লাঠি

সাগরিকা রায়

“আমসত্ব দুধে ফেলি, তাহাতে কদলী দলি, সন্দেশ মাখিয়া দিয়া তাতে/ হাপুস হুপুস শব্দ, চারিদিক নিস্তব্ধ/ পিঁপিড়া কাঁদিয়া যায় পাতে/” - গলা তুলে হাঁটু বাজিয়ে গান জুড়েছে গজু। মাঝে মাঝে গলা নামিয়ে ঢোক গিলে নেয়। ফের নব উদ্যমে কালোয়াতি চলে তার। গতরাতে কালী গরুটার একটা বাচ্চা হয়েছে, সন্ধে থেকেই হুসহাস শব্দ করছিল গরুটা। অস্থির ভাব। মাঝে মাঝে চোখ ঠেলে জল বেরিয়ে আসছিল। অভিজ্ঞ গজু বুঝে ফেলেছে একটা প্রাণী আসছে মায়ার টানে। তাড়াতাড়ি করে পুলিনকে খবর দিয়েছে। কালীর স্বভাব মন্দ। জন্মানোর মুহূর্ত্তে ঠ্যাং আটকে যায় বাচ্চাগুলোর। যেন কেউ পেছন থেকে টেনে রাখে– যাসনে! জ্বলে মরবি কিন্তু! বাছুরের মাথাটা তখন ল্যাতপ্যাত করে। তখন পুলিনই ভরসা। ও এসব ভাল বোঝে। রাত এগারোটা নাগাদ বাচ্চাটা মুখ দেখিয়েছে। সে বাছুর এখন উঠোনময় ছুটোছুটি করছে। মুখখানা মায়াময়।

তো, রাতভর হুজ্জোতি। সকাল সকাল উঠে বারান্দায় বসা হয়নি। ছিষ্টির কাজ সেরে এখন সময় পেয়েছে গজু। কালোয়াতি চালাতে চালাতে স্মৃতির জাবর কাটে ও। প্রতিদিনের মত আজও সেই থালাটা দেখতে পেয়েছে গজু। থালাভরা দুধ কলা, আমসত্ব আর গোটা চারেক সন্দেশ। মহা আনন্দে সব উপকরণগুলি বেশ করে মাখে ও। তারপর গরাসে গরাসে হাপুত হুপুত...। এই থালাই সারাদিনের রসদ ওর। বেঁচে থাকার রসদ। দুপুরবেলা অবসর পেলেই স্মৃতি গনগনে। তারপরে শুরু হয় গান। অন্তরা, সঞ্চারী, স্থায়ী ভেঙে চুরে একাকার হয়ে একটা মন্ডে পরিণত। সেই মন্ডে দুধ কদলী আমসত্ব ইত্যাদি ইত্যাদি শূণ্যে ভাসতে থাকে। ভাসতে ভাসতে গজুর চারপাশে ঘুরতে থাকে। রাখালি করার সব পরিশ্রম সব ওই সুখেই হাওয়া।

খাদক আছে, কিন্তু খাদ্য নেই। এই পরিস্থিতি সম্ভবত উন্মাদনার জন্ম দেয়। গজু সেই উন্মাদনার কারণে কিছুটা স্বপ্ন বিলাসীও। ওর স্বপ্ন – বাস্তব সমস্তটা জুড়েই আছে খিদে নামক এক চামুন্ডা। উদর – আগ্নেয়গিরি নিয়ে ঘুমভাঙে রোজ। স্বপ্নের কথাটা মুখ ফসকে বলেছিল সুমনদাকে। সুমনদা তো অবাক। রোজ দুধ? আমসত্ব? ধ্যাত, ভাল লাগে? বাইক পার্ক করতে করতে থেমে যায় সুমন। কলেজ যাওয়ার কথা ভুলে যায়। অথচ ও ভীষণ পাংচুয়াল ক্লাসের ব্যাপারে। একটা লোক রোজ দুধ কলা...। গজুকে একটু দেখে সুমন। গজুর খালি গায়ে মশার কামড়ের দাগ, সুমনের বাবার পুরনো লুঙ্গি ভাঁজ করে পরা, নোংরা মাথা...। এই লোকটার জন্য সুমন প্র্যাকটিকাল ক্লাস নিতে যেতে দেরি করছে। অ্যাবসার্ড! পেছন ফিরে সুমনকে চলে যেতে দেখে অবাক গজু। আমসত্ব দুধে ফেলি... তাহাতে কদলী... তাহাতে সন্দেশ! শুনেও চলে যেতে পারে কেউ? বাড়িতে জল দিতে আসে বাবুভাই। সেই জলে ব্লিচিং এর গন্ধ। কেনা জলে রান্না হয়। নাহলে সুমনদাদের নাকি ডায়রিয়া হয়। তো বাবুভাই গজুর কথা শুনে হাসে – “খেতে হলে চিকেন, বুঝলি। লাল ঝোলের মধ্যে ইয়াব্বড় ঠ্যাং... আহ,” বলে জিভে ঝোল টানে বাবুভাই। ভ্যান চালিয়ে চলে যাচ্ছে বাবুভাই, ইলেকট্রিক শক খাওয়া গজু বাবুভাইয়ের কথাগুলো নতুন করে ভাবতে বসে। লাল ঝোল! তার মধ্যে ইয়াব্বড় মুরগীর ঠ্যাং! কখনও এই খাওয়াটা ভাবেনি গজু! হাবলার মত পড়ে ছিল দুধ কদলী নিয়ে! এই খাবার খায় খোকারা। গজু কি খোকা? বিয়ে হলে নেই নেই করে পাঁচটি বাচ্চার বাবা হতে পারতো কিনা? নাহ, এখন থেকে গজু রোজ চিকেন খাবে। সেই থালাটা ভাসতে ভাসতে আসবে। তাতে থাকবে লাল ঝোলে ডোবানো মুরগির ঠ্যাং। কিন্তু দেবে কে? ভারি ভাবনায় পড়ে যায় গজু। ওর সমস্যাটা শুনে ভীষণ বিরক্ত মাধু।

স্টীল উল দিয়ে হাঁড়ি, কড়া মাজতে মাজতে থ্যাবড়া নাকটা ফুলিয়ে তাকায় – “যার দরকার সেই মেটায়। বুড়ো হতে চললে, এখনও অন্যের ভরসায় চল? কেমন পুরুষ?”

ক্ষেপে গেল গজু। ও কাজ করেনা? তাহলে মাসিমার বাড়ির সাতসতেরো কাজ করে কে?

-‘কর তো ঠিকই’, মাধু শাড়ির আঁচল টেনে বুক ঢাকে, আড়ে গজুর দিকে তাকায়। গজু ওসব লক্ষ্য করেনি। মাধুর কথাটা মনে লেগেছে। মাধু সেটা বুঝে খুশি। অন্তত রাগটা তো আছে গজুর। এটুকুই এখন অনেক ভাবতে হবে। ক্ষমা চাওয়ার সুরে মাধু বলে– “কাজ করনা বলে ভুল করেছি। এই রকম ভুল হয় মাঝে মাঝে, এটা ভুল ভবিষ্যত। তবে বাপু, অন্যের কাজ না করে হার্গিস নিজের কাজ করতে পার। আজকের দিনে এমনটি কেউ করে?” মাধুর মুখের দিকে অবাক হয়ে তাকিয়ে গজু ভাবতে থাকে। নিজের কাজ মানে কী? ও সুমনদাদের বাড়িতে থাকে। খায় দায়। কাজকর্ম করে দেয়। সেটা নিজের কাজ নয় তবে? অন্যের কাজ? মায়ের কাজ? সুমনদার মায়ের। হাঁস, মুরগী, গরু, বারুইপুরের ভেতরের দিকে পাঁচু ঠাকুরের মন্দিরের আরও ভেতরের দিকে ধানি জমি, ফসলি জমি সুমনদাদের, অনেক লোক দরকার দেখাশোনার জন্য। গরু, হাঁস, মুরগির দায়িত্ব গজুর উপর। এসব গজুর কাজ। কিন্তু এসব গজুর নয়। তবে এই বেগার খাটা কেন? মাধু যে কী বলে! নিজে নিজে রোজগার করার ক্ষমতা কি আছে গজুর? আছে কেবল থুম মেরে বারান্দায় বসে পাহাড় প্রমাণ ভাতের স্বপ্ন দেখার শক্তি। আর মুরগির ঝোলের। কিন্তু একটা জিনিস পস্টো হয়েছে। সুমনদাদার খিদে আছে। মানে, সবারই খিদে পায়? ভেবে খুব মজা পায় গজু। খুবই মজা। কিন্তু বারান্দায় বসে স্বপ্ন দেখে কি খিদে মেটে? ইচ্ছে করলে শরীরের খিদে কোনরকমে মেটানো যায়, পেটের খিদে মেটে না। দেখেছে গজু। শেষরাতে ঘুমটা যখন পাতলা হয়ে এল, তখন গজু বুঝল এবারে বারান্দায় গিয়ে বসতে হবে। সেই স্বপ্নটা দেখতে হবে। কাঁসার বড় বাটিতে লাল টকটকে...। ইসস, ভাবতেই শরীর জুড়ে রোমাঞ্চ। শুকনো শরীরে কাঁটা দিয়ে ওঠে। পেটের ভেতরে ডিগডিগ বাজনাটা বাজতে শুরু করেছে। নিজের মাকে বিশেষ মনে নেই, মধুর মাকে মনে পড়ে। সে বলেছিল, “যার কেউ নেই, তার আছে ভগবান। সে একদিন ঠিক রামধনু দেখতে পায়।” এতকাল ধরে বিশ্বাস করে রাখা শব্দগুলো আজ এই সকালে অবিশ্বাস্য মনে হতে থাকে গজুর। শেষ বিকেলে জলপান্তা জুটেছিল। তাতে নুনটা বেশি চেয়েছে বলে সুমনদার মা জোর ধমক দিয়েছে।

দুপুরে খেতে খেতে বেলা হয়। গরু বাছুরের দেখভাল করে, গোয়াল সাফ করে, হাঁস-মুরগির খাবার ঠিকঠাক খাইয়ে, বাগান ঝাঁটপাট দিয়ে নিজে যখন খেতে বসবে বলে ভাবছে, তখনই সুমনদার মা ডাকে–“ও গাধা, খেয়ে উদ্ধার কর এসে।” কী আনন্দই না হয় তখন। খেতে বসে সেই জলপান্তা দেখে মনটা ঝুলে যায়। জল বেশি, ভাত কম। তাহলে নুনটা বেশি লাগবে না?

ধমক খেয়ে মোড়ের কৃষ্ণচূড়া গাছের নীচের সিমেন্ট বাঁধানো জায়গায় শুয়ে পড়ল গজু। বেশ ছায়া। কেউ বলবে না, ওহে গজু, ওঠ। এটা আমার জায়গা।

জমিয়ে ঘুম আসছে। তবু, তারই মধ্যে রান্নাঘরের সুবাসটা নাকে ভেসে আসছে। মাসিমা আজ আলু পটলের ডালনা করেছিল। চাইতে মুখ খিঁচিয়ে একটু দিয়েছিল। কী সুবাস! আর একটু নেওয়ার ইচ্ছে ছিল, কিন্তু সাহস ছিল না। মাসিমার যা মুখ! ধুর। সেই যে বলে না, ‘কিসের রান্ধন, কিসের বাড়ন, কিসের হলদি বাঁটা, / আঁখির জলে বুক ভিজিল /ভাস্যা গেল পাটা’- এ হল তা-ই। রান্না বান্না হলে কী হবে, গজুর কপালে কি আর...। একটা হৈ হৈ হচ্ছে, তাই না! মাসিমা ঠিক। গজুকে কেন ধমকায় মাসিমা! গজু সব কাজ সেরে রেখেছে। তবে... । ঝট করে তন্দ্রাটা কেটে গেল। উঠে বসে গজু। একটা হৈচৈ হচ্ছে তো! ক্রমে এগিয়ে আসছেও তো! ওহো, মিছিল!জনা বিশেক লোক রাস্তা দিয়ে লাইন করে কোথায় চলেছে। যেতে যেতে কাকে যেন শাসাচ্ছে – দিতে হবে, দিতে হবে।

ধ্যাত! হাই তোলে গজু। কী লাভ এসব করে? কার কাছে চাইছে এরা? কেই বা শুনছে এই শাসানি? ফের শুয়ে পড়তে গিয়ে থমকাল গজু। আচ্ছা! ওই মিছিলে অমলের ভাই পরশ ছিল না? ও আবার কী চায়? চাইলেই পাবে নাকি? বেকার অসময়ে হাঁটাহাঁটি! খিক খিক করে হাসতে থাকে গজু। কত আজব বস্তুই যে আছে এই দুনিয়ায়! মাগো মা, পরশও শাসাচ্ছে? হেসে গড়িয়ে পড়ে গজু। উফ!

সন্ধের মুখে পরশের সঙ্গেই দেখা হয়ে গেল পানভান্ডারের সামনে। লম্বা সরু দড়ির এক প্রান্তে এই একটুখানি আলো জ্বলছে। সেখানে মুখ এগিয়ে সিগারেটে আগুন ধরায় পরশ। তারপর গলগল ধোঁয়া ছাড়ে বাতাসে। গজু হেসে এগিয়ে যায় – ‘কি রে পরশ? কী চাই তোর? মিছিল করে চাইলে কী পাবি? তার চে মন্দিরে যা। প্রার্থনা করে দ্যাখ যদি কিছু পাস।’ হাসিটা লুকোয় না গজু।

চোখ ছোট করে গজুকে দেখে পরশ –‘তাই নাকি? তুই যাস না কেন? শুনেছি তোর পেট ভরে না! মাসিমার জমিতে তোর ভাগ আছে। যা, চেয়ে নে।’

-‘চাইলেই কি পাওয়া যায়? তোদের মত হাত তুলে কাকে শাসাবো? দিতে হবে বললেই দেয়? তুই পেলি কিছু?’

পরশ সেভাবেই তাকিয়ে থাকে – ‘বহুদিন তো মাসিমার গরু বাছুর সামলালি। আর ক’দিন? মিছিলে ঢুকতে চাস তো বল। চেয়ে চিন্তে দ্যাখ সুমনের মা তোর ভাগটা দেয় কিনা। কদিন আর জলপান্তা খাবি?’

-‘হুস, মিছিলে ঢুকলেই কি পাওনা টাওনা পাব?’ হাসতে থাকে গজু।

-‘দেখবি।’

কোন কাজ নেই, তাই খই ভাজাটাই বেশ। তিনদিন পরে পরশ খবর পাঠাল, আজ একটা নাগাদ ক্লাবের মাঠে ... যদি গজু আসতে চায় ...!

গেল গজু। রাখালির পাট চটপট মিটিয়ে বাসিপান্তা সেরে ক্লাবের মাঠে গেল। গিয়ে তো বাকশূন্য। এ কী-ই! এত লোক! মেলা নাকি?

-‘লোক হবেই তো। সবারই কিছু না কিছু চাই। না চাইলে কে দেবে? আমরা জনগন। আমাদের অধিকার কারও চেয়ে কম নাকি?’

বাহ, বেশ কথা শিখেছে ছেলেটা! কী বা বয়স!ওর দাদাই তো গজুর বয়সি। অথচ দেখ, কত বুদ্ধি!

মাঠ জুড়ে চেঁচামেচি। বাচ্চা কোলে মা–ও আছে। ও বাবা, এদের আবার কী চাই? মাথা নাড়ে গজু। সবজান্তার মতো। খিদে! সবার খিদে আছে। সেটা মেটাতে চায়। স্বপ্ন টপ্নও দেখে বোধহয়। এক বুড়োকে নিয়ে এদিকে আসছিল পরশ। হাতের ইশারায় গজুকে ডাকল – ‘এই যে, ওর কথাই বলেছিলাম। নতুন জয়েন করেছে গজু।’

বুড়োর তীক্ষ্ণ চোখ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে গজুকে দেখে। ভারী অস্বস্তি। চোখটা কোনদিকে সরাবে বুঝে উঠতে পারেনা গজু। হাতের নড়বড়ে লাঠি মাটিতে ঠুকে ঠুকে কী যেন ভাবতে থাকে বুড়ো।

-‘পারবে? নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। মনে বল আছে?’

বোকা বোকা মুখে তাকিয়ে হাসে গজু। ওর অবস্থা দেখে পরশ সামাল দিতে এগিয়ে আসে – ‘খেতে পায়না। পেলে হয়তো…।’

মিছিল শেষে চা পাঁউরুটি পেল ওরা। নরম পাঁউরুটিতে গলা আটকে আসে। তখন এক ঢোক গরম চা খাও, আ-রা-ম! গজুর ভরা পেটের আরামের মত আরাম আর কী আছে?

সেই শুরু। এখন মিছিল মানেই গজুর কাজ বেড়ে যাওয়া। লাইনের শেষে দাঁড়ালে খুব বেশি চেঁচাতে হয়না। বরং ঢিলেঢালা হেঁটে বেড়াতে ভালই লাগে। আর দুপুরের দিকে, কি সন্ধেবেলা চা রুটি, কখনও ডালভাত জুটে যাচ্ছে। পরশ গজুকে দেখে। বুড়ো নাকি বলেছে।

বুড়ো কী বলল? গজু স্বপ্ন দেখতে শুরু করে। বুড়ো লাঠি ঠুকে ঠুকে বলছে – ‘ছেলেটা ভাল, কিন্তু খেতে পায়না। ওকে একদিন সাদা ভাত আর মুরগির লাল ঝোল খাইয়ে দিও।’ পরশকে জিজ্ঞেস করেই ফেলে গজু কথাটা। কী বলে বুড়ো? –‘কী আর? বললেন, ছেলেটাকে দরকার। যত লোক, তত শক্তি। বুড়োর মনে শান্তি নেই রে!’ পরশ শ্বাস ফেলে। গজুর খুব গর্ব হয়। পরশ ওকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করছে না। বন্ধুর মত কথা বলছে। কিন্তু বুড়োর কী এমন দুঃখ! পরশ ফের শ্বাস ফেলে – ‘বয়স হয়েছে, না? একজনকে চাই। নিজের জায়গায় বসাতে হবে, মানে, উত্তরাধিকারী খুঁজছে বুড়ো। নেতা বানাবে।’ শুনে গজুর শুকনো বুকে উথাল পাথাল দেয় এক মস্ত নদী। নেতা মানে বিশুবাবুর মত? দাম জিজ্ঞেস না করেই ইয়াব্বড় চিতল কেনে যে? সেদিন গজু অনেকটা রাস্তা বিশুবাবুর থলির পিছন পিছন হেঁটেছিল। যদি এমন হয়, বুড়ো গজুকেই নেতা বানাল? তখন কি গজুর চালকল, তেল কল, পেট্রলপাম্প…? কিছুই বলা যায়না। খনা বলে, হাল নিয়ে মাঠে যবে করিবে গমন, আগে দেখ চাষীভাই হয় যেন শুভক্ষণ। তো, এখন গজুর জীবনে শুভক্ষণই আসছে যেন! ভেবে ভেবে শান্তি নেই গজুর। কখন যে বুড়োর বাসায় পৌঁছে গেছে খেয়াল নেই। বাসা-ই। একটা চৌকি, কাঠের টেবিল, আর একটা আলমারি। ঘরের কোণে স্টোভ। কিছু ঝুল কালির বাসনপত্র। গজুকে দেখেও কিছু বলল না বুড়ো। একবার জানতে চাইল না- ‘কেমন আছ? তোমার খিদের খবর কী? শরীরে বল পাও কিনা?’

কোনরকম আপ্যায়ন না পেলে যে স্বস্তি হয় না, সেটা বোঝে গজু। অস্বস্তি কাটাতে ঘরের কোণে রাখা বেঞ্চির ওপর আর তিনটি মানুষের পাশে বসে পড়ল ও। একটু একটু খিদে পাচ্ছে। পেটের মধ্যে খিদের বাজনা বাজতে শুরু করেছে ডিগডিগ ডিগডিগ…। ধপধপে সাদা চুলের বুড়ো জানতে চায় – মিছিলের লোক জোগাড় হল কিনা!

-‘হ্যাঁ। বেঞ্চে বসে থাকা একজন উঠে দাঁড়ায়।’

-‘কত হবে? বুড়ো বাতাসে গন্ধ নেয়।’

-‘পাঁচশো হবে।’

-‘দুশো আসবেনা ধরে রাখ। তিনশো হবে বলছ?’

-‘হবে, দুপুরের খাওয়া দিতে হবে।’

-‘খাওয়া?’ বুড়ো ভারি অবাক যেন। খাওয়া শুনলে লোকে যে কেন তটস্থ হয়ে ওঠে বুঝতে পারেনা গজু।

-‘সে হবেনা। পারহেড দশ টাকা। আইনভঙ্গ করতে যাচ্ছে, এত চাহিদা কেন?’ বুড়োর ভ্রু সোজা হয়না। গজুর বুকের ভেতরে ডিগডিগ বাজনাটা বাজতে থাকে। দ-শ-টি টাকা! গজুও পাবে? সত্যি সত্যি আকাশ জুড়ে রামধনু উঠবে এবার। মাঠের এ কোণ থেকে ওই কোণ অব্দি। কে যেন বলেছিল, ঝাঁ চকচকে রামধনু যখন মাঠের এ কোণ থেকে ও কোণ পর্যন্ত উঠবে, সেদিন সবার সব আশা পুর্ণ হবে। বুড়োর দিকে আর মন ছিলনা গজুর। পরশ কোথায়? ওকে চাই।

সব শুনে চোখ সরু করে তাকায় পরশ। ইদানিং ওর থুতনিতে মাংস জমেছে। বাম হাত খানা অজান্তে সেখানে চলে যায় বারবার। গজুর শুকনো মুখ আর তেলতেলে লোভী চোখটা দেখে ও – ‘তুই-ও পাবি। সকলে পাবে। ওই টাকায় অনিতা পাইস হোটেলে ডালভাত সবজি হয়ে যাবে।’

ধ্যাত্তেরিকা! ডাল আর ভাত! কতকাল ধরে এই ডালভাত চলবে গজুর জীবনে? লাল ঝোলের ভেতর থেকে মুরগির ঠ্যাঙের কি এখনও আসার সময় হয়নি মা তারা?

-‘তোর এত খিদে কেনরে? কিছুতেই মেটেনা! বেশ, সন্ধে নাগাদ দেখা করিস, মাছ-ভাত খাইয়ে দেব।’ তো সেদিন আসতে আরও দুটো দিন কেটে গেল। সকাল থেকেই গজু রেডি। গোয়াল সাফ করল। পরশ একদিন ওর গায়ে গোবরের গন্ধ পেয়ে নাক সিঁটকেছিল – এবারে এসব ছাড়। গজু বোঝেনা এসব ছেড়ে দিলে তিনটে বাসী রুটি আর একগ্লাস লাল চায়ের মায়া ছাড়তে হয়। তবে পরশকে রাগালে চলবে না। স্নানটা এই ফাঁকে সেরে নিল ও। গা মুছতে মুছতে মিছিলের কথা ভাবে গজু। আজ নাকি কোন অফিসের সামনে গিয়ে দাবিদাওয়া জানাতে হবে। বিশাল ব্যাপার নাকি! বুড়ো তো আছেই, অন্য কারা সব নেতারাও থাকছে। অতশত জেনে লাভ নেই গজুর। মাছ ভাতটা সন্ধেবেলা। সেটাই জরুরী।

বেলা দুটো নাগাদ মিছিল বের হল। আজ মিছিলটা হয়েছেও! জমজমাট। এক নেতা বেশ বললেন। তবে, ভারি শক্ত কথা। সবটা না বুঝলেও দুঃখীদের কথা বলা হচ্ছে, তা বুঝেছে গজু-‘কার্পেটের নীচে আমরা ঢেকে রেখেছি ছেঁড়া চটি, পোড়া বিড়ি, বমি, রক্ত, বাহ্যের দাগ, খিদে, কার্তুজের শূন্য খোল। আজ আমরা সেই লাল কার্পেট তুলে ফেলব…। বন্ধুগণ…।’ গজু শুনতে শুনতে মোহিত হয়ে যাচ্ছিল। একটা জায়গায় মিলে যাচ্ছে ওর সঙ্গে। কার পেটের কথা হচ্ছে বুঝেছে ও। দুঃখীদের। তারাই তো খিদে চেপে রাখে। ঢেকে রাখে। এতদিনে এখানে আসা, মিছিলে হাঁটা সার্থক হয়েছে ওর। খিদের কথা মনে পড়েছে সবার। খুশি মনে শিস দেয় গজু। একটা ছোকরাকে ডাকে – ‘কত লোক হয়েছে?’ শুকনো মুখ ছোকরা খ্যাঁক করে উঠল – ‘গুনেছি নাকি?’ এই সময় কে চেঁচাল – চল, চল, পা চালাও। অনেক লোক চেঁচিয়ে উঠল – ‘আমাদের দাবি মানতে হবে… দিতে হবে।’ দিলে নিতে হবে। এই বিশ্বাসে এগিয়ে যাচ্ছিল সবাই। মিছিলের প্রথম দিক থেকে পিছিয়ে পিছিয়ে শেষের দিকে চলে আসে গজু। পেছনে থাকলে গা এলিয়ে হাঁটা যায়। রগ ফুলিয়ে চেঁচাতে হয়না অত। সেভাবেই এগিয়ে যাচ্ছিল। সহসা একটা চিৎকারে সজাগ হয়ে উঠল। কী একটা হচ্ছে! মিছিলটা কি ভেঙে গেল নাকি? সব ছত্রভঙ্গ হয়ে যাচ্ছে যে! কারা চেঁচিয়ে ওঠে – লাঠিচার্জ হচ্ছে!

উঁকি দিয়ে লাঠিচার্জ বস্তুটা সম্পর্কে জ্ঞান আহরণ করতে গিয়েছিল গজু। পরশের কপাল বেয়ে রক্ত পড়ছে। দুটো ছেলে ওকে ধরে নিরাপদ জায়গায় সরিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। কারা সব মাটিতে লতর পতর। শুকনো মুখ ছেলেটাকে কারা বেদম পেটাচ্ছে। এরই মধ্যে স্লোগান চলছে – আমাদের দাবি…। বাচ্চা কোলে মহিলাটি দৌড়ে পালাচ্ছিল। বাচ্চাটা ত্রাসে কেঁদে উঠল – ও ম্মা অ্যা।

সামগ্রিক পরিস্থিতিতে হতচকিত গজু কর্তব্য বুঝতে পারছিল না। মাথার ভেতরে বাজনাটা বাজতে শুরু করেছে। খিদের স্বপ্নটা চুরমার করে দিচ্ছে কেউ। এক একটা লাঠির আঘাত পাকস্থলী ভেদ করে রক্ত মজ্জায়, শিরা – উপশিরায় ঢুকে যাচ্ছে। দীর্ঘদিনের যন্ত্রণাটা পাক দিয়ে উঠছে ফের। সেই মুহূর্তে বাচ্চাটা কেঁদে উঠল। কান্নাটা কানে ঢুকতেই চমকে ওঠে গজু। অনেকদিনের অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ গজু রাখালের কানে সদ্য জন্মানো বাছুরের অস্ফুট ম্মা শব্দটা ঢুকল। মাতৃজঠর থেকে এইমাত্র জাগতিক পরিবেশে পৌঁছে গেল গজু। রগ ফুলিয়ে বীভৎস চিৎকার করে উঠল ও – ‘দিতে হবে … । সব কেড়ে নিচ্ছে! সব! এদের বাধা দাও গজু। কেড়ে নাও সব।’

চোখের সামনে বিদ্যুৎ চমকায়। অসহ্য যন্ত্রণায় চোখের সামনে রামধনু দেখে গজু। মাঠের এ কোণ থেকে ওই কোন পর্যন্ত বি-শা-ল রামধনু! ঝাঁ চকচকে একটা বাছুর জন্ম নেয়। নির্ণিমেষে প্রাণীর জন্ম দেখে গজু।

দিন দুই পরে বুড়োর বাসার বেঞ্চের ওপর বসেছিল ও। কপালের ওপর কাপড়ের ফেটি ভেদ করে রক্তাভা দেখা যায়। পরশ এক লাঠি বেচনেওলাকে ডেকে এনেছিল। বুড়োর হাতের নড়বড়ে লাঠি দিয়ে আর চলছে না। লাঠিগুলো ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখছে বুড়ো। সপাং করে বাতাস কেটে দেখল। এটা মোটামুটি। খুব শক্ত পোক্ত নয়। তবে ব্যবহার করতে করতে হয়তো একদিন …।

ওটাই নিচ্ছেন? পরশ জিজ্ঞেস করে।

-‘নিয়ে দেখি। মনে হয় কাজ হবে।’ বুড়োর সাদা চুলে রামধনুর সাত রঙ। দেখতে দেখতে পা তুলে বসে গজু রাখাল। কাজ শুরু হচ্ছে।

প্রচুর কাজ। পরবর্তী মিটিঙের দিন ধার্য হল … গজুকে ডাকো। বুড়ো মুখ তুলে বোধহয় ওকেই খোঁজে।

প্রচুর কাজ। গজু সশব্দে শ্বাস ফেলে। কত কাজ। আমসত্ব দুধে ফেলে, তাহাতে কদলী, তাহাতে…। কী স্বাদ কাজের! কী স্বাদ বুড়োর চুলের রামধনুর। কী স্বাদ বুড়োর ওকে খোঁজা …! মাটিতে পা রাখে গজু। তবে রাখালিটা বোধহয় গেল। নাকি শুরু হল?... ভাবতে চেষ্টা করছিল গজু।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%