সাগরিকা রায়
মানসমুকুল বাজারের ব্যাগটা হাতবদল করতে গিয়ে ফোনের রিং টোন শুনেছিল। পাত্তা দেয়নি। বাজার করার সময় ও এসব দিকে তাকায় না। কেবল বাজার করা বললে ভুল হবে। রাস্তা পার হতে গিয়ে, কি মেট্রোতে উঠছে … তখন কারও ফোন ও রিসিভ করবেই না। তৃণা বারণ করেছে। তৃণা বলেছিল, “ট্রেনে ওঠার সময়ে যদি ফোন বেজে ওঠে, রিসিভ করবে না। মনে রেখ। অ্যাকসিডেন্ট কিন্তু এভাবেই হয়!”
মনে রেখেছে মানসমুকুল। ছেলে সোহমকেও পইপই করে শিখিয়ে রেখেছে। ছেলে কখনওই বাইরে গেলে ফোন করে না। টুইশন থেকে ফিরতে দেরি হলেও ফোন করে জানাবে না। মানসমুকুল যে ফোন করে খবর নেবে, তার উপায় নেই তৃণার জন্য। তৃণার টেনশন হলেও সহ্য করে যায় – “আহ, অমনি কর না। আসবে। রাস্তাঘাটের কথা তো জানই। ও ঠিক সময়ে ফোন করবে।” বলতে বলতে সোহমের ফোন এসেছে “আমি আসছি। মেট্রোতে আছি।”
ব্যস! তৃণার মুখে হাসি, “দেখেছ তো!”
মানসমুকুলও নিশ্চিন্তে ল্যাপটপ নিয়ে বসেছে। শুভ্রা দত্তর সঙ্গে চ্যাট করতে বেশ লাগে। মহিলা বন্ধুসুলভ কথাবার্তা বলেন। মানসমুকুল মাঝে মাঝে তৃণার সঙ্গে শুভ্রার মজাদার কথা শেয়ার করে। তৃণা জানে শুভ্রার কথা। সেসব নিয়ে ওদের মধ্যে কোনও সমস্যার সৃষ্টি হয়নি। তৃণার ফেসবুক ফ্রেন্ড অনিমেষকে নিয়ে অবশ্য মাঝে মাঝে তীর্যক মন্তব্য ছোঁড়ে মানসমুকুল। তা সেও খানিকটা খুনসুটি টাইপ। মাঝে রাগারাগি করে অনিমেষকে ব্লক করেছিল তৃণা। পরে আফশোস হলে, এবং অনিমেষের অবিশ্রান্ত অনুরোধেও যখন ফের অনিমেষকে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাতে পারছিল না, তখন সোহম টেকনিক্যালি সলভ করে দিয়েছিল প্রবলেমটা। ফের অনিমেষ আর তৃণার চ্যাটিং চলছে। সোহমের সঙ্গেও অনিমেষের ফ্রেন্ডশিপ রয়েছে। মানসমুকুলকে বলেছিল তৃণা। কিন্তু মানসমুকুল অনিমেষকে বন্ধু বানাতে আগ্রহ দেখায়নি। তৃণা ঠোঁট বেঁকিয়েছে- জেলাস!
সোহম আজ বাড়ি ফিরে স্যালাদ বানাতে বানাতে মার দিকে তাকিয়ে অল্প হাসল। ঠিক সরাসরি হাসল বলা যাবে না, ঠোঁট আর চোখ নরম মায়াময় আলো ছড়াল। তৃণা বুঝল কোনও ভাল খবর আছে। ও আগ্রহ নিয়ে তাকিয়েছিল। সোহম স্টিমড চিকেনে ভিনিগার, পিনাট বাটার, মেয়োনিজ মেশাতে মেশাতে প্রোজেক্টের কথা বলল। আজ কাজ খুব ভাল হয়েছে। এরপর আরও কাজ করতে হবে। তৃণা মুগ্ধ হয়ে ছেলের মুখের দিকে তাকিয়েছিল। ছেলেটা বিদেশে পড়তে যাওয়ার জন্য তৈরি হচ্ছে। ভাত খেতে বড্ড ভালবাসে। সঙ্গে কষা মাংস, গলদা চিংড়ি, আড় পাতুড়ি… গরম ভাতে মেখে খেতে ভালবাসে। অথচ বিদেশে গেলে খাদ্যাভাসে পরিবর্তন আনা দরকার। বাইরে গেলে ঘরের খাবার পাবে না। সেই জন্য এখন থেকেই খাদ্যাভাসে চেঞ্জ এনেছে। তৃণার খারাপ কি লাগে না? লাগে। কিন্তু, ছেলেটার মনের ইচ্ছে পূর্ণ হোক, এটা চায় তৃণা। মানসমুকুল কতদিন দুঃখ করেছে। খুব ইচ্ছে ছিল আরও পড়াশোনার। মা মন খারাপ করা গলায় বলেছিল, “বেশ, যাও। আমরা না হয় নুন-ভাত খেয়ে থাকব।” মানসমুকুল সেদিন সারারাত ঘুমোতে পারেনি। ইতিহাস সাবজেক্টটা বড্ড ভাল লাগে। ইচ্ছে ছিল, এই বিষয়টা নিয়ে গবেষণা করবে। বিদেশে পড়াবে। অনেক গভীরে যাবে ইতিহাসকে নিয়ে। ছেলেকে বলেছে সেসব দুঃখের কথা। তৃণাকে বললে অমনি শাশুড়ির দিকে আঙুল তোলে, “তোমার এত আগ্রহ দেখেও উনি…!” সোহম যখন বিদেশে পড়তে চেয়েছে, তৃণা সাপোর্ট করেছে, “চেষ্টা করে দেখ। যদি পারিস, আমি আটকে রাখব না। তবে পড়া শোনাটাই এক্ষেত্রে মুখ্য। রেজাল্ট দিয়ে, নানারকম এক্সাম দিতে হয়, সেসব করে নিজের মান রেখে যদি পারিস, যাবি।”
মানসমুকুল ক্লাসে ইতিহাস পড়াতে পড়াতে যুদ্ধের পর্যায়ে এসে থমকে যায়। এই যুদ্ধের কি দরকার ছিল? এক একটা রাজা নিজের নিজের সাম্রাজ্য বিস্তার নিয়ে ভেবেছে। সারাক্ষণ যুদ্ধের ভেতর দিয়েই যাত্রা। এত যুদ্ধ দেখতে তাঁদের রানীদের, বেগমদের ভাল লাগতো? নাকি তাদের রক্তে মিশে গিয়েছিল যুদ্ধ বাপ পিতামহের ধারা নিয়ে? আদিম মানুষ যুদ্ধ করেছে আদিম প্রাণীদের সঙ্গে, দুর্যোগের সঙ্গে। এরপরেও যুদ্ধ থামেনি। মানুষ ক্রমে সভ্যতার দিকে এগিয়েছে, সেও যুদ্ধই! ক্রমেই যুদ্ধের ধারা বদলেছে। সভ্যতা যত এগিয়ে যাচ্ছে, যুদ্ধের ধরণ তত পালটে যাচ্ছে। প্রত্যেকটা মানুষ স্ব স্ব ক্ষেত্রে যুদ্ধই তো করে চলেছে। মানসমুকুল কি করছে না? করেনি?
আজ ক্লাসে কন্সট্যান্টিনোপল নিয়ে পড়াচ্ছিল। প্রিয় চরিত্র কন্সট্যানটাইন। আজারবাইজান এশিয়া মহাদেশের প্রজাতন্ত্রী রাষ্ট্র। কৃষ্ণসাগর ও কাস্পিয়ান সাগরের মাঝামাঝি দক্ষিণ ককেশাস অঞ্চলের সবচেয়ে পুবে অবস্থিত রাষ্ট্র। বাইজানটাইন হল ঊনবিংশ শতাব্দি থেকে মধ্যযুগীয় গ্রীকভাষী রোমানদের দ্বারা পরিচালিত সাম্রাজ্য যা গড়ে উঠেছিল কন্সট্যান্টিনোপলকে ঘিরে। কন্সট্যান্টাইন প্রথম রোম থেকে রাজধানী বাইজেন্টিয়ায় সরিয়ে আনেন। এক অপ্রতিরোধ্য সাম্রাজ্য গড়ে তুলতে চেষ্টা করেছিলেন। অনেকটা এগিয়েও ছিলেন।
পড়াতে পড়াতে সুপ্রিয় স্যারের কথা মনে পড়ে। কেমন চমৎকার করে বুঝিয়ে বলতেন,যেন সামনে ঘটে যাচ্ছে ঘটনাগুলো। ইতিহাস বইএর পাতায় হালকা করে স্কেচ করা কন্সট্যানটাইনের মুখটা আজও স্পষ্ট মনে আছে। আচ্ছা, সুপ্রিয় স্যার কোথায় আছেন এখন?
ঘণ্টা পড়ে গেল। আরেকটু পড়ানোর ইচ্ছে ছিল। বাকিটা নেক্সট দিন হবে। টু দি পয়েন্ট করে বোঝাতে পারলে অঙ্কের মত নম্বর তুলে নেওয়া যায় আর্টস সাবজেক্টেও। তৃপ্ত মুখে ক্লাস থেকে বের হল মানসমুকুল। ক্লাস সিক্সেই পড়েছিল সম্ভবত এই চ্যাপ্টারটা। দেবার্ঘ্যজ্যোতি বলেছিল, “এই কোশ্চেনটা পরীক্ষায় এলে, পড়া থাকলেও আটেন্ড করব না। কন্সট্যানটাইন বার দশেক লিখতে লিখতে ওয়ার্নিং বেল পড়ে যাবে।”
অঙ্কিত মুচকি হেসেছে, “আর বাইজানটাইন?”
অল্প হাসি ঠোঁটে নিয়ে কমনরুমে ঢুকতে মানব সরকারের কৌতূহলী প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হল, “কী? টিউশন বাড়ল নাকি আরও? খুশি খুশি মুখ দেখতে পাচ্ছি।”
ধুস, এই লোকটা টাকা ছাড়া কিচ্ছু বোঝেই না। ও নাকি কবে ফুটবল খেলা দেখতে গিয়েছিল। এদিকে মোবাইল খুলে ছাত্রের বাবার সঙ্গে ডিল করছিল। খেলা খেলার মত চলছে, মানবের খেয়ালই নেই। একটা সময় ডিল কমপ্লীট হলে ফোন অফ করে তাকিয়েছে মাঠের দিকে, “ কারা খেলছে অ্যাঁ?”
পাশে ছিল প্রশান্ত পাল। মানবের অবস্থা দেখে হেসেছে, “অনেকগুলো স্টুডেন্ট খেলছে। বাইশ জন। তোমার কোচিং এ নেবে নাকি?”
মানবের কথার জবাব না দিয়ে বোতল থেকে জল খেল মানসমুকুল। একটা চিন্তা রয়েছে। এখানে বলা যাবে না। বললেই অমনি তেড়ে ফুঁড়ে উঠবে সব, “ভুল করছ, ভুল করছ মানস! ছেলে কিন্তু হাতছাড়া হয়ে যাবে বলে দিচ্ছি। কত দেখলাম! আরে, ওই যে দীপ্তেনবাবু? চেন তো? বাজারের ধারে বাড়ি? হেলথ ডিপার্টমেন্টের দীপ্তেনবাবু, কী কান্ড করেই না ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছেন। এখন অসুস্থ হলে কে দেখবে?”
মাত্র কিছু মাস আগে সোহমের ইচ্ছের কথাটা কমনরুমে বলেছিলেন কথা প্রসঙ্গে। অমনি ঝড় নেমে এসেছিল। কথার ঝড়। কতরকম ভাবেই না সোহমকে পিছিয়ে আসার কথাটা বলতে বলেছিল সবাই মিলে। অনিমেষবাবু চক নাচাতে নাচাতে বিচ্ছিরি হেসেছিলেন, “বয়স হচ্ছে, তোমার বাজার করবে কে? ডাক্তার মোক্তার ডাকতে হলে কে আসবে? বিকাশবাবুকে দেখছ তো? বুড়োবুড়ি বিকেলে ঠায় বারান্দায় বসে থাকে। সে তো ছেলের অপেক্ষায় বসে থাকা! আর মিসেস মজুমদার এবাড়ি ও বাড়ি ঘুরে ঘুরে দুঃখ করেন। মেয়ে বিয়ে করে বিদেশে রয়ে গেল। এখন একশো গ্রাম মুড়ি আনতে হলেও পাড়ার লোককে ধরতে হয়। আর একটা কথা, এরপর মেমসাহেব বউ নিয়ে এলে তার স্কার্ট কেচে দিতে হবে, মনে রেখ।” মানুষ একটু ভাল চোখে কিছু দেখতে পায় না কেন? এই যে, সোহম, বাইরে ভাল ইউনিভার্সিটিতে পড়বে বলে চোস্ত ইংরেজি শিখেছে। কী করে আমেরিকান আক্সেন্টে কথা বলে ও? ব্রিটিশ লাইব্রেরিতে যাতায়াত করতে করতে মর্গান, রিকি, জ্যাক... এর সঙ্গে আলাপ। এরপর আলাপ ঝালিয়ে নিতে তৎপর হয়ে পাক্কা তিনটি মাস ওদের সঙ্গে গালগল্প করেছে। সেটা সময় কাটাতে নয়। উদ্দেশ্য নিয়েই। টোয়েফেলএ দুর্দান্ত র্যাঙ্ক এসেছে সোহমের। নিজের চেষ্টায় এনেছে। একটা ভাষার প্রতি এত ভালবাসা দেখা যায় না। মা, বাবা সাপোর্ট দিচ্ছে অবশ্যই। কিন্তু সাধনা তো ওরই! মানসমুকুলের ইচ্ছে ছিল সোহম ফিজিক্স নিয়ে পড়ুক। সোহমের ইচ্ছে কেমিস্ট্রি। মানস বাধা দেয়নি। পড়ুক, যেটা মন চায়।
আজ পাসপোর্ট হল সোহমের। একটু আগেই তৃণা ফোন করে খবরটা দিয়েছে। ও খুশি। আবার মনটা একটু খারাপ হয়নি, এমনও নয়। এইটুকু বাচ্চাটাকে পুতুলের মত যত্নে মানুষ করেছে। নিজের শখ শৌখিনতার দিকে নজর দেয়নি। ছেলে অন্ত প্রাণ। কষ্ট হবে এ আর নতুন কথা কী! একটু একটু করে পা ফেলছে ছেলেটা। স্টেপ বাই স্টেপ। তৃণা বলে, “আগেই গাছে চড়বি না। মাটিতে দাঁড়িয়ে গাছের উচ্চতা দেখে নিয়ে আস্তে আস্তে শুরু কর। একথালা ভাত কি একবারে খাই আমরা? এক গ্রাস এক গ্রাস করেই তো? বল? ঠিক ওভাবেই...!” ছেলেটা কথা কম বলে। চুপচাপ মায়ের কথা শুনতে থাকে। মানসমুকুলের কেমন ভয় ভয় করে। সব ঠিকঠাক হবে তো? ছেলেটা পারবে তো স্বপ্ন পূরণ করতে? যদি না হয়? তাহলে কী হবে? তৃণা থামিয়ে দেয় মানসমুকুলকে, “আগেই হতাশ হচ্ছ কেন? হলে হবে। নইলে নয়। চেষ্টা করছে। করতে দাও। তাতে কী দোষ আছে? ভয় করছে, সেটা ওকে বুঝতে দিও না। বরং সাহস দাও। ও পারবে। যেসব পরীক্ষা দিতে হচ্ছে সবটা ভাল হচ্ছে। ওর কনফিডেন্স আছে।” একটু থামে তৃণা। ঘরের হালকা অন্ধকারে ওর সিল্যুট মুর্তি প্রাচীন কোন রানীর মত মনে হয় মানসমুকুলের। তৃণা আস্তে আস্তে স্বগতোক্তি করে, “এত আকাঙ্ক্ষা মিথ্যে হতেই পারে না। আর, আমরা জুলুম করে পাঠাচ্ছি না। যা করছে নিজের ইচ্ছেতে।” তৃণা ওপাশ ফিরে শোয়। ওর লম্বা বিনুনি সাপের মত বালিশের ধার ঘেঁষে শুয়ে থাকে আদুরে পোষ্যের মত। মানসমুকুলের মায়ের এরকম লম্বা চুল ছিল। তেল দিয়ে হাত খোঁপা করে রাখত মা। কী একটা তেল মাখতো, খুব সুন্দর গন্ধ ছিল। এখন মা সেই তেলটা মাখে না? বিধান মার্কেট থেকে মাসকাবারি করে আসার সময় বাবা নিয়ে আসত।
বাবা! বাবা চেয়েছিল ছেলে আরও পড়ুক। উচ্চশিক্ষা নিক। গবেষণা করতে চায়, দেখুক চেষ্টা করে। মানসমুকুলের বড্ড ইচ্ছে ছিল নালন্দার ধ্বংসাবশেষ দেখার। অজন্তা, ইলোরা দেখার। নিদেনপক্ষে মুর্শিদাবাদটাও দেখা হয়নি। ইচ্ছেগুলো কাটা পড়া ডানা ঝাপটে ঝাপটে পড়ে আছে এককোণে। পরিবারের সদস্য সংখ্যা বেশি ছিল। দিদা, মাসি, মাসতুতো দিদি সব বাবার আশ্রয়েই ছিল। হয়তো মা ভয় পেয়েছিল ছেলে বাড়ির বাইরে থেকে পড়াশোনা করতে গেলে অর্থনৈতিক অবস্থায় টান পড়বে, তাতে পরিজনদের অবহেলা হবে ভেবে। আস্তে আস্তে ইচ্ছেগুলোকে বুকের ভেতরে ছিটকিনি আটকে রেখে দিল মানসমুকুল। কাউকে দেখতে দেয়নি কখনও। পীযূষ সাউথ আফ্রিকায় চাকরি নিয়ে চলে গেল। যখন আসতো, স্বস্তির ছাপ দেখতে পাওয়া যেত পীযুষের চেহারায়। স্কুলের চাকরিতে ঢুকে পড়ার জন্য মা চাপ দিয়েছে। বাবার রিটায়ারমেন্টের আগেই যাতে মানসমুকুল চাকরিতে জয়েন করতে পারে, সেটা দেখেছে মা। চিরকাল সংসারকে ভালবেসেছে বলে গুছিয়ে ভাবতেও শিখেছে। মানসমুকুল একদিন অসময়ে বাড়িতে এসেছিল। হঠাৎ করে ছুটি হয়ে গিয়েছিল কোন কারনে। এসে বাড়ির ভেতরের গুপ্ত আলোচনা শুনে ফেলেছে। মা রসিয়ে রসিয়ে অহঙ্কার নিয়ে বলছিল, “ছেলেকে বাইরে পড়তে পাঠালে বোকামি করতাম। বাইরে চলে যাওয়া মানে বিয়ে থা করে বাইরে বাইরে থাকবে। বাইরে চাকরি করবে। বাড়িতে আসবে কালে ভদ্রে। আমাদের দেখবে কে?”
শুনে ঘরের ভেতরে ঢুকতে ইচ্ছে হয়নি মানসমুকুলের। কাগজফুল গাছের কাছে দাঁড়িয়ে রোদে ঝলসে যাওয়া গন্ধহীন ফুলগুলো দেখছিল ও। চড়া রোদে ফুলের রঙ ফেড হয়ে গিয়েছে। একটু জল দেবে ভেবে পরে ভুলে গিয়েছে। তারপর থেকেই নিজেকে গুটিয়েই রেখেছে মানসমুকুল। সোহমের কথা জানে মা। গুম হয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখে। সে মুখে কিছু বলছিল না। সেদিন থাকতে না পেরে বলেই দিল, “বোঝ তোমরা। ভুল করছ, সেটা ভেবে দেখ। এই ছেলে কিন্তু হাত ফসকে গেল বলে দিচ্ছি। দাসীর কথা বাসি হলে বিশ্বাস হয়।”
কে দাসী, কে দাস, সেসব নিয়ে ভাবে না মানসমুকুল। তৃণা বিয়ের সময় বাড়ি থেকে কিছু টাকা পেয়েছিল। ওর বাবা মেয়েকে আকাউন্ট খুলে দিয়েছিলেন। মোটা টাকা ফিক্সড ছিল ব্যাঙ্কে। সে টাকা নানা খাতে রেখে রেখে সোহমের জন্য ব্যয় করছে তৃণা। মানসমুকুল নিজের সঞ্চয়ের অনেকটাই রেখেছে সোহমের জন্য। জমি খানিকটা বাপ-মা তৈরি করে রাখুক। ছেলে হেঁটে যাক সেই জমির ওপর দিয়ে আরও পথ বানাতে বানাতে।
প্রসেসিং কমপ্লীট হল। নামী ইউনিভার্সিটিতে চান্স পেয়েছে সোহম। ফুল স্কলারশিপ পাচ্ছে। একটু কেনাকাটা ছিল সেসব মাকে সঙ্গে নিয়ে সেরে ফেলেছে সোহম। ভিসার জন্য দিল্লি যেতে হল। এসব করতে করতে একটা সময় যাওয়ার দিন চলে এল। এয়ারপোর্টে পৌঁছে দিতে গিয়েছিল ওরা। মা, বাবার মাঝে বসে সোহম চুপচাপ কিছু ভাবছিল। হয়তো পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে ভাবছে। একটা একটা করে পা ফেলতে হয়, একটা একটা করে করে করে...!
রাতের কলকাতা দেখাই হয়নি কখনও। এমন ঝলমলে কলকাতা দেখতে দেখতে তৃণা ছেলের দিকে তাকাল, “কী রে? টেনশন হচ্ছে নাতো?”
সোহম ভ্রু কুঁচকে তাকাল। ঠোঁট উল্টে মাথা নাড়ল। পোস্ট গ্রাজুয়েশন করতে যাচ্ছে জার্মানিতে। দু বছরের কোর্স। মাঝে আসতে পারবে কিনা কে জানে। যা ঠান্ডা ওসব জায়গায় ভেবে তৃণা এক্সট্রা টাকা দিয়েছে ওখানে গিয়ে গরম পোশাক কিনে নেওয়ার জন্য। জেট ল্যাগ হয় সোহমের। সেটা নিয়েও চিন্তা আছে মানসের। তৃণা সাহস জুগিয়ে যাচ্ছে, “ছোটখাটো বিষয়কে গুরুত্ব দিয়ে মন খারাপ করো না।”
শিলিগুড়ি থেকে মানসের ছেলেবেলার বন্ধু ফোন করেছে। তৃণা শুনছিল। মানসমুকুল বলছে, “হ্যাঁরে, একটু আগেই বেরিয়ে পড়লাম। জ্যাম হলে মুশকিল হবে। এয়ারপোর্টে আবার দু’ঘন্টা আগেই পৌঁছতে হয়। তারপর সিকিউরিটি চেক টেক আছে। পাসপোর্ট চেক হবে, বুঝলি তো? নানান চেক ইন, তারপরে বোর্ডিং পাস হবে। ...না, আমরা থাকব বাইরে বসে। ওর ফ্লাইট ভোর সাড়ে তিনটের সময়ে...! আচ্ছা, পরে তোকে ফোন করব।” মানসমুকুল ফোন অফ করে ঝুঁকে ছেলেকে দেখল। তৃণা দেখল, মানসমুকুলের মুখ তৃপ্তিতে ভরে আছে।
এয়ারপোর্ট ট্রলিতে ব্যাগ ব্যাগেজ নিয়ে ভেতরে চলে গেল সোহম। তৃণার বুবলাই।
ভোর তিনটের সময়ে সোহম ভেতর থেকে ফোন করল, “আমি ফ্লাইটে উঠে গিয়েছি। এখন আর ফোন করব না। পৌঁছে করব। হোয়াটস অ্যাপে।”
ওরা ফিরে আসছিল ঝলমলে কলকাতার ভোর দেখতে দেখতে। নতুন করে জেগে উঠছে কলকাতা। তৃণা জানতে চায়, “কতক্ষণ লাগবে ওর দোহায় পৌঁছতে? ওখানে দুঘন্টা থাকতে হবে।”
মানসমুকুল গুগল ম্যাপ থেকে ফ্লাইট ট্যাগ অ্যাপস ডাউনলোড করে ইন্সটল করে রেখেছে মোবাইলে। অ্যাপ থেকে দেখাবে প্লেনটার অবস্থান। স্যাটেলাইট ম্যাপ থেকে দেখাবে নীচে পৃথিবীর নানা দেশ, সাগর পাহাড়...! প্লেন এই মুহূর্তে কোথায় আছে, সেটা জানা যাবে। সোহমের ফ্লাইটের নাম্বারটা দিয়ে সার্চ করতে হবে। তৃণাকে বুঝিয়ে বলছিল পুরো সিস্টেমটা। তৃণা মনোযোগ দিয়ে দেখছিল। একটু আধটু বোঝে ও এসব। একটু ভেবে বলল, “আচ্ছা, অ্যাপস থেকে তো দেখা যাবে ফ্লাইটটা কোথায় আছে?” মানসমুকুল খুশি হয় তৃণার আগ্রহে, “ওর ফ্লাইট কোথায় ল্যান্ড করল, ডিলে করছে কিনা, সবটাই জানা যাবে।”
শাশুড়ি জেগে ছিলেন। নাতির জন্য চিন্তা হচ্ছিল। অত দূরের রাস্তায় একা যাচ্ছে ছেলেটা। কতটুকুই বা বয়স! তৃণা পোশাক ছেড়ে বুবলাইএর ঘরে গিয়ে দাঁড়াল। বড্ড ফাঁকা লাগছে বাড়িটা। এই ঘরে লেপটে আছে ওর গায়ের গন্ধ। চোখ জ্বালা করছিল। তৃণা নিজেকে সামলে নিল। ভাল হোক, সব ভাল হোক। ওর মনের ইচ্ছে পূরণ হোক। সেই কবে, একদিন মাকে জিজ্ঞাসা করেছিল, “আমি যদি ভাল রেজাল্ট করি, আমাকে বাইরে পড়াবে?”
তৃণা বুবলাইএর চোখের দিকে তাকিয়ে ঘাড় নেড়েছে, “অবশ্যই পড়াব।” আজ মনে হল একটা কথা রাখার বৃত্ত সম্পূর্ণ হল। সন্তানের কাছে করা অঙ্গীকার রাখা হল। জানালাটা বন্ধ ছিল। তৃনা ভোরবেলায় জানালা খুলে দেবে ভেবে রাখল। এখন ভোরের দিকে মাঝে মাঝে বৃষ্টি হয়। তেমন হলে বিছানায় জলের ছাঁট আসবে। বুবলাই ওদিকটাতেই শোয়। বিছানা ভিজে থাকবে।
রাতে ঘুম এল না। সকালে মোবাইল হাতে নিয়ে চোখ সেঁটে রেখেছে মানসমুকুল। মাঝে মাঝে দেখছে। তৃণাকে ডেকে দেখাল, “এই মাত্র দোহা ছেড়ে গেল ওর ফ্লাইট।”
তৃণার গা ঝিম ঝিম করছে সারারাত না ঘুমিয়ে। ও স্নানে গিয়েছিল রান্না বান্না সেরে। পুজো দিয়ে কেবল ঘুরে দাঁড়িয়েছে, মানসমুকুল চিৎকার করে উঠেছে, “তৃণা, তৃণা, মা, বুবলাই এইমাত্র আজারবাইজানের ওপর দিয়ে চলে গেল...!”
প্রথম কন্সট্যানটাইন আচমকা মৃত্যুর কারনে যে স্বপ্নকে অধরা রেখে চলে গিয়েছিলেন, ছেলে সেকেন্ড কন্সট্যানটাইন সেই স্বপ্ন পুরো করে বাইজানটাইন সাম্রাজ্যেকে উন্নতির শিখরে নিয়ে যান। সেই আজারবাইজান!
সুপ্রিয় স্যার বলেছিলেন, “বাপের অধরা স্বপ্ন পুরো করেছিল ছেলে। এক বিশাল সাম্রাজ্য, যা কেউ হারিয়ে দিতে পারেনি শতাব্দির পর শতাব্দি, সেই সাম্রাজ্য ছেলের হাতে গড়ে উঠেছিল। ব্রিটেনে বেড়াতে গিয়ে প্রথম কন্সট্যানটাইনের মৃত্যু হলে একটা সাম্রাজ্য ধ্বসে পড়ার কথা। কিন্তু সৈন্যরা সম্রাটের ছেলেকে সিংহাসনে বসালে দ্বিতীয় কন্সট্যানটাইন সাম্রাজ্যের ভার হাতে নেন।” মানসমুকুল স্পষ্ট দেখতে পায় সেই আজারবাইজানের ওপর দিয়ে সোহম উড়ে যাচ্ছে।
ক্লাস সিক্সের ইতিহাসের পাতার কন্সট্যান্টাইনের ছবিটা স্পষ্ট মনে পড়ল। কিন্তু সেটা কার ছবি, সেটা মনে পড়ছিল না। বাবা কন্সট্যানটাইন, নাকি ছেলে? দুজনেই কি একরকম দেখতে? বইটা পেলে হত।
আচ্ছা, পুরনো বই কোথায় পাওয়া যায় তৃণা?
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন