ থাকে। বরকত আলী কাশির রোগী। এনায়েত খাঁ খেতমজুর।
রলা খাঁর বাড়ি ছাড়িয়ে একটু বাঁয়ে এগিয়ে গেলে উটওয়ালা নিক্কা খাঁর বাড়ি । আর নিক্কা খাঁর বাড়ি ছাড়িয়ে একটু ওপরের দিকে উঠে গেলে সাহাবদিনের বাড়ি। সাহাবদিন পাঠান। দীর্ঘদেহী। খুব ফর্সা আর বলিষ্ঠ। লাল-লাল চোখ। নীচের দিকে ঝুলে পড়া লম্বা গোঁফ। ওরা খুব পর্দানশিন, স্ত্রীও দেখতে খুবই সুন্দরী। এত সুন্দরী আমি জীবনে দেখিনি।
এই বাড়িগুলোর পরেই বিরাট এক খোলামেলা চত্বর। চত্বরের চারদিকে ঝুপড়ি। ঝুপড়িগুলোয় আর চত্বরে গোরু মোষ বাঁধা থাকে। ... এই চত্বরেই নুরার সঙ্গে আমার পরিচয়।
তখন আমার বয়স বড় জোর বছর বারো। প্রায় সময়েই অসুস্থ থাকতাম। গ্রহ-শান্তি করার জন্যে পণ্ডিতমশায় উপদেশ দেন, সারা বছর ধরে প্রতি মঙ্গলবার একুশটি গোরুকে নিজের হাতে করে ঘাস-পাতা খাওয়াতে হবে।
গ্রামে খুব বেশি হলে দুশটি পরিবারের বাস। এর মধ্যে দেড়শ পরিবারই ব্রাহ্মণ, রাজপুত আর বেনে। আর এই দেড়শ পরিবারে খুব বেশি হলে পাঁচটার বেশি গোরু ছিল না। কিন্তু মুসলিম পরিবারগুলোতে গোটা বিশেকের মতো গোরু ছিল।
গোরুকে ঘাস-পাতা খাওয়ানোর জন্যে আমি এখানে আসতাম।
গোরুর লম্বা-লম্বা শিংগুলোকে আমি ভীষণ ভয় পেতাম। ভয়ে সিঁটিয়ে যেতাম। এমন সময়, খুব বেশি হলে বছর দশেক বয়েসের ডল-পুতুলের মতো দেখতে একটা মেয়ে এসে বলল, “এই যে বীরপুরুষ, আমাকে দাও, খাইয়ে দিচ্ছি।”
“না, তোমাকে দেব না। মা নিজের হাতে খাইয়ে দিতে বলেছে।”
“বেশ, আমি সামনে দাঁড়াচ্ছি, তুমি খাইয়ে দাও।”
আমি ওকে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার ভয় করে না।” ডল পুতুলের মতো মেয়েটি মাথা নাড়িয়ে জানাল, না। ঘাস-পাতা খাওয়ানো হয়ে গেলে আমি মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করলাম, “তুমি রলা খাঁর মেয়ে না ?”
ও আবার মাথা নাড়িয়ে জানাল, “হ্যাঁ”
বললাম, “আমি প্রতি মঙ্গলবার এসে গোরুকে খাইয়ে যাব।”
ছোট্ট সুন্দর মাথাটি দুলে উঠল। চোখ আর মাথা দুলিয়ে নীরব ভাষার কথা বলার নুরার বৈশিষ্ট্য। ওর মাথা দোলানোর মধ্যে একটা অদ্ভুত সুন্দর ব্যঞ্জনা ছিল।
বর্ষা এলে গ্রামের চারদিক ঘেরা পাহাড় বহুদূর পর্যন্ত সবুজ ঘাসে ছেয়ে যেত। হাওয়ায় ঘাসগুলো যখন দুলত, মনে হত যেন একটা সবুজ সমুদ্রে ঢেউ বয়ে চলেছে! এই সময় লাল ভেলভেট রঙের বীরবহুটি পোকায় চারদিক ছেয়ে যেত। নদীনালা টইটম্বুর হয়ে উঠত। আর ছোট ছোট ছেলেমেয়েরা তাতে সাঁতার কাটত।
বর্ষার সময় স্কুল বন্ধ থাকত। বন্ধ থাকত বলে সেই সময় আমি বনে জঙ্গলে মোষ চরিয়ে বেড়াতাম।.... সেই বছর আমি আর নুরা একসঙ্গে মোষ চরিয়েছি।
দিনের পর দিন দিন কাটতে লাগল। আমি আর নুরা ক্রমেই ঘনিষ্ঠ থেকে ঘনিষ্ঠতর হতে লাগলাম। আমরা যেন আপন ভাই-বোনের মতো হয়ে উঠলাম। নুরা দেওয়ালী-দশহরা-হোলির উৎসবে আমার সঙ্গে মজে যেত, আর আমি নুরার সঙ্গে ঈদ-মহরমে জুটে যেতাম ।
আমাদের দু পরিবারও ক্রমে ঘনিষ্ঠ হয়ে উঠেছিল। রলা খাঁ নুরার বিয়ের সম্বন্ধ নিয়ে আমার বাবার সঙ্গে শলা পরামর্শ করত। আর মা আমার পড়াশোনা নিয়ে নুরার সঙ্গে আলোচনা করত ।
‘বীরপুরুষ বি.এ.-তে ফার্স্ট হলে আমি পীরের দরগায় শিরনি দেব,' বলতে বলতে নুরার সারা মুখ-চোখ আনন্দ আর মমতায় ভরে উঠত।
ইংরেজ সরকার সাম্প্রদায়িকতার যে আগুন উসকিয়ে দিয়েছিল, তা অনুকূল হাওয়ায় ফুলে উঠল। সারা দেশ দাউ দাউ করে জ্বলতে লাগল । হাজার হাজার বছর ধরে যে মানবিক গুণগুলো অর্জিত হয়েছিল সেসব ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে মানুষ শয়তানে পরিণত হল। শয়তানের চেয়েও ক্রূর হয়ে উঠল। ... লুটতরাজ, হত্যা, বলাৎকার—এমন সব ঘৃণিত কাজ করল, যে কাজ দেখে শয়তানও লজ্জায় মুখ ঢাকল। খুব আশ্চর্যের কথা, সমস্ত অপকাজই করা হয়েছে ঈশ্বর অথবা আল্লার নামে আর এই লুটতরাজ-হত্যা-বলাৎকারে নেতৃত্ব দিচ্ছিল একদল গোঁড়া ধর্মান্ধ মানুষ ৷
আমাদের এলাকার আবহাওয়া গরম হয়ে উঠলে, গ্রামের তরুণরা ‘ললারি' মহল্লা রক্ষার জন্যে দিনরাত পাহারা দিতে লাগল । তবুও অল্প কয়েকদিনের মধ্যেই অবস্থা খুবই উদ্বেগজনক হয়ে উঠল—আশপাশের গ্রামগুলো থেকে হুমকি-দেওয়া চিঠি আসতে লাগল। হুমকি ছিল, —সংখ্যালঘুদের সঙ্গে তারা যা করেছে, তাই যেন করা হয় ৷ না করলে আমাদের গ্রাম জ্বালিয়ে পুড়িয়ে খাক করে দেওয়া হবে। পঞ্চায়েতের মিটিং বসল। তাতে ঠিক হল, সংখ্যালঘুদের আমরা আমাদের বাড়িতে লুকিয়ে রাখব। লুকিয়ে রেখে রটিয়ে দেব, ওরা পালিয়ে গিয়েছে।
নুরাদের পরিবার আমাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিল। রলা খাঁ, নুরা এবং তার মা সারাদিন একটা কুঠরিতে বন্ধ থাকত। ওদের মুখের ওপর আতঙ্ক আর মৃত্যুর একটা গভীর উদাসীন ছাপ নেমে এসেছিল ওদের হাসিখুশি রাখার জন্যে আমি প্রাণপণ চেষ্টা করতাম, কিন্তু আমার সমস্ত চেষ্টাই ব্যর্থ হয়ে যেত। যদিও বা কদাচিৎ ওরা হাসত, কিন্তু সেই হাসি দেখে মনে হত যেন ওরা কাঁদছে।
ওদের অবস্থা দেখে আমার বুক ভেঙে যেত। ধর্মের ওপর থেকে আমার আস্থা উঠে গিয়েছিল।... এ কী ধরনের ধর্ম, যে ধর্ম জীবনের বদলে মৃত্যু ডেকে আনে; - ... মানুষকে মানুষের ওপর নেকড়ের মতো ঝাঁপিয়ে পড়ার জন্যে উত্তেজিত করে। এই কথাটা কিছুতেই আমার মাথায় ঢুকছিল না। এক ধর্মের মানুষ যদি অন্য ধর্মের মানুষের সঙ্গে কোথাও কোন খারাপ ব্যবহার করে, তাতে এমন কী এসে যায়, যার জন্যে হাজার হাজার মাইল দূরে মারামারি কাটাকটি হবে! এ ঘটনার সঙ্গে তো তাদের কোন সম্পর্কই নেই। ... জানি না ইতিমধ্যে এমন কী ঘটনা ঘটে গেল যে পুরুষানুক্রমে যারা এই দেশে বাস করছে, হঠাৎ সেই দেশ তাদের কাছে পর হয়ে গেল। আর কেউ কেউবা তাদের এই দেশ থেকে তাড়িয়ে দেওয়ার প্রয়োজন অনুভব করছে। অনেক মারদাঙ্গা অনেক আগুন জ্বলার পর সাম্প্রদায়িকতার আগুন কিছুটা নিভে গেল। সারা পাঞ্জাবের কথা বলতে পারব না, তবে আমাদের গ্রামে কোন ক্ষতি হয়নি, – না কোন আর্থিক হানি হয়েছে, না কোন দৈহিক। গ্রামে বিপত্তি যে কিছুই হয়নি, তা নয়। গ্রামের অবস্থা খুব সঙ্গীন ভেবে সাহাবদিন অন্য কোথাও চলে গিয়েছিল। কিন্তু তারপর আর তার কোন খবর নেই । -
একটা হালকা ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা আমেজ পড়ছিল। ঠাণ্ডা এই আমেজে ভোরবেলা সবুজে ভরপুর খেতের রাস্তা ধরে যেতে কী ভালোই না লাগে! ঠাণ্ডা হাওয়া বইছিল। সবুজ সবুজ গমের চারার ওপর মুক্তোর মতো টলমল করছিল শিশিরবিন্দু। মনে হচ্ছিল, আকাশে ডানা মেলে উড়ে যাই।
স্কুলে যাওয়ার জন্যে তৈরি হচ্ছিলাম। এমন সময় হঠাৎ খবর ছড়িয়ে পড়ল, ললারিদের পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়ার জন্যে মিলিটারি এসেছে। হৃৎপিণ্ড ধকধক করতে লাগল। স্কুলের ব্যাগ ফেলে দিয়ে আমি ললারিদের পাড়ার দিকে ছুট দিলাম ।
পৌঁছে দেখলাম, সেখানে বহু লোক জমায়েত হয়েছে। পাড়ায় ঢোকার মুখটায় একজন বালুচ সৈন্য রাইফেল হাতে দাঁড়িয়ে রয়েছে। কিছুটা দূরে পঞ্চায়েত-প্রধান এবং আমার বাবা একজন মিলিটারি অফিসারের সঙ্গে গল্পে মশগুল হয়ে আছেন। অফিসার বলছিলেন, “এখান থেকে চিঠি গিয়েছে বলেই আমরা এসেছি। কাউকেই আমরা জোর করে নিয়ে যাব না। যারা থাকতে চায় থাকতে পারে। আপনিই সবাইকে জিজ্ঞেস করে জানুন।”
বাবা এবং পঞ্চায়েত-প্রধানের সঙ্গে আমিও পাড়ার মধ্যে ঢুকলাম। আমি সোজা রলা খাঁর বাড়িতে গেলাম। ঘরের এক কোণে বসে নুরা কাঁদছিল। রলা খাঁ এবং তাঁর স্ত্রী আসবাবপত্র বাঁধাছাদা করছিল। তাদের মুখে চোখে বিমর্ষতার মেঘ।
“আব্বাজি, আপনি এখানে থাকতে পারেন। ক্যাপ্টেন সাহেব বলছিলেন, তাঁরা কাউকে জোরজবরদস্তি করে নিয়ে যাবেন না। বাবা আর প্রধান আপনাকে জিজ্ঞেস করতে আসছেন।” আমি আনন্দে উল্লসিত হয়ে বললাম ৷
মন চাইছিল বলে দিই, নুরাকে আমি বিয়ে করব। কিন্তু সেই সময় গ্রামের কট্টর সমাজব্যবস্থায় এ কথা বলার অর্থ নিজেকে চরিত্রহীন বলে প্রতিপন্ন করা। তাই আমি চুপ করে রইলাম। ইতিমধ্যে বাবা এবং গ্রাম-প্রধান সেখানে এসে হাজির হল। তাদের চেহারায় কেমন একটা ক্লান্তির ভাব। ... সবাই প্রায় একই উত্তর দিয়েছিল।
সন্ধ্যার প্রায় ঘণ্টাখানেক আগে ওরা সবাই পাড়া থেকে বেরুল। কাফেলাটি ধীরে ধীরে স্কুলের পিপুলগাছের দিকে এণ্ডল। সেখানেই ট্রাকটা দাঁড়িয়েছিল। ওরা পৌঁছতেই ট্রাক ছেড়ে দিল। দৃশ্যটা খুবই করুণ। যেন কন্যাবিদায় হচ্ছে। ... যারা যাচ্ছিল তারা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিল। আর যাদের ছেড়ে যাচ্ছিল তাদেরও চোখে জল । এমন কি, দু-চার জন মিলিটারির চোখও জলে ভরে উঠেছিল।
ট্রাক ছাড়ার আগে নুরা একবার আমার সামনে এসে দাঁড়াল ৷
আমি বললাম, “সাবধানে যেও।” ও মাথা হেলিয়ে সম্মতি জানাল ।
“পৌছনোর সঙ্গে সঙ্গে খবর দিও।” ও আবার মাথাটা কাত করল।
“বিয়ের খবর নিশ্চয়ই পাঠাবে। যেমন করে হোক আমি হাজির হব।” ও লজ্জা পেয়ে গেল।
“বীরপুরুষ, পরীক্ষার রেজাল্টের খবর কিন্তু নিশ্চয়ই জানাবে । পীরের দরগায় তোমার ভালো রেজাল্টের জন্যে মানত করেছিলাম।” কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর ও কান্নাভরা কণ্ঠে কথাগুলো বলে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। ... কিছুক্ষণ পরেই আমাদের হৃদয়ের ওপর ট্রাকের চাকা দলাই-মলাই করতে করতে ছুটে চলে গেল।
দিনের পর দিন চলে যেতে লাগল, আমি উন্মুখ হয়ে অপেক্ষা করছি; কিন্তু নুরার কোন খবরই পেলাম না ।
সেদিন ছিল বসন্ত ঋতুর এক সুন্দর শীতল রাত্রি। টিপটিপ করে বৃষ্টি পড়ছে। গায়ে কম্বল চাপিয়ে ঘুমনোর চেষ্টা করছি। হঠাৎ পাশের ঘরে বাবার গলা শুনতে পেলাম, “কি, ঘুমিয়ে পড়েছ নাকি ? ”
“না, ঘুমোই নি।” মা উত্তর দিল।
“ছেলে ঘুমিয়ে পড়েছে?”
“আজ তাড়াতাড়িই শুয়ে পড়েছে। বলছিল, শরীর ভালো নেই।”
ওদের কথাবার্তা শোনার জন্যে আমার কান খাড়া হয়ে উঠল।
“কী ব্যাপার? তুমি ওর কথা জিজ্ঞেস করছ কেন?” মা জিজ্ঞেস করল।
“ওকে কিছু বোলো না।” বাবার গলা ফিশফিশানির মতো নীচু হয়ে গেল। —“রলা খাঁর চিঠি এসেছে। নুরা পাকিস্তানে পৌঁছতে পারেনি।”
সত্যি ! আমার হৃৎপিণ্ডে হঠাৎ কে যেন ছোরা বিঁধিয়ে দিল।... নুরার তাহলে কী হয়েছে? ... আমার সম্পূর্ণ চেতনাশক্তি কানের মধ্যে কেন্দ্রীভূত হয়ে গেল।
মা ফিশফিশ করে জিজ্ঞেস করল, “কি হয়েছিল ?”
“খুলে কিছু লেখেনি ... মেয়েটি তো দেখতে সুন্দরী ছিল।”
“কিন্তু ওদের সঙ্গে তো পাকিস্তানি মিলিটারি ছিল।”
“তাতে এমন কি ফারাক আছে। ... হে ভগবান, দয়া করো।” বাবার কণ্ঠ থেকে এক গভীর বেদনা ঝরে পড়ল।
... আমি যেন পাথরের মতো জড় পদার্থে পরিণত হয়ে গেলাম।
বিয়ের খবর নিশ্চয়ই দেবে।
আমি যেমন করে পারি পৌঁছে যাব।...
বীরপুরুষ পরীক্ষার রেজাল্টের খবর দিও।
পীরের দরগায় তোমার রেজাল্টের জন্যে মানত করেছি।
... এখন কার কে পীরের দরগায় শিরনি দেবে? .... বিয়ে হবে ?
“চাচাজি, আপনি গ্রামে এলে এই উজার চত্বরে গিয়ে দুদণ্ড বসেন, তাই, বাবা আপনাকে ডেকে পাঠিয়েছেন।”
আমি চোখ তুলে তাকালাম। দেউড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আমার খুড়তুতো ভাই-এর ছেলে মিটমিট করে হাসছে। এই উজার চত্বরের সঙ্গে জড়িত অতীতের সমস্ত ঘটনা আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে।
“যে অতীত অতীত হয়ে গিয়েছে সেই অতীত যেন আর কখনও কখনও বর্তমান বা ভবিষ্যৎ না হয়—কারো জন্যেই যেন না হয়।” বলতে বলতে আমি ওর পেছনে পেছনে এগিয়ে চলছিলাম।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন