জল এবং পুল

কমলেশ সেন

মহীপ সিং

জল এবং পুল

মহীপ সিং—পাঞ্জাবের অধিবাসী। হিন্দি এবং পাঞ্জাবি–দু’ ভাষাতেই তিনি দক্ষ। এবং দু’ভাষাতেই তিনি সমানে লিখেছেন। কিছুদিন জাপানের কানসাই বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিজিটিং প্রফেসার হিসেবে অধ্যাপনা করেন। বৃত্তি অধ্যাপনা। বিভিন্ন পত্র-পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। একটি উপন্যাস এবং পাঁচটি গল্প সংগ্রহ প্রকাশিত হয়েছে। আলোচক হিসেবেও তিনি খ্যাতি অর্জন করেন। তিনি ছিলেন হিন্দি সাহিত্যপত্র ‘সংচেতনা’-র সম্পাদক। একাধিক গ্রন্থেরও তিনি সম্পাদনা করেছেন। গল্পকার হিসেবে তিনি নতুনত্বের দাবি রাখেন। তাঁর মৃত্যু হয় ২০১৫ সালের নভেম্বর মাসে।

গাড়ি লাহোর ছাড়ার সঙ্গে সঙ্গেই মন আর একবার ভয়ে থরথর করে কেঁপে উঠল । আমরা এখন যে দিকে চলেছি, আজ থেকে চোদ্দ বছর আগে সে জায়গা জ্বালিয়ে পুড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল। সেই আগুনে হাজার হাজার মানুষ জ্বলে মরেছে, আর যারা বেঁচে গিয়েছে তাদের শরীরে এখনও আগুনের চিহ্ন রয়ে গেছে। মনে হচ্ছিল, আমাদের গাড়ি যেন কোন দীর্ঘ অন্ধকার গুহার ভিতর দিয়ে ছুটে চলেছে। আর আমরা যেন আমাদের সমস্ত অস্তিত্ব এই অন্ধকারের হাতে সঁপে দিয়ে নিশ্চল বসে আছি।

গাড়িতে আমরা সবশুদ্ধ প্রায় তিনশ যাত্রী ছিলাম। মহিলা এবং শিশুদের সংখ্যাই ছিল বেশি। লাহোরে আমরা সবাই গুরুদ্বার দর্শন করেছি। সেখানে আমরা ভালোই অভ্যর্থনা পেয়েছিলাম, জানতাম পঞ্জা-সাহেবেও আমাদের কোন অনিষ্টের সম্ভাবনা নেই। তবু বলা যায় না, কখন মানুষের ভেতরের পশুটা মাথা চাড়া দিয়ে উঠে সব কিছুকে তছনছ করে দিয়ে যায়।

“নানারকম কথা ভাবতে ভাবতে মার দিকে তাকালাম, দেখলাম মা জানলার ওপর কনুইয়ের ভর দিয়ে হাতের চেটোর ওপর মুখ রেখে বাইরের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। খেতের ফসল কাটা হয়ে গিয়েছে। বহুদূর পর্যন্ত সমতল মাঠ দেখা যাচ্ছে। মনে হল, এই সমতল মাঠ মার চোখের ভেতর দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে অন্তরের অন্তস্থলে ঢুকে মনটাকে ছেয়ে ফেলেছে। আমি চোখ ফিরিয়ে গাড়ির অন্যান্য যাত্রীদেরও দেখতে লাগলাম। তাদের প্রত্যেকের মধ্যেই কেমন একটা উদাস-উদাসভাব। বুঝতে পারছিলাম, সবাই হঠাৎ কেন এমন উদাস হয়ে গেছে।

মার মগ্নতা ভেঙে দিয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তোমার এই পথ নিশ্চয়ই ভালোভাবে মনে আছে? নিশ্চয়ই তুমি বহুবার এদিক দিয়ে যাতায়াত করেছ?”

আমার দিকে তাকিয়ে মা মুচকি হাসল। সবকিছু হারিয়েও মার মুখে এই মিষ্টি হাসিটুকু রয়ে গেছে। মা আমাকে বলল, “এই পথের প্রতিটি স্টেশন আমার মনে আছে। কিন্তু কেন জানি না, আজকে এই পথটা কেমন যেন অচেনা-অচেনা মনে হচ্ছে। চোদ্দ বছর পর এদিক দিয়ে যাচ্ছি। আগেও এভাবে যেতাম। লাহোর পার হওয়ার পর থেকেই এক অদ্ভুত ধরনের উত্তেজনা আমার সমস্ত দেহমনে ছড়িয়ে পড়ত। আমাদের গ্রাম সরাই যতই কাছে এগিয়ে আসত, সেখানকার প্রতিটি মানুষের মুখ এক-এক করে চোখের সামনে ভেসে উঠত। স্টেশনে কত লোকই না অভ্যর্থনা করতে আসত।” ...

চোদ্দ বছর আগের মধুর স্মৃতি চোখকে জলে ভরিয়ে তুলল। বাবা উত্তরপ্রদেশে গিয়েছিলেন রুজি-রোজগারের জন্যে। আমাদের সব ভাই বোনের জন্ম হয়েছে পাঞ্জাবের বাইরে। আমার বেশ মনে আছে, বছরে বাবা এক-আধবার পাঞ্জাবে যেতেন, কিন্তু মা বছরে অন্তত দু-তিনবার যেতেনই। আমাদের ভাইবোনদের মধ্যে বয়সে যে সবচেয়ে ছোট বোনই মার সঙ্গে যাতাযাত করত। সেই সময় সবে পাঞ্জাব দ্বিখণ্ডিত হওয়ার খবর ঘোষিত হয়েছে, আর পাঞ্জাবের পাঁচটি দরিয়ার জলই উন্মত্ততার এক সমুদ্রে পরিণত হয়েছে। তা সত্ত্বেও মা পাঞ্জাবে যাবে বলেই স্থির করল। সবাই তাকে এমনভাবে নিষেধ করল, যেন সে জ্বলন্ত আগুনে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে। সত্যিই তো মা জেনে-বুঝে আগুনে ঝাঁপ দিতে যাচ্ছে। বাবা এবং আমরা সবাই ভালো করে জানতাম, মাকে তার পথ থেকে ফিরিয়ে আনা অত সহজ ব্যাপার নয়। হেসে মা সবার কথা উড়িয়ে দিল। এবং সত্যিসত্যি বিশ-বাইশ দিনের মধ্যে মা পাঞ্জাব থেকে ফিরে এল। ফেরার সময়ে গ্রামের বাড়ির অনেক আসবাবপত্র বুক করে এসেছে। সঙ্গে করে শুধু এনেছে পুরনো একটা চরখা এবং ঘোল করার মথনি।

আবার সারা পাঞ্জাব জুড়ে দাউ দাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। ঘরের পর ঘর, গ্রামের পর গ্রাম, শহরের পর শহর সেই আগুনে ভস্মীভূত হতে লাগল। একদিন আগুন নিভলে দেখা গেল, লাহোর আর অমৃতসরের মাঝখানে যে বিস্তীর্ণ জমি, সেই জমি কখন ফেটে চৌচির হয়ে গিয়েছে, তৈরি হয়েছে এক গভীর খাদ। এই খাদের দুপারে মানুষ জন ছিটকে পড়েছে। আমরা ভুলে গিয়েছিলাম এই গভীর খাদের অন্য পারেই হচ্ছে আমাদের গ্রাম। পাকা যে সড়ক চলে গিয়েছে তার পরেই রয়েছে একটা খাল, আর তার পাশেই জেহলাম নদী। চপলা মেয়ের মতো দুলতে দুলতে বয়ে চলেছে জেহলাম।

আজ আমি মার সঙ্গে সেই খালের ওপর সরকারের তৈরি পুলের ওপর দিয়ে চলেছি। চলেছি সেই দিকে— গতকালও যে জায়গা ছিল আমাদের একান্ত আপন, কিন্তু আজ তা পর হয়ে গিয়েছে।

একটা বইয়ের পাতা আমি উলটে চলেছিলাম, এমন সময় মা আমাকে জিজ্ঞেস করল, “গাড়ি কি সরাইয়ে থামবে?”

এক মুহূর্ত চিন্তা করে বললাম, “হ্যাঁ, মনে হচ্ছে থামবে। তবে রাত্তির দেড়টা-দুটোর আগে নয়। আমরা হয়তো গভীর ঘুমে ডুবে থাকব। স্টেশন এলে, জানতেও পারব না। সরাইয়ে আমাদের আর আছেই বা কী!”

মার চোখে-মুখে একটা ক্রোধের আভা খেলে গেল। বলল, “আগেই বা তোমাদের ওখানে কী ছিল?”

বুঝতে পারলাম, আবার কথায় মা খুব আঘাত পেয়েছে। আর কথা না বাড়িয়ে আমি মাথা গুঁজে বইয়ের মধ্যে নিজেকে নিবিষ্ট রাখলাম।

ক্রমে অন্ধকার ঘন হয়ে আসতে লাগল। একটা পুঁটলি খুলে মা খাওয়ার জন্যে কী যেন সব বের করল। দূর সম্পর্কের এক মামাও আমাদের সঙ্গে ছিল। তিনজনে খেয়েদেয়ে শোয়ার বন্দোবস্ত করলাম। মামা তো মিনিট দশেকের মধ্যেই নাক ডাকতে শুরু করে দিল। আমিও শুয়ে পড়লাম। মা কিন্তু সেই একই ভাবে কনুইয়ে ভর দিয়ে বসে রইল।

কিছুক্ষণ পরে আমি চোখ মেলে তাকালাম। দেখলাম, মা তেমনি ঠায় বসে বাইরে অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে রয়েছে। ঘড়ি দেখলাম, সাড়ে দশটা বেজে গেছে। বললাম, “মা, তুমিও শুয়ে পড়ো।”

‘আচ্ছা’ বলে মা আধ-শোয়া অবস্থায় বসে রইল। আমার তন্দ্রা এসেছিল, তন্দ্ৰায় একটা স্বপ্ন দেখলাম। সাধারণত স্বপ্নের কথা আমার মনে থাকে না। কিন্তু তন্দ্রার মধ্যে যে স্বপ্ন আমি সেদিন দেখলাম, তাতে আমি বিচলিত হয়ে উঠেছিলাম। সেটা ছিল খুব সম্ভব কোন অস্পষ্ট স্বপ্নের বিহ্বলতা। বহু বহু বছর আগের কোন তরল পদার্থ যেন আমার চারদিকে, মনে হচ্ছিল, সেই লাল টকটকে পদার্থের ওপর আমার পা থপ থপ করে পড়ছে। সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কে আমি উঠে বসলাম। মা আমাকে ঝুঁকে দেখছিল। এক অদ্ভুত ধরনের আতঙ্ক আর উত্তেজনায় মার হাত থরথর করে কাঁপছিল ।

জিজ্ঞেস করলাম, “কী হয়েছে?”

“দ্যাখ তো বাইরে এত হৈ-হল্লা কিসের ?”

আমি বাইরে মাথা বাড়িয়ে ঝুঁকে দেখতে চেষ্টা করলাম। আমাদের ট্রেন ছোট্ট একটা স্টেশনে এসে থেমেছে। প্লাটফর্মের ওপর ল্যাম্প পোস্টের অস্পষ্ট আলো ৷ বিচিত্র একটা হট্টগোল হচ্ছে। আমার প্রতিটি রোমকূপ কাঁটা দিয়ে উঠল । চোদ্দ বছর আগেকার শোনা অনেক ঘটনা মুহূর্তে বিদ্যুতের মতো ঝিলিক দিয়ে উঠল। যেখানে সেখানে গাড়ি থামিয়ে দাঙ্গাবাজরা মানুষকে মুলো-গাজরের মতো কেটে ফেলেছে । মামারও ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। আমার কাঁধ ধরে সে ঝাঁকুনি দিতে লাগল।

“আরে, কী হয়েছে?”

ঠিক এই সময় একটা কণ্ঠস্বর শুনতে পেলাম। ভিড়ের মধ্যে কে যেন চীৎকার করে বলছে, “এই গাড়িতে সরাইয়ের কেউ আছে?”

আমি মাকে জিজ্ঞেস করলাম, “কোন স্টেশনের কথা বলছে?”

মা বলল, “সরাই –আমাদের গ্রামের স্টেশন।”

বাইরে, আবার কে যেন চীৎকার করে জিজ্ঞেস করল, “আরে ভাই, এই গাড়িতে সরাই-এর কেউ আছে ?”

আমি মার দিকে তাকালাম। মার চোখে মুখে এক দৃঢ় সাহসের ভাব দেখলাম । মা বলল, “জিজ্ঞেস কর, ওরা কেন সরাইয়ের লোক খুঁজছে।”

জানলা দিয়ে আমি মুখ বাড়ালাম। দেখলাম, অনেক লোক ছোটাছুটি করে চিৎকার করছে, “আরে, এ গাড়িতে সরাইয়ের কেউ আছ না কি?”

একজন লোককে পাশ দিয়ে যেতে দেখে জিজ্ঞেস করলাম, “কী ব্যাপার ভাই ?”

“তোমাদের মধ্যে সরাইয়ের কেউ আছে না কি?” মা সামনে মুখ বাড়িয়ে বলল, “হাঁ, আমিই এই গ্রামের।”

লোকটি আবার জিজ্ঞেস করল, “আপনি সরাইয়ের?”

“আজ্ঞে, হাঁ।”

মার উত্তর শেষ হতে না হতেই সারা স্টেশন জুড়ে আরও হুলুস্থুল, হই চই শুরু হয়ে গেল। চারদিকে ছড়ানো ছিটানো লোকগুলো আমাদের কামরার সামনে এসে ভিড় করল। তারপর সবাই প্রায় একসঙ্গে প্রশ্ন করতে লাগল:

“আপনি সরাইয়ের?

মাও জোর দিয়ে বলছে, “হাঁ, আমি এই গ্রামেরই।”

উপস্থিত জনসমুদ্রের মধ্যে একটা গুঞ্জন শুরু হয়ে গেল। কে যেন ভিড়ের মধ্যে থেকে প্রশ্ন ছুড়ল, “আপনি কোন বাড়ির?”

মা আমার দিকে তাকাল। বললাম, “আমার বাবার নাম সর্দার মুলা সিং। ইনি আমার মা।”

, “তুমি মুলা সিং-এর ছেলে ?” কয়েকজন একসঙ্গে চিৎকার করে উঠল, “আপনি মুলা সিং-এর স্ত্রী ...রবেল সিং-এর বৌদি? তোমরা সবাই কেমন আছ ... ?” জিজ্ঞেস করতে করতে অনেকগুলো হাত আমাদের দিকে এগিয়ে এল। আমাদের আত্মীয়-স্বজনরা কে কেমন আছে জিজ্ঞেস করতে করতে ওরা আমার হাতে ছোট ছোট পুঁটলি দিতে লাগল। দেখে মনে হচ্ছিল পুঁটলিগুলোতে বাদাম আখরোট কিশমিশ এবং শুকনো মেওয়া বাঁধা রয়েছে। দেখতে দেখতে আমাদের কামরা ছোট ছোট পুঁটলিতে ভরে গেল।

আমি অবাক হয়ে এই কাণ্ডকারখানা দেখছিলাম। মা মাথার ঘোমটা সামলাতে সামলাতে জোড় হাতে প্রতি নমস্কার করছিল। আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে মার ঠোঁট দুটি ফুলের পাপড়ির মতো কাঁপছিল। গলা দিয়ে কোন স্বরই বের হচ্ছিল না। দেখে মনে হচ্ছিল, চোখ দুটো এই বুঝি জলে ভরে উঠবে।

গার্ড কাছেই দাঁড়িয়েছিল। সবুজ লন্ঠন ওপরে উঠিয়ে কোটের পকেট থেকে হুইসিল বের করল। দেখলাম, তিন-চারজন তাকে প্রায় জড়িয়ে ধরেছে।

“আরে বাবু আর দু-চার মিনিট দেরি করো না। দেখছ না এই ঠাকরুন আমাদের গ্রামের ...।” গার্ডের যে হাতে লন্ঠন ধরা ছিল তা একজন ধরে নীচে নামিয়ে দিল ।

“বৌ-ঠাকরুন, সর্দারজি কেমন আছে? তাকে কেন সঙ্গে করে আনলে না— সে ও পঞ্জা-সাহেব দর্শন করে যেত” বুড়োমতো একজন মুসলমান মাকে বলল ।

দু হাত দিয়ে মা মাথার ঘোমটা আরও খানিকটা টেনে দিয়ে খুব ধীরে বলল, “সর্দারজি মারা গেছেন ... ।”

“কী ... মুলা সিং মারা গিয়েছে? কী হয়েছিল ? কী হয়েছিল ?”

মা কোন জবাব দিল না। আমি বললাম, “উদরি হয়েছিল। যে দিন উদরি ফাটে, তার পরদিন মারা যায়।”

“আঃ, বড় ভালো মানুষ ছিল। খোদা যেন তাঁকে শান্তিতে বিশ্রাম করতে দেয়,” একজন আফশোস করে বলল। আর অন্যান্যরা কিছুক্ষণের জন্যে স্তব্ধ হয়ে রইল ।

“বৌ-ঠাকরুন, তোমার ছেলে মেয়েরা কেমন আছে?”

“বাহে গুরুর কৃপায় সবাই ভালো আছে।” মা খুব আস্তে বলল। একসঙ্গে অনেকে বলে উঠল, “আল্লা ওদের দীর্ঘায়ু করো।”

একজন বলল, “বৌ-ঠাকরুন, তুমি ছেলে-মেয়ে নিয়ে এখানে এসে থাক।” একসঙ্গে অনেকে সেই কথারই পুনরাবৃত্তি করল।

“বৌ-ঠাকরুন, তোমরা আবার এখানে ফিরে এস। ... তোমরা আবার ফিরে এস।” প্লাটফর্মে দাঁড়ানো মানুষগুলো সবাই একসঙ্গে অনুরোধ করতে লাগল। “ফিরে এস ...”

আমি শুনছিলাম, পেছনে মামা দাঁড়িয়েছিল। রাগে গরগর করে মামা বলল, “হুঁ বদমাশ কোথাকার ! আগে তো মেরে ধরে এখান থেকে তাড়িয়ে দিয়েছিল, আর এখন কিনা বলছ, ফিরে এস ... লুচ্চা কোথাকার!”

প্লাটফর্মে যারা দাঁড়িয়েছিল তারা মামার কথা শুনতে পেল না। ওরা সমানে বলে চলেছে :

“বৌ-ঠাকরুন, তোমার বাচ্চা-কাচ্চা নিয়ে আবার এখানে চলে এস। বৌ-ঠাকরুন বলো, কবে আসছ? নিজের গ্রামের কথা তুমি ভুলে যাওনি। বৌ-ঠাকরুন, ফিরে এস।”

মা তাদের কথার জবাব দিতে পারছিল না। মাথার কাপড় সামলাতে সামলাতে মা সমানে হাত জোড় করে চলেছিল।

প্লাটফর্মের একপ্রান্তে দাঁড়িয়ে গার্ড লণ্ঠন দেখিয়ে চলেছে আর সঙ্গে সঙ্গে বাঁশি বাজাচ্ছে ইঞ্জিনও হুইসিল দিল। ঝিকমিক করে গাড়ি চলতে লাগল। দলে দলে মানুষ আমাদের কামরার সঙ্গে সঙ্গে কদম এগিয়ে চলল।

“আচ্ছা বৌ-ঠাকরুন, সেলাম ... খোকাবাবু সেলাম . রবেল সিংকে সেলাম দিও ... সবাইকে আমাদের সেলাম জানিও ... ” ....

মা হাত জোড় করেছিল, আর উচ্ছ্বাসে গদগদ হয়ে যেন কিছু বলতে চাইছিল। গাড়ির গতি ক্রমেই বাড়তে লাগল। আমরা দুজনেই জানলা দিয়ে বাইরে মাথা বের করে হাত জোড় করে রইলাম। ভিড়ের সমস্ত মানুষ হাত ওপরের দিকে তুলে চিৎকার করে চলেছিল।

গাড়ি প্লাটফর্ম ছাড়ার পর আমি বার্থ থেকে পুঁটলিগুলো একদিকে সরিয়ে রেখে, কিছু বলার জন্যে মার দিকে তাকালাম ।

দেখলাম, মার দুচোখ বেয়ে অবিরাম জল পড়ছে। ওড়না দিয়ে মা বারবার চোখের জল মুছে চলেছে। কিন্তু বন্যার তোড়ে বাঁধ ভেঙ্গে যাওয়ার জল আর বাগ মানছিল না—শুধু বয়ে চলেছিল।

গাড়ি জেহলমের পুলের ওপর দিয়ে ছুটছিল। রাত্রির নিস্তব্ধতাকে খান খান করে ভেঙ্গে শুধু একটা ঘটাং ঘটাং শব্দ ভেসে আসছিল। জানলা দিয়ে ঝুঁকে আমি জেহলমের পুল দেখতে লাগলাম। শুনেছিলাম, জেহলমের পুল খুব মজবুত। পাথর আর ইস্পাত দিয়ে তৈরি জেহলমের পুল আমি এই অন্ধকারের মধ্যেও দেখতে পাচ্ছিলাম। আমার দৃষ্টি ক্রমেই আরও আরও নীচের দিকে চলে যাচ্ছিল। সেখানে শুধু ধূসর অন্ধকার, কালো অন্ধকার। আমি জানতাম, এই ধূসর অন্ধকার আর কিছু নয়—জল, –কলকল করে বয়ে চলা জেহলমের স্বচ্ছ আর নির্মল জল। পাথর আর ইস্পাতে তৈরি এই পুলের নীচ দিয়ে জেহলমের স্বচ্ছ আর নির্মল জল অবিরাম বয়ে চলেছে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%