কমলেশ সেন
উপেন্দ্র নাথ অশক
উপেন্দ্রনাথ অঙ্ক-এর জন্ম পাঞ্জাবের জলন্ধরে, কাল্লোভানি মহল্লায়। পিতার বৃত্তি ছিল যজমানি। তাঁর প্রথম কবিতা প্রকাশ হয় উনিশ শ ছাব্বিশ সালে লাহোরের উর্দু ‘মিলাপে’। প্রেমচন্দ-এর সঙ্গে যোগাযোগের পর উর্দু থেকে হিন্দি সাহিত্যে আসেন। আই.পি.টি.এ. এবং প্রগতি লেখক সংঘ-এর সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। সাজ্জাদ জাহিদের অনুরোধে তিনি তুফান সে পহলে’ একাঙ্ক নাটকটি লেখেন। কিন্তু নাটকটি মঞ্চস্থ হওয়ার আগেই বেআইনি বলে ঘোষিত হয়। তাঁর ‘গরম রাগ’ একসময় প্রগতিশীল মহলে মিশ্র প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল। তিনি অসংখ্য নাটক কবিতা গল্প এবং উপন্যাস লিখেছেন। তাঁর মৃত্যু হয় ১৯৯৬ সালের জানুয়ারি মাসে।
রেল লাইনের ওপারে নতুন গড়ে-ওঠা বসতি ইসলামাবাদ। সেই নতুন বসতির মুসলমানরা যখন জিনিসপত্রের মোহ ছেড়ে প্রাণ নিয়ে পালাতে লাগল, তখন আমাদের প্রতিবেশী লহনা সিং-এর স্ত্রীর বুদ্ধি খেলে গেল।
সর্দারনি লহনা সিংকে বলল, “তুমি হাতের ওপর হাত রেখে নপুংসকের মতো বসে আছ ! ওদিকে সবাই একেকটা সুন্দর বাড়ি কব্জা করে নিচ্ছে।”
সব রকম অপমানজনক কথা শুনতে রাজি লহনা সিং, কিন্তু মেয়েছেলের মুখ থেকে ‘নপুংসক’ শুনতে সে কিছুতেই রাজি নয় । তাই সে তার ঢিলে পাগড়িটা খুলে আবার কষে বাঁধতে লাগল, মেঝের সঙ্গে লটর-পটর খাওয়া লুঙ্গিটা কোমরে ভালোভাবে বেঁধে নিল । খাপ থেকে কৃপাণ বের করে তার ধার পরীক্ষা করে আবার খাপে ঢুকিয়ে রাখল। তারপর যে কোন একটা ‘নতুন’ বাড়ি দখল করার জন্যে ইসলামাবাদের দিকে রওনা হল।
বাড়ির চৌহদ্দি পেরনোর আগেই সর্দারনি দৌড়তে দৌড়তে এসে লহনা সিং-এর হাতে একটা বড় তালা দিল। বলল, “বাড়ি যদি পেয়ে যাও, দখল রাখবে কীভাবে?”
সর্দার লহনা সিং এক হাতে তালা নিয়ে এবং অন্য হাত কৃপাণের ওপর রেখে রেল লাইন পেরিয়ে ইসলামাবাদের দিকে এগিয়ে চলল ৷
অমৃতসরের খালসা কলেজ রোডের পুতলি-ঘরের কাছেই আমার বাড়ি। আমার বাড়ির সামনেই যে এক চিলতে খালি জমি, সেই জমিতেই লহনা সিং-এর খড় কাটা মেশিনের দোকান। জমির এক দিকে দু-তিনটি স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘর ।
আলাদা বসত বাড়ি না পাওয়ায় সর্দারজি এখানেই থাকত। দেড়-দুহাজার টাকা নিয়ে সে ব্যবসা শুরু করে, কিন্তু যুদ্ধের সময় (সেই সময় কৃষকদের হাতে প্রচুর টাকা) সেই ব্যবসা ফুলে ফেঁপে বেড়ে ওঠে। আমদানি ভাল থাকায় আসবাবপত্রের বাহুল্য হল এবং সুখ-সুবিধার জন্যে মোহও জাগে তার মধ্যে। প্রথম দিকে এই স্যাঁতসেঁতে অন্ধকার ঘরেই স্বামী-স্ত্রী খুশিতে ছিল, কিন্তু সবাই যখন তার স্ত্রীকে ‘সর্দারনি’ বলে ডাকতে লাগল, তখন এই স্যাঁতসেঁতে আর অন্ধকার ঘরটা সে উপেক্ষার চোখে দেখতে শুরু করল। ক্রেতাদের মেশিনের শক্তি এবং কার্যকারিতা দেখানোর জন্যে সর্দারজিকে দিনভর খড় কাটায় ব্যস্ত থাকতে হয়। সমস্ত জায়গা জুড়ে মেশিনের সারি, আর ভয়-ভাবনাহীন সর্দারজি তীক্ষ্ণ ছুরি দিয়ে সমানে খড় কেটে চলেছে। মেশিনের কর্কশ শব্দ সর্দারনির কানে অনবরত হাতুড়ির ঘায়ের মতো এসে বিঁধত। যেখানে সেখানে স্তূপ হয়ে পড়ে থাকা বিচালি সর্দারনির চোখে খচখচ করে বিঁধতে লাগল । সর্দার লহনা সিং-এর পাগড়ি আর লুঙ্গি ছিল সিল্কের। আগের ডোরাকাটা মোটা কাপড়ের জামা ছেড়ে এখন তার বদলে সে হাঁটু অব্দি লম্বা বোস্কির জামা গায়ে দেয়। কিন্তু চালচলনে সে আগের লহনা সিং-ই থেকে গিয়েছিল। অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে ঘর, মেশিনের কর্কশ শব্দ, খড়ের গাদা ওকে বিমর্ষ তো করতই না, বরং এই পরিবেশের মধ্যেই ও খুশিতে ডুবে থাকত। সর্দারজিদের সম্বন্ধে একজন লেখক মন্তব্য করেছিলেন, যে দিক থেকেই উলটে-পালটে দেখ না কেন, শিখকে শিখই দেখবে। সর্দার লহনা সিং সম্পর্কেও এ কথা বলা যায়।
এর কারণ অবশ্য এই নয়, লহনা সিং রোগা-পটকা। বরং সে বেশ হৃষ্টপুষ্ট। তার পৌরুষ তাকে পাঁচ-পাঁচটা সন্তানের জনক করেছে। আর সেই পাঁচটা বাচ্চা সর্বক্ষণ সর্দারনিকে জোঁকের মতো আঁকড়ে ধরে আছে। যখনই কোন বুদ্ধিসুদ্ধির কাজের দরকার পড়ত, সর্দারনি ঠিক তখনই সর্দারজিকে ‘বুদ্ধ’ বলে উসকে দিত; আর ‘নপুংসক’ বললেই সর্দারজি রেগে গিয়ে চরম সাহসের কাজটা করে ফেলত। টাকার দেমাকে সর্দারনি ডগমগ, আর বাছাই বাছাই জামাকাপড় পরলে কী হবে, তার মধ্যে শিষ্টতার ছিটেফোঁটাও ছিল না ।
সর্দার লহনা সিং ইসলামাবাদে পৌঁছে দেখল সেখানে মারদাঙ্গা চলছে। তার খড়-কাটা মেশিন যেভাবে নিরীহ বিচালি কেটে ভুরভুর করে নামিয়ে দিচ্ছে, তখন ঠিক সেই ভাবেই বিশেষ ধর্মের অনুগামীরা অন্য ধর্মের অনুরাগীদের সমানে কেটে চলেছে। সর্দার লহনা সিং খাপ থেকে তার ঝকমকে কৃপাণ টেনে বার করল। যদি কোন মুসলমান তার সামনাসামনি এসে পড়ে তবে সে নিজের পৌরুষ প্রমাণ করে ছাড়বে। কিন্তু ইসলামাবাদে একজন জীবিত মুসলমানেরও চিহ্ন ছিল না। অলিতে গলিতে শুধু রক্তের দাগ। আর দূর থেকে লুটতরাজের হই চই শব্দ ।
সে খুব সতর্কভাবে পায়ে পায়ে এগুচ্ছিল। একটু এগুতেই সে দেখতে পেল তার বন্ধু গুরদয়াল সিং একটা বাড়ির তালা ভাঙছে।
সর্দার লহনা সিং এগুতে গিয়ে থমকে দাঁড়িয়ে পড়ে বিস্মিত হয়ে গুরুদয়াল সিং-এর দিকে তাকিয়ে রইল।
“আমি এই বাড়িটা দখল করছি।” সর্দার গুরুদয়াল সিং উপেক্ষার দৃষ্টিতে বন্ধুর দিকে তাকিয়ে আবার নিজের কাজে লেগে গেল।
সর্দার লহনা সিং ঢিলে হয়ে যাওয়া পাগড়িটা ভাল করে কষে বাঁধতে লাগল । বাঁধতে বাঁধতে সে বন্ধুর নতুন বাড়িটা একবার নিরিখ করল। বন্ধুকে বাড়ি দখল করতে দেখে নিজের জন্যে বাড়ি খোঁজার কথা তার মনে পড়ে গেল। মনে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে সে এগিয়ে গেল। দু-একটা বাড়ি ছাড়ার পর গুরুদয়াল সিং-এর চেয়েও সুন্দর একটা বাড়ি তার নজরে পড়ল। দেখল বাড়ির দরজায় তালা ঝুলছে। গলি থেকে একটা বড় মতো ইট খুলে তালাতে দু-চার ঘা দিতেই তালাটা খুলে গেল।
বাড়িটা খুব বড় নয়, কিন্তু তার কোঠাঘরের তুলনায় স্বর্গ। বোধ হয় একদিন কোন শৌখিন কেরানি এই বাড়িতে থাকত, কারণ একটা ছোট্ট রেডিও এবং গ্রামোফোনও পড়েছিল। একটা ট্রাঙ্ক খোলা অবস্থায় পড়েছিল, কিন্তু তাতে কোন গয়নাগাটি বা কাপড়চোপড় ছিল না। মারদাঙ্গা শুরু হওয়ার আগেই খুব সম্ভব বাড়ির মালিক শরণার্থী ক্যাম্পে অথবা পাকিস্তানে চলে গিয়ে থাকবে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় তার অনেক বেশি জিনিসপত্র ফেলে গেছে তারা। এত জিনিসপত্র দেখে সর্দার লহনা সিং তার কাঁধের কলারটা উলটে দিয়ে বকরির মতো উল্লাসে চেঁচিয়ে উঠল।
প্রয়োজনীয় জিনিসগুলো বেছে বেছে সে একদিকে গুছিয়ে রাখল। আর যেগুলো অনাবশ্যক তা সে তুলে বাইরে ছুঁড়ে ফেলে দিল। সঙ্গে যে তালাটা এনেছিল তা দরজায় লাগল। দরজায় তালা লাগিয়ে গুরদয়াল সিংকে একটু নজর রাখতে বলে নিজের আসবাবপত্র আনতে চলে গেল। বাড়ির ওপর তার দখলটা সে সম্পূর্ণভাবে কায়েম করতে চায় ।
বাড়িতে পৌঁছে তার খেয়াল হল আসবাবপত্র সে কিসে করে নিয়ে যাবে ? এই দাঙ্গা-হাঙ্গামার মধ্যে টাঙ্গা কোথায় পাবে? উঠোন থেকে সাইকেল নিয়ে সে তার বহুদিনের বন্ধু রামধন গোয়ালার কাছে গেল। তার গোরুর গাড়ি করেই সে এক সময় খড়-কাটার মেশিন নিয়ে আসে। অনেক সাধ্যিসাধনা করে, দ্বিগুণ ভাড়ার লোভ দেখিয়ে সে ওর গাড়িটা নিয়ে এল ৷
সমস্ত জিনিসপত্র গাড়িতে বোঝাই করে সে যখন রওনা হতে গেল, তখন সর্দারনি ও তার সঙ্গে যেতে চাইল। লহনা সিং তাকে বুঝিয়ে সুঝিয়ে ক্ষান্ত করল। বলল, যখন অন্য সর্দাররা সর্দারনিদের আনবে তখন সে তাকেও নিয়ে যাবে। হতে পারে সে হাজার সর্দারনির সমান, কিন্তু সে তো নারী। দাঙ্গা-হাঙ্গামায় মেয়েরাই বেশি লাঞ্ছিতা হয় । তাছাড়া, বাড়ির সামনের চত্বরের ওপরেও নজর রাখতে হবে। অসংখ্য শরণার্থী আসছে, ঘর খোলা দেখে কেউ আবার আয়েশ করে বসে না যায় ৷
সর্দারনি সর্দারজির যুক্তিতে রাজি হয়ে গেল। সে সর্দারজিকে জিনিসপত্রের সঙ্গে খড় কাটার মেশিন নিয়ে যেতে বলল। নতুন বাড়িতে মেশিন বসিয়ে দিলে এ বাড়ির মালিক যে তারা, তাতে আর কোন সন্দেহ থাকবে না। সবাই বুঝতে পারবে এ বাড়ির মালিক খড় কাটার মেশিনওয়ালা সর্দার লহনা সিং ।
সর্দারনির এই প্রস্তাব সর্দারজির মনে ধরল ।
গোরুর গাড়িতে আর একতিল জায়গাও ছিল না। কিন্তু সে জিনিসপত্রের মাথায় খড়-কাটা মেশিনটা অনেক কষ্টে তুলে দিল। মেশিনটা যাতে পড়ে না যায়, সে জন্যে দড়ি দিয়ে কষে বেঁধে দিল। নতুন বাড়িতে পৌঁছে সর্দার লহনা সিং দেখল সর্দার গুরদয়াল সিং-এর সর্দারনি এবং বাচ্চা-কাচ্চারা তাদের নতুন বাড়িতে এসে গিয়েছে। ওদের দেখে ওর মনে হল সে ভুল করেছে। তার সর্দারনিকে এখনই নিয়ে আসা উচিত। রোগা-পটকা গুরদয়াল সিং যদি সর্দারনিকে নিয়ে আসতে পারে সে কেন তার সর্দারনিকে আনতে পারবে না ।
দেউড়িতে যেখানে বড় তালা ঝুলছে সমস্ত জিনিসপত্র সেখানে নামিয়ে রেখে সে গুরদয়াল সিংকে বলল, “ভাই, একটু দেখো, সর্দারনিকে নিয়ে আসি। তোমার স্ত্রী একজন সঙ্গী পেয়ে যাবে।”
যে গোরুগাড়ি করে এসেছিল, তাতে চড়েই আবার সে রওনা হল। বাড়িতে পৌঁছেই সে সর্দারনি আর বাচ্চাদের ঝটপট তৈরি হয়ে নিতে বলল ।
প্রায় ঘণ্টাখানেক পর সর্দার লহনা সিং যখন তার সর্দারনি আর কাচ্চা-বাচ্চা নিয়ে ইসলামাবাদ পৌঁছল, দেখল তার বাড়ির তালা ভাঙা । দেউড়ির সামনে যে জিনিসপত্র রেখে গিয়েছিল, সব উধাও। শুধু খড়-কাটা মেশিনটা পড়ে আছে। হতচকিত হয়ে সে গুরদয়াল সিংকে চিৎকার করে ডাকল। কিন্তু দেখল সে বাড়িও অন্য একজন সর্দারের দখলে। জানতে পারল যে, গুরদয়াল সিং অন্য এক গলিতে আরও ভালো একটা বাড়ি দেখে উঠে গিয়েছে। এগিয়ে গিয়ে দেখতে লাগল চোর তার কী কী জিনিস নিয়ে গেছে।
দেউড়িতে পা দিতেই লম্বা-তাগড়া দুজন শিখ এগিয়ে এসে তার পথ রোধ করে দাঁড়াল। তারপর তারা গোরুগাড়িতে বসা তার স্ত্রী এবং বাচ্চাদের দিকে ইঙ্গিত করে বলল, “এ বাড়ি শরণার্থীদের জন্যে নয়। এখানে থানা অফিসার বলবন্ত সিং থাকেন।” থানা অফিসারের নাম শুনতেই লহনা সিং-এর কৃপাণ খাপে ঢুকে গেল, পাগড়ি ঢিলে হয়ে গেল তার।
“হুজুর, এ বাড়িতে আমি নিজে তালা লাগিয়েছিলাম। আমার সব জিনিসপত্র...”
“যা, এখান থেকে বের হয়ে যা। আদালতে গিয়ে দাবি করগে। অন্যের জিনিসকে নিজের বলে দাবি করছিস।”
সর্দার লহনা সিংকে তারা দেউড়ি থেকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দিল। ঠিক সেই সময় লহনা সিং-এর চোখ খড় কাটা মেশিনের ওপর পড়ল। পড়তেই সে বলল, “দেখুন স্যার এই যে আমার খড় কাটার মেশিন এখানে রয়েছে। যে কোন লোককে ডেকে জিজ্ঞেস করুন, সবাই আমাকে জানে।”
হইচই শুনে ‘নতুন’ বাড়িগুলো থেকে যে সর্দাররা বেরিয়ে এল, তাদের একজনও লহনা সিং-এর পরিচিত নয় ।
“ওঃ, কেন বলছ না যে খড়-কাটা মেশিনটা তোমার চাই,” লহনা সিংকে ধাক্কা দিয়ে একজন শিখ বলল। তারপর সে তার এক সঙ্গীকে বলল, “এই কর্তার সিং, মেশিনটা রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দে। এরা গরিব শরণার্থী। আমরা শালার এই মেশিন নিয়ে কী করব?”
দুজনে মেশিন তুলে রাস্তায় ছুঁড়ে ফেলে দিল।
ঘণ্টা দু-আড়াই ধরে অযথা হয়রানির পর রাত্রি যখন নেমে এসেছে, সর্দার লহনা সিং আবার তার পুরনো বাসার দিকে রওনা হল। তার স্ত্রী এবং বাচ্চা-কাচ্চারা তার সঙ্গে হেঁটে হেঁটে চলেছে। খড় কাটার মেশিনটি গোরুর-গাড়ির ওপর।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন