স্থাপত্যকৌশল

সাগরিকা রায়

মৃদুলবাবুর বাড়ি থেকে বেরিয়ে সরাসরি জনবহুল রাস্তায় এসে পড়ল বিতনু। মানুষ আর চাকা... দেখতে দেখতে ভোঁ ভোঁ করে মাথা। এমনিতেই ওর স্পন্ডেলাইটিসের প্রবলেম। বালিশ ছাড়া শুয়ে দেখতে বলেছেন শ্রীকুমারবাবু। ওঁর প্রবলেমের সঙ্গে অনেকটাই মেলে বিতনুর উপসর্গের। সেদিন সমস্যা শুনে ওঁর মুখে পাঁচশো ওয়াটের বাল্ব জ্বলে উঠেছিল – ‘সত্যি নাকি? আরে, আমারও তো...।’ যেন ‘তোর শাউড়ির নাম ঝুমকি? আমার পিসশাউড়ির নামও তো...! কী মিল দ্যাখ।’ সাঁই সাঁই ছুটে চলা মানুষ দেখতে দেখতে বিতনু ভাবল এত মানুষ কোথায় যায় এভাবে? কারও এক সেকেন্ড থেমে যাওয়ার উপায় নেই! ভ্যাকুয়াম ক্লিনারের প্রবল আকর্ষণে সোঁ সোঁ শব্দে সবাই একই দিকে ধাবমান। সন্ধের গন্ধমাখা এই বিকেলে নিজেকে আদিম মানুষ ভাবতে ইচ্ছে করে বিতনুর। সেই মানুষ, যে পশুচারণ সদ্য সমাপ্ত করে কৃষি সভ্যতায় ঢুকেছে। স্থায়ী আবাস তৈরি করতে শিখেছে। সেইসব আধুনিক গুহা টানছে সবাইকে। যে-যার গুহার দিকেই প্রবল বেগে ছুটছে, চিনে নিচ্ছে নিজস্ব আবাসস্থল। দিয়া পার্লার থেকে ফিরে গোমড়া মুখে বসেছিল। ফেসপ্যাক লাগালে এইরকমভাবে বসে থাকে ও। কিন্তু এখন কেস অন্য! ফেস প্যাকের কেস নয়। তাহলে? চোখ কুঁচকে শিস দিল বিতনু- হোয়াটস দ্য প্রবলেম?

মুখে রিঙ্কল ধরা পড়েছে বুঝি? খ্যাক করে উঠল দিয়া- ‘ঠাট্টা ইয়ার্কি ছাড়ো প্র্যাকটিকাল হও! আজ পার্লারে গেছিলাম।’

বিতনু হাসল – ‘জানি। সাঁলোতে গেছিলে তো?’

‘মামনি এসেছিল। বডি স্পা করাতে!’

‘ওহো! তুমি করাবে বডি স্পা? নেক্সট উইকে চলে যেও।’ সমাধান বাতলে উঠে পড়ছিল বিতনু, দিয়া আটকাল— ‘আমার কথা শেষ হয়নি। জাস্ট শুরু করেছি।’

ও বাবা! বডির পর আর কী কী থাকে মানুষের? রূপসাগরের পর কী অরূপরতন চায় দিয়া? বিতনুর পকেট পারবে সামলাতে?

‘ওর বর জয়দীপ দারুণ কাজ করছে! একটার পর একটা হিট মাল ছাড়ছে বাজারে! পয়সার গন্ধ মামনির শরীরে, কথায়... বডি ল্যাঙ্গুয়েজ পালটে গেছে! ভাবতে পারবে না!’

‘ওর বর সিনেমায় নেমেছে? নাকি প্রোডিউসার? নাম শুনিনি তো! এখন তো ভেঙ্কটেশ, ধানুকা ব্যাটিং করছে! জয়দীপটা কে? প্রোডাকশন হাউসের নাম কী?’ বিতনু সিরিয়াস মুখ করে দিয়ার ভাবনাকে কদর করার চেষ্টা করে। অথবা পুরোটাই ভান মাত্র।

দিয়া বিদ্রুপাত্মক হাসি হাসে বিতনুর উৎসাহ দেখে— ‘জয়দীপ, মামনির বর, বিশেষ কাজের মানুষ হয়েছে! যত বিল্ডিং দেখছ ইদানীং, প্রায় টেন পার্সেন্ট জয়দীপের কাজ! ওর হাতের তৈরি। সৃষ্টি বলতে পার।’

‘ওহো! বুঝেছি, রাজমিস্ত্রি বুঝি ? বাঃ!’ বিতনু বেশ গম্ভীর। দিয়া এখনও ব্যঙ্গের হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে লিপগ্লস লাগানো ঠোঁটে, এটাই যা ভয়ের!

‘না। প্রোমোটার। পনেরোটা ফ্ল্যাটবাড়ি কমপ্লিট করে, আরও চারটের কাজ চালাচ্ছে।’

‘কী করে?’ এবারে সত্যি অবাক হল বিতনু। যা একটা বোমা ফাটাল দিয়া। আরডিএক্সের পরিমাণ বিতনুকে ছেঁতড়ে দেওয়ার পক্ষে যথেষ্ট ছিল।

‘কাজ করে করে।’

‘সেটা তো আমিও করি করি!’

‘কিন্তু তোমার কিসসু নেই। ঠোঁট উলটে দিল দিয়া।

বিব্রত হাসে বিতনু- ‘আসলে কী জান, মোটা পার্টি পাচ্ছি না! মাকালবাবু বলেছিল ভালো পার্টি আছে হাতে। ঘুরছি। পার্টি দেয় না। বেশি বেশি চিনি দেওয়া সিটিসি পাতার লাল চা খাইয়ে পাগল করে দিল। কিন্তু জয়দীপের কথা শুনে ভক্তি বিহ্বল হয়ে পড়ছি মাকালী!’ পরস্পরকে ছুঁড়ে মারা ধনু, শক্তি, সৃষ্টি, প্রাস, নিদ্রাবাণগুলোকে সযত্নে সরিয়ে রাখল দিয়া- ‘শোনো, সময় আসবে। খপ করে ধরে ফেলতে হবে। তুমি গড়িয়া স্টেশনের মহারানি বৈদ্যর জমিটার খোঁজ নিয়েছিলে? পঞ্চসায়রের পেছনের নয়াবাঁধে সস্তায় জমি ছেড়ে দিচ্ছিল কারা, খোঁজ করতে বলেছিলাম। যাওনি! ফেসবুক নিয়ে পড়ে থাকলে ব্যবসা এগোয়?’

‘ফেসবুককে তুমি বরাবরই দুয়োরানি ভেবে এসেছ। কিন্তু, ফেসবুক কী করতে পারে জান? কায়রোর ছাব্বিশ বছরের আসমা তার স্ট্যাটাস আপডেট করলেন, আমি তাহরির স্কোয়ার চললাম। ব্যস! এক হপ্তার মধ্যে লক্ষ লক্ষ মানুষ। তাহরিরে জড়ো হয়ে গেলেন। দাবি তুললেন— স্বৈরাচারী যুগের পতন! ফেসবুক-টুইটার প্রতিবাদ ছড়িয়ে দেওয়ার একটা হাতিয়ার ইয়ার! ফেসবুক রেভোলিউশনের উদ্দাম ঢেউ টিউনিশিয়ায় ছড়াল, ইয়েমেনে, লিবিয়ায়, বাহরিনে, বাংলাদেশে ছড়াল!’

‘তোমার কী এল গেল?’ খুব শান্ত হাসি হাসল দিয়া। থতোমতো খেল বিতনু। দিয়া ঠান্ডা মাথায় দান দিচ্ছে, খুঁটি সামলাতে পারছে না বিতনু। কী যে হবে আজ! পূর্ণিমা তিথিতে নাকি স্ত্রীজাতির মাথা ঠান্ডা হয়, কৌশলী হয়... আজ কি পূর্ণিমা?

‘তুমি যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত হও।’

‘মানে?’ যুদ্ধ শব্দটাতে তরোয়ালের ঝনঝনানি শোনে বিতনু।

‘বেঁচে থাকতে হলে উঠে দাঁড়াতে হবে। মামনির বর যা পারছে, তুমিও পারবে। কম্পিটিশন চলছে সর্বত্র। ব্রেনটাকে হেলদি করো। তাহলেই আর পিছু ফিরে তাকাবে না। কেবল দেখবে লাইনে তুমি কোথায় দাঁড়িয়ে। কতটা এগোতে পেরেছ। সামনে ক-জন!

‘তাহলে?’ বাধ্য ছাত্রের মতো প্রশ্ন করে বিতনু। দিয়া এমন মায়াবী সুরে কথা বলছিল যে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যেতে হয়। বিয়ের আগে দিয়া রেডিও-জকি ছিল। এখন লোকাল চ্যানেলে এক জ্যোতিষীর সঙ্গে দুপুরের দিকে বসে। কথা বেচে খায়। ডিমান্ড অছে ওর!

‘তাহলেই সব করায়ত্ত।’ হাত মুঠো করে দেখাল দিয়া। নীচু গলায় বিতনুকে বুদ্ধি জোগায় ‘আজই আমাকে কতগুলো জিনিস এনে দিতে পারবে?’ পার্স খুলে একটুকরো কাগজ বের করে ও – ‘লিস্ট করে এনেছি। ধাতুর ফুলদানি, সাদা প্লাস্টিকের ফুল, বাজনাওলা ঘড়ি, তিনটি চিনামুদ্রা, সাতরঙা হাওয়া-ঘণ্টা, লালবল, ধাতুর কচ্ছপ..!’

‘মানে?’ হাবুডুবু খায় বিতনু - ‘ফেং সুই?’

‘ইয়া। এসব ছাড়া লাক ফেরে না। জীবনের বাধাবিপত্তি সরাতে হবে তনু। মামনি খুব উপকৃত হয়েছে। ...কখন যাবে? এখন?

‘যাব? কোথায়?’

‘এগুলো আনতে। বোকা বোকা ভাব কোরো না তো!’

‘এসব কোথায় পাব? চোরবাজারে?’

‘মামনি ঠিকানা দিয়েছে।’ কাগজের টুকরোটা দেবতার আশীর্বাদের মতো এগিয়ে দিল দিয়া বিতনুর দিকে।

পরিস্থিতিকে দ্রুত আয়ত্তাধীনের চেষ্টা করে বিতনু। এই মুহূর্তে দিয়ার মেজাজ- টাকে হাতে নিতে হবে। আজই মায়ের চিঠি এসেছে। অতনুর কাছে আছে মা এখন। কিন্তু ছ-মাস কমপ্লিট। অতনুর কোটা শেষ। এবার বিতনুর পালা। দিয়াকে আস্তে আস্তে বশে আনতে হবে। যখন-তখন খাণ্ডবদাহনের খবর গৃহস্থকে দিতে নেই। প্রেসার চড়ে যাবে তাতে।

দিয়ার হাউসকোটের মেরুন কালার এদিক-ওদিক ওড়াউড়ি করছে। বিতনু রুমাল বের করল। চোখে-মুখে বালি কিচকিচ করছে। রাস্তার যা দশা। দূষণ দূষণ করে এত চেঁচামেচি কিন্তু ফল শূন্য! সূর্য তার গ্রহগুলি সম্পর্কে উদাসীন হয়ে পড়েছে। শুভ ইউনিভার্সিটির প্রফেসর। ওর বিষয় জ্যোতির্বিজ্ঞান। বলছিল, পুরো সিস্টেমটাই পালটে যাচ্ছে। ওজোন স্তর ভেঙে চুর্ণ হয়ে যাচ্ছে। কী রেখে যাব আমরা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য? শুভর চিন্তিত স্বর এই সাতশো স্কোয়ার ফিটের ফ্ল্যাটে ধ্বনিত হওয়ার প্রয়োজন ছিল না। অথচ বিতনুর মনে এল!

‘ফ্রেশ হয়ে নাও, খাবার গরম করছি।’ দিয়ার গলার স্বর শুভর কথাগুলো ভেঙে দিচ্ছিল। হাজরা মোড়ে শুভর সঙ্গে দেখা হয়েছিল সেদিন। খুশি হয়েছিল শুভ। একগাল হেসে হাত বাড়িয়ে দিয়েছিল— ‘কী রে? প্রোমোটার হয়েছিস? একটা ফ্ল্যাট দে।’ বিতনু খুশি হয়েছিল সেদিন। ‘প্রোমোটার হয়েছিস?’ বাক্যটিতে প্রতিষ্ঠার শিলমোহর লাগিয়ে দিয়েছিল শুভ সেদিন। কিন্তু দিয়া খুশি নয়। মামনির বরের পাশে বিতনু বড় ম্যাড়মেড়ে। এক পার্টির আজ আসার কথা ছিল। ওরা ফ্ল্যাট বুক করতে চায়। ইদানীং পার্টি শব্দটাতে কান খাড়া হয়ে ওঠে। কীরকম পার্টি? কম তেলে মুচমুচে ভাজা চায়? অবশ্য কে-ই বা সেটা চায় না ? ডোরবেল বাজতেই দরজা খুলে দাঁড়াল বিতনু। ছিপছিপে তরুণীর রঙিন চুল, সঙ্গী যুবকের হাতে ল্যাপটপ। চেহারায় গাম্ভীর্য রেখে সামান্য হেসে বিতনু – ‘বলুন।’

মেয়েটা ঠোঁট ফাঁক করল – ‘ফ্ল্যাট চাই।’

বিতনু লক্ষ করল কথা বলার সময় মেয়েটার দাঁত দেখা গেল না। কত কায়দা। বিতনু ঘরে বসিয়ে হিসেব কষে দেখাচ্ছিল ওদের। ছ-শো স্কোয়্যার ফিট প্লাস কো-শেয়ারার হচ্ছেন ছাদ, জল, সিঁড়ি, গেট। ওরা ফ্ল্যাট সম্পর্কে জানতে চাইছিল আরও। বিতনু রবিবার বেলা দশটা নাগাদ আসতে বলল ওদের। পার্টিকে হাতছাড়া করা উচিত নয়।

মৃদুলবাবুর কাছে গেল বিতনু পরদিনই। দাঁতে কাঠি খোঁচাতে খোঁচাতে মৃদুল হাসলেন—‘একদিনে লাখপতি হওয়ার কথা ভাববে না। তবে, কম্পিটিশনে নামতে হবে।’

কম্পিটিশন! কম্পিটিশন! শব্দটা তাড়া করে সবসময়। শান্তিতে এক কাপ চা খেতে পারে না বিতনু। এই বুঝি কিছু ফসকে গেল। এদিকে আরেক ঝামেলা শুরু হয়েছে। কিছু অবৈধ বহুতল ভাঙার কথা হচ্ছে। প্ল্যান পাস করার সময় কিছু নিয়ম মানতেই হচ্ছে এখন। সবটা মিলিয়ে ভজঘট অবস্থা! মাঝে মাঝে গভীর ঘুমের ভেতরে হাফপ্যান্ট পরা অন্য এক বিতনু এসে হাজির হয়। এসেই ধমক দিতে থাকে— ‘প্রোমোটার হয়েছ? এক্সপিরিয়েন্স আছে? করতে তো টিউশনি! পারবে সামলাতে?’ দিয়ার পাশে শুয়ে থাকা বিতনু অবশ্য পাল্টা হুমকি দিতে ছাড়ে না—‘কে হে হরিদাস পাল? পারব না মানে? তিনটে জমিতে চারতলা করে মোট বারোতলা ফ্ল্যাটবাড়ি বানাচ্ছি। একটা আছে পি প্লাস থ্রি। পার্টি আমার হাতের মুঠোয় তা জান?’ হুমকি খেয়ে তৎক্ষণাৎ চুপসে যায় হাফপ্যান্ট বিতনু। পেছনের জমাদারের সিড়ি বেয়ে নেমে যায় কোথায় কে জানে! গভীর আয়েসে দিয়াকে জড়িয়ে ধরে বিতনু। এক্সপিরিয়েন্স দেখাতে এসো না চাঁদ!

ওসব কিনতে পাওয়া যায় বুঝলে? দেখছি তো মধুবাবু অভিজিতবাবুদের। মৃদুল বাবুই বা কম কী? ওঁরা কি শুয়ে শুয়ে প্রোমোটার হয়েছে?

সকালে বের হবে বলে প্রস্তুতি নিচ্ছে, অতনুর ফোন এল। মিহিকার একটা ভালো সম্বন্ধ এসেছে। বিতনু যদি...! বিতনু বিরক্ত হল। ধুস! মিহিকা-টিহিকা গুলি মার। ব্যবসার যা অবস্থা! সবসময় সতর্ক থাকা দরকার। ম্যাডামের জমিটা নিয়ে গণ্ডগোল হচ্ছে। সমীর সরকার নাকি শাসাচ্ছে জমিটা কাউকে কিনতে দেবে না। ম্যাডামকে নাকি ভালো টোপও দিয়েছে। বলরাম পাকা খবর এনেছে। এদের পেশিবল বেশি। ভয় পাইয়ে পার্টিকে বশ করে। দাম যা দেবে তা ধর্তব্য নয়। এক্ষেত্রে জমিটা পেতে হলে কায়দা করতে হবে। সমীর বশ করার আগে আলকায়দা ইউজ করতে হবে ম্যাডামকে বশ করতে। বসাকের কাছে যেতে হবে মেটিরিয়ালসের জন্য। এতসব কর্মকাণ্ডের মধ্যে মিহিকা কোথায়? মা-ই বা কোথায়? মন দিয়ে স্থাপত্যকৌশল আয়ত্ত করতে হবে। মনোযোগ অন্যদিকে দেওয়ার সময় কোথায়? এখন নজর দিতে হবে বাড়ি ফাউন্ডেশনের সুপার স্ট্রাকচারে। দেওয়াল যদি কোথাও বসে যায়, তাহলে অসমান ভাবে বসে পড়ার জন্য দেওয়ালে ফাটল দেখা দেবে। মেঝেতে দু-রদ্দা ইটের শোলিং বিছোতে হবে। টাইলস, পাথর ইত্যাদির বাজারদর যাচাই করতে হবে। ফ্ল্যাটে ইদানীং লফট্‌ চলছে! কিচেনে লফট্‌ বসালে চিমনি বসানো অসুবিধে। বাথরুমে লফট্‌ বসানো যাবে। প্রথম বার সোনারপুরে দু-কামরার বাড়ি বানিয়েছিল বিতনু। ফ্লোর এরিয়া চারশো পঁচাশি বর্গফুট। এস্টিমেটিংয়ের দিকে নজর আছে বিতনুর। জিনিস ভালো চাই। এর সঙ্গে জমির দাম, রেজেস্ট্রি খরচ, প্ল্যান স্যাংশন, মালমশলার খরচ আছে। শিডিউল অব কোয়ান্টিটি, আইটেম ওয়ারি, এস্টিমেটের উপর ভরসা রাখে বিতনু। প্লিন্থে একনম্বর হঁট দেবে। ইঁট পার পিস সাত টাকা এখন। তবু দেবে। পার্টি ছুটে আসবে। সাফল্য এভাবেই আসে। বুঝলে দিয়া দেবী?

ঘণ্টাখানেক বাদেই বরুণের ফোন— ‘ভালো পার্টি পাওয়া গেছে। ওরা যাবে? নাকি তুই আসবি?’

আনোয়ার শা রোড পর্ণশ্রী থেকে খুব বেশি দূর নয়। বিতনু মনে মনে হিসেব কষে। ডায়মন্ড হারবার রোড এসময় ভিড়ে জমজম করে। জুয়েলারি দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লোক দেখতে দেখতে দ্রুত অঙ্ক কষে বিতনু! বরুণের পার্টি বিতনুর জন্য আনোয়ার শা রোডে অপেক্ষমাণ। পর্ণশ্রীতে এক মোটা পার্টির সঙ্গে মোলকাত পর্ব সেরে আনোয়ার শা-এ যেতে হবে। এভাবে চালাতে পারলে মামনির বর জয়দীপ বহু দূরে রয়ে যাবে। আর বিতনু সাঁ সাঁ ছুটবে। ছুটতেই থাকবে। প্রতিষ্ঠা আর প্রতিষ্ঠা।

পর্ণশ্রী থেকে বের হতে দেরি হয়ে গেল। বরুণকে ফোন করে অ্যাপয়েন্টমেন্টের সময় চেঞ্জ করে নিল। নিজের ফ্ল্যাটেই কথা হবে। বিকেলে। বিকেলে? বিতনুর কি বিকেলে বাড়িতে বসে থাকা মানায়? উপায় নেই। বরুণ ফোন করেছে। ওরা কিছুক্ষণের মধ্যে চলে যাবে ওর ফ্ল্যাটে। মার্কেট সাইটে কাজ হচ্ছে। মৃদুলবাবু যেতে বলেছিলেন। দিয়া ওর অবস্থা দেখে থোকা গোলাপের হাসি হাসছিল।

‘তুমি কি কোটিপতি হয়ে যাবে?’ বলতে বলতে দিয়ার হাসি ঝাড়বাতির মতো দুলছিল। ওকে দেখতে দেখতে মামনির বর জয়দীপকে দেখতে পাচ্ছিল বিতনু। এত কাছে জয়দীপ দাঁড়িয়ে যেন ইচ্ছে করলেই জয়দীপকে বুড়ো আঙুল দেখানো যায়।

‘দিয়া! মোট সাতটা পার্টি পেয়েছি। এবারে ম্যাডামের জমিটা ধরব।’ দিয়ার পারসি কারুকাজের শাড়ির ফুল আর প্রজাপতি সমস্ত ফ্ল্যাটজুড়ে উড়তে থাকে। ফুল, ফুলের সুগন্ধে মাখামাখি হয়ে পড়ছিল বিতনু। আরও জমি। আরও ফ্ল্যাট। টন টন মেটিরিয়াল, কম্পিটিশন। আহা! ওহো! বসাককে একটা ফোন করতে হবে। ওর সঙ্গে কথাবার্তা সেরে রাখা জরুরি। বিতনু পকেট থেকে সেলফোন বের করে। ওধারে রিং হচ্ছে, ‘না দাদা। মেটিরিয়ালস আপনাকে দিতে পারব না।’ বসাক ভীষণরকম ব্যস্ততার ভান করে। চোখ তুলে তাকাচ্ছে না। যেন ফোনের মধ্য দিয়ে বিতনুর সঙ্গে চোখাচোখি হয়ে যাবে। বিতনু বুঝতে পারছিল।

‘সমীর গেছিল আপনার কাছে, তাই না?’ ব্যাপারটা আন্দাজ করতে পারছিল বিতনু। বসাকের গলার স্বরে কেমন এক ধরনের ঔদ্ধত্য ছড়িয়ে পড়ছিল ইথারে।

‘অস্বীকার করছি না। সমীরদা দাম বেশি রেখেছে। বুঝতেই পারছেন...।’ এই কথাগুলো বলার সময় বসাক কি রাস্তার দিকে তাকিয়ে আছে? মনে মনে বিতনুকে গালাগালও দিতে পারে। আবার সমীরকে সামনে রেখে দামটা বেশিই নেবে বিতনুর থেকে!

‘আরে! আমি কি কম দেব? তুমি যা রেট রেখেছ, আমি তাই...! জিনিস কিন্তু একনম্বর চাই ভাই! আমি রাতের দিকে যাচ্ছি।’ ফোন অফ করে একমিনিট চুপচাপ দাঁড়িয়ে ভাবে বিতনু। বসাককে বোঝা যায়। এখন ও নিশ্চয়ই বিতনুকে কী দামে মেটিরিয়ালস দেবে তার একটা হিসেব কষছে।

বরুণ পার্টি নিয়ে এসেছে। কথা বলে হতাশ হল বিতনু। পার্টি ওর কাছে আসার আগে সমীর সরকারের কাছে গেছিল। তিন হাজার টাকা স্কোয়ার ফিটের জায়গায় সমীর আঠাশশো নিচ্ছে। পার্টি তো মার্কেট যাচাই করবেই। এখন বিতনু যদি তিন বলে ওরা সমীরের কাছে যাবে। পার্টি হাতে রাখতে হলে বিতনুকে সাড়ে সাতশো স্কোয়ার ফিট রাখতে হয়। ওদিকে সমীর বসাক... মৃদুল... অজিত.... ম্যাডামের জমি...

বসাকের ঠেকে যাবে বলে বের হল বিতনু। অন্যমনস্ক ছিল বলে খেয়াল করেনি কখন যেন হাফপ্যান্ট বিতনু এসে হাজির হয়েছে। এল কোথা থেকে? বাঁ-পাশের শুটকো গলিটা দিয়ে? অদ্ভুত! গলিটার শেষ আর শুরু যে কোথায় বোঝা যায় না। বিতনুর দিকে তেরছাভাবে তাকিয়ে হাফপ্যান্ট বিতনু হাসল- ‘কী? পারবে? কাজটা অত সহজ নয় বুঝলে?’

পাল্টা জবাব দিতে গিয়ে থমকাল বিতনু। কীই-বা বলবে! বলার আছেই-বা কী?

শুটকো গলিটার সামনে দাঁড়িয়ে হাফপ্যান্ট বিতনু হাসে। মুখে উপদেশ- ‘কিচ্ছু নেই বুঝেছ? রাস্তাঘাট দ্যাখো। এর কোনো সমান্তরাল চেহারা আছে? অ্যাঙ্গেলগুলো দ্যাখো। শহর নির্মাণকারীদের কোনো জ্যামিতিক জ্ঞান নেই অ্যাঙ্গেল দেখলেই বুঝবে।’

‘জ্ঞান নেই?’ বিতনুর ঠোঁট ফুঁটে শব্দ বের হল।

‘কোনোকালেই ছিল না। ছ-হাজার বছর আগের কথা ভাবো। মহেঞ্জোদারোর স্থপতিরা জ্যামিতিক জ্ঞানের পরিষ্কার ছবি দিয়েছেন। সাতটা সমায়ত ব্লকে শহরকে বিভক্ত করা হয়েছিল। পড়নি ইতিহাস বইতে? পাঠ্যসূচিতে ছিল তো! অসাধারণ স্থাপত্যকৌশল। ভাবলে অবাক হতে হয়।’

‘তাহলে? কোনোকালেই জ্যামিতিক জ্ঞান ছিল না বললে কেন?’ প্রশ্নটা করেই বিতনু অবাক হল। গেল কোথায় হাফপ্যান্ট বিতনু? পাছে অন্য প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় তাই পালিয়েছে। প্রশ্ন তো আছেই! এতই যদি অসাধারণ স্থাপত্য তাহলে মহেঞ্জোদারো ধ্বংস হল কেন? না! রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফালতু সময় নষ্ট করছে ও। বসাক অপেক্ষা করছে। একটা মেসেজ পাঠিয়ে দিল বিতনু- যাচ্ছে। পনেরো মিনিটের মধ্যে।

বসাকের অফিস রুমটা কালো কাচে ঘেরা। কালো কাচ কেন বোঝে না বিতনু। কী লাভ এতে! অনেকদিন ভেবেছে বসাককে জিজ্ঞেস করবে। ভুলে যায়।

বসাক স্বভাবত তেরছা চোখে তাকাল- ‘কী হল? ভালো জিনিস চাই? খারাপ জিনিস আমি দিই না! দিই?’

লজ্জা পেল বিতনু। কালো কাচের ভেতর থেকে বাইরের দুনিয়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে, অস্বস্তি নিয়ে চেয়ারে বসে পড়ে বিতনু। বসাক ওকে নিরীক্ষণ করছিল— ‘কী হল দাদা? মেজাজ খাট্টা?’

‘নাঃ! নানা ঝামেলায়...’ মৃদুলবাবুকে ফোন করতে হবে। দরকারে ভালোই পরামর্শ দেন। এই ব্যবসায় মৃদুলকে দেখেই তো পা বাড়িয়েছে বিতনু। ফের মোবাইল বের করে ও ফের মেসেজ।

গোডাউনে মাল তদারকি করছিল বসাক। বসে থাকতে থাকতে হতাশ হয়ে পড়ছিল বিতনু। তখনই মৃদুলের ফোন এল।

‘বোকামি কোরো না বিতনু। তোমার ওই স্থায়ী সভ্যতা গঠনের প্রয়াস এবারে ত্যাগ করো। সভ্যতা কখনো স্থায়ী হয় না। একটা যায়, তবেই অন্য সভ্যতা আসবে। ইতিহাস পড়নি? কুলোতে পারবে না বুঝলে? বসাকের থেকে মাল বুঝে নাও। সাতাশশো টাকা রাখো স্কোয়ার ফিট। সমীরের ছেলেদের হাত করো। টাকা ছাড়ো। এছাড়া ম্যাডামের জমি পাবে না। আর খবর পেয়েছ? বস্তি পুড়েছে।’

বিতনু বিস্ময় লুকোয় না— ‘শুনলাম! প্ল্যানমাফিক হয়েছে নাকি? পুরসভার চেয়ারম্যান জড়িত নাকি?’

বিরক্ত হল মৃদুলবাবু- ‘নাকি, নাকি করছ কেন? ওসব দেখার দরকার কী তোমার? যোগাযোগ করো। চার কাঠাও যদি পাও...! এসব সুযোগ হাতছাড়া করা উচিত?’

ফোন অফ করে কিছুক্ষণ অপেক্ষা করে বিতনু। পররিবর্তিত হতে সময় দরকার।

‘কী হল দাদা?’ বসাক কাজকম্মো সেরে এসে পড়েছে। বসাকের ঝুলেপড়া মুখটার দিকে তাকিয়ে মৃদুলকে স্মরণ করে বিতনু। তারপর একটা চোখ টিপল বসাকের চোখে তাকিয়ে। এভাবে চোখ টিপতে দেখেছে ও মৃদুলকে। সমীরকে। অজিতবাবুকে।....!

‘তোমার ছেলেদের একটু বলে রেখো...।’ গলা বাড়িয়ে ফিসফিস করে বিতনু। কখন যে বসাককে আপনি থেকে তুমিতে নামিয়েছে মনে নেই।

‘সে বলতে হবে না।’ বিতনুর গলা বাড়িয়ে দেওয়া, বিতনুর ফিসফিস, দেখেশুনে চোখ চকচক করে বসাকের। চেনা মানুষকে দেখে জ্যাবজেবে হাসি হাসে বসাক— ‘তবে বলি, পাথর, সিমেন্ট, মোটাদানা বালি, হোয়াইট সিমেন্ট, টাইলস আমি দেব কিন্তু।’

‘সে বলতে হবে?’ হাসে বিতনু। হাসতে হাসতে ভেতরে ভেতরে দাঁত খিঁচোয়— শাল্‌লা!

দিয়া ভারি অবাক—‘এত কিছু সামলাতে পারবে?’

‘হয়ে যাবে।’ বিতনু পা ছড়িয়ে বসে।

‘মানে? অনেক টাকা লোন নিয়েছ। কাস্টমার পুরো টাকা দেয়নি এখনও?’

‘পেয়ে যাব। বুকিং শুরু হবে। একটা ছাদ ফেলতে দাও। রিস্ক না নিলে কি ব্যবসা হয়?’

পরের দিনটা শুরুই হল ঝামেলা দিয়ে। মৃদুলকে দরকার ছিল অথচ দেখা হল না। দ্বিতীয়ত বরুণের পার্টি দামটা আরও কমাতে চাইছে। বাথরুমের আয়নায় নিজের খিঁচোনো মুখ দেখে বিতনু। এই এক ঝামেলা। কেনাকাটার সময় পার্টি মেটিরিয়ালের খোঁজ চায়। তখন কম দামের ফ্ল্যাটের জন্য হুড়োহুড়ি করে। পরে বোঝে সস্তার কয় অবস্থা!

এসব ঝামেলার খবর দিয়া নিতে চায় না। বুঝতেও চায় না। ও বলে, ‘তোমার কী দরকার? পার্টি যা চায় তাই দাও। দেখতে ভালো, দাম কম— এমন জিনিস যদি দিতে পার তো দেবে না কেন?’

ঠিক। মাঝের ফাঁকটা ঢাকতে হবে মেটিরিয়ালস দিয়ে। দেখতে ভালো, দাম কম। বাইশ এম এম রড ব্যবহার করবে বিতনু। বারোভাগ বালি একভাগ সিমেন্টের সনাতনী নিয়ম পালটে সাতভাগ বালি একভাগ সিমেন্ট দেবে। অভাব বোঝে কোন শালা? ম্যাচিওরড কাঠ দেবে না কোথাও। এসব নিয়ে বসাকের সঙ্গে বসতে হবে। ও হল ননবায়োলজিক্যাল ভাইরাস। সবার অজান্তে সবকিছু নষ্ট।

দিন-রাত এক করে ফেলেছিল বিতনু। কোথায় রড, কোথায় সিমেন্ট করে নাওয়া-খাওয়া মাথায় উঠেছে। বসাকের তুলনায় কম রেট খুঁজতে মার্কেট চষে ফেলেছে। অসম্ভব ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে পড়ছিল। দিয়া ডাকছিল— ‘শুনে যাও, এসে দ্যাখো।’

অদ্ভুত সব জিনিস দিয়ে ঘর সাজিয়েছে দিয়া। এতে নাকি সুখসমৃদ্ধি বাড়বে। স্বাস্থ্যকর ব্যস্ততার মধ্যে ঝলমল করবে বিতনু। যদিও স্বাস্থ্যকর ব্যস্ততার মানেটা ঠিকঠাক বুঝতে পারল না বিতনু। তবে হ্যাঁ, আজ অবশ্য ম্যাডামের সঙ্গে কথা পাকা করে এসেছে। ভালো দাম পেতে হলে জমিটা ওকেই দেবেন ম্যাডাম। উনি কোনো ঝামেলা চান না।

না। এটা ঝামেলা নয়, বিজনেস। যে পুজোয় যে নিয়ম ওখানে তাহলে বসাকের ছেলেদের ফিট করতে হচ্ছে।

বিজ্ঞাপনের খসড়া তৈরি করছিল বিতনু- ‘সুন্দর পরিবেশে, সুযোগ সুবিধাসম্পন্ন স্থানে ফ্ল্যাট বাড়ি বিক্রয়। স্থান...।’ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে লেখাটা পড়ল দিয়া উঃ! কী করছ? লেখায় কায়দা কোথায়? ‘আসুন! আমরা আপনাকে স্বপ্ন দেখাই...’ এরকম লেখো। বিজ্ঞাপনে রং চাই!

‘ওয়াও! এক হাতে দিয়ার কোমর জড়িয়ে ধরে বিতনু ‘আ প্রাসাদ কনস্ট্রাকটেড বাই বিতনু ইন দ্য ডাইরেকশন অফ দিয়ারানি।’ হাসছিল বিতনু। দিয়াও।

চেয়ারে পা ছড়িয়ে বসেছিল বসাক। বিতনু চেয়ার টেনে বসে পড়ল। সস্তার মেটিরিয়ালস চাই। যত সস্তা তত লাভ। অভিজ্ঞতা চাই। পেশিশক্তি চাই। মাটির সন্ধানে কুকুরের মতো ছুটতে জানা চাই। বিল্ডিং চাই, বসাক। অনেক বিল্ডিং। অসাধারণ স্থাপত্য কৌশল আয়ত্ত করতে হবে। তবেই না সাফল্য। সাকসেস! হাসি মুখে শঙ্খধ্বনি শোনে বিতনু। মানুষ বাড়ছে। এক সভ্যতা ভেঙে অন্য সভ্যতা তৈরি হচ্ছে। শহর নির্মাণকারী বিতনু মহেঞ্জোদারোর ধ্বংসের কারণ জেনে ফেলছে।

‘মাল রেডি দাদা। খবর শুনেছেন? সমীর সরকার আউট। ওর বাইসেপ দুবলা হয়ে গেছে।’ বসাক হাসে।

কিন্তু বিতনু জেনে গেছে সমীররা ফের আসবে। আরও কম রেটে তৈরি হবে ফ্ল্যাট। নীচু স্বরে আঁতাত গড়ে বিতনু। কালো কাচের ভেতরে ওদের দুজনকে বাইরে থেকে দেখা যায় না।

কথা শেষ। বাইরে এসে দাঁড়াল বিতনু। এবার গিয়ার চেঞ্জ করো। ক্ল্যাচটা দাবাও! গতিতে ছোটো। এক সভ্যতা থেকে অন্য সভ্যতা থেকে অন্য সভ্যতায় যাও! কৃষি সভ্যতা থেকে যে-সভ্যতায় পা রেখেছিল মানুষ, সেই পা বাইকে তুলে নিল বিতনু। সারি সারি ফ্ল্যাটের ভেতরে ঘূর্ণমান এক পিঁপড়ে ছুটছিল। সাকসেস নামক গুড়ের খোঁজে।

সকল অধ্যায়

নোট নিতে এবং টেক্সট হাইলাইট করতে লগইন করুন

লগইন
০%