সাগরিকা রায়
বাঁশবনের ভেতর দিয়ে রাস্তা। বুবলি শুনেছে বাঁশবনের ভেতরে গর্ত খুঁড়ে শেয়াল থাকে। স্কুল থেকে ফেরার সময় এক দৌড়ে বাঁশবন পার হয়ে হাঁপ ছাড়ে বুবলি। বিকেলে ভরত স্যারের কাছে টিউশন আছে। অংক শেখে সেখানে। তখন মল্লিকাকা সাইকেলের পিছনে বসিয়ে পৌঁছে দেয় কোচিং ক্লাসে। রুমিদির বুটিকের পাশেই ভরতস্যারের কোচিং ক্লাস। খুব গরম এই ঘরটা। এটা আসলে গ্যারাজঘর। ফেরার সময় বাবা সব্জির দোকান বন্ধ করে ওকে নিয়ে ফেরে। সেও সাইকেলে। তবু বাঁশবনের কাছাকাছি হলেই ওর মনে হয় বাঁশবনে শেয়াল থাকে। শেয়ালে খুব ভয় বুবলির।
আজ সকাল থেকে আকাশটা মেঘে মেঘে গুমগুম। বড়কাকি জানালা বন্ধ করতে করতে চেঁচাল – ‘অ সুমু, চানটা সেরে নে। চুল ভেজানোর দরকার নেই। ওরা এসে পড়ল বলে।’ বুবলি আজ স্কুলে যাবেনা। সুমুদিকে দেখতে আসবে সোনারপুর থেকে। ফোন করেছিল। রওনা হয়ে গেছে। আসতে আসতে ঘণ্টাখানেক। ওদের আদি বাড়ি গোসাবায়। এখন ওখানে থাকে পাত্রের ঠাকুমা ঠাকুরদা। তাঁদের চপের, ফুলুরির দোকান নাকি জমজমাট। পাত্র কালো। মা বলেছে গঙ্গার জল ঘোলা ভাল, বংশের ছেলে কালো ভাল। সুমুদিও কাল, তবে কুচকুচে নয়। টিপ পরলে দেখা যায়। কাজল পরলে বোঝা যায়। ঠোঁট দুটো মোটা এই যা। শ্যামলী পিসি বলেছিল – তাতে কী? পিয়াঙ্কা চোপড়ার ঠোঁটও মোটা। তাতেই তার বিউটি খোলে। শুনে সুমুদি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে ঠোঁট দেখলো। পেয়ারাতলায় দাঁড়িয়ে বুবলি প্ল্যান কষছিল। সুমুদির বিয়ে হয়ে গেলে একদিন সোনারপুরে গিয়ে ভিডিও হলে সিনেমা দেখবে। তবে পাত্র নাকি সোনারপুরের ভাড়া বাড়িতে থাকবেনা। কসবার দিকে দু’কাঠা ঠিকা জমি কিনেছে। কম দামে। মল্লিকাকা সোনারপুরে গিয়ে পাত্র সম্পর্কে খোঁজতল্লাশ নিয়ে এসেছে। একটা দোকানঘর ভাড়া নিয়ে ‘সন্তোষ মোবাইল রিপেয়ারিং সেন্টার’ খুলেছে পাত্র। কাকা খুশি – বুঝলে বৌদি, সেদিনকেরে যা দেখলুম ব্যবসাপত্তর বাজারে ভালই লাবিয়ে ফেলেছে। কাস্টমার আচে। ‘বুবলি ভাবে একটা মোবাইল কিনবে ও। জামাই বাবুকে বলবে সেকেন্ডহ্যান্ড মাল তো কতই থাকে! এমনও হয়, হয়ত মোবাইল রিপেয়ার করতে দিয়ে কাস্টমার আর এলই না। নতুন মডেল কিনে নিয়েছে। ও এল এক্স-এ হরদম এমন বেচাকেনা হচ্ছে। তো, বুবলিকে যদি তেমন একটা মোবাইল...! কী মজা। রিংটোন বাজবে ‘বুবলি ও বুবলি, শোননা একটা কথা।’
এইরকম রিংটোন ও শুনেছে পুজোর প্যান্ডেলে। একটা মোটাসোটা মহিলার মোবাইলে এরকমই রিংটোন ছিল।
একটা কথা শোন, একটা কথা শোন! কী মজা। হি হি করে হাসতে থাকে বুবলি। লংস্কার্টের পকেট থেকে কাঁঠালবিচি ভাজা বের করে খেতে খেতে বুবলি দেখে বর্ষার মেঘে গুমসুম আকাশটা একটা নদীর মত। কালো জলে ভরা নদী। ওই জল নেমে এসে নদীগুলোকে ভরিয়ে দেবে। যাত্রাপালার মত ‘নাও চড়ে নতুন বৌ যায় গো আপন ঘরে’ গানটা গাইবে সুমুদির মা বড়কাকি। নদীর জল ছলছল ছলাৎ শব্দে কেঁদে কেঁদে সঙ্গ দেবে বড়কাকির। আর নাও এ বসে ঘোমটার ফাঁক দিয়ে সুমুদি বরের দিকে তাকিয়ে দেখবে। আচ্ছা, দেখবে কি? বিশ্বনাথকে ভারি পছন্দ সুমুদির। কিন্তু কাকার পছন্দ না। সোনারপুরের পাত্র কি খুব কালো? চোখ মুখ বোঝা যায় তো? মল্লিকাকা দেখে এসে বলেছিল – ‘ভারি মিঠে চেহারা। চোখ দুটো ছটফট করে।’ হলেই ভালো। স্কুলে বন্ধু্রা যেন বুবলির জামাইবাবুকে দেখে না হাসে।
পেছন দরজা দিয়ে বাড়িতে ঢুকে বুবলি দেখে হলুদ তাঁতের শাড়ি পরে, কানে চিকমিক সোনার দুল, কপালে টিপ, চোখে কাজল, মুখে ফর্সা হবার ক্রিম। মনটা ভারী। তবু কী সুন্দরী দেখাচ্ছে সুমুদিকে।
মল্লিকাকা দই মিষ্টি নিয়ে এসেছে। আর, শিব মিষ্টান্ন ভান্ডারের জিলিপি, বোঁদে। এই সময় বুবলির রুমিদির মোবাইলের কথা মনে হল। হোয়াটস্অ্যাপে পাত্রের ছবিটা যদি রুমিদির ফোনে পাঠাতো ওরা, তাহলে সবাই দেখতে পেত। নতুন জামাইবাবু গোমড়ামুখো হলে, সবসময় ‘টাকা দাও টাকা দাও’ করলে কি ভাল পাত্র হয়? মধুর জামাইবাবু কমলবাবু যেমন। কী অশান্তি বাবা! রোজ রোজ পারমিতাদি বাড়ি এসে কাঁদে। ফের সন্ধ্যার দিকে পারমিতাদির মা ওকে শ্বশুরবাড়ি পৌঁছে দিতে যায়। একটা বিউটিপার্লারে চাকরি করে পারমিতাদি। কতই বা পায়! বলছিল মধু।
হুড়মুড় করে ফোন হাতে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে মল্লিকাকা – ‘এই শুনছো? ওরা এল। আমি বাইরে যাচ্ছি ওদের আনতে।’ বুবলি আড়াল থেকে দেখল দুটো বৌ, একটি মাঝবয়েসি লোক, আর একজন কালোপানা লম্বা লোক। ওমা! এই কি পাত্র? এ তো লোক! ছেলে তো নয়! বড়কাকি, মা, ছোটকাকি ঘোমটা টেনে এগিয়ে গেল- ‘আসুন আসুন, এতো আপনাদেরই বাড়ি।’
বুবলি অবাক। এটা তোমাদের বাড়ি বললেই হল? ইস্! ওরা হাসি মুখে ঘরে ঢুকল। ঘর গুছিয়েছে বড়কাকি আর মা। লেসের ঢাকনাগুলো বের হয়েছে। সুমুদিকে এই নিয়ে চারজন দেখতে এল। তবু বিশ্বনাথের সঙ্গে বিয়েটা দেবেনা ওরা। বুবলি জানে এখন ওদের খাবার দেওয়া হবে। তারপর সুমুদিকে নিয়ে ছোটকাকি ঘরে ঢুকবে। সুমুদি মাটির দিকে তাকিয়ে আস্তে আস্তে হাঁটবে। লজ্জাবতী লতা! আহা, কাল যখন বুবলি ওর ক্লিপ নিয়েছিল বলে দুম্ করে কিল বসিয়েছিল, তখনকার দাঁত খিঁচোনো চেহারাটা যদি এদের দেখানো যেত!
জানালার নিচে দাঁড়িয়ে ভেতরের কথা শোনে বুবলি। কে জিজ্ঞাসা করলো, “তোমার নাম কী? রান্না করতে জান? পড়াশোনা?”
এই যাহ্! সুমদি তো পড়াশোনা করেইনি। বড়কাকি বলে- ‘মেয়েদের পড়া কোন্ কাজে লাগে?’ কিন্তু এখন মল্লিকাকা তো তো করে বলছে- ক্লাস থ্রি পর্যন্ত পড়েছে । এ মা! ছিঃ! বলে দেবে নাকি বুবলি? সুমুদি ওয়ানেও পড়েনি। বিয়ে হলে ধরা পড়ে যাবেনা?
‘আসলে আমরা একটু লেখাপড়া চাইছিলাম। যা যুগ পড়েছে, ছেলেমেয়েকে মা যদি একটু দেখিয়ে দিতে পারে...’ মোটা মহিলা কথা বলছে, “ছেলেও পড়াশোনা চায়। ও মাধ্যমিক পাশ।”
যাহ্! এবারেও সুমুদির বিয়েটা হবেনা। সন্ধ্যেবেলা চুপচাপ শুয়ে থাকবে সুমুদি অন্যবারের মত।
মুখটা শুকনো হয়ে গেছে মল্লিকাকার। মিথ্যে বলেও কাজ হলনা। আজ আর বাড়ি থেকে বেরোবে না কাকা। তাহলে বুবলির কোচিং ক্লাস? বাঁশবনটা আছে যে...।
‘আমার ভাইয়ের মেয়ে আছে। ক্লাস এইটে পড়ে। ওকে যদি দেখেন, পছন্দ হবে। পড়াটা চালিয়ে দিলে ও মাধ্যমিক দিতে পারবে।’ মল্লিকাকা কার কথা বলছে? ভাইয়ের মেয়ে ক্লাস এইটে কে পড়ে? চম্পা? ও তো এখন ফোর। তাহলে?
উড়োঝুড়ো চুল, লং স্কার্ট পরা অবস্থায় বুবলিকে দেখানো হল। আশ্চর্য বুবলি দেখল সুমুদি চলে যাচ্ছে বারান্দা পেরিয়ে। আর ও কালো লম্বা সোনারপুরের পাত্রের সামনে দাঁড়িয়ে এখন। ওরা হেসে হেসে কী কী যেন জিজ্ঞেস করছিল!
বুবলিকে ওদের ভারি পছন্দ হয়েছে। বুবলি মার কাছে কেঁদে ফেলল, “আমার একটুও পছন্দ হয়নি। আরও পড়বো, চাকরি করবো।” মা হেসে বলেছে “তাতে কী? বিয়ে করে পড়বি। তারপর না হয় চাকরি করবি।”
বুবলি বোঝে এসব বানানো কথা। ওকে কথায় পটিয়ে পাত্রটিকে হাতে রাখার মতলব এদের। বাড়িতে চারটি মেয়ে, বাবা কাকার মিলিয়ে। ভালো পাত্র পাওয়া যাবে কোথায়? তাই...
বোঝানো, আদর–এর শেষে ধমক, বকাঝকা শুরু হল। ছোটকাকাকে খবর দেওয়া হয়েছে। সে গেছে উত্তরবঙ্গের মোয়ামারিতে। কাজ পেয়েছে দীর্ঘস্থায়ী। এই কদিন আগেই এসে ঘুরে গেছে। এসে পর্যন্ত গালগল্প। গিয়েছে বাঁশের বাংলো বানাতে। সঙ্গী আছে আরও কয়েকজন। বাঁশের জানালা, দরজা, মেঝে, বেড়া, মোড়া সবকিছু। কচি বাঁশঝোপে নাকি বাঘ থাকে। ওখানকার লোক চতুর্থীর দিন বাঁশ পুজোও করে। বাঁশেরও কত নাম। মহাদেবের বাঁশ, ডাকুয়ার বাঁশ,পারিবারিক বাঁশ, কোকোয়া বাঁশ...! ভেটাগুড়ি থেকে মাকলা বাঁশের ফুলদানী নিয়ে এসেছিল কাকা নদীরাম মন্ডল। ফোনে খবর পেয়ে সে জানিয়েছে বিয়ের দিন ঠিক করে যেন তাকে জানানো হয়। বুবলি ঘরের ভেতরে বসে এসব শোনে। ভরতস্যারের কোচিং ক্লাস বন্ধ হয়ে গেল ওর? সন্ধ্যেবেলা কাউকে না জানিয়ে পালিয়ে গেল বুবলি। কোচিং ক্লাসে যেতেই হবে। স্যারকে বলবে ওরা আমার বিয়ে দেবে স্যার, আমি আরও পড়বো। রুমিদির মত চাকরি করবো, বুটিক খুলবো। আপনি ওদের বলুন, ওরা আপনার কথা শুনবে। দৌড়তে দৌড়তে ভগীরথের পানের দোকান পার হয়ে অন্ধকার রাস্তায় এসে পড়লো বুবলি। এই রাস্তার মাঝামাঝিতে বাঁশবন। বাঁশবনে এখন কেবল শেয়াল নয়, বাঘও থাকে। দুই রকমের বাঁশফুল এসেছে এবার। সোনালি আর সবুজ। সে তোমার ওপর থেকে সব দেখতে ভাল। বাঁশগাছে ফুল এলে তো দুর্ভিক্ষ হয়। ভেতরে শেয়াল, বাঘ। যেমন মল্লিকাকা। যেমন বড়কাকি, মা, ছোটকাকা...। মল্লিকাকা শেয়ালের হাত থেকে বাঁচাতেই ওকে সাইকেলে চাপিয়ে কোচিং ক্লাসে নিয়ে যেত। এখন দেখ, সেই লোকটা তোমাকে বাঁশবনে ঠেলে ঢুকিয়ে দিচ্ছে! একটা লম্বা কালো শেয়াল ওত্ পেতে আছে মুরগি খাবে বলে।
ভয় করছে বুবলির। কারা ছুটে আসছিল। ওর নাম ধরে ডাকছিল। সাইকেলের ঘণ্টি বাজছিল। ধরা পরে গেল বুবলি। কেউ বকলো না। হাত ধরে বাড়িতে নিয়ে গিয়ে মিটিং বসালো বাবা – ‘তুই কী চাচ্ছিস? বিয়ে তো করতেই হবে একদিন। পরে কী এমন পাত্র পাওয়া যাবে? আজ ছোট আছিস, দুদিন পরে ভালো পাত্র খুঁজতে সুমুর মত বয়স গড়িয়ে যাবে।’
মা কাঁদো কাঁদো, “আমরা কি তোর খারাপ চাই বুবলি?”
সারারাত জেগে জেগে মেঘের ধমক শুনলো বুবলি, “কাঁদবি না মেয়ে। ইঃ! বিয়ে করবো না! কী আমার রাজকন্যে এলেন! তাহলে কী করবি? ওপাড়ার মেয়ে বৌ এর মত কলকাতায় যাবি আয়ার কাজ করতে? পাঁচটা পুরুষে ছিঁড়ে খাবে। জীবনে কী বা অভিজ্ঞতা তোমার?” মেঘের ধমকটা হুবহু বড়কাকির মত।
পুরুতমশাইয়ের কাছে যাবে বাবা। দিনক্ষণ ঠিক করতে হবে। সামনের মাসেই ভাল দিন আছে। ছেলেপক্ষ দেরি করতে চাইছেনা।
বুবলি এক্কাদোক্কার কোর্টের সামনে দাঁড়িয়ে থাকে একা। সুমুদি খুব চুপচাপ হয়ে গেছে। বুবলির মনটা সুমুদির কথা ভেবে ভার। স্কুলের বইগুলো গুছিয়ে বাক্সে রেখে দেয় বুবলি। কে জানে বাবা, কেউ হয়তো ডোবায় ফেলেই দিল টান মেরে। সুমুদি আজ সকালে কেমন একরকম গলায় বললো, “তোর ভালই হল বুবলি।” বুবলি সুমুদির হাত চেপে ধরলো, “হবে সুমুদি হবে। তুমি একটু পার্লারে যাবে? গ্যালভানিক মেশিন আছে, সেটা দিয়ে কী সুন্দর করে দেয় স্কিন।”
সুমুদি জানলা দিয়ে মেঘ মেঘ দিনটা দেখল, “দেখিস, বিশ্বনাথের সঙ্গেই আমার বিয়ে হবে।” বুবলি ভাবে, সোনারপুরের লোকটা বড্ড বাজে। দিদিকে দেখতে এসে কেউ বোনকে বিয়ে করতে চায়? ভরতস্যারের সঙ্গে দেখা হলনা। রুমিদির সঙ্গেও যদি দেখা হত! ওরা হয়ত বিয়েটা আটকাতে পারত। আচ্ছা, বিয়েটা কি এখনও আটকানো যায়না? একমাত্র পাত্র লোকটা পারে বিয়ে আটকাতে। সোনারপুর স্টেশনের কাছে সন্তোষ মোবাইল রিপেয়ারিং সেন্টারে চলে যেতে পারবেনা বুবলি? ঠিক দুপুর দুপুর একটু গা এলিয়ে দেয় মা কাকিরা। তখন?
ঘট ভেঙে জমানো পয়সা বের করে রাখে বুবলি। হলুদবাটা মাখতে আজ আপত্তি করল না। এক্সট্রা কেয়ার শুরু হয়েছে ওর। রঙ ফর্সা। তবু আর একটু যত্ন নিলে ক্ষতি কী? মা কাকিরা খুশি। এটাই চেয়েছিল বুবলি। দুপুরবেলা চটপট পাছদুয়ার খুলে পুকুরের পাশের কচুবনের ভিতর দিয়ে জল ছপছপ করতে করতে দৌড়ল ও। সোনারপুর যেতে হবে ক্যানিং লোকাল ধরে...।
সন্তোষ মোবাইল রিপেয়ারিং সেন্টারটা যখন খুঁজে পাওয়া গেল, তখন বিকেল হয়ে গেছে। দোকানঘরটা মাঝারি সাইজের। দুটো চেয়ার, একটা রঙচঙে সরু বেঞ্চ, দেওয়ালে কাচের শোকেস ভর্তি মোবাইল। একদিকে নতুন ঝাঁ চকচকে, অন্যদিকে পুরনো অর্থাৎ রিপেয়ারের জন্য অপেক্ষমান মাল। ভেতরে উঁকি দিয়ে একটা বেঁটে ছেলেকে দেখতে পেল বুবলি। জেরক্স মেশিনের সামনে দাঁড়িয়ে কী করছে ছেলেটা? এই মেশিনটাও পাত্রর? আর একটু গলা বাড়িয়ে ভেতরটা দেখতে যেতে কে পেছন থেকে ডাকল, “কী চাই?”
বুবলি ত্রাসে চোখ বুজে ফেলল। এই স্বর ওর চেনা। লোকটা সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। এই সেই বাঁশবন। এখন সাহস হারালে মরতে হবে। সটান তাকিয়ে বুবলি বলল, “আমি পিয়ালি থেকে এসেছি। আমার নাম নিশা মন্ডল। বাবার নাম সহজ মন্ডল।”
লোকটা বিস্ফারিত চোখে বুবলিকে দেখছিল। বোঝাই যাচ্ছে চিনতে পেরেছে। খুব অবাক গলায় বলল, “এখানে? কী ব্যাপার? আচ্ছা, ভেতরে এস।”
জুতো খুলে দোকানঘরে ঢুকল বুবলি। বেঁটে ছেলেটাকে কোথায় পাঠিয়ে দিল শেয়ালটা। তারপর বলল, “এখানে এসেছ কেন?” বুবলি সোজাসুজি তাকাল, “আপনি আমার দিদিকে বিয়ে করুন।”
লোকটা বিরক্ত, “তুমি কি দিদির জন্য ঘটকালি করতে এসেছ?”
বুবলির মন খারাপ হয়ে গেল। কী বাজে লোক! আসলে জানা কথাই তো। ও যে বাঁশবনে থাকে!
“আমি এখন বিয়ে করব না। পড়াশোনা শেষ করে চাকরি করব। রুমিদির মত বুটিক খুলব।”
লোকটা কী ভাবতে ভাবতে বলল, “আমাকে কী করতে হবে?”
“কিছু না। বিয়েটা করবেন না। বাড়িতে বলে দিন।”
“কিন্তু, আমি তো বিয়ে করব।”
“করুন। কেউ তো বাধা দিচ্ছে না। তবে আমাকে নয়।”
“বয়ফ্রেন্ড আছে?”
“বাজে বকবেন না। আমাকে খারাপ মেয়ে ভেবেছেন নাকি?”
“বয়ফ্রেন্ড থাকাটা কি খারাপ?”
“কিন্তু আমার তা নেই। আমি পড়ব। চাকরি করব। বুটিক খুলব।”
“চাকরি মানে?”
“স্কুলে।”
“কোন্ স্কুল?”
“প্রাইমারি। কারন, আমার বাবা খুব বেশি দূর আমাকে পড়াতে পারবেনা।”
“তার জন্য টেট দিতে হবে।”
“জানি।”
“আর বুটিক? সেলাই জান? কাঁচি ধরতে পার?”
“রুমিদি ট্রেনিং দেবে বলেছে।”
“এখন এইট। মাধ্যমিক পাস করতে দু বছর। আরও দু বছর ফ্রি দিলাম সেলাই শেখার জন্য। মোট চার বছরে নিজের পায়ে দাঁড়াতে পারবে?”
“নিশ্চয়ই। দেখিয়ে দেব। আপনি বিয়ে করে নিন প্লিজ।”
খুব চিন্তিত গলায় কালো শেয়াল বলল, “চার বছর ওয়েট করাটা অসুবিধের নয়। পারব। এখন আমার তেইশ, চার বছর পর সাতাশ। তোমার আঠের?”
“উনিশ।”
“বাহ্। তুমি অ্যাডাল্ট। মানে, নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে তারপর নিশ্চয়ই বিয়েতে আপত্তি নেই?”
“মানে?”
“মানে সোজা। বিয়েটা হবেই। কিন্তু সামনের মাসে নয়। ঠিক চার বছর পর।” শেয়াল হাসল, “তুমি বেশ ডেসপারেট আর মুডিও।”
হাসি দেখে গা জ্বলে গেল বুবলির, “আমি কী করব সেটা আমি ঠিক করব। ওয়েট করবেন না। ওয়েট করলে ভিজবেন চোখের জলে, আর বুড়ো হবেন।”
লোকটা এবারে হাসল না, “তুমি এখানে এসেছ আমার সঙ্গে ডিসকাশন করতে। আমার মতামত দিলাম। পছন্দ না হলে সামনের মাসেই বিয়ে। এবারে বাড়ি যাও। তাড়াতাড়ি।”
মাথা গরম করেই বেরিয়ে এল বুবলি। কী করা উচিৎ এখন ওর? বাড়ি না ফিরলে কেমন হয়? অস্থির বুবলি বাইকটাকে নজরে আনেনি। ধাক্কাটা খেল। উলটে পড়ে যেতে যেতে বুঝল অসম্ভব যন্ত্রণায় ছিঁড়ে যাচ্ছে পা। সাংঘাতিক হৈ হৈ হল। কালো শেয়াল বেরিয়ে আসতেই তার গায়ে ডোরাকাটা দাগ পড়ল। ঝাঁপিয়ে পড়ে বাইকের সওয়ারীকে শুইয়ে দিয়ে দ্রুত কোলে তুলে নিল বুবলিকে। সোজা হাসপাতাল।
সন্ধে পার করে পায়ে ব্যান্ডেজ বেঁধে কালো শেয়ালের সঙ্গে বাড়ি ফিরল বুবলি। অন্ধকার মুখগুলো উল্লসিত, “বুবলি এসেছে, বুবলি এসেছে।” কালো শেয়াল কী যেন বোঝাচ্ছে সবাইকে। ঘরের ভেতরে বিছানায় শুয়ে হতভম্ব বুবলি। সেই দুপুরে বাঁশবনে ঢুকেছিল, আর বের হতে পারছে না। আর কি পারবে! বাঁশবনের শেয়াল এখন বাঘ। বুবলিকে কোলে তুলে নিয়ে এক্কেবারে খেয়ে ফেলেছে। বুবলির মনে পড়ল শেয়ালটা ওকে কোলে তুলে নিতেই অত যন্ত্রণাতেও শরীরটা শিরশির করে কাঁপতে শুরু করেছিল। কেন?
দুঃখে–রাগে চোখে জল এল বুবলির। জল চোখে ও স্পষ্ট দেখল বাঁশগাছে ফুল এসেছে। দুর্ভিক্ষ নয়। সোনালি-সবুজ ফুল। ইঁদুরগুলো ওই ফুল ভালবাসে। বুবলি আর ওদের বাঁশফুল খেতে দেবে না। সব ফুল বুবলির।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন