গোপনবাবু

সাগরিকা রায়

আর একপাক ঘুরে বেঞ্চটায় বসবেন অরিন্দম বসু। যদিও সুতপা বলে, “এ বয়সে আর গুনে গুনে পাক খাওয়ার দরকার কী? যদি হাঁটতেই হয়, তবে বাজারটা করে দাও বা গোলডিকে স্কুলবাসে তুলে দিয়ে এসো। ব্যস! ব্যায়ামও হল কাজটাও। ডেয়ারির দুধটা আনো গে। মর্নিংওয়াকও হল! আহেলিকে পয়সা দিয়ে লোক রাখতে হয় না তাহলে।”

সবই বোঝেন অরিন্দম। সুতপা খারাপ ভেবে কিছু বলেনি। কিন্তু ওসব কাজ কি অ্যাদ্দিন করেননি? ওগুলোকে ‘নতুন কাজ’ দেখিয়ে নাকের সামনে জিলিপি ঝুলিয়ে ছোটানো কেন? সমস্যা শুনে হেসেছেন সিদ্ধার্থ, “তুমিও পার অরিন্দম! একটা অপরাধ করে ফেলেছ সেটার মাশুল গুনবে না?”

“একটা অপরাধ! মানে?” অরিন্দম সিদ্ধার্থর কথার অর্থ বুঝলেন না।

“সরি। একটা নয়। দু’টো। দু’টো অপরাধ। প্রথমত রিটায়ার করেছ মানে মাসান্তে আগের মতো টাকা আনবে না আর দ্বিতীয়ত বুড়ো হয়ে গেছ। বুড়ো ঘোড়াকে কোথায় যেন গুলি করে মারে, জানো সেটা?”

“এসব কী বলছ?” ভিতরে ভিতরে আহত হলেন অরিন্দম।

“দু’বছর আগে আমি রিটায়ার করেছি। দু’টো বছর কাটুক, বুঝে নিও।” ম্লান হাসলেন সিদ্ধার্থ, “চলি। ওরা সব বের হবে। বাড়ি পাহারা দিতে হবে। কার যেন বিয়ে। বলাবলি করছিল। বাড়িতে।” চশমাটা ঠেলে তোলেন সিদ্ধার্থ।

“তুমি?”

“আমাকে তো জানায়নি কিছু। বৃদ্ধত্ব এক ধরনের সংক্রামক ব্যাধি। বউ পর্যন্ত এড়িয়ে চলে! মোহনা চাকরি করে। ওর নিজস্ব জগৎ আছে। আমার সঙ্গে বেশিক্ষণ থাকলে ওর মধ্যেও নাকি বুড়োটেভাব চলে আসবে। ছেলের বউয়ের সঙ্গে বিউটি থেরাপি নিতে যাচ্ছে, যোগা করছে, শপিং মল, আইনক্স...! মাঝে থেকে আমি বড্ড একা হয়ে পড়েছি অরিন্দম।” সিদ্ধার্থর ফেলে দেওয়া দীর্ঘশ্বাস বাতাসে ঘুরে বেড়ায়। সিদ্ধার্থ কেমন যেন হয়ে গেলেন! নিজের ভাললাগার জায়গাটা নিজেকে খুঁজে নিতে হয়। অরিন্দম সেদিন ব্যাঙ্কে গিয়েছিলেন। রিটায়ারমেন্টের পরে টাকাপয়সা ফিক্সড করেছে এমন কিছু মানুষ এক জায়গায় বসে আড্ডা দিচ্ছিলেন। আড্ডা বলতে কিচেন পলিটিক্স চলছিল বলা যায়। ছেলের বউয়ের বাড়বাড়ন্ত। কীভাবে শ্বশুর এবং শাশুড়ি একযোগে দমন করছেন তার পুঙ্খানুপুঙ্খ বর্ণনা করছিলেন গোলগাল ভদ্রলোক। বলতে বলতে আরামে চোখ বুজে আসছিল তার! বেশ ভাল কাজ পেয়েছেন ভদ্রলোক। তখন হাসি পেয়েছিল। এখন মনে হয় ভদ্রলোক খুব অসহায় অবস্থাতেই এই উপায় খুঁজে বের করেছেন। সবটাই টিকে থাকার কৌশল। এই কৌশল খুঁজে বের করেই অরিন্দম শরীরচর্চায় মন দিয়েছেন। আরে, বুড়ো হওয়ার মধ্যে অন্য সৌন্দর্য আছে। ভোর পাঁচটায় উঠবেনই অরিন্দম। নাতি গোলডিকে তার বাবা স্কুলবাসে তুলে দেবে আগের মতো। তিনি দেড়টা নাগাদ গিয়ে নিয়ে আসবেন স্ট্যান্ড থেকে। বাড়ির কাজে হেল্‌প করব মানে এই নয় যে বুড়ো ঘোড়ার রোল নেব! সেজেগুজে মর্নিংওয়াকে যাওয়ার সময় সুতপার টিটকিরি না শুনলে মন খালি খালি লাগে। চিবিয়ে চিবিয়ে অথচ সরলচোখে সুতপা বলে, “পার্কে কেউ আছে নাকি গো? তাড়াতাড়ি যাও। হয়তো অনেকক্ষণ ওয়েট করছে! দেখ বাবা! পুরনো রোগ। এ বয়সে চাপ সহ্য করতে পারলে হয়!” সুতপার ধারণা সুন্দরী মহিলা দেখলেই প্রেমে পড়ে যান অরিন্দম। সুতপা খেয়াল করে দেখেছে সে সময় অরিন্দমের ঠোটের অস্পষ্ট তিলটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

সুতপার অভিযোগটা অস্বীকার করতে পারেন না অরিন্দম নিজের কাছেই। নারীসঙ্গ তার বড় প্রিয়। অথচ সুতপাকে ভালবাসেন না তা তো নয়। মনে করে সুতপার জন্মদিনে বিশাল সাইজের পাবদা, চিতল, ছোট মাছ, কেক আনেন। বয়স কম দেখানোর নামী কোম্পানির ক্রিম, রিঙ্কল ফ্রি ক্রিম, লিপস্টিক ইত্যাদি দেন। কখনও ব্যবহার করে বলে মনে হয় না। তাঁর ভালবাসা, তাঁর চাহিদা কখনও বুঝল না সুতপা। দার্জিলিং বেড়াতে গিয়ে শিলিগুড়িতে একদিন ছিলেন। হংকং মার্কেট থেকে মেক-আপ বক্স কিনে দিয়েছেন। একজোড়া বিকিনি কিনেছিলেন। গোয়ায় যাওয়ার আগে। সুতপা ছুঁড়ে ফেলেছিল সেসব—“ছিঃ ছিঃ! মাথা খারাপ হয়ে গেছে তোমার!” স্বামীর রোমান্টিকতাকে টিটকিরি দিতে ও অরিন্দমের নাম রেখেছে গোপনবাবু। বেশি রেগে গেলে গোপনবাবু হয়ে যায় ‘গুপি’! এসব হেনস্থাকে সাবধানে হ্যান্ডেল করেন অরিন্দম। এই যে সিদ্ধার্থর বউ নিজের মর্জিমতো থাকে, সে কি স্বামীর অনুমতি নেয়? কার সঙ্গে যেন একটু আধটু সম্পর্কের কথাও শুনেছিলেন। প্রত্যেকেরই একটা নিজস্ব জীবন আছে। সেখানে যার যার পছন্দের খোলা ছাদ থাকা উচিত। গোপনবাবু! হুঁ:! আর তোমরা? তোমরা সব গোপী। কেষ্টা বেটাই বা সব সময় চোর কেন। হবে যদি গোপীদের প্রশ্রয় না থেকে? তাছাড়া, সুতপা যদি চাহিদাটা মেটাতে জানত তাহলে বাইরে চোখ রাখার কি দরকার ছিল? শুনে। সুতপা বাঁকা হেসেছে, “তাহলে হনিমুনে গিয়ে অরেঞ্জ কালারের সিফন পরা মেয়েটাকে দেখে তার পিছনে গিয়েছিলে কেন? মাত্র তো সাতদিন হয়েছিল বিয়ের!” কী স্মরণশক্তি! বাপরে! পাক শেষ হতেই বেঞ্চটাতে বসবেন বলে এগোলেন অরিন্দম। একটু রেস্ট, তারপর বাড়ি। বেঞ্চের দিকে এগিয়েই থমকে গেলেন। এতক্ষণ কেউ ছিল না। এইমাত্তর এসেছে। একটি মেয়ে। পাতলা ছিপছিপে চেহারা। গায়ের রং যেন কাঁচা হলুদ! কোঁকড়ানো চুলগুলো চওড়া ব্যান্ডে আটকে উঁচুতে তুলে রাখা হয়েছে। ট্র্যাকস্যুট পরনে। অরিন্দম স্তম্ভিত হয়ে গেলেন। হঠাৎ করে এরকম অলৌকিক চেহারার মেয়ে তার সামনে! অ্যাদ্দিন মর্নিং ওয়াক করছেন, এমন অভিজ্ঞতা কখনই হয়নি। এই ভোরবেলা আকাশ থেকে পরি নেমে আসেনি তো? “বসবেন?” নরম গলার স্বর যেন ফুলের পাপড়ি খসে পড়ল!

সম্বিত ফিরে পেতে পেতে ফের হারিয়ে ফেলছিলেন অরিন্দম। দিনের আলোয় এমন অপূর্ব রূপসি কখন এল? “বসুন না!” হাসল মেয়ে। হিরের ঝলক উঠল যেন। দাঁড়িয়ে থাকার ক্ষমতা ছিলও না। বসে পড়লেন অরিন্দম। মিষ্টি ফুলের গন্ধ পাচ্ছিলেন। পরির শরীর থেকে আসছে গন্ধটা। কে এ? “আমি সোহা। গড়িয়ায় থাকি। পঞ্চসায়রের এই লেকটার কথা আমাকে বলেছিল সোনাল দত্ত। পলিউশন নেই। নির্জন। তাই চলে এলাম বাইক চালিয়ে। আপনি বুঝি রোজই আসেন?” “রোজ। রোজ! পাঁচটায় উঠে চলে আসি। আপনি কি পড়াশোনা করেন?” অরিন্দম স্বাভাবিক ছন্দ ফিরে পাচ্ছিলেন। পালস রেট বেড়ে গেছে শুধু। শব্দটা কানে শুনতে পাচ্ছেন অরিন্দম। ব্লাড সার্কুলেশনের শব্দটাও। “আমি একটা মালটিন্যাশনাল কোম্পানির। পাবলিক রিলেশনস অফিসার। সারাদিন সময় পাই না। সামান্য যোগা আর মর্নিং ওয়াক!” ফের হিরে ঝলকালো। কাচের মতো স্কিনে সামান্য টোল পড়ল। অরিন্দম টলমল করছিলেন।

“নিশ্চয়। শরীর হল মন্দির। একে পুজো করতে হয়।” অরিন্দম সমে ফিরছিলেন। এবার জমে গেলেন। ফলে আড্ডাপর্ব সেরে যখন বাড়ি ফিরলেন, গোলডিকে সুতপা বাসস্ট্যান্ড থেকে নিয়ে এসেছে। সোহা অনেকক্ষণ চলে গিয়েছিল। অরিন্দম পার্কে বসে বসে প্রতিটি শব্দ, প্রতিটি মুহূর্ত রিওয়াইন্ড করে দেখলেন, শুনলেন। আচার চেটে খাওয়ার মতো। শরীর এবং মন সম্পূর্ণ রিচার্জড হয়ে গেল। ফেরার পথে বাজারটা ঘুরে গেলেন। নধর ডাঁটা, সরু সবুজ বর্ডারলাইনের পর হলদে মিষ্টি কুমড়ো, মোচা আর গলদা কিনলেন। দামটা বেশিই পড়ল। কিন্তু আজ দেরি করে ফেলেছেন।

তূণ থেকে বাণ ছুঁড়তে তৈরি হয়ে আছে সুতপা। বাণ-বৃষ্টি রোধ করতে তাই গলদার বর্ম! সুতপা অবশ্য ছাড়ল না! হুল ফোটাল, “দেখা হল? হুরি-পরির সঙ্গে?”

চমকে উঠলেন অরিন্দম। এর মধ্যে টের পেয়ে গেছে সুতপা? না বোধহয়! মন দিয়ে চিংড়ি দেখত না তাহলে!

সুতপা পিছন ফিরে চলে যাচ্ছে। অরিন্দম লক্ষ করলেন কোমরটা কী চওড়া হয়ে গেছে। থার্ডচিনের অস্তিত্ব পিছন থেকেও মালুম হচ্ছে। ফেস-মাসাজ-টাসাজ করতে তো পারে। এখনও কত চুল! অথচ চিরকেলে হাতখোঁপাই করে গেল। সিদ্ধার্থের বউ চমৎকার মেনটেন করে নিজের স্বাস্থ্য। কিস্যু শিখল না সুতপা। এদিকে হিংসেতে ভুড়ি হয়ে গেছে! ধ্যার!

খবরের কাগজ পড়তে পড়তে চা খেলেন অরিন্দম। মনটা বশে নেই আজ। সেই গানটা আছে না? প্রাণে খুশির তুফান জেগেছে! এদিকে সিদ্ধার্থ এক্কেবারে নিঃসঙ্গ! সবসময় একা থাকতে থাকতে একাকিত্ব চেপে ধরেছে ওকে। অরিন্দম সেদিনও থিয়েটারে যাওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন। সিদ্ধার্থ অনীহা প্রকাশ করেন, ‘না!’ এমন হলে তো তুমি পাশে কাউকে পাবেও না এক সময়। নিজের ভাললাগাগুলো খুঁজে বের করতে হয়। শুভময়দা যেমন। এখনও চমৎকার ফিট। বছর চারেক হল রিটায়ার করেছেন। মাঝে মাঝে বেহালার ওদিকে কোথায় গীতাপাঠের আসরেও যান, আবার ক’জন বন্ধুবান্ধব মিলে ‘ভেজা ফ্রাই পার্ট টু’ দেখে এলেন। ওঁর বউ রাগ করে কি? শুভময়দা হাসেন, “রাগ করবে কেন?” মিলিটারি মেজাজটা ছাড়তে নেই। ওটা যে ভড়ং সেটাও বুঝতে দিতে নেই। মেজাজে বলি, “যাও বাণী, রনিতার বাড়ি থেকে ঘুরে এসো। বাড়িতে থেকে থেকে পচে গেলে। রনিতা আমার শালী। আমি না বললেও যেত! কিন্তু গার্জেনগিরি দেখিয়ে বকলেসের চেনটা হাতে রাখলাম। সে খুশ! আমিও। বাড়ি ফাঁকা হলে আমার বয়সি দু’চারজনকে ডেকে একটু নিদোষ পার্টি হল। ওই একঢোক করে। রেড ওয়াইন।... তবে, বউকে নিয়েও বের হই। ব্যালেন্স না রাখতে জানলে চলে না?” সিদ্ধার্থ কিছুই পারল না। রিটায়ার করা মানে কি মরে যাওয়া নাকি?

ডোরবেল বাজছে। আহেলি অফিসে। ওর ভাই বিন্দুসার এসেছে। ছেলেটা ইদানীং জ্যোতিষচর্চা করছে। কোথায় নাকি চেম্বারও খুলেছে। কোন এক টিভি চ্যানেলে দুপুরের দিকে বসে। চেহারার মিষ্টি ভাবটা বেশ লাগে অরিন্দমের। অরিন্দমকে দেখে হই হই করে উঠল বিন্দুসার। “দেব সাহেব! কেমন আছেন?” তুলনাটা পছন্দ হল না অরিন্দমের। তিনি মাত্র ষাট বছরের শিশু। কমপক্ষে অমিতাভ বা মিঠুন বললে ভাল লাগত।

“দেখি আপনার হাতখানা।”

“ভিজিট দেব না বলে দিচ্ছি।”

“ভিজিট চেয়েছি? দেখেছেন মাসিমা?”

বিন্দুসার অভিযোগ করে!

সুতপা চোখ দিয়ে ধমকাল, “দেখাও না! ঘরের ছেলে!”

হাত মেলে ধরলেন অরিন্দম। দুটো হাতই। বিন্দুসার ডান হাতখানা টেনে নিল, “আতসকাচটা আনা হয়নি। তাতে সূক্ষ্মরেখাগুলো ভাল দেখা যায়। তবে আপনার হাত বেশ ভালই মেসো। শুক্রের স্থান উঁচু। সৌন্দর্যের প্রতি আকর্ষণ আছে। আপনার মধ্যেও আকর্ষণ ক্ষমতা আছে। জীবনে প্রেমপ্রীতিকে গুরুত্ব দিয়েছেন। মিশুকে স্বভাব! আর মঙ্গলের দ্বিতীয় অংশ বলছে রসিক আপনি। এদিকে—”

“তাই তো বলি! এত রস আসে কোত্থেকে?” সুতপা চোখমুখ নাড়াতে থাকে, “রাত জেগে রিয়েলিটি শো দেখেন তোমার মেসো। এনার্জি আর কাকে বলে! বাথরুমে গান গায় লাগা চুনরিমে দাগ ছুপাউ ক্যায়সে! সব সময়। গুপিগুপি ভাব!”

“তখন তো তুমি মুখ ফুলিয়ে ঘুমিয়ে আছ। এত ঘুমোও কেন?” অরিন্দম ছাড়বেন কেন? বিন্দুসার যে হাসি লুকোল লক্ষ করেন অরিন্দম, “জীবনটাকে এনজয় করা কি খারাপ কাজ বিন্দুসার? রিটায়ার করেছি মানে কি ধর্মকর্ম করতেই হবে? মনটা তো মরেনি।”

“সে তোমাকে বলতে হবে না, দেখলেই বোঝা যায়।” সুতপা উঠে পড়ল, “বিন্দু তুমি খেয়ে যাবে কিন্তু। চিংড়ি করছি।”

বিন্দুসার গোলডির সঙ্গে বকবক করছে। ভাবনার জগতে ঢুকে পড়লেন অরন্দিম। পরি কী করছে এখন? চাকরি করেও চেহারায় ফুলের পেলবতা ধরে রেখেছে। কাল তাড়াতাড়ি যেতে হবে, পরি আসবে। স্কুললাইফে পুতুল নামে একটি মেয়ের সঙ্গে একটুআধটু প্রেম প্রেম সম্পর্ক হয়েছিল। হঠাৎ করে পুতুলের বাবার চাকরিতে ট্রান্সফার অর্ডার এল। পুতুল খুব কেঁদেছিল। চলে গেল ওরা বাঁকুড়ায়। প্রথম প্রথম একটা দুটো চিঠি আসত। ধীরে ধীরে সেটা বন্ধ হয়ে গেল। এখন পুতুলের চেহারাটাও স্পষ্ট মনে পড়ে না। দুটো বিনুনি করে ‘লাভ ইন টোকিও’ ব্যান্ড লাগাত চুলে। আবছা মনে পড়ে এসব। কিন্তু গড়িয়ার মেয়ে যেন কাচ দিয়ে তৈরি। এমন চেহারা কি আগে দেখেছেন কখনও? সিনেমা কি টিভিতে? নাঃ! হলে মনে থাকত! এমনটা কখনও হয়নি যে সুন্দরী মহিলা চলে যাচ্ছে আর তিনি অন্যদিকে তাকিয়ে হরিনাম করছেন। এ নিয়ে সুতপা তো কম বলে। না! কিন্তু বউ ব্যাপারটা এতটাই বৈধ যে, তার ভিতরে উত্তেজনার বারুদ থাকে না। সব জলে ভেজা দেশলাই। চরম আশ্লেষের সময় সুতপা বলে উঠেছিল, “অনেকদিন সিলিংটা রং করা হয়নি, না গো?”

পরদিন তাড়াতাড়ি বের হলেন। সাদা ট্রাউজার, সুতোর কাজ করা লিনেনের সাদা শার্ট, পায়ে স্নিকারস। চুল পেকেছে। উঠে যায়নি। গতকাল স্নানের আগে হেয়ার কালার লাগিয়ে প্রায় লুকিয়ে ছিলেন খবরের কাগজের আড়ালে। স্নানের পর ধরা পড়লেন। সুতপা গালে হাত দিল, “রঙ্গ দেখি বেড়েই যাচ্ছে। তোমার শুক্রের স্থানের দফারফা করে দেব কিন্তু। মেসো, আপনার আকর্ষণ ক্ষমতা আছে!’ আহারে! ন্যাকা বুড়ো। বউয়ের জন্য তো এত রস দেখিনি কখনও?”

এমনিতেই আজ লজ্জা লজ্জা করছিল। সুতপার বিষকামড়ে মনটা বিষাক্ত হয়ে পড়ল। কিসের জন্য সংসার করে মানুষ? তিনি অন্যায় কিছু করছেন কি? যেখানে কথা বলতে ভাল লাগছে, সেখানে যাচ্ছেন। তাতে সুতপাকে অবহেলা করা হল কখন? সুতপা কিছুই উপলব্ধি করতে পারল না! এই সংসারের জন্য কি না করেছেন! দুঃখ হয়। কী পেলেন জীবনে? এতগুলো বছর সংসারের চাহিদা মেটাতেই পার করে ফেললেন। কেউ কখনও বলেনি, এবার তুমি একটু বিশ্রাম নাও! সুতপাও কখনও বলেনি, “যাও, ক’দিন ঘুরে এসো। আমি সামলে নেব সব।” একই চক্রযানে ঘুরপাক খেতে খেতে শ্বাস নিতে থামতে পারবেন না? বুড়ো! তিনিই কেবল বুড়ো হয়েছেন! আর কেউ বুড়ো হবে না? ছেলে রোহিত বউ আহেলিকে নিয়ে লাগোয়া পাশের ফ্ল্যাটে থাকে। নাকি পাঁচজনের পক্ষে একটা ফ্ল্যাট ছোট হয়ে যায়। ছেলেবেলায় বাবা-মা-পিসি, দাদুর সঙ্গে বেহালার হরিসভা লেনের দেড়খানা ঘরে থাকেননি? অসুবিধে শব্দটা মাথায় ছিল না কারও! আহেলি জিনস-টি শার্ট পরে বাইক চালিয়ে অফিসে যায়। রোহিতও। গোলডি স্কুলের সময় বাদে বাকি সময় তাদের কাছে থাকে। কত স্বাধীনতা রোহিতদের জীবনে। ওদের হাজব্যান্ডওয়াইফের মধ্যে কোনও ঝুটঝামেলা নেই। অথচ তার জীবন? সুতপা কী দিয়েছে তাকে? পঞ্চাশ বছরেই প্রায় বৃদ্ধা সুতপা। সাজগোজ নেই। ইদানীং অন্তর্বাসও পরে না। অনুযোগ করাতে ভ্রূ কুঁচকে উঠেছে ওর, “নাতি হয়ে গেছে! এখন আবার অত কী? বাইরে গেলে তো পরি!” কয়েকদিন আগেই সিদ্ধার্থর বউ মোহনাকে দেখলেন। তরতরে, ছিমছাম। যোগা করে, বিউটি থেরাপি করে, ম্যাসাজ পার্লারে যায়। কে বলবে ওর নাতি আছে? কাঁধে স্ক্র্যাপ দেওয়া ব্যাগ। লম্বাটে মুখে চৌকো ফ্রেমের সানগ্লাস। ব্রাউন শেডের সিল্ক শাড়িতে কী অসম্ভব সুন্দরী দেখাছিল মোহনাকে। সঙ্গে সিদ্ধার্থকে দেখতে পাননি। মোহনা একাই ছিল। মনে মনে সুতপাকে পাশে দাঁড় করিয়ে বড়সড় শ্বাসই ফেললেন অরিন্দম। আর কিছু নয়। সকালটা ঝরঝরে সুন্দর। একবার করে লেকটা পাক দেন, নজর রাখেন বেঞ্চটার দিকে। এখনও আসেনি সোহা। আজ আসবে কি না কে জানে! চতুর্থ পাকের পর দেখলেন পরি আসছে। হেঁটে। গাঢ়রঙের কটন ট্রাউজার্সের সঙ্গে ওয়াইন রেড টপ পরেছে। তার সঙ্গে সঙ্গে জগিং করতে করতে কথা বলছিল সোহা। অরিন্দম লক্ষ করলেন সোহার গলায় খুদে খুদে পাথরের হালকা নেকপিস। সেটা তিনি লক্ষ করেছেন দেখে মিষ্টি হাসল সোহা, “আজ অফিসের পর পার্টিতে যেতে হবে। এখনই বেরিয়ে পড়ব। শুধু অভ্যেসটা বজায় রাখতে এসেছি।” অরিন্দমের খুব ইচ্ছে করছিল সোহার সঙ্গে গল্প করতে। সেটা বলেও ফেললেন।

“আপনি নেটে বসেন?” সোহা সহজ উপায় বের করল, “ফেসবুকে আমার অনেক বন্ধু আছে। চ্যাট করতে দারুণ লাগে। আজ পারব না। কাল থেকে রাত ন’টার পর চ্যাটে থাকব। ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠাবেন। আমি অ্যাকসেপ্ট করে নেব।” চলে গেল সোহা।

ফেরার পথে সাইবার কাফেতে ঢুকলেন অরিন্দম। কম্পিউটারটা একেবারেই জানা নেই। ক’দিন শিখলেই হয়ে যাবে। তেমন শিখে গেলে রোহিতের মতো ল্যাপটপ নেবেন। ব্যস! বিশ্বরূপ ছিল সাইবার কাফেতে। অরিন্দমের ইচ্ছে জেনে খুশি হল। “শিখবেন? কোনও ব্যাপারই না। বসুন।”

বিশ্বরূপ কম্পিউটার অন করা থেকে শেখাতে শুরু করল। মাউসটাকে বশ করতে পারছিলেন না। প্রথম প্রথম এমন হয় হয়তো। প্রবল উত্তেজনাও কাজ করছিল। দিন পাঁচেক পর থেকে রাত নটার পর ‘এটটু ঘুরে আসছি’ বলে বের হলেন। আজ বলা আছে। সোহা অনলাইন থাকবে। কথা হবে। কথা হলও। প্রথম দিন বলে ভয় ভয় ছিল। সুতপা জানতে পারলে...। সাড়ে ন’টার পর বাড়ি ফিরে এলেন। আজকালকার মেয়েরা কত স্মার্ট! বুড়ো বলে ভাগিয়ে তো দেয়নি। গান শোনাল। উনিও প্রেমেন্দ্র মিত্রর কবিতা বললেন। শেষের লাইনগুলো অবশ্য ভুলে গেছেন। পৃথিবী কত পালটেছে। দেখো সুতপা দেখো! কতদিন পর কবিতা বললেন! খুব ভাল লাগছে।

সকালে ঘুম ভাঙল পরম তৃপ্তির সঙ্গে। গতরাতে শোওয়ার আগে একটু ক্রিম ঘষেছেন মুখে। সকালে দেখলেন চকচক করছে চামড়াটা। আয়নায় নিজেকে দেখতে দেখতে মনে হল খুব কি দেরি হয়ে গেল জীবনের আনন্দটুকু পেতে? কে জানে জীবন শেষ হয়ে এল কি না! মনটা উদাস হয়ে গেল!

আজ ঘণ্টা দেড়েক বসে থেকেও দেখা হল না। সোহা এল না। গতকাল তো কিছু জানায়নি। ইস! ওর মোবাইল নাম্বারটা কোথায় রেখেছেন। সেভ করা তো হয়নি! শরীর ভাল আছে তো সোহার? মনটা বিমর্ষ হয়ে পড়ল। ক্লান্ত পায়ে বাড়িতে এসে ঝামেলায় পড়লেন। বিশ্বরূপ রোহিতকে তাঁর কম্পিউটার শেখা, চ্যাটিং ইত্যাদি খবর দিয়েছে। আহেলি নাকি এর মধ্যে কবে দেখেছে সুন্দরী যুবতীর সঙ্গে পার্কের বাইরে গল্প করছেন অরিন্দম।

বাড়ির পরিবেশ থমথমে। সুতপার মুখ হাঁড়ি। রোহিত কী রকম যেন হাসল, “তোমার গোপনবাবু নামটা মা ঠিকই দিয়েছে।” খুব দুঃখ পেলেন অরিন্দম। ভিতরে ভিতরে অপমানিত হয়েছেন। সুতপা যদি এসব সহজভাবে নিতে জানত তাহলে লুকোছাপার দরকার কী ছিল? বিকেলে বের হলেন না। রাত ন’টার মধ্যে। সামান্য খেয়ে শুয়ে পড়লেন। সুতপা একবারও সামনে এল না। রিটায়ার করার পর সবাই কেমন ঝিমিয়ে যায়, খিটখিটে হয়ে যায়, এমনটা কত শুনেছেন। অথচ, তিনি যখন অন্য রকম হতে চাইলেন কারও পছন্দ হল না। কী আশ্চর্য পৃথিবীতে বাস করে মানুষ!

চারপাশে নাকি আপনজনেরা থাকে! এরা তার আপনজন? এমনকী আহেলি পর্যন্ত কুৎসিত ভঙ্গিটাকে আয়ত্ত করেছে। অথচ তিনি মনে করতেন মেয়েটি আধুনিক মনস্ক! রোহিতের জীবনটাও তার মতো বদ্ধ জলা হয়ে থাকবে। কোথাও খোলা জানলা নেই। বদ্ধ বাতাসে দম আটকে আসে যেন। কেন মানুষ বেঁচে থাকে। এত অপমান সহ্য করে?

ঘুমিয়ে পড়েছিলেন অরিন্দম। রোহিত ডাকছিল তাঁকে। রোদ চড়চড় করছে।

“বাবা। ওঠো! আজ মর্নিংওয়াকে গেলে না?” রোহিতকে অবিন্যস্ত দেখাচ্ছে। অরিন্দম ক্ষোভ উগরে দিলেন, “এ কথা বলতে ডেকে তুললে? ঘুমানোর স্বাধীনতাও নেই নাকি?” অরিন্দম উঠে বসেন।

“বাবা! একটা খারাপ খবর আছে। তোমার বন্ধু সিদ্ধার্থকাকু... উনি মারা গেছেন। ওঁর স্ত্রী মানে কাকিমা ফোন করে বললেন!”

রোহিত বুঝতে পারেনি এতটা রিঅ্যাক্ট করবেন অরিন্দম। অস্থির হয়ে পড়লেন তিনি। সিদ্ধার্থ মারা গেছে! কীভাবে? সুস্থই তো ছিল!”

“পড়ে গিয়েছিলেন নাকি! বালব চেঞ্জ করতে গিয়ে টেবিলে উঠেছিলেন। পড়ে গিয়ে স্পাইনাল কর্ড, সার্ভাইকাল ভার্টিব্রা ভেঙে যায়। নার্সিংহোমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল, কিন্তু...! একবার যাওয়া দরকার।”

ধীরে ধীরে শুয়ে পড়লেন অরিন্দম। শেষ পরিণতি তাহলে এ-ই? ভয়াবহ মৃত্যু অপেক্ষমান তার জন্যও? সিদ্ধার্থ কি সুইসাইড করল? দিনের পর দিন একাকিত্বের যন্ত্রণা সহ্য করতে পারেনি আর ও! সে জন্যই হয়তো এই রাস্তাটা বেছে নিয়েছিল! কে বলবে সত্যিটা? বাকরুদ্ধ হয়ে গেলেন অরিন্দম। কথা বলার স্পৃহাটুকুও ছিল না। অথবা ক্ষমতাই ছিল না। চোখ পলক ফেলতে ভুলে গিয়েছিল। ডাক্তার ডেকেছে রোহিত। ডাক্তার দাশগুপ্ত ওঁদের ফ্যামিলি ফিজিশিয়ান। ঘুমের ওষুধ দিলেন। লিকুইড-এর সঙ্গে গুঁড়ো করে দিতে বললেন। হঠাৎ করে তীব্র শক পেয়ে এমন হয়েছে। “কাছে থাকুন। ওঁর এখন সহানুভূতি দরকার।” ধীরে ধীরে চেতনা ফিরছিল অরিন্দমের। বোধহয় ভোর হয়ে আসছে। ঘরের ভিতরের আবছা আলোতে খড়ের তৈরি দুর্গার কাঠামোর মতো দাঁড়িয়ে আছে সুতপা। অরিন্দমের একটা হাত চেপে ধরে আছে।

অরিন্দম নড়ে উঠতে চমকে উঠল সুতপা, “শুনতে পাচ্ছ? তুমি শুনতে পাচ্ছ?” ঘরে কেউ এল কি! অরিন্দম আহেলিকে দেখলেন। ‘মা!’ অস্পষ্ট ডেকে উঠল আহেলি। সুতপা কেঁদে উঠবে হয়তো আহেলিকে দেখে। ভাবলেন অরিন্দম। সুতপা কাঁদল না। পিছন ফিরে আহেলির দিকে তাকাল; “আহেলি! সেই খুব সুন্দরী মেয়েটিকে তুমি কোথায় দেখেছিলে? একবার যাও। যদি পারো, নিয়ে এসো। ওকে দেখলে হয়তো তোমার বাবার মনটা ভাল লাগবে। যেভাবে পারো নিয়ে এসো।...ওঁকে বাঁচাতেই হবে যে!” অরিন্দম দেখলেন সুতপার ধেবড়ে যাওয়া টিপ, চওড়া সিঁথি, মোটা কোমর, থার্ড চিন। হাত বাড়িয়ে সুতপাকে ছুঁতে ইচ্ছে হল তাঁর। হাত বাড়ালেন না ইচ্ছে করেই। আর একটু দেখতে ইচ্ছে হল। এভাবে অনাবৃতা হয়নি সুতপা কখনও। এমনভাবে মন খুলে দাঁড়ায়নি তার সামনে।

মনে মনে কথা বলছিলেন। সুতপাকে লক্ষ করেই, “বুঝলে, তোমরা মেয়েরা হলে এক একটি গোপনবাবু। বাইরেটা দেখাও। ভিতরটা বুঝতে দাও না। কী আশ্চর্য প্রাণী এই নারী। ওইটুকু মেয়ে আমার বন্ধু হয়ে উঠতে পারে! বর মরে গেলে বউ ফোন করে স্বাভাবিক ঘটনা হিসেবে বরের মৃত্যুর খবর জানাতে পারে। কে বুঝবে নারীর মন কী দিয়ে গড়া! শ্বাস ফেলেন অরিন্দম। তাঁর পাশে সুতপা আছে। মোহনা নয়। কী দিয়ে তৈরি খড়ের প্রতিমা? সুতপাকে বুঝতে অনেক দেরি হল! অনেক! সোহা এলে বেশ হয়। সুতপার সঙ্গে আলাপ করিয়ে দিতে হবে। শুভময়দার সঙ্গেও। সুতপার জীবনে জানলা কোথায়? জানলাটা খোলার দায়িত্ব অরিন্দমের হাতে! শুভময়দাকে ভাল লাগবে সুতপার। রসিক মানুষ। রঙ্গরসে জমিয়ে দিতে জানেন। খোলা হাওয়ায় হাসুক সুতপা! জীবনে সবাইকে একটু একটু গোপনবাবু হতে হয়। না হলে বেঁচে থাকার মজা কোথায়? যখন তখন টেবিল থেকে পড়ে যেতে হতে পারে! স্পাইনাল কর্ড ভেঙে কী লাভ? দেখ, হার্টটাও যেন না ভাঙে! ওটার খুব দাম সুতপা! অনেক দাম। গুনতে পারবে না! অরিন্দম ডাকলেন, “সুতপা! একটু জল দেবে? ঠান্ডা জল!”

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%