সাগরিকা রায়
দুপুরের দিকেই ওরা এল। শ্রীতমা প্রথম দেখতে পেয়েছে। দেখেই চেঁচাল – “অ্যাই তুতুন, তোমার ভাগনে এসেছে, আর দীপনদা।”
বাড়ির পেছনদিকের ঝিমধরা বাগানের মেঘ ছুঁই ছুঁই তালগাছটার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়েছিল তুতুন। বউদির ডাকাডাকির সঙ্গে বাক্যের প্রতিটি শব্দ আলো হয়ে ডুবে গেল বুকের ভেতরে। ভাগনে এসেছে! অরিত্র – তুতুনের ভাগনে! শুভ। ভাগনে শব্দটার সঙ্গে অরিত্র জড়িয়ে আছে।
“তুতুন, ওরা এসেছে রে …।” মায়ের স্বভাবসুলভ নিস্তেজ গলায় তরঙ্গ অনুভব করে তুতুন। বউদির গলায় মায়ের মতই লাবন্যর সুর। তুতুন আঁচল টেনে গায়ে জড়াল। ইদানিং ইনার ইউজ করার কথা মনে থাকে না। ব্লাউজের হুক ঠিকঠাক লাগানো নেই। বড্ড এলোমেলো বেশবাস। মা অনুযোগ করে – ‘এই গরগরে বয়সের মেয়ে, পুরন্ত শরীর। একটু গুছিয়ে থাক, তা নয়।’ তারপর মা বিড়বিড় করে – ‘যাই ঘটুক, যৌবনকে কি লুকিয়ে রাখা যায়? নাকি মেরে ফেলা যায়?’ অথচ তুতুন শরীর নিয়ে ভাবেই না। মনেই থাকে না শরীরের কথা। অরিত্র মনে রাখেনি তুতুনের শরীরকে, তুতুন মনে রেখে কী করবে? কিন্তু আজ একমাস পরে মনে হল বড় এলোমেলো হয়ে আছে ও। ড্রয়িংরুমে বাবা ছিলেন। দাদাও। বউদিকে দ্রুত পায়ে কিচেনের দিকে চলে যেতে দেখল তুতুন।
-‘যাও, ওরা তোমার কাছেই এসেছে।’ চাপা খুশি বউদির চোখে মুখে টুনটুনি পাখির মত লাফাচ্ছে। অরিত্রর ভাগনে এসেছে আর জামাইবাবু দীপনদা। তুতুনের একটা সুবন্দোবস্ত হচ্ছে তাহলে! ওদের দেখেই হয়তো বুকের ভেতরে কান্নাটা ঘাই মেরে উঠল তুতুনের।
-‘এখানে বস, কথা বল।’ মা উঠে দাঁড়ায়। বাবাও। ওঁদের পেছন পেছন দাদাও চলে গেল। শুভ আর দীপনদার সামনে মাথা নীচু করে বসে থাকল তুতুন।
- ‘বসুন মামি। কিছুদিন ধরেই ভাবছিলাম আসব। এবারে বাড়িতে চলুন।’ শুভ তুতুনের মুখভাব লক্ষ্য করছিল।
-‘ঘুরে ফিরে এলে মন ভাল হয়ে যাবে।’ শুভ নিবিষ্ট চোখে তুতুনকে দেখে।
বাড়ি? ভেতরে তীব্র কাঁপন জেগে উঠল। ও বাড়িতে কখনও কি যেতে পারবে তুতুন?
-‘কেন? আপনি ও বাড়ির বউ। যাবেন না মানে?’ দীপনদা সুন্দর করে হাসেন। হাসিতে আপনজনের গন্ধ এসে নাকে ঠেকল বলে নিঃসঙ্কোচে তাকাতে পারল তুতুন এবার। হাসির শব্দে আন্তরিকতার শব্দ ভেসে এল কানে।
-‘আমি পারবনা দীপনদা! সমস্ত বাড়ি জুড়ে ওর স্মৃতি আমাকে ছুঁতে আসে। আমার ভয় করে, ভীষণ একা লাগে!’ তুতুনের চোখে জল এল।
শুভ এসে পাশে বসল – ‘এভাবে বলবেন না মামি। আমরা কষ্ট পাই। নিজেকে একা ভাবছেন কেন? আমরা তো আছি!’
এভাবেই তো শুনতে চেয়েছিল তুতুন। এইরকম ভাবে বাড়িয়ে দেওয়া হাত ধরতে চেয়েছিল ও। আবেগে ভেসে গেল উথালপাথাল হয়ে। প্রানভরে কাঁদল। স্বজন কুটো ধরে বেঁচে থাকার ভরসায় কাঁদল। আছে। অরিত্র নেই, কিন্তু সকলের মধ্যে আছে অরিত্র।
ওরা দুপুরে খাওয়া দাওয়া করল। বাবা, দাদার সঙ্গে টুকটাক কথা চলছে ওদের। তুতুন কিছুক্ষন দাঁড়িয়ে থেকে আস্তে আস্তে বারান্দায় গিয়ে দাঁড়াল। মনটা অবসাদে ভরে আছে। মাঝে মাঝে মনে হয় কি যেন বলার ছিল ... কি যেন করার ছিল... ! মনে পড়ে না কিছু। সুনসান রাস্তাটার দিকে তাকিয়ে দেখল একটা লোক সাইকেল চালিয়ে চলে যাচ্ছে। এখন ঠিক দুটো বাজে। ঠিক দুটোর সময় অরিত্র বলেছিল – ‘যাচ্ছি। কাল ঠিক দুটোর সময় এসে তোমাকে বাড়িতে নিয়ে যাব। রেডি থেক। অনেকদিন তোমাকে হামলে পড়ে আদর করা হয়নি। শ্বশুরবাড়িতে শুয়ে কি বিছানা ধামসে প্রেম করা যায়?’
তুতুন জানতো অরিত্র আসবে। বউ ছেড়ে থাকতে পারেনা লোকটা। তবু কপট রাগ দেখিয়েছে – ‘ঠিক?’
অরিত্র তুতুনের হিল্লোল তোলা বুকের খাঁজে মুখ ডুবিয়ে বলেছে – ‘ঠিক, ঠিক, ঠিক।’ তখন তুতুন বুঝতেই পারেনি পরদিন দুটো বাজার অনেক আগেই বাড়িতে চলে আসবে অরিত্র। বুঝতে পারেনি ট্রাকের চাকার তলে পিষ্ট হতে হতে অরিত্র তুতুনকে ডেকেছিল কিনা! কয়েক ঘন্টার মধ্যে অরিত্র একটা বডি হয়ে গেল! সাদা কাপড়ে ঢাকা দেহটা তুতুনের কাছে অচেনা হয়ে গেল মুহূর্তের মধ্যে! রক্ত – সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে তুতুন দেখল অরিত্র মৃতের দেশে চলে যাচ্ছে!
মায়ের গলা পাচ্ছে তুতুন। সাবধানে, তুতুন যাতে না শোনে, সেভাবে কথা বলছে মা – ‘এমনিতে ঠিক আছে। কখন কখন গুম হয়ে থাকে। তখন কেমন ঘোরের মধ্যে রয়েছে মনে হয়। আর একা থাকতে ভয় পায়।’ মায়ের গলার স্বর ঘরের ভেতর থেকে কেঁপে কেঁপে বাইরে ছিটকে আসছিল।
-‘মামি কোথায় গেল?’ শুভ আর খেতে পারছিল না। গেলাস তুলে অল্প জল খেল।
- ‘একা একা কোথাও দাঁড়িয়ে আছে হয়তো।’ বউদির গলা পেল তুতুন।
-‘তুতুন নাকি অরিত্রকে দেখে। সাদা কাপড়ে ঢাকা অরিত্র ওর কাছে আসতে চায়। আসলে তুতুন এক অদ্ভূত সময়ের মধ্যে আছে।’ মায়ের কথায় দুশ্চিন্তার ছায়া ভাসে। শুভ আর দীপন মুখ নীচু করে নিজ নিজ হাতের রেখা পরীক্ষা করে।
-‘মামির কাউসেলিং দরকার।’ শুভ মুখ তুলে দীপনের দিকে তাকায়।
-‘দেখিয়েছি। সাইক্রিয়াটিস্ট। বলেছেন – স্বামীর বীভৎস মৃত্যু ও সইতে পারছে না। ও মনে মনে আলো চায়, জীবন চায়।’ বলতে বলতে বউদি শ্রীতমা তুতুনকে দেখতে পেয়েছে – ‘এস তুতুন, দেখ ওরা কিছুই খেলেন না।’
তুতুন বুঝতে পারে বউদি প্রসঙ্গ পাল্টাচ্ছে। কিন্তু এখন আর কাউকে জুলুম করে খাওয়াতে ইচ্ছে করেনা ওর। বিয়ের পর নতুন মামি হয়ে শুভকে পরোটা আর মাংস খাওয়ানোটা নিয়ম হয়ে গিয়েছিল। পেট ভরে গেছে বললেও ছড়েনি। সেই হাসি মজায় ভরা মনটা চাকার তলায় কী ভয়ঙ্কর শব্দে টুকরো টুকরো হয়ে গেল। অরিত্রর চশমাটা নাকি অটুট ছিল। কাচ নিজেকে বাঁচাতে পেরেছে, অরিত্র পারল না? ও কি অন্যমনস্ক ছিল? বনিপিসির মেয়ের বিয়ের দিন কি কান্ডটাই না করেছিল অরিত্র। ছাদে বসে সবাই আড্ডা দিচ্ছিল। ঝট করে বৃষ্টি আসাতে হুড়োহুড়ি পড়ে গেল। অরিত্র তুতুন মনে করে অন্য এক মহিলার হাত ধরে শেডের নীচে যেতেই হাসাহাসি পড়ে গেল। তুতুন খুব হেসেছিল – ‘তুমি এত আনমনা কেন?’ অরিত্র বোকা বোকা মুখে সবার দিকে তাকাচ্ছিল। এখনও ওর জলের ছিটে লাগা চশমার কাচের ভেতরের অবাক চোখদুটো স্পষ্ট দেখতে পায় তুতুন।
ওই রকমই ছিল অরিত্র। তাই রাস্তায় বাঁক নিতে গিয়ে সাবধান হতে ভুলে গিয়েছিল। বাইকটা ফুলস্পীডে গিয়ে আছড়ে পড়েছিল ট্রাকের গায়ে।
পেছনের সরু প্যাসেজে দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে কথা বলছিল অরিত্রর দিদির বর দীপন । মালপত্রগুলো পাঠিয়ে দিতে চায় ওরা। খাট, বিছানা, আলমারি, টিভি, মাইক্রোওয়েভ, ড্রেসিং ইউনিট, কার্পেট...। গুচ্ছের শাড়ি পচে নষ্ট হবে? অরিত্রর জামা কাপড়গুলো তুতুনের কাছে স্মৃতি হয়ে থাকুক।
অবিন্যস্ত চুল দুপুরের হাওয়ায় ওড়াওড়ি করে। জিনিসপত্রের কথা মনেই পড়েনা ঠিকঠাক। কত জিনিস জমা হয় সংসারে। কত প্রয়োজন থাকে তার। কোন্ অদ্ভুত রসায়নে সব পালটে যায়। আবার সেইসব রঙহীন, মূল্যহীন আবর্জনা ফিরে আসতে চাইছে। সেসব দিয়ে কী করবে তুতুন? স্মৃতি? চোখের সামনে লোকটা জ্বলজ্বল করছে, সেখানে তার শার্ট নতুন কী মনে করাবে তুতুনকে?
তুতুন একটা করে সিঁড়ি ভাঙে। দুপুরের এই ঝিমঝিমে রোদ মাখা বাতাস কী যেন মনে করিয়ে দিতে দিতে ঝাপটা মেরে চলে গেল। মুখ তুলে আকাশ দেখে তুতুন। ছেলেবেলায় দম চুরির অভ্যেস ছিল বলে বুড়ি ছুঁ খেলা থেকে ওকে বাদ দিয়ে দেওয়া হত। তুতুন তখন দূরে দাঁড়িয়ে অন্যের খেলা দেখতো। এখনও তাই হচ্ছে। ওর সংসার সংসার খেলাটা শেষ। তুতুন বাদ। খেলা তো চলছে, ও দূরে দাঁড়িয়ে দেখবে শুধু। জীবন থেকে কত জিনিস হারিয়ে গেল, ছাই রঙের পেনটা, একটা বারবি ডল, সাদা হিল জুতো, পোষামেনি তুলতুলএর মত অরিত্রও হারিয়ে গেল। ওর জামাকাপড় পড়ে থাকতে থাকরে একদিন বিবর্ণ হয়ে যাবে। একটা লোক ছিল, সে এখন নেই। তার খুঁটিনাটি কথাবার্তা, নানান অভ্যেস, ভালবাসা ধীরে ধীরে অস্পষ্ট হয়ে যাবে।
সাদা কালো ছাপা শাড়ির ফুলছাপ লতাপাতার আঁচল নিঝুম দুপুরের গরম হাওয়ায় পাগলের মত ছুটোছুটি করে। বড় বড় শ্বাস ফেলে তুতুন। মায়ের ঘরে ঢুকে আলমারির সঙ্গে সেট করা লম্বাটে আয়নায় নিজেকে দেখে ও। উড়ো ঝুরো চুল, কাজল, টিপহীন ফ্যাকাশে মুখ, ফর্সা নিটোল গলা, উদ্ধত ভারি স্তন, খাঁজকাটা কোমর নেমে গেছে উদ্দাম প্লাবন হয়ে। শাড়ি ব্লাউজ খুলে ফেলে তুতুন। উরুসন্ধির মাঝখানে গভীর, গহন বুনো গন্ধে ভরা ফুল প্রস্ফুটিত হয়ে আছে। মোহাবিষ্ট মৌমাছির মত এই ফুলে সমর্পিত ছিল অরিত্র...।
ওর চেহারায় কি ফুলদিদার ছাপ পড়েছে? অরিত্র দেখলে খুব রেগে যেত। সেবার বিশ্বকর্মা পুজোর দিন ছাদে ঘুড়ি ওড়ানো দেখতে গিয়ে সিঁড়িতে পা পিছলে গেছিল তুতুনের। বলার মত ঘটনাই নয়। অথচ মিতুদি হেসে হেসে যখন, ‘অরিত্র, তোমার বউ আজ আর একটু হলেই পা পিছলে আলুরদম হয়ে যেত’ তখন ঘুড়ি ওড়ানো ফেলে সে কী টেনশন অরিত্রর। সবার সামনেই ওর পায়ের আঘাত পরীক্ষা করতে হাঁটু মুড়ে বসে শাড়ি অনেকটা তুলে ফেলেছে। কী লজ্জা তুতুনের! কী যে বউ অন্ত প্রাণ লোকটার! তুতুনকে ফেলে রেখে সত্যিই কি চলে যেতে পেরেছে? জীবনের রসে আকন্ঠ ডুবে ছিল অরিত্র, তাই সেদিন ঘুম ভেঙে উঠে একবারও বুঝতে পারেনি ওর আজ শেষবারের মত ঘুম ভেঙে ওঠা হল, দাঁত ব্রাশ হল। শেষবারের মত ব্রেকফাস্ট করে বেরিয়ে যেতে যেতে বারান্দায় দাঁড়ানো তুতুনের দিকে তাকিয়ে ঘাড় হেলিয়ে বিদায় নিয়েছিল। তুতুন কি বুঝেছিল, আর কয়েকটা মিনিট মাত্র? তারপর অরিত্র নয়, একটা বডি ফিরে আসবে!
তীব্র অভিমান হয় তুতুনের। পুরনো বাড়িতে মায়ের সঙ্গে থাকতো অরিত্র তুতুনকে নিয়ে। পাশের চারকাঠা জমিতে তেতলার ভিত তুলে দোতলা করে নিয়েছিল অরিত্রর বড়দা, মেজদা। শাশুড়ি বলেছিল, ‘অরুকে আমি এই পুরনো বাড়ি দিয়ে যাব, ওর মনের মত করে গড়ে নেবে।’ অরিত্র খুশি হয়েছিল – ‘সেটাই ভাল। এক বাড়িতে গাদাগাদি না করে এই একতলা বাড়িই ভাল। আমার ছেলেবেলা তো এই বাড়িতেই কেটেছে। মায়ের খাটের নিচে দেখ আমার ছোট্টবেলার দোলনা আছে’ বলেই চেঁচিয়ে উঠেছিল– ‘মা, এই বাড়ি কিন্তু আমাকেই দিও’ অথচ অরিত্র চলে গেল কিছু না বলেই।
ওরা চলে যাচ্ছিল। বউদি বিদায়পর্ব শেষ করে ঘরে ঢুকল। তুতুনকে দেখতে পায়নি। দাদাকে বলছিল– ‘দীপনদার হাতেই তুতুনদের বাড়ির চাবি আছে কিনা বুঝতে পারছিনা। যতবার কথা তুলি, দীপনদা পাশ কাটিয়ে যায়। কাল এসে তুতুনের জিনিসপত্র দিয়ে যাবে। অবশ্য বাড়িটা তো তুতুনেরই রইল বল? হয়তো কাল এসে বাড়ির চাবি দিয়ে যাবে।’
দাদা শার্টের বোতামে হাত রেখে জবাব দেয় – ‘অরিত্রর মা শুনেছি অরিত্রর নামে বাড়ি লিখে দেবেন বলেছিলেন। কিন্তু কাজটা করেছেন কি না... ! দিয়ে থাকলে ওটা বিক্রি করে দেব, তুতুন এখানেই থাকবে। আর অরিত্রর চাকরিটা যদি পায় তো ভালই। ট্রাকের মালিকের কাছ থেকেও ক্ষতিপূরণ পাওয়া উচিৎ কিন্তু ওরা নাকি মানতে চাইছে না। শুভ কথা বলেছিল। ওরা বলছে ড্রাইভারের দোষ ছিলনা, অরিত্র নাকি নিজে থেকেই সোজা চাকার নিচে...।’
তুতুন আস্তে আস্তে হেঁটে মায়ের কাছে গিয়ে গুটিশুটি হয়। ওর গায়ের ওপর হালকা চাদর টেনে দেয় মা। বাবা টিভিতে নিউজ দেখছে। মা এখন ঘরের আলো না নিভিয়ে বাবার কাছে গিয়ে বসবে। দুজনে চুপচাপ বসে থাকবে। তুতুন জানে, সন্তানের দুর্ভাগ্যের সামনে বাবা – মা নিশ্চুপ থেকেই মনের কথা আদান প্রদান করে। তুতুন চোখ বুজে থাকে। শোনে, ভারি চিন্তিত গলায় মা বলছে, ‘ওরা যে তুতুনের জিনিসপত্র পাঠিয়ে দেবে সেসব রাখব কোথায়?’
বাবা সমাধান বাতলায় – ‘ফুলকাকিমা যেখানে থাকতেন সেখানেই থাকুক।’
তুতুন বোঝে ফালতু জিনিস রাখার জন্য বাড়িতে জায়গা খুব কম। অসুস্থ অবস্থায় বাবার ফুলকাকিমাকে তার ভাসুর ক্যানিং থেকে এখানে এনে রেখে গিয়েছিল চিকিৎসার জন্য। ওই ঘরেই ফুলকাকিমা মারা যান। ঘরটা বহুদিন পড়ে আছে।
মা তুতুনের ভবিষ্যত সাজাচ্ছিল – ‘কাল একবার অরিত্রর অফিসে যাও। পাওনাগণ্ডা কী আছে তার খোঁজ নাও। তুতুনের চাকরির ব্যাপারেও কথা বলবে।’
-‘আর ট্রাকের মালিক ক্ষতিপূরণ দেবে তো? শুভ এসেছিল, কী বলল?’ বাবার গলায় উৎকন্ঠা টের পায় তুতুন। ক্ষতিপূরণ চায় বাবা। কার ক্ষতি? কতটা ক্ষতি? তুতুন চোখ বন্ধ করে থাকে। কিছু শুনবেনা ও। কিছু দেখবেনা। ভীষণ ভয় ওত পেতে অপেক্ষা করে আছে। ঘরের কোণে কোণে। কখন নেকড়ের মত থাবা উঁচিয়ে ঝাঁপ দেবে কে জানে! বুকের ভেতরে খাঁ খাঁ করে। তুতুন বোঝে খুব ঝামেলায় ফেলে দিয়েছে অরিত্র সবাইকে, তুতুনকেও। তুতুন যে কী করে বাবা, মা, দাদার দুশ্চিন্তা দূর করবে বুঝতে পারেনা।
চোখের সামানে যেমন রাত নামতে দেখে, তেমনই সকাল হতেও দেখে তুতুন। ফের সেই ভয় আঁকড়ে ধরতে আসবে তুতুনকে। রক্তাক্ত চেহারা নিয়ে যদি সত্যি সত্যি অরিত্র এসে দাঁড়ায়, তুতুন সহ্য করতে পারবে? দাদা ট্রাক মালিকের কাছে গিয়েছিল। লোকটা নাকি খুব ধূর্ত। সপাটে ‘না’ করে দিয়েছে। বলেছে, সাঁই সাঁই করে এসে ট্রাকের গায়ে যে আছড়ে পড়ে, তার মাথা কাজ করছিল তো ঠিকঠাক?’ –বলতে বলতে দাদা থামে, শ্বাস নেয়– ‘শুনলাম, ট্রাকটার নাকি ইনসুরেন্স ছিল না! লোকটাকে ভয় দেখাতে বললাম, শুভ আর দীপনদাকে নিয়ে আসছি। শুনে লোকটা বিশ্রী হাসল’–‘শুভবাবু আমার কী করবে?’ লোকটা আঁটঘাট বেঁধে কাজে নেমেছে , বড় গাছে নৌকো বেঁধেছে। থানা, পুলিশ সব হাতে।
-‘তুই একবার শুভদের ওখানে যা। গিয়ে সব বল।’ বাবা উপায় খোঁজে।
-‘ওরা আজ মালপত্র নিয়ে আসবে। তখন না হয় ...।’ দাদা সম্মতি চায় বাবার। বউদি ডাকছিল – ‘এই! ওরা জিনিসপত্র নিয়ে এসেছে। খাট, আলমারি ... ।’
তুতুন অবাক হয়। খাট আলমারি দিয়ে ও কী করবে? ও তো মায়ের পাশেই শুয়ে থাকে। এত বড় খাটে একা তুতুন? যদি পাশে এসে শোয় অরিত্র? খুব খুব ভালবেসে যদি জড়িয়ে ধরে তুতুনকে? উফ্! দীপনদার গলা পাচ্ছিল তুতুন। লোকজন নিয়ে মাল নামাচ্ছে গাড়ি থেকে। একটা করে মাল নেমে সঙ্গে সঙ্গে বাবার ফুলকাকিমার ঘরে চলে যাচ্ছে। ঘরটা বউদি সকালেই খুলে রেখেছিল? বিয়ের আগে তুতুনের একটা ঘর ছিল। সেটায় দাদা কমপিউটার রেখেছে। তুতুনের ছোট্ট খাটখানা ড্রয়িংরুমে চলে গেছে। এখন বাবা ওটাতেই শোয়। না হলে তুতুন নিজের ঘরেই থাকতে পারতো। আগের মত।
সব মাল নামিয়ে ঢুকিয়ে দিয়েছে দীপনদা। মালপত্র বুঝিয়ে দিতে তুতুনকে ফুলকাকিমার ঘরে নিয়ে গেছে দীপনদা। হাতের বেড় দিয়ে ওকে কাছে টেনে নিয়েছে। কোমরের খাঁজে হাত রেখেছে – ‘আমি আছি তো ভয় কী? ইচ্ছে করলেই আমাকে ডাকবে। মাঝে মাঝে তোমাকে বেড়াতে নিয়ে যাব কেমন?’ দাদা ওদের চলে যাওয়ার আগে লাস্ট মোমেন্টে একটা চান্স নিল – ‘দীপনদা, তুতুনের মানে অরিত্রর বাড়ির চাবিটা... ? মাসিমা তো এখন নতুন বাড়িতে আছেন। ওই বাড়ি মানে অরিত্রর বাড়ি তো অ্যাকচুয়ালি তুতুনের অধিকারেই বর্তায়...! আসলে মাসিমা তো অরিত্রকেই বাড়িটা দিয়েছেন , তাই বলছিলাম...’
দীপন খুব ঠান্ডা গলায় বুঝিয়ে দিল ব্যাপারটা। মাসিমা মানে দীপনদা এবং তুতুনের যিনি শাশুড়ি মা, তিনি লিখিত কিছু দেননি যখন এবং এখন তিনি মেয়ে অর্থাৎ দীপনদার স্ত্রীর হেফাজতেই যেহেতু থাকবেন, সুতরাং... । মা যাকে ইচ্ছে তাঁর সম্পত্তি দান করতে পারেন। তাহলে মেয়েকে নয় কেন? অরিত্র যখন আর নেই তখন আর... ।
দাদা চুপ হয়ে গেল। দীপনদা সঙ্গে করে হয়ত ক্লাবের ছেলেদের এইজন্যই এনেছে। বলছিল দাদা।
মালপত্র সবকিছুই পেছনের ঘরে উঠেছে। কী এক অমোঘ আকর্ষণে সেখানে গিয়েছিল তুতুন। ঘরের ভেতরে আলোছায়ার অদ্ভুত খেলা চলছে। তুতুনের প্রিয় আসবাব দেওয়াল ঘেঁষে, ঘরের কোনে ঠাসাঠাসি গাদাগাদি করে বাধ্য ছাত্রের মত দাঁড়িয়ে আছে। সবাই তুতুনের মত একা আর ভীতু হয়ে গেছে। ওরাও কি অরিত্রকে দেখলে ভয় পাবে? চারপাশ থেকে দৃষ্টি সরতে সরতে চেয়ারের ওপর এসে থমকাল। এবং স্তব্ধ হয়ে গেল তুতুন। প্রিয় চেয়ারে বসে রয়েছে অরিত্র। মেরুন কালারের ফুল স্লিভ শার্ট পরে একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে তুতুনের দিকে। কপালের বাঁ পাশ দিয়ে মোটা ধারায় রক্ত নেমে আসছে। ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরের ভেতরে বসে অরিত্র তুতুনকে দেখছে। দেখার আর শেষ নেই যেন।
চিৎকার করেছিল কিনা মনে নেই। তাড়া খাওয়া জন্তুর মত পালিয়ে এসেছিল ফুলদিদার ঘর থেকে। অরিত্র তুতুনকে ছাড়া থাকতে পারেনা। ওই প্রেতলোকের জীবটিকে আপন ভাবতে পারেনা তুতুন। কী করবে ও?
রাতে তুতুন শুয়ে পড়লে মা পাশে গিয়ে বসে বাবার। বউদি মুখে ক্রিম ম্যাসাজ করতে করতে এসে দাঁড়াল। দাদাও এল। মা দুশ্চিন্তায় ভরে আছে। কে দেখবে তুতুনকে? বাপ মা কদিন? ভাইয়ের সংসার আছে। কদিন আর তারা তুতুনকে দেখবে?
বউদি প্রতিবাদ করেনা মায়ের কথায়। বলেনা – ‘এভাবে বলবেন না মা। তুতুন আমাদের সঙ্গেই থাকবে।’ বললনা বউদি। আলতো হাতে আপস্ট্রোকে ক্রিম ঘষে মুখে। দাদার স্বরও পায়না তুতুন।
বেলা দশটার দিকে তুতুন বিছানা ছেড়ে খোলা জানালার ওপাশে পার্কটার দিকে তাকিয়ে থাকে। বর্ষার জল পেয়ে আগাছায় ভরে গেছে পার্কটা। লম্বা লম্বা ঘাস গজিয়ে গেছে। বউদি কি চিংড়িমাছ রাঁধছে? গন্ধটায় গা গোলাচ্ছে তুতুনের। অরিত্র ভালবাসত চিংড়িমাছ। যেদিন শেষবারের মত বাড়ি থেকে বের হল বাড়িতে চিংড়িমাছ হয়েছিল। অরিত্র ফিরে এসে খাবে বলেছিল। ওর জন্য বেড়ে রাখা মাছ বাটিতে ছিল। তখনও ফ্রিজারে তোলা হয়নি। পরদিন গোলাপী বলছিল – ‘ইশ্, জামাইবাবুর মাছের বাটি ভর্তি পিঁপড়ে উঠে গেছে।’ কে আর মনে করে অরিত্রর জন্য রেঁধে রাখা মাছ ঢেকে রাখবে!
-‘তুতুন উঠেছ? এস, একটু চেখে দেখবে ঝাল নুন সব ঠিক হয়েছে কিনা।’ বউদি ডাকছে। তুতুন বোঝে এই ডাকাডাকির ভেতরে একটা উদ্দেশ্য আছে। তুতুনকে স্বাভাবিক করে তোলার উদ্দেশ্য। এমনভাবে বউদি ডাকল যেন কোথাও কোনও ঢেউ আসেনি তুতুনের জীবনে। রোজের সহজ স্বাভাবিক ছন্দে যেন চলেছে ও। বউদির ডাক শুনে আগের মত লাফাতে লাফাতে কিচেনে চলে যাবে আর চেটেপুটে খেয়ে ‘ফ্যানটাস্টিক’ বলে চেঁচিয়ে উঠবে। কিন্তু কোথায় যেন ছেদ পরে গেছে। আগে রান্নার প্রশংসা করলে বউদির মুখ আলো হয়ে যেত। কিন্তু এখন ঠিক তেমন হবেনা। বউদি চুপিচুপি বুঝে নেবে তুতুন বউদিকে তোয়াজে রাখছে। ভাইয়ের সংসারে ও একটা বোঝা। দাদা কাদের সঙ্গে যেন কথা বলছিল। তুতুন দেখল ওরা সব অরিত্রর পাড়ার ছেলে। দাদা লোকবল বাড়াতে চেয়েছিল। যদি বাড়িটার ব্যাপারে পাড়ার লোক তুতুনের পক্ষে দাঁড়ায়। অরিত্রর বড়দা মেজদা একেবারেই আমল দেয়নি তুতুনের দাদাকে। পাড়ার ছেলেরাও পিছু হঠল – ও বাড়ি বউদি পাবেন না। ওদের বড় গাছে নৌকো বাঁধা। তুতুন অবাক হয়, এই বড় গাছটা কোথায় কোথায় আছে যেখানে সবাই নৌকো বেঁধে নিশ্চিন্ত থাকে?
নিউজ চ্যানেল খুলে হরেক কিসিমের খবর দেখতে দেখতে বাবা শ্বাস ফেলে – ‘কী অবস্থা দুনিয়ার! বাড়িটা বোধহয় গেল। কিছু লেখাপড়াও করা নেই! অরিত্রর মায়ের অ্যাকটিভ হওয়া উচিত। তুতুন তো তারই ছেলের বউ।’
-‘একটা খবর শুনলাম বাবা’ দাদা বলল। অরিত্রর ভাগ্নে শুভ আর জামাইবাবু মিলে টাকা খেয়েছে ট্রাকমালিকের কাছ থেকে। এখন আর কোনওই আশা নেই।’
তুতুন বাতাসে পা রেখে হাঁটছিল। কিছুতেই পায়ের নিচে মাটির খোঁজ পাচ্ছেনা ও। দাদা কোথায়? পর্দা হাওয়ায় উড়ছে। পর্দা সরিয়ে তুতুন কি যাবে দাদার কাছে?
-‘কী হবে গো?’ বউদির গলা বাতাসে ভাসে।
-‘আর কী? বেকার ছুটোছুটি হল। চাকরিও পাবে কিনা ভগবান জানে। প্রাইভেট ফার্মের চাকরি কি এভাবে হয়?’ দাদার হতাশ গলা তুতুনকে ধমক দেয় যেন। পেছন ফেরে তুতুন। ওরা কেউ যেন তুতুনকে দেখতে না পায়। দাদার ঘরে কত আলো! প্যাসেজে মায়াবী আলোর কারিকুরি। এত আলো কেন? এই আলোর মধ্যে নিজেকে লুকোবে কী করে ও? এলোমেলো পায়ে দৌড়তে থাকে তুতুন। আলোর দুনিয়া থেকে পালাতে হবে। ফুলদিদার ঘর ছাড়া কোথায় পাবে সেই অন্ধকার? দীপনদাও চলে আসতে পারে। সেদিন বেড়াতে নিয়ে গিয়ে হুল্লোড় করেছিল তুতুনের শরীর নিয়ে। নিজেকে লুকিয়ে ফেলা ছাড়া আর উপায় নেই।
ঘুটঘুটে অন্ধকার ঘরে ঢুকে কিচ্ছু দেখতে পাচ্ছিলনা তুতুন। চেয়ার? চেয়ারটা কোথায়? মেরুন ফুল স্লিভ শার্ট পরে অরিত্র এখনও বসে আছে? আছে তো অরিত্র?
অন্ধকারকে বুকে জড়িয়ে ধরে পাগলের মত হাঁপাচ্ছিল তুতুন। ঘরময় শবের গন্ধ। তারই মাঝে একমাত্র আশ্রয়টিকে লক্ষ করে এগিয়ে যাচ্ছিল ও। মৃতের দেশ থেকে অমৃতের দেশে প্রবেশের পথ খুঁজছিল তুতুন। সেই অন্ধকার আর ভীতির নয়, বড় প্রিয় এখন ...।
নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন
লগইন